আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৮
সুরভী আক্তার
মাঝে সময় কেটেছে ।
শিশির আর ইকরার গায়ে হলুদ ছিলো আজ । কাল বিয়ে । দুপুরের দিকে পাড়ার কজন মহিলা মিলে পুরো শরীর জুড়ে হলুদ মাখিয়েছে ওদের ।
হাতে মেহেন্দি পড়া বাকি । সেসব কিছুই হয় নি এখনো । শিশিরের মাতামাতি নেই কোনো কিছুতে । ইকরা যাও টুকটাক দৌড় ঝাঁপ করছে আগামী কালের জন্য ।
মেহমান, আত্মীয় স্বজন বলতে কেউ নেই ওদের । বাড়ি খালি থাকছে না তবুও । পাড়ার এর ওর আনাগোনা লেগেই চলেছে । পুরো পাড়ায় রটে গেছে ,, এ বাড়ির দুই মেয়ের বিয়ে একসাথে ,, এমনকি এক বাড়িতে । বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে হচ্ছে ।
যারা কখনো ফিরেও চায়নি ,, তারাও খাতির জুগিয়ে দেখতে আসছে মাঝে মাঝে ।
শিশির’দের ছোট্ট বাড়িটা একটু আধটু সাজানো হয়েছে ।
এখন সন্ধ্যা । দু বোন উঠেছে ছোট্ট বাড়িটার ছাদে । সাথে আছে আরো দুটো মেয়ে । ইকরার ফ্রেন্ড । একজন সেই ছোট বেলার । অন্যজন কলেজ লাইফের । এই পাশাপাশি বাড়ি ওদের । এসেছে খানিক আগে । শিশির আর ইকরা কে মেহেদি পড়ানো হয় নি এখনো । আজমিরা বেগম নিচের দিকটা সামলে দুই মেয়েকে ছাদে পাঠিয়েছেন ।
ইকরার দুটো ফ্রেন্ড ,, রিতু আর সামহা । দু’জনে দুবোনকে ধরে বসিয়েছে মেহেদি পড়ানোর জন্য । সাধ করেও এসব সজ্জায় হাত রাঙানো হয় না আজ কতদিন । ইকরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চেয়ে রয়েছে নিজের হাতের পানে । মেয়ে দুটো বেশ ভালো মেহেদি লাগাতে পারে ।
এর মধ্যেই সিফাত উঠলো ছাদে । ছেলেটা বেশ খুশি । অসুস্থতা ভুলতে বসেছে । এমন আয়োজন অনুষ্ঠান দেখে নি কখনো । এই প্রথম দু বোনের বিয়েতে দেখছে এসব । হাসি মুখে বোনদের পাশে বসলো সে । শিশির ঠান্ডা স্বরে বলে….
” একা উঠলি উপরে ?
মাথা ঝাঁকায় ছেলেটা । ছাদে ওঠার সিঁড়ি বাড়ির বাইরে । অন্ধকার আবছা । যদি পড়ে যেতো ? সে ভয় আছে এই ছেলের মাঝে ? মুখাবয়বে কিঞ্চিত রাগি ভাব টেনে বলে আবার….
” ঠান্ডা লাগছে না ? এখানে অনেক শীত,, ভাই ! ঠান্ডা লেগে যাবে তোর । নিচে যা ,, আমরা আসছি এক্ষুনি !
সিফাত কথা বলে না এবারো । এমনিতেও বেশি কথা বলে না । বলতে গেলে জিভে জড়িয়ে আসে ।
মাথা ঝাঁকায় না বোধক । অর্থাৎ সে যাবে না । ইকরা মৃদু হেসে বলল….
” আচ্ছা যেতে হবে না । এই নে ,, সোয়েটারের উপর আমার চাদরটা পড়ে নে । তাহলে ঠান্ডা লাগবে না আর ।
দুহাতের উপরি পিঠে মেহেদি লাগানো শেষ । খুব ঘন করে নয় । সাদামাটা করে ডিজাইন করা হয়েছে ।
সিফাতের দিক থেকে ধ্যান সরিয়ে আবারো খেয়ালে মশগুল হলো শিশির । কি যে ভাবছে , তা সেই জানে কেবল । এমনিতেই ও ঠান্ডা স্বভাবের । তার উপর এখন আরো বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে । নিজের রাঙা হাত দুটোর দিকেও ধ্যান নেই । বাম হাতের তালুতে ডিজাইন করা হচ্ছে এখন । শেষ প্রায় । মাঝ বরাবর একটু জায়গা রাখা হয়েছে । নাম লেখা হবে সেখানে ।
এক পর্যায়ে হাতে মেহেন্দি পড়াতে পড়াতে শিশির কে জিজ্ঞাসা করলো রিতু….
” শিশির,, তোমার হাসবেন্ড এর নাম টা বলো দেখি ? হাতে কি লিখে দেবো ?
ভীষণ আনমনা ছিলো মেয়েটা । কানে পৌঁছেছে কথা গুলো । তবে বোধগম্য হয় নি । থতমত খেয়ে পাল্টা জানতে চাইলো…
” হ্যাঁ আপু, কিছু বললেন ?
” বললাম তোমার হাসবেন্ড এর নাম কি ? হাতে লিখতে হয় । লিখবে না তার নাম ?
মেয়েটা চোখ নামায় । নাম উচ্চারণ করতে দ্বিধা লাগে । আড়চোখে ইকরার দিকে তাকায় । ইকরার হাতে আবিদের নাম লেখা হয়েছে ইতোমধ্যে । ইকরা চোখ ইশারা করলো নাম বলার জন্য । ইশারা পেয়ে জড়ানো স্বরে বলতে উদ্যত হয় শ্যামলিনী….
” আয়া….
শেষ করতে পারে না পুরো নামটা । এর আগেই পিছন থেকে ভেসে আসে একটা পুরুষালি রাশভারী স্বর…..
” A,,, A লিখে দিনে ওর হাতে । জাস্ট A । ওর হাসবেন্ড এর নাম A দিয়ে শুরু হয় । ওটা লিখলেই হবে ।
আধো পরিচিত একটা কন্ঠ কর্নকুহরে আঘাত হানা মাত্রই চমকায় রমনী । দ্রুত ফিরে চায় ছাদ থেকে নেমে যাওয়া সিঁড়ির পানে । দুজন যুবক দাঁড়িয়ে । ঠিক আকাঙ্ক্ষিত কন্ঠের অনাকাঙ্ক্ষিত জন ও রয়েছে আবিদের পাশে । আশ্চর্য ভঙ্গিতে চোখ জোড়া বৃহৎ হয়ে আসলো শিশিরের । চোখাচোখি হয়েছে শুরুতেই । যেনো থমকালো ।
বাকি তিন রমনী সহ সিফাত ও তাকিয়েছে সেদিক পানে । ইকরা একটু অপ্রস্তুত হলো । উঠে দাঁড়ালো সহসা । এনাদের তো আসার কথা ছিলো না । তাহলে ,, হঠাৎ ?
অপ্রস্তুত হয়েও হাসার চেষ্টা করলো ইকরা । এক কদম এগিয়ে আমতা আমতা করলো….
” আপনারা এখানে ,,, এই সময়ে ?
আবিদ এগোয় উত্তর করতে করতে….
” ওমা,, আসতে পারি না বুঝি !
” না,, তা নয় ,,, হঠাৎ এলেন । আগে জানান নি । তাই বলছিলাম !
” আগে জানালে এভাবে সারপ্রাইজড হতেন ? সারপ্রাইজড করার জন্যই এসেছি ।
পাশ দিয়েই যাচ্ছিলাম আমরা । ভাবলাম বউদের সাথে একবার দেখা করে যাই ।
আবিদের কথাটার অর্থ ঠিকভাবে বোঝার চেষ্টা করলো না ইকরা । ভালোভাবে শুনলো না । চোখ নামিয়ে বললো আলতো করে….
” ওওও ,,
বাকিরাও উঠে দাঁড়িয়েছে । সামহা আগ্রহী হয়ে জানতে চায় ইনিয়ে বিনিয়ে ।
” ইকরা ,,, ইনি…?
উপর নিচ মাথা ঝাঁকায় ইকরা ।
আদ্রের দিকে নজর দেয় রিতু । চোখ আটকায় অনিমেষে । কি হ্যান্ডসাম ছেলেটা । আঁধারে জ্বলছে দূর হতেই । দাম্ভিক যুবক ,, সটান দাঁড়িয়ে একহাত পকেটে গুঁজে । দৃষ্টি শিশিরের পানে । লোকটাকে ওভাবে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে সন্দিহান হয়ে বলে বসে মেয়েটা…..
” আর উনি ,,, শিশিরের ?
” নাহহহহ….
তৎক্ষণাৎ চেঁচিয়ে বাঁধ সাধলো শিশির । শরীর ঝাড়া দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে বললো….
” না আপু ,,, উনি ভাইয়ার ফ্রেন্ড !
রিতু হাঁফ ফেললো । ঠোঁটে চওড়া হাসি ফুটিয়ে মুখ গোল করে বললো….
” ওওও ।
মেহেদি পড়া শেষ । আবিদ আরেকটু এগিয়ে হাতের দিকে চেয়ে জানতে চায়…..
” দেখি ,,, কিভাবে মেহেদি পড়েছেন ! লিখেছেন আমার নাম ?
ইকরা এক পশলা হাসলো । মৃদুমন্দ লজ্জা পেয়ে হাত এগিয়ে দেখালো । দুহাতের তালুর মাঝ বরাবর দুখানেই আবিদের নাম । তা দেখে লোকটা বেশ প্রশান্ত হাসে । শীতল হয় বক্ষস্থল । রমনীর মুখপানে তাকিয়ে বলে…
” নামটা শুধু হাতে নয় ,, মনেও থাকা চাই কিন্তু । সবটা জুড়ে থাকা চাই….
” আছে ।
উত্তর নিভু স্বরে । শিশির অস্বস্তিতে পড়লো । এখানে ওদের দুটোকে কথা বলার একটু সুযোগ করে দেওয়া উচিত । রিতু আর সামহা কে উদ্দেশ্য করে বললো মেয়েটা…
” আপু ,, চলুন আমরা নিচে যাই ।
সঙ্গে সঙ্গে ওরা সিঁড়ির দিকে এগোয় । সিফাতের দিকে তাকিয়ে আবার বলে মেয়েটা….
” ভাই ,, আমার ওরনা ধর । অন্ধকার আছে সিঁড়ির পথে ।পড়ে যাবি নয়তো । হাত ধরতে পারবো না, মেহেদি লেগে যাবে ।
বাধ্য ছেলেটা তাই করলো । অবুঝের ন্যায় বোনের ওরনার এক কোণা খামচে ধরলো ।
আদ্র এখনো দাঁড়িয়ে সিঁড়ির মাথায় । শিশির এগিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ তুললো । মৃদু স্বরে বলল…
” আপনিও নিচে চলুন স্যার ।
বলেই সে পা বাড়ায় প্রথমে । পেছন পেছন সিফাত । কম প্রস্থে লম্বাটে লোহার সিঁড়ি । ধাপ বেশ উঁচু উঁচু । শিশির একধাপ করে নামছে , আর পিছু ফিরে ভাইকে সতর্ক করছে ,, যেনো ধীরে নামে সে ।
আদ্র কেও সাবধান করতে ভুললো না…
” স্যার,,, ধীরে পা বাড়ান । উঁচু অনেকটা । বেখেয়ালে পা পিছলে যাবে ।
” আমাকে জ্ঞান না দিয়ে তুমি নিজে দেখে চলো বেয়াদব ,, পড়ে যাবে নয়তো ।
শিশির নেমেছে কয়েক ধাপ । সিফাত ধীরে ধীরে পা বাড়াচ্ছে । আগপিছ হয়েছে অনেকটা । ওরনার কোণা টেনে ধরায় রমনীর গলা হতে ওরনাটা অনেকটা ছুটে এসেছে সিফাতের হাতে । আদ্র লক্ষ্য করলো । আজ এই প্রথম হিজাব ছাড়া দেখলো শিশির কে । তবে চুল খোঁপা করা । মাঝ বরাবর সিঁথি । মাথায় ওরনা ছিলো । খসে পড়েছে । টুকটাক খুচরো চুল নেমেছে কপালের দুধারে ।
আদ্র বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারে নি তখন ।
এখন নামছে আর দেখছে অপলক । তবে পিছু থেকে । মুখ দেখতে পারছে না । ওরনা সম্পুর্ন টা সিফাতের হাতে খুলে এলো বলে । আদ্র চোখ সংবরন করে । তড়িঘড়ি করে সিঁড়ির শেষ মাথায় নেমে সিফাতের হাত টেনে ধরে । ধীরে বলে….
” ভাইয়া ,,, আপুর ওরনা ছাড়ো এখন !
ছেলেটা কেমন জড়িয়ে যায় ভয়ে । ওরনা টেনে ধরেই পেঁচিয়ে শিশিরের পেছনে লুকায় । পাতলা করে ওরনার একপাশ আটকে রয় রমনীর শরীরে । নিজের এমন বেহাল অবস্থা দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে শিশির । দ্রুত পিছু ফেরে । সিফাতের দিকে ঘুরে বলে….
” ভাই ,,, ওরনা ছাড় । নেমে পড়েছি তো,, এখন বাড়ি যাবো । ওরনা ছাড় ।
ভয়ে তটস্থ চেহারা । দুদিকে মাথা নাড়ায় সিফাত । আদ্র অপরিচিত । ওকে দেখে ভড়কেছে । সহজে কাউকে মানতে পারে না সে , কাছ ঘেঁষতে দিতে পারে না । আদ্র ওর এমন অদ্ভুত ব্যবহার দেখে জিজ্ঞেস করে…..
” ও কথা বলতে পারে না ?
” পারে । কিন্তু বলে না । আমাদের সাথেও কথা বলে না । খুব প্রয়োজন পড়লে তখন কথা বলে । আপনি অপরিচিত তো , তাই ভয় পাচ্ছে ।
” নাম কি ওর ?
” সিফাত !
আদ্র ডাকে….
” সিফাত ,,, ভয় পাচ্ছো আমায় ? ভয় পাওয়ার কিছু নেই । আপুর ওরনা ছাড়ো । আমার কাছে এসো । চকলেট খাবে ? ভাইয়া তোমাকে চকলেট দেবে ,, এসো এদিকে ।
সিফাত শুনলো না । শিশিরের কোল জড়িয়ে গুঙ্গিয়ে উঠলো কেমন আতঙ্কে । কাউকে দেখা বা মেশার অভ্যাস নেই । একলা ঘর,নয়তো হাসপাতালের বেড,, এই থেকে থেকে গুটিয়ে গেছে ছেলেটা । বৃদ্ধি হয় নি শারিরিক গঠনেও । মস্তিষ্ক তো আরো অকার্যকর । দিনের আলোর সাথেও পরিচয় কম । এখন তো অন্ধকার । তাই বেরিয়েছিল বাইরে ।
বেশি মানুষ দেখলেও ভয় পায় ।
ওর এমন ভয়ার্ত ভাব দেখে শিশির বলে বিচলিত হয়ে….
” স্যার ,, থাক । ওর কাছে আসবেন না । ভয় পাবে । প্রেসার বাড়বে আবার । এমনিতেই শান্ত হয়ে যাবে ও । আপনাকে প্রথম দেখেছে , আপনার কথা শুনবে না । চলুন ,,, বাড়ির ভেতরে যাই ।
ভাই , ছাড় আমায় । উনি কিচ্ছু করবেন না ।
সিফাত ধীরে মাথা তোলে । বোনের উদরের পাশ গলিয়ে আদ্রের দিকে পিট পিট করে তাকায় । সরে আসে একটু । ততক্ষণে গোটা ওরনাটা খুলে পড়েছে । একপাশ সিফাতের হাতের মুঠিতে ,, অন্যপাশ মাটিতে । গায়ে মোটা সোয়েটার আছে । তবুও ধক্ করে ওঠে শিশির । ভড়কে বলে…
” ভাই ,, বলেছি না ওরনা ছাড়তে ।
কিছুটা ধমকানো স্বর । ছেলেটা চমকায় । ওরনার কোণা ছেড়ে এক ছুট লাগায় বাড়ির দিকে ।
শিশির পিছু ডাকে । শোনে না আর । এদিকে দু হাত ভরা মেহেদি । তবুও তড়িঘড়ি করে দোপাট্টা তুলে চট করে গায়ে জড়ালো মেয়েটা । পিছু ফিরলো আদ্রের পানে । বুকে হাত গুটিয়ে অন্যপাশে চেয়ে রয়েছে লোকটা । শিশির তাকানো মাত্রই ভারিক্কি স্বরে আদেশ করে…
” ভেতরে যাও ।
” আপনিও চলুন । আবিদ ভাইয়া আর আপু কথা বলুক একটু ।
” আমি যাবো না । এখানেই ঠিক আছি । আবিদ আসলে চলে যাবো আমরা । তুমি যাও…
” আম্মু আপনাকে দেখলে খুশি হবে ।
” কাল দেখবে ।
” আসবেন কাল ?
আদ্র তাকালো এবার । চোখ সরু করে অক্ষি লতা গুটিয়ে নিলো । বললো রাশভারী গলায়…..
” কেউ না আসলেও আমাকে আসতে হবে । ইনফ্যাক্ট তোমার ঐ বখাটে হবু স্বামী ,, যার জন্য বউ সাজবে কাল । সে না আসলেও আমি আসবো । ডোন্ট ওয়ারি….
মুখ কালো করলো শিশির । কোমল কন্ঠ ভারী করলো…
” মেঘা আর শাফাহ্ কে নিয়ে আসবেন ।
” আসবো ! ভেতরে যাও তুমি ,, শীত পড়ছে । ঠান্ডা লেগে যাবে । বিয়ে কাল তোমার ।
শিশির সহসা পিছু ফিরে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় । কয়েক কদম এগিয়ে একটু থামে । আলগোছে ঘাড় ঘোরায় । আদ্র তাকিয়েই ছিলো । চোখাচোখি হলো সহসা । আচমকা বললো মেয়েটা….
” আমার বিয়ে টা আটকাতে চেয়েছিলেন ,, মনে আছে ? আবিদ ভাইয়ার ভাইয়ের সাথে বিয়ে হচ্ছে বলে ভুলে গেলেন । পাল্টি খেলেন এভাবে ?
আদ্র নড়েচড়ে ওঠে । দৃষ্টি সরায় । মেয়েটা ভুল বুঝছে ওকে । শিশির মৃদু হেসে আবার বললো….
” শুধু মেঘা আর শাফাহ্ কে নয় ,, পুরো পরিবার নিয়ে আসবেন কাল । আমি সবাইকে ইনভাইট করে এসেছি । আন্টি বলেছিলেন , তিনি আসবেন । নিয়ে আসবেন কিন্তু ।
এটুকুই বললো । অতঃপর পিছু ফিরে ধুপধাপ পা ফেলে ঢুকে গেলো বাড়িতে । বুক চিরে তপ্ত শ্বাস ফেললো আদ্র ।
শাফাহ্’র দিন কাটে বহু কসরতে ।
এর মধ্যে গতকাল মেহের ও বাপের বাড়ি চলে গেছে । আর সঙ্গি নেই কেউ । কতক্ষন আর একলা থাকা যায় ? আম্মু আর মামনি’র সাথেই বা থাকবে কতক্ষন ? ওনাদের সাথে কি কথা বলবে !
কদিন ধরে একলা একা এই সময়গুলো কিভাবে কাটাচ্ছে , তা কেবল সেই জানে । মুখের হাসি উবে গেছে মেঘার সাথে সাথে ।
ডিনারের পর ঘরে উঠেছে । এখন বাজে দশটা । আদ্র ফিরলো সবে । বাড়িতে ডিনার করবে না আর । খেয়ে এসেছে বাইরে ।
নিজের ঘরে ঢোকার আগে পা থামলো শাফাহ্’র ঘরের সামনে । দরজা চাপানো , লাইট জ্বলছে ভেতরে ।
আদ্রের কপাল কুঁচকে আসে । থেমে টোকা দেয় ঘরের দরজায় ।
টেবিলের উপর মাথা এলিয়ে আনমনে বসে আছে মেয়েটা । সামনে বই খুলে রাখা । শব্দ পেয়ে মাথা তুললো সচকিতে । আদ্রের অবয়ব দেখে বললো….
” এসো ভাইয়া !
আদ্র ভেতরে ঢুকে শুধায় ।
” ঘুমোস নি ! কি করছিস এখনো ?
” পড়ছিলাম !
” বাহ্ , এতো পড়ুয়া হলি কবে থেকে ?
” মেঘা যাওয়ার পর থেকে !
” মন খারাপ ?
” ভীষণ !
” কাল তোর ফ্রেন্ডের বিয়ে । যাবি না ?
” যাবো । কিন্তু ভাইয়া ,, মেঘা ?
” মেঘ ও যাবে । বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওদিকে ড্রপ করে নেবো ওকে ।
” মেঘা আর আসবে না এ বাড়িতে ? আমার একলা ভালো লাগে না ওকে ছাড়া ।
” আসবে । সাথে অন্যকেউ…
” হু ?
” কিছু না । ঘুমা এখন ।
নতুন সকাল । সকাল গড়িয়ে দুপুর ।
কাল রৌদ্র ছিলো না । ওর তো এক রুটিন । সকালে মেঘা ঘুম থেকে উঠে ওকে দেখতে পায় না আর । থাকে না সারাদিন । রাত হতেই ফিরে আসে ।
সারাদিন কি করে না করে খোঁজ নেই ।
শিশিরের বিয়েতে যেতে হবে । আদ্র ফোন করেছিলো । বিকেলে আসবে । তৈরি হয়ে থাকতে বলেছে মেঘা কে । ড্রপ করে নেবে সে ।
শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে মেঘা । সারা আর জাবির রুমেই ছিলো । মেঘার পর সারা ঢুকবে শাওয়ারে । কালকে এই রুমেই ছিলো সে ।
মেঘা ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে চুল মুছতে মুছতে বললো…
” ওয়াশ রুমের গিজার কাজ করছে না,, সারা । পানি ঠান্ডা । এখানে শাওয়ার নিবি ?
” বলিস কি ,, গিজারে কি প্রবলেম হলো ?
” আমি কি জানি । ঠান্ডা পানিতে গোসল করার হলে যা , নয়তো অন্য ওয়াশ রুমে যা । তবে তাড়াতাড়ি । আদ্র ভাইয়া এসে যাবে । তৈরি হয়ে থাকতে বলেছে । তুই ও যাবি আমাদের সাথে ।
” না মেঘা ,, আমি বললাম তো আমি যাবো না ।
” আমি বলেছি তুই যাবি ,, তার মানে যাবি । কোনো কথা শুনবো না । যা তো । দেরি হয়ে যাবে ।
” আচ্ছা , আমি যাচ্ছি । জাবির কে একটু দেখে রাখ । কাজ করছে আম্মু । আপু তো বেরিয়েছে জানিসই…
আর কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো ।
ইভা বেরিয়েছে একটু । জাবির কে রেখে গেছে । এটুকু সময়ের জন্য ওকে মেঘার দায়িত্বে দিলো সারা ।
বাচ্চা টা সোফার একপাশে বসে খেলছে । চকলেট এক হাতে । মেঘা পলক ফিরিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখলো । ঠান্ডায় চিবুক কাঁপছে তিরতির করে । লালচে হয়ে উঠেছে মুখাবয়ব ।
দ্রুত চুল শুকানো প্রয়োজন । টুপটাপ পানি ঝড়ছে চুল থেকে । চেয়ার টেনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুল গুলো গোছা গোছা করে আলাদা করলো মেঘা । হেয়ার তুলে ধীরে সুস্থে চালু করলো । মৃদূ তপ্ত বাতাসের ঝাপটায় মেলে ধরলো চুল গুলো । কেশরাশী অবাধ্য হয়ে উড়ে চলে তপ্ত বাতাসে ।
এলোমেলো তাদের টাল ।
এর মধ্যেই পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ । রমনী চোখ তোলে নি । ঠাহর ও জাগে নি । একবিংশীর পেছনে হাঁটু মুড়ে বসলো সেই জনা । ভেজা ভেজা লেপ্টানো চুলে নাক ডুবিয়ে শ্বাস টানলো । সদ্য শ্যাম্পু করা । ঘ্রাণ মারাত্মক ।
চোখ বুজে আসে তার । ঠোঁটে ফোটে মৃদু হাসি । হাসি প্রগাঢ় করে ডাকে আবেশিত কন্ঠে….
” সুইটহার্ট !!
আকস্মিক ডাকে চমকায় রমনী । বিচলিত হয়ে উঠে দাঁড়ায় । হাতের হেয়ার ড্রায়ার ঠক করে পড়ে যায় মেঝেতে । এতে ভড়কায় আরো বেশি । হুটহাট রৌদ্র কে দেখে কেঁপে ওঠে বক্ষস্থল ।
” আপনি ?
” ইয়েস সুইটহার্ট ।
” আপনি কখন এসেছেন ?
” এইমাত্র !
চোখ সরু করে মেঘা । অপ্রস্তুত অবস্থা সামলে নেয় । শক্ত কন্ঠে জানতে চায়…..
” কোথায় ছিলেন কাল ? আসেন নি কেনো ?
” মিস করেছো ?
” হেয়ালি করবেন না । সোজাসুজি উত্তর দিন । কোথায় ছিলেন ?
” বাইরে !
” কোথায় ?
” রোহানের এপার্টমেন্টে ।
” মিথ্যে !
” সত্যিই ! তোমার কসম ।
” মদ খেয়েছিলেন খুব ?
” জানলে কি করে ?
” মাতাল না হলে ঠিক আসতেন ।
রৌদ্র মুচকি হাসলো ঠোঁট চেপে । হেয়ার ড্রায়ার টা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো । মেঘার কাছ ঘেঁষে ঝুঁকে বললো….
” বেশ ভালো চিনেছো আমায় দেখছি ।
বলতে বলতে ড্রায়ারের দমকা গরম হাওয়া মুখপানে তাক করলো । মুখ সিঁটকায় রমনী । তেঁতে বলে….
” রাইনো মুখো,, কি করছেন ?
” হেয়ার ড্রাই করে দেই ,, আসো ।
” প্রয়োজন নেই । আমি করে নিতে পারবো । আলাগা পিরিত দেখাবেন না ।
রৌদ্রের হাত থেকে ড্রায়ার টা কেড়ে নেয় মেঘা ।
রৌদ্র ফিচেল হাসে । ফিসফিস করে বলে…..
” না আলগা পিরিত করতে দাও , আর না মাখো মাখো পিরিত করতে দাও । আমি করবো টা কি সুইটহার্ট ?
ভেংচি কাটলো মেঘা ।
এতক্ষণে রৌদ্রের দৃষ্টি পড়ে পেছনের সোফায় । জাবির বসে । খেলার পাশাপাশি পিটপিট করে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলো এতক্ষণ ।
রৌদ্র পিছু ফেরা মাত্রই বাচ্চা টা ভড়কে চোখ নামায় । চোখ কুঁচকে ওর দিকে এগিয়ে যায় রৌদ্র ।
” এই নাগিনের বাচ্চা ,, ব্যাঙের পোনা,, এখানে কি চাই তোর ?
বলতে বলতে গিয়ে বসলো বাচ্চাটার পাশে । আঁতকে তাকায় ছোট্ট বাচ্চাটা । রৌদ্র বিলম্ব করে না । ওর ছোট ছোট দুহাত জড়ো করে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নেয় । দাঁত পিষে চিবিয়ে বলে….
” নাগিনের বাচ্চা,, নাম কি তোর ?
জাবির চোখ মুখ খিচে কুকিয়ে ওঠে । বাচ্চা সুলভ স্বভাবে কেঁদে ফেলার দশা । মুখ কাঁচুমাচু । উচ্চারণ করলো নিভে যাওয়া স্বরে….
” পতা নোক !!
” ওরে হারামী ,, আমি পঁচা ? তুই খুব ভালো ? তোর মা ,, ঐ নাগিন খুব ভালো ? ব্যাঙের ছানা,,, চটকানা মেরে দাঁত ভেঙে দেবো । নাম কি বল ?
পেছন থেকে কিড়মিড় করে জবাব দেয় মেঘা….
” ওর নাম জাবির !
” ওও ,, জাবির । সাবাস বেটা,, তোর বাপের নাম জলিল, তাই না ?
বলেই হো হো করে হেসে উঠলো । হাসি থামিয়ে আবার ছেলেটার হাত মুঠোতে করে টেনে নিয়ে বললো….
” চকলেট খাচ্ছিস ? দে ,, খেতে হবে না তোকে ।
টুকটুকি নেই এখানে ,, সুইটহার্ট চকলেট খাবি তুই ?
মেঘার থেকে উত্তর না নিয়ে আবার লেগে পড়লো বাচ্চাটার পিছনে । টেনে কোলে বসালো ওকে । কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো….
” শোন বেটা,,, তোর মা একটা নাগিন । জানিস তুই ? অবশ্য তুই জানবিই বা কি করে ? তোর মা তো তোকে ছোবল দেয় নি কোনো দিন । তোর বুড়ো বাপকে দিয়েছে । তোর বাপের হাড় হাড্ডি সব চিবিয়ে খেয়েছে । বেচারা হিমশিম খেয়ে নালিশ করে আমার কাছে । জানিস ,, তোর মা আর তোর বাপের পাঁচ দিনের প্রেম ছিলো । তারপর বিয়ে । শোন বেটা ,, তুই কিন্তু বড় হয়ে প্রেম করবি না । করলে ঠ্যাং ভেঙ্গে গাছে ঝুলিয়ে রাখবো । প্রেম বড্ড জ্বালা দেয় বাপ ,, তুই বুঝবি না এখন । আমি বুঝি । হায়য়য় , ক্যান যে প্রেমে পড়লাম….
শেষের কথা গুলো দীর্ঘ শ্বাসে বললো । জাবির শান্ত হয়ে পিটপিট করে চেয়ে দেখছে ।
ওদিকে রাগে ফুঁসছে মেঘা । কিসের এতো খাতির এই বাচ্চাটার সাথে ? কোলে নিয়েছে আবার । গল্প জুড়েছে দেখো । তাও আবার প্রেমের গল্প । ওর মায়ের প্রেমে পড়ে ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যাকা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই । বিয়ে করতে চেয়েছিলো তো । পারে নি । না পেরে হাতিয়ার বানিয়েছে মেঘা কে ।
জাবিরের সাথে রৌদ্র কে সহ্য হলো না বিন্দুমাত্র । রাগে গজগজ করলো একবিংশী । ড্রায়ার টা ধপ করে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখলো । শব্দ পেয়ে সেদিকে খেয়াল দেয় রৌদ্র । হিসহিসিয়ে ধুপধাপ কাবাডের দিকে এগোয় রমনী । প্রথমে কিছু না বুঝলেও কিয়ৎ কাল বাদ নিজের দিকে তাকানো মাত্রই তড়াক করে দৃষ্টি খুলে যায় রৌদ্রের । একি করেছে ও । নাগিনের বাচ্চা ওর কোলে ? যেচে পড়ে বিপদ সংকেত বাজিয়ে দিয়েছে । একবিংশী ক্ষেপে গেছে নিশ্চয়ই ? শুল্ক ঢোক গিললো রৌদ্র । ঠোঁট ভিজিয়ে ডাকলো….
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৪৭ (২)
” মেরি জান….
” শাট আপ রাইনো মুখো । একদম কথা বলবেন না আমার সাথে ।
কাবাড থেকে একটা ওরনা বের করে রৌদ্রের দিকে ছুড়ে মারলো মেঘা । কটমট করলো । মুখ কাঁচুমাচু করে হাসে রৌদ্র । রমনীর এমন ঠিকড়ে ওঠা ক্ষিপ্ততা দেখে তেঁতে দৃষ্টি ফেরায় জাবিরের দিকে । চোয়াল খিচে রাগান্বিত চাপা স্বরে বলে ওঠে…..
” নাগিনের বাচ্চা ,,,, তোর সাহস কি করে হলো আমার কোলে ওঠার । আমার কোলে চড়বে আমার বউ । নাম কোল থেকে ।
