Home আযদাহা সিজন ২ আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২২

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২২

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২২
সাবিলা সাবি

স্টেলার একাডেমির বিস্তৃত মাঠের এক কোণে বসে আছে সিলভা, তার বান্ধবী, আর ক্যালিক্স। বিকেলের নরম রোদ মাঠের ঘাসের ওপর ঝিকিমিকি করছে, আর হালকা বাতাসে ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে চায়ের স্টলে জমে ওঠা আড্ডার শব্দ।
“কাল এসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে, আজ যদি শেষ না করি, তাহলে কাল খুব চাপ হবে,” সিলভা চিন্তিত কণ্ঠে বললো, চোখ তার সামনে খোলা নোটবুকে।
ক্যালিক্স হেসে বললো, “তুই তো সব বুঝে ফেলেছিস, আর একটু লাগিয়ে দিলেই তো হয়ে যাবে। এই নে, একটু জুস খেয়ে নে, নাহলে মাথা কাজ করবে না।”
সিলভা এক মুহূর্ত থেমে ক্যালিক্সের দিকে তাকালো, তারপর একটু বিরক্তি নিয়ে বললো, “আমি নিজে খেতে পারি, ক্যালিক্স!”

কিন্তু ক্যালিক্স যেন এসব শুনতেই পায়নি, জুসের বোতলটা ধরে হাসিমুখে এগিয়ে দিলো।
ওদের আড্ডা থেকে খানিক দূরে, একাডেমির ট্রেনিং এরিয়ায় দাঁড়িয়ে ছিল এথিরিয়ন। আজ তার দায়িত্ব নতুন স্টুডেন্টদের ট্রেনিং দেয়া, আর পাশাপাশি সে ল্যাপটপে নিজের এক প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তার মনোযোগ পুরোপুরি কাজের দিকেই ছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই তার চোখ চলে গেল মাঠের দিকটায়।
সিলভা মনোযোগ দিয়ে এসাইনমেন্টে ডুবে আছে, আর ক্যালিক্স তাকে জুস খাইয়ে দিচ্ছে।
এথিরিয়নের আঙুলগুলো কীবোর্ডের ওপর থেমে গেল। চোখ একটু সংকীর্ণ হলো।
“হুম…”

সে আরেকবার দেখলো, সিলভা বিরক্ত হচ্ছে, কিন্তু ক্যালিক্সের মুখে সেই চিরচেনা স্বচ্ছন্দ হাসি।
এথিরিয়ন মুখ শক্ত করে ল্যাপটপের দিকে ফিরে গেলো।
কিন্তু ট্রেনিং বা প্রজেক্টের মাঝে তার মন তখনো একটু পিছিয়ে পড়েছিল, ঠিক সেই মাঠের কোণাটাতেই…
এথিরিয়ন বুঝতে পারছিল না, তার মনের ভেতর এই অদ্ভুত অস্বস্তিটা কেনো জেঁকে বসেছে। এটা বিরক্তি? না কি অন্য কিছু?
সিলভা এতক্ষণ একবারের জন্যও তার দিকে তাকায়নি। অথচ এর আগে, যতক্ষণ এথিরিয়ন আশপাশে থাকত, সিলভার চোখ ঠিকই তার দিকেই থাকতো। কখনো অকারণেই, কখনো কিছু বলার ছুতোয়।
কিন্তু আজ?
আজ সিলভা সম্পূর্ণ ডুবে আছে এসাইনমেন্টে, আর তার পাশে বসে আছে ক্যালিক্স। আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়—সিলভা ক্যালিক্সের কাছ থেকে জুস নিচ্ছে, যদিও মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
এথিরিয়নের মস্তিষ্ক এই দৃশ্যটা ঠিক মেনে নিতে পারছিল না।
কেনো?
কেনো সে অনুভব করছে, যেনো কিছু একটা ঠিকঠাক নেই? কেনো মনে হচ্ছে, সিলভার পাশে ক্যালিক্সের থাকা উচিত নয়?

সে শক্ত করে দাঁত চেপে আবার ল্যাপটপের দিকে চোখ ফেরাল। কিন্তু পর্দার লেখা আর আগের মতো স্পষ্ট লাগছিল না। শব্দগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
ট্রেনিং গ্রাউন্ডে স্টুডেন্টদের দিকনির্দেশনা দেয়ার সময়ও বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল সিলভার দিকে, কিন্তু সিলভা তাকে একবারের জন্যও খেয়াল করল না।
এথিরিয়নের ভেতরে কোথাও যেন একটা অস্থিরতা জমে উঠছিল… এক অজানা, অপ্রত্যাশিত অনুভূতি, যার কোনো নাম খুঁজে পাচ্ছিল না সে।
এথিরিয়ন বড় করে নিঃশ্বাস ফেলল। কপালে আঙুল চালিয়ে চুলের ভেতর দিয়ে স্লাইড করল ক্লান্ত ভঙ্গিতে। নিজের মনে ফিসফিস করে বলল,
“উফ… এথিরিয়ন, ভালোই হয়েছে মেয়েটা তোর ঘাড় থেকে নেমেছে। তাহলে তুই বিরক্ত কেনো হচ্ছিস?”
সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—এটাই তো চেয়েছিল সে, তাই না? সিলভার অযথা দৃষ্টি, তার অতিরিক্ত মনোযোগ—এসব থেকে মুক্তি।
তাহলে কেনো যেনো এখন এতটা অস্বস্তি লাগছে? কেনো বারবার চোখ চলে যাচ্ছে সিলভার দিকে?
সে চায়নি, তাই তো? চেয়েছিল?

এথিরিয়ন বিরক্ত মুখে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু মনোযোগ দেওয়া আর সম্ভব হচ্ছিল না।
এথিরিয়নের দৃষ্টিতে আগুন জ্বলে উঠলো ক্যালিক্স যখন সিলভার হাতের ওপর হাত রেখে তাকে চিত্র আঁকতে সাহায্য করছিল—এই দৃশ্যটাই তার মেজাজ গরম করে দিলো। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হতে লাগলো,মনে হলো কেউ তার জায়গাটা দখল করে নিচ্ছে।
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে পারলো না। দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত গলায় বলল,
“আজকের মতো ট্রেনিং বাতিল। আমি যাচ্ছি।”
কেউ কিছু বোঝার আগেই সে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
এথিরিয়নের এই আচরণ দেখে সিলভার বান্ধবী হালকা ইশারা করল কিছু একটা সিলভাকে কিছু বোঝাতে চাইলো। সিলভা তখন কৌতূহলী হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল—এথিরিয়ন ভার্সিটির গেটের দিকে দ্রুত পা বাড়াচ্ছে।
এক মুহূর্তের জন্য সিলভা স্থির হয়ে রইলো,তার চোখে কিছু অনুভূতি খেলা করলো। কিন্তু পরক্ষণেই সে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। গভীর শ্বাস ফেলে ফের এসাইনমেন্টের পাতায় মনোযোগ দিলো, যেন কিছুই ঘটেনি।

লিউ ঝান তখনো ক্লাস নিচ্ছিল। স্টুডেন্টদের উদ্দেশ্যে বোর্ডে কিছু লিখছিল সে, যখন ফোনটা কাঁপতে লাগলো। স্ক্রিনে বাবার নাম দেখে তার কপালে একটুখানি ভাঁজ পড়লো। সে ধীরেসুস্থে কল রিসিভ করল।
“এতদিন ধরে ফোন করো নি কেন?”
ওপাশ থেকে বাবার কড়া গলা ভেসে এলো।
লিউ ঝান এক মুহূর্ত চুপ করে রইল, তারপর অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, “বিজি ছিলাম, ক্লাস আর হসপিটালের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে।”
“এই সব বাহানা শোনাতে এসো না। আমি জানি তুমি আসলে কীসের জন্য ব্যস্ত।ফিওনাকে নিয়ে আর পড়ে থেকো না, লিউ ঝান। সে তোমার জীবন থেকে চলে গেছে। এখনো তাকে পাওয়ার আশা করাটা বোকামি।”
লিউ ঝানের মুখ থমথমে হয়ে গেল। সে জানে, তার বাবা যতোই বাস্তববাদী হোক, তাকে বোঝানো অসম্ভব যে ফিওনা আর তার গল্প শেষ হয়ে যায়নি—তারা আবারও একসঙ্গে জন্মেছে শুধুমাত্র তাদের মিলনের জন্য।কিন্তু এই সত্যিটা বাবাকে বলা মানে অবিশ্বাস আর প্রশ্নের পাহাড় টেনে আনা।
সে চুপ করে রইল।
ওপাশ থেকে বাবা আবার বললেন, “আচ্ছা, তোমার একটা কাজ আছে। আমার এক বন্ধুর মেয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে, তোমার ব্যাচেই পড়বে। ওকে একটু আলাদা করে গাইড করবে।”
লিউ ঝান ভ্রু কুঁচকে বলল, “নাম কী?”
“ইয়াং জিয়াও।”
নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই লিউ ঝানের মনে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হলো।কোথায় শুনেছে এই নামটা।খুব চেনা,খুব পরিচিত…কিন্তু কোথায়?মনে করতে পারলো না।

ফিওনাকে বিশাল এক কক্ষে এনে ফেলেছে বিজ্ঞানীরা। সেই কখন থেকে তার হাত পেছন দিকে শক্ত করে বাঁধা, রক্ত চলাচল পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঘরটা ধাতব, শীতল, অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ। বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করার আওয়াজ হলো, তারপরই বিজ্ঞানীরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
ফিওনা দ্রুত চারপাশে চোখ বোলালো, কোনো উপায় আছে কি বের হওয়ার? কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই দরজা আবার খুলে গেল। এবার ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো লুকিয়ান আর থালাস।
তাদের ঠোঁটে চওড়া, কুটিল হাসি।
ফিওনার অন্তর কেঁপে উঠল। শরীরে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।
সে শক্ত গলায় বলল, “তোমরা কি চাও? কেনো আমাকে আটকে রেখেছো? আমাকে এখান থেকে বের হতে দাও!”

লুকিয়ান হাসতে হাসতে থালাসের দিকে তাকালো, তারপর গলার স্বর ঠান্ডা রেখে বলল, “প্রতিশোধ নিতে। তোমার কারণেই আমার ভাই মরেছে, আর তোমার সেই ড্রাগন হাজবেন্ড? সে তো আমার ভাই আর লুকিয়ানের ভাতিজাকে হত্যা করেছে। এই ঋণ তো শোধ করতেই হবে, তাই না?”
থালাস একধাপ এগিয়ে এলো, তার চোখের গভীরে নৃশংসতার ঝলক। “তোমার আর তোমার হাজবেন্ডের জন্য আমরা আমাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছি, এবার পালা তোমার কিছু হারানোর।”
ফিওনার শ্বাস দ্রুত হয়ে এলো। তার মনে ভয় জাগছে, কিন্তু সে সেটা দেখাল না। তার মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তোমরা জানো না আমি কে?আমি তোমাদের ভয় পাই না!”
লুকিয়ান মাথা একদিকে কাত করল, চোখে বিদ্রূপের ঝিলিক। “ভয় পাবা কিনা, সেটা তো এখনও ঠিক করা হয়নি, মামণি।”
লুকিয়ান আর থালাস ধীরে ধীরে ফিওনার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল, তাদের মুখে বিকৃত একরকম হাসি। ফিওনা পিছু হটতে লাগল, যতক্ষণ না তার পিঠ দেয়ালের সঙ্গে ঠেকে যায়। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করল।
লুকিয়ান এক ঝটকায় তার কনুই চেপে ধরে টেনে তুলল, আর সঙ্গে সঙ্গে পেছনে বাঁধা দড়ি খুলে দিল।
ফিওনা অবাক হয়ে কিছু বোঝার আগেই, পেছন থেকে থালাস শক্তভাবে তাকে জড়িয়ে ধরল। তার বাঁধন এতটাই দৃঢ় ছিল যে ফিওনার শরীর অসাড় হয়ে যাচ্ছিল।

“ছাড়ো আমাকে!” ফিওনা ছটফট করে উঠল, নিজেকে মুক্ত করার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে গেল।
কিন্তু লুকিয়ান এক ধাপ এগিয়ে এসে ফিওনার চোয়াল শক্ত করে ধরে ফেলল, তার আঙুলের চাপ এতটাই ছিল যে ব্যথায় ফিওনার চোখে পানি চলে এলো।
লুকিয়ান কটাক্ষের হাসি নিয়ে বলল, “উফ! এত চেঁচাও কিভাবে? কিন্তু তোমাকে একটা ছোট্ট তথ্য দিই—এই রুমটা সাউন্ডপ্রুফ।”
সে ফিওনার মুখের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “তোমার সেই ড্রাগন হাজবেন্ডের প্রতি আমরা এতটুকু দয়া করেছি যে, তোমার চিৎকার তার কানে পৌঁছাবে না।”
থালাস ফিসফিস করে হাসল, ফিওনার গায়ে তার শ্বাস অনুভূত হলো।
ফিওনার হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল, কিন্তু সে জানত, আতঙ্ক প্রকাশ করলে এরা আরও বেশি উপভোগ করবে। তাই সে ঠোঁট কামড়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, চোখে একরাশ ঘৃণা নিয়ে লুকিয়ানের দিকে তাকাল।
ফিওনার চোখ ক্রোধে জ্বলে উঠল। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমাকে মেরে ফেল! এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরাই ভালো!”

লুকিয়ান হেসে ফিওনার গালে আলতোভাবে আঙুল ছুঁইয়ে দিল, তারপর ধীরে ধীরে তার চোয়াল স্পর্শ করল।
“মেরে ফেলব?” লুকিয়ানের গলায় উপহাস ঝরল। “না, না… হিউম্যানদের মেরে ফেলা আমাদের নিয়মের বাইরে। বরং আমরা তোমার সাথে এমন কিছু করব যাতে তুমি নিজেই মরতে চাইবে।”
থালাস পিছন থেকে ফিসফিস করে বলল, “তাছাড়া, তোমার মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু বিশেষ আছে, নাহলে ড্রাগন প্রিন্স তোমাকে বিয়ে করত না।”
লুকিয়ান এবার আরও নিচু স্বরে বলল, “আমারও একটু দেখা দরকার, কী আছে তোমার মাঝে। কথা দিচ্ছি, যদি সত্যিই খুব ‘ইয়ামি’ হও, তাহলে শুধু আজ না—অনেকদিন ধরে তোমাকে আমরা উপভোগ করব।”
তার ঠোঁটে এক শয়তানি হাসি ফুটে উঠল।
ফিওনার পুরো শরীর শিউরে উঠল। সে জানত, এদের দয়াশীলতা আশা করাটা বোকামি। তার শরীর কাঁপছিল, কিন্তু সে মুখ শক্ত করে রাখল। ভেতরে ভেতরে আতঙ্কিত হলেও, সে জানত, দুর্বলতা দেখালেই এরা আরও নির্মম হয়ে উঠবে।

ফিওনার শ্বাস ধীর হয়ে আসছিল, আতঙ্ক আর রাগে তার শরীর কাঁপছিল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল, তা হলো নিজের অসহায়ত্ব।
সে জানত—সে ড্রাগন। তার রক্তে সেই শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, যা পাহাড় ধ্বংস করতে পারে, যা আগুনের সম্রাজ্ঞী হতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে, তার নিজের শক্তি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করল, চোখ বন্ধ করল, চেষ্টা করল নিজের ভেতরের সেই ড্রাগন সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে, কিন্তু কিছুই হলো না।
লুকিয়ান উপভোগ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কী হলো, বেইবি? কিছু চেষ্টা করছিলে নাকি? আহা,তুমি তো মানবী তোমার কোনো শক্তি ক্ষমতা নেই।।”
থালাস হেসে বলল, “তাই বলছিলাম, একজন সাধারণ মানুষের মতো কাঁপতে কাঁপতে মরার জন্য প্রস্তুত হও।”
ফিওনার চোখ জ্বলে উঠল, কিন্তু এই মুহূর্তে সে বন্দি, নিরুপায়, আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার—নিজের শক্তিহীনতার ফাঁদে আটকে আছে।
ফিওনা হঠাৎই অনুভব করলো এক তীব্র আঘাত, যখন থালাস তাকে ধাক্কা মেরে ফ্লোরের দিকে ছুড়ে ফেলল। সে কোনো রকমে নিজেকে রক্ষা করতে পারলো না,আর ফ্লোরে পড়ে গিয়ে অসাড় হয়ে পড়লো।পুরো দেহটা ঠান্ডা হয়ে গেল, কিন্তু তার শরীরের ব্যথা তীব্র ছিল।চোখে অন্ধকার,আর মনে ভয়ে ভরপুর এক অনুভূতি।এই মুহূর্তে তার সারা পৃথিবী শুধুমাত্র তার নিজের শ্বাসের আওয়াজ আর হৃদয়ের তীব্র স্পন্দন ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছিল না।

তখনই হঠাৎ হায়নার মতো, দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়লো লুকিয়ান। তার চোখে জ্বলছিল এক অদম্য ক্রোধ, আর সে ফিওনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে শক্ত করে ধরে ফেললো। ধাক্কা, চিত্কার,আর অশ্রু মিশ্রিত অবস্থা।ফিওনা চেষ্টা করছিল মুক্তি পাওয়ার,কিন্তু লুকিয়ানের শক্তি ছিল অসীম।
হঠাৎ,এক দমকে লুকিয়ান ফিওনার জামা ছিঁড়ে ফেললো। ফিওনা চিৎকার করলো,কিন্তু সে আগের মতো শক্তি পাচ্ছিল না।জামার টুকরো টুকরো হয়ে গড়িয়ে পড়ছিল, আর তার শরীর জ্বলে উঠছিল তীব্র ব্যথায়।
আরো তীব্র আঘাত। লুকিয়ানের ধাড়ালো নখগুলো ফিওনার হাতে গেঁথে গেলো। রক্ত গড়িয়ে পড়ল, আর ফিওনার দেহে শিরশিরে অনুভূতি প্রবাহিত হলো। সে সেসব যন্ত্রণা সহ্য করছিল, তবে এবার তার গলা চেপে ধরলো লুকিয়ান, তার সারা শক্তি দিয়ে কামড়ে দিল গলায়।
ফিওনার চোখে ছলছল করে উঠলো, তার আর কোন শক্তি ছিল না। তার চিৎকার রুদ্ধ হয়ে গেল, শুধুমাত্র এক বিক্ষিপ্ত, অশ্রুপূর্ণ আর্তনাদেই ফেঁসে রইলো।
লুকিয়ানের কামড়ে শুধু রক্তের লালছটা তৈরি হয়নি, বরং শ্বাসরুদ্ধকর এক ভয় ভরিয়ে দিলো চারপাশ। ফিওনা কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না, তার সমস্ত শরীর পাথরের মতো ভারী হয়ে পড়েছিল।
ফিওনা ফ্লোরে থাকা অবস্থায়,থালাস এসে পেছন থেকে তাকে শক্ত করে চেপে ধরল।ফিওনা ৎএক মুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেলো, পুরো দেহটি হতাশায় ভরা,কিন্তু তার মধ্যে একটি অদম্য শক্তি ছিল যা তাকে আরেকটু লড়াই করতে উৎসাহিত করছিল।

লুকিয়ান তখন ফিওনার দিকে তীব্র দৃষ্টি দিয়ে বললো, “স্বেচ্ছায় আমাদের সবকিছু বিলিয়ে দাও। কথা দিচ্ছি, জ্যাসপারের চেয়ে বেশি মজা দেবো আমরা তোমাকে।”
ফিওনা তার মুখে ঘৃণাভরে থুতু ছুঁড়ে দিল। তারপর একরাশ তীব্রতার সাথে বললো, “মরে গেলোও তোরা স্বেচ্ছায় আমাকে পাবি না!”
লুকিয়ান রাগে ফুঁসছিল,তার চোখে ছিল এক ধরনের অদম্য ক্রোধ যা কোনোভাবে থামানো সম্ভব মনে হচ্ছিল না। সে তীব্রভাবে ফিওনাকে একদিকে ধাক্কা দিয়ে, তার মুখের দিকে তীব্রভাবে হাত তুলে ফেললো।
ফিওনার শরীরটি সজোরে কেঁপে উঠলো, আর তারপরেই একটি প্রচণ্ড থাপ্পড় তার মুখে এসে পড়লো। ফিওনার ঠোঁটের নিচের অংশে এক গভীর ক্ষত হয়ে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে রক্ত বের হয়ে এল। রক্তের লাল ফোঁটা তার ঠোঁট থেকে গড়িয়ে পড়লো, আর ফিওনার মুখে এক মুহূর্তের জন্য মুছে গেল সমস্ত আত্মবিশ্বাস।
সে কিছু বলতে চেয়েছিল, তবে মুহূর্তেই ঠোঁটের ব্যথা তাকে চুপ থাকতে বাধ্য করলো। চোখে অসীম আক্রোশ আর ক্ষোভ নিয়ে সে চুপচাপ পড়ে ছিল,মনে হচ্ছে তার শরীর কেবল এক যন্ত্রণা, আর তার আত্মা ভেতরে ভেতরে পুড়ছিল।

লুকিয়ানের সড়ে যাওয়ার পর,থালাস ঘুরে ফিওনার দিকে এগিয়ে এসে এক তীব্র দৃষ্টিতে তাকে পরখ করতে লাগলো। ফিওনার মধ্যে এক অসীম ক্রোধ ছিল,কিন্তু শরীরের প্রতিটি অংশে জ্বলন্ত ব্যথা অনুভব হচ্ছিল। থালাস হঠাৎই তার ঠোঁটে কামড় বসালো,তার সমস্ত আত্মবিশ্বাস চুরমার করে দিলো।
ফিওনা আ*র্তনাদ করে উঠলো, কিন্তু কোনোভাবে তার মুখ বন্ধ করতে পারছিল না। তার ঠোঁটে কামড়ে কারনে রক্ত বের হতে লাগলো।
তারপর, থালাসের শক্তি আবার তাকে না থামিয়ে ফিওনার বুকের নরম জায়গায় চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো। প্রতি চাপের সাথে ফিওনার শরীরে এক তীব্র জ্বালা আর অসহ্য যন্ত্রণার অনুভূতি হচ্ছিল।সে চেষ্টা করছিল প্রতিরোধ করার, কিন্তু থালাসের শক্তি এতটা প্রখর ছিল যে, সে কিছু করতে পারছিল না।
থালাস আর লুকিয়ান একে অপরকে অবিশ্বাস্যভাবে তীব্র দৃষ্টিতে দেখছিল। তাদের চোখে ছিল এক নিষ্ঠুর পরিকল্পনা, ফিওনার শরীর ক্লান্ত আর আহত হয়ে পড়েছিল।তাদের মধ্যকার সংঘর্ষ বাড়ছিল, আর ফিওনার জন্য এই পরিস্থিতি এক অসম্ভব প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
থালাস হঠাৎ তার বেল্ট খুলে ফেললো আর ফিওনার দিকে এগিয়ে গেলো। তবে,ফিওনার মধ্যে তখনও ছিল এক ধরনের আত্মবিশ্বাস,এমনকি সে বুঝতে পারছিল যে সে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল, কিন্তু তার মানসিক শক্তি তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

লুকিয়ানও সেই মুহূর্তে তার বেল্ট খুলে ফিওনার দিকে এগিয়ে আসে,আর এক সেকেন্ডের মধ্যে আক্রমণ চালাতে চেয়েছিল, কিন্তু ফিওনা এক মুহূর্তের জন্য তার শরীরের শক্তি সঞ্চয় করলো,আর তার মধ্যে থেকে এক শক্তিশালী শ্বাস নিয়ে শেষ শক্তি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো।
তবে এক মুহূর্তে একটি তীব্র আঘাত এসে পড়লো বেল্টের। ফিওনা কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে লুটিয়ে গেলো। থালাস আর লুকিয়ান দুজনেই তখন তাকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল,কারণ ফিওনার মুখের মধ্যে অসম্ভব দুর্বলতা ছিল,আর তার চোখে ছিল গভীর ক্লান্তি।
থালাস ফিওনার মাথার কাছে গিয়ে তার চুল তুলে ধরে মুখটা ওপরের দিকে তুললো,তাকে জ্ঞান ফিরানোর জন্য চেষ্টা করলো,কিন্তু ফিওনার শরীরের ওপর যে মানসিক চাপ আর আঘাত এসেছে,তা দ্রুত সেরে উঠার মতো ছিল না।তার চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল,তার সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল।
ফিওনার মনে কিছু প্রশ্ন ছিল,কিন্তু তার শরীর সম্পূর্ণ অচল ছিল।সে জানতো না, তার জন্য পরবর্তী সময়ে কি অপেক্ষা করছে।
থালাস এক গভীর দৃষ্টিতে লুকিয়ানকে তাকিয়ে বললো, “এখন কি করবি? আসল কাজটা করবি?”
লুকিয়ান তার ঠোঁটে একটি নির্মম হাসি ফুটিয়ে বললো, “না, আমি এটা এতো সহজে শেষ করতে চাই না।আমি চাই তার চিৎকার শুনতে—প্রত্যেকটা যন্ত্রণা তার গলা থেকে বেরিয়ে আসুক,আর সেটা আমার কানে এসে পৌঁছাক।”

জ্যাসপার যখন তার চোখ খুলে দেখতে পেলো,চারপাশে অন্ধকার আর সিল করা কাঁচের বক্সে এখনো আটকে থাকা, তখন তার মনে হলো যেন গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কিছুটা বিস্মিত হয়ে সে আশপাশে তাকাল।মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, যখন ক্যামিকেল ছড়ানো হয়েছিল,তখনই তার শক্তি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছিল। তবুও,সে এখনো এ বক্স থেকে বের হতে পারছিল না।
“ফিওনা! ফিওনা!” চিৎকার করতে থাকে জ্যাসপার, তার কণ্ঠে হতাশার বিষাদ স্পষ্ট। সে অদৃশ্য শক্তির বিপরীতে সংগ্রাম করছিল,কিন্তু কাঁচের বক্স তাকে আটকে রেখেছিল। আহাজারি করতে করতে সে নিজেকে দোষ দিতে লাগলো।
“আমি কেনো তার ড্রাগন ক্ষমতা ব্লক করে রাখলাম? যদি তা না করতাম, তাহলে সে আজকে নিজকে রক্ষা করতে পারতো…” তার মনে একের পর এক আঘাত আসছিল, একসময় তার চোখে ঝাপসা হয়ে আসছিল।সে কাঁচের বক্সের চারপাশে শক্তি প্রয়োগ করে ভাঙতে চেষ্টা করলো, কিন্তু বক্সের শক্তিশালী কাঠামো তার শক্তির প্রভাবকে একেবারে প্রতিহত করে ফেলেছিল।
অগত্যা, জ্যাসপার আরও একবার চেষ্টা করলো। সে জানতো, ফিওনাকে সুরক্ষিত রাখতে হলে এখনো তাকে এই মহাবিশ্বের যেকোনো কিছুর সাথেই লড়াই করতে হবে।

লিউ ঝান ক্লাসে ফিরে যাওয়ার পর,হঠাৎ করে সমস্ত স্টুডেন্টদের মধ্যে প্রশ্ন করলো, “তোমাদের মধ্যে ইয়াং জিয়াও কে?”
ইয়াং জিয়াও উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে কিছুটা উদ্বেগ ছিল, কিন্তু সাথে সাথে একটা নিরীহ অভ্যস্ত হাসিও ছিল। লিউ ঝান অবাক হয়ে দেখলো, “এটাই তো সেই মেয়ে, যাকে আমি বকা দিয়েছিলাম।”
লিউ ঝান তার দিকে তাকিয়ে বললো, “ক্লাস শেষে আমার সাথে দেখা করবে।”
এটা শুনে, ইয়াং জিয়াও কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লো। সে বুঝতে পারছিল না, আনন্দিত হবে নাকি ভয় পাবে। কারণ, লিউ ঝান যে এমন সময়ে তাকে ডাকলো, তার মানে হয়তো আবার তাকে কিছু বলা হবে। কিন্তু সাথে সাথে ইয়াং জিয়াও বুঝতে পারলো, এটা একটা সুযোগ হতে পারে—লিউ ঝান তাকে কি একটা সুযোগ দিতে চাচ্ছে?

এথিরিয়ন প্রাসাদে ফেরার পর নিজের কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম করতে শুরু করলো। চোখ বন্ধ করার সাথে সাথেই সিলভার মুখটা তার মনের মধ্যে ভেসে উঠলো। তার সিলভার চোখের মুখাবয়ব, হাসি, কথা—সব কিছু একে একে মনে পড়তে লাগলো। কিছুই ঠেকাতে পারলো না।
এথিরিয়ন চিত্কার করে উঠলো, “এটা কি হচ্ছে?”। ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিলো, আর মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলো, “ওই মেয়েটা এতদিন আমাকে টর্চার করেছে, আর এখন আমার ব্রেইনকে টর্চার করছে?”
এথিরিয়ন শ্বাস টেনে শান্ত হতে চেষ্টা করলো, কিন্তু সিলভা তার মনে সবসময় বিরাজ করছে। কিছুতেই মাথা থেকে তাড়াতে পারলো না। তাকে কেন এমন অনুভূতি হচ্ছে? এতদিন পর্যন্ত সে নিজেকে এড়িয়ে চলেছে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সিলভা যেন তার ভেতরে কোথাও প্রবেশ করেছে, আর তার প্রতিটি চিন্তায় সিলভার উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
“কি হচ্ছে আমার?”—এথিরিয়ন মরমর করে বলল, আর হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে। “তুমি কি আমাকে পাগল করে তুলবে?”
নিজেকে শান্ত করার জন্য চোখ বন্ধ করল, কিন্তু সিলভার মুখ মনে পড়তেই আরো অস্থির হয়ে উঠলো। কেন তার মন এমন অস্থির হচ্ছে?

জ্যাসপার ধীরে ধীরে কিছু একটা উপলব্ধি করতে লাগলো। মাথার ভেতর কেমন যেন অস্বাভাবিক ভারী অনুভূতি।কিছু একটা ঠিক নেই।সে শ্বাস নিতে গেল,কিন্তু বাতাসে তখন ও কেমিক্যালের গন্ধ ভাসছিলো।
শরীরের ভেতর দহন অনুভব হচ্ছে।কদিন আগেও যে সে ছিলো এলড্র রাজ্যের ড্রাগন প্রিন্স,এখন এক পরীক্ষাগারের ইঁদুরের মতো মনে হচ্ছে নিজকে।
জ্যাসপার ধমক দিলো নিজেকে। এটা সে না। সে কেবল জ্যাসপার না—সে থেরন!
তার ভেতরের র*ক্ত আগুন হয়ে ফুটতে লাগলো। শিরাগুলোতে এক অতিপ্রাকৃত শক্তির বিস্ফোরণ ঘটতে লাগলো।স্মৃতির অতল গহ্বর থেকে কোনো এক পুরনো যুদ্ধের দৃশ্য ভেসে উঠলো— আগের জন্মে একাই শত শত ড্রাগনকে ধ্বংস করেছিলো সে,তার গর্জনে আকাশ ফেটে পড়েছিলো।আজ আবার সেই সময় এসেছে।
তারপরই…

এক মুহূর্তে পুরো বাক্স কেঁপে উঠলো।
জ্যাসপার হাত মুঠো করলো, আর সাথে সাথে প্রবল এক কম্পনে কাঁচের বাক্সের প্রতিটি অংশ বিদীর্ণ হয়ে গেলো। তীক্ষ্ণ ধারালো টুকরোগুলো বাতাসে উড়লো, কিছু এসে বিধলো তার কপালে, গালে, হাতে। কিন্তু সে টের পেলো না। বরং কাঁচের টুকরোর ভেতর দিয়ে যখন সবুজ রক্ত গড়িয়ে পড়লো, তখন মনে হলো তার রক্তের সাথেই যেন শক্তির নতুন এক তরঙ্গ ছড়িয়ে যাচ্ছে শরীরজুড়ে।
ভেতরে আগুনের মতো জ্বলছিলো জ্যাসপারের র*ক্ত। বাতাসে বারুদ আর কেমিক্যালের গন্ধ ছড়িয়ে আছে, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোতে তার সবুজ রক্ত ঝলমল করছে।কিন্তু সে এখন ব্যথা অনুভব করছে না।
ফিওনার অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন নেই—এটাই তাকে পাগল করে দিচ্ছে!
জ্যাসপার গভীরভাবে শ্বাস নিলো,তার শরীরের প্রতিটি কোষে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রবাহ শুরু হলো।তার ভেতরের থেরন এখন সম্পূর্ণ জাগ্রত!

তার চোখদুটো সবুজের মধ্যে রূপালী-সোনালি আভা ছড়াতে লাগলো,চারপাশের বাতাস কাঁপতে লাগলো তার অদৃশ্য শক্তির চাপে। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকলো—তার আশেপাশে থাকা সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস এক মুহূর্তেই বিকল হয়ে গেলো।
হঠাৎ করেই,তার ড্রাগন-ইন্দ্রিয় অনুভব করলো কিছু…
ফিওনা এখানেই আছে,কোথাও খুব কাছেই।
কিন্তু তার প্রাণশক্তি দুর্বল,তবে কিছু একটা তাকে স্তব্ধ করে রেখেছে।
জ্যাসপার এবার আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না।শক্তি সংহত করে সে প্রবল বেগে দেয়ালের দিকে আঘাত করলো। শক্ত ধাতব দেয়াল ধুলো হয়ে উড়ে গেলো!
অন্ধকার প্রকোষ্ঠের ভেতরে
হঠাৎ জ্যাসপার একটু থেমে গেলো তার শরীরে একধরনের অদ্ভুত, কালো ধোঁয়া জড়িয়ে যাচ্ছে।—জ্যাসপার বুঝতে পারলো, এটা থালাস আর লুকিয়ানের কোনো বিশেষ কেমিক্যাল টক্সিন, যা ড্রাগনদের শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে পারে।

জ্যাসপার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার আগেই কিছু অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলো। বাইরে গাড়ির ইঞ্জিন থামার আওয়াজ, ভারী বুটের দ্রুতগতির শব্দ আর রেডিওতে কিছু সংকেত আদান-প্রদান করা হচ্ছে।
বাইরে সারি সারি পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে।
শুধু পুলিশ নয়, সিআইডি, আর্মি—সবাই হাজির!
এক মুহূর্তের জন্য, জ্যাসপার থেমে গেলো। ব্যাপারটা কী? এতগুলো মানুষ এখানে কী করছে?
তারপরই একটা তীক্ষ্ণ কমান্ড ভেসে এলো—
“অভিযান শুরু! সবাই সতর্ক থাকুন!”
এক ঝলকের মধ্যে পুরো ভবন আলোয় ঝলমল করে উঠলো। লাল-বেগুনি সংকেত বাতি ঘুরতে থাকলো, আর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করলো।
থালাস আর লুকিয়ান তখনই বুঝতে পারলো, ওরা ধরা পড়ে যাচ্ছে,আর ওরা চাইলো নিজেদের আসল রুপে এসে প্রতিবাদ করতে পারবে না। এতে আরো বিপদে পড়বে!
আসল ক্লায়েন্টদের বন্দি করে নিজেদের ছদ্মবেশে জ্যাসপারের সামনে হাজির হয়েছিলো ওরা।কিন্তু ওদের হিসাবের ভুল হয়েছিলো—ক্লায়েন্টরা বেশিক্ষন বন্দি থাকেনি।
একসময় তারা জেগে উঠেছে আর সাথে সাথে পুলিশকে খবর দেয়।
পুলিশ বুঝতে পারে, এ কেবল সাধারণ কিডন্যাপিং কেস নয়—এতে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধের ছায়া। আর এই ভবনটাই এখন চরম বিপজ্জনক অপরাধীদের আস্তানা।
তাই ফোর্স নিয়ে এখানে অভিযান চালাতে আসে।

থালাস চারপাশে একবার তাকিয়ে বুঝতে পারলো, এখন ওদের পালানোর সময় এসেছে।
“লুকিয়ান, আমাদের দ্রুত বের হতে হবে!” থালাস ফোঁস করে উঠলো।
কিন্তু জ্যাসপার তখনি সামনে এসে দাঁড়ালো, তার সবুজের মধ্যে রূপালী-সোনালি চোখ দুটো জ্বলতে থাকলো।
“আজকে তোমরা পালাতে পারবে না আমার ফিওনা কোথায়?”
জ্যাসপার থেরনের শক্তি পুরোপুরি জাগ্রত করে থালাস আর লুকিয়ানের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করলো। আগুনের ঝলকানি,শক্তির তরঙ্গ—সব মিলিয়ে পুরো ভবন কেঁপে উঠছিল।তারা বিশাল কক্ষে যুদ্ধ শুরু করেছে। পুলিশ বাহিনী এখনো তাদের কক্ষে পৌঁছায়নি।
সিআইডি আর আর্মির সদস্যরা চারপাশ থেকে ভবন ঘিরে ফেলেছে,সবকিছু স্ক্যান করে নিশ্চিত করেছে—এই বিল্ডিংয়ের কোথাও যেন পালানোর কোনো সুযোগ না থাকে।

কিন্তু…
থালাস এক বিকৃত হাসি দিলো।
“আমরা ধরা পড়বো না জ্যাসপার।”
থালাস আচমকা তার শক্তি ছড়িয়ে দিলো পুরো ভবনে, চারপাশ কুয়াশার মতো একধরনের অন্ধকার শক্তিতে ভরে উঠলো।
এই শক্তির প্রভাবে সব আলো নিভে গেলো, শুধু লাল সংকেত বাতিগুলো জ্বলজ্বল করছিলো।
“সতর্ক থাকুন! কিছু একটা ঘটতে চলেছে!” এক পুলিশ অফিসার হাঁক ছাড়লো।
ঠিক সেই মুহূর্তে, পুলিশ আর আর্মি দুটো বিশেষ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করলো—দুইজন বিজ্ঞানী, যারা এই পুরো কিডন্যাপিং অপারেশনের মূল মাথা ছিলো তারা অবশ্য মানব ছিলো।
ওরা পালানোর চেষ্টা করছিলো, কিন্তু পুলিশের ড্রোন ক্যামেরা আর সেন্সর ট্র্যাক করে ফেলেছে তাদের অবস্থান।

“হ্যান্ডস আপ! ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট!”
পুলিশ তাদের হাতকড়া পরিয়ে দ্রুত হেলিকপ্টারে নিয়ে গেলো।
কিন্তু সমস্যা হলো, থালাস আর লুকিয়ান তখনো ধরা পড়েনি!
লুকিয়ান দ্রুত তার হাতের আঙুলে থাকা একটি ছোট, গাঢ় নীল রঙের পাথরে চাপ দিলো।
এক সেকেন্ডের জন্য, পুরো রুম ঝাঁকুনি খেলো, আর লুকিয়ান ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেলো!
পুলিশের কয়েকজন অফিসার ছুটে এসে থালাসকে ঘিরে ফেললো।
“হাত তুলো! একটুও নড়াচড়া কোরো না!”
কিন্তু থালাস শুধু মুচকি হাসলো।
তার চোখের মধ্যে একটা অদ্ভুত আলো ফুটে উঠলো।
জ্যাসপার বুঝতে পারলো, ও কিছু একটা করবেই!
এক মুহূর্তের জন্য, থালাসের শরীর একটা কালো ধোঁয়ায় পরিণত হলো…
তারপর এক ঝলকে সে মিলিয়ে গেলো অন্ধকারের মধ্যে!

জ্যাসপারের রাগ আর ফিওনার খোঁজ
থালাস আর লুকিয়ান পালিয়ে গেলো, কিন্তু পুলিশ বিজ্ঞানীদের ধরে ফেলেছে।
জ্যাসপার দাঁতে দাঁত চেপে রাগে ফুঁসছিলো।
এত কাছে এসেও থালাসকে ধরতে পারলো না!
কিন্তু এখন তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
ফিওনা কোথায়?
সে কি নিরাপদ? নাকি থালাস পালানোর আগেই তাকে নিয়ে গেছে?
চারপাশে শুধু বিশৃঙ্খলা।
থালাস আর লুকিয়ান রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে গেছে,এমনভাবে যেনো ওরা কখনো এখানেই ছিলো না।
পুলিশ বাহিনী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। কীভাবে সম্ভব?
একজন সিনিয়র অফিসার সন্দেহ নিয়ে বললেন, “এটা কোনো সাইন্স ফিকশন প্রযুক্তি হতে পারে। হয়তো হাই-টেক হোলোগ্রাফিক কিছু ব্যবহার করেছে ওরা।”
কিন্তু আসল সত্য তারা জানে না।
জ্যাসপার জানে।
ওদের মুখোশের আড়ালে কী আছে, সেটা শুধুমাত্র জ্যাসপারই জানে।
জ্যাসপার হাত-মুঠো করে দাঁতে দাঁত চেপে চারদিকে তাকালো।

“ফিওনা!”
তার কণ্ঠে আগুনের তীব্রতা, উন্মত্ততা।
কিন্তু কোথাও কোনো উত্তর নেই।
সে পুলিশদের দিকে তাকিয়ে রাগত স্বরে বলল, “আমার ওয়াইফ কোথায়? ওরা কিছু একটা করেছে! প্লিজ, আমার ওয়াইফকে খুঁজে বের করুন!”
পুলিশরা জ্যাসপারের এই কথায় চমকে উঠলো।
কিছু অফিসার তার দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকালো।
কেউ কেউ ভাবলো, “এই লোক এত মরিয়া কেন? ওর ভেতরে কোনো গোপন তথ্য আছে নাকি?”
কিন্তু একজন অফিসার, যিনি অভিজ্ঞ আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এগিয়ে এলেন।
“আমরা সবকিছু করে দেখবো, মিস্টার। কিন্তু আমাদের তথ্য দরকার। আপনি কি জানেন, তারা আপনার স্ত্রীকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে?”
জ্যাসপার কিছুক্ষণ চুপ থাকলো।
তার চোখ দুটো এখনো আগুনের মতো জ্বলছে।
সে জানে—ওরা মানুষ নয়।
ওরা দানব।

এখন তাকে যা করতে হবে, তা একা করতে হবে।
চারপাশে এখনো বিশৃঙ্খলা।
আর্মি, পুলিশ, আর সিআইডির সদস্যরা জায়গাটা ঘিরে রেখেছে।
জ্যাসপার তখনো ফিওনাকে খুঁজে মরিয়া হয়ে উঠেছে, কিন্তু হঠাৎই কিছু লোক পুলিশের নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে তার দিকে এগিয়ে এল।
জ্যাসপার তাদের দেখে প্রথমে সতর্ক হয়ে উঠলো।
তারা সুসজ্জিত পোশাক পরে আছে,চোখেমুখে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার ছাপ।
তাদের নেতা সামনে এসে বললেন, “আমাদের দেখে এত অবাক হচ্ছেন কেন, মিস্টার আলভিন?”
জ্যাসপার তাদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো।
“তোমরা কে?”
তাদের নেতা হাসলো, তবে সেই হাসির পেছনে ছিলো গভীর অর্থ।
“আমরা সেই ক্লায়েন্ট, যাদের সঙ্গে আপনার দেখা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসার আগেই আমাদের আটকানো হয়েছিলো।”
জ্যাসপারের মস্তিষ্ক বিদ্যুতের মতো কাজ করতে লাগলো।

“তাহলে…”
“হ্যাঁ,” অন্য একজন বললো, “যাদের সাথে আপনি এতক্ষণ কথা বলছিলেন, তারা আমাদের ছদ্মবেশী।তারা আমাদের জায়গায় এখানে এসেছে।”
জ্যাসপার চোখ বন্ধ করলো, মনে মনে হিসাব মেলাতে লাগলো।
ক্লায়েন্টদের নেতা হঠাৎ আবার ও বললেন
“আমরা জানতাম না এই অপারেশনটা এত বড় ষড়যন্ত্রের অংশ হবে। এখন আমরা বুঝতে পারছি, যারা এটা করেছে, তারা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়… তারা আপনার একান্ত ব্যাক্তিগত শত্রু।”
এটা শুনেই জ্যাসপার এক মুহূর্ত থমকে গেল।
জ্যাসপার জানতো,এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করলে অসাধারণ কিছু হতে পারে,কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, এখানে তার ব্যক্তিগত শত্রু ঢুকে পড়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ফিওনা এখন কোথায়?
জ্যাসপার এক মুহূর্তও দেরি না করে বললো, “আমার স্ত্রীকে খুঁজে বের করতে হবে!এখন এসব ভাবার সময় নেই।”

জ্যাসপার দ্রুত অন্য আরেকটা কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করলো।
চারপাশের দৃশ্য দেখে তার চোখ কুঁচকে উঠলো।
কক্ষটা অন্যসব কক্ষের চেয়ে আলাদা ছিলো—অগোছালো, ভাঙাচোরা, যেন কিছুক্ষণ আগেই এখানে এক বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে গেছে।
“ফিওনা!”
জ্যাসপার চিৎকার করলো, কিন্তু কোনো উত্তর আসলো না।
তার মনে হলো, এখানে কিছু একটা ঘটেছিলো—কিন্তু কী?
জ্যাসপার সাবধানে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করলো।
ফ্লোরে ভাঙা কাঁচ, দেয়ালে আঁচড়ের দাগ, কিছু আসবাব উল্টে পড়ে আছে।
এগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, এখানে কিছু একটা সংঘর্ষ ঘটেছে।
জ্যাসপার ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো, তার চোখ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলো।
জ্যাসপার কক্ষের চারপাশে তাকিয়ে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো।
এত বিশৃঙ্খলা… এত ধ্বংসস্তূপ…
ফিওনা এখানে ছিলো, নিশ্চিত।
কিন্তু এখন সে কোথায়?
তার চোখ পড়লো মেঝের উপর, ধুলোমাখা ভাঙা জিনিসের ভেতর একটা ছোট কিছু ঝলসে উঠলো।
সে নিচু হয়ে সেটি তুলে আনলো—

একটা ব্রেসলেট।
ফিওনার ব্রেসলেট!
জ্যাসপার হাতের তালুতে সেটি শক্ত করে ধরলো।
এটা সেই ব্রেসলেট, যেটা সে ফিওনাকে জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলো—
একটা বিশেষ সোনালি ব্রেসলেট, যার মাঝখানে ছোট্ট রত্ন বসানো ছিলো, ঠিক তার চোখের রঙের মতো।
কিন্তু এখন সেটা ছিঁড়ে গেছে।
ব্রেসলেটের একপাশে রক্তের দাগ…
জ্যাসপারের নিশ্বাস গরম হয়ে উঠলো।
এই মুহূর্তে, তার শরীরের প্রতিটি শিরা রাগে, হতাশায় ফেটে পড়ার অপেক্ষায়।
সে রাগে এক মুহূর্ত দেরি না করে সামনে থাকা আলমারির দরজায় প্রচণ্ড এক ঘুষি মারলো।
“ধড়াম!”
আলমারির দরজা কেঁপে উঠলো, শক্তপোক্ত কাঠ ভেঙে নিচে পড়লো।
আর তখনই—

একটা নরম, অচেতন শরীর তার ওপর ভেঙে পড়লো।
ফিওনার নিথর শরীরটা যখন জ্যাসপারের বুকে পড়লো, সময় যেন সেখানেই থমকে গেলো।
তার বুকের ভেতর একটা বিস্ফোরণ হলো,নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসলো।
কিন্তু যখন সে দেখলো—
ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক, গলায় কামড়ের দাগ, হাতে কামড়ের আর নখের চিহ্ন আর ঠোঁটে পুরোটারই কালসিটে হয়ে আছে গালে পর্যন্ত নখের চিহ্ন …
ধ্বংসের আগুন জ্বলে উঠলো!
তার পুরো সত্তা এক মুহূর্তে আগুনের গোলার মতো ফেটে পড়লো!
জ্যাসপার ফিওনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে চাইলো তাকে,যাতে করে এই পৃথিবী আর একবারও তাকে কষ্ট দিতে না পারে।
ফিওনাকে আস্তে করে শুইয়ে দিলো ফ্লোরে তারপর তার কপাল ফিওনার কোমরে ঠেকিয়ে সে গভীরভাবে শ্বাস নিলো।
কিন্তু সেই নিশ্বাসে শুধু ব্যথা… রাগ… আর প্রতিশোধের আগুন।
তার পুরো শরীর ড্রাগনের রূপ নিতে চাইলো, নখ লম্বা হয়ে বেরিয়ে এলো, দাঁত এমন শক্ত হয়ে গেলো যে মাড়ি থেকে সবুজ রক্ত গড়িয়ে পড়লো।
কিন্তু সে এখনই বদলাবে না।

এখনো না।
তার সবুজ চোখ অন্ধকার হয়ে গেলো।
আর তারপর—
তার চোখের কোণে এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়লো।
রক্তের কান্না!
“তারা… তোমাকে ছুঁয়েছে…”
তার কণ্ঠ এতটাই গভীর, এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠলো যে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে গেলো।
সে ফিওনার মুখে হাত রাখলো, তার সমস্ত ব্যথা নিজের ভেতরে টেনে নিতে চাইলো।
কিন্তু সে পারেনি।
তাই সে ফিসফিস করে বললো—
” তারা তোমাকে তাদের নোংরা স্পর্শ দিয়েছে?
আমাকে ক্ষমা করো, হামিংবার্ড…আমাকে ক্ষমা করো,আমি সঠিক সময়ে আসতে পারিনি,আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি!”
কিন্তু পরের মুহূর্তেই, তার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো।
সে গর্জন করতে করতে ফিওনাকে আস্তে করে নিজের থেকে সরিয়ে নিলো।
তার হাত কাঁপছে।
কিন্তু সেই কম্পন কষ্টের নয়, ধ্বংসের!
“ওদের কাউকে আমি ছাড়বো না!”
প্রলয়ের আগুন!
তার কণ্ঠে এমন এক ভয়ংকর ক্ষমতা ছিলো যে চারপাশের বাতাস থমকে গেলো।

“একজনও বেঁচে থাকবে না! একটাও না! ওদের পুরো জাতিকে আমি পৃথিবী থেকে নিষ্ক্রিয় করে দিবো।
আমি এমন মৃ*ত্যু দেবো যে ওদের,পুরো মহাবিশ্ব কেঁপে উঠবে!”
তার হাতে তখন আগুন জ্বলতে শুরু করলো।
শরীর থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে আসলো।
পুরো বিল্ডিং কাঁপতে লাগলো!
“তাদের চিৎকারে পুরো শহর দুলবে!”
জানালার কাঁচ ভেঙে ধূলোর মতো উড়ে গেলো!
“আমি তাদের গলা এমনভাবে ছিঁড়ে ফেলবো,তাদের মৃত্যু দেখে জীবনে আর কেউ কোনো নারীর দিকে তাকানোর সাহস না পায়!”
“আমি তাদের হাড় দিয়ে আমার সিংহাসন বানাবো!”
জ্যাসপারের চারপাশে ধ্বংসের ঝড় বইতে লাগলো!
বাতাস থমকে গেলো।
পৃথিবী ও জানে—
এক ড্রাগনের ক্রোধ পুরো গ্রহ ধ্বংস করে দিতে পারে!
আজ জ্যাসপার নয়।
আজ থেরন জেগে উঠেছে।
আজ এক ভয়ানক আযদাহা জন্ম নিলো!

জ্যাসপার দ্রুত ফিওনাকে নিজের গায়ের কোট জড়িয়ে দিলো,ফিওনার বিশ্বস্ত শরীর ঢেকে দিলো।
তার হাত কাঁপছিলো।
কিন্তু ফিওনার ঠোঁটের একটুকরো নড়াচড়া দেখে বুঝলো—
সে এখনো বেঁচে আছে!
” আমার হামিংবার্ড…”
তার গলার স্বর ভেঙে যাচ্ছিলো।
কিন্তু এখনো সে ভাঙতে পারেনা।
এখন না!
সে এখন মনোবল হারালে চলবেনা !
জ্যাসপার কোনো কথা না বলে ফিওনাকে শক্ত করে কোলে তুলে নিলো।
তার পা মেঝে ছোঁয়ার আগেই ঝড়ের মতো ছুটে গেলো বিল্ডিংয়ের বাইরে।
বাইরে তখন পুলিশরা ছুটে আসছিলো, চারদিকে আলো ঝলসে উঠলো, কেউ কেউ তার দিকে ছুটে আসছিলো তাকে থামাতে!

কিন্তু জ্যাসপার কারো তোয়াক্কা করলো না!
সে এক মুহূর্তের জন্য থামলো না!
এক নিঃশ্বাসে সে পার্কিং লটে পৌঁছে গেলো।
সে দ্রুত ফিওনাকে কোলে নিয়েই ড্রাইভিং সিটে বসলো, এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে আরেক হাতে ফিওনাকে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে রাখলো।
তারপর…
সিটবেল্ট টানটান করে বেঁধে দিলো।
নিজের সাথে ফিওনাকে একসাথে বেঁধে ফেললো!
এ যেনো এক যুদ্ধ!
এ যেনো এক অসম লড়াই!
গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠলো,হেডলাইট জ্বলজ্বল করতে লাগলো।
তারপর…
গাড়ি বিদ্যুতের গতিতে ছুটে গেলো!
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কালো ধোঁয়ার বিশাল একটা রেখা রেখে মহাসড়কে ছুটে গেলো জ্যাসপার!
তার হাত স্টিয়ারিংয়ে, কিন্তু তার চোখ ফিওনার নিস্তেজ মুখে…
তবে সে থামবে না!

সে ওভারটেক করলো একের পর এক গাড়ি,আশেপাশের ভবনগুলো ঝাপসা হয়ে গেলো,লাইটগুলো ঝাপসা রেখার মতো ছুটতে থাকলো!
পুলিশের সাইরেন বেজে উঠলো পিছনে!
কিন্তু আজ কেউ তাকে থামাতে পারবে না!
এটা শুধু একটা রেস নয়।
এটা জীবন-মৃত্যু*র রেস!
এটা ফিওনাকে বাঁচানোর রেস!
“আমাকে ক্ষমা করো, হামিংবার্ড…”
আজ আমি এই শহর পুড়িয়ে দেবো, যদি দরকার হয়…
কিন্তু তোমাকে কিছু হতে দেবো না!

গাড়ির টায়ার কেঁপে উঠলো, হেডলাইটের আলো ছিঁড়ে ফেললো রাতের অন্ধকার।
জ্যাসপার এক মুহূর্তও নষ্ট করলো না।
তার চোখ স্ক্রিনে পড়লো— সামনের রাস্তায় একটা হসপিটাল আছে!
তার নখ গেঁথে গেলো স্টিয়ারিংয়ে।
হাসপাতালের সামনে এসে গাড়িটা প্রচণ্ড গতিতে ব্রেক কষলো, টায়ার থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে এলো!
এক মুহূর্তও নষ্ট না করে, জ্যাসপার ফিওনাকে শক্ত করে কোলে তুলে নিলো।
তারপর, ঝড়ের মতো ছুটে গেলো হসপিটালের দরজার দিকে।
ভেতরে প্রবেশ করতেই নিশ্চুপ হসপিটাল যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটালো!

“ডক্টর! নার্স!”
“কেউ আছেন,‌এদিকে আসুন।”
তার গলা এতটাই গভীর আর কম্পমান ছিলো যে, পুরো রিসেপশন থমকে গেলো।
তখনই কয়েকজন ডক্টর ছুটে এলো।
তারা তড়িঘড়ি করে ফিওনাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে দিলো।
নার্সরা তার গায়ে সালাইন লাগাচ্ছে।
ডক্টররা তার পালস চেক করছে।
কিন্তু জ্যাসপারের মনের মধ্যে শুধু একটা চিন্তা— প্রতিশোধ!
“ওরা আমার ফিওনাকে স্পর্শ করেছে…”
একটা শপথ, যা পৃথিবী বদলে দেবে!
এক মুহূর্ত ফিওনার মুখের দিকে তাকিয়ে জ্যাসপার ধীরে ধীরে তার হাত ধরলো।
তার গাঢ় সবুজ চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলতে লাগলো।
সে আস্তে করে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো—
“তোমার এই করুন অবস্থার প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত…”
“আমি তোমার সামনে আমার মুখও দেখাবো না!”
তার কণ্ঠ ছিলো অটল, কঠিন,আর ভয়ংকর।
এক মুহূর্ত থেমে, সে ফিওনার রক্তমাখা কালসিটে ঠোঁটে নরম একটা চুমু দিলো।
তারপর…

পাল্টে গেলো সব!
সে এক মুহূর্তের জন্যও আর দাঁড়ালো না।
ডক্টররা ডাকতে লাগলো—
“মিস্টার! আপনি কোথায় যাচ্ছেন? রক্ত নিতে হবে!”
কিন্তু সে শোনেনি।
একটা ধ্বংসাত্মক আগুন তার ভেতরে জ্বলতে শুরু করেছে!
সে জানে, যতক্ষণ পর্যন্ত তার প্রতিশোধ পূরণ না হয়, সে শান্ত হবে না!
ফিওনাকে যখন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো, ডক্টররা একে অপরের দিকে তাকালো।
কেউ কথা বলছিলো না, কিন্তু সবার চোখে একই প্রশ্ন—
“এটা কি স্বাভাবিক আক্রমণ, নাকি…?”
একজন নার্স ফিসফিস করে বললো, “গলার দাগগুলো দেখেছেন? ঠোঁটের কাটা জায়গাগুলো?”
আরেকজন ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “আমরা পুলিশ না ডাকা পর্যন্ত ট্রিটমেন্ট শুরু করতে পারবো না।”
অন্য একজন মাথা নেড়ে বললো, “তুমি জানো নিয়ম কেমন! এ ধরনের কেসে পুলিশ রিপোর্ট লাগবে, নয়তো আমাদের বিপদ হবে!”
কিন্তু ঠিক তখনই, একজন তরুণ ডাক্তার দৃঢ় কণ্ঠে বললো—

“না! আগে রোগীর জীবন, তারপর নিয়ম!”
একেক ডাক্তার, একেক সিদ্ধান্ত!
ডাক্তারদের কেউ কেউ দ্বিধায় পড়ে গেলো।
পুলিশ ডাকা জরুরি, কিন্তু জীবন বাঁচানো তার চেয়েও বেশি জরুরি!
তরুণ ডাক্তার আরেকবার বললো, “একটা মানুষ মৃ*ত্যুর সঙ্গে লড়ছে,আর আমরা কী করছি? নিয়ম নিয়ে তর্ক করছি?”
বাকিরা তখন রাজি হয়ে গেলো।
“ঠিক আছে, আগে ট্রিটমেন্ট শুরু করি।”
তারা দ্রুত ফিওনার অবস্থা চেক করা শুরু করলো।
ধমনী ঠিকভাবে কাজ করছে কিনা, পালস কেমন চলছে, ফুসফুসে কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা…
কিন্তু তাদের মনে একটা ভয় কাজ করছিলো—
“যদি সত্যিই কিছু ভয়ংকর ঘটে থাকে, তাহলে কি আমরা এটা সামলাতে পারবো?”

ডক্টর লিউ ঝান দ্রুত অপারেশন থিয়েটারের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন।
তার গায়ে সাদা অপারেশন কোট,চোখে গভীর মনোযোগের ছাপ।
সে ইমার্জেন্সি কেস শুনেই ভেতরে ঢুকেছিলো কিন্তু যখন স্ট্রেচারে শুয়ে থাকা মেয়েটির মুখ দেখলো—
সে হঠাৎ থমকে গেলো।
তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
“ফিওনা!”
লিউ ঝানের চোখ বিস্ফারিত হলো।
সে বিশ্বাসই করতে পারছিলো না—
ফিওনা এখানে? এই অবস্থায়?
হাত কাঁপতে শুরু করলো।
নিজের মুখ থেকে মাস্ক খুলে ফেললো, কিছুক্ষণ ফিওনার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো।
তারপর ধীরে ধীরে এক কদম পিছিয়ে গেলো।
“এটা কীভাবে সম্ভব?”
কোটের ভেতরে ফিওনার ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক, গলায় দাগ, ঠোঁটের ক্ষত…
লিউ ঝান যেন পাগলের মতো হয়ে উঠলো। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে আসছে, পুরো শরীর কাঁপছে আতঙ্কে। চোখ দুটো ক্রমশ বিস্ফারিত হয়ে উঠছে, কিন্তু মুখ দিয়ে ঠিকমতো কথা বের হচ্ছে না।
সে ছুটে গিয়ে ফিওনার নিথর শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে দিশেহারা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো,

“কি হয়েছে? কেউ আমাকে বলবে,আমার ফিওনার কী হয়েছে?ওর এই অবস্থা কেনো?”
ডাক্তাররা একে অপরের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লো। তারপর একজন ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলো, “ডক্টর লি, আপনি কি এই রোগীকে চেনেন?”
লিউ ঝানের চোখ চকচক করে উঠলো। ব্যথা, আতঙ্ক আর শোক একসঙ্গে জমাট বেঁধে তার গলায় দলা পাকিয়ে আসছিলো। কণ্ঠ কাঁপতে কাঁপতে সে ফিসফিস করে বললো, “চিনি? ও আমার ফিয়েন্সি… আমার ভালোবাসা… আমার হার্ট।”
তার কথা শেষ হতে না হতেই, পাশের এক নার্স অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, “ডক্টর লিউ… আমার মনে হয়, মেয়েটা… রেইপ হয়েছে।”
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই লিউ ঝান যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গেলো। পা পিছলে গিয়ে ধাক্কা খেলো পাশে রাখা টেবিলের সঙ্গে, চারপাশে যন্ত্রপাতি পড়ে গিয়ে এক বিকট শব্দ তুললো। কিন্তু লিউ ঝান সেসব টেরও পেলো না।
তার চোখ ক্রমশ ফাঁকা হয়ে আসছে, নিঃশ্বাস আটকে আসছে, পুরো শরীর অসাড় হয়ে যাচ্ছে। তবুও সে কাঁপতে কাঁপতে হাত বাড়িয়ে দিলো ফিওনার দিকে। তার আঙুল যখন ফিওনার গলার ক্ষতগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে গেলো, তখন তার শরীর শিউরে উঠলো। ঠোঁটের কোণ দুটো কাঁপছিলো, যেনো কোনো শব্দ বের করার চেষ্টা করছে, কিন্তু শব্দগুলো যেন কণ্ঠনালীতে আটকে গেছে।
তারপর এক অসহায়, ব্যথায় বিদ্ধ কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠলো, “ফিওনা… না! এটা সত্যি হতে পারে না…!”

তার চোখের কোণে জমে থাকা জল একে একে গড়িয়ে পড়লো ফিওনার কপালে, কিন্তু তাতেও যেন কিছু বদলানোর নয়।
লিউ ঝানের দৃষ্টিতে তখনো অন্ধকার ঘনিয়ে আছে, মাথার ভেতর যেন হাজারটা প্রশ্ন ঝড় তুলছে। ব্যথা, ক্রোধ আর অসহায়তা একসঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে তার হৃদয়ের প্রতিটি ধমনীতে। সে একদৃষ্টিতে ফিওনার নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো, তারপর গভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, “ওকে এখানে কে এনেছে?”
ডাক্তাররা একে অপরের দিকে তাকালো, তারপর একজন ধীর স্বরে উত্তর দিলো, “একজন ইয়াং ম্যান। তবে তিনি পেশেন্টকে এখানে রেখে সঙ্গে সঙ্গে চলে গেছেন, যেন খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিলেন।”

লিউ ঝান মুহূর্তেই বুঝতে পারলো—এটা নিশ্চয়ই জ্যাসপার। কিন্তু তার মনের আরেকটা দিক সন্দেহে ভরে উঠলো। যদি জ্যাসপার ওকে হাসপাতালে নিয়ে এসে থাকে, তাহলে ফিওনার এই অবস্থা কে করলো?
তার মুঠি শক্ত হয়ে গেলো, রাগে তার রক্ত যেন ফুটে উঠছে, কিন্তু ফিওনার দুর্বল নিঃশ্বাস তাকে থামিয়ে দিলো। সমস্ত ক্রোধ ভুলে গিয়ে সে ধীরে ধীরে ফিওনার কপালে হাত রাখলো, আঙুল বুলিয়ে দিতে লাগলো তার এলোমেলো চুলের ভেতর দিয়ে।

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২১

তার কণ্ঠ বিষন্ন হয়ে এলো, ফিসফিস করে বললো, “আমি তোমার পাশে আছি, ফিওনা… আমি কিছুতেই তোমাকে হারাতে দেবো না!”
তার চোখের কোণে জমে থাকা জল একফোঁটা করে গড়িয়ে পড়লো ফিওনার গালে, কিন্তু ফিওনা তখনো নিশ্চুপ…।

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৩