আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৬০
সুরভী আক্তার
মাঝে গোটা একটা দিন কেটেছে ।
ইয়াশ ফিরে আসার পঞ্চম দিন আজ । বেলা গড়িয়েছে আজও । ক্লান্ত বিকেলে খোলা আকাশের তলে ঝিম ধরে ছাদের দোলনায় বসে আছে মেঘা । ইয়াশের সাথে কথা হয়নি আর । দেখাও হয় নি সেই দুপুরের পর । ছেলেটা কখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে জানা নেই । আসার পর প্রথম রাতটাই কাটিয়েছে এ বাড়িতে । অতঃপর একরাত ও আর যাপন করে নি । দানা পানি গেলে নি এ বাড়ির । তোফায়েল কাবির কতবার খোঁজ করলেন , সময় বের করে ইয়াশের সাথে জরুরি কথা বলতে চাইলেন , কিন্তু সাক্ষাৎ পাওয়া গেলো না ও ছেলের । মেঘা লাগাতার ফোন দিয়েছে । ফোন ধরেনি ইয়াশ । কেটে দিয়েছে বারংবার । অথচ গত একুশ বছরে এমনটা হয় নি কখনো । ভাইয়ার থেকে আজ অবধি উপেক্ষিত হয় নি মেঘা । রৌদ্র কে মানালো ওর সাথে কথা বলার জন্য , কিন্তু ওই তো নেই ।
মেঘা চুপটি করে বসে বসে ভাবছে আজগুবি সব চিন্তা । ইয়াশের দোষটাই বা কোথায় ? একাধারে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়লো , ইয়াশ বললো সেদিন – ও রৌদ্র কে নয় বছর ধরে চেনে ? কিন্তু কিভাবে ? মেঘা তো আর কিছুই শুনলো না ।
রৌদ্রের ব্যাপারে মুখ খুলতে চায় নি সে , একথা কেনো বললো ? মেঘার চোখ ঘোলাটে হয়ে এসেছিলো ।
আকস্মিক এই চিন্তা মাথায় আসতেই নড়েচড়ে উঠে বসলো সে । কপালে বিস্তর ভাঁজ ফেলে বোঝার চেষ্টা করলো । অতিরিক্ত না ভেবে উঠে দাঁড়িয়ে ধুপধাপ পা ফেলে প্রস্থান করলো ছাদ থেকে । আদ্রের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালো সোজাসুজি । কড়া নাড়তে গিয়ে দ্বিধায় থেমে গেলো । কিছু একটা ভেবে সরে আসলো সেখান থেকে । শুভ্র এসেছিলো দুপুরের পর । এখনো অফিসে বেরোয়নি । বেরোবে নিশ্চয়ই ।
ড্রইং রুমে বসে বারবার সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছে মেঘা । মিনিট দশেকের মাথায় শুভ্র কে নামতে দেখা যায় । পেছন পেছন মেহের । মেঘা তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো ।
” ভাইয়া , অফিসে যাচ্ছো ?
চোখ তুলে মৃদু হাসলো শুভ্র ।
” হু , কেনো ?
” একটু দরকার ছিলো ।
” কিছু লাগবে ? কি লাগবে বল !
” না, লাগবে না কিছু । আমাকে সাথে নিয়ে যাবে একটু ? প্লিজ ভাইয়া….
চোখ সরু করলো শুভ্র । পেছন থেকে মেহের শুধোয়…..
” তুমি কোথায় যাবে মেঘা ?
” আমি একটু বাইরে যাবো আপু ।
” কোথায় যাবি ?
শুভ্রর শক্ত প্রশ্ন । মেঘা কন্ঠ খাদে নামিয়ে উত্তর করলো…..
” আমাদের বাড়িতে । ভাইয়া ওখানে আছে । অফিসে যাওয়ার পথে আমাকে নামিয়ে দিও একটু , প্লিজ । ওখানে যাওয়া টা প্রয়োজন আমার । প্লিজ ভাইয়া….
শুভ্র হাসলো এক চিলতে ।
” আরে মিষ্টি মেয়ে , এভাবে বলছিস কেনো ? চল , নামিয়ে দেবো ।
চিকচিক করে উঠলো রমনীর দুচোখ । আদল খানি ভরে উঠলো খুশিতে ।
শুভ্রর সাথেই বেরিয়েছে সে । কাবির ম্যানসন থেকে ওদের বাড়ির দূরত্ব প্রায় অনেকটা । মিনিট পঁয়তাল্লিশ তো লাগেই যেতে । শুভ্র পথ ঘুরে দূরত্ব পেরিয়ে গাড়ি থামালো #বিনীতা কুঞ্জের সামনে । জরাজীর্ণ বাড়িটা । রংচটা হয়ে পড়ে আছে অবহেলায় । বিশাল লোহার গেটের পাশে দেয়ালের গায়ে বড় নেমপ্লেট । সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা , বিনীতা কুঞ্জ । এটা মূলত ওর মায়ের নামে । আব্বু আম্মু কে ডাকতো এ নামেই ।
সবুজ ভারী শ্যাওলা জমেছে নেমপ্লেটের উপর । বাড়ির দিকে তাকালে অন্ধকার লাগছে । শুভ্র মেঘা কে নামিয়ে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে গেলো ।
বাড়িটার দিকে পুরোপুরি ফিরলো মেঘা । শরীর খানা শিউরে উঠলো তার । কতশত স্মৃতি জড়িয়ে এখানে । বাপ মায়ের স্মৃতি তো মনে নেই । দাদু মনি আর ইয়াশের স্মৃতি জুড়ে আছে কেবলই । চোখ দুটো কেমন জ্বলে উঠলো মেঘার । গা ছমছম করে উঠলো । দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সে আবার এ বাড়িতে । ভয় লাগলো অকারণে ।
প্রধান গেইট খোলা । তালা নেই । তার মানে ইয়াশ ভেতরেই আছে । মেঘা ঢোক গিলে সামলায় নিজেকে । চোখ ছাপিয়ে পানি গড়ানোর আগেই চোখ মুছে নেয় । হালকা ধাক্কায় গেইট খুলে ভেতরে ঢোকে । বাগানটা নিঃস্ব । ফুল গাছ নেই । আছে অকার্যকর কিছু গাছগাছড়াই ।
সদর বন্ধ । তিনটে চাবি এ বাড়ির । একটা ইয়াশের কাছে , বিদেশেও ছিলো । দ্বিতীয় টা মেঘার কাছে সেই পাঁচ বছর থেকেই । আর তৃতীয় টা থাকে কেয়ার টেকারের কাছে । মাসে পাঁচ বার তিনি বাড়িটা পরিষ্কার করে যান । দেখভাল করেন ভালোমতো ।
মেঘা পার্স হাতড়ে চাবি বের করলো । কম্পিত হাতে সদর খুললো । সহসা দমকা হাওয়া লাগলো শরিরে । আসতে আসতে অন্ধকার নেমেছে । সন্ধ্যার লগন । ভেতরটা পুরো অন্ধকার ঘুটঘুটে । সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে একবিংশীর । ভয়ে ভয়ে ভেতরে পা বাড়ায় । পাশের দেয়ালে সুইচ বোর্ড হাতড়ে লাইট অন করলো । অমনি দপ করে আলো জ্বলে উঠলো পুরো বাড়ির । স্বস্তি পেলো মেঘা ।
হাঁফ ছেড়ে সদর চাপিয়ে দিলো । উজ্জ্বল আলোয় নিজের সেই চিরচেনা বাসস্থান দেখা মাত্রই ফিক করে হাসলো রমনী । কিচ্ছু পরিবর্তন হয় নি । সব যেভাবে ছিলো, ঠিক সেভাবেই আছে । সোফা , ডাইনিং, চেয়ার টেবিল , ফুলদানি গুলো , দেয়ালে দেয়ালে সব পেইন্টিং , সব আগের মতোই এক জায়গায় আছে । চকচক করছে এখনো । কেবলই মানুষের অভাব এ বাড়িতে । প্রথমে ইয়াশ চলে গেলো , অতঃপর দাদু মনি চলে গেলো না ফেরার দেশে । এবং শেষে চলে গেলো মেঘা । কার কাছেই বা থাকতো এ বাড়িতে ? কেউ নেই তো !
কিন্তু বাড়িটা তো ঠিকি আছে । সব ভয় ডর নিমিষেই উধাও হলো । নিজের বাড়িতে আবার ভয় কিসের ? মেঘা হাঁসফাঁস করে । ঘুরে ঘুরে দেখে পুরো বাড়ি । আস্বাদন করে চিরচেনা ঘ্রাণ ।
সিঁড়ির পাশের রুমে লাইট জ্বলছে বোধহয় । দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ,, মিটিমিটি আলো সেখানে । ইয়াশের ঘর ওটা । মেঘা হাঁফ ছাড়ল ওর উপস্থিতি বুঝে । দীর্ঘ দম নিয়ে ঘরের দিকে কদম বাড়ালো । চাপানো দরজা আলগোছে ঠেলে পা রাখলো ঘরের ভেতর । পুরো বাড়ি গোছানো হলেও এই ঘরটা পুরো এলোমেলো । জিনিসপত্র ছড়িয়ে আছে এদিক ওদিক । মেঝেতে গড়াগড়ি কাপড়চোপড় ।
বিছানায় উবু হয়ে বেঢাল পড়ে আছে ইয়াশ । মেঘা চমকায় । তেড়ে যায় । বসে একপাশে । ইয়াশের চুলের ভাঁজে হাত রাখে । ডাকে উদ্বিগ্ন হয়ে……
” ভাইয়া ,, ভাইয়া ?
সাঁড়া নেই । একটু নড়চড় ঠাহর হলো ।
মেঘা লক্ষ্য করে দেখলো , মেঝেতে কতগুলো টুকরো টুকরো কাঁচ ভেঙ্গে পড়ে আছে । গোটা কয়েক ওয়াইনের বোতল । নাকে বিদঘুটে গন্ধ ঠেকলো । অবিশ্বাসে ছানাবড়া হলো রমনীর ডাগর চোখ জোড়া । ইয়াশ নেশা করে ? কই না তো ! কখনো সিগারেট অবধি খায় নি ! তাহলে এসব ? সেদিন ও বললো , একসাথে সিগারেট খেয়েছে । মানে কি এসবের ? অবান্তর ধারনায় আঁতকায় একবিংশী !
ঢোক গিলে কাঁপা হাতে ভাইয়া কে ঝাঁকায়……
” ভাইয়া ! শুনছো আমায় ? ওঠো প্লিজ ।
নড়লো ইয়াশ । মুখ ফেরালো মেঘার দিকে । চোখের ভারী পাপড়ি যুগল ফাঁক করে চাইলো বোনের পানে । নেশার ঘোরে বিরক্ত হলো । বাজখাঁই গলায় বলল…..
” কি হয়েছে ?
” ওঠো !
” এখানে কেনো তুই ? কি চাই ? চলে যা !
” কোথায় যাবো ? আর এসব কি ? তুমি ড্রিঙ্ক করেছো ?
” করেছি !
” ভাইয়া ,,, কি বলছো ? তুমি এসব কবে থেকে……
” চুপ , কথা বলবি না আমার সাথে । যা চলে যা । আমার প্রয়োজন নেই তোর ! যাদের প্রয়োজন, তাদের কাছে যা ।
কন্ঠ কিছুটা এলোমেলো । নেশার ঘোরে আছে, বোঝাই যাচ্ছে । মেঘা ওষ্ঠ উল্টায় । ক্ষমা চায়……
” সরি ভাইয়া ।
” কিসের জন্য ?
” তোমার কথার অবাধ্য হয়েছি , ঠিকমত কথা বলিনি, তাই ! তুমি চলে এসেছো কেনো ও বাড়ি থেকে ? কতবার ফোন দিয়েছি , খেয়াল আছে ? আমার চিন্তা হয় না বুঝি ?
ইয়াশ হাসলো তাচ্ছিল্য করে । উঠে বসলো……
” খেয়াল রেখে লাভ কি ? আমার চিন্তাও হয় বুঝি তোর ? হয়েই বা লাভ কি ?
ব্যাকবোর্ডে হেলান দিয়ে ফুল স্লিভের মোটা একটা সয়েটশার্ট গায়ে জড়ালো ইয়াশ । কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে । অথচ গরমের টান পড়ছে ইদানিং । শীত কমে আসছে । মেঘা ওকে সরু চোখে পরখ করলো , ইয়াশের চোখ দুটি লাল বিভৎস । ওকে ঝাঁকানোর সময় শরীরের উত্তাপ অনুভব করেছে কিছুটা । তবে সেভাবে গুরুত্ব না দিলেও , এখন আঁতকে উঠলো । হাত বাড়িয়ে কপাল স্পর্শ করতেই ধক্ করে উঠলো মেঘা ।
” ভাইয়া , তোমার তো জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে ।
আর এভাবেই পড়ে আছো তুমি ?
ইয়াশ ভাবেলাশহীন । মেঘা বিচলিত হয়ে পড়লো । উঠে দাঁড়ালো কিছু একটা করার জন্য । এর মধ্যেই ডাকলো ইয়াশ…..
” লিটিল বার্ড,,,
মেঘা চমকে উত্তর করে…..
” হ্যাঁ ?
” আমার পাশে বস একটু ! কথা বলবো, শুনবি ?
কেমন কাতর কন্ঠ । মেঘা মনে মনে ভড়কায় । উদ্বিগ্নতা ছেড়ে আলগোছে পাশে বসে ।
” কি হয়েছে ভাইয়া ? আমি ভুল করেছি ? তুমি ভুল বুঝছো আমায় ? কিন্তু বিশ্বাস করো , রৌদ্র খারাপ নয় । তুমি তো আমাকে চেনো , আমি খুব সহজে কাউকে মানতে পারি না , জানো এটা । মেয়েদের বিয়ে একবারই হয় ভাইয়া । তাহলে এমন কেনো করছো ! আমি রৌদ্র কে ক্ষমা করে দিয়েছি । উনি নিজের ভুল স্বীকার করেছেন !
” কি কি স্বীকার করেছে ?
রৌদ্র কে কতটুকু চিনেছিস ? আচ্ছা বাদ দে,,, আমি আমার কথা বলি । তাহলে উত্তর পাবি অনেক । শোন লিটিল বার্ড, তোর আরাফের কথা মনে আছে ?
ভাইয়ার শুকনো বিষন্ন প্রশ্নে মেঘার কপালে তিন স্তরের ভাঁজ পড়লো । খানিক বাদ হেসে বলল……
” আরাফ ভাইয়া ? হ্যাঁ, মনে আছে তো ! তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড । মনে থাকবে না আবার ?
” রিসা ? ওকে মনে আছে ?
” হুম , খুব মনে আছে ! রিসা আপু , তুমি আর আরাফ ভাইয়া । তোমরা তিনজন তো বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলে ! আমার আর দাদু মনির পর ওরাই সবকিছু ছিলো তোমার জীবনে ।
ইয়াশ মর্মান্তিক হাসলো একটু । বিড়বিড়ালো…..
“ হারালাম তো হারালাম , সবকিছুই হারালাম ।
শ্বাস পড়লো বুক চিরে । বোনের কাঁধে মাথাটা এলিয়ে দিলো ভীষণ ক্লান্ত হয়ে । মেঘা ওর জ্বরের তীব্র উত্তাপ বেশ অনুভব করলো । নেশার ঘোরে আছে ইয়াশ । তাই হয়তো অতিত টানছে । মেঘা প্রশ্রয় দিলো ।
ইয়াশ নরম কন্ঠে ফের বলে…..
” আর একজনকে মনে করাবো ! তখন একবার দেখেছিলি শুধু ! দেখতো, এখন মনে করতে পারিস কি না ?
” কাকে ?
” ছয় বছরের বেশি সময় হয় ,, মনে আছে , একবার আমাদের বাড়িতে একটা গুন্ডা ভাঙচুর করেছিলো ? চার পাঁচ জন ছিলো ওর সাথে ! তুই ভীষণ ভয় পেয়েছিলি সেদিন । মনে আছে তোর ?
মেঘার মুখো ভঙ্গিমায় পরিবর্তন আসে তড়িতে । ক্ষণকাল বাদ মনে পড়ে সেই ছয় বছর আগের ঘটনা ।
সালটা ২০১৮ । মাস বোধহয় অক্টোবর । সেদিন ছিলো শুক্রবার । রমনী তখন ষোড়শী কন্যা । স্কুলে প্রিটেস্ট হচ্ছিলো ফাইনাল পরীক্ষার আগে । শুক্রবার পরীক্ষায় বিরতি । স্কুল ছিলো না মেঘার । ইয়াশের ও ভার্সিটি ছিলো না । পুরো সকাল জুড়ে ইয়াশকে জ্বলিয়েছে মেঘা । ঘুরতে যাবে সে । ইয়াশ বলেছিলো বিকেলে ঘুরতে নিয়ে যাবে । ভাইয়ার একমাত্র আহ্লাদী বোন । কথা মোতাবেক বিকেলে যাওয়ার জন্য নিজের ঘরে তৈরি হচ্ছিলো মেঘা । সাথে দাদু মনি ছিলো । একটা সাদা টপসের সাথে অলিভ স্কার্ট পড়ে মিলিয়ে পড়েছে । সাজুগুজু করা সখ ছিল সে সময় । বেশ সুন্দর করে সেজেছিল ষোড়শী কন্যা । ড্রইং রুমে ইয়াশ অপেক্ষায় । তড়িঘড়ি করে সাজগোজ করতে হয়েছে ওকে । আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখার মাঝে দাদু মনি একটা রংচঙে ওরনা গলায় পেঁচিয়ে দিলেন । মেঘা হাসলো ফিক করে ।
ঘর থেকে বেরোনোর আগে ড্রইং রুম থেকে একটা বিটক শব্দ কানে বাজলো । চমকালো ষোড়শী । কিছু বুঝে ওঠার আগেই একের পর এক কাঁচ ভাঙার আওয়াজ এলো কানে । হাসিখুশি মুখখানা মিইয়ে গেলো নিমিষেই ।
তড়িঘড়ি করে দাদু মনির সাথে ঘর ছাড়লো সে । সিঁড়ির কাছে আসতেই নিচের এলোমেলো অবস্থা দেখে ছ্যাঁত করে উঠলো । বসার ঘরের সব তোলপাড় । ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে এদিক ওদিক । কাঁচের টি টেবিল ঝরঝরিয়ে গুঁড়িয়ে পড়েছে মার্বেলের মেঝেতে । চেয়ার টেবিল উল্টে পড়ে আছে ।
এই তান্ডব চালাচ্ছে গোটা পাঁচেক বেপরোয়া যুবক । এলোপাথাড়ি ভাঙচুর করছে সব । একজন দাঁড়িয়ে কেবল । প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে আয়েশি ভঙ্গিতে মজা দেখছে । তার নির্দেশেই সব হচ্ছে এখানে ।
তখনকার সেই ভীত ষোড়শী ভড়কায় । ভাইয়াকে খোঁজে হন্যে হয়ে । অবশেষে ইয়াশের দেখা মেলে সিঁড়ির নিচে । মেঘার কলিজা শুকিয়ে কাঠ । শূন্য হয়ে আসে পুরো পৃথিবী । ভয়ে আতঙ্কে দাদু মনিকে জাপটে ধরে সে । ছিপছিপে গড়নের হালকা তনু কেঁপে ওঠে । মুখ লুকায় বুকে । বৃদ্ধা বিমূঢ় । গলা বাড়িয়ে চেঁচালেন উপর থেকে…….
” ইয়াশ,, দাদু ভাই এসব কি হচ্ছে ? কারা ওরা ? এই গুন্ডা গুলো বাড়িতে ঢুকলো কি করে ? এমন করছে কেনো ?
ইয়াশ মাথা তুলে চায় উপরে । অতঃপর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা উশৃঙ্খল ছেলেটার দিকে । এই বেপরোয়া বখাটে যুবকের বিপরীতে তার অসহায় চাহনি । কেননা, ছোট বোনটা আছে এখানে । যদি কোন ক্ষতি করে বসে ? ঢোক গিললো সে । প্রথম বার চোখে ভয় সমেত তাকালো রুখো যুবকের পানে । কাকুতি করলো…..
” দেখ রুডি ,,, তোর ঝামেলা আমার সাথে । সেটা ভার্সিটিতে । আমার বাড়িতে এসেছিস কেনো তুই ? আমার বোন ভয় পাচ্ছে ! যা করেছিস যথেষ্ট , প্লিজ এখন চলে যা । ভয় পাচ্ছে আমার বোনটা , ও খুব সেনসিটিভ ।
বেপরোয়া ছেলেটা হাসলো গা দুলিয়ে । হাত উঁচিয়ে থামতে বললো নিজের সঙ্গীদের । চোখ উপরে তুললো । তৎক্ষণাৎ সরু হলো দৃষ্টি । এক অনুচ্চ রমনী বৃদ্ধার বুকে মুখ গুজে কাঁপছে তিরতিরিয়ে । ফোঁপানির শব্দ শোনা যাচ্ছে ক্ষিণ গলায় । মেয়েটা ভয়ে গুঙ্গিয়ে ডাকে চিকন স্বরে…….
” ভাইয়া !
বর্তমান_______
অতিত বিচরণে ঘটনাপ্রবাহ আবছা ভাবে স্মৃতিতে ধরা দিলো মেঘার । সেই গুন্ডা টার অবয়ব খুব ঝাপসা । মনে নেই বিন্দুমাত্র । তবুও মনে পড়েছে সেদিনের ঘটনা গুলো । ধক্ করে উঠলো বর্তমান একবিংশী ।
শুল্ক ঢোক গিলে বললো….
” মনে আছে ঐ গুন্ডার কথা । কিন্তু তুমি হঠাৎ এসব কেনো বলছো ভাইয়া ? জ্বর এসেছে তোমার ! গা পুড়ে যাচ্ছে । তুমি বসো , আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করছি ।
মেঘার কথাগুলোর তোয়াক্কা না করে ইয়াশ একরোখা হয়ে প্রশ্ন করে…..
” সেই গুন্ডাটা কে জানিস ?
” আমি জানবো কি করে ? মনে নেই খুব একটা ।
” জানতে চাস ?
হাঁফ ছাড়লো মেঘা । ইয়াশের জেদের কাছে হার মেনে বললো….
” আচ্ছা বলো শুনি । তার কথা মনে করাচ্ছো কেনো হঠাৎ ? কে সেই গুন্ডা ?
প্রত্যুত্তর করতে এক মুহুর্ত বিলম্ব করলো না ইয়াশ…..
” রুডভিক কাবির রৌদ্র ,, ওরফে রুডি ! ভার্সিটির বখাটে, উশৃঙ্খল,রগচটা টপার । গুন্ডাগিরিতে পারদর্শী । তোর ভাইয়ার কোন এক দুশমন । বেপরোয়া, ছন্নছাড়া, নেশা খোর, বদমেজাজি রুডভিক কাবির রৌদ্র ।
সম্পর্কে তোর স্বামী এখন ।
ইয়াশের কথা শেষ । নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেলো পুরো ঘর । মেঘা স্তব্ধ , বিমুঢ় । এক মুহুর্তে যেনো পাথর হয়ে গেলো । কথা গুলো কানে ঢুকেছে , মনে নয় ।
সেকেন্ড কয়েক বাদ অবিশ্বাসে শব্দ করে হাসলো…..
” ভাইয়া ,, মজা করছো তুমি ? কি ভেবেছো , আমি বুঝতে পারবো না ?
ইয়াশ মাথা তোলে । হাসে নীরবে ।
” তোর ভাইয়া তোকে কোনদিন মিথ্যা বলেছে ? যে আজ বলবে !
মেঘা চুপসে যায় । গায়েব হয় ঠোঁটে টানা জোর পূর্বক হাসি টুকু । ছলছল করে দুচোখ । আঁখি দ্বয়ের আর্দ্র কিনার ভিজে আসে । তবুও বিশ্বাস করে না ।
রৌদ্র বলেছিলো , ইয়াশ মেঘাকে ভুল বোঝাবে । পাগল মেঘা এখনো রৌদ্রের কথাটাই বিশ্বাস করলো । কিন্তু ভাইয়া কেও অবিশ্বাস করতে পারলো না । হাসলো পাগলের মতো ।
” দেখো ভাইয়া , মজা করবে না একদম । তোমার কথা শুনছি না বলে এসব বলছো , তাই তো ? প্লিজ ভাইয়া , মেনে নাও । রৌদ্র বাধ্য হয়ে যাবে সত্যিই বলছি ।
” আরাফের সাথে আমার সম্পর্কটা নষ্ট হয়েছে ছয় বছর হলো । জানিস এটা ? বলিনি তোকে ,,, আরাফ আর আমার বন্ধুত্ব নেই এখন । রিসাও নেই । ওরা এখন অসীম দূরত্বে চলে গেছে । ওদের সাথে কত বছর কথা হয় না , দেখা হয় না , আড্ডা দেওয়া হয় না । কোনো কিছু শেয়ার করা হয় না । আমার আর কোনো বন্ধু নেই । আমি কেনো ছয় বছর আগে হঠাৎ করে ইউএসএ চলে গেলাম , জানিস আসল কারন ?
মেঘা হাঁসফাঁস করে উঠলো এবার । ইয়াশ শান্ত, স্থির । মাথা এলিয়ে বিপরীতে মুখ ঘুরিয়েছে । নেশায় কন্ঠ ভার । তবে নেশায় থাকলে নাকি লোকে সত্যি কথা বলে ? সত্যিই কি ? মেঘের গলা শুকিয়ে আসে । শুধোয় জবান চিরে…..
” কেনো ?
” আমি ডক্টর হতে চাই নি কখনো । স্কলার্সিপে সুযোগ পেয়েছিলাম । কাজে না লাগিয়ে আরাফ আর রিশার সাথে ঢাবিতে ভর্তি হলাম । কারন যদি কাজে লাগাতাম , তাহলে আমাকে অনেক দূর চলে যেতে হতো । তোকে ছেড়ে , আরাফ কে ছেড়ে আর রিসা কেও ছেড়ে । জানিস লিটিল বার্ড , আমি রিসা কে ভালোবাসতাম ।
গলা কাপলো যুবকের । থামলো । একটু দম টেনে বললো আবার……
” রিসা কে ভালোবাসতাম আমি । বলিনি কখনো ।
ভার্সিটি লাইফে আসার পর রৌদ্র কে চিনলাম । কাবির পরিবারের ছোট ছেলে রুডভিক কাবির রৌদ্র । সেবার সে সেকেন্ড টপার হয়েছিলো । প্রথম হয়েছিলো আরাফ । আরাফ কে নিয়েই খুশি ছিলাম আমরা । আমরা তিনজন এক ছিলাম । আর কারোর প্রয়োজন ছিলো না আমাদের । কিন্তু ক্যাম্পাসে রোজ রোজ কারনে অকারণে রৌদ্রের সাথে জুড়ে যেতাম । ঝামেলা হতো ওর সাথে । মূলত আরাফের সাথে পায়ে পা দিয়ে ঝামেলা করতো রৌদ্র । ও বড্ড বখাটে । কাউকে তোয়াক্কা করতো না । না সিনিয়র আর না প্রফেসর । আমাদের কথা তো বাদই দিলাম ।
তাই ওর সাথে হওয়া সব ঝামেলা এড়ানোর চেষ্টা করতাম যথাসম্ভব । কিন্তু আর কত ? একের পর দিন,মাস পেরিয়ে বছর ও পেরোলো । ও আমাদের পিছুই ছাড়তো না । রোজ সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে একটা না একটা সুযোগে হ্যারাস করতো আমাদের । তুই তো জানিস আরাফ শান্ত । ও সবসময় এসবে শান্তই থেকেছে । সহ্য করেছে । কিন্তু আমি পারতাম না । তাই ঝামেলা টা আমার সাথেই হতো বেশি । সেদিন ও এক ঝামেলার জন্য ভার্সিটি থেকে দুই মাসের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছিলো ওকে । কমপ্লেইন আমি করেছিলাম । তাই আমার উপর রাগ ঝাড়তে বাড়িতে এসে ওভাবে ভাঙচুর করে গেছে ।
থামলো সে । আবারো নিস্তব্ধ হয়ে গেলো পুরো ঘর । মেঘা মন দিয়ে শুনলো । চোখে পলক পড়তেই দীঘল পাপড়ি ছাপিয়ে টপাটপ কয়েক ফোঁটা পানি গড়ালো চোখ থেকে । হালকা হয়েও পূনরায় ভরলো চোখ দুটি । অনুভুতি হীন জড় বস্তু হয়ে গেলো রমনী ।
খুব করে মনে করার চেষ্টা করলো সেদিনের সেই গুন্ডা টার মুখাবয়ব । কিন্তু ভুলো মনে কিছুই ধরা দিলো না ।
ইয়াশ থেমে বলে চলে…..
” রৌদ্রের সাথে আমার শত্রুতা তখন থেকেও নয় । বরং তখন থেকে, যখন ও আমার কাছ থেকে রিসাকে কেড়ে নিলো । আমার আর আরাফের সম্পর্কে ভাঙন ধরালো । ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে কেড়ে নিলো আমার বন্ধুটাকেও । ওরা দুজনেই আমার সব ছিলো । কিন্তু রৌদ্র ওদের কেড়ে নিলো । দূরে সরালো আমার থেকে । সব রাগ নিংড়ে মিটিয়ে নিঃস্ব করলো আমায় । রিসা,আরাফ ওরা আর আমার জীবনে নেই । কোথায় আছে , কেমন আছে, কিভাবে আছে জানি না । আর বাকি রইলি তুই ! জেদ করে তোর দিকটা না ভেবেই চলে গেলাম ইউএস । রিসা বরাবর চাইতো আমি ডক্টর হই । ওকে হারিয়ে ওর ইচ্ছের মূল্য দিতে ছুটলাম । যাওয়ার পর কি শুনলাম ? আমার শেষ সম্বল টাও নাকি রৌদ্র হাতিয়ে নিলো । মেরে রক্তাক্ত করে জোর পূর্বক বিয়ে করলো তোকে । এতো রাগ আমার উপর ? যার বশে প্রতিহিংসার শিকার করলো তোকে ।
মেঘা এবার ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে । পিছিয়ে যায় বসা অবস্থায় । দু’হাতে মুখ চেপে ধরে । ঝরঝরিয়ে পানি গড়িয়ে গাল ভেজে । ইয়াশের কন্ঠ নিভে এসেছে ঘোরের বশে । বিড়বিড় করছে এখনো……
” ও আমাকে বলেছিলো , ও আমায় নিঃস্ব করে ছাড়বে । আর তাই করলো । তুইও ওর ফাঁদে পা দিলি মেঘা । তুচ্ছ করলি ভাইয়াকে ? আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো ! আমার যে আর কেউ রইলো না । ওখানে দম বন্ধ লাগে আমার । গুমড়ে মরি প্রতিটা ক্ষণ । যাবি না তুই আমার সাথে ? যাবি না…..
বিড়বিড় করতে করতে এক পর্যায়ে নিভে যায় কন্ঠ । পুরোপুরি নেতিয়ে পড়ে ছেলেটা । গা ফেটে যাচ্ছে জ্বরে । আগুন জ্বলছে যেনো ।
মেঘা কিংকর্তব্য বিমূঢ় ।
ধীরে খাট থেকে নামলো । ইয়াশ কে টেনে আলগোছে শুইয়ে দিলো । গায়ে ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে দিয়ে এক ছুটে ঘর থেকে বেরোলো । ঝকঝকে পুরো বাড়ি । অথচ মেঘার কাছে সবটা অন্ধকার লাগছে । মনে হচ্ছে সে হারিয়ে যাচ্ছে গহীন তিমিরে । চার দেয়াল ঠেসে ধরছে ওকে । মাথা ভনভন করছে । নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না একবিংশী । শরীরের ভার সামলাতে হিমশিম খেলো বড্ড বেশি । টলমলে হাঁটু গুঁড়িয়ে ধপ করে পড়লো শক্ত মেঝেতে । ব্যাথায় মৃদু কুকিয়ে উঠলো ।
অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলো চোখ বেয়ে । শব্দ করে কাঁদতেও ভুলে গেলো মেয়েটা । বুক চিরে যাচ্ছে , কিন্তু কন্ঠ চিরে আওয়াজ আসছে না । শ্বাস নেই বুকে । হা করে শ্বাস নিতে হচ্ছে ।
মেঘা ভেজা চোখ তুলে সিঁড়ির দিকে তাকায় । লোকটাকে প্রথম দেখেছিলো এই সিঁড়ির নিচে । যখন ষোড়শী কন্যা ভয়ে গুটিয়ে ভাইয়ার পিছনে লুকিয়ে ছিল শার্ট খামচে । তখন সামনের সেই বেপরোয়া গুন্ডাটা ডেকেছিলো বোধহয় ফিসফিস করে…..
“ সুইটহার্ট !
সেই ডাকটা কানে বাজে । মেঘার হেঁচকি উঠে যায় । ডুকরে কান্না পায় । ভাইয়া যা বললো , তা সত্যিই ? লোকটা এ কারণেই বিয়ে করেছে ওকে ? কেবল প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ? ইয়াশ কে নিঃস্ব করতে ? তাহলে তার বেপরোয়া হৃদয়ে ভালোবাসার ঘ্রাণ পায় কেনো মেঘা ? লোকটা উন্মাদ কেনো মেঘার উপর । নাকি সব ছলনা ? সে যদি সত্যিই মেঘাকে ভালোবাসে , তাহলে পাঁচ বছর কোথায় ছিলো ? এতো সময় মেঘার খোঁজ নেয় নি কেনো ? মেঘা যদি না থাকতো কাবির ম্যানসনে , তাহলে ফিরে এসে উন্মাদনা করতো কার জন্য ? মেঘা তো বোকা ! সে কখনো খুঁটিয়ে ভাবেই না এসব । ইভার সাথে বিয়ে ঠিক , অতঃপর ইভার পালিয়ে যাওয়া । মেঘার সাথে সারার বন্ধুত্ব তো আরো আগে থেকেই । সারার খালাতো ভাই উনি । আবার ইয়াশের সাথে এই শত্রুতা ।
এ কেমন গোলক ধাঁধায় পড়লো মেঘা । তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সব । মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । হাপুসহুপুস করে উঠলো বুক ভরে শ্বাস নিতে ।
জবজবে গাল মুছলো । কাঁদলো না চিৎকার করে । ইয়াশের কাছে যেতে হবে । অসুস্থ সে , জ্ঞান শূন্য ইতোমধ্যে ।
মেঘা বহু কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে । হা করে বড় বড় কয়েক শ্বাস টানে । উঠে দাঁড়ায় । পা বাড়ানোর আগেই সদরের ডোর বেল বাজে । চমকায় রমনী । ধক্ করে ঘাড় ঘোরায় । লাগাতার বেল বাজছে । চকিতে ঘড়ির দিকে তাকালো মেঘা । রাত প্রায় আটটা বাজতে চললো । বুঝতে বাকি রইলো না কিছু । দু’হাতের আজলে ভালোমতো ভেজা চোখ মুখ মুছে নিলো । ত্রম্ভ পায়ে হেঁটে গিয়ে খুলে দিলো দরজা ।
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৯ (২)
ঠিক সামনাসামনি বেপরোয়া যুবক । দরজা খুলতেই মেঘা কে দেখে এক ফালি হাসলো ঠোঁট ঠেলে । এক লাফে ভেতরে ঢুকে আসলো । কিছু বুঝতে দেওয়ার আগেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো একবিংশীকে । সেপ্টে লুকিয়ে নিলো নিজের প্রশস্ত বুকের মাঝে ।
” লাভ ইউ, লাভ ইউ, লাভ ইউ, মেরি জান !
এখানে এসেছো আমাকে বলবে না ? আমি সারা বাড়িতে খুঁজছিলাম তোমায় ।
