Home আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৭৭+৭৮+৭৯

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৭৭+৭৮+৭৯

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৭৭+৭৮+৭৯
ফারজানা মনি

রাতের খাওয়া শেষে সবাই যার যার রুমে চলে গেল। মিম রুমে ঢুকেই তাড়াতাড়ি করে দরজাটা লাগিয়ে দিল। তারপর বালিশের নিচ থেকে ফোনটা নিয়ে চেক করলো আরিফ কোন কল বা মেসেজ দিয়েছে কিনা। নাহ.. দেয়নি। মিম আর অপেক্ষা করলো না। ও নিজেই কল লাগালো আরিফকে। একবার নয় দুইবার নয় প্রায় সাত বার কল দিল কিন্তু ওই পাশ থেকে কেউ কল রিসিভ করল না। মিম হতাশ হয়ে দু হাত দিয়ে মুখ চেপে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। আর আস্তে আস্তে আওরালো: কোথায় তুমি আরিফ? আজ যে তোমাকে আমার বড্ড বেশি প্রয়োজন। আমি যে তোমায় ছাড়া নিঃস্ব ,বড্ড বেশি একা।

টুং.. মেসেঞ্জারে মেসেজের শব্দ পেয়ে মিমের ঘোর কাটলো। ছুটে গেল ফোনের সামনে। হ্যাঁ মিম যা ভেবেছে তাই, এইতো তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটির মেসেজ।
আরিফ: hi
মিম: hlw
আরিফ: কেমন আছো?
মিম আরিফের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আতঙ্কিত কন্ঠে আরিফকে পাল্টা প্রশ্ন করল: এতগুলো কল দিলাম কল কেন ধরলে না?
আরিফ: কাজ ছিল তাই ব্যস্ত ছিলাম।
মিম অভিমানী কন্ঠে বলল: ওহ।
আরিফ: এতগুলো কল দিলে জরুরী কিছু বলবে?
মিম ভেবে পাচ্ছে না কি করে আরিফ কে বলবে তার বিয়ের কথা। মিম যখন ভাবনায় ব্যস্ত তখন আরিফ বারবার মেসেজ দিচ্ছে।
আরিফ:ai
আরিফ:oi
আরিফ: ai mim
ঘন ঘন মেসেজের টুং টুং শব্দে মিম বাস্তবে ফিরলো। তাড়াতাড়ি ফোনটা হাতে নিয়ে রিপ্লাই দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু কি বলবে সে আরিফকে। কি করে বলবে এক সপ্তাহ পর তার বিয়ে। তাছাড়া আরিফের রিএকশন ই বা কি হবে?

মিম কাঁপা কাঁপা হাতে মেসেজ লেখা শুরু করলো: আরিফ, তোমার কথা অনুযায়ী আমি আব্বু আম্মুকে তোমার কথা জানিয়েছিলাম। তারা আমাদের সম্পর্কটা মানতে নারাজ।
মেসেজটি সেন্ড হওয়ার সাথে সাথেই ওই পাশ থেকে রিপ্লাই মেসেজ আসলো।
আরিফ: কি বলেছে মামা- মামি?
মিম: দুপুরে আব্বু আম্মুকে জানিয়েছিলাম। আম্মু শুনেই আমাকে একটা চড় মেরেছে। আর আব্বু বলেছে, তোমাকে বিয়ে করলে ফুপির মত আমাকেও আর খান বাড়িতে আসতে দেওয়া হবে না।
আরিফ: ওহ।
মিম চোখের পানি মুছতে মুছতে আবার লিখলো: তুমি শুধু ওহ বলছো? তোমার কি একটুও টেনশন হচ্ছে না? নাকি তুমি আমার কথা গুরুত্ব দিচ্ছ না।
আরিফ: আজব গুরুত্ব না দেওয়ার কি আছে আমি তো তোমার সকল কথাই শুনলাম।
মিম: তাহলে কিছু বলছো না যে? তোমার কি কিছুই করার নেই?
আরিফ: দেখো মিম.. আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি এটা যেমন সত্যি তেমন আমার ফ্যামিলিকেও আমি ভীষণ ভালোবাসি। আমার পরিবারকে আমার যতই কষ্ট হয়েছে মানিয়ে নিয়েছি। এখন তুমিও তোমার পরিবারকে মানানোর চেষ্টা করো।

মিম: আচ্ছা আরিফ, তোমার কি মনে হয় না আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি সবাইকে মানানোর?
আরিফ: চেষ্টা যেহেতু করতেছ সেহেতু তারা অবশ্যই মেনে নেবে। তাদের একটু সময় দাও। আর আবারো বোঝানোর চেষ্টা করো।
মিম: সময় দেওয়ার মতো সময় আর নেই আরিফ।
আরিফ: কেনো?
মিম: কারণ আগামী সপ্তাহের দিকে আমার বিয়ে..
আরিফ: বিয়ে!!
মিম: হুম বিয়ে.. আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আগামীকাল ছেলে পক্ষের সাথে আমাদের বাড়ির আব্বু, চাচ্চু ও ভাইয়ারা একত্রিত হয়ে বিয়ের তারিখ ঠিক করবে। সবাই চায় আগামী শুক্রবার বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করতে।
এবার আরিফের মেসেজটি কেমন জানি গা ছাড়া মেসেজ মনে হলো মিমের। আরিফ বলল: তাহলে আর কি.. সব যেহেতু ঠিক হয়ে গেছে তাহলে বিয়েটাও করে নাও ।
নোনা জলে মিমের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। তাও চোখের পানি মুছে আবার লেখা শুরু করল: তুমি কি করে বলতে পারছ এসব। তুমি তো এমন ছিলে না..
আরিফ: তাহলে কি বলবো? বিয়েটা নিশ্চয়ই হঠাৎ করে ঠিক হয়নি। তুমি সবটা জানার পরেও আমাকে এতদিন জানাওনি। এখন হঠাৎ করে বলছো সামনের সপ্তাহে বিয়ে। হাতে মাত্র এক সপ্তাহ। এই অল্প সময়ে আমি কি বা করতে পারি।

মিম কাঁদতে কাঁদতে বলল: তুমি এভাবে বলোনা আরিফ। তুমি তো আমাকে কথা দিয়েছিলে, যত বিপদই আসুক তুমি আমার পাশে থাকবে। তাহলে আজ কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ। আমি তোমায় খুব ভালোবাসি আরিফ। অন্য কারো ঘরে বউ হয়ে যাওয়ার কথা ভেবেই আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমি তোমায় ছাড়া বাঁচবো না, এটা কি তুমি বুঝতে পারছ না?
আরিফ: আমি জানি মিম। আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু আমার হাত-পা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বাঁধা। আমি চাইলেই তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারি না। আমার আম্মু দীর্ঘ 27 বছর পর তার ভাইদের সাথে সম্পর্ক ঠিক করেছে। আমি চাইনা নতুন করে আমার জন্য আবারো খান পরিবারের সাথে আমাদের বিচ্ছেদ হোক। তুমি প্লিজ তোমার ফ্যামিলিকে মানানোর চেষ্টা করো।
মিম দু হাতে চোখের পানিগুলো মুছে বলল: আর যদি না পারি?
আরিফ: তাহলে পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও।
মিম আশ্চর্য কন্ঠে বলল: আরিফ!! তুমি কি করে বলতে পারছো এসব? তুমি কি ভুলে গেছো আমাদের গত ৫ বছরের স্মৃতি গুলো.. আজকের দিনটার ভয়েই আমি গত পাঁচ বছর আগে তোমাকে একসেপ্ট করতে চাইনি। তবুও তুমি এলে আমার জীবনে। আর এখন এসে যখন পড়েছ, তাহলে ছেড়ে কেন যাচ্ছে?
আরিফ: সরি মিম। প্লিজ পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও। কিন্তু দুই ফ্যামিলির অমতে আমি তোমাকে কিছুতেই বিয়ে করতে পারব না।
মিম এবার খানিকটা রাগী কন্ঠে বলল: এটাই কি তোমার শেষ কথা?

আরিফ: হুম।
মিম: ঠিক আছে মিস্টার আরিফ। আপনাকেও আমার বিয়েতে দাওয়াত রইল। অবশ্যই দুই দিন আগে থেকেই চলে আসবেন। আফটার অল, আপনি আমার প্রিয় কাজিন বলে কথা।
তারপর আরিফের আইডি থেকে শুধু একটি মেসেজই আসলো; ভালো থেকো।
মিম ফোনটা বিছানায় ছুড়ে মেরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলো। কি বলছে আরিফ? আরিফকে আজ বড্ড বেশি অচেনা লাগছে। যেই ছেলেটা মিম বলতে পাগল ছিল। সে আজ কত সহজে মিমকে এগিয়ে দিল অন্যের ঘরণী হতে। মীম হাত পা ছড়িয়ে ফ্লোরে বসে কাঁদছে। আর বারবার বলছে: আমার সকল ভালো থাকা কেড়ে নিয়ে, তুমি কি করে আমায় বলছো ভালো থাকতে? তুমি কেন বুঝতে পারছ না আমার সকল ভালো থাকা তুমি। তুমি কি করে এত নিষ্ঠুর হতে পারলে। বেইমান তুমি, আর বেইমান তোমার ভালোবাসা? আমি ঘৃণা করি, তোমাদের মত বেইমান পুরুষের বিষাক্ত ভালবাসাকে।

রাত ১২ঃ০০ টার কাটায়।
মেঘ আহিয়ান ও আহিয়া কে বুকে নিয়ে ঘুমাচ্ছে। আবির এতক্ষণ পাশেই বসে ল্যাপটপ নিয়ে অফিসের কাজ করছিলো। হঠাৎই আবিরের মুখে চিন্তিত ও হতাশার ভাব ফুটে উঠলো । ল্যাপটপটা বন্ধ করে বিছানা থেকে নেমে গেল ব্যালকনিতে। আবির তাকিয়ে আছে দূর ঐ আকাশের পানে।
আকাশের চাঁদটা বারবার মেঘের কোলে হারিয়ে যাচ্ছে। আবার একটু পর পর বের হয়ে আলো ছড়াচ্ছে পৃথিবীর বুকে। হঠাৎ একটা শব্দে ধ্যান ভাঙল আবিরের। লক্ষ্য করে দেখলো, আকাশ থেকে অনেক নিচ দিয়ে একটা প্লেন উড়ে যাচ্ছে তার নিজ গন্তব্যে । আবির খানিকক্ষণ ওই দিকে তাকালো। তারপরেই পাশে কারো উপস্থিতি টের পেলো। কিন্তু আবীর পাশ ফিরে তাকালো না। আবির জানে তার পাশের মানুষটি কে।
আহিয়ার আব্বু… মেঘের ডাকে আবিরের শান্ত জবাব: হুম।
মেঘ:অনেক রাত হয়েছে এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন? রুমে চলুন ঘুমাবেন।
আবির; ঘুম আসছে না।

মেঘ : কেন? কি নিয়ে আপনার এত টেনশন?
আমি মৃদু হাসলো। তারপর মেঘকে কিছুটা কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল: আহিয়ার আম্মু.. আমার হঠাৎ করেই কেন যেন ভয় হচ্ছে!
মেঘ আবিরের বুকে মাথা রেখে এক হাত দিয়ে আবিরের বুকের বা পাশে কি যেন আঁকিবুকি করছে। আবিরের কথা শুনে মেঘের সহজ-সরল জবাব: কেন?
আবির মেঘকে আরেকটু বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল: আচ্ছা.. এত তাড়াতাড়ি করে মিমের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে কি আমি ভুল করলাম?
মেঘ: একদমই না। মেয়েরা হলো ঘরের সম্মান। তাদের সম্মান মত বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোটা হলো বাড়ির বড়দের দায়িত্ব। আর আপনি সেই দায়িত্বই পালন করেছেন।
আবির: আচ্ছা আহিয়ার আম্মু… মীম আমায় ভুল বুঝবে না তো?
মেঘ আবিরকে সান্ত্বনা দেওয়ার কণ্ঠে বললো: মোটেও না.. দেখবেন এমন এক সময় আসবে মিম আপনাকে আপনার এই সিদ্ধান্তের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাবে। বলবে.. ভাইয়া তুমি না থাকলে জীবনে এত সুখ কখনোই আসতো না।

মেঘের কথা শুনে আবির পুনরায় মুচকি হাসলো। তারপর মেঘের এক হাত নিজের হাতে নিয়ে উষ্ণ ওষ্ঠ ছুঁয়ে দিলো। মেঘ যেন হঠাৎ করেই কেঁপে উঠলো।
আবির মোহনীয় কন্ঠে বলল: সেই একই তুমি, সেই একই আবেগ, আর সেই একই শিহরণ।
মেঘ খানিকটা লজ্জা পেয়ে আবিরকে ছেড়ে পাশে দাঁড়ালো। আবির মেঘের দিকে ফিরে কিছুটা মেঘের মুখের উপর ঝুকলো। তারপর একবার চাঁদের পানে তাকিয়ে মেঘের দিকে ফিরে নেশাতুর কণ্ঠে বলা শুরু করল:
চাঁদের মতো তুমি—নির্জনেও আলো,
যেখানে যাই, কাদম্বিনী, তুমি পাশে চলো।
তুমি নেই তো রাত ঝাপসা, আকাশ ফাঁকা,
তুমি এলে রাতটা যেন প্রেমে ভরা ঢাকা।
এই পৃথিবীর চাঁদ, হোক শত আলোয় ভরা,
তোমার মুখশ্রী ছাড়া, তা লাগে সারা শূন্য ধরা।
তাই বলি বারবার—চাঁদ নয়, কাদম্বিনী তুমি,
তোমায় নিয়েই রচি হৃদয়-আকাশের ভূমি।

মেঘ লজ্জায় বেলকনি থেকে চলে যেতে চাইল। কিন্তু আবির কি একা পেয়ে নিজের বউকে যেতে দেওয়ার পাত্র। মুহূর্তেই মেঘের ওড়না টেনে ধরল। মেঘ গলার কাছে ওড়নাটা খামচে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ইস্ কি লজ্জা! বিয়ের এত বছর পরেও এই মানুষটা নিজের বউকে লজ্জা দিতে সর্বদাই প্রস্তুত।
মেঘের সারা দেহটা লজ্জায় ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে কেঁপে উঠছে। আবির মেঘের লাজুক মুখটাকে দুহাতের আজলায় নিয়ে মৃদু কন্ঠে বলল:♥️♥️ বউ.. হোকনা আরেকটা মধুময় রাত তোমার আমার ♥️♥️
বলেই আবির নিজের ঠোঁটটাকে নিয়ে আসলো মেঘের তির তির করে কাঁপা ঠোঁটের কাছে।
য়ু হু.. মাম্মা.. তুমি কোতায়?
আহিয়ার কান্নার শব্দ পেয়ে মেঘ গাল থেকে আবিরে হাত সরিয়ে বলল: মেয়ে কাঁদতেছে, আমি যাই।
বলেই মেঘ ছুটে গেল রুমের দিকে।
উফফফস… বেচারা আবির..

আবির এবার লুকিয়ে যাওয়া চাদবিহীন অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে একা একাই বিড়বিড় করল। “শালার জীবন.. এই জীবন রাইখা লাভ কি? এইজন্যই বউকে বলছিলাম বাচ্চাটা আর কয়েক বছর পরে নেই। কিন্তু বউকি আমার কথা শোনার নারী। যখনই বউটাকে একটু একলা পাই, তখন ই ছেলে না হয় মেয়ে এসে আমার রোমান্সের বারোটা বাজায়”
আবির গিয়ে হন্ততন্ত হয়ে মেঘের পাশে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো ।
ইতিমধ্যে মেঘ আহিয়াকে ঘুম পাড়িয়ে ফেলেছে। আবিরের উপস্থিতি বুঝতে পেরে, মেঘ এবার আবিরের দিকে ফিরে শুয়ে পড়লো। কি আর করার.. আবির ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেঘকে বুকে নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলো।

ভোরের প্রথম কিরণটা জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকতেই, নিঃশব্দে বদলে যেতে লাগল পুরো পরিবেশটা। রাতের ঘুমঘোরে ডুবে থাকা শহর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে ফজরের আযান, পাখিরা ডানা ঝাপটাচ্ছে — কেউ গানের সুরে, কেউবা ডাকে সাড়া দিয়ে।
ঘরের কোণে রাখা একটা পুরোনো ঘড়ি তখন ঠিক ভোর ৫টা বাজিয়ে জানিয়ে দিল — “এখানে একটা নতুন সকাল শুরু হয়েছে।”
সকালের একটা বিশেষ গন্ধ থাকে — টাটকা, স্নিগ্ধ, জীবনের মতো। বাতাসে শিশিরের ছোঁয়া, কাক ডাকা ভোরের প্রশান্তি, আর নতুন কিছুর আশার আলতো কাঁপুনি। আজকের এই সকালটা অন্য রকম — যেন কিছু একটা ঘটার অপেক্ষায়।

ঘরের মধ্যে আলোটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে কেউ একজন চোখ মেলে তাকিয়ে আছে দূরের আকাশে। হালকা নীলচে আলো তার চোখে, মনে, মুখে ছড়িয়ে দিয়েছে বিষাদের ছোঁয়া।
আজকের সকালটা শুধু আরেকটা দিন নয়।
আজ থেকে বদলে যাবে কারো জীবনের গল্প।
গতকাল সারারাত দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি মিম। সারারাত কান্না করে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। একদিনেই যেন মেয়েটার চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিটা কত যে বিষাদের তা শুধু একটা মেয়েই উপলব্ধি করতে পারে। একদিকে পরিবারের সকলের আশা ভরসা এই বিয়েটাকে নিয়ে। অন্যদিকে প্রিয় মানুষটার অবহেলা। পরিবারের থেকে পাওয়া কষ্টটা প্রিয় মানুষকে বলা যায় না আর প্রিয় মানুষের দেওয়া কষ্টটা পরিবারকেও বলা যায় না। যা ভিতরে ঘুমড়ে ঘুমড়ে একটা মেয়েকে মৃত্যুর দিকে অবতারিত করে।
হঠাৎ করে দূর ওই নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে মিম গুনগুন করে একটা বিষাদের গান গেয়ে উঠল__
সুখে থাকার স্বপ্ন দিলা—

সুখ তো দিলা না,
কতো সুখে আছি, বেঁচে খবর নিলা না,
বিধি— খবর নিলা না।
আমি ছাড়া কেউ নাই আমার
দুঃখের পরিজন,
আমারে পুড়াইতে তোমার এতো আয়োজন,
আমারে ডুবাইতে তোমার এতো আয়োজন,
মিমের কন্ঠে এমন একটা বিষাদের গান যেন পরিবেশটাকে আরো ভারী করে তুলেছে।
আজ শনিবার
আস্তে আস্তে সূর্যি মামা উকি দিচ্ছে সকালের নীলাভ আকাশে। সূর্যের কিরণটা সরাসরি আবিরের চোখে পড়ছে। ঘুমের মাঝে যা একেবারে অসহনীয়। আবির আস্তে আস্তে চোখ খুলল । কিন্তু সামনে যা দেখল, এক মুহূর্তেই তার মনে প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গেল।

মেঘ একটা গাঢ় নীল রংয়ের থ্রি পিস পরে ড্রেসিন টেবিলের সামনে বসে চুলে চিরুনি করছে। চুল থেকে টপটপ করে ঝরে যাওয়া পানি গুলো মেঘের পিঠ বেয়ে বেয়ে কোমর ভিজে যাচ্ছে।
আবির এক দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে আছে। কি মোহনীয় সেই দৃশ্য.. যা আবিরের প্রথম সকাল টাকে আরও মনোমুগ্ধকর ও স্নিগ্ধ করে তুলেছে।
হঠাৎ করে মেঘের দৃষ্টি সামনের আয়নার দিকে পড়তেই লক্ষ্য করল, আবির মুগ্ধ চোখে এদিকেই তাকিয়ে আছে।
মেঘ একটু মুচকি হাসলো। তারপর চোখের ইশারায় প্রশ্ন করল: কি হয়েছে?
আবির মুচকি হেসে জবাব দিল: ভাবছি।
মেঘ: কি?
আবির দুষ্টু হাসি মুখে টেনে বলল: আমিতো রাতে কিছু করিনি।
আবিরের কথা শুনে মেঘের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল: উফফ.. সকাল বেলাই আপনি শুরু করে দিয়েছেন?

আবির: কেউ স্বামীকে সারা রাত অনিহায় রেখে সকালবেলা উঠেই গোসল করবে। আর আমি বললেই যত দোষ।
লজ্জায় যেন মেঘের কান গরম হয়ে উঠল । সাথে খানিকটা অপরাধবোধ। মেঘ মিন মিনিয়ে বলল: আমার কি দোষ? আপনার ছেলে সকালবেলাই আমার গায়ে জুস ফেলে দিয়েছে। তাইতো গোসল করতে বাধ্য হলাম।
আবির এতক্ষণে উঠে মেঘের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। পিছন থেকে মেঘের কাঁধে দুই হাতে রেখে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল: হয়েছে আর মন খারাপ করতে হবে না। আমি তো এমনি দুষ্টুমি করেছি।
আবির আবার পুনরায় প্রশ্ন করল: আহিয়ান আর আহিয়া কই?
মেঘ জবাব দিল: আহিয়ান নিচে ড্রয়িং রুমে টিভিতে কার্টুন দেখতেছে। আর তৃধা ও আহিয়া খেলতেছে।
আবি র একবার ঘড়ির দিকে তাকালো। তারপর বলল: ঠিক আছে, নাস্তা রেডি করো। আমি শাওয়ার নিয়ে নিচে আসছি। আজ একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে।
মেঘের শান্ত জবাব: জ্বী আপনি আসুন।

সকালের নরম আলো ঘরের কাচের জানালা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বাড়িটায়। নিচতলার ডাইনিং টেবিলে মেঘ ও বন্যা নাস্তা গুছিয়ে রাখছে। আজকের দিনটা বিশেষ, কারণ আবিরের অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। মেঘ সকাল থেকে সবকিছু নিখুঁত রাখার চেষ্টা করছে—আবিরের শার্টে যেন কোনো ভাঁজ না থাকে, টাইটা ঠিকভাবে গোঁজা হয়, আর প্রিয় কফির মগে যেন কড়া কফির গন্ধ থাকে।
ঠিক তখনই সিঁড়ির দিক থেকে ধীরে ধীরে ভেসে এলো আবিরের জুতোর শব্দ। মেঘ একটু পেছন ফিরে তাকাতেই চোখ আটকে গেল।

আবির নামছে সিঁড়ি বেয়ে—আজ যেন একদম রাজপুত্রের মতো লাগছে ওকে।
ধবধবে সাদা রঙের শার্টে গলা পর্যন্ত বোতাম আঁটা, গায়ে হালকা নীল রংয়ের ব্লেজার, হাতে কালো রিস্টওয়াচ, চোখে কালো সানগ্লাস ,আর চোখে মনোযোগী, আত্মবিশ্বাসী এক ঝলক। চুলগুলো পরিপাটি করে সেট করা, আর ক্লিন শেভড মুখে যেন একটা অদ্ভুত সৌন্দর্যের দীপ্তি। সকালের রোদে তার গায়ের গাত্রবর্ণ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। চোখে সেই পরিচিত গম্ভীর ভাবটা—যেটা মেঘকে বারবার না চাইতেও তার দিকে টেনে নিয়ে যায়।
মেঘের হাতের চামচ থেমে যায়। চোখটা স্থির হয়ে যায় আবিরের মুখে। সেই হাঁটাটা, সেই উপস্থিতি—সবই যেন ওকে প্রতি মুহূর্তে নতুন করে প্রেমে ফেলে দেয়।
আবির নিচে নেমে এসে এক ঝলক তাকায় মেঘের দিকে। ঠোঁটে সামান্য একচিলতে হাসি। ফিসফিশিয়ে বলল:
– “কি হলো? এমন করে তাকিয়ে আছো কেন?”
মেঘ যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে আসে। লজ্জায় গাল লাল হয়ে যায়। আস্তে আস্তে বলল:
– “এই… কিছু না… আজ একটু বেশিই… হ্যান্ডসাম লাগছে। মনে হচ্ছে সেই পুরনো আপনি”
আবির হাসলো। আবিরকে দেখে আজ মেঘের পুরনো স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। সাথে পুরনো সেই চির পরিচিত গান।

আরে ভাইয়া, তোমাকে তো আজকে অনেক হ্যান্ডসাম লাগছে। তানভীর এর কন্ঠে ধ্যান ভঙ্গ হলো মেঘের। তাকিয়ে দেখল আবির গিয়ে তার চেয়ারে বসে পরেছে।
আলী আহমেদ খান হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলল: দেখতে হবে না ছেলেটা কার.. আমিও এক সময় এত হ্যান্ডসাম ছিলাম।
আলী আহমেদ খানের কথা শুনে ড্রয়িং রুমে যেন হাসির ঝরনা বইছে।
আলী আহমেদ খান আবার পুনরায় বললেন: আবির আজকের মিটিং এর প্রস্তুতি কেমন ?
আবির খেতে খেতে জবাব দিল: আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কোন টেনশন করবেন না।
ওদের কথার মাঝখানে মোজাম্মেল খান বলল; আরে ভাইজান আপনি চিন্তা করবেন না, আমার মেয়ের জামাইকে দেখেই ক্লাইন ডিল ফাইনাল করে ফেলবে।
এবার ইকবাল খান বলল: হুম, দেইখো ক্লাইন্ট আবার নিজের মেয়েকে বিয়ে দিতে চায় কিনা তোমার মেয়ের জামাইয়ের কাছে। ইকবাল খানের কথা শুনে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
আবির মনে হয় এবার খানিকটা লজ্জায় পড়লো।

কথা ঘুরানোর জন্য বলল: তোমাদের সবার মনে আছে তো, আজকে আমাদের ওই বাড়িতে যেতে হবে।
আলী আহমেদ খান ,মোজাম্মেল খান ,ইকবাল খান ও তানভীর একসঙ্গে বলে উঠলো: হ্যাঁ আমরা প্রস্তুত।
একই ধ্বনিতে সবার একসাথে কথা শুনে মনে হল এখানে কোন যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে।
একে একে খাওয়া শেষ করে, সবাই অফিসে চলে গেল। প্রতিদিন সকালে দুই ঘন্টা সময় ব্যয় করে মেঘ আহিয়া ও আহিয়ানকে খাওয়াতে। আজ তৃধা ও এসে যোগ হয়েছে। মেঘ তিনটাকে খাওয়ানোর চেষ্টায় হাপিয়ে উঠেছে। আহিয়ার নানান বাহানা খাবার না খাওয়ার। সারাক্ষণ বাহানা দেয়, মাম্মা আমি পাপার সাথে খেয়েছি। যা চরম ভুল কথা। প্রতিদিন সকালে অফিস যাওয়ার আগে‌ সবাই যখন ডাইনিং টেবিলে খেতে যায়। তখন একে একে হাজির হয় আহিয়ান, আহিয়া ও তৃধা। ওরা খেতে পারুক আর না পারুক ওদের একটাই উদ্দেশ্য নিজেদের চেয়ারগুলোতে বসে পাপা ,দাদু ও নানুদের সাথে গল্প করা।

সময় চলছে সময়ের গতিতে..
দেখতে দেখতে দিন পেরিয়ে বিকেল হয়ে আসলো। মিম সকালে নাস্তা খায় নি। অনেক ডাকার পর দুপুরে এসে দুপুরের খাবার খেয়েছে। মিমের মনে একটাই প্রশ্ন: বাড়ির সবাই কি আমার কষ্টগুলো বুঝতে পারছে না? নাকি বুঝতে চাইছে না? আমার পরিবারের চির পরিচিত লোকগুলো তো এমন ছিল না।
গতকাল সারারাত না ঘুমানোর দরুন মিম খাওয়ার পর দুপুরে রুমে গিয়েই ঘুমিয়ে পড়ল।
হঠাৎ কিছু চিৎকার চেঁচামেচি শব্দের মিমের ঘুম ভেঙে গেল। উপর থেকে নিচতলার কথা যতটুকু শোনা যাচ্ছে, মিম বুঝতে পারলো আবির আর তানভীর চলে এসেছে।
কি হয়েছে বোঝার জন্য মিম আস্তে আস্তে নিচে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। কিন্তু একটা কথা শুনে সিঁড়ির উপরেই থমকে গেল মিম ।

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৭৪+৭৫+৭৬

আম্মু.. সবাইকে মিষ্টি খাওয়াও। আগামী ৪ জুলাই মিমের বিয়ে।
মালিহা খান অবাক কন্ঠে বলল: ৪ জুলাই মানে তো আগামী শুক্রবার! আর আজকে শনিবার, তার মানে হাতে বেশি সময় নেই।।
আবির খুশি মনে হাসতে হাসতে সকলের উদ্দেশ্যে বলল: জ্বি আগামী শুক্রবার। তোমরা সবাই প্রস্তুতি নাও, আমরা আগামীকাল বিকেলেই স্পেরো ড্রিম হাউসে চলে যাব। পরে সেখানেই বিয়ের সকল আয়োজন করা হবে।

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে সিজন ২ পর্ব ৮০+৮১+৮২