ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৮
নওরিন কবির তিশা
গভীর রজনীর নিস্তব্ধতা চরাচরকে গ্রাস করেছে। দেয়ালঘড়ির কাঁটা দুটো জানান দিচ্ছে সময় এখন মধ্যরাত পেরিয়ে ভোরের দিকে ধাবমান। আগামীকাল সকালে কোম্পানির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একখানা বোর্ড মিটিং ও মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন রয়েছে। ব্যবসায়িক দলগত এই কাজের জটিল সমীকরণগুলো সুচারুভাবে মিলিয়ে নিতেই আরাভ নিজের শয়নকক্ষের লাগোয়া সুপ্রশস্ত স্টাডি স্পেসের সোফায় বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে ছিল।
কাজের ফাঁকে হঠাৎ ঘড়ির দিকে দৃষ্টি পড়তেই ও ল্যাপটপটি বন্ধ করল। দীর্ঘক্ষণ একটানা স্ক্রিনের দিকে চেয়ে থাকায় চোখ দুটো সামান্য জ্বালা করছে ওর। আলতো পায়ে ও শয়নকক্ষের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তিয়াশার নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে ও কক্ষের আলো অনেক আগেই নিভিয়ে দিয়েছিল, তবে এখন দরজার ফাঁক গলে অন্দরের টিমটিমে ম্লান আলো দৃষ্টিগোচর হতে ও কিঞ্চিৎ কৌতূহল ও শঙ্কা নিয়ে দ্রুত চরণে কক্ষে প্রবেশ করতেই ওর বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল।
সম্মুখের বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে তিয়াশা। দুই হাত দিয়ে নিজের পেটটা শক্ত করে চেপে ধরে ও বালিশে মুখ গুঁজে মৃদু গোঙানির শব্দ করছে। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণায় ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে ও নিজের অবাধ্য কান্নাটুকু আড়াল করার আপ্রাণ প্রচেষ্টায় মগ্ন হলেও ওর মুখশ্রী এখন যন্ত্রণার তীব্র লালিমায় আরক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। রেশমি কালো অলকগুচ্ছ সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে পিঠ আর গাল ছুঁয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, গায়ের ওড়নাটা অবহেলায় এক পাশে আলুথালু হয়ে পড়ে রয়েছে।
তিয়াশার এমন সকরুণ অবস্থা অবলোকন করে আরাভ রীতিমতো ভয়ে ভড়কে গেলো। ও এক লাফে বিছানার কিনারায় এসে বসে এক প্রকার জাপটে ধরে তিয়াশাকে আলতো করে সোজা করার চেষ্টা করল। ওর কণ্ঠস্বর তখন উদ্বেগে কাঁপছে
— হোয়াট হ্যাপেন্ড, জান? কী হয়েছে তোমার? এদিকে তাকাও না প্লিজ! কষ্ট হচ্ছে?কি হইছে?
হঠাৎ আরাভের ওমন অতর্কিত স্পর্শ আর উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বরে তিয়াশা যন্ত্রণার মাঝেই চমকে উঠল। লজ্জায়, জড়তায় আর তীব্র শারীরিক কষ্টে ও নিজেকে আরও গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,,,
— আ-আপনি… আপনি এখানে কেন? ইউ জাস্ট গো ফ্রম হিয়ার! চলে যান এখান থেকে!
আরাভ তখনও তিয়াশার এই আকস্মিক শারীরিক পরিবর্তনের নিগূঢ় হেতু অনুধাবন করতে সক্ষম হয়নি। ও অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে তিয়াশার ললাট বেয়ে নেমে আসা স্বেদবিন্দুটুকু নিজের হাত দিয়ে মুছে দিতে দিতে বলল,,
— আমি কোথাও যাব না, তিয়াশা। আগে বলো প্রবলেমটা কোথায়? মাথা ঘুরছে? নাকি বুকে ব্যথা করছে? ডক্টর ডাকব?
তিয়াশা নিজের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে তীব্র যন্ত্রণার মাঝেই প্রায় চিৎকার করে উঠল,,,
— আই সেইড লিভ মি অ্যালোন! আপনি যান না, প্লিজ! কেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন?
বলতে বলতেই ও যখন পুনরায় পেটে হাত দিয়ে বিছানায় কুঁকড়ে গেল, ঠিক তখনই শ্বেতশুভ্র চাদরের এক কোণে সামান্য রক্তিম আভাযুক্ত দাগ দৃষ্টিগোচর হলো আরাভের। মুহূর্তের মাঝেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুপুরুষ হিসেবে আরাভের প্রখর মস্তিষ্ক সমস্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে অনুধাবন করে নিল। ও বুঝতে পারল, নারীর জীবনের প্রতি মাসের এই চিরন্তন, কষ্টদায়ক দিনলিপির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে তিয়াশা।আর কোনো বাক্যব্যয় না করে ও দ্রুতলয়ে কক্ষ ত্যাগ করল।
কিছুমুহূর্ত বাদে…
তিয়াশা তখনো যন্ত্রণায় বালিশটা আঁকড়ে ধরে গোঙাচ্ছিল, আকস্মিক কক্ষে পুনরায় পদার্পণ ঘটল আরাভের। ও একহাতে প্রয়োজনীয় হাইজেনিক সামগ্রী আর অন্যহাতে একটি ব্যথানাশক ওষুধ নিয়ে তিয়াশার শিয়রে এসে দাঁড়াল। আরাভকে ওমন বস্তু হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিয়াশার যন্ত্রণাক্লিষ্ট হৃদয়ে মহাবিস্ময়ের পাশাপাশি এক তীব্র লজ্জার পাহাড় এসে ভেঙে পড়ল। এক অভিনব জড়তায় ও চাদরের নিচে নিজেকে আরও একটু সংকুচিত করে নিল। তবে কি এই পুরুষটি সবকিছু বুঝে ফেলেছে?
আরাভ তিয়াশার সেই আরক্তিম, লজ্জাবনত মুখের পানে অত্যন্ত স্বরে বলল,,
— এখানে লজ্জা পাওয়ার বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার কিচ্ছু নেই, তিয়াশা। দিস ইজ কমপ্লিটলি ন্যাচারাল। এই জিনিসগুলো নাও আর ওয়াশরুমে গিয়ে চট করে চেঞ্জ করে এসো। আই অ্যাম ওয়েটিং হিয়ার।
তিয়াশা ভীষণ লজ্জায় ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে আরাভের হাত থেকে সামগ্রীগুলো গ্রহণ করল। এই মুহূর্তে ওর শরীরের যা অবস্থা, তাতে কোনো অহংকার বা জেদ দেখানোর অবকাশটুকুও নেই। ও ধীর চরণে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। খানিক বাদে তিয়াশা যখন নিজেকে পরিপাটি করে ওয়াশরুম হতে নির্গত হলো, তখন কক্ষের দৃশ্য দেখে ও পুনরায় স্তব্ধ হয়ে গেল। আরাভ ইতিমধ্যেই বিছানার সেই দাগ লেগে যাওয়া শ্বেতশুভ্র চাদরটি বদলে একদম নতুন ও পরিষ্কার একখানা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ও বিছানার এক প্রান্তে এক ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে অপেক্ষমান।
তিয়াশা বিছানার দিকে পা বাড়াতেই আরাভ ওর দিকে একটি গোলগাল, নরম পান্ডার আকৃতির কুশন এগিয়ে দিল। তিয়াশা অবাক হয়ে ওটা হাতে নিতেই টের পেল, বস্তুটির ভেতর হতে এক আরামদায়ক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে। ও এক মুহূর্তেই অনুধাবন করল,এটি প্রকৃতপক্ষে পান্ডার আদলে তৈরি পেট সেঁক দেওয়ার হট ওয়াটার ব্যাগ।
আরাভের এই অভাবনীয় সূক্ষ্ম যত্ন আর বিবেচনাবোধে তিয়াশার চোখ দুটো কৃতজ্ঞতায় সিক্ত হলো। ও বড় বড় চোখ করে আরাভের দিকে চেয়ে রইল। আরাভ চায়ের কাপটি ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,,
— এই গরম চা টুকু খেয়ে নাও, সুইটহার্ট। ভেতরের ক্র্যাম্পটা একটু কম কম লাগবে।
তিয়াশা কোনো প্রতিবাদ না করে বাধ্য বালিকার ন্যায় কাপে চুমুক দিল। আদা আর লেমনগ্রাসের সেই ওষ্ণ তরল পেটে যেতেই ওর শরীরের অবশ ভাবটা কিছুটা লাঘব হলো। চা শেষ হতেই আরাভ ওর হাতে ব্যথানাশক ঔষধ আর জল এগিয়ে দিল। ওষুধটা গিলে নেওয়ার পর আরাভ পরম মমতায় তিয়াশাকে বিছানায় শুইয়ে দিল এবং চাদরটা ওর বুক অবধি টেনে দিল।
আরাভ এবার তিয়াশার শিয়রে বসে অত্যন্ত আর্দ্র কন্ঠে শুধাল,,
— যন্ত্রণা কি পেটের পাশাপাশি কোমরেও করছে? তুমি বললে আমি আলতো করে একটু মাসাজ করে দিতে পারি।
তিয়াশা মহাবিস্ময়ে চোখ জোড়া কপালে তুলে ওর দিকে চাইল। এক জবরদস্তিকারী পুরুষের মুখে এমন কথা! ওর অনুমতিও চাইছে? ও আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাওয়ার পূর্বেই আরাভ ওর ললাটের অবিন্যস্ত কেশরাজ আলতো করে সরিয়ে দিয়ে আশ্বস্ত করে বলল,,
— ডোন্ট ওরি, আমি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে বলছি না। আমি শুনেছি এই সময়ে একটু মাসাজ করে দিলে নাকি ব্যথাটা অনেকখানি উপশম হয়। আই জাস্ট ওয়ান্ট টু হেল্প ইয়্যু। আমি তো আর ততটাও খারাপ নই, যতটা তুমি ভাবো।
জীবনের প্রথমবার আরাভের কণ্ঠের এই নিখাদ শুদ্ধতা আর কর্মকাণ্ড তিয়াশার পাথুরে মনের গহীনতম কোণে এক মস্ত বড় ফাটল ধরিয়ে দিল। ও চোখ দুটো বুজে এক বুক তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে বললো,
— থাক,লাগবে না!
আরাভ আর কথা বাড়ালো না। ও কক্ষের মূল আলো নিভিয়ে কেবল জিরো বাল্বের মৃদু ম্লান নীল আভাটি জ্বেলে দিল। নিস্তব্ধ শয্যার অপর প্রান্তে অত্যন্ত সতর্ক দূরত্ব বজায় রেখে শুয়ে পড়লো। তবে ঘুমালো না;সিলিংয়ের দিকে চেয়ে অত্যন্ত সজাগ ও নিঃশব্দে জেগে রইলো। যদি তিয়াশার পুনরায় কোনো প্রয়োজন পড়ে!
নিশুতি রজনীর অবসান ঘটিয়ে পূর্ব দিগন্তে তখন ঊষালগ্নের আবিররাঙা আলোর সমাপ্তি ঘটিয়ে প্রখর রৌদ্ররশ্মি ফুটি ফুটি করছে। চরাচরের গুমোট আঁধার ভেদ করে স্নিগ্ধ, সুশীতল সমীরণ জানালার পর্দা ঠেলে কক্ষে প্রবেশ করতেই তিয়াশার অবশ নেত্রে ঘুম ভাঙল। ব্যথানাশক ওষুধের প্রভাবে আজ বেশ অনেকটা বেলা অবধি ঘুমিয়েছে ও।
শয্যা ত্যাগ করে আলতো পায়ে তিয়াশা যখন ড্রইংরুমে এসে দাঁড়াল, সম্মুখের দৃশ্য দেখে ওর চোখ জোড়া বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে গেল। সেন্টার টেবিলের ওপর স্তূপীকৃত হয়ে আছে হরেক রকমের তাজা ফলমূল, বেদানার রস, ডাবের পানি আর এক বাটি গরম স্যুপ। অল্পবয়সী পরিচারিকাটি তখন পরম যত্নে থালাবাসন গোছাতে ব্যস্ত।তিয়াশা ললাটে কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের রেখা ফুটিয়ে পরিচারিকাটির উদ্দেশ্যে মার্জিত স্বরে শুধাল,,
— এসব কী? এত সকালে টেবিলে এত ফল আর খাবার সাজিয়ে রেখেছ কেন?
পরিচারিকাটি তিয়াশাকে দেখে হাত মুছে বিনীত ভঙ্গিতে হাসল,,
— আরাভ স্যার অফিসে যাওয়ার আগে নিজে অর্ডার দিয়ে এই সব কিছু আনিয়ে গেছেন, ম্যাম। উনি কড়া গলায় বলে গেছেন, আজ যেন আপনাকে বিছানা থেকে একদম উঠতে না দেওয়া হয়। আপনার শরীরে নাকি বড্ড উইকনেস।
‘উইকনেস’ শব্দটা শ্রবণগোচর হতেই তিয়াশার শুভ্র আনন লজ্জার তীব্র লালিমায় আরক্তিম বর্ণ ধারণ করল। কাল রাতের সেই অতি সংবেদনশীল মুহূর্তটির কথা মনে পড়তেই ও লোকলজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইল। ও নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,,
— কিন্তু এত খাবারের তো কোনো প্রয়োজন ছিল না।
পরিচারিকাটি এবার একটু হেসে বলল,,
— স্যার তো ইতিমধ্যেই দুইবার ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন, ভাবি। উনি বললেন দুপুরের মধ্যে বোর্ডের ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং শেষ করেই নাকি দ্রুত বাড়ি চলে আসবেন। আর যতক্ষণ না আসছেন, ততক্ষণ যেন আপনার প্রপার কেয়ার নেওয়া হয়। হয়তো স্যার আপনাকে অনেক ভালোবাসেন ম্যাম। ওনার মুখের অস্থিরতা দেখেই বোঝা বুঝলাম!
কাজের মেয়ের মুখে এমন সরল ও অকপট স্বীকারোক্তি তিয়াশার ভেতরের সমস্ত জেদ আর প্রতিজ্ঞার দেওয়ালে এক মস্ত বড় ধাক্কা দিল। যে পুরুষটা বাইরে এত দুর্ধর্ষ, ক্ষমতার দাপটে অন্ধ, সে অন্তরালে একটা মেয়ের সামান্য শারীরিক কষ্টে এতটা ব্যাকুল হয়ে উঠতে পারে? তিয়াশা উদাসীন নেত্রে বাইরের আকাশের পানে চেয়ে রইল। বুকের ভেতরটা আজ এক অদ্ভুত দোলাচলে দুলছে ওর—আরাভ খানের এই অতি মানবিক ও খাঁটি যত্নশীল রূপটাকে কোন ব্যাকরণে সংজ্ঞায়িত করবে ও?
প্রাতঃকালের স্নিগ্ধ রৌদ্রালোক তখন রুদ্রদ্বীপের পড়ার ঘরের বাতায়ন ভেদ করে টেবিলে স্তূপীকৃত নথিপত্রের ওপর এসে পড়েছে। এমন সময় হস্তধৃত চায়ের পেয়ালা আর প্রাতরাশের থালাখানি অতি সন্তর্পণে বহন করে কক্ষে প্রবেশ করল নয়নিকা। ওর আননে এক চিলতে চঞ্চল মধুর হাসি। রুদ্রদ্বীপ ফাইলের পাতা থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই অত্যন্ত গম্ভীর ও সংযত স্বরে বলল,,
— থ্যাঙ্ক ইউ, নয়ন। টেবিলের ওপর রেখে দাও।
নয়নিকা ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ উল্টে, কৃত্রিম অভিমানের সুরে বলল,,
— রোজ সকালে আপনার এই একঘেয়ে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ শুনতে বড্ড ক্লান্তি লাগে, রুদ্র ভাই! একটু হেসে কি কথা বলা যায় না?
রুদ্রদ্বীপ এবার হাতের কলমটি নামিয়ে রাখল। ও বুঝতে পারল, কিশোরী মেয়েটির এই অবাধ্য ও একতরফা অনুভূতির ভ্রান্তি আজকেই ভেঙে দেওয়া সমীচীন, নইলে অনর্থ ঘটবে। নয়নিকা প্রস্থান করার উদ্দেশ্যে যেই না ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অমনি রুদ্রদ্বীপ পেছন থেকে অত্যন্ত ধীর ও ভারী গলায় ডাকল,,
— নয়ন, একটু শোন।
নয়নিকা পরম আহ্লাদে ও হাসিমুখে চকিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,,
— কী হয়েছে, রুদ্র ভাই? কিছু বলবেন?
রুদ্রদ্বীপ ক্ষণকাল নীরব রইল। অতঃপর প্রখর, বাস্তববাদী চক্ষুদ্বয় নয়নিকার ওপর স্থির করে অত্যন্ত নিরাসক্ত কণ্ঠে বলতে শুরু করল,,
— শোন নয়ন, জীবনটা কোনো সিনেমা বা উপন্যাস নয়। মানুষের অবচেতন মন অনেক সময় সাময়িক মোহকে পরম সত্য বলে ভুল করে বসে। বিশেষ করে তোর এই কাঁচা বয়সে বাইরের চাকচিক্য আর আবেগের তীব্রতা মনকে বড্ড বেশি আন্দোলিত করে।
রুদ্রর এমন পরোক্ষ ও ইঙ্গিতপূর্ণ গুরুগম্ভীর কথা বুঝতে নয়নিকার বিন্দুমাত্র বিলম্ব হলো না। ওর মুখের সেই চঞ্চল হাসি নিমেষেই ম্লান হয়ে গেল। ও দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে অবাধ্য যুক্তি খণ্ডন করার ছলে বলল,,
— আপনি কি আমাকে অবুঝ ভাবেন, রুদ্র ভাই? আমি যথেষ্ট ম্যাচিওর। আর আমার মনের এই অনুভূতি কোনো সাময়িক মোহ নয়, এটিই আমার জীবনের একমাত্র ধ্রুব সত্য!
নয়নিকার এই অবাধ্য একগুঁয়েমি দেখে রুদ্রদ্বীপের ধৈর্যের বাঁধ এবার আলগা হলো। ও চেয়ার ছেড়ে সটান দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ধারালো ও কড়া গলায় সরাসরি বলল,,
— জাস্ট স্টপ দিস ননসেন্স, নয়ন! তুই বড্ড ছোট, ভালো-মন্দের বোধবুদ্ধি এখনো তোর মাঝে তৈরি হয়নি। তোর এই কিশোরী বয়সের নিছক ইমম্যাচিউরিটি আর ভালোলাগাকে ভালোবাসার নাম দিয়ে নিজের জীবনটা নষ্ট করিস না। আজ আমাকে ভালো লাগছে, দুদিন পর যখন অন্য কাউকে সামনে দেখবি, তখন এই ভালোলাগা কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। সো, জাস্ট গ্রো আপ!
রুদ্রর মুখে এমন নির্মম ও কঠোর প্রত্যাখ্যানের বাণী শ্রবণ করে নয়নিকার বুকটা মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র অপমানে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ওর দুই চোখ ফেটে জল চলে এলো। ও কান্নায় ভেঙে পড়া রুদ্ধকণ্ঠে চিৎকার করে বলল,,
— আপনি…আপনি না বড্ড নিষ্ঠুর, রুদ্র ভাই! আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালো লাগা আমার পক্ষে কোনোদিন পসিবল না! আপনি কেন আমার মনটা বোঝেন না?
নয়নিকার এই অবুঝ ক্রন্দন আর তর্কের পিঠে রুদ্রদ্বীপ এবার চরম রেগে গেল। ও টেবিলের ওপর একখানা জোরালো চাপড় মেরে অত্যন্ত কড়া হুমকি দিয়ে বলল,,
— আই সেইড শাট আপ, নয়ন! আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিস না। আজ থেকে যদি আর কোনোদিন তোর মুখে এই সমস্ত ফালতু আবেগের কথা শুনেছি, তবে এই বাড়িতে তোর আসা আমি আজীবনের মতো বন্ধ করে দেব! দিস ইজ মাই লাস্ট ওয়ার্নিং টু ইউ! গেট আউট ফ্রম মাই রুম!
রুদ্রর ওমন ভয়ানক রুদ্রমূর্তি আর শেষ হুমকিটা তীরের মতো গিয়ে বিঁধল নয়নিকার কোমল হৃদয়ে। ও আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। লজ্জায়, অপমানে আর তীব্র যন্ত্রণায় দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে ও ঘর থেকে দ্রুত পায়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। রুদ্রদ্বীপ এক মস্ত বড় তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে নিজের কপালে হাত রাখল।এই মেয়েকে বোঝানোর সাধ্য ওর নেই। তবু চেষ্টা চালাতে হবে, কেননা নয়নিকার মন মতো কিছুই হওয়া সম্ভব নয়।
মধ্যাহ্নের তীব্র ব্যস্ততা ও সেই গুরুত্বপূর্ণ মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন সমাপ্তি ঘটতেই আর এক মুহূর্তও দপ্তরে কালক্ষেপণ করেনি আরাভ। সমস্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে, তীব্র গতিতে গাড়ি ছুটিয়ে চটজলদি পুনরায় বাড়ি ফিরলো ও।
কোট-টাই পরিহিতাবস্থাতেই, ড্রেস চেঞ্জ করার সামান্যতম তাগিদ না দেখিয়ে আরাভ হড়মড় করে কক্ষে প্রবেশ করল। চোখেমুখে উদ্বেগের স্পষ্ট ছাপ ওর। বিছানার কিনারায় অলস ভঙ্গিতে বসে থাকা তিয়াশাকে দেখেই ও দ্রুত চরণে ওর সম্মুখে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। তিয়াশার ফ্যাকাশে আননের দিকে চেয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল কন্ঠে শুধাল,,
— হাউ আর ইউ ফিলিং নাও, সুইটহার্ট? কষ্ট কি একটু কমেছে? পেটে ব্যথাটা কি এখনও আছে? মেডিসিন ঠিকঠাক নিয়েছ তো?
আরাভের ওমন অতর্কিত আগমন আর ঝড়ের বেগে ছুটে আসা প্রশ্নের বাণে তিয়াশা ক্ষণিকের তরে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তবে পুরুষের চোখের ওই নিখাদ অস্থিরতা অবলোকন করে ও নিজেকে সামলে নিয়ে বড্ড শান্ত গলায় বলল,,
— আরেহ, রিল্যাক্স! অতটাও বড় কিছু হয়নি, ইট’স আ নর্মাল থিং। আপনি এত বেশি হাইপার কেন হচ্ছেন বলুন তো? আই অ্যাম পার্ফেক্টলি ফাইন নাও।
তিয়াশাকে এতটা শান্ত ও কোমল সুরে কথা বলতে দেখে আরাভের ওষ্ঠাধরে এক পরম তৃপ্তির মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। ও তিয়াশার একখানা কোমল হাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় আলতো করে তুলে নিয়ে আর্দ্র কণ্ঠে বলল,,
— তোমার আমার সম্পর্কে মনোভাব, আই ডোন্ট কেয়ার। বাট,তোমার সামান্যতম শারীরিক কষ্টও এই আরাভ খানের সহ্য করার ক্ষমতার বাইরে, জানেমান। ইয়্যু আর মাই এভরিথিং!
আরাভের এই গহীন ও নিখাদ স্বীকারোক্তিতে তিয়াশার মুখের সমস্ত যুক্তি আর দেমাগ যেন এক নিমেষে চুপসে গেল। ও বিস্ময়াভিভূত নেত্রে চেয়ে রইল এই দুর্ধর্ষ পুরুষের পানে। আরাভ আর কথা না বাড়িয়ে নিজের কোটের পকেট হতে প্রাতঃকালে আনা সেই সুরভিত তাজা লাল গোলাপটি বের করে তিয়াশার হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল। অতঃপর মৃদু হেসে বললো,,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৭
— গোলাপটা তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমি চট করে একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।
বলেই আরাভ নিজের কোট-টা খুলতে খুলতে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। ও চলে যেতেই তিয়াশা হাতের ওই রক্তিম গোলাপটির দিকে চেয়ে এক দীর্ঘ, তপ্ত নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। ওর চোখের কোণে এক ফোঁটা অবাধ্য জল চিকচিক করছে হয়তো। ও জানালার বাইরে দূর অন্তরীক্ষের পানে চেয়ে মনে মনে আক্ষেপের সুরে আওড়াল,,
— এতটাও ভালো হয়েন না আরাভ খান! যতটা ভালো হলে আপনাকে ছেড়ে যেতে আমার কষ্ট হবে!
