Home ইন্তেজার এ ওয়াসিল ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৭

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৭

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৭
নওরিন কবির তিশা

— সুইটহার্ট?
গভীর অন্ধকারের স্তব্ধতা চিরে সহসা প্রতিধ্বনিত হওয়া পরিচিত পৌরুষ কণ্ঠস্বরে তিয়াশার সর্বাঙ্গে এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেল। আরাভের আলমারির গোপন ড্রয়ারে পেনড্রাইভের অনুসন্ধান করতে করতে ও এতটাই মগ্ন ছিল যে, কখন অলক্ষ্যে শিকারীর মতো ওর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে এই পুরুষ, তা ও টের পায়নি। আতঙ্কে আর আকস্মিকতায় পা পিছলে তিয়াশা মেঝেতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই একখানা অতি মজবুত, উষ্ণ বাহু চিতার ক্ষিপ্রতায় ওর কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল।
ছিটকে সরাসরি আরাভের সেই চওড়া, শার্টাবৃত বক্ষদেশে এসে আছড়ে পড়ল তিয়াশা। আকর্ষণের তীব্রতায় ওড়নাটা কাঁধ থেকে খসে পড়েছে। আরাভ তিয়াশাকে নিজের বাহুবন্ধনে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে গভীর, কিঞ্চিত রসিকতার সুরে ফিসফিসিয়ে বলল,,

— টাইমলি প্রপার ডায়েট করো জানেমান, এভাবে না খেয়ে খেয়ে দুর্বল হলে তো সামান্য হাওয়াতেই পড়ে যাবে! তখন এই স্বামীকে সামলাবে কে, হ্যাঁ?
তিয়াশা তীব্র অস্বস্তি আর বুকের ভেতরের ধকধকানি সামলে নিয়ে সর্বশক্তিতে ওর বুক থেকে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,,
— ছাড়ুন আমাকে! বলছি ছাড়ুন!
— আরেহহহ,, এত পালাই পালাই করো কেন? জানু!
তিয়াশা ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললো,,
— ছাড়বেন আমায়?
আরাভ নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় উত্তরের পরিবর্তে প্রশ্ন ছুঁড়ল,,
— ছাড়ার জন্য ধরেছি কি?
তিয়াশা বিরক্তিতে চোখমুখ বিশ্রীভাবে কুঁচকে বলল,,

— আপনার ওই মুখস্থ কুৎসিত রসিকতাগুলো এবার বন্ধ করবেন, মিস্টার আরাভ খান? আপনার এই দমবন্ধ করা সান্নিধ্য আমার বিন্দুমাত্র রুচিসম্মত নয়!
তিয়াশার এহেন ক্ষুব্ধ হৃদয়স্পর্শী বাক্যবাণেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না আরাভ; কষ্ট পেয়েছে কি? মনোভাব বোঝা গেল না। ও বরং নিজের বাহুবন্ধন আরও একটু দৃঢ় করে, তিয়াশার আনত মুখের ওপর নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখল। প্রাতঃকালের সেই পরিপাটি রূপ এখন দিনান্তের ক্লান্তি আর এক অদ্ভুত মায়ায় মন্ডিত। ও তিয়াশার কপালে ছুঁয়ে থাকা দু-গাছি অবাধ্য অলকগুচ্ছ ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,,
— রুচির কথা বলছ, সুইটহার্ট? যে স্বামী নিজের সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে শুধু তোমার ওই জেদি মুখটা দেখবে বলে ট্রাফিক জ্যামের নরক পার হয়ে ছুটে আসে, তার সান্নিধ্যকে কুৎসিত বলাটা কিন্তু বড্ড ইনজাস্টিস! জাস্ট লুক অ্যাট মি, মায়া হচ্ছে না তোমার?
তিয়াশা ওর চোখের সেই গভীর সংকল্প দেখে ক্ষণিকের তরে স্তব্ধ হয়ে গেল। এই পুরুষের কণ্ঠের আকুলতা ওর ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধকে যেন অবশ করে দিতে চায়। ও চোখ নামিয়ে কোনোমতে নিজের গলার জোর বজায় রেখে বলল,,

— ভিলেনরা জেন্টলম্যানের মুখোশ পরলেই হিরো হয়ে যায় না। আপনি এখন যা করছেন, তা কেবলই একটা চাল।সো, আপনার প্রতি মায়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না!
— চাল নয় বউ, দিস ইজ পিওর রিয়্যালিটি।
তিয়াশা ওষ্ঠাধর প্রান্তে তাচ্ছিল্যের ‌হাসি ফুঁটিয়ে বলল,,
— হাহ! আমি বিশ্বাস করিনা।
প্রত্যুত্তরে আরাভ মলিন হাসলো। এই প্রথমবার! জীবনে প্রথমবার ওকে এমন অসহায় রূপে হাসতে দেখলো তিয়াশা! ‌ওর বুকের গহীন ভেতরটা যেন ক্ষণিকের তরে এক অদ্ভুত অজানা ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। তবে কি শত্রুর প্রতি অবচেতন মনে কোনো দুর্বলতা জমা হচ্ছে? না, যে পুরুষ ওর জীবনকে জোর করে খাঁচায় বন্দি করেছে, তার প্রতি করুণা দেখানো মোটেও সমীচীন নয়।
আরাভ আলতো করে তিয়াশার কোমর থেকে নিজের বাহুবন্ধন শিথিল করে দিল, তবে ওকে সম্পূর্ণ ছেড়ে না দিয়ে ওর দুই কাঁধে নিজের হাত দুটি স্থির রাখল;অত্যন্ত আর্দ্র ও নিচু স্বরে বলল,,,
— বিশ্বাস তুমি একদিন করবেই তিয়াশা, সেদিন হয়তো বড্ড দেরি হয়ে যাবে। আই নো, এই রিলেশনশিপের শুরুটা খুব একটা জেন্টলম্যানদের মতো ছিল না। বাট ট্রাস্ট মি, তোমাকে হারানোর ভয়টা আমাকে এতটাই অন্ধ করে দিয়েছিল যে, ভালো-মন্দের তফাত করার মতো হুশ আমার ছিল না।
তিয়াশা ওর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ঘরের দেয়ালের দিকে চেয়ে অত্যন্ত কঠোর কন্ঠে বলল,,

— ভয়? নাকি নিজের জেদ আর ক্ষমতার অহংকার? একটা মেয়ের অসম্মতিকে সম্মান জানানোর মানসিকতা আপনাদের মতো ছেলেদের থাকে না, মিস্টার খান। ওটাকে ভালোবাসা বলে নিজের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করবেন না।
আরাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল; বেদনাকাতর কন্ঠে বলল,
— অপরাধ আমি করেছি, আর তার শাস্তিও তো পাচ্ছি, সুইটহার্ট। এই যে ২৪ টা ঘন্টা তোমার এত কাছে থেকেও তোমার মনের ওই মস্ত বড় দূরত্বটা আমাকে সহ্য করতে হয়, এর চেয়ে বড় ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট আর কী হতে পারে বলো? তুমি যেটাকে আমার জেন্টলম্যান হওয়ার নাটক বলছ, ওটা আসলে তোমাকে একটু শান্তিতে রাখার, তোমার মুখে এক চিলতে হাসি দেখার আমার একটা আপ্রাণ চেষ্টা মাত্র।
তিয়াশা ক্ষণিকের জন্য পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। এই বখাটে পুরুষের মুখে এমন গভীর ও হৃদয়স্পর্শী জীবনবোধের বহিঃপ্রকাশ ওর সমস্ত চিন্তাধারাকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। ও বুঝতে পারছে না, আরাভের এই রূপটা সত্যি, নাকি ওর সেই ব্ল্যাকমেইলার রূপটা সত্যি। ও নিজেকে সামলে নিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,,,

— আপনার এসব আবেগঘন কথাবার্তায় তিয়াশা চৌধুরী গলে যাবে না, মিস্টার। আমার কাছে আপনার একমাত্র পরিচয়-আপনি একজন জবরদস্তিকারী।
আরাভ তিয়াশার এই অবিচল কাঠিন্য দেখে ফের একটু হাসল। ও এবার কোটের পকেট থেকে লাল গোলাপটি বের করে তিয়াশার চিবুকের কাছে ধরল এবং অন্য হাত দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা সুবাসিত বেলী ফুলের গাজরা জোড়া ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে ভরাট কন্ঠে বলল,,
— আই ডোন্ট কেয়ার, বউ! তুমি আমাকে জবরদস্তিকারী বলো আর ভিলেন বলো, দিনশেষে তোমার এই সুন্দর রাগ আর ইগোটার মালিক কিন্তু আমি একাই। এই নাও, আজ সারাদিন এই বোরিং অফিসে খাটুনির পর শুধু তোমার জন্য এই ফুলগুলো নিয়ে এসেছি। এগুলো অন্তত ডাস্টবিনে ফেলে দিও না, প্লিজ!
তিয়াশা ফুলগুলোর দিকে চাইল। বেলী ফুলের সুবাসিত ঘ্রাণে সমগ্র কক্ষ আচ্ছন্ন হতে তৎপর। আরাভের এই অভাবনীয় যত্নশীল রূপের সম্মুখে দাঁড়িয়ে তিয়াশা নিজের অবশ ভাবটুকু লুকানোর প্রয়াসে হিমশীতল কন্ঠে বলল,,

— আমি ফুল পছন্দ করি না।আর সেটা যদি হয় আপনার দেওয়া,তাহলে আমি এক কথায় ঘৃণা করি!
তিয়াশার মুখের ওপর ছুড়ে দেওয়া এই নির্মম ও অসত্য বাক্যবাণটি শোনামাত্রই আরাভের প্রসারিত হাত দুটি ক্ষণিকের তরে শূন্যে নিশ্চল হয়ে রইল;ও তিয়াশার আরক্তিম ও জেদি আননের পানে চেয়ে এক ম্লান, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ও অত্যন্ত ধীর পায়ে এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর ফুলগুলো নামিয়ে রেখে নিজের কোটের কলারটা সামান্য আলগা করে বলল,,
— মিথ্যে বলাটা তোমার ওই সফিস্টিকেটেড ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে বড্ড বেমানান, তিয়াশা। আমি জানি তুমি ফুল কতটা ভালোবাসো। তবে হ্যাঁ, ফুলকে নয়, তুমি আসলে ঘৃণা করো এই আরাভ খানকে। আর সেই ঘৃণার তাপে আজ এই নিরীহ ফুলগুলোও পুড়ল। দ্যাটস ওকে, সুইটহার্ট!
তিয়াশা ওষ্ঠাধর শক্ত করে চেপে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল। ওর বুকের ভেতরটা তখন এক অজানা অপরাধবোধ আর অস্থিরতায় তোলপাড় হচ্ছে। আরাভ নিজের ব্রিফকেসটা তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগোতে এগোতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। ও পেছন ফিরেই অত্যন্ত নিরাসক্ত স্বরে বলল,
— ফ্রেশ হয়ে নাও। রাতের ডিনারটা আজ আমরা একসাথেই করব। আই ডোন্ট লাইক এনি কাইন্ড অফ এক্সকিউজ, ওয়াইফি।
আরাভ কক্ষ ত্যাগ করতেই তিয়াশা এক মস্ত বড় নিশ্বাস ছেড়ে খাটের ওপর বসে পড়ল। ওর দৃষ্টি তখন টেবিলের ওপর রাখা ওই শ্বেতশুভ্র বেলী ফুলের গাজরাটার ওপর স্থির। অবচেতন মনেই ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আরাভের এই অভাবনীয় পরিবর্তন আর অন্তহীন সহনশীলতা ওর ভেতরের প্রতিজ্ঞার দেওয়ালটাকে প্রতি মুহূর্তে একটু একটু করে ধসিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ও তো দমে যেতে পারে না! ওর বাবার সম্মান, আরাভের আগের করা সমস্ত অপরাধ ওকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই মায়ায় জড়ানো এক মস্ত বড় ভুল হবে।

নিশুতি নিস্তব্ধতা তখন সমগ্র চরাচরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ডাইনিং টেবিলের মৃদু আলোয় মুখোমুখি বসে আছে দুজন। কক্ষের গুমোট নীরবতা ভঙ্গ করে কেবল তৈজসপত্রের মৃদু ঠুনঠুন শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।তিয়াশা নিজের থালায় যৎসামান্য অন্ন মুখে তুলতে তুলতে আড়চোখে সামনের পুরুষটির দিকে চাইল। আর তখনই ওর ডাগর চক্ষুদ্বয় তীব্র বিস্ময় ও কিঞ্চিৎ বিরক্তিতে কুঞ্চিত হয়ে উঠল।
আরাভের খাদ্য গ্রহণের ভঙ্গিটি বড্ড অদ্ভুত, পাতের চারিপাশে অন্নকণা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে, অত্যন্ত অসাবধান ও খামখেয়ালি এক ভোজনশৈলী। ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে নিজের কৌতূহল আর অবদমিত রাখতে পারল না তিয়াশা। ও তীব্র কটাক্ষ মেশানো স্বরে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল,,

— আপনি কি সবসময় এভাবেই খান? দিস ইজ সো উইয়ার্ড!
আরাভ ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে গিয়েও মাঝপথে থমকে গেল। ও থালা থেকে মুখ তুলে তিয়াশার সেই নাসিকা কুঞ্চিত করা মুখশ্রীর পানে চাইল। ওর দৃষ্টিতে কোনো ক্রোধ ফুটে উঠল না, বরং এক নিরাসক্ত শান্ত কৌতূহল নিয়ে চাইল। তিয়াশা ওর নীরবতায় আরও এক ধাপ এগিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলেই ফেলল,,,
— জাস্ট লুক অ্যাট ইয়োর প্লেট, মিস্টার খান! এভাবে চারিপাশে ভাত ছড়িয়ে কোনো সভ্য মানুষ আহার করে? দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো হিংস্র বন্য মানব খেতে বসেছে। ছোটবেলা থেকে আপনাকে কি কেউ কখনো ঠিকঠাক ম্যানার্স শেখায়নি, নাকি কেউ কখনো খাইয়ে দেয়নি?
খাইয়ে দেওয়া শব্দটা শ্রবণগোচর হতেই আরাভের চোখের অতল গহীনে ক্ষণিকের তরে এক সুগভীর কালচে ম্লান ছায়া ঘনীভূত হয়ে উঠল। ও হাতের অন্নকণাগুলো থালাতেই ফেলে দিল। অতঃপর একখানা শুষ্ক, তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে অত্যন্ত নিচু ও ভারী গলায় বলল,
— খাওয়াবে? কে খাওয়াবে আমাকে, তিয়াশা? আমার কি কোনো মা ছিল, যে পরম মমতায় কোলে বসিয়ে লোকমা মুখে তুলে দেবে?
আরাভের এই অপ্রত্যাশিত জবাব তিয়াশার কর্ণে যেন এক বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। ওর মুখের সমস্ত অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য এক লহমায় বিলীন হয়ে;ও স্তম্ভিত নেত্রে চেয়ে রুদ্ধকণ্ঠে শুধালো,,

— মানে? আপনার মা কখনো খাইয়ে দেয় নি?
আরাভ টেবিলের ওপর রাখা জলের গ্লাসটা এক চুমুকে খালি করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল;সোজা হয়ে বসে অত্যন্ত নিরাসক্ত গলায় বলল
— নো, সুইটহার্ট। মা আমার বুঝ শক্তি অবধি থাকলে তো খাওয়াবে! আমার বয়স যখন মাত্র চার কি পাঁচ বছর, তখন এই ক্ষমতার লোভী আনোয়ার খানের প্রাসাদ ছেড়ে চিরতরে চলে যান তিনি। তারপর থেকে এই বিশাল রাজপ্রাসাদে আমি একাই বড় হয়েছি। কাজের লোকের হাতের অবহেলা আর বাপের ক্ষমতার দাপট—এই ছিল আমার চাইল্ডহুড। সো, জাস্ট রিল্যাক্স! আমার এই জঙ্গলি স্বভাবের পেছনে কোনো ডমেস্টিক ট্রেনিং কাজ করেনি।
আরাভের এই নির্মম অতীত এবং ওর ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর উগ্রতার নেপথ্য কারণটি উদঘাটিত হতেই তিয়াশার বুকের বাঁ পাশটা এক তীব্র, অচেনা বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। ও বুঝতে পারল, এই যে পুরুষটা আজ এতটা বেপরোয়া, খামখেয়ালি আর ভালোবাসার জন্য অন্ধ-এর পেছনে আসলে লুকিয়ে আছে এক তীব্র মাতৃস্নেহবঞ্চিত, একাকী এক বালকের হাহাকার। মায়ের আঁচল না থাকলে মানুষের জীবন বুঝি এমনই এক শুষ্ক মরুভূমি হয়ে দাঁড়ায়!
তিয়াশা নিজের অবচেতন মনের সমস্ত ঘৃণা আর প্রতিজ্ঞাকে ক্ষণিকের তরে বিস্মৃত হলো। এক অদ্ভুত মায়া আর নারীসুলভ মমতা ওকে গ্রাস করল। ও আর এক মুহূর্তও কালবিলম্ব না করে, নিজের আসন ছেড়ে উঠে এসে ধীর চরণে আরাভের ঠিক পাশের চেয়ারটায় বসলো।
আরাভ মহাবিস্ময়ে ওর এই চঞ্চলতা অবলোকন করছিল। তিয়াশা কোনো কথা না বলে, অত্যন্ত কোমল হাতে আরাভের থালা থেকে সামান্য ভাত আর তরকারি পরম যত্নে মেখে নিজের ডাগর চোখ জোড়া আরাভের চোখের ওপর স্থির রেখে, অত্যন্ত ধীর-গম্ভীর কণ্ঠে বলল,,

— মুখ খুলুন।
আরাভ তখন প্রস্তরমূর্তির ন্যায় স্তব্ধ! যে মেয়েটি ওর নামটাও প্রতি মুহূর্তে তীব্র ঘৃণায় উগরে দেয়, তার হাতের এই অভাবনীয় অন্নগ্রাস ওর চেতনার সমস্ত সমীকরণ ওলটপালট করে দিচ্ছে। ও একদৃষ্টে তিয়াশার মায়াবী, আরক্তিম আননের দিকে চেয়ে রইল।তিয়াশা কিঞ্চিৎ ধমকের সুরে পুনরায় বলল,,
— কী হলো? এভাবে হাঁ করে স্ট্যাচুর মতো চেয়ে না থেকে জাস্ট হা করুন তো! এরপর থেকে যদি কখনো দেখি এভাবে ভাত ছড়িয়ে নষ্ট করছেন, আমি কিন্তু সত্যিই খুব রেগে যাব।
আরাভ এবার আর নিজের ভেতরের অবাধ্য সত্তাটাকে ধরে রাখতে পারল না। ও অত্যন্ত বাধ্য বালকের মতো মুখ খুলল এবং জীবনের প্রথমবার তিয়াশার সেই পদ্মফুলের মতো কোমল আঙুলের ছোঁয়া মাখানো প্রথম লোকমাটি পরম তৃপ্তিতে গ্রহণ করল।

গভীর রজনীর স্তব্ধতা ভেঙে রুদ্রদ্বীপের ঘরে ফিরতে ফিরতে দেয়ালঘড়ির কাঁটা দুটো একটা অপরের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা দিনের কেস ফাইলের জটিলতা আর তিয়াশার ওই গুপ্ত মিশনের তীব্র মানসিক চাপ ওর চওড়া ললাটে স্পষ্ট। ও সোফায় কোটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে কপালে হাত রাখতেই ওপাশে উপবিষ্ট রূপকথা বেগম এক গ্লাস জল নিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ালেন।
রুদ্রদ্বীপ জলটা এক চুমুকে পান করে সোফায় মাথাটা এলিয়ে দিল। রূপকথা বেগম ওর অবিন্যস্ত কেশগুচ্ছে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে বললেন,
— আর কতকাল নিজেকে এভাবে যান্ত্রিকতার বেড়াজালে বন্দি করে রাখবি, রুদ্র? আমার ‌বয়স কিন্তু বাড়ছে, কমছে না। আজীবন কি এই শূন্য ঘরে একা একাই রাত পার করবি?
রুদ্রদ্বীপ চোখ না মেলেই কিঞ্চিৎ ক্লান্ত হাসল,,

— আবার শুরু করলে, মা? আই অ্যাম অলরেডি ভেরি বিজি উইথ মাই কেসেস। ওসব নিয়ে ভাবার সময় কই?
রূপকথা বেগম এবার ওর পাশে বসে একটু ইঙ্গিতপূর্ণ স্বরে বললেন,,
— সময় তোকে করে নিতে হবে, বাবা। আজ সকালে নয়নিকা তোর জন্য চায়ের কাপ হাতে যেভাবে চঞ্চল হয়ে ঘুরছিল, আমার এই বুড়ো চোখ কিন্তু তা এড়ায়নি। মেয়েটা তোকে কতটা সমীহ করে, তা কি তুই আসলেই বুঝিস না?
নয়নিকার প্রসঙ্গ আসতেই রুদ্রদ্বীপ চকিতে চোখ মেলে তাকাল। ও সোজা হয়ে বসে বলল,,
— মা, তুমি কিসের মধ্যে কি টানছো? নয়নিকা বড্ড ছোট, ইভেন অনেক ছোট! ও তো সবেমাত্র এসএসসি শেষ করল। ওর এই কাঁচা বয়সের নিছক আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া আমার মতো একজন ম্যাচিউর অফিসারের পক্ষে কোনোভাবেই পসিবল না।
রূপকথা বেগম ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে রুদ্রর দিকে চাইলেন। ওনার কণ্ঠে এক মস্ত বড় সামাজিক বাস্তবতার সুর ফুটে উঠল,,

— তাতে কী হয়েছে, রুদ্র? মেয়েদের বয়স একটু কম থাকাই তো ভালো। তোকে আগলে রাখার জন্য অমন একটা চঞ্চল আর পবিত্র মেয়েরই প্রয়োজন। আর তাছাড়া…!
একটু থেমে রূপকথা বেগম ছেলের চক্ষু গহীন কোণের লুকিয়ে থাকা অন্য এক রূপকে পাঠ করার চেষ্টা করে অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন,
— রইল বাকি তিয়াশার কথা! ও এখন অন্যের ঘরণী। পরিস্থিতি যেমনই হোক, সমাজ জানে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের বিবাহিতা স্ত্রী। একজন বিবাহিত মেয়ের সাথে আমি আমার ছেলের নাম জড়াতে দিতে পারি না, রুদ্র। ওই চ্যাপ্টারটা দয়া করে ক্লোজ কর।
মায়ের এই সটান ও নির্মম বাস্তববাদী বাক্যবাণটি রুদ্রদ্বীপের পুরুষালী ইগো আর সুপ্ত অনুভূতির ওপর গিয়ে যেন এক মোক্ষম আঘাত হানল। ও চোয়াল শক্ত করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল,,
— মা, জাস্ট স্টপ দিস ডিসকাশন! নয়নিকা আমার কাছে আজীবন ওই ছোট বোন-ই থাকবে, ওর সাথে আমার কোনো ফিউচার নেই। আর তিয়াশার গায়ে জোর করে লেপে দেওয়া ওই কলঙ্কের দাগ মুছে ওকে মুক্ত করে আনা আমার আইনি এবং ব্যক্তিগত জেদ। সমাজ কী ভাবল, তাতে রুদ্রদ্বীপের কিচ্ছু যায় আসে না।
কথাটা শেষ করেই রুদ্রদ্বীপ আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে ধীর পদক্ষেপে নিজের শয়নকক্ষের দিকে এগিয়ে গেল। রূপকথা বেগম এক বুক নিঃসীম ক্লান্তি নিয়ে ছেলের প্রস্থান পথের পানে চেয়ে আনমনেই এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

মধ্যাহ্নের তীব্র দাবদাহ শেষে প্রকৃতির রুদ্ররূপ যেন হঠাৎ করেই স্তিমিত হয়ে এসেছে। নীলিমার বিশাল ক্যানভাস জুড়ে আজ ঘন কৃষ্ণবর্ণের জমাটবদ্ধ মেঘের মেলা, যেন কিছুকালের মাঝেই এক পশলা বৃষ্টি চরাচরকে স্নান করিয়ে দেবে। এমনই এক মেঘলা প্রহরে তৃষিত চিত্তে মুক্ত বাতাসের সন্ধানে প্রাসাদের সুপ্রশস্ত ছাদে এসে দাঁড়িয়েছিল তিয়াশা। বিগত দুটি দিন ধরে আরাভ নিয়মিত অফিসের কাজে ব্যস্ত, আর সেই সুযোগে তিয়াশা ঘরের প্রতিটি কোণে পেনড্রাইভের সন্ধান চালিয়েছে, তবে কাঙ্ক্ষিত সেই ডিভাইসের নাগাল ও এখনো পায়নি।
তিয়াশা যখন আকাশের এই মেঘলা রূপ অবলোকন করছিল, ঠিক তখনই অত্যন্ত মৃদু ও কুণ্ঠিত পদক্ষেপে ছাদে প্রবেশ করল আনু। ছাদের অপর প্রান্তে তিয়াশাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই আনু চমকে উঠল;অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তড়িঘড়ি উল্টো পথে চলে যেতে উদ্যত হলো।

— আনু, শুনুন!
তিয়াশার স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বরের আহ্বানে আনুর চরণের গতি মাঝপথেই রুদ্ধ হয়ে গেল। ও অত্যন্ত ধীর পায়ে পেছন ফিরে দ্বিধাগ্রস্ত নেত্রে চাইল। তিয়াশা ওর মনের দোলাচল বুঝতে পেরে ওষ্ঠাধরে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে কয়েক কদম এগিয়ে এলো,,
— আপনি আমাকে দেখে এভাবে পালিয়ে যাচ্ছেন কেন? আই অ্যাম নট ইওর এনিমি, আনু। আসুন না, এখানে এসে বসুন।
আনু নিজের ওড়নার প্রান্তটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে কিঞ্চিৎ তোতলামি সামলে বলল,,
— না মানে… তিয়াশা, আপনি এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন দেখে ভাবলাম ডিস্টার্ব না করি।
তিয়াশা ছাদের রেলিংয়ে দুই হাত রেখে আকাশের দিকে চেয়ে এক প্রলম্বিত শ্বাস ফেলল। ও আড়চোখে আনুর ফ্যাকাশে মুখশ্রী পর্যবেক্ষণ করে অত্যন্ত মার্জিত ও গভীর গলায় বলল,,
— আমার ওপরে আপনার রাগ অথবা ঘেন্না, কোনটা বেশি প্রকট?ʼ
আনু বুঝলো প্রশ্নের কারন। সে নাবালিকা নয়,তবে তিয়াশা কি সত্যিই বুঝেছে ওর মনোভাব? কিন্তু কিভাবে? আগে তো কখনও তিয়াশার সামনেও পড়েনি নি ও। যথাসম্ভব আড়ালে রেখেছে নিজেকে। তবুও কি? যাইহোক ও নিজেকে সামলে বলল,

— কোনোটারই অধিকার নেই।
— রাগ, ঘৃণা, পছন্দ, ভালোবাসা এসবের জন্য অধিকার লাগেনা। অধিকার অভিমান, অনুরাগ, অনুযোগ, অভিযোগে লাগে। আপনার অনুভূতি আমার ওপর অভিমান টাইপের না। ঘৃণা টাইপেরই হবে কিছু!
— কারণ নেই কোনোটারই। তবুও তা কেন মনে হলো?ʼ
তিয়াশা ওর দিকে চেয়ে অদ্ভুতভাবে হাসল,
— চোখ লুকাতে বড্ড অদক্ষ আপনি।
আনুর চোখে এবার পানি উপচে পড়তে চায়। পানি যেন সবসময় সেখানে মজুতই থাকে।
তিয়াশা আর কিছু বলল না। প্রথম সাক্ষাতেই বেশি কিছু বেমানান কি না! প্রস্থান করলো তৎক্ষণাৎ। ও কোল যেতেই আনু আর নিজের অশ্রু সংবরণ করতে পারল না। দুই চোখ বেয়ে নোনা জলের ধারা নেমে এলো ওর।

অপরাহ্ণের জমাটবদ্ধ মেঘের আস্তরণ ভেদ করে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টিবিন্দু তপ্ত ধরণীর বুকে আছড়ে পড়তেই মহাবিপদে পড়ল আদ্রিতা। রিকশা পাওয়ার তীব্র আশায় ও যখন রাজপথের মোড়ে দাঁড়িয়ে ব্যাকুল নেত্রে চেয়ে ছিল, ঠিক তখন স্থানীয় কিছু বখাটে ছোকরা ওকে লক্ষ্য করে নোংরা টিপ্পনী কাটছিল। একজন তো প্রায় ওর ওড়নার প্রান্ত ছুঁয়ে দেওয়ার ধৃষ্টতাও দেখিয়ে ফেলল। আদ্রিতা আতঙ্কে ও লজ্জায় চোখ দুটো বন্ধ করে এক অস্ফুট আর্তনাদ ছেড়ে প্রায় কেঁদে দিবে , ঠিক তক্ষুনি দিকবিদিক কাঁপিয়ে অতি পরিচিত একখানা কৃষ্ণবর্ণের ভারী স্পোর্টস বাইকটি সশব্দে এসে ব্রেক কষল সেথায়।
সাইদ বাইক থেকে নেমেই কোনো বাক্যব্যয় না করে ওই বখাটে ছেলেটার কলার চেপে ধরে এক মোক্ষম ঘুসি কষাল। ওর সেই পেশীবহুল সুপুরুষ অবয়বের রুদ্রমূর্তি প্রত্যক্ষ করে বাকি ছোকরারা মুহূর্তের মধ্যে লেজ গুটিয়ে চম্পট দিল। ধুলোবালি ঝেড়ে সাইদ নিজের জ্যাকেটের কলারটা সামান্য ঠিক করে আদ্রিতার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ও নিজের তীক্ষ্ণ চাউনিতে কিছুটা ধমক আর এক চিলতে কৌতুক মিশিয়ে শুধাল,,

— হেই লেডি! হোয়াট ইজ রং উইথ ইউ? তুমি কি কসম খেয়েছ যে রোজ রাস্তায় বের হয়ে কোনো না কোনো ঝামেলায় জড়াবে, আর দিস সাইদ খান অলওয়েজ স্পাইডারম্যানের মতো এসে তোমাকে রেসকিউ করবে, হ্যাঁ?
সাইদের এহেন রাশভারী খোঁচায় আদ্রিতার ভয়ার্ত রূপ নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। ও নিজের দুই হাত কোমরে গুঁজে, ফর্সা গাল দুটো টমেটোর মতো ফুলিয়ে, ডাগর চোখ জোড়া বড় বড় করে ভীষণ রাগ দেখিয়ে বলল,
— হ্যাঁ! আমি সবসময় ঝামেলায় পড়ি, আমার কপালটাই খারাপ! আর আপনার এত দয়া দেখানোর কোনো দরকার নেই তো। আমি কি আপনাকে ডেকেছিলাম বাঁচানোর জন্য? হু আর ইয়্যু টু জাজ মি?
আদ্রিতার এই বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে রাগ করার ভঙ্গিতে সাইদ আর নিজের গম্ভীরতা বজায় রাখতে পারল না। ও নিজের ওষ্ঠাধর উন্মোচিত করে হঠাৎ বড্ড চমৎকার ও প্রাণখোলা এক চিলতে মিষ্টি হাসি হাসল। প্রখর অহংকারী এই পুরুষের অধরে ওমন হাসি আদ্রিতা ইতিপূর্বে কখনো অবলোকন করেনি। অপরাহ্নের ম্লান আলোয় হাসির ছটায় সাইদকে আজ বড্ড বেশি সুপুরুষ আর মায়াবী ঠাওর হলো। আদ্রিতা পলকহীন নেত্রে স্তব্ধ হয়ে সেই হাসির পানে চেয়ে ওর চিত্তের গহীন কোণে আকস্মিক এক অলৌকিক চঞ্চলতার সৃষ্টি হলো।
তবে পরক্ষণেই সাইদ নিজের হাসির বেগ সংবরণ করে হুট করেই বড্ড গম্ভীর হয়ে গেল। ও বাইকের হ্যান্ডেলে হাত রেখে অত্যন্ত বাস্তববাদী কণ্ঠে বলল,

— লিসেন লেডি, প্রতিদিন এভাবে তোমাকে লিফট দিতে পারব না আমি। আই হ্যাভ মাই ওন ওয়ার্কস। সো, বি কেয়ারফুল।
সাইদের এই আকস্মিক কথাটা বড্ড করুনাময় বলে ঠাওর হলো আদ্রিতার! ও কখনো করুনার পাত্রী হতে চায় না। বুকটা এক অজানা অভিমানে মোচড় দিয়ে উঠল হঠাৎ। ও নিজের মোহ থেকে চট করে বাস্তবে ফিরে এসে ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে তেজস্বী গলায় বলল,,
— আমি কি আপনার কাছে কোনোদিন লিফট চেয়েছি, মিস্টার? আপনিই হুটহাট কোত্থেকে চলে আসেন।নয়তো,আপনার ওই দামি বাইকে চড়ার বিন্দুমাত্র শখ আমার নেই!
কথাটা শেষ করেই আদ্রিতা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সটান কদমে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করল। সাইদ ওর এই অবাধ্যতা দেখে ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি ফুটিয়ে বাইক স্টার্ট দিল। মুহূর্তের মধ্যে ও বাইক নিয়ে আদ্রিতার ঠিক পাশে এসে এক ঝটকায় আদ্রিতার কোমল হাতখানা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। আদ্রিতা কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই ও এক মৃদু চটকা মেরে ওকে সরাসরি বাইকের পেছনের সিটটায় টেনে তুলল।
আদ্রিতা মহাবিস্ময়ে ও সম্মোহনে চেঁচিয়ে উঠতে গেলেই সাইদ ওর মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এসে, এক অদ্ভুত পুরুষালি আধিপত্য খাটানোর সুরে কড়া গলায় বলল,,
— সাইদ আবরারকে তেজ দেখাচ্ছো? তোমার সাহসের তারিফ করতে হচ্ছে তো! চুপচাপ বসো মেয়ে,নয়তো এমন থাপ্পড় দিবো সারামাস বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবে না!

সন্ধ্যার ম্লান আলো আঁধারির খোলনলচে বদলে তখন রজনীর গভীর স্তব্ধতা নেমে এসেছে ধরণীর বুকে। তীব্র গতিতে ছুটে চলা কালো ক্রাউন গাড়ির ব্যাকসিটে হেলান দিয়ে বসে ছিল আরাভ। হাতে একগুচ্ছ রক্তরঙা গোলাপের তোড়া। অফিসের এক প্রবীণ সহকর্মী সেদিন কথায় কথায় বলেছিলেন,,
— ভালোবাসার মানুষকে প্রতিদিন ফুল দিলে নাকি হৃদয়ের জমে থাকা কঠিন বরফও একসময় গলে জল হয়ে যায়।
আরাভ জানে, তিয়াশা এই গোলাপগুলো দেখলেই হয়তো তীব্র অবজ্ঞায় দূরে ছুড়ে ফেলে দেবে, প্রতিদিনের মতো আজও হয়তো ধুলোয় লুটোপুটি খাবে এই লাল পাঁপড়িগুলো। তবুও এক অদ্ভুত, অবাধ্য জেদ আর তীব্র অনুরাগ বুকে চেপেই ও রোজ এই সুবাসিত উপহার নিয়ে নীড়ে ফেরে। আজকের ঘটনাটাও তেমনি। তীব্র যানজটে আটকে পড়া এক বখাটে পুরুষ এতকিছু ভেবে আনমনে মুচকি হাসলো, মনে মনে বলল,,

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৬

— লোকে রক্তক্ষরণে যন্ত্রণায় ছটফট করে, আর আমি তোমার দেওয়া ক্ষতের আসক্তিতে বুঁদ হয়ে থাকি। সুইটহার্ট, তুমি আমার হৃদয়ের সাধারণ স্পন্দন নও, আমার মগজে রাজত্ব করা এক তীব্র অসুখ। যার নিরাময় পৃথিবীর যেকোনো ওষুধের পক্ষে সম্ভব নয়!

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here