আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৪
সুরভী আক্তার
শাওয়ার নিয়ে বাইরে বেরোতেই আনতারা বেগম ঘিরে ধরেছিলেন । রৌদ্র এখন কিছু খাবে না । তাকে পাশ কাটিয়ে ছুতো দিয়ে বাইরে বেরোলো সে । জবর ঘুম হয়েছে একটানা । ক্লান্তিতে নিঃশেষ ছিলো হালাত্ । ঘুমটাও মিলেমিশে বেশ বেঘোরেই হয়েছে । বাড়ি ফাঁকা । রৌদ্র গেটের কাছটায় এসে থামলো । ওরা সকলে কোথায় ? এপাশ ওপাশ তাকালো নজর ঘুরিয়ে । পেছনে আয়াজ আর সাবার কন্ঠ কানে বাজতেই সচকিতে তাকালো ঘাড় ঘুরিয়ে । ওরা দু ভাই বোন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে । গেটের কাছে আসতেই রৌদ্র কে দেখে থামলো । রৌদ্র নিজেই প্রশ্ন করলো আগ বাড়িয়ে….
” সাবা , বাকিরা কোথায় ?
” ভাইয়ারা তো গ্রামের স্কুলের দিকটায় গেছে । আপুরা পুকুর পাড়ে আছে । আমরা ওখানেই যাচ্ছি ।
” ও …
আয়াজ কে নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো সাবা । রৌদ্র খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেও পিছু পিছু হাঁটা লাগালো ওদিকটায় । ততক্ষণে শুভ্র আর আদ্র ফিরে এসেছে । বাকিদের ঘাটের সিঁড়ির কাছটায় বসে থাকতে দেখে দুভাই গিয়ে বসলো পাশাপাশি । সাবা কে উদ্দেশ্য করে শুভ্র বলে উঠলো……
” স্কুলের মাঠে প্যান্ডেল বানানো হয়েছে । মঞ্চ সাজানো হচ্ছে । টুকটাক আয়োজন দেখলাম । কি হবে ওখানে ?
” স্কুলের মাঠে ? ও হ্যাঁ , আজ রাতে তো ওখানে মঞ্চ নাটক হওয়ার কথা । দোকানপাট বসবে বোধহয় । তাই প্যান্ডেল করা হয়েছে । আমি তো এই পরীক্ষার চক্করে ভুলেই গিয়েছিলাম ।
” মঞ্চ নাটক ? এখনো হয় এসব ?
” হুম । হয় তো । এখনো গ্রামে হয় এসব ।
বছরে দু’বার করে হয় । এ বছরে এটা শেষ বার ।
শাফাহ্ উদ্বেগ নিয়ে বলে…..
” আমি জানি , মনে আছে আমার । আগে যখন নাটক হতো, তখন তো প্রত্যেক বার আমরা আসতাম । তাই না ভাইয়া , মনে আছে তোমার ? সেই ছোট বেলায় ।
শুভ্র মাথা ঝাঁকায় । মেঘা এসব বুঝলো না । না বোঝার ভঙ্গিতেই কথার মাঝে বললো….
” এসব আবার কি ? নাটক হয় গ্রামে ?
বুঝিয়ে বললো শুভ্র…..
” হুম । ঐ এককথায় যাত্রাপালা বলে এসবকে । দেখিস নি আগে ?
” যাত্রা ? শুনেছি , দেখা হয় নি সামনাসামনি ।
শাফাহ্ ব্যাকুল হয়ে পড়ে….
” তাহলে আজ রাতে যাত্রা দেখতে যাই আমরা ? অনেক মজা হবে ! কতদিন দেখি না আমিও ! মেঘারও এই সুযোগে প্রথম বার দেখা হয়ে যাবে । ভাইয়া , যাই প্লিজ ? নিয়ে যাবে ?
সাবা থামিয়ে বলে….
” কিন্তু আপু , আসল নাটক তো শুরু হবে রাতের দিকে । আগে পালা গান হবে । নাটক শুরু হয়ে শেষ হতে হতে সেই মধ্যরাত্রি । ওসবে বড়রা থাকবে । ভুজুং ভাজুং কিসব হবে না হবে , বোর হবে তোমরা । আর এমনিতেও , মানুষের ভিড় থাকবে অনেক । অতো রাতে ওখানে যাবে ? আব্বু বকবে !
মেঘার ইচ্ছে জাগে । যাত্রা দেখা হয় নি । এই সুযোগে দেখা হলে মন্দ হয় না । সে ইচ্ছে প্রকাশ করে আমতা আমতা করে…
” আমরা যদি সবাই মিলে যাই , তবুও বকবে ?
ভাইয়া , একবার যাই না যাত্রা দেখতে ? একটু দেখেই চলে আসবো ।
আদ্র মেঘার ইচ্ছে টুকু বুঝলো । কিন্তু উপায় নেই । ওকে ফিরতে হবে আজ । ভার্সিটি আছে কাল । আধো চোখে মেয়েটাকে পরখ করে বললো সে…
” না মেঘ , রাতে বাড়ি থেকে বেরোনোর প্রয়োজন নেই । আমরা থাকবো না । আমি আর ভাইয়া বিকেলে চলে যাচ্ছি বাড়িতে । তোরা একলা থাকবি । একা একা ওসবে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না ।
” তুমি বাড়ি ফিরবে আজ ?
” হুম । বিকেলের দিকে রওনা দেবো । ভাইয়াও যাবে । ভার্সিটি আছে আমার । আর ভাইয়ার অফিস । আমাদের থাকা হচ্ছে না । তোরা তিনটে একসাথে থাকবি । আমার আর আসা হবে না । ভাইয়া কাল অথবা পরশু আবার এসে নিয়ে যাবে তোদের ।
” থেকে যাও না , একসাথে বাড়ি ফিরবো কাল । আজ যাত্রা দেখতে যাবো সবাই মিলে ।
” না মেঘ বুড়ি , হবে না ।
গ্রামের পরিস্থিতি আলাদা । থেকে গেলেও অতো রাতে নিয়ে যেতাম না ।
মেঘা মুখখানা মলিন করে ।
নামিয়ে নেয় চোখ ।
রৌদ্র পেছনের আম গাছটার কাছে টান টান হয়ে বুকে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে । স্বভাব সুলভ মুখশ্রী নিরেট । এতো বেশি ঘুমের দরুন চোখ মুখ ফোলা তার । শুভ্রর চোখে পড়া মাত্রই শুভ্র ডাকলো ওকে….
” রুডি , ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো ? এদিকে আয় । কথা আছে তোর সাথে ।
আদ্র ঘাড় কাত করে চায় ভাইয়ের দিকে । রৌদ্র সহসা এগোনো মাত্রই শুভ্র প্রশ্ন করে সোজাসুজি…..
” কখন এসেছিস কাল ?
” সাড়ে তিনটের বেজেছে !
ভনিতা হীন উত্তর । থেমে প্রশ্ন করলো আদ্র….
” অতো রাতে , বাইকে এসেছিস ?
উত্তর নেই । বরাবরের ন্যায় তিক্ততায় আদ্রকে উপেক্ষা করলো রৌদ্র । কিয়ৎ কালেও উত্তর না পেয়ে শুভ্র একই প্রশ্ন করলো…..
” কি হলো বল । বাইকে এসেছিস ?
” হু ।
” বেরিয়েছিলি কখন বাড়ি থেকে ?
” দেড় টার দিকে !
চরম বিস্মিত হলো শুভ্র আর আদ্র । ফ্যাল ফ্যাল অবিশ্বাসে চাইলো একে অপরের দিকে । এই ছেলে বলে কি ? শুভ্র কিঞ্চিত অবিশ্বাস নিয়েই বললো….
” রুডি , আর ইউ সিরিয়াস ? তুই সেই মাঝরাতে টানা ড্রাইভ করে দুঘন্টায় গ্রামে এসেছিস ? লাইক সিরিয়াসলি ? সিটি থেকে মিনিমাম ১৩০ কিলোমিটার দূরত্বে আছি আমরা ! আর তুই এই এতোটা পথ দু ঘন্টায় পাড়ি দিয়ে এসেছিস ?
” কোথায় অতোটা ? কম ছিলো তো ! জাস্ট দু ঘন্টা লেগেছে আসতে । স্পীড বাড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে চলে আসতে পেরেছি । নতুবা না আসলে শ্বাস রোধ হয়ে আসছিলো ।
বাঁকা চোখে মেঘা কে দেখলো কথা টুকুনি বলেই ।
পুকুরের পানির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেঘা । শুনছে সবটা , তবে উদ্বেগহীনা ।
শুভ্র গলা ঝাড়লো । বললো…..
” এখানে এসেছিলি তো সেই ছোট বেলায় । পথ মনে ছিলো তোর ?
” যে পথের পথিক আমি , সে পথ ভুলবো কি করে ? সে পথ , পথের দূরত্ব পেরিয়ে গন্তব্যে যে আছে আমার রেড ফ্লাগ । সেই রেড ফ্লাগের টানে পথ খুঁজে নিয়েছি ।
মনে মনে কথাটুকু আওড়ালো । মুখে বললো রাশভারী গলায়….
” আমি কিছু ভুলি না ।
শুভ্র ভাইয়ের দিক থেকে চোখ নামায় । হাফ ছেড়ে বলে…
” দেখতেই পাচ্ছি ।
আদ্রের ফোন বেজে উঠলো । তোফায়েল কাবির ফোন করেছেন । নিশ্চয়ই রৌদ্রের খোঁজে । আন্দাজ ভুল হলো না আদ্রের । ফোন কানে তুলতেই ওপাশ থেকে রাশভারী গলায় প্রথমেই প্রশ্ন ছুঁড়লেন তোফায়েল কাবির….
” কোথায় তোমরা ? ভাই কোথায় তোমার ?
আদ্র রৌদ্রের দিকে তাকায় । উত্তর করে….
” এখানে !
” ওখানে মানে ? কখন গেছে সে ?
” মাঝরাতে !
” বাহ্ , মাঝরাতে ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ চলে গেছে ঐ ছেলে ? কেনো ? কি দরকার ওখানে তার ?
বাড়িতে তো থাকে না । গেছে তো গেছে , নিজের মাকে অবধি বলে যায় নি । মাঝরাতে কোন দরকারে ওখানে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লো তোমার ভাইয়ের ?
আদ্র নিশ্চুপ ।
সকালে উঠেই ছেলে কে ঘরে না দেখে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলেন রুবিনা কাবির । ফোন করেও ফোনে পান নি । দুপুর গড়াতে না গড়াতে চিন্তা বেড়েছে । তোফায়েল কাবিরের আন্দাজ ঠিক ছিলো একদম । তিনি সোজাসুজি এখানেই ফোন করেছেন । আর যা ভেবেছিলেন তাই হলো । তার বেপরোয়া ছেলে কোনো কিছুর পরোয়া না করে গ্রামে পৌঁছেছে মাঝরাতে । এটাই তো দেখার ছিলো তার ।
মেঘা কে রৌদ্রের থেকে দূরে সরাতে চান তিনি । আর তার বেপরোয়া ছেলে তার চাওয়া কে তোয়াক্কা করে না । দ্বিধাদ্বন্দ্বে ডুবেছেন তোফায়েল কাবির । কোথায় ভাবলেন কদিনের জন্য মেঘা কে গ্রামে পাঠিয়ে দূরে সরিয়ে রাখবেন একটু । কিন্তু না , যার থেকে দূরে সরালো , সেই আরো কাছে গিয়ে বসলো । এখন হুটহাট তো শহরে ফিরিয়ে নেওয়াও যাবে না মেঘা কে ।
কথা শেষ করে ফোন রাখলো আদ্র । ও আর শুভ্র ফিরবে বিকেলের পর ।
সেই দুপুরের পর রৌদ্র বেরিয়েছিলো কোথাও । এ বাড়িতে খায় নি কিছু । কাউকে কিছু না বলেই কোথায় গেছে হোদিশ নেই । আদ্র আর শুভ্র বিকেলের পর শহরে ফিরে গেছে । অতঃপর রৌদ্রের দেখা মিলেছে সন্ধ্যার আজানের সময় । বাইক নিয়ে বেরিয়েছিলো ।
বিদ্যুৎ চলে গেছে । এই সন্ধ্যাতেই কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে পুরো গ্রাম । ঘুটঘুটে অন্ধকার চারপাশে । পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্লাশ অন করলো রৌদ্র । বাড়িটা ভুতের বাড়ির থেকে কম কিছু মনে হচ্ছে না এই আঁধারে । গেইট পেরিয়ে সদরে কড়া পড়তেই হাতে টর্চ নিয়ে দরজা খুলে দিলেন আনতারা বেগম । রৌদ্র কে দেখে বিচলিত হয়ে বললেন তিনি……
” রৌদ্র , কোথায় ছিলে তুমি সারাদিন ? সেই যে বেরোলে , আর তো ফিরলে না । কিছু খাও নি এখনো পর্যন্ত ।
মেঘা কেও কিছু বলে যাও নি । কতবার জিজ্ঞেস করলাম তোমার কথা । জানে না ও , তুমি অন্তত মেয়েটা কে বলে যাবে তো ?
” শহরের দিকে গেছিলাম একটু ।
” এসো এসো , ভেতরে এসো আগে । আদ্র আর শুভ্র চলে গেছে , আমি ভাবলাম তুমিও বোধহয় চলেই গেছো ।
ফোনের আলোয় ভেতরে ঢুকলো সে । ডান পাশের ঘরে হলদে ঝিলিক দেখা যাচ্ছে । বোধহয় মোমবাতি জ্বলছে ।
কথার শব্দও শোনা যাচ্ছে সেখান থেকে । বাকিরা হয়তো ওখানে । আনতারা বলতে বলতে ঢুকলেন….
” গ্রাম তো, লোড শেডিং হয় মাঝে মাঝে । একটু পরেই কারেন্ট চলে আসবে । তুমি ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও । আমি মেঘা কে পাঠাচ্ছি তোমার ঘরে । আর শোনো , ঐ কর্নারের ঘরটায় যেও । ওয়াশ রুম আছে ওটাতে ।
সাবার ঘরে একসাথে বসে আছে সকলে । আনতারা বেগম ট্রেতে করে কিছু নাস্তা আর এক কাপ কফি করে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন । কারেন্ট নেই বিধায় পড়া হচ্ছে না সাবার । বসে বসে আনমনা না থেকে চার রমনী ফোনে লুডু খেলছে বোরিং সময় কাটাতে । আয়াজ পাশে বসে টুকটুক করে দেখছে । ওকে খেলায় নেওয়া হয় নি বিধায় গাল ফুলিয়ে রেখেছে ও । আনতারা বেগম ঘরে ঢুকেই তাগাদা দিয়ে
বললেন….
” মেঘা , রৌদ্র ফিরেছে । সারাটা দিন ছেলেটা কিছু খেলো কি না কে জানে । তুমি ওকে এই খাবার টুকু দিয়ে আসো গিয়ে । কফি খাওয়া তো ওর অভ্যাস । কারেন্ট আসলে ডিনার করবে পরে । এখন গিয়ে এটুকু দিয়ে এসো ।
মেঘা পড়ে বিড়ম্বনায় । রৌদ্র আবারো ফিরবে , এটা ওর অবাধ্য মনে আন্দাজে ছিলো । নড়েচড়ে আমতা আমতা করে সে….
” মামি , আমি যাবো ?
” হুম । তুমি নয়তো কে ? তুমি না ওর বউ !
সহসা চিবুক নামায় মেঘা । মেহের পরিস্থিতি বুঝে ধীরে বলে….
” এটুকুই তো । কথা না বাড়িয়ে দিয়ে এসো মেঘা ।
আয়াজ কে সাথে নিলো মেঘা । ফ্লাশ জ্বালিয়ে ওর হাতে ফোন ধরিয়ে দিয়ে নিজে নিলো খাবারের ট্রে । অন্ধকার ভেদে রৌদ্রের ঘরটার দিকে এগোলো । দরজা খোলা । মেঘা তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকলো । ওয়াশ রুম থেকে পানির আওয়াজ আসছে । তার মানে ঐ লোক ভেতরে । ধরা না দিয়ে কেটে পড়তে পারলেই বাঁচা যায় । মেঘা চটজলদি ট্রে রেখে আয়াজের হাত চেপে ধরে বললো….
” চলো….
আবছা আলোয় দ্রুত পা চালাতে গিয়ে হোঁচট খাওয়া বাদ পড়লো না উদ্যমী রমনীর । দরজার পাশের টেবিলের পায়ায় কনিষ্ঠা আঙ্গুল বাড়ি খেলো । সহসা ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো রমনী । টেবিলে হাত ঠেসে পা উঁচু করলো চিনচিনে ব্যাথার চোটে । মুখ কুঁচকে ছোট করলো ।
কুকিয়ে ওঠা শুনে বিচলিত হয় আয়াজ….
” কি হলো আপু ? ব্যাথা পেয়েছো ?
” না , কিছু না ।
এর মধ্যেই রৌদ্র বেরিয়ে এসেছে । মেঘা আর পা বাড়াতে পারলো না লোকটার উপস্থিতিতে । মেঘা কে ওভাবে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকায় রৌদ্র । পাশে আয়াজ কে দেখে বিরক্তি নিয়ে বলে….
” কি হয়েছে ?
” অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে আপু পায়ে ব্যাথা পেয়েছে ভাইয়া ?
” হোয়াট ?
তেড়ে আসলো রৌদ্র । মেঘার দিকে আসতেই মেঘা পেছায় আঁতকে । ওকে অবাক করে দিয়ে বিচলিত হয়ে বলে রৌদ্র…..
” ইভারা , কি হয়েছে ? ব্যাথা পেয়েছো পায়ে ? কোথায় দেখি !
হাঁটু মুড়ে বসলো সে । ফোন হাতে ফ্লাশ তাক করলো মেঘার পায়ের দিকে । হাত বাড়াতে গেলে মেঘা ছ্যাত করে পিছিয়ে যায় !
” কি করছেন ? কিছু হয় নি আমার ।
রৌদ্র পাত্তা না দিয়ে ঘাড় কাত করে আয়াজ কে বলে ভারী গলায়….
” তুই যা এখান থেকে !
ছেলেটার পালাতে দেরি হলো না ।
ভড়কালো মেঘা । ঢোক গিললো অন্ধকারে । ওরনার কোণা খামচে আরেক কদম পেছালো । উঠে দাঁড়ায় রৌদ্র । দরজা আটকে দেয় । আরো বেশি ভয়ে কুঁকড়ে যায় মেঘা । এই লোকটাকে মাঝে মাঝে কেমন ভয় লাগে ওর । এনার কাছাকাছি, সংস্পর্শে থাকা মানেই যে অঘটন । বারংবার নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে ঔদ্ধত্যা ভুলে বেখেয়ালি হয়ে পড়ে মেঘা । শক্ত খোলস ধরে রাখতে পারে না ।
রৌদ্র ওর দিকে ফেরা মাত্রই ভেজা গলা ঠেলে শক্ত করে মেঘা….
” দরজা আটকালেন কেনো ? খুলে দিন । বেরোবো আমি !
” আজ এঘর থেকে আর বেরোনো হচ্ছে না তোর ।
” মানে ?
” মানে , আজ রাতে তোকে লাগবে আমার । অন্য ঘরে থাকলে অসুবিধায় পড়ে যাবো । তাই এ ঘরে থাকবি তুই আজ !
” হোয়াট ?
মেঘা চেঁচিয়ে ওঠে । রৌদ্র ডান পাশে মুখ ফেরায় । কপাল চুলকে ওষ্ঠ পিষে হাসে । গলা ঝাড়ে । এগিয়ে গিয়ে ফোনের ফ্লাশ মেঘার মুখের উপর তাক করে ঝুঁকে বলে হাস্কি টোনে..
” আজ তোমাকে আমার লাগবে ,, সানিইই । এতো অবুঝ কেনো তুমি ?
মেয়েটা শিউরে ওঠে । দ্রুত ঢোক গেলে লাগাতার । ঘন পলক ফেলে চোখে । মেয়েটা কে আরো বেশি আঁতকে দিয়ে ছলাৎ করে রুমের আলো জ্বলে উঠলো । কারেন্ট আসলো এক ঝটকায় । চমকে ঝাঁকুনি দিয়ে চোখ খিচে বন্ধ করলো মেয়েটা ।
রৌদ্র এপাশ ওপাশ তাকায় । পরক্ষনে সামনে । মেয়েটাকে চোখ খিচে ভয়ে চুপসে থাকতে দেখে শিথিল হয় অক্ষি যুগল । কেমন অদ্ভুত ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকায় সে । অপরুপা শ্বেতাঙ্গ রমনীর নিখুঁত মুখাবয়ব দেখে দৃষ্টি ভরে । আনমনে হাসি দেখা দেয় ওষ্ঠপূটে ।
মেঘা পিটপিট করে তাকায় । রৌদ্র কে দেখে আরো পিছিয়ে যায় । কঠিন হয়ে বলে….
” লিমিট ক্রস করবেন না ।
আপনি অসভ্য হতে পারেন , কিন্তু এ বাড়ির কেউ নয় । অতিথি বাড়ি এটা । বাড়াবাড়ি করবেন না বলে রাখলাম ।
মেঘা ওকে পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে এগোয় । এ ঘরের দরজা আলাদা । ছিটকিনি মাঝ বরাবর । মেঘার নাগাল পেতে বেগ পোহাতে হয় না । রৌদ্র ওকে ছাড়লো । ছাড় দিলো এসময় । ঠিক সময়ে ঠিক বুঝে নেওয়া যাবে । দরজা খুলে গটগটিয়ে বেরিয়ে গেলো মেঘা ।
শাহিন আলম বাড়িতে নেই । বাড়িতে আজ কেবলই মহিলা’গন । রৌদ্র আছে সুপুরুষ । আটটার পর পর ডিনার শেষে গেইট , সদর , সব কড়া ভাবে অবলোকন করে বন্ধ করে দিয়েছেন আনতারা বেগম । গ্রামে আবার সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যায় । দশটা হতে হতে পুরো বাড়ি শান্ত । বারোটার পর নিশুতি রাত নেমে আসে গ্রামে । জেগে থাকে না কেউ ।
চেয়ারম্যান বাড়ির সবাই এ মুহূর্তে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ।
মেহের আর সাবা এক রুমে শুয়েছে । আর শাফাহ্ মেঘা অন্য রুমে । এক রুমে রৌদ্র একা । আয়াজ তার মায়ের কাছে । রৌদ্র কে ভয় পায় সে । ভয়ের চোটে ওর কাছ ঘেঁষে নি আর ।
রাত্রি এখন প্রায় দেড়টার দোর গোড়ায় ।
খট করে দরজা খুললো । চৌকাঠ মাড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো একখানা সুঠাম দেহের ছায়া । ডিম লাইট জ্বলছে ঘরে । ছায়া মানব নির্দ্বিধায় এগোলো তার মানবীর পানে । গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন একবিংশী । উষ্ণ গরম শ্বাসে ভ্যাপসা পুরো ঘর । রৌদ্র হাঁটু গেড়ে বসে খাটের পাশে জমিনে । ইডিয়ট টা আর ধরা দেয় নি ওর নাগালে । বিরক্তিতেও ক্ষিণ হাসে রৌদ্র । মেয়েটা কে জ্বালাতে হাত বাড়িয়ে ছুঁইয়ে দেয় ওকে । ঘুমন্ত রমনীর অগোছালো চুল সরিয়ে দেয় মুখের উপর থেকে । কপোলে পূর্ণ হাতে স্পর্শ করে ।
কাঁপে একবিংশী । রৌদ্র ওকে জাগাতে ডাকে…..
” এইই ইডিয়ট ?
মেঘার ঘোর লাগে ঘুমের মধ্যে । স্বপ্ন ভেবে উড়িয়ে দেয় । শোয় নড়েচড়ে । আবার ডাকে রৌদ্র….
” ইভারা,,
ঘুমের আচ্ছন্নতায় পিটপিট করে তাকানো মাত্রই সামনে বেঘোরে ছায়া মতো কিছু একটা দেখেই আঁতকে ওঠে মেঘা । ধড়ফড়িয়ে চমকে লাফিয়ে ওঠে মেয়েটা । ভয়ে ডরে চিৎকার করার আগেই ঠোঁট জোড়া চেপে ধরে রৌদ্র । জবান আটকে চাপা স্বরে বলে…..
” ইডিয়ট , এটা আমি !
বড় বড় চোখে চায় মেঘা । ঘন বেগতিক শ্বাসের দরুন বক্ষ ওঠানামা করছে তার । কাতর আঁখিতে বেপরোয়া লোকটাকে দেখে পলক ফেললো ঘন । ছিটকে রৌদ্রের হাত দূরে ঠেলে পাশে শাফাহ্’র দিকে তাকালো । বেঘোরে ঘুমোচ্ছে সে । মেঘা ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়….
” আ… আপনি এখানে ? এতো রাতে ?
” হুঁ । তোর জন্যই তো , ইডিয়ট । সহজ পথে কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছিস । বললাম ঐ রুমে থাকতে । শুনলি আমার কথা । ওখানে থাকলে এখন এখানে আসতে হতো না আমায় । চল ওঠ…
” কেনো ?
” উঠতে বলেছি ওঠ । বেরোবো তোকে নিয়ে !
” কোথায় ?
” গ্রামে ! রাতের গ্রাম ঘুরে আসি চল ।
বাড়ির ভেতরটা নিস্তব্ধ হলেও বাইরেটা নিস্তব্ধ নয় । গান বাজনার তাল ভেসে আসছে অদূর থেকে । সদর খুলে মেঘা কে নিয়ে বাইরে বেরিয়েছে রৌদ্র । সাবধানী হয়ে দরজা আটকেছে আবার ।
মেঘা স্থবির । রৌদ্রের কথার বিপরীতে বেশি অবাধ্যতা দেখায় নি । ধমকে চুপ রেখে ওকে বাইরে নিয়ে এসেছে রৌদ্র । ঘুম ছুটিয়ে বেরোলো দু’জনে ।
মেঘা কান পেতে অদূর হতে ভেসে আসা যাত্রার ঢাক ঢোলের বাজনা শুনলো ।
মেঘা পিটপিট করে শুধালো….
” যাত্রা দেখতে যাবেন আমায় নিয়ে ?
” হু !
সহজ সরল স্বীকারোক্তি রৌদ্রের । মেঘা চিকচিক করে ওঠে । নিষ্পাপ মুখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে….
” সত্যিই ?
” মিথ্যে নয় ।
মেঘা তাড়া দেয়………
” তাহলে চলুন । আমি না কখনো এসব যাত্রাপালা দেখিনি । আদ্র ভাইয়াকে বললাম নিয়ে যেতে । কিন্তু ভাইয়া তো থাকলো না । থাকলে ঠিক নিয়ে যেতো ।
রৌদ্র চোয়াল খিচলো । বাইকের চাবি পকেটে ঢুকিয়ে চিবিয়ে বললো…..
” ইডিয়ট , আর একবার ওর নাম মুখে নিলে এক্ষুনি মত পাল্টে ঘরে গিয়ে ঘুমাবো আমি । ঘুম উড়িয়ে তোকে আমি নিয়ে যাচ্ছি । ও নয়….
” না , চলুন…
আমি যাবো !
বাইক বের করলো না রৌদ্র । এখান থেকে স্কুলের পথ হাঁটার দুরত্বে পাঁচ মিনিট । হেঁটেই চলে যাওয়া যাবে । এতো রাতে বাইকের শব্দের বাদবাকিদের ঘুম হালকা না করাই শ্রেয় । গেইটের বাইরে বেরিয়ে মেঘার হাত খানা শক্ত করে চেপে ধরে সে । মেঘা নিজের হাতের দিকে তাকায় কোমল দৃষ্টিতে । আচানক সম্বিত ফেরে , প্রশ্ন জাগে মনে , আজ ও কঠোর হলো না কেনো ? নিজের স্বার্থে ? নিজে যাত্রা দেখতে চায় , তাই অবাধ্য হলো না ? নতুবা রৌদ্র জোরাজুরি করলে তো ঠিক অবাধ্য হতো । কড়া হতো সে বেলায় । কিন্তু এ বেলায় নিজ স্বার্থে কোমল সে ।
বাকি রইলো রৌদ্র , সে কেনো যাচ্ছে এই রাতে নাটক দেখতে ? নিজে দেখতে নাকি মেঘা কে দেখাতে ?
হাঁটতে হাঁটতে পথ যত কমে আসে, ঢাক ঢোলের বাজনা শোনা যায় তত বেশি ।
দূরে আলোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছে । মানুষের ভিড় নজরে পড়ছে । রৌদ্র থামলো । গোটা রাস্তা ফোনের ফ্লাশের আলোয় পা বাড়িয়েছে মেয়েটাকে আগলে রেখে । এ বেলায় থেমে মেঘার দিকে ফ্লাশ তাক করলো ।
মেয়েটার মাথায় ওরনা এঁটে রাখা । রৌদ্র ওকে পরখ করে এগোলো আবার । সামনে অনেক ভিড় । হলদেটে বাল্ব জ্বলছে এখানে ওখানে । স্কুলের বারান্দা , মাঠ , সব মানুষে গিজগিজ করছে । দলে দলে ভিড় জমিয়েছে মানুষ । ফাঁক নেই কোথাও । ভ্যাঙ্গানো কন্ঠস্বর ভেসে এসে আসছে ভেতর থেকে । রৌদ্র আবারো থেমে বিরক্তিতে কপাল গুটায় । এতো সব মানুষের ভিড়ে এখানে আসাটাই বৃথা । সামনে এগোনো মানে একেক জনের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি হবে । কতশত মানুষ । বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে গ্রামের ছেলেপেলে সবাই । মহিলা নেই কোথাও ।
রৌদ্র বিরক্তি নিয়ে মেঘার দিকে তাকালো । সবার পেছনে অনেকটা দুরে দাঁড়িয়ে আছে ওরা । মেঘা পিটপিট করে বৃদ্ধা আঙ্গুলে ভর করে পা উঁচিয়ে মানুষ টপকে ভেতরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করছে । রৌদ্র বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে ধমকালো….
” ইডিয়ট , এখানে কি দেখতে এসেছিস ? ভিড় দেখেছিস মানুষের !
মেঘা কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলে…
” আমি আসলাম , নাকি আপনি আমায় নিয়ে আসলেন ?
” আসতে তো চেয়েছিলি তুইই । কি দেখবি এখন এখানে ?
” আমি আসতে চেয়েছি । আপনাকে এটা বলিনি যে, আমায় নিয়ে আসুন । আরেকটু আগে চলুন । সবাই দেখছে ঐতো । যা হচ্ছে তাই দেখবো !
” এখান থেকেই দেখ । ভেতরে অনেক ভিড় , যাওয়া হবে না ওদিকে ।
” এখান থেকে আপনার রাইনো মুখো থোবড়া ব্যাতীত আর কিছুই দেখতে পারছি না । আরেকটু সামনে চলুন ।
রৌদ্র কটমট করে তাকায় । মুখ বাঁকায় মেঘা ।
চোখ উল্টিয়ে সামনে তাকায় । রৌদ্র ওষ্ঠপূটে দাঁত বসায় । নিজেদের হাতের দিকে তাকায় । সে সেই কখন ছেড়েছে মেঘার হাত । বাঁধন আলগা করেছে । অথচ একে অপরের হাত আলাদা হয় নি এখনো । বাঁধন চ্যুত হয় নি । রমনী নিজেই শক্ত করে ধরে রেখেছে বেপরোয়া লোকটার হাতখানা । রৌদ্রের মন প্রশান্ত হয় । হাসে এক পশলা ।
হীম হয় অন্তঃস্থল ।
এগোয় আরেকটু । মানুষ জনের থেকে দূরত্ব রেখে পিছনে দাঁড়ায় । সে লম্বা হওয়ার দরুন দেখতে পারছে । উঁচু মঞ্চে পালা রচিত হচ্ছে । অদ্ভুত ভিন্ন পোশাকধারী কুশীলব । কিসব আবোল তাবোল সংলাপ ঝাড়ছে । সাথে সাথে হারমোনিয়াম শোনা যাচ্ছে মাইকে । এসব মাঝপথে এসে বোঝা যায় নাকি ?
মেঘা শত কসরতেও উঁচু হয়ে দেখতে পারলো না । ঝাইঝাই করে উঠলো এক রাশ বিরক্তিতে…..
” উফফফ , দেখবো না আমি । বাড়ি চলুন । কেনো নিয়ে আসলেন এখানে ? কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না ।
” আমি তো পাচ্ছি । আরেকটু লম্বা হলে তুই ও পারতি ।
” আরেকটু খাটো হলে আপনিও পারতেন না । যত্তসব । আমি থাকবো না এখানে । দেখবো না কিছু । চললাম আমি….
রৌদ্র ওকে থামায় । টেনে ধরে আচমকা কোমর জড়িয়ে নেয় মেয়েটার । ভ্যাবাচ্যাকা খায় মেঘা । রৌদ্র হুট করেই মেয়েটার কোমর শক্ত করে চেপে ধরে । নিজের সাথে ঠেসে ধরে শূন্যে ভাসিয়ে উঁচিয়ে তোলে ছিপছিপে নারী শরীর টা । জমিন হতে এক ফুট উপরে তুলে নিজ বরাবর করে মেয়েটাকে । মেঘা গোল গোল চোখে তাকায় । নিজেকে সামলে নিতে কাঁধ খামচে ধরে রৌদ্রের । চোখে চোখ রেখে বলে থতমত কম্পিত স্বরে…..
” কি করছেন ? পড়ে যাবো তো ! নামান আমায় !
” পড়বি না । আমি আমার জিনিস সামলে রাখতে জানি । আর তুই তো আমার প্রপার্টি । হয়েছি সমান সমান । এবার দেখ ।
মেঘা ঢোক গেলে । মঞ্চের দিকে তাকায় ।
একটু চোখ বুলিয়ে দেখে লোকটার থেকে ছাড়া পেতে বলে….
” নামিয়ে দিন , দেখবো না আমি । বাড়ি যাবো !
” দেখবি না কেনো ইডিয়ট ?
” ইচ্ছে নেই তাই । অনেক মানুষ আছে এখানে । কেউ দেখে ফেলবে আমাদের এ অবস্থায় । ছাড়ুন প্লিজ ।
” সত্যিই দেখবি না ?
” উঁহু !
রৌদ্র নামালো ওকে । জোর করলো না । পকেটে ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে । ওকে নামিয়েই মনযোগ ফেরালো সেদিকে । ফোন বের করে স্ক্রিনে নজর বুলিয়েই তড়িতে ছলাৎ করে মেঘার দিকে তাকালো । ফোনটা চেপে ধরে এক প্রকার আড়াল করে বললো…..
” এখানে দাঁড়া , আমি কথা বলে আসছি । কোত্থাও যাবি না । গটইট….?
মেঘার উত্তর না শুনেই রৌদ্র বড় বড় ধাপে দূরত্ব বাড়ালো । কিছু দূরত্বে গিয়ে ফোন রিসিভ করে কানে ঠেকালো । মেঘা সূক্ষ্ম নেত্রে অনুমান করলো , আঁধারের কোলে নিজেকে আড়াল করে লোকটা কথা বলছে ফোনে । ক্ষিয় হাসি ওষ্ঠপূটে । সেটুকুও নজর এড়ালো না ধারালো রমনীর । কপালে ভাঁজ ফেললো তীক্ষ্ণ । কার সাথে কথা বলছে এই লোক ? এভাবে দূরে দাঁড়িয়ে নিজেকে আড়াল করে লুকিয়ে । কে আছে ফোনের ওধারে ?
সঙ্কিত প্রশ্ন জাগে রমনীর হৃদয়ে । চোখ ফিরিয়ে নেয় সে ।
যাত্রা পালার শেষের দিকে এসেছে ওরা । দোকানপাট ততক্ষণে সব বন্ধ হয়ে গেছিলো । মানুষের ভিড় ভেঙ্গে যাচ্ছে । তার মানে নাটক শেষ । শেষের পাঁচ মিনিটে এসেছে ওরা ।
রৌদ্র মেঘা কে একলা দেখে তড়িঘড়ি করে ফোনে কথা শেষ করলো । মেঘার কাছে এসে হাত ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতেই পিছিয়ে গেলো মেঘা । চিবুক নামিয়ে ভার গলায় বলল…..
” ধরতে হবে না । আমি একলা হাঁটতে পারবো ।
রৌদ্র উপেক্ষা করলো । জেদ দেখিয়ে হাত টেনে ধরলো ওর । দাঁত পিষে উচ্চারণ করলো…..
” ইডিয়ট , সিনক্রিয়েট করছিস কেনো হঠাৎ ?
” ফোনে কার সাথে কথা বলছিলেন আপনি ?
চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কন্ঠে প্রশ্ন করলো মেঘা । রৌদ্র ভ্রু জড়ো করে । প্রশ্ন এড়িয়ে যায় । উত্তর করে দায় সারা….
” কেউ না ।
” আমিও আপনার কেউ না । হাত ছাড়ুন বলছি ।
” তুই আমার সব , ইডিয়ট । চল , মানুষ’জন আসছে এদিকে ।
” আগে ছাড়ুন । তারপর যাবো আমি ।
” ইভারা , অবাধ্য হবি না ।
” জোর করে বাধ্য করার চেষ্টা করবেন না আমায় । হাত ছাড়ুন । আপনি আমার হাত না ধরলেও যেতে পারবো আমি ।
পিছনে গুটিকয়েক লোক হাজির হয়েছে । যাত্রাপালার সবাই এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে পুরো স্কুলের মাঠে । মধ্যবয়স্ক চার পাঁচ জন পুরুষ একটা মেয়ে আর একটা ছেলেকে ওভাবে দেখে দ্রুত এগিয়ে আসলো । বললো একজন…..
” ওই পোলা , কি হইতাছে এইখানে ?
রৌদ্র বিরক্ত হলো তাদের উপস্থিতিতে । বললো গম্ভীর মুখে….
” নাথিং । আপনারা যান এখান থেকে !
” মাইয়াডারে বিরক্ত করতাছো ? কে তোমরা ? আগে তো কখনো দেখি নাই এ গ্রামে ! যাত্রা দেখতে আইছো ? আর মাইয়াডার হাত ধরছো ক্যান এমনে ?
” সেটা আমাদের ব্যাপার ! আপনারা নাক গলাচ্ছেন কেনো ?
” নাক গলামু না ? চেনা নাই জানা নাই , কই থাইকা আইছো তোমরা ? গ্রামের মনে হইতাছে না তোমাদের ! শহর থাইকা আইছো ? আর এই মাইয়া , এইডা কে তোমার সাথে ?
রৌদ্র চরম বিব্রত হয় । ও কিনা জবাবদিহি করবে এই লোকগুলোকে ? রাগে দাঁত পিষে নিজেকে সামলে নিলো । ক্ষুব্ধ স্বরে বলল বেশি কথা না পেঁচিয়ে…..
” সি ইজ মাই ওয়াইফ । তাই আমি ওর হাত ধরেছি , আপনাদের কোনো প্রবলেম আছে এতে ? নিজের কাজে যান না ।
মেঘা চিবুক নামিয়ে সিটিয়ে দাঁড়িয়েছে । রৌদ্রের জোর খাটানো কথাটায় চোখ তুলে তাকালো । একজন হিতাহিত না বুঝে বলে উঠলো মেঘার উদ্দেশ্যে….
” ওই মাইয়া , এই পোলা ঠিক কইতাছে ? এইডা তোমার ওয়াইফ ?
মেঘা শোনা মাত্রই ভ্যাট ভ্যাট তাকালো । পরক্ষনে ঠোঁট চেপে ফিক করে হেসে উঠলো । ফোঁস করে উঠলো রৌদ্র…..
” স্টুপিড ইল্লিটারেট, আমি ওর ওয়াইফ নই । ও আমার ওয়াইফ । মানে বোঝেন ? স্ত্রী ও আমার । আরো বুঝিয়ে বলবো ? বিয়ে করা বউ ও আমার । বউ মানে ঘরের বউ । অর্ধাঙ্গিনী ।
লোকটা মাথা দোলায় । আবার বলে….
” তুমি ক্যান কথা কও ? আমি মাইয়াটারে জিগাইছি । এইটা তোমার স্বামী ? এই পোলারে চেনো তুমি ?
” হুম ।
শেষের কথাটার উত্তর করেছে মেঘা । ছোট্ট উত্তরে আর বাড়াবাড়ি করলেন না কেউ । পরিস্থিতি সামলে চলে গেলেন সকলে ।
রৌদ্র বিরক্তি ঝেড়ে মেঘার দিকে তাকালো । ফের হাত চেপে ধরে রেগে বললো…..
” ইডিয়ট , বাড়াবাড়ি না করলে শান্তি হয় না তোর ?
চল এখন…..
মেঘার সেই জেদ…..
” হাত ছাড়ুন । তারপর যাবো ।
” তুই চাইছিস আমি বাড়াবাড়ি করি ? তো নে , সামলা এবার !
কথা টুকু শেষ হতে দেরি হলো , রৌদ্রের ওকে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিতে দেরি হলো না । ঝট করে মেয়েটাকে আগলে কোলে তুললো । নিয়ন্ত্রণ হারালো মেঘা । তড়িঘড়ি করে রৌদ্রের কলার খামচে ধরলো নিজেকে সামলে নিতে । রৌদ্র মেঘা কে এক হাতে সামলে অন্য হাতে ফোনের আলো ধরলো । পা বাড়ালো দৃঢ়তায় । ঘন পলক ফেলে খিটখিট করে উঠলো মেঘা…..
” রাইনো মুখো , আপনার সাথে আসাটাই ভুল হয়েছে আমার । নামিয়ে দিন আমায়…..
” ইউ ইডিয়ট , জবান বন্ধ করতে পারিস না এক মুহুর্ত ? আর একবার উঁচু স্বরে কথা বললে ঠাস করে ফেলে দেবো কোল থেকে ।
মেঘা রেগেমেগে তাকায় । একটু থেমে আবার বলে রৌদ্র…..
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২৩
” খাস না কিছু ? শরীরের হাল তো বেহাল । এই শরীরে এতো তেজ আসে কোথা থেকে তোর ? ইডিয়ট ।
” রাইনো মুখো ।
” শাট আপ ।
” ইউ শাট আপ ।
” ইভারা , রাগাবি না আমায় ।
