Home আযদাহা সিজন ২ আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৪

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৪

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৪
সাবিলা সাবি

হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোরে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো জ্যাসপার।জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের ফিকে আলো ফিওনার বিছানার ওপর পড়ে আছে,তার মুখের নিস্তেজ ছায়াগুলোকে আরও কোমল করে তুলেছে।তার হাত এখনো ক্যানোলায় বাঁধা,নিঃশ্বাসের ওঠানামা স্থির,কিন্তু জ্যাসপার জানে—এই নীরবতার আড়ালে যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে।
চেয়ারে বসে ছিল অনেকক্ষণ।একবার ফিওনার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল,খুব ধীরে।সেই উষ্ণতা অনুভব করল,যা তার নিজের ছিল না,কিন্তু যেটাকে সে আগলে রাখতে চায়। কিন্তু এখনই সে তা পারবে না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।লুকিয়ান আর থালাস এখনো বাকি—তাদের খুঁজে বের করতেই হবে।তার মন বলছিল,ফিওনাকে এভাবে রেখে যাওয়া উচিত নয়। তবু, এই প্রথমবারের মতো সে স্বেচ্ছায় ফিওনাকে লিউ ঝানের কাছে রেখে যেতে রাজি হলো। হয়তো পরিস্থিতির চাপে, অথবা নিজের একগুঁয়েমির বিরুদ্ধেই হার মেনে—কিন্তু আজ, এক দিনের জন্য হলেও, সে মেনে নিলো যে ফিওনা লিউ ঝানের হেফাজতে নিরাপদ।
চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত থমকালো জ্যাসপার,নিজের মনের দ্বিধা সরিয়ে ফেলতে চাইলো।তারপর আর একবারও ফিরে তাকাল না।নিঃশব্দে,রাতের ছায়ার মতো হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেলো সে—তার মিশনের পথে,অন্ধকারের দিকে।

ক্যান্টিনের টেবিলে হাত রেখে বসে আছে সিলভা। তার সামনে কফির কাপ, কিন্তু তাতে এখনো এক চুমুকও দেওয়া হয়নি। পাশে বসে আছে তার বন্ধুরা, আর সামনেই ক্যালিক্স—চোখেমুখে চাপা উত্তেজনা আর একটু অস্থিরতা।
আজ শেষ পরীক্ষা। চারপাশে বিদায়ের আবহ, হাসি-ঠাট্টার মধ্যেও এক ধরনের শূন্যতা। কিন্তু ক্যালিক্সের মন ভালো নেই। সে সোজা সিলভার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি এখানে ভর্তি হবে? স্টেলার ইউনিভার্সিটিতেই থাকতে চাও?”
সিলভা এক মুহূর্ত কিছু বলল না, শুধু কফির কাপটা নাড়ল। ক্যালিক্স একটু হেসে বলল, “আমার জন্য না, ভুল বোঝো না। আমি শুধু চাই তুমি আমাদের সবার সাথে থাকো।”
বন্ধুরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল, কিন্তু ক্যালিক্সের চোখে ছিল অন্য এক রকম প্রশ্ন। একটু চুপ থেকে সে হঠাৎই বলল, “সিলভা, তুমি কি আমাকে নিয়ে কিছু ভেবেছো? মানে…” সে একটু থেমে নিল, তারপর সরাসরি বলেই ফেলল, “তুমি কি আমার গার্লফ্রেন্ড হবে?”
চারপাশের কোলাহল মুহূর্তেই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সিলভা তাকিয়ে রইল ক্যালিক্সের চোখের দিকে—সেখানে অপেক্ষা, আশা, আর একরাশ অনিশ্চয়তা। সে এবারো কোনো উত্তর দিল না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি…আরও সময় চাই।”

ক্যালিক্স ছোট একটা হাসি দিল, যেন সে এই উত্তরটাই আশা করেছিল। কিন্তু তার চোখের গভীরে একটুখানি হতাশা লুকিয়ে ছিল, যা শুধু সিলভাই দেখতে পেল।
ক্যান্টিনের আলোচনায় এবার নতুন একটা পরিকল্পনা তৈরি হলো। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল, আজ রাতে ফ্লোরাস রাজ্যে সিলভার কক্ষে বসে গ্রুপ স্টাডি করবে। পরীক্ষার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি,বিশেষ করে প্র্যাকটিক্যাল বিষয়গুলো একসাথে রিভিশন দেওয়ার জন্য এটা খুব দরকারি।
ক্যালিক্স, এলেনা, মারিয়ান সহ সবাই বেশ উত্তেজিত।কিন্তু সিলভা এক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়ে গেল।তার পরিবারের নিয়ম এতটাই কঠোর যে,রাজপ্রাসাদে কখনো এভাবে বন্ধুদের নিয়ে গ্রুপ স্টাডি হয়নি।
সিলভা একটু ইতস্তত করে বলল, “আমি ঠিক জানি না এটা সম্ভব হবে কিনা… আমার বাবা রাজা জারেন বা ফুপি লিয়ারা অনুমতি দেবেন কি না!”
ক্যালিক্স হেসে বলল, “তুমি যদি বলো, তাহলে নিশ্চয়ই অনুমতি পাবে। আরে, স্টাডি ছাড়া তো আমরা অন্য কিছু করতে যাচ্ছি না!”
এলেনাও উৎসাহ দিল, “তোর ফ্যামিলি তো সবসময় চায় তুই সেরা হস। এই গ্রুপ স্টাডি তো তোর জন্যই ভালো!”
সিলভা এবার একটু হাসল, “ঠিক আছে, আমি প্রাসাদে ফিরে বাবার অনুমতি নিয়ে নেব। যদি উনি রাজি হন, তাহলে সবাইকে ইমেল করে জানিয়ে দেব।”
সবার মুখে তখন উচ্ছ্বাসের ঝলক। ফ্লোরাস রাজ্যের মতো জাঁকজমকপূর্ণ জায়গায় গিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ তো জীবনে একবারই আসে! তবে সিলভার মনে এখনো একটু শঙ্কা—বাবা কি সত্যিই এই অনুমতি দেবেন?

হাসপাতালের করিডোরে দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে গেলেন মিস্টার চেন শিং আর মিস ঝাং। রাতের অন্ধকারে খবরটা পাওয়ার পর থেকে তারা যেন স্বস্তিতে শ্বাসই নিতে পারছিলেন না। তাদের চোখের মণি, তাদের একমাত্র পরিবার—ফিওনা—এভাবে আক্রান্ত হয়েছে, এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না চেন শিং।
কেবিনের দরজা খুলতেই ফিওনাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখলেন তিনি। সাদা চাদরের নিচে নিষ্প্রাণ লাগছে মেয়েটাকে। তার হাতে ক্যানোলা লাগানো, মুখে অক্সিজেন মাস্ক। ফিওনার এমন অবস্থা দেখে চেন শিংয়ের বুক ফেটে যাচ্ছিল। তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ফিওনার মাথায় হাত রাখলেন।
চোখের জল আর আটকে রাখতে পারলেন না। ভেঙে পড়লেন কান্নায়। “আমার ছোট্ট ফিওনা… আমার নাতনীটাকে এভাবে দেখতে হবে, এটা কখনো কল্পনাও করিনি…”
মিস ঝাং একপাশে দাঁড়িয়ে নির্বাক হয়ে দেখছিলেন। তিনিও চোখের কোণ মুছে নিলেন।
লিউ ঝান পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার মুখ গম্ভীর।সে বুঝতে পারছিলেন চেন শিংয়ের মনের যন্ত্রণা। একটু পরে নরম কণ্ঠে বললো, “গ্ৰ্যান্ড চেন, চিন্তা করবেন না। ফিওনার পুরোপুরি ক্ষতি হয়নি। ও এখন শঙ্কামুক্ত।”
চেন শিং এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। লিউ ঝানের কথা শুনে যেন বুকের ওপর রাখা একটা ভার নেমে গেল। তবে ব্যথা পুরোপুরি কমল না। তিনি ফিওনার হাতটা ধরে বললেন, “যে-ই এটা করুক, আমি তাকে ছাড়ব না…!”
কেবিনের বাতাসটা যেন ভারী হয়ে উঠল। নিঃশব্দে শুয়ে থাকা ফিওনার নিঃশ্বাসের শব্দই কেবল শোনা যাচ্ছিল।

চেন শিং গভীর দৃষ্টিতে লিউ ঝানের দিকে তাকালেন। কণ্ঠ গম্ভীর, অথচ স্থির, “জ্যাসপার আসেনি?সে এখন কোথায়?”
লিউ ঝান কিছুটা বিরক্ত স্বরে উত্তর দিলো, “কাল রাতে একবার এসেছিল। ভোর হওয়ার আগেই চলে গেছে। সেদিনও হাসপাতালে রেখেই চলে গিয়েছিলো। কতটা কেয়ারলেস হতে পারে একজন! ওর জন্যই তো ফিওনার এই অবস্থা। ওর শত্রুরাই ফিওনার এই অবস্থা করেছে!”
চেন শিং চুপ করে রইলেন। তার মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটল না। তবে তার চোখের গভীরে এক ধরণের বোঝার স্পষ্টতা ছিল। তিনি জানতেন, লিউ ঝান যা বলছে, তা পুরোপুরি সত্যি নয়।
জ্যাসপার কখনোই ফিওনাকে এই অবস্থায় একা ফেলে রেখে যাওয়ার পুরুষ নয়। সে যদি চলে গিয়ে থাকে, তবে নিশ্চয়ই এর পেছনে বড় কোনো কারণ আছে।
চেন শিং চোখ নামিয়ে ফিওনার দিকে তাকালেন। শুয়ে থাকা মেয়েটির মুখ শান্ত, অথচ ক্লান্ত লাগছিল। তিনি ধীরে ধীরে ফিওনার হাতের পাশে নিজের হাত রাখলেন। মনে মনে বললেন, “জ্যাসপার নিশ্চয়ই কিছু একটা করছে। ফিওনার এই অবস্থা যারা করেছে, তাদের ও ছেড়ে দেবে না।”
তিনি জানতেন, জ্যাসপার বরাবরই আগুনের মতো—নির্মম, ধ্বংসাত্মক, কিন্তু যাকে ভালোবাসে, তার জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। তিনি কাছ থেকে দেখেছেন, মাউন্টেন গ্লাস হাউজে থাকাকালীন কীভাবে জ্যাসপার ফিওনার প্রতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছিলো।সে ফিওনাকে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান ধন মনে করে।
চেন শিং গভীর শ্বাস নিলেন। জ্যাসপার হয়তো কোনো ভয়ঙ্কর ঝড়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আকাশের নরম নীল রঙ মিশে যাচ্ছে গোধূলির লালচে আভায়।এল্ড্র রাজ্যের বাগানের পাশের লেকের ধারে বসে আছে থারিনিয়াস আর আলবিরা। বাতাসে হালকা শীতলতা, গাছের পাতা মৃদু কাঁপছে।
আলবিরা পানির দিকে তাকিয়ে হাসলো, “এখানে বসলে আমার কেমন যেনো শান্তি লাগে।”
থারিনিয়াস এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো, চোখের গভীরে এক ধরনের নরম উষ্ণতা। সে হালকা হেসে বললো, “শান্তি? নাকি আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার ভালো জায়গা?”
আলবিরা ভ্রু কুঁচকে তাকালো, “তুমি তো অনেক কনফিডেন্ট!”
থারিনিয়াস কাঁধ ঝাঁকালো, “আমি তো জানি, তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবো না।”
আলবিরা ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপার চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। “তুমি সবসময় এমন কেনো? একটু রোমান্টিক হতে পারো না?”
থারিনিয়াস হেসে আলবিরার দিকে ঝুঁকে এলো। আলবিরার হৃদস্পন্দন একটু বেড়ে গেলো, চোখ বড় হয়ে তাকালো তার দিকে।

“রোমান্টিকতা যদি চাও, তবে আমার চোখে তাকাও, আলবিরা,” থারিনিয়াস ধীরে ধীরে বললো, তার কণ্ঠ গভীর আর মাদকতাময়। “কারণ আমার পুরো ভেনাস শুধুই তোমার চোখে ধরা দেয়।”
আলবিরা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। ঠান্ডা বাতাসও যেনো তাদের মাঝে গাঢ় উষ্ণতা ছড়িয়ে দিলো। থারিনিয়াসের কথাগুলো তার হৃদয়ের ভেতর নরমভাবে আঘাত করলো।
সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে থারিনিয়াসের আঙুল ছুঁলো। থারিনিয়াস তার হাত আলতো করে ধরলো, তারপর একদম কাছে এনে বললো,
“তুমি চাইলে আমি হাজার বছর এইভাবেই তোমার হাত ধরে বসে থাকতে পারি। শুধু বলো, তুমি কি আমায় থামতে বলবে?”
আলবিরার ঠোঁটে ধীরে ধীরে এক মিষ্টি হাসি ফুটলো। বাতাসে ঝিরঝিরে কাঁপা শব্দের মাঝে শুধু তাদের নীরবতা কথা বললো।
আলবিরার হৃদস্পন্দন থরথর করে কাঁপছে। থারিনিয়াসের গভীর দৃষ্টি তাকে যেনো বশ করে ফেলেছে। বাতাস থেমে গেছে, চারপাশের কোলাহলও কেমন যেন নিস্তব্ধ। কেবল তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ মিলেমিশে এক হয়েছে।

থারিনিয়াস ধীরে ধীরে তার মুখটা আলবিরার কাছে আনলো, চোখ দুটো গভীর, মোহনীয়। “তোমাকে ছুঁতে চাই, বিরা,” তার কণ্ঠস্বর মৃদু, কিন্তু দৃঢ়।
আলবিরার চোখ দুটো স্বপ্নীল হয়ে উঠলো। সে কিছু বললো না, কিন্তু তার দৃষ্টি বলছিলো, “আমি রাজি।”
থারিনিয়াস আলতো করে তার গাল ছুঁলো, তারপর ধীরে ধীরে তার নরম ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট রাখলো। মুহূর্তটা যেন সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে গেলো, চারপাশে কোনো শব্দ নেই, শুধু তাদের নিঃশ্বাসের উষ্ণতা একে অপরের মাঝে মিশে গেলো।
আলবিরার চোখ বন্ধ হয়ে এলো, তার সমস্ত অস্তিত্ব যেনো এই চুম্বনের মাঝে গলে গেলো। থারিনিয়াসের স্পর্শ নরম, কিন্তু তার অধিকারবোধ প্রবল।
তারপর হঠাৎ, থারিনিয়াস আলবিরাকে শক্ত করে নিজের বাহুডোরে টেনে নিলো। আলবিরার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরলো,কখনোই তাকে হারাতে চায় না।
আলবিরা থারিনিয়াসের শক্ত বাহুতে বন্দী হয়ে চোখ বন্ধ করলো। সে অনুভব করলো, এই উষ্ণতার মাঝে সে পুরোপুরি নিরাপদ।
থারিনিয়াস তার চুলের গন্ধ নিতে নিতে মৃদু স্বরে বললো, “তুমি আমার, বিরা… আমার চিরকাল।”
আলবিরা তার বুকে মুখ গুঁজে একঝলক হাসলো, তারপর ফিসফিস করে বললো, “আর তুমিও আমার, নিয়াস।”
চাঁদের আলো তাদের দুজনকে জড়িয়ে রেখেছে, আর রাতের বাতাস তাদের একে অপরের আরও কাছাকাছি নিয়ে এলো…

আকাশে পূর্ণচন্দ্র ঝলমল করছে,আজ রাতটাকে আরও বিশেষ করে তুলতে হবে।থারিনিয়াস আর আলবিরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে, চাঁদের আলো তাদের দুজনের মুখে নরম আলো ছড়িয়ে দিয়েছে।
“বিরা…” থারিনিয়াস হঠাৎ করে নামটা উচ্চারণ করলো। সেই পুরনো ডাক, যা কত বছর ধরে হারিয়ে গিয়েছিল।
আলবিরা বিস্ময়ে থারিনিয়াসের দিকে তাকালো, তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। চোখের মাঝে একরাশ আবেগ খেলা করছে।
“নিয়াস…” আলবিরাও ফিসফিস করে বললো, তার গলার স্বর কেঁপে উঠলো অনুভূতির ভারে।
এই ডাকগুলো তাদের শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। কত দিন পর আবার তারা নিজেদের পুরনো নামগুলোতে ফিরে গেলো!
থারিনিয়াস ধীরে ধীরে আলবিরার কাছে এগিয়ে এলো। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে, তারপর আলতো করে তার গালে হাত রাখলো। “তুমি জানো, বিরা, তোমাকে আমি কখনো ভুলতে পারিনি।”
আলবিরার চোখে জল চিকচিক করে উঠলো। “আমি জানি, নিয়াস। আমিও কখনো তোমাকে ভুলতে পারিনি।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থারিনিয়াস তাকে শক্ত করে নিজের বাহুতে টেনে নিলো। আলবিরা নিঃশব্দে তার বুকে মুখ গুঁজলো, এই উষ্ণতা হারিয়ে যেতে না দিবেনা।
থারিনিয়াস তার কপালে একটা গভীর চুমু খেয়ে বললো, “আজকের রাত শুধু আমাদের, বিরা। আজকের রাতটাকে মনে রাখবে তো?”
আলবিরা চোখ বন্ধ করলো, তার ঠোঁটে এক নিঃশ্বাসে হাসি ফুটে উঠলো। “চিরদিন মনে রাখবো, নিয়াস…”
এথিরিয়ন দূর থেকে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। চাঁদের আলোতে থারিনিয়াস আর আলবিরাকে একসঙ্গে দেখে তার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিলো।
একদিকে খুশি লাগছে—এদের প্রেম পুনরায় জেগে উঠেছে। কিন্তু অন্যদিকে একটা অজানা হাহাকার বুকের মাঝে বাজছে।

“এদেরও প্রেম হয়ে গেলো পুনরায়… আর আমি?”****”
আমি এখনো পারছি না।”
এথিরিয়ন একবার আকাশের দিকে তাকালো, উত্তর খোঁজার জন্য।তার ড্রাগনের হৃদয় আজও শূন্য,এক অদ্ভুত শূন্যতা যা পূরণ করতে পারছে না।
গভীর নিশ্বাস ফেলে সে মাথা নিচু করলো। “আমি আমার লাইফের কয়েকটা বছর নষ্ট করে ফেলছি?” আমি কি কাউকে খুব বেশি কষ্ট দিয়েছি।
কিন্তু এই রাত তার কোনো উত্তর দিলো না,শুধু দূর থেকে প্রেমে মগ্ন দুই সত্ত্বার হাসির প্রতিধ্বনি ভেসে এলো বাতাসে।

এথিরিয়ন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠান্ডা বাতাস তার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে, কিন্তু সে অনুভব করছিল শুধু এক ধরনের অস্বস্তি—অতীতের এক অদ্ভুত অনুভূতি, যা আজ আচমকা তাকে ছুঁয়ে গেল।
তিন বছর আগে…
সিলভা তার সামনে দাঁড়িয়ে, চোখে একরাশ আশা আর বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে বলেছিলো, “আমি গত দু’বছর ধরে তোমাকে একতরফা ভালোবাসছি, রিয়ন।”
সেদিন এথিরিয়ন অবাক হয়েছিল, কিছুটা বিরক্তও। ভালোবাসা, সম্পর্ক—এসবের প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। সিলভা ছিল খুব বেশি আগ্রহী, সবসময় তার আশেপাশে ঘুরতো, যেখানেই যেতো সেখানেই হাজির হতো, আর সুযোগ পেলেই হা করে তাকিয়ে থাকতো তার দিকে। এমনকি বন্ধুদের মাঝেও সিলভা প্রায়ই বলে বেড়াতো, “এথিরিয়ন আমার প্রেমিক, বুঝেছো?”
এথিরিয়ন এসব সহ্য করতে পারত না। তখন তাকে মনে হয়েছিলো, “সিলভা কি এতটাই সস্তা? এভাবে গায়ে পড়ে!”

কিন্তু আজ…
আজ থারিনিয়াস আর আলবিরার ভালোবাসার মুহূর্ত দেখে হঠাৎ মনে হলো—সেদিনের সিলভাকে সে কি খুব বেশি কষ্ট দিয়েছিল?
সে কি সিলভার অনুভূতিগুলোকে একেবারেই গুরুত্ব দেয়নি?
এথিরিয়নের বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত এক শূন্যতা বাজলো। ভালোবাসা না চাইতে চেয়েছিল না কখনো, কিন্তু আজ যখন চারপাশে সবাই ভালোবাসা খুঁজে নিচ্ছে, তখন তার মনেও একরকম অজানা ব্যথা ছুঁয়ে গেল।
সিলভা কি এখনো তার জন্য অনুভূতি বয়ে বেড়ায়? নাকি সে এগিয়ে গেছে?
এথিরিয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে হলো, আজ প্রথমবারের মতো সে বুঝতে পারল ভালোবাসা শুধু একরকম হয় না—প্রত্যেকের অনুভূতি প্রকাশের ধরন আলাদা হতে পারে।
সেদিন যদি সে সিলভাকে মেনে নিত, হয়তো সিলভা এতটা গায়ে পড়া হতো না। হয়তো সে তার ভালোবাসার প্রকাশটা আরেকভাবে দেখাত।
হয়তো…

কিন্তু ‘হয়তো’ তো বাস্তবতা বদলাতে পারে না।
এথিরিয়ন একবার আকাশের দিকে তাকাল, তারপর থারিনিয়াস আর আলবিরার দিকে। তারা দুজনেই হাসছিল, একে অপরের চোখে তাকিয়ে ছিল গভীর আবেগ নিয়ে। তাদের সেই চোখে ছিল ভালোবাসার নিরাপত্তা, যা সেদিন সিলভা তার কাছে খুঁজেছিল।
আর এথিরিয়ন?
সে সেদিন সিলভাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, কারণ তার ভালোবাসার ধরন পছন্দ হয়নি। এখন ভাবলে মনে হচ্ছে, সেটাই কি ছিল তার ভুল?
এথিরিয়ন নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলল, “সিলভা, তুমি কি এখনো অপেক্ষা করছ? নাকি আমিই দেরি করে ফেলেছি?”

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে আসছে। সিলভা প্রাসাদে ফিরে এসে প্রথমে রাজা জারেনের কাছে গ্রুপ স্টাডির অনুমতি চেয়েছিল,কিন্তু রাজা শুরুতে কিছুতেই রাজি হননি। সিলভা খানিকটা হতাশ হয়ে পড়েছিল, তবে তার ফুপি লিয়ারা, যিনি মামমত্ববোধ থেকে রাজা জারেনকে বুঝিয়ে দিলে, আর রাজা জারেন শেষমেশ অনুমতি দিলেন।
তবে এই অনুমতির পিছনে লিয়ারা নিজের মনেই এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করছিলেন।তার মেয়ে ফিওনার জন্য।জ্যাসপার তাকে কোথায় নিয়ে গেছে,কিছুই জানেন না তিনি। ফিওনার জন্য লিয়ারা চিন্তিত, তার অবস্থা কী হতে পারে, সেটা ভাবতে ভাবতে লিয়ারার মন ভারী হয়ে উঠছে।
সিলভা,একদিকে তার ফুপি লিয়ারা ও রাজা জারেনের অনুমতিতে গ্রুপ স্টাডির সুযোগ পেয়ে আনন্দিত,অন্যদিকে লিয়ারার মনের মধ্যে বড় একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সে জানে না, ফিওনাকে নিয়ে জ্যাসপার কী করেছে, কোথায় নিয়েছে। তার মনে কেবলই একটা প্রশ্ন—তার মেয়েটা কি ঠিক আছে? তার মনের মধ্যে,ফিওনার অবস্থান সম্পর্কে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে, কিন্তু তার কোনো উত্তর নেই।

সিলভা ধীর পায়ে নিজের কক্ষে প্রবেশ করলো।সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে,আজ রাতের গ্রুপ স্টাডির আয়োজন সে করবেই।ল্যাপটপ খুলে দ্রুত টাইপ করলো একটি ইমেল—
“সবাই,
আমার কক্ষে আজ রাতেই গ্রুপ স্টাডি হবে। প্র্যাকটিক্যাল আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কভার করা হবে।দেরি না করে চলে এসো সবাই, বাবা আর ফুপি অনুমতি দিয়েছেন।”
ইমেল পাঠিয়ে দেয়ার পর সিলভা এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চিন্ত হলো।কিন্তু তার ভিতরে কিছু একটা যেন শূন্যতায় দুলছিল। এথিরিয়ন আজ ভার্সিটি আসেনি? রিয়ন কোথায়?
এথিরিয়ন আজ ভার্সিটিতে যায়নি। সকালে বেরোলেও, দুপুরের পর সে ব্যক্তিগত কিছু কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তবে সে ভুলে যায়নি তার আগ্রহ—সিলভা। তাই সকালে সে তার এক বন্ধুকে বলেছিল, “সিলভার দিকে নজর রাখিস, কোনো অদ্ভুত কিছু ঘটলে জানাবি।”

বন্ধুটি সেই কথাটা মনে রেখেছিল। দুপুরে ক্যান্টিনে বসে সে শুনেছিল, সিলভা তার বন্ধুদের সাথে গ্রুপ স্টাডির পরিকল্পনা করছে, সাথে ক্যালিক্স থাকবে,তার নিজের রাজকীয় কক্ষে।
কিন্তু তখন সে নিজেও কাজের মধ্যে ডুবে ছিল, তাই তখন জানানো হয়নি। এখন, যখন রাতের বাতাস হালকা হয়ে আসছে, তখন সে হঠাৎ থেমে গিয়ে ভাবলো—”আমি তো এথিরিয়নকে এখনো জানাইনি!”
তড়িঘড়ি করে সে এথিরিয়নকে ভিডিও কল করলো।
এথিরিয়ন ফোন তুলতেই বন্ধুটি বললো, “বন্ধু, সিলভা এখন তার প্রাসাদে, তার রুমে গ্রুপ স্টাডির আয়োজন করছে। তুমি বলেছিলে নজর রাখতে, তাই জানাচ্ছি।”
এথিরিয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। ফোনের পর্দায় বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখে একরকম অদ্ভুত ভাব ফুটে উঠলো।
“সিলভা তার রুমে… আর সবাই সেখানে যাচ্ছে?”
এথিরিয়নের কণ্ঠে এক শীতল অনুভূতি খেলে গেল। সে জানে না কেন, কিন্তু এই খবর তার ভেতরে এক অদ্ভুত সাড়া জাগালো। কিছু একটা বদলে যাচ্ছে, হয়তো অনেক কিছুই।

সিলভার রাজকীয় কক্ষের উজ্জ্বল আলোয় মার্বেল মেঝে চিকচিক করছিল। বিশাল টেবিলের ওপর বইপত্র ছড়িয়ে আছে, চারদিকে ছড়ানো নোটবুক, ল্যাপটপের আলোয় সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এলেনা মারিয়ানা একটা ফিজিক্সের সমীকরণ বোঝানোর চেষ্টা করছিল, আর ক্যালিক্স অলস ভঙ্গিতে বসে কখনো টেবিলের ওপর হাত রেখে, কখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে সময় পার করছিল।
“সিলভা,এত সিরিয়াস হোস না,” হালকা হাসি দিয়ে বললো এলেনা, “একটু রিল্যাক্স কর, সবই হয়ে যাবে।”
সিলভা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। “এইবার আমার বাবা আর ফুপি অনুমতি দিয়েছেন।কিন্তু যদি এই স্টাডি সেশন নিয়ে কিছু খারাপ হয়, তাহলে আর কোনোদিন আমাকে পড়তে দেবে না!”
ক্যালিক্স তখন ব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করতে করতে বললো, “তাহলে আসলেই একটু রিল্যাক্স করা যাক…”
সেই মুহূর্তেই সিলভা দেখলো—ক্যালিক্সের হাতে একটা ছোট বোতল!

“এটা কি?” চমকে উঠে সিলভা বললো, চোখ বড় হয়ে গেছে।
এলেনও এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। “ওহ, ক্যালিক্স, তুমি এটা এনেছো?”
ক্যালিক্স হাসলো, “হ্যাঁ! একটু এলকোহল, এত ভয় পাওয়ার কি আছে?”
সিলভা তখনই উঠে দাঁড়ালো, রাগে তার চোখ আগুনের মতো জ্বলছিল। “ক্যালিক্স, তুমি কি জানো তুমি কি করছো? যদি বাবা আর ফুপি জানতে পারে, তাহলে আর কোনোদিন গ্রুপ স্টাডি করতে দেবে না!”
ক্যালিক্স তখনও হাসছিল, কিন্তু এবার একটু অসহায়ভাবে। “আরেহ, এটা তো মজা করার জন্য… আমাদের বয়স তো হয়েছে, একটুখানি নিলে সমস্যা কোথায়?”
“সমস্যা? সমস্যা হলো এটা রাজপ্রাসাদ, এটা আমার রুম! তুমি জানো আমি কখনো এসব করি না, আর তোমার জন্য যদি কিছু হয়, আমাকে সব দায় নিতে হবে!”
এলেন তখন শান্তভাবে সিলভার দিকে তাকিয়ে বললো, “সিলভা, ও আসলে সিরিয়াসলি নেয়নি ব্যাপারটা। চিল… কেউ কিছু বলবে না।”
ক্যালিক্সও এবার মাথা নিচু করলো। “ঠিক আছে, ভুল হয়ে গেছে, সিলভা। এটা নিয়ে টেনশন নিয়ো না, আজকের দিনটাইতো।”
সিলভা ধীরে ধীরে গভীর নিঃশ্বাস নিলো, তার রাগ একটু কমে এলো। “ঠিক আছে, কিন্তু ক্যালিক্স, প্লিজ, এটা শেষবারের মতো, বুঝেছো?”
ক্যালিক্স মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। এলেন একপাশ থেকে মুচকি হাসলো। “ঠিক আছে, তাহলে এবার হয়ে যাক।”

সিলভা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বই খুলে দিলো। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, এই রাতটা হয়তো সাধারণ কোনো স্টাডি সেশন থাকবে না…
সিলভা, এলেনা মারিয়ানা, আর ক্যালিক্স একে একে এক গ্লাস করে এলকোহল পান করলো। হালকা নেশা ছুঁয়ে গেল তাদের শরীরের রন্ধ্রে, হাসির ছন্দ বাড়িয়ে দিলো কিছুটা।
“এটা তো মন্দ না!” ক্যালিক্স হাসতে হাসতে বললো, গ্লাসটা টেবিলে রেখে দিলো।
সিলভা এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় ছিল, কিন্তু অবশেষে সেও এক চুমুক দিলো। স্বাদটা প্রথমে তিতা লাগলো, কিন্তু পরের মুহূর্তেই শরীরে এক অদ্ভুত শীতলতা নামিয়ে আনলো।
“আমি ভাবিনি আমি এটা পান করবো কখনো,” হালকা হাসলো সিলভা।
ঠিক তখনই—

“ধপাস!”
বারান্দায় একটা ভারী শব্দ হলো, যেন কিছু একটা শক্তভাবে আছড়ে পড়েছে।
“কে ওখানে?”** এলেনা ভ্রু কুঁচকে জানালার দিকে তাকালো।
তারপরেই সবার চোখ কপালে উঠলো—বারান্দার দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে গেল, আর ভেতরে এসে দাঁড়ালো এক লম্বা, রাজকীয় কাঠামোর নীল চোখের তরুণ।
এথিরিয়ন!
সিলভার হাত থেকে গ্লাস প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো, ক্যালিক্স কেমন যেন ভ্রু কুঁচকে এথিরিয়নের দিকে তাকালো। তাকে চেনাচেনা লাগছিল, কিন্তু মনে করতে পারছিল না ঠিক কোথায় দেখেছিলো।
এথিরিয়নের চোখ এক ঝলক কক্ষের চারপাশে বুলিয়ে গেল—টেবিলে রাখা এলকোহলের বোতল, হাতে ধরা গ্লাস, আর তাদের মুখে অপরাধী হাসি।
তার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো।
“এটাই তাহলে তোমাদের গ্রুপ স্টাডির নমুনা?”
সিলভা তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো, মাথা একটু ঘুরে গেল নেশার কারণে।
“রিয়ন, তুমি এখানে এই মুহূর্তে—?”
“সেই প্রশ্ন তোমার করার কথা না,” এথিরিয়নের কণ্ঠস্বর কঠোর লাগলো। “তুমি এলকোহল পান করছো? সিলভা, তোমার বাবা জানেন?”
সিলভা এবার পুরোপুরি চুপ হয়ে গেল।
ক্যালিক্স এবার কিছুটা বিরক্তির সুরে বললো, “তুমি কে আমাদের ওপর নজরদারি করার? আমাদের বাবা-মা না!”

এথিরিয়ন এবার তার দিকে তাকালো, চোখে বিদ্যুতের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
“আমি কে, সেটা জানা তোমার দরকার নেই। কিন্তু তুমি কার সঙ্গে কথা বলছো সেটা বোঝা দরকার।”
এলেনা মারিয়ানা তখন পরিস্থিতি সামলানোর জন্য হালকা হাসলো। “এথিরিয়ন ভাইয়া,আমরা তো কেবল একটু রিল্যাক্স করছিলাম…”
এথিরিয়নের চোখ এবার সিলভার দিকে ফিরে এলো।
“সিলভা,? তুমি সত্যিই রিল্যাক্স করছো?”
সিলভা কিছু বলার আগেই তার গলায় যেন কিছু আটকে গেল। মনে হচ্ছিল, রাজা জারেন যদি জানতে পারেন, তাহলে…!
এথিরিয়নের চোখের গভীরে কিছু একটা ছিল—তীব্র অসন্তোষ, নাকি শঙ্কা? সিলভা ঠিক বুঝতে পারছিল না।
এই রাতটা যে এমন হবে, তা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি…
এথিরিয়ন চোখ সরু করে সিলভার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর ধীর গলায় বললো,
“তুমি ভুলে গিয়েছো, সিলভা, আমি শুধু তোমার কে?
আমি তোমার বেয়াই হই। আর অভিভাবকও।”
সিলভার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো। ক্যালিক্স, এলেনা, আর মারিয়ানা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো।

“বে… বেয়াই?” ক্যালিক্স ফিসফিস করে বললো, যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
এথিরিয়ন আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না। কণ্ঠে কঠোরতার ছোঁয়া এনে বললো,
“এই বাজে অভ্যাস আমি মেনে নিতে পারবো না। সবকিছু এখানেই শেষ! সবাই উঠে দাঁড়াও, বের হও।”
এথিরিয়নের কঠোর আদেশ শুনে এলেনা আর মারিয়ানা আতঙ্কে উঠে দাঁড়ালো। ক্যালিক্স প্রথমে যেতে চায়নি, কিন্তু এলেনা তার হাত ধরে টানলো।
“চলো, ক্যালিক্স।”
কিন্তু ক্যালিক্স দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
এথিরিয়নের চোখ তখন আরও শীতল হয়ে গেলো। “দরজা দিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। বারান্দা দিয়ে যাও সবাই ড্রাগন রূপ ধরে।”
এলেনা আর মারিয়ানা ভয়ে আর অপেক্ষা করলো না। তারা দুজনেই নিজেদের আসল রূপ ধারণ করলো—দুই উজ্জ্বল রঙের ড্রাগন, একজনে বেগুনি, অন্যজন রূপালি।
তারা বারান্দার কিনারায় গিয়ে একে একে ঝাঁপিয়ে পড়লো, ডানা মেলে উড়ে গেলো রাতের আকাশে।
ক্যালিক্স শেষ মুহূর্তে তাকিয়ে থাকলো, কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু তারপর এলেনা তাকে টেনে নিয়ে গেলো।
এথিরিয়ন তখনও কঠোর ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো, চোখে কঠিন দৃষ্টি।

“এবার আমি দেখবো, তুমি কি করো, সিলভা,” তার গভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো ঘরে।
এথিরিয়ন এক পা দু’পা করে সিলভার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো, সিলভা একটুও পিছু হটলো না, অথচ তার বুকের ধুকপুকানি ক্রমশ বাড়ছিলো। এথিরিয়নের চোখ দুটো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিলো,দেখে মনে হচ্ছে গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে আছে।
“তুমি এতো রাতে আমার কক্ষে বারান্দা দিয়ে কি শুরু করলে তুমি? তুমি কি প্রিন্স জ্যাসপারের মতো বারান্দা দিয়ে আসা শুরু করেছো?” সিলভা সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, গলায় মৃদু বিদ্রুপের সুর।
এথিরিয়ন কোনো উত্তর দিলো না। বরং পরের মুহূর্তেই তার দুই হাত সিলভার কাঁধ চেপে ধরলো, আর ঠাস করে দেয়ালের সঙ্গে তাকে ঠেসে ধরলো।
সিলভা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলো। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শিহরণ নেমে গেলো।
এথিরিয়ন ধীরে ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে তার মুখের কাছে এল। গভীর কণ্ঠে বললো, “তুমি কি মনে করো, আমি তোমার সঙ্গে খেলতে এসেছি?”

তার কণ্ঠে এতটাই শীতলতা ছিলো যে সিলভা এক মুহূর্তের জন্য কথা হারিয়ে ফেললো।
এথিরিয়নের দুই হাত তখন সিলভার মাথার দু’পাশে শক্তভাবে গেঁথে ছিলো, যেন সে পালিয়ে যেতে না পারে। তাদের মাঝে মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব।
“তুমি এতটা অবাধ্য হয়ে উঠেছো কবে থেকে, সিলভা?”
সিলভা এবার দৃঢ়ভাবে তাকালো তার চোখে। “যেদিন থেকে তুমি আমাকে বুঝতে শিখোনি,রিয়ন।”
এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো।
এথিরিয়নের চোখে কিছু একটা ঝলকে উঠলো, মনে হলো সে নিজেকেই প্রশ্ন করছে।
তবে এই মুহূর্তে, সে সিলভাকে ছাড়তে প্রস্তুত ছিলো না…
সিলভা অবাক হয়ে এথিরিয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
“তুমি ওদের সাথে এলকোহল পান করছিলে কেনো? যদি ক্যালিক্স নেশায় চুর হয়ে কিছু করতে চাইতো?”
এথিরিয়নের কণ্ঠ ছিলো তীক্ষ্ণ, যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।
সিলভা এবার চোখ সরু করে বললো, “তাতে তোমার কি? এটা আমার ব্যাপার। আমার কক্ষে, আমার বন্ধুদের নিয়ে কি করবো, না করবো, সেটা নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই!”
তার কণ্ঠে ছিলো রাগ আর চ্যালেঞ্জের সুর। কিন্তু এথিরিয়ন এক ইঞ্চিও নড়লো না, বরং তার মুখটা আরও কাছে আনলো সিলভার।

“তাতে আমার কি যায় আসে?” এথিরিয়ন গভীর কণ্ঠে বললো,”আমি জেলাস, সিলভা।”
সিলভার বুক ধক করে উঠলো।
তার হৃদস্পন্দন মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে গেলো, কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করলো না। সে কঠিন মুখে বললো, “তুমি… জেলাস?”
এথিরিয়নের ঠোঁটে একটুখানি তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। “হ্যাঁ। ক্যালিক্স তোমার খুব কাছে বসেছিলো, তুমি হেসেছিলে, মজা করছিলে। আর আমি দূর থেকে দেখছিলাম, কিছুই করার ছিলো না। এটা সহ্য করতে পারছিনা।”
সিলভা এবার সত্যিই চমকে গেলো। এথিরিয়নের ঠান্ডা স্বভাবের আড়ালে এমন একটা আবেগ লুকিয়ে ছিলো, সেটা সে কখনো বুঝতেই পারেনি।
সিলভা কিছুক্ষণ এথিরিয়নের চোখের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকলো। তার বুকের ভেতর ধুকপুক করে উঠছিলো, কিন্তু সে নিজেকে দৃঢ় রাখলো।
“তুমি কেনো জেলাস? কে তোমাকে অধিকার দিয়েছে আমার প্রতি জেলাস হতে?” তার কণ্ঠ কঠিন, কিন্তু এক ধরনের অদৃশ্য কম্পন ছিলো তাতে।
এথিরিয়ন গভীর শ্বাস নিলো, তারপর সোজা সিলভার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি দিয়েছো সেই অধিকার। পাঁচ বছর ধরে দিয়েছো। আমি কখনো নিইনি, কখনো চাইওনি। কিন্তু এখন? এখন আর ছাড়বো না, সিলভা।”

সিলভার ঠোঁট কাঁপলো, কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “তুমি তো ফিওনাকে লাইক করতে?”
এথিরিয়ন একটু হাসলো, যেন সে আগেই অনুমান করেছিলো এই প্রশ্ন আসবে।
“হ্যাঁ, করতাম। কেনো, ভালো লাগা থাকতে পারে না?” সে একটু থামলো, তারপর শান্ত গলায় বললো,”ফিওনাকে আমি লাইক করতাম। কিন্তু যেদিন দেখলাম,জ্যাসু ভাইয়া তাকে ভালোবাসে,আর ফিওনাও তাকে চায়, সেদিন তাদের একসাথে দেখে আমার আনন্দ হয়েছিলো।খুশি হয়েছিলাম। আমার সেরকম কষ্ট হয়নি।”
সে এবার সিলভার চিবুকটা আলতো করে ধরলো,প্রতিটা প্রতিক্রিয়া অনুভব করতে চাইলো।
“কিন্তু, যখন তোমাকে ক্যালিক্সের সাথে দেখলাম? তোমার হাসি দেখলাম, তোমার চোখের সেই উজ্জ্বলতা দেখলাম—সেদিন আমার বুকের ভেতর কেনো অদ্ভুত ব্যথা হলো? কেনো আমি ক্যালিক্সকে এক মুহূর্তে ঘৃণা করতে শুরু করলাম? কেনো সেটা সহ্য হলো না?”
সিলভা চুপ।
সে নিজেও বুঝতে পারছিলো না, তার মধ্যে কি অনুভূতি কাজ করছে।
এথিরিয়নের হাত তখনো তার চিবুকে, তার চোখে সত্যের তীব্রতা।

“বলো, সিলভা। তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো, যে আমি তোমার জন্য কিছুই অনুভব করি না?”
সিলভা এবার মুখ ফিরিয়ে নিলো, কিন্তু তার লাল হয়ে ওঠা গাল এথিরিয়নের চোখ এড়ালো না।
সিলভা একটা অলস ভঙ্গিতে হাতে চিবুক ঠেকিয়ে জমাট চোখে এথিরিয়নের দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি এখন যাও রিয়ন, আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমাবো।” তার স্বরে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু অভিমানও ছিল লুকানো।
এথিরিয়নের চোখদুটো এক মুহূর্তের জন্য সংকীর্ণ হলো। সিলভা কি সত্যিই চাইছে সে চলে যাক? নাকি এটা শুধুই তার একরকম প্রতিরোধ? কিছুক্ষণ নীরব থেকে, হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করলো, “ক্যান আই স্টে হেয়ার টুনাইট?”

সিলভা এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে নিয়ে এক ধাক্কায় এথিরিয়নকে সরিয়ে দিলো। তার কণ্ঠে দৃঢ়তা, কিন্তু কোথাও যেন এক নিঃশব্দ কাঁপুনিও লুকানো ছিল, “নেভার! যাও প্লিজ।”
এথিরিয়ন একটু অবাক হলো, তারপর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললো, “ওকে, ফাইন, আমি যাচ্ছি। তবে মনে রেখো, জ্যাসু ভাইয়া ফিরে এলে তখন তোমাকে পারমানেন্ট আমার এল্ড্র রাজ্যের প্রাসাদের কক্ষে আমার সাথে থাকার ব্যবস্থা করবো। মাইন্ড ইট।”
এটা বলেই সে এক ঝটকায় বারান্দার দিকে ফিরে গেলো। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে, একবার সিলভার দিকে তাকালো তার চোখের ভাষা পড়তে চাইলো। তারপর অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়েই ড্রাগন রূপ নিয়ে উড়ে গেলো।
সিলভা এক গভীর শ্বাস ফেললো, তার বুকের মাঝে যেন এক অজানা উত্তেজনা খেলা করছিল।
সিলভা ধীরে ধীরে বিছানায় বসে পড়লো, গভীর রাতে ঘুম আসছে না তার। বারান্দার দরজাটা এখনো খোলা, হালকা বাতাস পর্দা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটু আগেই এখান দিয়ে উড়ে চলে গেলো এথিরিয়ন, কিন্তু তার ছোঁয়া যেন এখনো বাতাসে রয়ে গেছে।

সিলভা গভীর শ্বাস নিয়ে বিড়বিড় করে বললো, “এতো সহজে ধরা দেবো তোমাকে আমি? না, না, রিয়ন। আমাকে পাঁচ বছর কষ্ট দিয়েছো, এবার তোমাকে অন্তত পাঁচ মাস জ্বালাবো।”
তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো। চোখদুটো চিকচিক করছে।
বাইরে রাতের আকাশে অগণিত তারা ঝলমল করছে। দূরে কোথাও একটা ড্রাগনের ডানা ঝাপটানোর ক্ষীণ শব্দ মিলিয়ে গেল। হয়তো এথিরিয়ন এখনো কাছেই আছে, হয়তো আকাশের কোণ থেকে এখনো তাকিয়ে দেখছে তাকে।
সিলভা জানে, আজকের রাতের পর কিছু বদলে গেছে। এথিরিয়ন আর তাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করবে না।

রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে হঠাৎই হাসপাতালের করিডোরে একটি বিকট চিৎকার শোনা গেলো। লিউ ঝান তখন মনোযোগ দিয়ে কম্পিউটারের পর্দায় কিছু ডেটা দেখছিল, কিন্তু সেই চিৎকারে তার গা শিউরে উঠল।সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে দরজার বাইরে উঁকি দিলো।করিডোরটা যেন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে,হাসপাতালের সাদা আলো ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়ে গেছে।
ঠিক তখনই, আচমকা দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা পড়ল! কেউ যেন বেপরোয়াভাবে দরজাটা খুলতে চাইছে। লিউ ঝান হাত বাড়িয়ে দরজা খুলতেই ধাক্কা খেয়ে পেছনে সরে গেলো—তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নার্স, কিন্তু তার চোখ ফাঁকা, ত্বক ধূসর,আর ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধা রক্ত!
লিউ ঝানের শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। “জম্বি?”
নার্সটি বিকটভাবে গর্জে উঠে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লো! লিউ ঝান পাশ কাটিয়ে দ্রুত নিজের এপ্রনের পকেট থেকে ছুরি বের করলো, এক ঝটকায় নার্সটির গলায় বসিয়ে দিলো। কিন্তু র*ক্ত পড়ার বদলে এক ধরণের কালচে সবুজ তরল বের হয়ে এল!

চারদিক থেকে একইরকম বিকৃত আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। হাসপাতালের অন্যান্য রোগী, ডাক্তার, নার্স—যেন সবাই এক অদ্ভুত সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে গেছে! লিউ ঝান বুঝতে পারলো এটি কোনো সাধারণ আ*ক্রমণ নয়—এটা পরিকল্পিত কিছু!
ঠিক তখনই, তার রেডিওতে ফিসফিস করে একটি বার্তা ভেসে এলো—
“লুকিয়ান আর থালাস একজনকে পাঠিয়েছে… ফিওনাকে মারতে!”
লিউ ঝান মুহূর্তেই চোখ বড় করে তাকালেন। ফিওনা!
সে দ্রুত হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে ফিওনার কেবিনের দিকে দৌড় দিলো।কিন্তু তার পথ আগলে দাঁড়ালো এক ঝাঁক জম্বি—তাদের র*ক্তাক্ত চোখ,ক*ঙ্কালসার হাত, বি*কৃত মুখ দেখে মনে হচ্ছিল,তারা এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু আত্মা হারিয়ে গেছে।
লিউ ঝান দাঁত কামড়ে নিজের পিস্তল বের করলেন। “আমি তোমাদের শেষ করে দেবো!”****—এই বলে সে গুলি ছুঁড়লো!

কিন্তু এরই মধ্যে হাসপাতালের ছাদ থেকে ধীরে ধীরে নেমে এল এক অদ্ভুত ছায়ামূর্তি। তার পরনে কালো লম্বা কোট, চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছে লাল আগুনের মতো। হাতে ধরা এক ভয়ংকর ধারালো অ*স্ত্র।
সে ধীর কণ্ঠে বললো, “আমাকে থামানোর সাধ্য কারো নেই। ফিওনাকে আজ মরতেই হবে!”
লিউ ঝানের পিঠ চেপে আছে ফিওনার কেবিনের দরজায়। তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে, হাতের ছুরিতে জমাট রক্ত লেগে আছে। দরজার ওপাশে ফিওনা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু সে জানে না, বাইরে কি বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন অপেক্ষা করছে!
জম্বিদের বিকট গর্জন ক্রমেই কাছাকাছি আসছে। লিউ ঝান এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল, তারপর আবার খটখটে কণ্ঠে ফিসফিস করল, “যতক্ষণ আমার শ্বাস আছে, ওদের ঢুকতে দেবো না!”
সামনের করিডোরজুড়ে অন্ধকারের মতো নেমে এসেছে মৃ*ত্যু। জম্বিরা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে, তাদের বি*কৃত মুখ থেকে শোঁ শোঁ শব্দ বের হচ্ছে। তাদের হাতের প*চা চামড়া ঝুলছে, চোখে কোনো অনুভূতি নেই—শুধু নিঃশেষ তৃষ্ণা!
হঠাৎ!
একটা বজ্রপাতের মতো গর্জন হাসপাতালের পুরো বিল্ডিং কাঁপিয়ে দিলো! একটা আগুনের ঝড় পুরো করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল, আর তারপরই, প্রবল বাতাসে জানালাগুলো একে একে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো!
লিউ ঝান বুঝতে পারলো, সে এসে গেছে।
জ্যাসপার!

ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে আগুনের ডানাগুলো মেলে, এক বিশাল আকৃতির ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে জম্বিদের মাঝখানে নেমে এল। তার চোখে সবুজ আগুনের দৃষ্টি, মুখে প্রবল ক্রোধ।
জ্যাসপার এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করেই আক্রমণ শুরু করলো। তার ডানার ঝাপটায় জম্বিদের কয়েকজন দেয়ালে সজোরে ছিটকে পড়লো। তারপর সে এক ঝটকায় তার নখর বের করলো, আর পরপর কয়েকটি জম্বির মাথা এক ঝটকায় ছিন্নভিন্ন করে দিলো!
লিউ ঝান এই সুযোগে ছুটে গেলো ল্যাবের দিকে। সে জানে, কেবল যুদ্ধ দিয়ে এই সংক্রমণ থামানো যাবে না। তাকে কিছু একটা খুঁজে বের করতে হবে—একটা রাসায়নিক, যা জম্বিদের সংক্রমণ ধ্বংস করতে পারবে।লিউ ঝান যদি আজকে ড্রাগন না হয়ে সাধারণ মানব হতো তবে এতোক্ষণে সেও জম্বিতে পরিনত হতো।
লিউ ঝান দরজা খুলে ল্যাবের ভিতরে ঢুকলো, চারপাশে এলোমেলো কাগজপত্র আর ভাঙা কাচের টুকরো। ডেস্কের ওপরে কিছু পরীক্ষার নোট খোলা পড়ে আছে।
একটা ফাইলের পাতায় একটা নাম লেখা—

“Necrotoxin-Z7”
লিউ ঝানের চোখ চকচক করে উঠলো। “এটাই হতে পারে জম্বিদের জন্য বিষ!”
সে দ্রুত ক্যামিকেল মেশাতে লাগলো, বাইরের চিৎকার আর যুদ্ধের শব্দে হাসপাতাল যেন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
কিন্তু সে জানে, “আমার হাতে বেশি সময় নেই!”
ল্যাবের বাইরে থেকে এক আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে এল—
“স্যার!দরজাটা খুলুন! দয়া করে! ওরা আসছে!”
লিউ ঝান মুহূর্ত দেরি না করে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই ভয়ার্ত, শ্বাসকষ্টে কাঁপতে থাকা ইয়াং জিয়াও হুমড়ি খেয়ে তার ওপর পড়ে গেলো। তার গা ঘেঁষে দরজার ওপাশ থেকে জম্বিদের পচা-দুর্গন্ধময় বাতাস ভিতরে ঢুকে এলো।

“এরা কোথা থেকে এলো স্যার?আমি…আমি অনেক কষ্টে পালিয়ে এসেছি …” জিয়াও কাঁপা কণ্ঠে বললো, তার চোখে জল চিকচিক করছিলো।
লিউ ঝান শক্ত হাতে তাকে ধরে রাখলো, তারপর আস্তে করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিলো।
“আমি আছি। কিচ্ছু হবে না,” সে ধীরে ধীরে বললো, তার কণ্ঠই একটা ঢাল হয়ে দাঁড়ালো ইয়াং জিয়াওর জন্য।
জিয়াও আরও শক্ত করে লিউ ঝানকে জাপটে ধরলো, তার শরীর এখনও ভয়ে কাঁপছে।
“ওরা সবাই কি মরে গেছে, স্যার..?”
লিউ ঝানের মুখ কঠিন হয়ে গেলো।
সে বাইরে এক ঝলক তাকালো—হাসপাতালের করিডোরজুড়ে মৃত্যু*র ছায়া নেমে এসেছে। জম্বিদের বিকৃত শরীরগুলো ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে, তাদের ফাঁপা চোখের গভীরে এক শেষহীন তৃষ্ণা জ্বলছে।
সে জানে, আর দেরি করা যাবে না।
সে জিয়াওর কাঁধ ধরে বললো, “তুমি এখানে থাকো। আমি Necrotoxin-Z7 তৈরি করছি। এটা ওদের থামাতে পারবে।”
জিয়াও অসহায় চোখে তাকিয়ে বললো, “এটা কাজ করবে তো স্যার?”
লিউ ঝান একটু হেসে বললো, ” আমকে পারতেই হবে। আমাদের বাঁচতে হলে!”
বাইরে তখনও জ্যাসপার একের পর এক জম্বিকে ছিন্নভিন্ন করছে।

ধপ! ধপ! ধপ!
ল্যাবের দরজার বাইরে ভয়ঙ্কর শব্দ হচ্ছে,কঙ্কালসার সবাইকে মেরে ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে আছে।
“ইয়াং জিয়াও দরজা ধরে রাখো!” লিউ ঝান দ্রুত ইনজেকশনে Necrotoxin-Z7 ভরতে ভরতে চিৎকার করলো।
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।
একটা বিকৃত, পচা-গলা জম্বির হাত দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়েছে। একটা শীতল হাড়মোচড়ানো আওয়াজ করে দরজাটা এক ধাক্কায় ভেঙে পড়লো।
ইয়াং জিয়াও আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে পেছনে সরে গেলো। লিউ ঝান দেরি না করে ইনজেকশনটা শক্ত হাতে ধরে জম্বির ঘাড়ের মাংসে এক ঝটকায় গেঁথে দিলো!
সাথে সাথে জম্বির শরীর কাঁপতে শুরু করলো, তার গলিত মাংসের ওপর নীলচে আলো ছড়িয়ে পড়লো, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেলো।
তার চোখে ধীরে ধীরে ফিরে এলো চেতনার আলো—

“কোথায় আমি? কি… কি হয়েছে?”
লিউ ঝান হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, “ইটস ওয়ার্কিং,আই’ম সাকসেসফুল।”
কিন্তু এখনই বিশ্রামের সময় না।
ফিওনা!
লিউ ঝান দৌড়ে বেরিয়ে এলো ল্যাব থেকে, হাসপাতালের করিডোর দিয়ে ছুটতে লাগলো। জম্বিদের একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করতে করতে সে ফিওনার কেবিনের সামনে এসে থামলো।
কিন্তু দরজা খোলা…

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৩

ভেতরে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেলো।
ফিওনা নেই। জ্যাসপারও নেই।
শুধু লালচে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ছড়িয়ে আছে মেঝেজুড়ে।
আর তার পেছনে, আরও জম্বিরা এগিয়ে আসছে…

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৪ (২)