ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১২
নওরিন কবির তিশা
পশ্চিমাকাশে অস্তরবির লালিমা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।গোধূলির আবছা আলো-আঁধারিকে সঙ্গী করে প্রকৃতিতে নিস্তব্ধ সন্ধ্যার আগমনী বার্তা।মস্ত এক দাঙ্গাহাঙ্গামা আর রাজনৈতিক সংঘাতের ধকল শেষ করে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত অবয়বে কক্ষে প্রবেশ করল আরাভ। সারাদিনের ধস্তাধস্তি আর উত্তেজনার পর ওর শরীরটা যেন আর চলছিল না।
ও কোনোমতে বিছানার ওপর নিজের ভারী শরীরটা এলিয়ে দিল। মাথার ভেতরের শিরাগুলো তখন তীব্র যন্ত্রণায় দপদপ করছে; ও দুই হাত কপালে চেপে ধরে চোখ বুজে ওভাবেই পড়ে রইল।কক্ষের অন্য প্রান্তে, জানালার ধারের সোফাটায় এতক্ষণ যাবৎ নিশ্চল পাথরের মতো বসে ছিল তিয়াশা। বিছানায় শুয়ে থাকা আরাভের দিকে ও এক ঝলক আড়চোখে তাকাল।
গোধূলির ম্লান আলোয় আরাভের সুগঠিত, দীর্ঘদেহী পৌরুষালী অবয়বটা সুদর্শন হিসেবে ঠাওর হলেও, পরক্ষণেই তিয়াশা এক বুক তীব্র বিতৃষ্ণা নিয়ে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। মনে মনে একরাশ অবজ্ঞা, বিরক্তি আর গালির ঝড় বয়ে গেল। গা গুলিয়ে একটা তীব্র বমি বমি ভাব ওকে গ্রাস করতে চাইল।
অবশ্য এর কারণটা মোটেও অজ্ঞাত নয়; নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, পরম অপছন্দের ও ঘৃণিত এক পুরুষের সঙ্গে একই ছাদের নিচে বন্দি থাকতে হলে যেকোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়ের মনের অবস্থা এমনই হওয়ার কথা। সম্মুখে থাকা পুরুষটা অবয়বে যতটাই রাজপুত্র সমতুল্য সুদর্শন হোক না কেন, তিয়াশার চোখে সে কেবলই একজন নিষ্ঠুর অন্যায্য অপরাধী।
কক্ষের ভেতরের এই দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা যখন ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই হুট করে আরাভের পকেটে থাকা দামি ফোনটা উচ্চশব্দে বেজে উঠল,বিকট শব্দে বেজে উঠলো বিশ্রী এক গান,,
মনেতে ঘুরে ঘুরে আমার এই অন্তরে…
প্রেমেরই আকাঙ্ক্ষা……
ও পাংখা….
পাংখা..পাংখা…পাংখা…পাংখা..পাংখা হইলো মন…
মনের পাখা ঘুরে না তো…
খুঁজে বেড়ায় বন….
বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে আরোহন করে মুখটা বিশ্রীভাবে কুঁচকালো তিয়াশা। একটা মানুষের রুচির কতটা দুর্ভিক্ষ চললে এমন গান মোবাইলের রিংটোন হিসেবে সেট করে! এদিকে তিয়াশাকে মহাবিস্ময়ে ফেলে দিয়ে, এতক্ষণ মৃ-তদেহের মতো পড়ে থাকা আরাভ যেন এক ঝটকায় কোত্থেকে সহস্র ভোল্টের বিদ্যুৎ পেল! গানের তাল কানে যেতেই ও বিছানায় স্প্রিংয়ের মতো সোজা হয়ে বসে পড়ল। সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি এক লহমায় উধাও। ও চোখ বন্ধ করে গানের তালে তালে মাথা দোলাতে দোলাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করল এবং কলটা কেটে দিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তিয়াশা আর নিজের ভেতরের অবজ্ঞা ধরে রাখতে পারল না। ও সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
— অসভ্য, রুচিহীন ছোটলোক একটা! যেমন মানুষ, তেমন তার কুরুচিপূর্ণ গানের চয়েস।
আরাভ কান খাড়া করে তিয়াশার ওই মৃদু স্বরের ফিসফিসানিটুকু ঠিকই শুনে ফেলল। ও বিছানা থেকে নেমে দু-পা এগিয়ে এসে ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ঝুলিয়ে বলল,
— কী বললে বউ? আমার চয়েস কুরুচিপূর্ণ? আরে, মমতাজ আপার এই পাংখা পাংখা গানটা না শুনলে এই আরাভ খানের শরীরের রক্তে ঠিকমতো জোশ আসে না! সারাদিনের সব ধকল এক সেকেন্ডে হাওয়া হয়ে গেল। উফ, কী লিরিক্স! কী বিট! আ পাংখা!
তিয়াশা এক কদম পিছিয়ে গিয়ে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
— আপনার ওই মনের পাখা বনে না ঘুরে ডাস্টবিনে ঘুরলেই বেশি মানাত। আপনি যে একটা আস্ত সাইকো আর খ্যাত, সেটা আপনার এই রিংটোন শুনলেই পুরো দুনিয়ার মানুষ একবারেই বুঝে যাবে।
আরাভ এবার উঠে তিয়াশার খুব কাছে এসে দাঁড়াল, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বলল
— দুনিয়ার মানুষ যা ইচ্ছে বুঝুক, তুমি বুঝলেই হলো সুইটহার্ট! আর সাইকো বলছ বলো, কিন্তু খ্যাত বোলো না। এই গানের আসল মর্ম বুঝতেও একটা হাই-লেভেলের দিল লাগে, যা তোমার এই ডিআইজি বাপের দেওয়া আভিজাত্যের ভেতর খুঁজে পাবে না। আচ্ছা, তোমার মনটা কখনো এমন পাংখার মতো ঘোরেনি?
তিয়াশা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
— মুখ সামলে কথা বলুন, মিস্টার আরাভ খান! আপনার মতো একটা সস্তা গুন্ডার সাথে কথা বলাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। নিজের ফোনের রিংটোনটা অন্তত চেঞ্জ করুন, নইলে এই বিশ্রী আওয়াজে আমার কান দুটো ঝালাপালা হয়ে যাবে।
আরাভ এবার হো হো করে হেসে নিজের ফোনটা বাতাসে হালকা নাচিয়ে বলল,
— রিংটোন চেঞ্জ? ইম্পসিবল! এই রিংটোন তো এখন থেকে রোজ চব্বিশ ঘণ্টা বাজবে। আর তুমি যদি বেশি বিরক্ত করো, তবে মাঝরাতে স্পিকার অন করে এই গানের তালে তালে তোমার সাথে রোমান্টিক ড্যান্স করব। কেমন হবে বলো তো, বউ?
— আপনি একটা আস্ত জানোয়ার! আপনার সাথে কথা বলাই বৃথা।
আরাভ তিয়াশার এই মরিয়া ভাব দেখে আরও একটু এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
— জানোয়ার তো খাঁচায় বন্দি থাকে বউ, আর আমি তো তোমার মনের খাঁচায় অলরেডি জায়গা করে নিয়েছি। রাগ না করে বরং গানটা এনজয় করতে শেখো, লাইফটা অনেক ইজি হয়ে যাবে।
— কোথায় যাচ্ছেন?
তিয়াশার তীক্ষ্ণ প্রশ্নটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই,দরজার ঠিক অগ্রভাগ হতে সশব্দে পশ্চাতে চাইল আরাভ। ইঞ্চিৎসন্ধিহান দৃষ্টিতে বাঙালি রমণীদের মতন তিয়াশাকে চেয়ে থাকতে দেখে,ও এক কদম এগিয়ে এসে ভ্রু নাচিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
— কেন বউ? ঘরের বাইরে পা রাখতে না রাখতেই এত টান? তুমি কি আমারে মিস করবা নাকি? তা তুমি যদি এতই রিকোয়েস্ট করো, তবে আর বাইরে যাব না। বললেই এইখানেই থাইকা যাই, কড়া রোমান্স হইব!
তিয়াশা ঘেন্নায় মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে বলল,
— আপনাকে মিস করতে আমার বয়েই গেছে! যাওয়ার আগে শুধু একটা কথা বলে রাখছি— আবার একটুখানি পর ওই নোংরা মদ গিলে মাতলামি করতে করতে রুমে ফিরবেন না। আমি কিন্তু আজ রাতের বেলা ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করে রাখব, আগেই বলে দিচ্ছি।
তিয়াশার এই খোঁচায় আরাভ একটু দমে গেল। ও নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করতে করতে একটু আমতা আমতা করে বলল,
— কী যা তা বলো! আমি কি সবসময় মদ খাই নাকি? আজ কোনো ড্রিংকস করমু না, যাও।
তিয়াশা একখানা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ওষ্ঠাধর বাঁকিয়ে বলল,
— বিড়ালে বলে মাছ খাব না! এটা জীবনেও পসিবল, মিস্টার আরাভ খান? আপনার মতো নেশাখোরের মুখে এই কথা বড্ড বেমানান।
কথাটা সরাসরি আরাভের পুরুষালি ইগোতে গিয়ে লাগল। ওর চোখের চাউনিটা মুহূর্তের জন্য একটু শক্ত হয়ে উঠল, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— তুমি কি আমারে খোঁচা দিলা তিয়াশা?
তিয়াশা দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে সটান জবাব দিল,,
— মোটেও না। খোঁচা দেব কেন? আপনাকে জাস্ট বাস্তবতাটা চেনালাম।
আরাভ এবার তিয়াশার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তিয়াশার চোখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বলল,,
— আচ্ছা, এই তোমার ধারণা আমার ওপর? যাও, আজকে থেকে আর এক ফোঁটাও টাচ করমু না। দেখি কি হয়!
মস্ত বড় কৌতুক শোনার ভঙ্গিতে সশব্দে হেসে উঠল তিয়াশা; বলল,
— তাতে কি? কয়দিন টিকবে আপনার এই নাটক? একদিন? দুইদিন? তারপর তো ঠিকই আবার ওই মদের বোতল মুখে নিয়ে এই ঘরে এসে মাতলামি করবেন।
আরাভ তিয়াশার এই চরম অবিশ্বাস দেখে নিজের জেদ ধরে রাখতে পারল না। ও পকেট থেকে হাত বের করে কড়া কণ্ঠে ঘোষণা করল,
— যাও, সারা জীবনের মতোই ছাইড়া দিলাম! আজ থেকে আরাভ খান আর মদ ছোঁবে না।
— আপনার এই সস্তা ওয়াদা নিজের কাছেই রাখুন। শুধু মদ খেলেই কি মা-তলামি হয়? অন্য কিছুতেও তো মা-তলামি হয়, আর ওগুলো তো আপনি ঠিকই খাবেন।
আরাভ এবার একটু হেসে ফেলল। ও নিজের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে তিয়াশার সামনে দোলাতে দোলাতে বলল,
— সিগারেটটা আপাতত ছাড়া সম্ভব না সুইটহার্ট, ওইটা একটু লাগবে। তবে বাদবাকি যত নোংরা অভ্যাস আছে—সব ছাইড়া দিলাম। যাও, আজকে থেকেই ফুল স্টপ!
কথাটা শেষ করেই আরাভ একবার চোখ টিপে, বেশ ফুরফুরে মেজাজে রুম থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল।
আরাভ চলে যেতেই তিয়াশা ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।মনে মনে নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করলো,,
‘অসম্ভব কাজ যদি কোনোদিন সম্ভব করে দেখাতে পারেন মিস্টার আরাভ খান, তবে সেদিন থেকে আমিও আপনাকে ঘৃণা করা ছেড়ে দেব। কিন্তু আমি জানি, আপনার মতো সাইকোর পক্ষে এটা কোনোদিনই সম্ভব না।’
নিশীথের নিস্তব্ধতা তখন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে ধরত্রীকে। অথচ সেই বিশাল পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র কোণের দুই প্রান্তে ঘটে চলেছে এক নিদারুণ কষ্টের আখ্যান। বাবা-মায়ের সঙ্গ ছাড়া কখনো আহার না করা মেয়েটা আজ বিগত দুদিন যাবৎ কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে অতি সামান্য কিছু মুখে গুঁজে প্রাণটুকু টিকিয়ে রেখেছে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কান্নার তোড়ে খাবার যেন ভেতরেই ঢুকতে চায় না; তৃষ্ণার্ত ছটফটানিতে এক ঢোক পানিই এখন ওর শেষ সম্বল।
অন্যপ্রান্তে, চৌধুরীর আবাসের পরিবেশটা আজ শ্মশানের চেয়েও ভয়ানক নীরব। শয্যাশায়ী রেহানা বেগমের জ্বরে তপ্ত দীর্ঘশ্বাসে ঘরের বাতাস অব্দি ভারী হয়ে আছে। সহধর্মিনীর শয্যার পাশে আজ বড্ড অসহায়ের ন্যায় বসে আছেন ডিআইজি তাহের চৌধুরী। সিংহের ন্যায় পৌরুষদীপ্তি লোভ পেয়েছে তার। দীর্ঘনিঃশ্বাস হয়েছে শেষ সম্বল।
আরাভ ক্লাবে এসে পৌঁছাতেই ওর ফ্রেন্ড সার্কেল যথারীতি হইহুল্লোড় করে উঠল। আরিয়ান টেবিল থেকে হুইস্কির একটা দামি বোতল আর গ্লাস তুলে নিয়ে স্বভাবসুলভ আয়েশি ভঙ্গিতে আরাভের দিকে এগিয়ে দিল,,
— এই নে মামু, তোর স্পেশাল ডোজ! আজকে তো ক্লাবে মেলার কড়া কড়া মাল আসছে। নে, টান দিয়া ফ্রেশ হ!
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আরাভ আলতো হাতে গ্লাসটা দূরে সরিয়ে দিল। অদ্ভুত শান্ত পদক্ষেপে সোফায় হেলান দিয়ে পকেট থেকে সিগারেটের লাইটারটা বার করতে করতে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,,
— আজকে থেইকা এইসবে ফুল স্টপ, মামু। আর এক ফোঁটাও টাচ করমু না।
আরাভের মুখ থেকে এমন অবিশ্বাস্য কথায় সমগ্র ফ্রেন্ড সার্কেল এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। আরিয়ান বিস্মিত দৃষ্টিতে বোতলটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে বলল,,
— হোয়াট? তুই খাবি না? মামু, মাথা ঠিক আছে তো তোর? কালকে বাসর রাতের হ্যাংওভার এখনো কাটে নাই নাকি রে?
পাশ থেকে বাকি বন্ধুরা সশব্দে হেসে উঠতেই আরিয়ান আবার বাঁকা হেসে টিপ্পনী কাটল,
— আরেহ মামু! তুই কি আসলেই ওই ডিআইজির মেয়ের প্রেমে পড়ে গেলি নাকি? ওটা তো জাস্ট একটা ফান ছিল, ওগো ফ্যামিলির ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জেদ ছিল। এখন কি তুই সত্যি সত্যি সংসারী সাধু সাজার অ্যাক্টিং করতাছস?
বন্ধুদের এই সস্তা হাসাহাসির মাঝেই সোফার এক কোণে বসে থাকা সাইদ এতক্ষণ চুপচাপ ড্রিংকস করছিল। ও গ্লাসটা নামিয়ে রেখে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলল,ষ,,
— তোরা এখনো আরাভকে চিনতে পারিসনি। আমি ওকে ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো করে চিনি। যদি শুধু শোধ নেওয়ারই হতো, তবে ও সম্পর্কটাকে কখনোই বিয়ের মতো হালাল উপাধি দিত না। আরাভ খানের জেদ যে কখন ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে, ও নিজেই তা টের পায়নি।
সাইদের এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়নে ক্লাবের সেই কোলাহলপূর্ণ কোণটায় মুহূর্তের জন্য এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। আরাভ নিজের জ্বলন্ত সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিল। ধোঁয়ার কুন্ডলী বাতাসে ভাসিয়ে নিশ্চুপ রইলো।আজ প্রথমবারের মতো কোনোরূপ প্রত্যুত্তর করলো না ও।
রাত তখন বারোটার গণ্ডি ছুঁইছুঁই। তিয়াশা বিছানার এক কোণে হাঁটু দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে বসে ছিল। গত দুদিনের মানসিক ঝড় আর অনাহারের ক্লান্তিতে ওর চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসছে, শরীরটা ভেঙে আসছিল প্রবল নিদ্রাকর্ষণে । ঠিক তখনই ঘরের দরজার লকটা খোলার মৃদু শব্দ হলো।
তিয়াশা চমকে উঠে তড়িৎগতিতে চোখ মেলে তাকাল। তিয়াশার সমস্ত ধারণাকে পা দ্বারা পিষে আরাভ অত্যন্ত শান্ত পায়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল। ওর অবয়বে কোনো টালমাটাল ভাব নেই, চোখে লালচে নেশার ঘোর নেই—একদম সুস্থ, স্বাভাবিক এক পুরুষ। তবে তিয়াশাকে সবচেয়ে বেশি চমকে দিল আরাভের হাতের খাবারের থালাটা।
আরাভকে এত তাড়াতাড়ি এবং এই রূপে দেখে তিয়াশা ঝটপট খাট থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বিস্ময় ও জড়তা মেশানো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,,
— আপনি? এত তাড়াতাড়ি চলে এলেন যে? আর আপনার হাতে এগুলো কী?
আরাভ তিয়াশার সেই অবাক চাউনি লক্ষ করে ঠোঁটের কোণে মৃদু একটু হাসল। ও অত্যন্ত ধীরপদে এগিয়ে এসে খাটের পাশের ছোট টেবিলটার ওপর খাবারের প্লেটটা নামিয়ে রাখল। তারপর তিয়াশার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,,
— রহিমা খালার কাছে শুনলাম, তুমি নাকি গত দুদিন ধরে প্রায় কিছুই খাওনি। শরীরটাকে এভাবে শেষ করে দেওয়ার মানে কী, তিয়াশা?
আরাভের এমন মার্জিত ভাষায় তিয়াশা ক্ষণিকের জন্য পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ও কিছু না বলে কেবল এক দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রইল। আরাভ আর কোনো ভূমিকা না করে খাটের কিনারায় বসল এবং প্লেটটা হাতে নিয়ে তিয়াশার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,,
— এখানে এসে বসো। লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাবারটা খেয়ে নাও।
তিয়াশা নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়ে, তীব্র দ্বিধা আর সংশয় বুকে চেপে দু-পা পিছিয়ে গেল। ওর সারা শরীরে তখন এক অদ্ভুত জড়সড় ভাব। ও নিজেকে শক্ত করে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলল,,,
— আমি আপনার হাতের খাবার খাব না।
আরাভ তিয়াশার এই দূরত্ব বজায় রাখা আর জড়সড় হয়ে থাকাটা খেয়াল করল। ও প্লেটটা আবার টেবিলে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,,
— তুমি আমাকে বিশ্বাস করছ না, তাই তো? ভেবেছ আমি মুখে এক কথা বলে আড়ালে অন্য কিছু করছি? আমি আজ ক্লাবে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু এক ফোঁটা মদও ছুঁয়ে দেখিনি। বন্ধুদের সব আড্ডা ফেলে শুধু তোমার জন্য এই এত তাড়াতাড়ি ছুটে এসেছি। বিশ্বাস করো, আমি আমার কথা রেখেছি তিয়াশা। আজ থেকে আমার ওইসব নোংরা অভ্যাস অতীত।
তিয়াশা অবজ্ঞার একটা শেষ চেষ্টা করে বলল,,
— মানুষের স্বভাব এত সহজে বদলায় না, মিস্টার আরাভ খান। আপনার এই নাটকের পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।
আরাভ এবার তিয়াশার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। তিয়াশার অবিন্যস্ত চুলের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে বলল,,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১১
— উদ্দেশ্য কেবল একটাই— তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা। তুমি না খেয়ে থাকলে আমার এই বুকের ভেতর কেমন একটা তীব্র যন্ত্রণা হয়, তা তোমাকে বোঝানোর ভাষা আমার জানা নেই। জেদ আর রাগ তো অনেক দেখিয়েছ, এবার নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে অন্তত এই দুটো লোকমা মুখে তুলে নাও। আমি জোর করব না, তুমি নিজের হাতেই খাও।
