আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৯
সাবিলা সাবি
লন্ডনের মেফেয়ারের সেই গোপন কক্ষ থেকে হিয়া যখন বেরিয়ে এল, মুহূর্তটি ছিল বেশ নাটকীয়। ল্যাপটপে সব প্রস্তুতির কাজ শেষ করে সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার পরনে ছিল হালকা রঙের লিনেন কো-অর্ড সেট এবং চোখে ছিল কালো সানগ্লাস; তাকে দেখে যে কারো মনে হবে আভিজাত্যমণ্ডিত ভ্রমণে বের হওয়া এক তরুণী। তার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল ব্যক্তিগত প্রাইভেট জেট; আকাশের ঠিকানায় উড়াল দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা সেই জেটটিই ছিল তার গোপন পরিকল্পনার একমাত্র সঙ্গী।
ইভানা ফাইলগুলো ব্যাগে ভরতে ভরতে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “মিস্ট্রেস, আমরা তো কমার্শিয়াল ফ্লাইটের টিকিট বুক করেছি। কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই ফ্লাইটে যাচ্ছি? অফিসার লিওনও তো একই রুটে যাচ্ছে, ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় না?”
হিয়া জানালার বাইরের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন লন্ডনের আকাশের দিকে তাকালো তার ঠোঁটে এক চিলতে শীতল হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে ধীরস্থিরভাবে নিজের কব্জির ব্যান্ডেজটি ঠিক করতে করতে বলল “ইভানা, এই টিকিট বুক করাটা শুধু আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য। থাইল্যান্ডে নির্বিঘ্নে প্রবেশের জন্য বৈধ কাগজপত্রের কোনো বিকল্প নেই। আর লিওন—সে যদিও এখন ফ্যামিলি টুরে আছে, কিন্তু তার ওই সিআইডি ব্রেইন যেকোনো মুহূর্তে নড়েচড়ে উঠতে পারে। যদি কোনোভাবে তার সন্দেহ হয় এবং সে নিজে থেকে আমার মুভমেন্ট ট্র্যাক করার চেষ্টা করে, তবে সে যেন শুধু একজন সাধারণ পর্যটককেই দেখতে পায়। আমি চাই না সে বা তার তীক্ষ্ণ নজর কোনোভাবেই টের পাক আমি ঠিক তার পিছু পিছুই যাচ্ছি। লিওনের সাথে একই বিমানে বসে তার নাকের ডগায় যাত্রা করার মতো বোকামি করা আমার সাজে না।”
হিয়া নিজের হ্যান্ডব্যাগ থেকে প্রাইভেট জেটের চাবিটা বের করে ইভানার দিকে ছুঁড়ে দিল। তার কণ্ঠে তখন ইস্পাতকঠিন আত্মবিশ্বাস। সে গম্ভীর স্বরে বলল, “ওরা বিমানে অলস সময় কাটাতে থাকুক, আমরা ওদের আগেই রানওয়েতে থাকব। লিওন যখন রিসোর্টে পৌঁছাবে, তখন পুরো দ্বীপটা আমার হাতের মুঠোয় থাকবে।”
লন্ডনের হিউথ্রো থেকে থাইল্যান্ডের সেই নির্জন প্রাইভেট আইল্যান্ডের দীর্ঘ যাত্রার ধকল কাটিয়ে লিওন যখন রানওয়েতে নামল, তখন আকাশ জুড়ে গোধূলির রক্তিম আভা। নীল জলরাশির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা রিসোর্টটি যেন পৃথিবীর বাইরের কোনো এক স্বর্গ। লিওন যখন তার বাবা-মা এবং মায়াকে নিয়ে স্পিডবোট থেকে রিসোর্টের প্রাইভেট জেটিতে নামল, তখন সমুদ্রের নোনা বাতাস তার দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি ধুয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে নিয়ে এল।
রিসোর্টের কর্মীরা তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে এগিয়ে এল।
মায়া চারপাশে চোখ বুলিয়ে মুচকি হাসল। দুনিয়ার অনেক দামি রিসোর্টই তার দেখা, কিন্তু থাইল্যান্ডের এই দ্বীপের রূপ তাকে খানিকটা থমকে দিল। সে বিড়বিড় করে উঠল, “খারাপ না, লিও ভাইয়া। আগে অনেক জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু এখানকার বাতাসটা যেন অন্যরকম। পুরো জায়গাটা স্বপ্নের মতো লাগছে।”
লিওন মায়ার কথার ভিত্তিতে মৃদু হাসল ঠিকই, কিন্তু তার অবচেতন মন তখনো পুরোপুরি শান্ত হতে পারছিল না। চারপাশের সাজানো বাগান আর বিলাসবহুল ভিলার নিখুঁত সৌন্দর্যের মাঝেও সে তীব্র এক অস্থিরতা অনুভব করছিল। সমুদ্রের গর্জনের সাথে সাথে তার অস্থিরতা যেন আরও প্রকট হলো।
লিওন নিজের লাগেজটা টানতে টানতে রিসোর্টের লবির দিকে পা বাড়াল। তার বাবা আর্থার হায়াস এই রিসোর্টে ব্যবসার কাজে প্রায়ই আসেন, তাই এখানকার ব্যবস্থাপনা তাদের ব্যাপারে আগে থেকেই অবগত। ভিআইপি গেস্ট হিসেবে তাদের জন্য বিশেষ এন্ট্রি সবসময়ই উন্মুক্ত থাকে।
লিওন অবশ্য তখনো জানে না, তার থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরের পাশের ভিলাটিতেই হিয়া ইতিমধ্যেই তার রাজত্ব গেড়ে বসেছে। হিয়া সেই মুহূর্তটির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, যখন লিওন নিজেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত মনে করে সব সতর্কতা ছেড়ে দেবে। হিয়া জানে, সেই সুযোগটাই হবে তাকে পুরোপুরি নিজের করে পাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়।
রিসোর্টের ডাইনিং এরিয়াটি ছিল এক টুকরো স্বর্গ। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় নীল সমুদ্রের জলরাশি ঝিলিক দিচ্ছিল, আর তার মাঝে কাঠের তৈরি বিলাসবহুল ডাইনিং টেবিলগুলোতে সাজানো ছিল সকালের ব্রেকফাস্ট। ভোরে রিসোর্টে পৌঁছানোর পরপরই তারা সবাই জড়ো হয়েছে খোলা আকাশের নিচের এই চমৎকার পরিবেশে। মায়া ভীষণ উচ্ছ্বসিত; সে খুশি মনে লিওনের প্লেটে তাজা ফলের সালাদ তুলে দিতে দিতে সমুদ্রের সৌন্দর্যের প্রশংসা করছে। রাতের দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি কিছুটা থাকলেও, লিওন আজ বেশ হালকা মেজাজে। যদিও তার তীক্ষ্ণ চোখগুলো অভ্যাসবশতই চারপাশের পরিবেশের ওপর সতর্ক নজর রাখছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ডাইনিং হলের এক কোণা থেকে এগিয়ে এল একজন ওয়েটার। হোটেলের ধবধবে সাদা ইউনিফর্মে সুশৃঙ্খল দেখালেও, তার মুখমণ্ডল মাস্কের আড়ালে সম্পূর্ণ ঢাকা। তার মাথায় থাকা সাদা টুপিটি কপালের ওপর নেমে এসে তার চোখ দুটিকেও কিছুটা আড়াল করে রেখেছে। হাতে একটি রুপালি ট্রে, যাতে লিওনের প্রিয় ব্ল্যাক কফি আর ব্রেকফাস্টের আইটেম সাজানো।
হিয়া লিওনের প্রতিটি অভ্যাস সম্পর্কে অবগত। সে মাথা নিচু করে ট্রে-টি নিয়ে লিওনের টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল। কিছুটা দূরেই আড়ালে দাঁড়িয়ে ইভানা সব লক্ষ্য করছিল, তার বুক ধড়ফড় করছে। হিয়ার এই ঝুঁকি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু লিওনের ঠিক সামনে গিয়ে তার চোখের দিকে তাকানোর নেশা সে কিছুতেই কাটাতে পারছে না
হিয়া অত্যন্ত সাবধানে কফির মগটি লিওনের সামনে রাখল। তার হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে কি না, তা বুঝতে না দিয়ে সে অতি দক্ষতায় কফি পরিবেশন করল। লিওন তখন মায়ার সাথে কথা বলছিল, তাই ওয়েটারের দিকে বিশেষ নজর দেয়নি। কিন্তু কফি রাখার মুহূর্তে হিয়ার ব্যবহৃত পারফিউমের পরিচিত মৃদু ঘ্রাণ লিওনের নাকে আসতেই সে হঠাৎ কথা থামিয়ে দিল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল; এই ঘ্রাণটি তার খুব চেনা লাগলো, কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে, এই রিসোর্টে, এটি পাওয়াটা তার কাছে এক অদ্ভুত ধাঁধার মতো মনে হলো।”
লিওন ভ্রু কুঁচকে ওয়েটারের দিকে তাকাল। হিয়ার পরনের টুপির ছায়ায় তার চোখ প্রায় ঢাকা আর মুখে মাস্ক। লিওন গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “এই ব্ল্যাক কফিটা আমি অর্ডার করিনি। আমি তো সাধারণ কফি চেয়েছিলাম।”
হিয়া মাথা নিচু রেখেই ভরাট অথচ কৃত্রিমভাবে কিছুটা খাদে নামানো গলায় উত্তর দিল, “এটি আমাদের শেফের পক্ষ থেকে সৌজন্যমূলক উপহার, স্যার। আমাদের গেস্টদের পছন্দ অনুযায়ী এটি স্পেশাল ব্লেন্ড করা হয়েছে।”
লিওনের দৃষ্টিতে এক পলকের জন্য সন্দেহের মেঘ ঘনিয়ে এল। সে ওয়েটারের দিকে আরও মনোযোগ দিয়ে তাকাল। কিন্তু হিয়া নিজের শরীরী ভাষা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে যে তাকে বোঝার কোনো উপায় নেই। সে ট্রে-টি ধরে সামান্য মাথা নুইয়ে লিওনের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল।
ঠিক তখনই লিওন বলে উঠল, ‘এক মিনিট।’
লিওনের কণ্ঠের তীক্ষ্ণতা ডাইনিং হলের স্বাভাবিক ছন্দে ছেদ টানল। সে স্থির দৃষ্টিতে ওয়েটারের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “আমি টম ইয়াম কুং সুপটা চেয়েছিলাম, কফি কেন? স্যুপ কি এখনো তৈরি হয়নি?”
নিখুঁত একজন ওয়েটারের মতো মাথা নিচু করে রইল হিয়া, তার প্রতিটা অঙ্গভঙ্গিতে ছিল পেশাদারিত্বের এক সুনিপুণ অভিনয়। তার কণ্ঠে ফুটে উঠল ওয়েটারের প্রশিক্ষিত জড়তা, ‘দুঃখিত স্যার, কিচেনে কিছুটা দেরি হয়ে গেছে। আমি এখনই স্যুপ নিয়ে আসছি।'”
লিওন শুধু একবার মাথা নেড়ে নিজের কাজে মন দিল। হিয়া দ্রুত কিচেনের দিকে পা বাড়াল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধোঁয়া ওঠা স্যুপের বাটি নিয়ে সে ফিরে এল লিওনের টেবিলে। বাটিটি নামানোর মুহূর্তে হিয়ার আঙুলের ডগা ক্ষণিকের জন্য লিওনের হাতের ওপর আলতো করে ছুঁয়ে গেল।
লিওন কিঞ্চিৎ চমকে মুখ তুলে তাকাল, কিন্তু ওয়েটারের দৃষ্টি তখন অবনত। স্যুপ পরিবেশন শেষ করা মাত্রই হিয়া এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পা ফেলে ইভানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ইভানা সেখানে আগে থেকেই এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। সেখান থেকে লিওনকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লিওন ধোঁয়া ওঠা সুপের চামচটা মুখে তুলতেই হিয়ার শ্বাস যেন স্তব্ধ হয়ে এল। সে চোখের পলক না ফেলে লিওনের প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছে। ইভানার দিকে না তাকিয়েই সে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে উঠল, “আই উইশ… ইভানা, ওই স্পুনটা আমি হতে পারতাম। ওর ঠোঁট স্পর্শ করার অধিকার একমাত্র আমারই প্রাপ্য।” তার দৃষ্টিতে তখন এক অদ্ভুত, উন্মাদ নেশার ঘোর; নিজের সত্তা হারিয়ে সে লিওনের প্রতিটি সূক্ষ্ম অনুভূতির সাথে একীভূত হয়ে যাচ্ছিল।
কথাটা শুনে ইভানা এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল। হিয়ার মতো একজন ঠান্ডা মাথার নারী, যে মানুষ নিকেশ করতে যার হাত কাঁপে না, সে আজ কী বলছে? ইভানা ভয়ে এবং বিস্ময়ে কাঁপতে কাঁপতে হিয়ার দিকে তাকাল। হিয়ার চোখে এখন আর কোনো হিংস্রতা নেই, আছে এক ভয়াবহ পৈশাচিক আসক্তি। ইভানা অবাক হয়ে ভাবল, সে জীবনে অনেকবার ভাইপারের ক্রুর রূপ দেখেছে, কিন্তু এই রূপটি তার কাছে আরও বেশি ভীতিকর। সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি যে, লিওনের প্রতি হিয়ার এই ভালোবাসা আসলে ভালোবাসা নয়, এটি এক চরম মানসিক বিকারের পর্যায়ে চলে গেছে।”
ইভানা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে উঠল, “মিস্ট্রেস, আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনি কী বলছেন? আপনি কি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন একটু বেশি দুর্বল হয়ে যাচ্ছেন না?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না, শুধু তার দৃষ্টি তখনো লিওনের ঠোঁটের ওপর আটকে রইল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক নিষ্ঠুর বক্ররেখা; মরণখেলার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে তখন।
লিওন আরেকবার চামচটা মুখে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে থমকে গেল। গলার ভেতরটা হঠাৎ করেই জ্বলে উঠল তীব্র অস্বস্তিতে। বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই সে দেখল, হাতের উল্টো পিঠে, কব্জির কাছে লালচে চাকা দাগগুলো সাপের মতো ফুটে উঠছে। নিশ্বাস নেওয়াটা অসম্ভব হয়ে পড়ল তার কাছে—যেন ফুসফুসটাকে কেউ অদৃশ্য কোনো শক্ত মুঠোয় পিষে ধরছে।
লিওন আতঙ্কিত হয়ে তার কলারটা খামচে ধরল। তার চোখজোড়া মুহূর্তের মধ্যেই রক্তবর্ণ ধারণ করল। মায়া চিৎকার করে উঠল, ‘লিও ভাইয়া! কী হয়েছে তোমার?’
পুরো ডাইনিং হল যেন থমকে গেল। লিওন চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে টলমল করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। তার ঠোঁট নীল হয়ে আসছে, সে হাঁপাচ্ছে—ঠিকমতো বাতাস ভেতরে নিতে পারছে না। মায়ার আর্তনাদ আর চারপাশের বিশৃঙ্খলার মধ্যেই লিওনের বাবা চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, কাঁপাকাঁপা গলায় তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ‘লিও! মাই বয় হোয়াট হ্যাপেন্ড? এই কেউ ডাক্তার ডাকো!’
মায়ের অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। তিনি আতঙ্কে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু লিওনকে মেঝেতে আছড়ে পড়তে দেখেই তিনি জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থায় চিৎকার করে ছুটে এলেন। তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে, তিনি বারবার লিওনের নাম ধরে ডেকে যাচ্ছেন, কিন্তু আতঙ্ক আর কান্নায় তার কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট হয়ে আসছে। ম্যানেজার দৌড়ে এল, কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে সে পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা হিয়ার চোখের সামনে জগতটা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মতো খেলে গেল একটি তথ্য—লিওনের মাশরুমে মারাত্মক অ্যালার্জি আছে! সে জানত লিওন সি-ফুড স্যুপ অর্ডার করেছিল, কিন্তু ম্যানেজারের গাফিলতিতে রান্নাঘর থেকে মাশরুমের স্যুপ চলে এসেছে—আর তাতেই শুরু হয়েছে এই প্রাণঘাতী বিপর্যয়। হিয়ার মস্তিষ্ক মুহূর্তে কাজ শুরু করল। তার চোখের সেই ‘নেশালো’ চাহনি নিমেষেই বদলে গেল হিংস্র শিকারির দৃষ্টিতে।
হিয়া দ্রুত নিজের হাতের আস্তিনটা টেনে দিয়ে কোনো শব্দ না করে লিওনের দিকে ছুটে গেল। ইভানা পেছন থেকে চিৎকার করে উঠল, ‘মিস্ট্রেস! আপনি কোথায় যাচ্ছেন? ধরা পড়ে যাবেন!’
হিয়া ইভানার কোনো কথায় কর্ণপাত করল না। সে ভিড় ঠেলে লিওনের কাছে পৌঁছে গেল। লিওন তখন মেঝেতে শুয়ে ছটফট করছে, যন্ত্রণায় তার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে মায়া, লিওনের মা আর হোটেলের কর্মীরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কেউ জানে না কী করতে হবে। মায়া এক পর্যায়ে লিওনের দিকে ঝুঁকে পড়লো লিওনকছ সামলানোর চেষ্টা করলো। লিওনের বাবা ওদিকে ডক্টরকে কল করতে ব্যাস্ত। হিয়া একদম সামনে গিয়ে ভিড় ঠেলে লিওনের মাথার কাছে বসল। তার মুখে ওয়েটারের সেই সাদা টুপি আর মুখে মাস্ক, সে লিওনের গলার কাছে হাত দিয়ে দেখল, শ্বাসনালী ফুলে গিয়ে সরু হয়ে আসছে। সে মায়ার দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল, ‘সরে যান এখান থেকে! আমি জানি কী করতে হবে।'”
লিওন আধো-বোজা চোখে ঝাপসা দৃষ্টিতে হিয়ার হাতের দিকে তাকাল। তার মস্তিষ্ক তখন ঘোরলাগা অবস্থায়, তবুও সে সেই পরিচিত ছোঁয়াটা অনুভব করতে পারছে। এই ছোঁয়াটা তার কাছে অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হলো—যেন সজ্ঞান অবস্থায় নয়, অবচেতনেই কোথাও সে এই স্পর্শের সাথে মিশে আছে। কারণ মায়া ছাড়া আর কোনো নারীর স্পর্শ তার জীবনে আসেনি, আর মায়ার স্পর্শও কোনোদিন গভীর বা তীব্র ছিল না।
হিয়া ম্যানেজারকে উদ্দেশ্য করে প্রায় গর্জন করে উঠল, ‘দ্রুত কিট থেকে একটা এপিনেফ্রিন অটো-ইনজেক্টর নিয়ে আসুন! দেরি করলে ওনাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না!’
ম্যানেজার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু হিয়ার তীক্ষ্ণ এবং আদেশমূলক চাহনি দেখে সে আর প্রশ্ন করার সাহস পেল না। হিয়া আসলে এমন পরিস্থিতির জন্যই প্রস্তুত ছিল। তাদের বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ জীবনে সবসময় হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই জীবন রক্ষাকারী জরুরি মেডিসিন এবং চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে সে অনেক পড়াশোনা করেছে। আজ লিওনের শ্বাসরুদ্ধকর এই অবস্থায় তার সেই জ্ঞানই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ম্যানেজার দৌড়ে গিয়ে কিট থেকে ইনজেকশনটি নিয়ে আসতেই হিয়া সেটা দক্ষ হাতে লুফে নিল। হিয়া অতি সাবধানে, অত্যন্ত দক্ষ হাতে লিওনের উরুর পেশিতে ইনজেকশনটি পুশ করল। ঠিক সেই মুহূর্তেই লিওন যেন দীর্ঘ এক দম নিল, তার শরীরের খিঁচুনি কিছুটা কমল।
ম্যানেজারের তোতলামি ভরা ক্ষমা প্রার্থনা যেন আগুনের ওপর ঘি ঢালল। লিওনের বাবা রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন, ‘আপনি কি জানেন আপনি কার সঙ্গে কী করেছেন? আমার ছেলে কোনো সাধারণ অতিথি নয়—সে একজন সিআইডি অফিসার! এই রিসোর্টের মালিকের ক্ষমতা কতটুকু তা হয়তো আপনার জানা নেই, কিন্তু লিওন চাইলে এখনই আপনাদের এই পুরো রিসোর্ট সিলগালা করে দিতে পারে! এটা গাফিলতি নয়, সরাসরি খুনের চেষ্টা! আমার ছেলের একটা চুলও বাঁকা হলে এখানকার একজনেরও মাথা আস্ত রাখবো না আমি!'”
লিওন মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে ম্যানেজারের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল, ‘খাবারের অ্যালার্জি যে কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, সেটা কি আপনাদের ধারণায় আছে? আজ আমি বেঁচে গেলাম, কিন্তু আমার জায়গায় যদি অন্য কোনো সাধারণ ট্যুরিস্ট হতো—যার কাছে সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকত না—তবে তার লা/শের দায় কে নিত? আপনারা আজ একটা জীবন নিয়ে খেলছেন! এত বড় রিসোর্ট সামলানোর যোগ্যতা কি আপনাদের সত্যিই আছে, নাকি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই আপনাদের পরিচয়?’
ম্যানেজার ভয়ে কাষ্ঠ হয়ে ঘামতে ঘামতে বারবার মাথা নুয়ে শুধু ‘সরি’ বলে যাচ্ছে, আর লিওন তার পরিবারকে নিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়েই দ্রুত ভিলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে হিয়া আর ইভানা পুরো ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করছিল। হিয়ার ভেতরটা রাগে টগবগ করে ফুটছে। সে ভাবছিল, ‘এই অযোগ্য ম্যানেজারটার খামখেয়ালিতে যদি লিওনের আজ কিছু একটা হয়ে যেত!’ এই ভাবনাটিই তার মস্তিষ্কে দহনের মতো কাজ করছিল। তার কাছে লিওন কেবল একজন মানুষ নয়, এক পবিত্র সত্তা; আর এই চরম অবহেলা হিয়ার কাছে ক্ষমার অযোগ্য এক অপরাধ বলে মনে হচ্ছে।
ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে রিসোর্টের ভেতরের নির্জন পাথুরে পথ ধরে কটেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল লিওন। হঠাৎই সে থমকে দাঁড়াল। অবচেতন মনে এখনো সেই পরিচিত স্পর্শের রেশ রয়ে গেছে। সে দ্রুত চারিদিকে একবার চোখ বোলাল—সেই ওয়েটার মেয়েটিকে খুঁজছে সে, যে জীবন বাঁচিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ভিড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল। কিন্তু কোথাও তার কোনো চিহ্ন নেই। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য, অথবা সেই রহস্যময় মানুষটির পরিচয় জানার জন্য তার মনটা আকুল হয়ে উঠল, অথচ কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না।
হিয়া এক নজর ইভানার দিকে তাকাল। তার চোখের শীতল অথচ তীব্র চাহনিতেই সব স্পষ্ট হয়ে গেল—ম্যানেজারের এই দুঃসাহসের চরম মূল্য তাকে খুব দ্রুতই চোকাতে হবে।
ম্যানেজার দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিচেনের অন্ধকার করিডোর ধরে একা এগিয়ে যাচ্ছিল। হিয়া এবং ইভানা ছায়ার মতো তার পিছু নিল। কোনো শব্দ না করে, চোখের পলকে তারা তার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ম্যানেজার কিছু বুঝে ওঠার আগেই হিয়া তার মুখ চেপে ধরল, আর ইভানা চটজলদি তাকে টেনে পাশের সরু স্টোর রুমের ভেতরে নিয়ে গেল। পুরো প্রক্রিয়াটি এত নিখুঁত এবং নিঃশব্দে ঘটল যে করিডোরের আশেপাশে থাকা স্টাফরা টেরও পেল না যে তাদের চোখের সামনেই ম্যানেজার নিখোঁজ হয়ে গেছে।
স্টোর রুমের ভারী দরজাটা বন্ধ হতেই হিয়ার শান্ত মুখোশ খসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে সে হিংস্র হয়ে উঠল। কোনো বাক্যব্যয় না করেই ম্যানেজারকে টেনে নিয়ে গিয়ে সজোরে আছাড় মারল দেয়ালের গায়ে। সেই আঘাতের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, ঘরের স্তব্ধতা ভেঙে ম্যানেজার গোঙানির শব্দ করে উঠল। কিন্তু তার আগেই ইভানা বিদ্যুৎগতিতে তার মুখ চেপে ধরল, যাতে বাইরের কেউ কিছু আঁচ করতে না পারে।
এরপর শুরু হলো হিয়ার সেই রুদ্র রূপ। প্রতিটি ঘুষি আর লাথি যেন লিওনের সেই অসহ্য যন্ত্রণার এক একটি নিষ্ঠুর প্রতিধ্বনি। হিয়া যেন আজ কোনো মানুষ নয়, তার নিশ্বাস তখন উত্তপ্ত, চোখের চাহনি শিকারি পশুর মতো তীক্ষ্ণ। হিয়ার এই হিংস্রতা কোনো সাধারণ রাগ নয়, এটা ছিলো নিষ্ঠুর ক্রোধ—লিওনকে মৃত্যুর দোরগোড়ায় দেখে সে আজ যমের রূপ ধারণ করেছে। ম্যানেজার মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে হিয়া তাকে আবার কলার চেপে ধরে দেয়ালে আছড়ে ফেলল। হিয়ার এলোমেলো চুল, জ্বলন্ত চোখ আর প্রতিটি পেশির টানটান উত্তেজনা স্পষ্ট করে দিচ্ছিল যে, আজ ওর ক্ষমা নেই। মেঝেতে আধমরা হয়ে পড়ে থাকা ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে হিয়ার নিশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছিল। হিয়া তার পায়ের বুট দিয়ে ম্যানেজারের কপালে চাপ দিয়ে শীতল স্বরে বলল, “আজ আমার লিওনের যদি কিছু হতো, তবে শুধু তোর চাকরি যেত না, তোর অস্তিত্বই মুছে ফেলতাম আমি ফাকিং বাস্টার্ড।”
ম্যানেজার ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অস্পষ্ট স্বরে ক্ষমা চাইছিল। হিয়া তাকে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে নিষ্ঠুর হাসি হেসে বলল, ‘সরি? সরি বলে কি জীবন ফিরে পাওয়া যায়? আজ তোর গাফিলতির মাশুল দিতে গিয়ে ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, সেটা তোরর মাথায় আছে?’
ম্যানেজার ব্যথায় জ্ঞান হারানোর দোরগোড়ায়। হিয়া অবজ্ঞার চোখে তার দিকে তাকিয়ে হাত সরিয়ে নিল। ইভানা ততক্ষণে রিসোর্টের ডিজিটাল সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। হিয়ার ইশারায় সে মুহূর্তের মধ্যে কিচেন এবং ডাইনিং হলের সমস্ত সার্ভার থেকে মাশরুমের প্রতিটি আইটেম স্থায়ীভাবে মুছে ফেলল।
হিয়া ঠান্ডা গলায় বলল, “যে বিষাক্ত খাবারের জন্য লিওন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, রিসোর্টের মেনু কার্ডে তার কোনো অস্তিত্ব আর থাকবে না।”
ইভানা দ্রুত আঙুল চালিয়ে সার্ভার আপডেট করে দিল। মাশরুমের নামগন্ধ পর্যন্ত মুছে গেল রিসোর্টের ডিজিটাল তালিকা থেকে। কাজ শেষ করে হিয়া একবার মেঝেতে আধমরা পড়ে থাকা ম্যানেজারের দিকে তাকাল, তারপর ইভানার সঙ্গে নিয়ে স্টোর রুম থেকে বেরিয়ে এল—যেন কিছুই হয়নি।
পরদিন সকালে রিসোর্টের কর্মীরা ঘুম থেকে উঠে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হলো। প্রতিটি মেনু কার্ডের ওপরে রক্তিম রঙে বড় বড় অক্ষরে লেখা—’আজ থেকে এই রেসোর্টে মাশরুমের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ।’
রিসোর্টের মালিক কিংবা সরকারি কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই পুরো মেনু থেকে মাশরুমের নাম চিরতরে মুছে ফেলা হলো। হিয়া তার নিজস্ব কায়দায় পুরো দ্বীপে এক অলিখিত আইন জারি করে দিল। কারো সাধ্য নেই সেই আদেশের অমান্য করার। এখন থেকে লিওনের খাবারের নিরাপত্তা আর রিসোর্টের ভরসায় নয়, বরং হিয়ার নিভৃত ও সতর্ক পাহারার কবজায় বন্দি।
পরদিন সকাল। রিসোর্টের ডাইনিং হলটা তখন ভোরের রোদে ঝলমল করছে; নেপথ্যে সমুদ্রের গম্ভীর গর্জন আর মৃদু মিউজিকের সুর। লিওন তার বাবা মা আর মায়াকে নিয়ে নিজেদের টেবিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। হলের সেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখে লিওনের চলার গতি যেন থমকে গেল, হলের এক কোণ থেকে ভেসে আসছে এক বিদেশি পর্যটকের কর্কশ চিৎকার, “মানে কী! আমি আমার স্যুপে মাশরুম চেয়েছি, আর তোমরা বলছ এখানে মাশরুম সার্ভ করা নিষিদ্ধ? এটা কেমন আজব নিয়ম?”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েটারটি ভয়ে কুঁকড়ে আছে। তার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ, মনে হলো কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ভয়ে সে ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সে তোতলানো গলায় কী যেন বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পর্যটকটি কিছুতেই শান্ত হওয়ার পাত্র নয়।
লিওন কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পুরো দৃশ্যটা পর্যবেক্ষণ করল। সে লক্ষ করল, আশেপাশের কর্মীরা এমনভাবে মাথা নিচু করে আছে যেন তারা কেবল অন্ধই নয়, বরং কোনো এক অলিখিত আতঙ্কের অদৃশ্য শিকলে বন্দি।
লিওনের বাবা ভ্রু কুঁচকে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে নিচু স্বরে বললেন, “কাল রাতেও তো মেনুতে মাশরুম ছিল, আজ সকালে হঠাৎ এই নিষেধাজ্ঞা কেন?”
লিওনের মা আতঙ্কের সুরে যোগ করলেন, “রিসোর্টের নিয়ম কি এতটাই অস্থিতিশীল? এমন অদ্ভুত কাণ্ড আগে কখনো শুনিনি।”
ওয়েটারটি ভয়ার্ত কণ্ঠে বারবার বলছে, “দুঃখিত স্যার, আমাদের কিচেন থেকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজ থেকে এই রেসর্টে মাশরুমের কোনো পদ পরিবেশন করা হবে না।”
“পুরো ডাইনিং হল জুড়ে গুঞ্জনের ঢেউ। বিলাসবহুল এই রিসোর্টে মাশরুমের মতো একটি সাধারণ খাবার নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, তা নিয়ে সবারই কৌতূহল তুঙ্গে।
মায়া ভ্রু কুঁচকে লিওনের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, ‘লিও ভাইয়া, বিষয়টা কি খুব অদ্ভুত লাগছে না? কালকে তোমার অ্যালার্জির ঘটনার পরেই আজ মাশরুম নিষিদ্ধ হলো? এটা কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি কোনো এক বিশেষ সাবধানতা?’
লিওনের বাবা কিছুটা চিন্তিত গলায় যোগ করলেন, ‘হতে পারে। কালকের ঘটনার পর হোটেলের মানসম্মান রক্ষা করার জন্য তারা হয়তো মরিয়া হয়ে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
লিওন কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি শান্ত, কিন্তু তীক্ষ্ণ। সে পুরো হলটা খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।
হিয়া তখন ডাইনিং হলের এক কোণে অন্য একটি টেবিলের আড়ালে বসে ছিল। সে তার আঙুল দিয়ে টেবিলের ওপর আলতো করে টোকা দিচ্ছে। ইভানা তার পাশে বসে ফিসফিস করে বলল, “আপনার এই অদ্ভুত আইন পুরো রিসোর্টে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে, মিস্ট্রেস। সবাই এখন এটা নিয়েই কথা বলছে।”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল—কিন্তু তাতে উষ্ণতার চিহ্নমাত্র নেই, আছে এক ভয়ানক রকমের অধিকারবোধ। সে লিওনের দিকে তাকিয়ে শীতল অথচ ঝাঁজালো কণ্ঠে বলে উঠল, ‘নিয়ম আমার, আর এই দুনিয়াটাও আমার ইশারায় চলে। লিওন যেখানে থাকবে, সেখানে ওকে আঘাত করতে পারে—এমন কোনো বিষাক্ত অস্তিত্ব আমি অবশিষ্ট রাখব না।”
দুপুরের প্রখর রোদ সমুদ্রের নীল জলে ঠিকরে পড়ছে। হিয়ার বিলাসবহুল ভিলার বারান্দায় সে হাতে একটি শক্তিশালী দূরবীন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি স্থির লিওনের রিসোর্ট ভিলার বারান্দার দিকে। হিয়া গোল্ডেন ঈগল শ্যাডোকে আনেনি তাই এই দূরবীনই তার একমাত্র ভরসা।
হঠাৎ দূরবীন দিয়ে দেখতে পেল, মায়া উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে লিওনের রুমে প্রবেশ করল। মায়া রুমে ঢোকার সময় যে সহজ সাবলীলতা দেখাল, তা হিয়ার স্নায়ুতে আগুনের হলকা ছড়িয়ে দিল। হিয়ার হাতটা দূরবীনের ওপর শক্ত হয়ে এল, তার আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে গেছে।
ইভানার দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই হিয়ার চোখের মণি যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলে উঠল। ইভানার কণ্ঠরোধ করে সে ফিসফিস করে বলল, “ইভানা, তুই কি দেখছিস? ওই মেয়েটার সাহস কত! ও সোজা লিওনের রুমে ঢুকেছে। ওর ওই নির্লজ্জ আচরণ, ওর ওই অযাচিত সাহস… আমার শিরদাঁড়া দিয়ে রাগ বয়ে যাচ্ছে।”
হিয়ার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে, কিন্তু কণ্ঠে তীব্র বিষের ছোঁয়া। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমি আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারবোনা। আমাকে এখনই কিছু একটা করতে হবে। ওকে এমন একটা শিক্ষা দেব, যাতে লিওনের ছায়া মাড়ানোর কথা সে দুঃস্বপ্নেও না ভাবে। ও বুঝে যাবে, আমার সীমানা লঙ্ঘনের পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে।'”
ইভানা হিয়ার এমন অস্থিরতা দেখে আঁতকে উঠল। সে দ্রুত হিয়ার কাছে এগিয়ে এসে তার হাত দুটো ধরে শান্ত করার ভঙ্গিতে বলল, “মিস্ট্রেস, প্লিজ নিজেকে সামলান! ভুল করেও এমন কিছু করতে যাবেন না। লিওন অফিসার হিসেবে এমনিতেই আপনার ব্যাপারে সন্দেহপ্রবণ, আপনাকে সে ঘৃণা করে। আর মায়া তো তার নিজের পরিবারের সদস্য। আপনি যদি ওর ওপর সামান্য আঁচড়ও দেন, তবে লিওন তা জানতে পারলে আপনাকে চিরদিনের জন্য অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করবে। তখন সে আপনাকে কখনোই ভালোবাসবে না, বরং আপনার প্রতি তার ঘৃণা আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।”
হিয়ার বুকের ভেতরটা তখন জ্বলন্ত কয়লার মতো ধুঁকছে। ইভানার কথাগুলো তার কানে পৌঁছাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার মস্তিষ্ক ততক্ষণে প্রতিশোধ আর একতরফা ভালোবাসার এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে। সে আবারও দূরবীনে চোখ রাখল। লিওনের রুমের ভেতরে মায়ার উপস্থিতি দেখে তার প্রতিটি পেশি টানটান হয়ে উঠল—সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল, “ও হয়তো আমাকে ঘৃণা করে, কিন্তু সেই ঘৃণা মিশিয়ে ওর অহংকার আমি ধুলোয় মিশিয়ে দেব। মায়া হয়তো এখন ওর আশ্রয়, কিন্তু সেই আশ্রয়টাই যে আমি একটা বধ্যভূমি বানিয়ে দিতে পারি—সেটা কি ও জানে? সবকিছুর চাবিকাঠি তো আমারই মুঠোয়।'”
হিয়া দূরবীনটা নামিয়ে বারান্দার রেলিংয়ে জোরে এক আঘাত করল। তার চাহনিতে এখন সেই পরিচিত ভাইপারের নিষ্ঠুরতা। সে ইভানার দিকে তাকিয়ে শীতল স্বরে বলল, “ঠিক আছে, আমি এখনই কিছু করছি না। কিন্তু মনে রাখিস ইভানা, লিওনের রুমটা ওর জন্য যতটা নিরাপদ, আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলে ততটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। মায়াকে আমি এখন ছাড় দিচ্ছি, কিন্তু লিওনের প্রতিটি নিশ্বাসে আমার নাম না লেখা পর্যন্ত আমি শান্ত হব না।”
ইভানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু দূরে সরে গেল। সে জানে, এই শান্ত ভাবটা কেবল সাময়িক। ঝড় আসার আগের নীরবতা হয়তো এটাই।
রিসোর্টের বিলাসবহুল ভিলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে লিওন সমুদ্রের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে ছিল। মায়া খুশিতে ডগমগ হয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াল। হাতে তার একটি ব্যাগ।
মায়া লাজুক হেসে বলল, “লিও ভাইয়া, আর কিছুক্ষণ পরেই তো আমরা ‘ব্লু ল্যাগুন’ এ নামছি। কতদিন ধরে এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছিলাম! কিন্তু একটা দ্বিধায় আছি, আমি কোন ড্রেসটা পরব? আমার কাছে দুটো অপশন আছে।”
লিওন হালকা হেসে মায়ার মাথায় হাত রাখল। সে কোনো বিশেষ পোশাকের দিকে নজর না দিয়ে সহজ গলায় বলল, “তোর যা ইচ্ছে পর, মায়া। যেটাতে তুই সবচেয়ে বেশি কমফোর্ট ফিল করবি, সেটাই পর। এই ছুটিতে তুই এসেছেছিস আনন্দ করতে, কোনো নিয়ম মেনে চলার জন্য নয়।”
মায়ার চোখেমুখে আনন্দের আভা ফুটে উঠল। সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “ঠিক আছে, তাহলে আমি আমার পছন্দের ড্রেসটাই পরছি!”
মায়া তার নিজের রুমের ভেতরে চলে গেল। সে মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে, আজ সে একটা স্লিভলেস ‘বডিকন’ ড্রেস পরবে। লিওনের পরিবার বেশ আধুনিক এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে চলা মানুষ, তাই পোশাকের ব্যাপারে তাদের কোনো বিধিনিষেধ নেই। মায়া জানে, এই পোশাকটি লিওনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সেরা হবে।
দুপুরের প্রখর রোদ যখন ব্লু ল্যাগুনের স্বচ্ছ নীল জলরাশিকে হীরের মতো উজ্জ্বল করে তুলেছে, তখন লিওন রিসোর্টের করিডোর দিয়ে ল্যাগুনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। বাবা-মা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই হইচই আর ভিড় তাদের ভালো লাগে না, তাই তারা তাদের ব্যক্তিগত ভিলায় বিশ্রাম নিতেই পছন্দ করলেন। লিওন ল্যাগুনের প্রবেশপথে এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই পেছন থেকে মায়া এসে তার পাশে দাঁড়াল। মায়াকে দেখে লিওনের পায়ের গতি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে খানিকটা চমকে উঠল, কারণ মায়াকে সাধারণত সে লন্ডনের পোশাক—ওভারকোট, হাই-নেক সোয়েটার কিংবা ফরমাল ওয়েস্টার্ন পোশাকেই অভ্যস্ত দেখেছে।
কিন্তু আজ মায়া পরেছে একটি গাঢ় ফিরোজা রঙের স্লিভলেস বডিকন ড্রেস, যা সমুদ্রের জলের সাথে দারুণভাবে মিলে গেছে। পোশাকটি শরীরের সাথে একদম লেগে আছে, যা তার অবয়বকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মায়াকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন কোনো এক ম্যাগাজিনের মডেল।
লিওনের চোখের কোণে একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তি ফুটে উঠল। সে দ্রুত তার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মায়ার এই রূপটা তাকে এক মুহূর্তের জন্য বিচলিত করে দিল। সে মনে মনে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—মায়া তার কাছে সেই ছোটবেলার চঞ্চল মেয়েটি, যাকে সে নিজের ছোট বোনের মতোই স্নেহ করে এসেছে। যদিও তাদের এনগেজমেন্ট হয়েছে হয়ত খুব তাড়াতাড়ি বিয়েও হবে। কিন্তু আজ মায়ার এই আধুনিক এবং সাহসী সাজ সেই স্নেহ সম্পর্কের গণ্ডিকে কিছুটা অস্পষ্ট করে দিচ্ছে, যা লিওনের পুরুষোচিত মনকে এক ধরনের মানসিক অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
লিওন একটু খকখক করে কেশে নিজেকে সামলে নিল। চটজলদি মায়ার দিকে তাকিয়ে হাসির আভা ফুটিয়ে বলল, ‘ওহ, মায়া! তুই একদম রেডি? চল, দেরি করলে তো ব্লু ল্যাগুনের আসল রূপটাই মিস করবি। এই সময়ে পানিটা দারুণ দেখায়!'”
মায়া তার স্লিভলেস পোশাকের ওপর হাত বুলিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসল। সে লিওনের অস্বস্তিটা পুরোপুরি ধরতে পারল না, বরং তার মনোযোগ ছিল লিওনের প্রতিক্রিয়ার দিকে। সে লাজুক হেসে বলল, “হ্যাঁ লিও ভাইয়া, এই ড্রেসটা কি খুব বেশি জাঁকালো হয়ে গেছে? তুমিই তো বললে যেটা কমফোর্ট লাগে সেটাই পরতে।”
লিওন মায়ার দিকে সরাসরি না তাকিয়েই হাঁটতে শুরু করল। সে ছোট করে উত্তর দিল, “না, মানে… ঠিক আছে। চল।”
ব্লু ল্যাগুনের বেলাভূমিতে তখন বিকেলের শেষ রোদ এসে পড়েছে। হালকা ঢেউগুলো সৈকতের বালু ছুয়ে আলতো শব্দে ফিরে যাচ্ছে। সৈকতের শেষ প্রান্তে এসে লিওন থামল। বিকেলের ম্লান আলোয় সমুদ্রের নোনা জলে আলতো ঢেউয়ের খেলা। লিওন শার্টের বোতামগুলো খুলে তা বালিতে ফেলল। পরনে তার সাধারণ সুইমিং শর্টস। গোধূলির আবছা আলোয় তার চওড়া কাঁধ আর পেশিবহুল শরীর স্পষ্ট হয়ে উঠল। সানগ্লাসের আড়ালে তার দৃষ্টি সমুদ্রের দিগন্তে স্থির, যেন কিছু একটা বোঝার চেষ্টায় সে মগ্ন।
একটু দূরে একটি বড় নারকেল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে হিয়া পুরো দৃশ্যটি দেখছিল। এর আগেও সে হিডেন ক্যামেরার ফুটেজে লিওনকে দেখেছিলো এমন খালি গায়ে। কিন্তু রোদের তীব্র আলোয় আজ প্রথমবার দূরবীনের লেন্সে তাকে এত কাছে—এতটা স্পষ্ট দেখছে সে। তার হাত কাঁপছে, নিঃশ্বাস ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে।
ক্যামেরার ঝাপসা স্ক্রিনে যা দেখেছিল, তার সাথে বাস্তবের এই লিওনের আকাশ-পাতাল পার্থক্য। গোধূলির আলোয় তার শরীরের প্রতিটি পেশির নড়াচড়া হিয়ার মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিচ্ছে। হিয়ার মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্যের সংজ্ঞা আজ এই একটা মানুষের মধ্যেই এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। এই আকর্ষণ কোনো সাধারণ ভালোলাগা নয়, এ এক তীব্র নেশা—যা তাকে শেষ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
কিন্তু হিয়ার এই মুগ্ধতা এক নিমেষে মিলিয়ে গেল যখন তার নজর পড়ল চারপাশে। সৈকতে থাকা অন্য পর্যটকদের চোখও লিওনের দিকে, অনেকে ফিসফাস করছে, কেউ কেউ লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আর মায়া? স্লিভলেস বডিকন পরে লিওনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ার ভঙ্গি দেখে হিয়ার শরীর রি রি করে উঠল। মায়া এমনভাবে লিওনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন পুরো সৈকতজুড়ে লিওন এখন কেবল তারই একান্ত। হিয়ার দূরবীনের লেন্স তখন কাঁপছে রাগে, আর বুকের ভেতরটা জ্বলছে তীব্র ঈর্ষায়। হিয়ার চোখের দৃষ্টিতে আগুনের হলকা। সে দাঁতে দাঁত চেপে ইভানার বাহুটা খামচে ধরল।
“তুই দেখছিস ইভানা?’ হিয়ার কণ্ঠস্বর এখন হিমশীতল, কিন্তু তার ভেতরে চাপা ক্রোধ লাভাস্রোতের মতো ফুটছে। “লিওন… ও কি জানে না ওর এই সৌন্দর্য কত বড় অপরাধ? এভাবে খালি গায়ে ঘুরে বেড়ানো! আর ওই মেয়েগুলো—ওদের দৃষ্টির স্পর্ধা দেখ! ওরা কি বুঝতে পারছে না লিওন কার? আর লিওন? সে নির্লজ্জের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের এই নোংরা চাহনিগুলো উপভোগ করছে!”
হিয়ার হাত নিজের অজান্তেই তার কোমরের দিকে গেল, যেখানে সে সবসময় একটা ছোট ধারালো ছুরি লুকিয়ে রাখে। তার চোখজোড়া চারপাশের নারীদের দিকে হিংস্র বাঘের মতো ঘুরছে। “ওদের চোখগুলো উপড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে আমার,” হিয়া বিড়বিড় করে বললো। “আর ওই মায়া… ওর তো মরে যাওয়া উচিত। আমার লিওনের পাশে দাঁড়িয়ে ও নিজেকে ওর যোগ্য ভাবছে? আজ ল্যাগুনের এই জল মায়ায় রক্তে লাল হয়ে যাবে ইভানা। আমার লিওন কোনো সাধারণ বস্তু নয় যে সবাই তাকে দেখবে, সে শুধু আমার!”
ইভানা হিয়ার এই ভয়াবহ রূপ দেখে শিউরে উঠল। সে জানে, হিয়ার এই ঈর্ষা এখন যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ইভানা ভয়ংকর ভয়ে ফিসফিস করে বলল, “মিস্ট্রেস, প্লিজ শান্ত হন! এখানে অনেক মানুষ, আপনি যদি এখন কিছু করেন, তবে লিওনের চোখে আপনি চিরদিনের জন্য খু*নি হয়ে যাবেন। সে আপনাকে ভালোবাসবে না, বরং তার হাতে আপনাকে মরতে হতে পারে। এটা কি আপনি চান?”
হিয়ার শরীরটা কাঁপছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এখন ল্যাগুনের সেই মেয়েগুলোর দিকে যারা লিওনকে দেখে হাসছে। সে ইভানার দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল, “আজ ওদের প্রাণ নিচ্ছি না, ইভানা। কিন্তু এই ল্যাগুনে আজ এমন কিছু ঘটবে যা পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দিবে। কেউ আমার লিওনের দিকে এভাবে তাকাতে পারবে না।”
লিওন তখনো সমুদ্রের ঢেউয়ে পা ভেজাচ্ছে, সম্পূর্ণ বেখবর যে কয়েক মিটার দূরেই এক ভয়ংকরী নারী তার জন্য এক ফাঁদ তৈরির পরিকল্পনা করছে।
হিয়ার পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত। সে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্যারাসুটিং এর প্রাইভেট অপারেটরকে ভাড়া করলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেই লোক প্যারাসুটে করে সমুদ্রের মাঝপথে গিয়ে পানিতে পড়ার নাটক করবে। হিয়া স্পিডবোট নিয়ে তাকে উদ্ধার করতে যাবে এবং এরপর তাকে অন্য একটি বোটে তুলে দেওয়ার কথা।
হিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়া করা লোকটি প্যারাসুটে করে সমুদ্রের মাঝপথে গিয়ে পানিতে পড়ার নাটক শুরু করল। হিয়া তার স্পিডবোট নিয়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছাল এবং লোকটিকে অন্য একটি বোটে তুলে দেওয়ার ভান করল। সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু হিয়া নিজের বোটটি এমনভাবে ঘুরিয়ে নিল যে, ধাক্কা সামলাতে না পেরে বোটটি উল্টে গেল।
সৈকতের অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যটকদের ভিড় থেকে অস্ফুট চিৎকার শোনা গেল। হিয়ার পরিকল্পনা ছিল একটাই—এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সবাইকে সৈকত থেকে সরিয়ে ভিলায় ফিরিয়ে নেওয়া। আর লিওন? সিআইডি হিসেবে তার সহজাত প্রবৃত্তিই হলো বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা। সৈকতে থাকা লিওন তখন মায়ার সাথে কথা বলছিল। হিয়া জানত, লিওন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। পানিতে বোট উল্টে যেতেই লিওনের চোখ স্থির হয়ে গেল।
লিওন যখন দেখল স্পিডবোটটি উল্টে গেছে, তার সিআইডি-সুলভ পেশাদার সত্তা মুহূর্তের মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠল। সে কোনো দ্বিধা করল না। সৈকতের উদ্ধারকারী বোটের দিকে ছুটতে ছুটতে সে তার সানগ্লাসটা খুলে বালিতে ছুড়ে ফেলল। সুইমিং শর্টস পরা লিওন লাফ দিয়ে উঠে পড়লো আর বোটের ইঞ্জিন চালু করল। বোটের হ্যান্ডেল তার শক্ত মুঠোয়। সে ঢেউ চিরে বিদ্যুতগতিতে উল্টে যাওয়া বোটের দিকে এগিয়ে গেল। সমুদ্রের মাঝখানে পানির তোড়ে ওই মেয়েটাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু লিওন তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পানির ঘূর্ণি লক্ষ্য করল।
বোটের কাছে পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহূর্তে লিওন ইঞ্জিন নিউট্রাল করে বোটটিকে একটি নির্দিষ্ট কোণে নিয়ে এল যাতে ওই ডুবন্ত মেয়েটার কাছে সহজে পৌঁছানো যায়। সে বোটের কিনারে হাঁটু গেড়ে বসল। পানির ওপর দিয়ে হিয়ার হাতটা নজরে পড়তেই লিওন পানিতে ঝাঁপ দিল না, বরং সে দক্ষ সিআইডি কর্মকর্তার মতো কৌশলী হয়ে উঠল।
পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া হিয়াকে দেখার জন্য সে এক মুহূর্ত পানির ভেতরে মুখ ডুবিয়ে দেখল হিয়া কোথায় আছে। পরক্ষণেই সে পানিতে নেমে পড়ল। তার পেশিবহুল হাত দিয়ে হিয়াকে পেছন থেকে জাপটে ধরল—যেভাবে লাইফগার্ডরা কাউকে বাঁচায়, যাতে হিয়া ভয় পেয়ে লিওনকে জড়িয়ে ধরে বিপদে না ফেলে।
হিয়ার শরীরটা যখন অনেকটা নিথর, লিওন তাকে ভাসিয়ে পানির উপরে নিয়ে এল। এক হাতে হিয়াকে শক্ত করে ধরে সে সাঁতরে উদ্ধারকারী বোটের পাশে এল। বোটের সিঁড়ি বেয়ে হিয়াকে তোলার সময় লিওনের গায়ের পেশিগুলো গোধূলির আলোয় টানটান হয়ে উঠল। হিয়াকে নৌকার মেঝেতে শুইয়ে দিয়ে লিওন তার পিঠে মৃদু চাপ দিয়ে ফুসফুস থেকে পানি বের করার চেষ্টা করল।
লিওনের চোখেমুখে তখন কোনো আবেগ নেই, আছে কেবল উদ্ধারকারী সত্তার কঠোর গম্ভীরতা। সে হিয়ার মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ল, নিশ্চিত হতে চাইল তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক কি না। হিয়ার ভেজা চুলগুলো তার মুখে লেপ্টে আছে, আর লিওন তার ভেজা হাত দিয়ে আলতো করে সেগুলো সরিয়ে দিল। গোধূলির ম্লান আলোয় হিয়ার ভেজা মুখটার দিকে তাকিয়ে লিওনের ভ্রু কুঁচকে উঠল। যদিও হিয়া তার ভ্রুর পিয়ার্সিং সরিয়ে ফেলেছে, হাতের ট্যাটুও নেই। তবে এই মুখটাই কিছু একটা যেন আছে যা লিওনের স্মৃতিতে পরিচিত এক সুরের মতো বাজছে।
লিওন একদৃষ্টিতে হিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সিআইডি-সুলভ বিশ্লেষণাত্মক মন খুব চেষ্টা করছে এই মুখটাকে কোনো নির্দিষ্ট স্মৃতির সাথে জুড়ে দিতে। এমন নয় যে সে হিয়াকে চিনতে পেরেছে, কিন্তু মেয়েটির ঠোঁটের রেখা কিংবা চোখের কোণের একটা ভঙ্গি তাকে অনেক বছর আগের কোনো এক অস্পষ্ট স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কোথায় যেন এই মুখটা সে দেখেছে—কোনো এক পুরোনো ফাইলে, নাকি কোনো এক ঝাপসা অতীতে?
সৈকতের কিনারে বোট ভিড়াতেই ইভানা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল। পর্যটকদের ভিড় ঠেলে সে যখন লিওনের সামনে এসে পৌঁছাল, তখন তার চোখেমুখে ভয়ের ছাপ, তবে হিয়ার পরিকল্পনায় সে নিজেকে দ্রুত সামলে নিল।
লিওন তখনো হিয়ার অচেতন মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, তার মনের ভেতর সেই অস্পষ্ট স্মৃতির খটকাটা তখনো তীব্র। ইভানা হাঁপাতে হাঁপাতে লিওনের সামনে এসে দাঁড়াল এবং কাঁপা গলায় বলল, “ওহ গড! হিয়া! হিয়া তুই ঠিক আছিস তো?”
সে এক মুহূর্তের জন্য লিওনের দিকে তাকাল, তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “থ্যাংক ইউ! ওকে বাঁচানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ। ও আমার বন্ধু হিয়া। আমরা আজই এখানে ঘুরতে এসেছি।”
ইভানার কথায় লিওন তার দৃষ্টি হিয়ার মুখ থেকে সরিয়ে ইভানার দিকে তাকাল। তার সিআইডি-সুলভ তীক্ষ্ণ চোখে তখনো কিছুটা সন্দেহ রয়ে গেছে। সে ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আপনার বন্ধু কি সবসময় এমন ঝুঁকিপূর্ণভাবে বোট চালায়? আজ অল্পের জন্য বড় কোনো বিপদ হতে পারত।”
ইভানা একটু অপ্রস্তুত হওয়ার অভিনয় করে দ্রুত বলল, “আসলে… ও লোকের বিপদ দেখলে নিজেকে সামলাতে পারেনা, আর ওতো খুবই ভালো বোট চালায়, কিন্তু আজ হঠাত কি হলো কে জানে। ও খুব একটা ভালো সাঁতারও জানে না।”
লিওন তখনো সেই রহস্যময়ী তরুণীর মুখের দিকে তাকিয়ে এক ঘোরের মধ্যে ছিল। তার মস্তিষ্ক বারংবার সেই পুরনো স্মৃতির সাথে বর্তমানের এই নারীর অবয়ব মেলাতে ব্যস্ত।
এরপরব লিওন পুনরায় গম্ভীর মুখে ইভানার দিকে তাকাল। তার সিআইডি-সুলভ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে পরিস্থিতিটি হয়তো যতটা সাধারণ দেখাচ্ছে, ততটা নয়। কিন্তু একজন মানুষের প্রাণ বাঁচানো তার পেশাগত দায়িত্ব। সে ইভানার দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে মাথা নাড়লো “আপনার বন্ধু অনেকটা পানি খেয়ে ফেলেছে, দ্রুত ওনাকে শুশ্রূষা করা প্রয়োজন।”
ইভানা সুযোগ বুঝে করুণ স্বরে যোগ করল, “আপনি কি দয়া করে ওকে কোলে নিয়ে আমাদের ভিলা পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন? আমি একা ওকে নিয়ে পারবোনা। আর আমাদের ভিলা এখান থেকে একটু দূরে।”
লিওন এক মুহূর্ত ভাবল। সিআইডি হিসেবে তার ভেতরটা সতর্ক সংকেত দিচ্ছে, কিন্তু এই মেয়েটাকে এভাবে অসহায় অবস্থায় ফেলে যাওয়া তার চরিত্রের সাথে মেলে না। সে তার ফেলে রাখা শার্টটা গায়ে জড়িয়ে পুনরায়, নিচু হয়ে অচেতন হিয়াকে নিজের দুই বাহুর ওপর তুলে নিল। হিয়াকে কোলে নেওয়ার সাথে সাথেই লিওনের মনে অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল।
ঠিক তখনই মায়া ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াল। সে পুরো দৃশ্যটি দেখছিল। মায়া জানে লিওন একজন সিআইডি, তাই বিপদে পড়া কাউকে সাহায্য করা তার সহজাত প্রবৃত্তি। তার মনে কোনো ঈর্ষা হলো না, বরং সে দেখল লিওনের চোখেমুখে সেই চেনা একাগ্রতা। মায়া শান্ত গলায় বলল, “লিও ভাইয়া তুমি ওকে সাহায্য করো। আমি ভিলায় ফিরে যাচ্ছি।”
লিওন এক মুহূর্তের জন্য মায়ার দিকে তাকাল। হিয়ার শরীরের ওজন তার বাহুতে, আর মায়ার স্থির দৃষ্টি তার দিকে। লিওন সংক্ষেপে মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে মায়া, তুই বরং দ্রুত ভিলায় ফিরে যা। আর সাবধানে যাবি।”
মায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, তারপর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়েই বালিপথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। মায়ার এই নির্ভরতা আর নিঃশব্দে সরে যাওয়ার ভঙ্গি লিওনকে কিছুটা অবাক করল, কিন্তু হিয়ার শরীরের সুগন্ধ আর তার মুখের রহস্যময়ী টান তখন লিওনের মস্তিষ্ককে অন্য দিকে ব্যস্ত রেখেছে। সে হিয়াকে কোলে নিয়ে ইভানার পিছু পিছু সেই নির্জন ভিলার দিকে পা বাড়াল।
লিওন হাঁটছে, তার প্রতিটি পদক্ষেপে অস্থিরতা বিরাজমান। ইভানা পাশে দ্রুত পায়ে চলছে, তার তীক্ষ্ণ নজর লিওনের মুখের প্রতিটি পরিবর্তনের ওপর। লিওনের মনে তখন তীব্র দ্বন্দ্ব চলছে। একজন সিআইডি অফিসারের ঠান্ডা মাথার বিচারবুদ্ধি আর এই মেয়েটিকে স্পর্শ করার পর জেগে ওঠা এক অজানা অস্থিরতা।হিয়ার ভেজা চুলগুলো লিওনের বুকের ওপর এসে পড়েছে, আর সেই চুলের ভিজে শীতলতা লিওনের বুকের ভেতরে অদ্ভুত রকমের আগুনের আঁচ দিচ্ছে। তার হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত গতিতে চলছে—এমন এক ছন্দে, যা লিওনের সিআইডি ক্যারিয়ারের দীর্ঘ দিনগুলোতে সে কখনোই অনুভব করেনি।
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৮
হঠাৎ, হিয়ার চুল থেকে ভেসে আসা ঘ্রাণ লিওনের নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করল। সেই ঘ্রাণ তাকে মুহূর্তের জন্য থমকে দিল। এমন একটা সুবাস, এমন একটা পরিচিতি! তার মনে পড়ে গেল কয়েকদিন আগের সেই হোটেল রুমের কথা—যেখানে একদম একইভাবে সেই ক্রিমিনাল নারীর সান্নিধ্য পেয়েছিল। সেই একই ঘ্রাণ, সেই একই মৃদু স্পন্দন!
লিওনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। হোটেল রুমের সেই স্পর্শ আর এই মুহূর্তের স্পর্শের মধ্যে এক অভাবনীয় মিল। সে যেন হিয়াকে কোলে নিয়ে হাঁটছে না, বরং কোনো এক হারানো স্মৃতির গোলকধাঁধায় পা বাড়াচ্ছে।
