আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৩
সাবিলা সাবি
বেইজিংয়ের রাতটা আজ অন্যরকম।হাসপাতালের করিডোর জুড়ে অস্থিরতা।চারদিকে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠছে, রেকর্ডার মাইক্রোফোন এগিয়ে আসছে,আর শিরোনাম হয়ে উঠছে একটাই নাম—
“এলিসন ফিওনা”
হাসপাতালের বাইরে মিডিয়ার ভিড়, পুলিশের ব্যস্ততা,আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ খবর—বিখ্যাত বিজ্ঞানী চেন শিং-এর একমাত্র নাতনী নির্মম নির্যা*তনের শিকার হয়েছেন।
ফিওনার শ্বাস-প্রশ্বাসের অনিয়মিত গতি আর তার মুখের গভীর দাগগুলো সিলিন্ডার লাইটের নিচে ফুটে ওঠে।
লিউ ঝান চোখে গভীর চিন্তাভাবনায় ভরা। তার হাত ঠাণ্ডা, মনও তেমনই। হাসপাতালের কক্ষের মধ্যে এক নীরবতা, যেখানে সময় থেমে গেছে। ফিওনার শরীরের শিরায় এখনও রক্ত চলাচল করছে, তবে তার রক্তমাখা ঠোঁট যেন ভাষাহীন হয়ে পড়েছে।
কিন্তু হাসপাতালের নির্জন কক্ষে,ফিওনার নিস্তেজ দেহের পাশে বসে থাকা ডক্টর লিউ ঝান জানে,সব সত্য এখনো প্রকাশ হয়নি।
সে ফিওনার সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে।
সে জানে ফিওনা পুরোপুরি ধ*র্ষিত হয়নি।
লিউ ঝান দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
একদিকে তার হৃদয়ের ভেতরকার তীব্র যন্ত্রণা,অন্যদিকে দায়িত্বের বোঝা।
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোলো।হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষমাণ পুলিশ ও সাংবাদিকরা তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“ডক্টর লিউ ঝান!মিসেস ফিওনার অবস্থা কেমন?”
সে একটু থামলো, তারপর স্পষ্ট গলায় বললো—
“ফিওনা পুরোপুরি ধর্ষি*ত হয়নি।”
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেলো।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশ,মাইক্রোফোনের সরবতা থেমে গেলো।
পুলিশ অফিসাররা একে অপরের দিকে তাকালেন। মিডিয়া হতবাক।
কিন্তু এর মধ্যেই অন্য কোথাও,হাসপাতালের গোপন কক্ষে, পুলিশের হেফাজতে থাকা সেই দুই বিজ্ঞানী এক ভিন্ন সত্য প্রকাশ করছিলেন।
তারা জানালো—
“লুকিয়ান আর থালাস মানুষ নয়… তারা মনস্টার!”
পুলিশরা অবাক হয়ে গেলো।
“আপনারা কি বলছেন?! এটা অসম্ভব কথা?”
কিন্তু দুই বিজ্ঞানীর চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না।
“আপনারা বিশ্বাস করুন বা না করুন… আমরা যা দেখেছি, তা কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না।”
কিন্তু আপাতত, এই ভয়াবহ সত্য মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করা হয়নি।
এই ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার সত্যের পর্দা এখনো সরানো হয়নি।
আজকের দিনটা অন্যরকম। স্টেলার একাডেমীর মাঠে দাঁড়িয়ে আছে সিলভা, একদিকে রোদ ঝলমল করছে, আর অন্যদিকে কিছুটা অস্থির মন নিয়ে সে সবকিছু দেখছে। হঠাৎ করে ক্যলিক্স এসে তার হাতে কফি ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি কফি খেতে থাকো, আমি তোমার জন্য স্ন্যাকস নিয়ে আসি।”
সিলভা একটু বিরক্ত হয়ে ভাবলো, কড়া রোদে কেউ কিভাবে কফি খায়! কিন্তু কথাটি গলায় আছড়ে পড়লো না, কারণ তার মনটা আজ অন্য কোথাও চলে গেছে। সে কফিটা হাতে নিয়ে খানিক সময় তাকিয়ে থাকলো।
হঠাৎ করেই তার গালে এক ধরনের ঠান্ডা অনুভূতি হলো। সিলভা চমকে উঠে দেখলো, এথিরিয়ন তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ছিল ভেনাসের বিশেষ ফলের জুস, আর সিলভা বুঝতে পারলো—এথিরিয়ন সেই জুসটি তার গালে ধরে রেখেছে।
এথিরিয়ন সোজা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই কড়া রোদে কফি খেতে খেতে,যদি তুমি আরও গরম হয়ে যাও,তাই জুস নিয়ে আসলাম।”
এথিরিয়ন অন্য হাতে সিলভার কফিটি হাতে নিয়ে পাশের জায়গায় ফেলে দিলো,খুব স্বাভাবিকভাবে।সিলভা আবার একটু অবাক হয়ে এথিরিয়নকে দেখলো, মনে মনে ভাবলো, এই ছেলে কীভাবে এত ঠান্ডা মেজাজে এমন কাজ করে!
সিলভা তখন একটু বিরক্তি নিয়ে বললো,”তুমি আমার কফিটা ফেলে দিলে কেনো?আমার বয়ফ্রেন্ড আমার জন্য যা আনবে,আমি সেটাই খাবো।”
এথিরিয়ন হেসে বললো, “তুমি ওকে চান্স দিয়েছো, কিন্তু বয়ফ্রেন্ড বানাও নি। আর ওই প্রথম চান্সেই হেরে গেছে। ও তো তোমার কেয়ার ঠিকভাবে করতেই পারবে না,নাহলে কি আর জুসের বদলে কফি নিয়ে আসে? হাহ, ডাফর ওই শালা!”
সিলভা অবাক হয়ে তাকে দেখলো। তার চোখে একটু মজা আর বিরক্তির মিশেল ছিল। এথিরিয়ন তার কথা বলে যাচ্ছিল, আর সিলভা ভাবছিল, এথিরিয়নের আবার কি হলো?
“তুমি কী বলতে চাও, রিয়ন?” সিলভা একটু ঠাণ্ডা গলায় বললো।
এথিরিয়ন অদ্ভুতভাবে হেসে সিলভার দিকে তাকালো,
“আমি বলতে চাচ্ছি, তোমার না হওয়া বয়ফ্রেন্ড তোমার যত্ন ঠিকভাবে নিতে পারছে না, তবে চিন্তা করোনা আমি আছি।”
সিলভা তখন তার ব্যাগ থেকে একটা কলম বের করে। স্লো মুভমেন্টে, সে জুসের বোতলে কিছু একটা লিখে ফেলে। তারপর সেটা নিয়ে, নির্দিষ্টভাবে এথিরিয়নের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, কোন কথা না বলে চলে যায়।
এথিরিয়ন অবাক হয়ে বোতলটা দেখলো, সেখানে সিলভা লিখেছে:
“আই ডোন্ট ওয়ান্ট ইউর ফাকিং কেয়ার”
তাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে,সিলভা চলে গেছে। এথিরিয়ন কিছু সময়ের জন্য বোতলটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো, মনে মনে ভাবতে লাগলো—সিলভা এমন আচরণ করছে কেনো ?
স্টেলার একাডেমির মাঠে তখনো রোদের কড়া তাপ। এথিরিয়ন চুপচাপ দাঁড়িয়ে, হাতে স্পেশাল জুসের বোতলটা ধরে। সিলভা এক মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকিয়েছিল, তারপর কোনো কথা না বলেই চলে গিয়েছিল।
ঠিক তখনই ক্যালিক্স তড়িঘড়ি করে এসে এথিরিয়নের সামনে দাঁড়াল। চারপাশে তাকিয়ে কিছুটা হতাশ স্বরে বলল,
— “ব্রো, তুমি কি সিলভাকে দেখেছো? মানে, এখানে একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছিলে?”
এথিরিয়ন নির্লিপ্তভাবে এক ঝলক তাকিয়ে বোতলটা ক্যালিক্সের দিকে বাড়িয়ে দিল।
— “হ্যাঁ, সে এখানে ছিল। তোমাকে এটা দিতে বলে গিয়েছে।”
কোনো বাড়তি কথা না বলে এথিরিয়ন তখনই ঘুরে চলে গেল।
ক্যালিক্স প্রথমে একটু অবাক হলো, তারপর জুসের বোতলটা হাতে নিল। বোতলের গায়ে সিলভার হাতের লেখা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে—
“I DON’T WANT YOUR FUKING CARE.”
ক্যালিক্স বোতলের লেখাটা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল, যেন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছে না। বুকের ভেতর কোথাও একটা হালকা ধাক্কা লাগল।
সিলভা কি আসলেই মনে করে যে তার কেয়ার দরকার নেই ? নাকি সে সত্যিই ক্যালিক্সের অনুভূতিগুলো বুঝতে পারেনি?
গভীর শ্বাস নিয়ে ক্যালিক্স মাথা নিচু করল, বোতলটা শক্ত করে ধরল, আর নিজের অজান্তেই ঠোঁট কামড়ে ধরল। আজকের দিনটা কেন যেন আর আগের মতো লাগছে না।
মাউন্টেন গ্লাস হাউজ……
জ্যাসপার কাঁচের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। দূরে আকাশের নিচে পুষ্পরাজ পাহাড়ের অবয়ব অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেখানে আজ আগুন জ্বলবে।
ল্যাবের বিশাল মনিটরে ভেসে উঠছে ক্রাবাথনদের ডিএনএ স্ট্রাকচার, তাদের শক্তির উৎস, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। জ্যাসপার একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। তার আঙুল দ্রুতগতিতে কীবোর্ডের ওপর চলল, কম্পিউটারের স্ক্রিনে একের পর এক অ্যানালাইসিস শেষ হতে লাগল।
“ওরা শক্তিশালী, কিন্তু দুর্বলতাও আছে,” জ্যাসপার নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলল।
— “তাপ এবং আয়নাইজড কার্বন!”
এটাই ছিল তাদের দুর্বলতা। বিশাল শরীর হলেও,অতিরিক্ত তাপে তাদের কোষ পুড়ে যায়,আর আয়নাইজড কার্বন তাদের কোষ বিভাজন বন্ধ করে দিতে পারে।
— “যদি আমি এই দুটোকে একসাথে ব্যবহার করি…”
জ্যাসপার দ্রুত হাতে নতুন একটা অস্ত্র ডিজাইন করল। প্লাজমা ব্লাস্টার যার তাপমাত্রা এক লাখ ডিগ্রির ওপরে যাবে, আর সাথে আয়নাইজড কার্বন বুলেটস, যা তাদের টিস্যুতে ঢুকে ধ্বংস করে ফেলবে।
— “আজকের পর থেকে ক্রাবাথনদের অস্তিত্ব থাকবে না!”
রাতের আকাশ কালো হয়ে আছে,কিন্তু পাহাড়ের বুকে লালচে আলো জ্বলছে।বিশাল বিশাল ক্রাবাথন দানবেরা গর্জন করছে,গুহার মধ্যে আলোছায়ার খেলা।ক্রাবাথনরা বিশেষ ক্যামিকেল ছাড়া মানব রুপ ধরতে পারেনা।
গগগগগগগগগ!
একটা বিকট আওয়াজ হলো,আর মুহূর্তের মধ্যে জ্যাসপার পাহাড়ের ওপর নামল।তার শরীরের চারপাশে একটা শক্তিশালী আগুনের বলয় জ্বলছে,চোখ রক্তিম লাল,হাতে প্লাজমা ব্লাস্টার।
— “ক্রাবাথনরা! আজ তোমাদের শেষ দিন!”
এক ঝলকে জ্যাসপার নিজের অস্ত্র তাক করলো, ট্রিগার টানলো—
শ্বশ্বশ্বশ্ব!
একটা তীব্র লালচে আগুনের ঢেউ বেরিয়ে এলো, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিশাল কয়েকটা ক্রাবাথন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেলো!
পাহাড়ের দানবগুলো চিৎকার করে উঠলো,কেউ কেউ পালানোর চেষ্টা করলো।কিন্তু জ্যাসপার আজ কাউকে ছাড়বে না!
সে ঝাঁপিয়ে পড়লো,কার্বন বুলেটগুলো একের পর এক ছুঁড়তে লাগলো।প্রতিটা বুলেট ক্রাবাথনদের শরীরে বিদ্ধ হচ্ছে,মুহূর্তের মধ্যে ওদের গায়ের শক্ত চামড়া ফেটে যাচ্ছে।
হঠাৎ কয়েকটা বিশাল ক্রাবাথন একসাথে জ্যাসপারের দিকে ছুটে এলো!
— “হাহ! কাম অন!”
জ্যাসপার শ্বাস নিলো, আর সাথে সাথে তার চারপাশে আগুনের ঢেউ তৈরি হলো। বিশাল ঢেউ এক ঝলকে চারপাশের সব দানবকে গ্রাস করে নিলো!
গগগগগগগগগগ!
শেষ চিৎকারের পর সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
জ্যাসপার এবার পাহাড়ের চূড়ায় উঠলো। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো, পুরো পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্রাবাথনের মৃ*তদেহ। আগুনের শিখা পাহাড়ের চূড়ায় লালচে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।
আগুনের শিখা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। বিশাল পাহাড়ের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে ক্রাবাথনদের ছাই হয়ে যাওয়া দেহ। বাতাসে পোড়া কার্বনের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, নিস্তব্ধতায় যেন শূন্যতা জমে আছে।
জ্যাসপার পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালো। চোখ দুটো লালচে জ্বলছে,শ্বাস ধীর কিন্তু ভারী। আগুনের আলোতে তার রূপ যেন আরও ভয়ংকর লাগছে।
সে ধীরে ধীরে আকাশের দিকে মুখ তুলে বলল—
“লুকিয়ান, তোমার মৃত্যু এতোটাও সহজ হবে না!”
তার কণ্ঠস্বর ঠান্ডা, কিন্তু তাতে লুকিয়ে থাকা প্রতিশোধের আগুন অনুভব করা যায়।
সে এক পা সামনে বাড়ালো, আগুনের ছাই মাটিতে চূর্ণ হলো।
“থালাস…”
জ্যাসপার দাঁত চেপে বলল, যেনো সেই নাম উচ্চারণ করাই ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ।
“তোর আর লুকিয়ানের মৃত্যু হবে আমার ফিওনার চোখের সামনে! সে দেখবে, কেমন করে আমি তোদেরকে শেষ করব!”
তার চোখে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। চারপাশের আগুনের শিখাগুলো যেন মুহূর্তেই আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বাতাসে শক্তির কম্পন ছড়িয়ে পড়ল।
“আর মৃত্যুর আগে, তোমরা এমন শাস্তি পাবে… যা তোদের প্রতিটা মুহূর্তে মনে করিয়ে দেবে, কার অস্তিত্বের দিকে হাত বাড়িয়েছিলি!”
সে হাত মুঠো করল, চারপাশের বাতাস থমথমে হয়ে উঠল, আগুনের কণা শূন্যে ভাসতে লাগল।
আজকের রাত শুধু ধ্বংসের রাত নয়, আজকের রাত প্রতিশোধের শুরু।
পুষ্পরাজ পাহাড়ের ধ্বংসস্তূপের মাঝে ধুঁকছিল একমাত্র বেঁচে থাকা ক্রাবাথন।সে এখন মানব রুপে পড়ে আছে কারন মৃত্যুর সময় ক্রাবাথন ক্যামিকেল ছাড়াই মানব রুপে ফিরে আসে।
তার গায়ের আঁশ ধুলোয় মাখা, শ্বাস দ্রুততর হয়ে আসছে। তার চারপাশে শুধু ধ্বংসের চিহ্ন—জ্যাসপারের তাণ্ডবে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে শত শত ক্রাবাথন।
জ্যাসপার ধীর পায়ে এগিয়ে এলো, তার চোখ জ্বলছে নীল আগুনের মতো।
“লুকিয়ান কোথায়?”—তার কণ্ঠে কোনো অনুভূতি নেই, শুধু কঠিন প্রতিশোধের প্রতিধ্বনি।
ধুঁকতে ধুঁকতে ক্রাবাথন হাসল, তার কণ্ঠে ব্যথা আর বিস্ময় মিশে ছিল।
“তুমি… পুরো বংশ শেষ করে দিলে… ড্রাগন প্রিন্স হয়ে ভেনাসের নিয়ম ভেঙে আমাদের হ*ত্যা করলে কেন?”
জ্যাসপার থেমে গেল। তারপর তার শরীর শক্ত হয়ে উঠল, দাঁত চেপে ফিসফিস করল—
“তোদের লিডার লুকিয়ান… আমার ভালোবাসার সাথে যা করেছে… আমার স্ত্রীকে যে নরকের মধ্যে ফেলে দিয়েছে…”
হঠাৎ, এক বজ্রনিনাদের মতো গর্জন করে উঠল সে। পাহাড়ের বাতাস কেঁপে উঠল, মাটির ধুলো উড়ে যেতে লাগল।
“এটা খুবই কম শাস্তি তোদের জন্য! আমি তোদের অস্তিত্বের স্মৃতিও পৃথিবী থেকে মুছে ফেলবো!”
সে সামনে ঝুঁকে এল, তার চোখে নীল আগুন দপদপ করছে।
“লুকিয়ানের শাস্তি হবে ভয়াবহ। সে মরার জন্য আমার কাছে ভিক্ষা চাইবে, কিন্তু আমি তাকে সহজে মরতে দেব না।”
ক্রাবাথনের চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল। এই ড্রাগন প্রিন্স শুধু ধ্বংস করতে আসেনি—সে ন্যায়বিচারের নামে প্রতিশোধের আগুন নিয়ে এসেছে।
জ্যাসপার আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না।ধ্বংসস্তূপের মাঝে পড়ে থাকা শেষ ক্রাবাথনটিকে পেছনে ফেলে,সে দ্রুত আকাশে উঠে গেল।তার চোখে ছিল অদম্য প্রতিশোধের আগুন।
লুকিয়ানের লোকেশন সে পেয়ে গেছে।
রাতের আকাশ কালো মেঘে ঢাকা,আর সেই অন্ধকার চিরে জ্যাসপার এগিয়ে চলল বজ্রের মতো।তার ড্রাগন রূপের ডানা ঝাপটানোর সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল।
এক রাত।
শুধুমাত্র এক রাতের মধ্যে,সে পুরো ক্রাবাথন মনস্টারদের বংশ নিশ্চিহ্ন করে দিল।পুষ্পরাজ পাহাড়ে আর কোনো জীবিত ক্রাবাথন রইল না—শুধু ছাই আর শীতল হয়ে যাওয়া শবদেহের স্তূপ।
কিন্তু এই পৃথিবীতে একটাই কিরাতুর মনস্টার এখনও বেঁচে আছে।
থালাস।
সে লুকিয়ানের ছায়াসঙ্গী, তার শেষ হাতিয়ার।
জ্যাসপার জানে, এই যুদ্ধ এখানেই শেষ নয়। লুকিয়ান আর থালাসকে কঠোর ভাবে ধ্বংস করা বাকি।
“আমি আসছি, লুকিয়ান…”
তার ফিসফিসানো কণ্ঠ রাতের বাতাসের সাথে মিশে গেল, আর সাথে সাথে এক ঝলক নীল বিদ্যুৎ আকাশে জ্বলে উঠল, যেন প্রকৃতিও এই ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে থাকল।
ফিওনার এখনও জ্ঞান ফেরেনি। হাসপাতালের সাদা আলোয় নিস্তব্ধ রাতটাকে আরও নীরব মনে হচ্ছে।লিউ ঝান তার পাশেই বসে আছে, দিন পার হয়ে গেছে। কালকৈ থেকে রাত দিন এক করে দিয়েছে।ফিওনার নিস্তব্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত চোখেও সে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে।
তবে আজ সারারাত জেগে থাকার পর তার শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।একটু জেগে থাকার শক্তি জোগাতে সে কফির কাপের জন্য বের হলো।হাসপাতালের করিডোরে তখন শুধু জ্বলন্ত বাতিগুলোর মৃদু আলো,আর কফি মেশিনের একঘেয়ে শব্দ।
ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ালো ইয়াং জিয়াও।
তার চোখে দ্বিধা, মনে কৌতূহল।কালকে থেকে সে শুধু দূর থেকে দেখেছে,কিন্তু আজ আর চুপ থাকতে পারলো না।
“স্যার, ওই মেয়েটা কে? যার জন্য আপনি এতটা অস্থির?”
লিউ ঝান কফির কাপে চোখ রেখে কিছুক্ষণ চুপ রইল, তারপর এক গভীর শ্বাস নিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল—
“আমার ফিয়েন্সি। আমার ভালোবাসা।”
ইয়াং জিয়াও যেন মুহূর্তের জন্য বোবা হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে জানে, লিউ ঝানের প্রতি তার অদৃশ্য ভালোবাসা কখনও প্রকাশ পায়নি। কিন্তু আজ, এই কথাগুলো শুনে মনে হলো, যেন কেউ অদৃশ্য ছুরির ফলা বসিয়ে দিয়েছে তার হৃদয়ে।
তার চোখে জল চলে এলো, যদিও সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো।
কিন্তু লিউ ঝান জানেই না, ইয়াং জিয়াওর চোখে যে কষ্ট ফুটে উঠেছে, সেটাই প্রমাণ যে সে তাকে কতটা ভালোবাসে।
লিউ ঝান নিজের কফির কাপে মনোযোগ দিলো, আর ইয়াং জিয়াও নীরবে সরে গেলো।
একজনের ভালোবাসা জ্ঞানের বাইরে, আর অন্যজনের ভালোবাসা রয়ে গেল নিরবতার আড়ালে।
ইয়াং জিয়াও পেছন ফিরে ধীর পায়ে চলে যাচ্ছিল। তার হৃদয়ে চাপা কষ্ট, চোখের কোণে লুকানো জল।
কিন্তু ঠিক তখনই—
একটা দমবন্ধ করা গোঙানির শব্দ কানে এলো।
সে দ্রুত ঘুরে তাকায়।
লিউ ঝান তার ডান হাতে পেটের পাশে চাপ দিয়ে রেখেছে। তার মুখ কুঁচকে গেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ব্যথায় পুরো শরীর কেঁপে উঠছে।
ইয়াং জিয়াও মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে গেলো।
“স্যার! কি হয়েছে আপনার?”
সে দৌড়ে এসে লিউ ঝানকে ধরে ফেলে, পাশের চেয়ারে বসিয়ে দেয়। আতঙ্কিত গলায় আবার জিজ্ঞাসা করে,
“কোথায় কষ্ট হচ্ছে? আমি ডক্টরকে ডাকছি!”
লিউ ঝান গভীর শ্বাস নিতে নিতে কষ্টকর কণ্ঠে বলল—
“আই থিংক… অ্যাসিডিটি।”
ইয়াং জিয়াও আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না। সে উঠে দাঁড়ায়, দ্রুত ডাক্তারকে ডাকতে যাবে।
কিন্তু হঠাৎই—
লিউ ঝানের হাত শক্ত করে ওর কব্জি চেপে ধরে।
ইয়াং জিয়াও থমকে দাঁড়ায়।
“এখন যেও না,” লিউ ঝানের কণ্ঠে অসহায়তা আর ক্লান্তির ছাপ।
ইয়াং জিয়াও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
সে ধীরে ধীরে বসে পড়ে লিউ ঝানের পাশে।
লিউ ঝান তখন চোখ বন্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তারপর আস্তে করে মাথাটা ইয়াং জিয়াওর কাঁধে হেলিয়ে দেয়।
ইয়াং জিয়াওর দম বন্ধ হয়ে আসে।
এত কাছাকাছি… এত অপ্রত্যাশিত ভাবে।
তার হৃদয় পাগলের মতো ধুকপুক করতে থাকে, কিন্তু সে নড়তে পারে না।
হয়তো এই মুহূর্তটা শুধুই কিছুক্ষণের জন্য…
হয়তো লিউ ঝান অন্য কাউকে ভালোবাসে…
তবুও, এই মুহূর্তটাকে সে ধরে রাখতে চায়।
কিছুক্ষণের জন্য হলেও সে লিউ ঝানের কাছে থাকার অনুমতি পেয়েছে।
প্রাসাদের রাজকীয় করিডোর ধরে ধীর পায়ে হেঁটে এথিরিয়ন ফিরে এল। বাইরে আকাশে তারাগুলো জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু তার মনের ভেতর গভীর অন্ধকার। কিছু একটা যেন বুকের ভেতর শূন্যতা তৈরি করেছে, অথচ সে বুঝতে পারছে না ঠিক কী।
কিচেন থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। থারিনিয়াস আর আলবিরা একসঙ্গে কিছু একটা রান্না করছে। কাঁচের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলো—আলবিরা কোনো একটা নতুন রেসিপি নিয়ে ব্যস্ত, আর থারিনিয়াস মজার ছলে ওর পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করছে। রাজপ্রাসাদের পরিবেশে আজ এক ধরনের উষ্ণতা ছড়িয়ে আছে, কিন্তু এথিরিয়নের মন যেন সেখানে নেই।
সে নিঃশব্দে দরজার ফ্রেমে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার দৃষ্টি কিচেনের উজ্জ্বল আলোর দিকে থাকলেও, মন যেন অন্য কোথাও আটকে আছে—একটি মুখ, একটি নাম, একটি অদ্ভুত অনুভূতি… সিলভা।
কেন জানি আজ তার সবকিছু এলোমেলো লাগছে। অথচ সে তো এমন ছিলোনা, সিলভার জন্য সে ছিলো অনুভূতিহীন, শক্তপোক্ত, আগুনের মতো তেজস্বী। তাহলে আজ এই অস্থিরতা কেন?
তার ভিতরে কিছু একটা ভাঙছে, কিন্তু এথিরিয়ন জানে না—এই ভাঙনটাই হয়তো ভালোবাসার প্রথম ধাপ।
ডাইনিং টেবিলের চারপাশে এক ধরনের অদৃশ্য অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। সোনালি ঝাড়বাতির আলোয় টেবিল জুড়ে সাজানো রাজকীয় খাবারগুলোর দিকে কারও মন নেই।
এথিরিয়ন নিঃশব্দে তার কাঁটাচামচ দিয়ে থালার উপর আঁচড় কাটছে, কিন্তু খাবারের দিকে কোনো আগ্রহ নেই। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
অ্যাকুয়ারা একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো। এরপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে সরাসরি বলেই ফেললো, “রিয়ন, কি হয়েছে তোর? তুই আজ অদ্ভুত দেখাচ্ছিস।”
এথিরিয়ন চমকে উঠে যেন বাস্তবে ফিরে এলো। মাথা নিচু করে বললো, “তেমন কিছু না… জ্যাসু ভাইয়ার কথা ভাবছিলাম। তারা এখন কী করছে?”
থারিনিয়াস তখন গম্ভীর গলায় বললো, “অদ্ভুত বিষয়, আজকে মাউন্টেন গ্লাস হাউজের ল্যাবে প্রবেশ করেছিলো প্রিন্স।কিন্তু হঠাৎ ওখানে কেন গেলো?”
আলবিরা চিন্তিত হয়ে বললো, “কিছু একটা হয়েছে,যেটা আমরা বুঝতে পারছি না। আমার মনে হয়,আমাদের পৃথিবীতে যাওয়া উচিত।”
থারিনিয়াস দ্রুত মাথা নেড়ে বললো, “না না! প্রিন্স অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত আমরা যেতে পারবো না। আমাদের হুট করে যাওয়া হয়তো আরও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।”
এথিরিয়ন চুপচাপ বসে থাকলো। চোখের সামনে যেন ভেসে উঠলো সেই মুহূর্ত—জ্যাসপার একা, ভয়ানক কিছু করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে…
তার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছে। সে জানে, কিছু একটা খুব শীঘ্রই ঘটতে চলেছে।
এই খবরটা পুরো চীনের মিডিয়াতে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্র,আর সোশ্যাল মিডিয়ার শিরোনামে এখন একটাই নাম—এলিসন ফিওনা।
“বেইজিংয়ের বিখ্যাত বিজ্ঞানী মিস্টার চেন শিং-এর একমাত্র নাতনী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার!”
“হাজবেন্ডের সামনেই…!”
খবরটা দেখার পর চেন শিং-এর হাত থেকে কাচের গ্লাস ছিটকে পড়ে,মেঝেতে আছড়ে ভাঙলো। মুহূর্তের মধ্যে তার বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিলো।
“না… এটা হতে পারে না…”
তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে আসছে। হার্টের ব্যথাটা যেন ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।
মিস ঝাং পাশের ঘর থেকেই ছুটে এলো।
“মিস্টার চেন শিং,আপনি ঠিক আছেন?”
তার দৃষ্টি দ্রুত টিভির স্ক্রিনের দিকে গেলো,যেখানে ফিওনার ছবি ভেসে উঠছে,আর সংবাদপাঠক ভয়াবহ বিস্তারিত জানাচ্ছে।
মিস ঝাং হতভম্ব হয়ে গেলো।
“এটা… এটা কীভাবে সম্ভব?”
চেন শিংয়ের হাত কাঁপছে। তাঁর চোখের সামনে যেন সমস্ত পৃথিবী ঘোলা হয়ে যাচ্ছে। তিনি কেবলই ফিওনার ছোটবেলার সেই হাসিখুশি মুখটা দেখতে পাচ্ছেন।
“ফিওনা…”
আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। বুক চেপে ধরে ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন।
সংবাদমাধ্যমের শেষ আপডেটে জানানো হলো—এলিসন ফিওনা বর্তমানে বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তাকে বাঁচানোর জন্য।
“এই মুহূর্তে তার চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন চীনের অন্যতম প্রতিভাবান ডাক্তার লিউ ঝান,যে একসময় ফিওনার ফিয়েন্সি ছিলেন।”
এই ঘোষণার পর মিডিয়া জগতে যেন নতুন করে আলোড়ন উঠলো।
“ফিওনার প্রাক্তন ফিয়েন্সি? তাহলে কি লিউ ঝানই ফিওনার প্রকৃত ভালোবাসা ছিলেন?”
“ফিওনার বর্তমান হাজবেন্ড কোথায়? কেনো সে তার স্ত্রীকে বাঁচাতে আসেনি?”
চেন শিং আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারলেন না।
“আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো! এখনই!”
মিস ঝাং দ্রুত চেন শিং-এর ওষুধ আর জ্যাকেট নিয়ে এলেন।
“স্যার, আপনার শরীর দুর্বল, আপনি এখন বের হতে পারবেন না!”
কিন্তু চেন শিং থামলেন না।
“আমার নাতনিকে একবার দেখতে হবে! তার পাশে থাকতে হবে!”
অন্যদিকে, হাসপাতালের কোল্ড করিডোরের এক কোণে ইয়াং জিয়াওর পারে বসে থাকা লিউ ঝান।
তার চোখ লাল, ক্লান্তিতে ভরা।সে গত চব্বিশ ঘণ্টা ফিওনার জন্য লড়াই করে গেছে যার ফলস্বরূপ খাওয়া ঘুম ঠিকমতো না করে তার অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দিয়েছে।কিন্তু তার হৃদয়ের ভেতরেও ঝড় বইছে।
“ক্যামেলিয়া, তুমি কি সত্যিই আমার কাছে ফিরে এসেছো?”
তার হাতের মুঠোয় রাখা ছোট্ট আংটিটা শক্ত করে ধরলেন।
সে জানে,এটা কেব চিকিৎসা নয়…এটা তার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার সাথে নতুন করে দেখা হওয়ার মুহূর্ত…
রাত গভীর, তবে এথিরিয়নের চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে থেকেও তার মন কোথাও অন্য কোথাও আটকে আছে। বাইরে চাঁদের আলো জ্বলজ্বল করছে, বাতাসে এক ধরনের অস্থিরতা ভেসে বেড়াচ্ছে। থারিনিয়াস, আলবিরা আর অ্যাকুয়ারা পাশের ঘরে নতুন একটা গেম নিয়ে মেতে আছে, কিন্তু এথিরিয়ন তাদের কোনো কথাই শুনছে না।
তার বুকের ভেতর এক অজানা টান। সিলভাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।
এক মুহূর্তও দেরি না করে সে উঠে দাঁড়ালো। নিঃশব্দে বারান্দার দরজা খুলে আকাশের দিকে তাকালো। চাঁদের আলোতে তার রুপালী ড্রাগন-ডানাগুলো ঝলমল করে উঠলো। তারপর এক লাফে আকাশে উঠে গেলো, দ্রুত গতিতে উড়ে গেলো সিলভার ঘরের দিকে।
বারান্দার রেলিংয়ে নেমে এলো নিঃশব্দে। ভেতরে উঁকি দিতেই দেখলো, সিলভা ল্যাপটপে কারো সাথে কথা বলছে।
একটা ছেলের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো স্পিকারে থেকে—
“তুমি কি এখনই ড্রেসটা পরে দেখাতে পারবে?”
এথিরিয়নের চোখ কুঁচকে উঠলো।
সিলভা মিষ্টি হেসে বললো, “ওয়েট, আমি তোমাকে ড্রেসটা পরে দেখাচ্ছি।”
এথিরিয়নের শরীরটা যেন মুহূর্তেই পাথর হয়ে গেলো।
সিলভা ল্যাপটপ বন্ধ করলো, তারপর আলমারি খুলে একটা সুন্দর পোশাক বের করলো। এথিরিয়ন তখনও বারান্দার কোণ থেকে তাকিয়ে আছে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে।
পরবর্তী মুহূর্তে যা ঘটলো, সেটা সে একেবারেই আশা করেনি।
সিলভা নিজের গায়ের জামা খুলতে শুরু করলো।
এথিরিয়নের পুরো শরীর জমে গেলো। চোখ বড় হয়ে গেলো, তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিজের চোখে হাত চাপা দিলো আর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালো।
তার মনে হলো যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো শরীরজুড়ে।
এই মুহূর্তে পালিয়ে যাওয়া উচিত, কিন্তু পা নড়ছে না।
তার মাথার ভেতর একটা অস্থিরতা দানা বাঁধছে। বুকের ভেতর প্রচণ্ড রাগ, বিরক্তি, কিংবা অন্য কোনো অনুভূতি ঝড় তুলছে—যার নাম সে নিজেও জানে না।
ক্যালিক্সের জন্য সিলভা পোশাক পরে দেখাবে?
তার রক্ত যেন ফুটতে শুরু করলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “অন্য কারো জন্য সাজবে, সিলভা?”
কিন্তু তার কথার আওয়াজ এতটাই চাপা ছিলো যে কেউ শুনতে পেলো না।
আধা চোখে সে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে একটু দেখে নিলো। সিলভা সম্পূর্ণ নতুন ড্রেস পরেছে, তার কোমল ত্বকে স্নিগ্ধ ফ্যাব্রিক ভাসছে, যা তাকে এক অনন্য রূপে পরিণত করেছে। সেই অফ-শোল্ডার ড্রেসে সিলভা আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠলো। আর তখনই এথিরিয়নের রাগ বেড়ে গেলো। তার অন্তরের গহীনে এক ঝড় শুরু হয়ে গেলো।
“একবার সুযোগ পেলেই তোকে আমার সামনে একশটা ড্রেস পরিয়ে ছাড়বো। সেকেন্ড সেকেন্ডে একটা করে ড্রেস পড়ে আসবি আমার সামনে,” এথিরিয়ন মনে মনে ভেবে ফেললো।
এথিরিয়ন নিজেকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু তার মনে এক অদ্ভুত আগ্রহ আর জ্বলন্ত রাগ নিয়ে,সে সিলভার প্রতি তার আকর্ষণকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারলো না।
মাঝরাতে, জ্যাসপার নিঃশব্দে হসপিটালে প্রবেশ করলো, তার চোখে এক অদৃশ্য তেজ। হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে যখন সে রিসিপশনের কাছে গিয়ে ফিওনার কক্ষের বিষয়ে জানতে চাইলো,তখন রিসিপশনিস্ট ভয়ে একটু পিছিয়ে গিয়ে বললো,
“স্যার, ডক্টর লিউ ঝান-এর অনুমতি ছাড়া ওই পেশেন্টের প্রবেশ নিষেধ।”
এই কথাটি শোনার পর, জ্যাসপারের চোখে মুহূর্তের জন্য রাগের শিখা জ্বলে উঠলো। তার মনোভাব একেবারে বদলে গেলো, যেন কিছুতেই তাকে থামানো যাবে না। কোনো কথার তোয়াক্কা না করে, সে হন্তদন্ত হয়ে করিডোরে পা বাড়ালো। তার পদক্ষেপের আওয়াজ কেবল বাতাসে মিলিয়ে যেতে, কিন্তু তার উপস্থিতি যেন পুরো হাসপাতালটাকেই চাপিয়ে দিয়েছিল।
রিসিপশনিস্ট হঠাৎ তাকে ডাকার চেষ্টা করলো, “স্যার, দয়া করে থামুন!” কিন্তু তার কণ্ঠস্বর যেন কেবল অদৃশ্য বাতাসে হারিয়ে গেলো। জ্যাসপার এক মুহূর্তও পেছন ফিরে তাকালো না, যেন পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারবে না।
ফিওনার কেবিনে ঢোকার আগে, হঠাৎ করেই জ্যাসপারের সামনে লিউ ঝান এসে দাঁড়ালো।করিডোরের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো,দুটি বিপরীত শক্তির সংঘর্ষ হতে যাচ্ছে।লিউ ঝান তার পথে একদম অবরোধ সৃষ্টি করে দাঁড়িয়ে রইল।
জ্যাসপার তার চোখের কোণে এক ঝলক রাগের অনুভূতি অনুভব করতে পারছিলো,কিন্তু সে নিজেকে ধরে রেখে সোজা দাঁড়িয়ে বললো, “ফিওনা এখন কেমন আছে?”
লিউ ঝান কঠোর গলায় উত্তর দিলো, “ওর খবর তোকে জানতে হবেনা। তুই তো ওকে হসপিটালে রেখেই চলে গেছিস।”
জ্যাসপার স্নিগ্ধভাবে তার কথা উপেক্ষা করে, আরো দৃঢ়ভাবে বললো, “ এসব কথা ছাড়, আমার ফিওনা কেমন আছে, সেটা বল।”
লিউ ঝান কিছুক্ষণ নীরব থাকলো, তারপর ঠান্ডা গলায় বললো, “ও এখন সুস্থ, অবজারভেশনে আছে।”
জ্যাসপার আরেকবার কেবিনে ঢুকতে চাইলে, লিউ ঝান তাকে আটকে দিয়ে সতর্কভাবে বললো, “তুই ওকে দেখতে পারবি না। তুই ফিওনাকে সেইফ রাখতে পারিসনি। তোর কাছে ফিওনা সেইফ না। তোর ছায়াটাও ওর জন্য বিপদজনক। তাই ওর থেকে দূরে থাক।”
এই কথা শোনার পর, জ্যাসপার এক মুহূর্ত চুপ থেকে তার গলা চেপে ধরে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করলো। তার চোখে এক ঝলক টান টান উত্তেজনা ফুটে উঠেছিলো, কিন্তু তার মুখে কোনো অনুভূতি প্রকাশ হলো না। সে যেন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না, তার মন আর মনোভাব দুইটি ভিন্ন পথে ছুটছিল। কিন্তু লিউ ঝানের কথায় ও একটি কঠিন সতর্কবার্তা ছিলো, যা তাকে আরও বিভ্রান্ত করে তুললো।
জ্যাসপার তার পায়ের নিচে শক্ত করে দাঁড়িয়ে বললো, “ওকে আমি দেখবো, এটা আমার অধিকার। তুই কী ভাবছিস, আমাকে ভয় দেখাবি?”
লিউ ঝান শুধু শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তার চোখে কোনো সাড়াশব্দ ছিল না।
জ্যাসপার যখন লিউ ঝানকে এখন ও চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল তখন তার গায়ের প্রতিটি রন্ধ্রে উত্তেজনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠলো। তার রাগ আর বিরক্তি একসাথে মিশে গেল,কিছুটা তড়িঘড়ি করেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো, “তুই যদি আমাকে এই মুহূর্তে বাধা দিস, আমি নিজের আসল রূপে এসে এক মুহূর্তে পুরো হসপিটাল তছনছ করে দিবো।”
লিউ ঝান কিছুটা হতবাক হলো,তার চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। সে জানতো, জ্যাসপার যেসব কথা বলছে, সেগুলো একেবারে বাস্তবে পরিণত করবেই। ষতার চেহারার মধ্যে একটা চাপা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়লো,সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর সরে দাঁড়ালো।
জ্যাসপার তীক্ষ্ণ এক দৃষ্টিতে লিউ ঝানকে উপেক্ষা করে, গম্ভীর মনোভাব নিয়ে ফিওনার কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। তার শরীরের প্রতিটি ধমনীতে এক ধরনের শক্তি আর উত্তেজনা বোঝাচ্ছিল, সে এক মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবেশটিকে পাল্টে দিতে পারতো।
তার ধৈর্যের সীমা ছিল না আর সে নিজের ফিওনার কাছে যাবে আর এমন কোনো শক্তি থাকবে না যে তাকে বাধা দিবে, এভাবেই সে একে একে পথের সব বাধা ভেঙে ফেলবে।
ফিওনাকে শুয়ে থাকতে দেখে জ্যাসপারের বুকটা ভারী হয়ে উঠলো। তার চোখে এক অদ্ভুত অন্ধকার নেমে এল।ফিওনার হাতে ক্যানোলা আর মুখে অক্সিজেন মাস্ক ছিল।সমস্ত হাসপাতালের নিস্তব্ধতা ছেদ করে জ্যাসপার ধীরে ধীরে ফিওনার কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।প্রতিটি পা যেন মাটি থেকে তার আস্থা কেড়ে নিচ্ছিল।একে একে প্রতিটি মুহূর্ত তার চোখের সামনে ঝাপসা হতে থাকলো,আর সে অনুভব করলো, এই সময়টা যেন চিরকালীন হয়ে গিয়েছে।
ফিওনার দিকে একপলক তাকিয়ে,তার হৃদয়ের গভীর থেকে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হয়ে এলো।জ্যাসপার তাড়াহুড়ো না করে,ধীরে ধীরে ফিওনার হাতের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।তার চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি ছিল,তার চোখ শত শত কথা বলছিল কিন্তু কোনো শব্দ ছিল না।
ফিওনার বেডের সামনে চেয়ারে বসে থাকলো জ্যাসপার। চোখে কষ্ট আর উদ্বেগের ছায়া। নিস্তব্ধ হাসপাতালের পরিবেশে তার শরীর যেন একের পর এক অসহ্য যন্ত্রণার বোঝা বহন করছে। ফিওনার ক্যানোলা দেয়া হাতটা সে নরম হাতে ধরল, যেন শীর্ণ আর দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও, এক অদৃশ্য শক্তি তাকে ফিওনার কাছেই রাখছে।
হাতের ওপর একমুহূর্তের জন্য হাত রেখে, সযত্নে সে মাথাটা বেডের ওপর রাখা ফিওনার হাতের কাছে নিয়ে এল। যেন, জীবনের সব চাওয়া-পাওয়ার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো এই মুহূর্তটুকু—ফিওনাকে আবার সুস্থভাবে দেখতে পাওয়া। জ্যাসপার গভীর দৃষ্টি দিয়ে ফিওনার মুখের দিকে তাকালো, তারপর মাথা অবলীলায় ফিওনার হাতের ওপর রাখলো। তার চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠলো, কিন্তু সে কিছুই বললো না। যেন, শব্দে কিছুটা অসম্পূর্ণতা ছিল, যা কেবল তার হৃদয় বুঝতে পারতো।
আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২২
ব্রেকিং পয়েন্ট ছিল, এক মুহূর্তের জন্য যেন এই পৃথিবী থেমে গিয়েছিল।জ্যাসপার গভীরভাবে নিঃশ্বাস ফেললো, আর চোখে চোখ রেখে, বেডের সাইডে থাকা ফিওনার হাতকে একটিবার জড়িয়ে ধরে।
আর কিছুটা সময়ের জন্য নিজেকে ভেঙে ফেললো। চোখে একে একে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকলো,প্রতিটি অশ্রু তার হৃদয়ের এক টুকরো যন্ত্রণা বহন করছে।
ফিওনার হাতের ওপর একে একে রক্তবর্ণ অশ্রুগুলি পড়তে লাগলো,তার শরীরের প্রতিটি কোণে বেদনা ছড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সে কিছু বললো না,শুধুমাত্র নিজের অশ্রু দিয়ে তার শোক আর গভীর ভালবাসা প্রকাশ করলো।
