ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২০
নওরিন কবির তিশা
মহানগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত চিরপরিচিত অভিজাত ক্লাবের অন্দরমহল তখন বুঁদ কৃত্রিম আলো আর চড়া সুরের মূর্ছনায় । ধোঁয়াটে কুন্ডুলিবদ্ধ পরিবেশের এক কোণে, সুপ্রশস্ত সোফায় বৃত্তাকারে বসে ছিল আরাভের বন্ধুদল। টেবিলে স্তূপীকৃত পানীয়ের গ্লাস আর হাসির রোল। আরাভ এসে সোফার এক প্রান্তে নিজের ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিতেই আরিয়ান ওর দিকে একখানা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে কিঞ্চিৎ কৌতূহলী স্বরে শুধালো,,
— হোয়াটস আপ, ম্যান? তোকে এত বিধ্বস্ত লাগছে কেন? আর ভাবীকে এত দ্রুত বাবার বাড়ি রেখে চলে এলি যে বড়? উই অল থট, তুই তিয়াশাকে কোনোদিন নিজের খাঁচা থেকে বের হতে দিবি না!
আরাভ আনমনে ম্লান হাসলো অতঃপর আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলল,,
— তোর ভাবী আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে রে, আরিয়ান। ও শুধু নিজের ইগো আর জেদের কারণে সেটা মুখে স্বীকার করতে নারাজ। ওকে জোর করে আটকে রাখলে ও কোনোদিন নিজের ভেতরের এই অনুভূতিটা টের পেত না। একটু আলাদা রাখলে, দূর থেকে ও নিজেই বুঝতে পারবে এই আরাভ খানের ভালোবাসার গভীরতা কতটা ছিল।
পাশ থেকে রাফসান ওষ্ঠাধর বাঁকিয়ে একটু চড়া সুরে বলে উঠল,,
— বলিস কী, আরাভ! যদি ও কোনোদিন স্বীকার না করে? মেয়েটা কিন্তু বড্ড জেদি আর আত্মসম্মানী। ও যদি তোকে ভুলে নতুন করে লাইফ স্টার্ট করে?
বন্ধুর এই আশঙ্কায় আরাভের প্রখর দৃষ্টি মুহূর্তে দুর্ধর্ষ হলো। ও সোফায় সোজা হয়ে বসে অত্যন্ত ভারী গলায় জবাব দিল,,
— ভুলে যাওয়া কি এতটা সহজ? তোরা কি ভেবেছিস আমি ওকে চিরতরে ছেড়ে দিয়েছি? নট অ্যাট অল! আমি তো আগেই বলেছি, তিয়াশাকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে আরাভ খান সারাজীবন ভিলেন হয়েই থাকবে। ওর ওই বাবার বাড়ির তো আমি ওকে কেবল ওর অনুভূতিগুলো উপলব্ধি করার জন্য রেখে এসেছি। আর মোদ্দা কথা হলো, এখন সামনে নির্বাচন। ক্ষমতার এই নোংরা লড়াইয়ে যখন-তখন অপোজিশন আমাদের ওপর ফিজিক্যাল অ্যাটাক করতে পারে। আমি চাইনি আমার কারণে তিয়াশার লাইফ কোনো ধরনের রিস্কে পড়ুক। ওর সামান্যতম ক্ষতিও এই আরাভ খান সহ্য করতে পারবে না।।
খনিকের নিস্তব্ধতা; হঠাৎ আরিয়ান কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে বললো,
— কিন্তু আরাভ, একটা জিনিস নোটিশ করেছিস? তোর শ্বশুর আব্বা আর ওই চ্যাঙড়া এসপি তো অলরেডি কোর্ট আর মিডিয়াকে ইনভলভ করার ট্রাই করছিল। তুই হুট করে এভাবে ভাবীকে ড্রপ করে আসায় ওদের সেই লিগ্যাল মুভগুলো কিন্তু এখন জাস্ট ইউজলেস হয়ে গেল। এটা কি কাকতালীয় নাকি তুই সব জেনে বুঝেই এক ঢিলে দুই পাখি মারলি?
আরাভ সোফার পেছনে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে ছাদের ধোঁয়াটে আলোর পানে চেয়ে এক অদ্ভুত নিস্পৃহ হাসি হাসল,,
— এক্স্যাক্টলি, আরিয়ান। রুদ্রদ্বীপ ভেবেছিল আইনি রেইড দিয়ে মিডিয়ার সামনে আমার ফ্যামিলি ইমেজ চূর্ণবিচূর্ণ করে তিয়াশাকে উদ্ধার করবে। কিন্তু আমি নিজেই যখন সসম্মানে তিয়াশাকে ওর বাবার কোলে ফিরিয়ে দিয়ে এলাম, তখন ওদের পুরো ব্লু-প্রিন্টটাই জলে গেল। এখন মিডিয়া বা কোর্ট কারো সামনেই আনোয়ার খানের ফ্যামিলির বিরুদ্ধে আঙুল তোলার কোনো গ্রাউন্ড নেই। পলিটিক্যাল গেমটা ব্যাকস্টেজ থেকে কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়, ওটা অন্তত আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
রাফসান এবার নিজের গ্লাসটা হাতে নিয়ে কিছুটা ঝুঁকে বসে শুধাল,,
— দ্যাটস ব্রিলিয়ান্ট ব্রো! কিন্তু ভাবীর মনের অবস্থাটা কী? তুই যখন ওনাকে ওভাবে ড্রপ করে এক টানে গাড়ি নিয়ে চলে এলি, ওনার রিঅ্যাকশন কেমন ছিল?
আরাভের বিষাদগ্রস্ত নেত্রে চেয়ে প্রলম্বিত শ্বাস টানলো,,
— তিয়াশার ওই ডাগর চোখের কোণে আমি স্পষ্ট এক ফোঁটা জলের কণা দেখেছি, রাফসান। যে মেয়ে এতদিন আমার ছায়াটুকুও সহ্য করতে পারত না, আজ আমার এই আকস্মিক নিস্পৃহতা আর চলে আসাটা ওর বুকের বাম পাশে এক মস্ত বড় হাহাকারের সৃষ্টি করেছে। আমি জানি, ও এখন প্রতিটা মুহূর্তে, নিজের ওই চেনা ঘরের চার দেওয়ালে বসেও আমার এই তীব্র ভালোবাসার অভাবটা হাড়ে হাড়ে টের পাবে। এই দূরত্বটুকুই আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পার্মানেন্ট সলিউশন।
গভীর রজনীর স্তব্ধতা গ্রাস করেছে চরাচর। সমগ্র ধরিত্রী গভীর নিদ্রায় মগ্ন। অথচ নিজের চিরচেনা শয়নকক্ষের নরম শয্যায় এপাশ-ওপাশ করছে তিয়াশা। এই কক্ষ, এই আসবাব-সবই তো ওর পরম আকাঙ্ক্ষিত মুক্তির স্বর্গ হওয়ার কথা ছিল, তবে আজ এই নিশীথ প্রহরে এক অদ্ভুত তন্দ্রাচ্ছন্নতা ওর দুই চোখের পাতাকে কেবল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে, গভীর ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে দিচ্ছে না।
বিগত কয়েকটি দিন ধরে যে পুরুষটির উগ্র শাসন, নিবিড় যত্ন আর গভীর ভালোবাসার বাহুডোরে ও আবদ্ধ ছিল, আজ তার আকস্মিক অনুপস্থিতি এই চেনা ঘরটাকেও বড্ড অচেনা আর একঘেয়ে করে তুলছে। বিছানার এক কোণে শুয়ে তিয়াশার বারবার মনে হতে লাগল, বুকের বাম পাশটায় যেন এক মস্ত বড় ফাটল ধরেছে, এক নিঃসীম হাহাকার যেন কেবলই ডুকরে উঠছে।
তীব্র অস্থিরতা সামলাতে না পেরে ও শয্যা ত্যাগ করল। ধীর চরণে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল ও। বাতায়ন গলে আসা হিমেল হাওয়ারা ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর অবিন্যস্ত অলকগুচ্ছ। বাইরের দূর অন্তরীক্ষে তখন মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে এক ফালি একাকী চাঁদ; তিয়াশা সেই উদাসীন চাঁদের পানে চেয়ে অবরুদ্ধ কণ্ঠে মনে মনে নিজেকে শাসিয়ে ওষ্ঠাধর শক্ত করে চেপে ধরল। তবুও,হৃদয়কোনের অযাচিত বেদনা রোধে ব্যর্থ হয়ে শেষমেষ প্রবেশ করলো ওয়াশরুমে। কৃত্রিম ঝর্ণার নিচে নিজেকে সঁপে, অবিরল ধারায় ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলতে চাইলো অপরাধী আবেগ!
সকাল থেকেই এক তীব্র দাবদাহ গ্রাস করেছে তিয়াশার সর্বাঙ্গ। পারদ চড়তে চড়তে জ্বর এখন একশো চার ডিগ্রির ঘর ছুঁইছুঁই। তীব্র জ্বরের ঘোরে ও শয্যায় এপাশ-ওপাশ করছে, আর অবিন্যস্ত ওষ্ঠাধর কামড়ে অবুঝের মতো বিড়বিড় করে চলেছে অর্থহীন শব্দগুচ্ছ।
একমাত্র কন্যার এই আকস্মিক ও সকরুণ অবস্থা অবলোকন করে রেহানা বেগম ও তাহের চৌধুরী সম্পূর্ণ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কপালে জলপট্টি দিতে দিতে রেহানা বেগমের চোখ দুটো ছলছল নয়নে কক্ষের মাঝে অস্থির পায়চারি করে চলা স্বামীর দিকে চাইলেন। অতঃপর জলপট্টির কাপড়টা নিংড়াতে নিংড়াতে অত্যন্ত ব্যাকুল কন্ঠে স্বামীকে বললেন,,
— তুমি আর দাঁড়িয়ে না থেকে ডক্টর সেনকে একটা কল করো না, প্লিজ! মেয়ের গা যেভাবে পুড়ে যাচ্ছে, আমার বড্ড ভয় করছে গো। যে মেয়ে এত ঝড়-ঝাপটার মাঝেও শক্ত দাঁড়িয়ে রইল, সে হুট করে এভাবে ভেঙে পড়ল কেন বলো তো?
তাহের চৌধুরী পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে এক গভীর, ম্লান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার চিরাচরিত প্রখর, দৃষ্টিজোড়া তখন বিছানায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট কন্যার ওপরেই স্থির,,
— আই নো, রেহানা। তিয়াশা বাইরে নিজেকে যতই স্ট্রং দেখাক না কেন, ওর মেন্টাল ট্রমাটা ভেতরে ভেতরে ওকে একদম শেষ করে দিয়েছে। ওই নরকুণ্ডে ও যে কী পরিমাণ মানসিক প্রেসারে ছিল, এই জ্বর আসলে তারই রিঅ্যাকশন।
রেহানা বেগম তিয়াশার কপালে পরম মমতায় হাত রেখে, বড্ড দ্বিধাকুল কণ্ঠে শুধালেন,,
— কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে। কাল থেকে মেয়েটা কেমন যেন এক ফোঁটা কথাও বলেনি, শুধু শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। ও কি সত্যিই ওই বাড়ি থেকে মুক্তি পেয়ে খুশি হতে পেরেছে, নাকি…?
তাহের চৌধুরী স্ত্রীর কথার মাঝখানেই বারণের ভঙ্গিতে হাত তুললেন, চোয়ালমুখ নিদারুণ শক্ত করে বললেন,,
— স্টপ ইট, রেহানা! অহেতুক আর কোনো ড্রামা কোরো না। ও জাস্ট ফিজিক্যালি উইক। ডক্টর এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আরাভ খানের চ্যাপ্টার আমাদের লাইফ থেকে পার্মানেন্টলি ক্লোজড হয়ে গেছে, ওটার ছায়া আমি আর এই ঘরে পড়তে দেব না। অতি শীঘ্রই ওদের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করবো
বলেই তাহের চৌধুরী দ্রুত চরণে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেলেন ডাক্তারের সাথে কথা বলার জন্য। রেহানা বেগম অশ্রুসজল নেত্রে মেয়ের ফ্যাকাশে মুখশ্রীর পানে চেয়ে রইলেন। মাতৃহৃদয় এক সূক্ষ্ম ইশারায় অনুধাবন করতে করলো এই তীব্র জ্বরের নেপথ্যে কেবল শারীরিক ক্লান্তি নয় বরং হয়তো অন্য কিছু লুকায়িত।
রুদ্র আর রূপকথা বেগম এসেছেন মাত্র। রুদ্র তিয়াশার পরিবারের সবার সাথে কুশল বিনিময় করলেও রূপকথা বেগমের চলনে-বলনে এক তীব্র অনিচ্ছা আর কুণ্ঠা জড়ানো; ওনার আকার-প্রকার দর্শনে যে কেউ এক লহমায় বুঝে নেবে, এই বাসভবনে ওনাকে এক প্রকার জোরপূর্বক, রুদ্রদ্বীপের একক জেদের বশবর্তী হয়েই আসতে হয়েছে।
বিশাল ড্রয়িংরুম জুড়ে এক থমথমে নিস্তব্ধতা। হঠাৎ নীরবতা বিদীর্ণ করে রুদ্র বলল,,
— আঙ্কেল, তিয়াশার শরীর এখন কেমন? কাল রাতে ওর এখানে ফিরে আসার খবরটা পাওয়ার পর থেকেই মা বলছিলেন একবার এসে দেখে যাওয়া উচিত।
রুদ্রদ্বীপের এই সৌজন্যমূলক অসত্যের পিঠে রূপকথা বেগম কেবল এক ম্লান ও নিস্পৃহ চাউনি হেনে মুখটা ঘুরিয়ে নিলেন। রেহানা বেগম এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর্দ্র কণ্ঠে বললেন,,
— কী আর বলব বাবা! তিয়াশার শরীরটা বড্ড খারাপ। সকাল থেকে প্রায় একশো চার ডিগ্রি জ্বর। গা যেন পুড়ে যাচ্ছে, ও তো জ্ঞানহারা হয়ে বিছানায় পড়ে আছে।
মায়ের মুখে তিয়াশার এই সকরুণ অবস্থার বিবরণ শ্রবণমাত্রই রুদ্রদ্বীপের প্রখর চক্ষুদ্বয়ে চট করে খেলে গেল এক আকস্মিক অস্থিরতা। ও সোফায় সামান্য ঝুঁকে বসে ব্যাকুল স্বরে শুধাল,,
— জ্বর এত বেশি! স্যার, ডক্টরকে ইনফর্ম করেছেন? এই সময়ে প্রপার মেডিসিন আর ব্লাড টেস্ট করানোটা বড্ড জরুরি।
তাহের চৌধুরী নিজের ললাটের চিন্তার রেখাগুলো হাত দিয়ে মুছতে মুছতে অত্যন্ত ভারী ও ক্ষুব্ধ গলায় জবাব দিলেন,,,
— হ্যাঁ রুদ্র, ডক্টর সেনকে কল করেছি, উনি কিছুক্ষণের মাঝেই এসে পৌঁছাবেন। আসলে তিয়াশা বাইরে নিজেকে যতই শক্ত দেখাক না কেন, ওই নরপিশাচের খাঁচায় কাটানো দিনগুলোর মেন্টাল ট্রমা ভেতরে ভেতরে ওকে শেষ করে দিয়েছে। এই হাই ফিভার আসলে ওই মানসিক অত্যাচারেরই বহিঃপ্রকাশ।
তাহের চৌধুরীর এই অতি সরলীকৃত ও মনগড়া যুক্তির পিঠে রুদ্রদ্বীপ মনে মনে কিঞ্চিৎ সন্দিহান হলেও মুখে কিছু প্রকাশ করল না। রেহানা বেগম কথার পিঠে কিছু বলতে গিয়েও চুপ রইলেন। স্বামীর কথার উপর কথা বলার অধিকার থাকলেও ইচ্ছা নেই তার!
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ রজনী আজ। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তার পরেই ব্যালট বাক্সে নির্ধারিত হবে ক্ষমতার চূড়ান্ত ভাগ্য। আনোয়ার খানের খাস কামরায় আজ সকাল থেকেই তীব্র ব্যস্ততা, চারিপাশে ফাইলপত্র আর কোঅর্ডিনেটরদের আনাগোনা। আজ বিকেলের মহাসমাবেশেই নির্ধারিত হবে প্রচারণার শেষ রণকৌশল, আর সেখানকার সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণের গুরুদায়িত্ব আরাভের কাঁধে।
এমনই এক অগ্নিগর্ভ মুহূর্তে, আরাভ বিশ্বস্ত সোর্স থেকে খবর পেয়েছে তিয়াশার নাকি ধুম জ্বর! তীব্রতার পারদ ১০০ ডিগ্রী ছাড়িয়েছে বহু আগেই। হৃদযন্ত্রে প্রচন্ড ব্যথা অনুভূত হচ্ছে আরাভের। এমন সংকটাপন্ন সময়ে ও নিজে সরাসরি তিয়াশাকে দেখতে যেতে পারবে না আবার তিয়াশাকে এই অবস্থায় ফেলে রাখা ওর পক্ষে অসম্ভব।
আরাভ আর এক মুহূর্তও কালবিলম্ব না দ্রুত হুট করে আসা পরিকল্পনার দরুন কাঙ্খিত নম্বরটায় কল করেছে,,
— শোন সোনিয়া, একটা বড্ড ক্রিশিয়াল কাজ আছে। তাহের চৌধুরীর বাসভবনে তোকে আজ বিকালের মধ্যে এন্ট্রি নিতে হবে। কোনো চেনা এজেন্সির থ্রু-তে তুই ওখানে একজন কেয়ারটেকার বা পরিচারিকা হিসেবে যাবি। তিয়াশা বড্ড অসুস্থ, ওর ধুম জ্বর। তুই চব্বিশ ঘণ্টা ওর পাশে থাকবি, ওর মেডিসিন আর কেয়ারের দায়িত্ব নিবি।
ওপাশ থেকে সোনিয়া কিঞ্চিৎ বিস্ময়ে শুধালো,,
— আই আন্ডারস্ট্যান্ড, আরাভ ভাই। কিন্তু ওই পরিবারে যদি আমাকে নিয়ে কারো কোনো ডাউট হয়?
— ডোন্ট ওরি অ্যাবাউট দ্যাট। তোর মেইন জব হলো তিয়াশার প্রপার কেয়ার নেওয়া আর প্রতি এক ঘণ্টা পর পর ওর হেলথ আপডেট আমাকে টেক্সট করা। এই সময়ে ওর শরীরে যেন কোনো অবহেলা না হয়। আই ট্রাস্ট ইউ, সোনিয়া। কাজটা যেন পারফেক্টলি হয়।
সোনিয়া ওপাশ থেকে আশ্বস্ত করে বলল,,
— ডান, আরাভ ভাই। আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি আজ বিকালের মাঝেই ওনাদের বাসায় যাওয়ার ব্যবস্থা করছি। ভাবীর পুরো খেয়াল রাখব।
আরাভ ফোন কেটে দিল। অতঃপর, ল্যাপটপ স্ক্রিনে তিয়াশার ছবিতে হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বলল,,
— ছেড়ে না থাকতে পেরে জ্বর বাঁধিয়ে নিলে, অথচ বলো কিনা ভালোবাসো না!
নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার উন্মাদনা আর ক্ষমতার নতুন সমীকরণ-এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বিগত দুটো সপ্তাহ যেন উল্কার গতিতে কেটে গেছে। আজ আনোয়ার খানের সেই সুপ্রশস্ত খাস কামরায় তিল ধারণের স্থান নেই। পুনর্নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভের পর রাজনৈতিক মহলে এখন উৎসবের আমেজ।
তীব্র কোলাহলের মাঝেই হাতে ফুলের তোড়া আর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে উপস্থিত হয়েছে আরভের বন্ধু মহল।ওরা এসেই আরাভের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যেনো,,
— কংগ্রাচুলেশনস, ম্যান! আংকেল তো অপোজিশনকে স্রেফ উড়িয়ে দিলেন। বাট, মাস্ট সে পলিটিক্যাল গেমটা তুই ব্যাকস্টেজ থেকে দারুণ হ্যান্ডেল করেছিস, ব্রো। বাট নাও, আসল কথায় আয়। ইলেকশন তো শেষ, এবার ভাবীকে কবে আনবি?
আরাভের সমস্ত মনোযোগ এতক্ষণ যাবত ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিবদ্ধ ছিলো। আবিরের প্রশ্নে আলতো করে স্ক্রিনকা নামিয়ে পাশ থেকে সিগারেট বের করে লাইটার জ্বালল। ধোঁয়ার কুন্ডলী বাতাসে উড়িয়ে বলল,,
— আমি ওকে আনতে যাব না রে, আবির। তোর ভাবী নিজেই খুব জলদি আমার কাছে ফিরে আসবে।
রাফসান সোফায় কিঞ্চিৎ ঝুঁকে বসে, ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান স্বরে বলে উঠল,,
— বলিস কী, আরাভ! দুই সপ্তাহ হয়ে গেল উনি এখনো নিশ্চুপ। ওদিকে তোর খাইসটা শ্বশুর তো অলরেডি ডিভোর্সের লিগ্যাল প্রসেস শুরু করার ট্রাই করছে। ও কেন নিজে থেকে তোর কাছে ফিরবে?
আরাভ সিগারেটের ছাইটুকু অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে সোফায় মাথাটা এলিয়ে দিল,,
— কারণ আমি জানি, তিয়াশা ওর ওই চেনা ঘরের চার দেওয়ালে বসেও প্রতিটা সেকেন্ড আমার এই তীব্র ভালোবাসার অভাবটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। মানুষের অবচেতন মন বড় বিচিত্র জিনিস, রাফসান। ও মুখে যতই জেদ দেখাক, ওর মন অলরেডি আমার মায়ায় আটকা পড়ে গেছে। লিগ্যাল নোটিশ বা ডিভোর্সের কাগজ এগুলো কিছুই করতে পারবে না। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ, ও নিজের ভালোবাসার টানেই এই দরজায় এসে দাঁড়াবে।
আরাভের এমন ইমোশনাল কথার প্রেক্ষিতে কষ্ট পাওয়ার পরিবর্তে সাঈদ হঠাৎ করেই এক মস্ত বড় ফাজিল মার্কা হাসি হেসে আরাভের পিঠে এক জোরসে থাপ্পড় বসাল,
— আরেহ রাখ তোর ভালোবাসার টান, মিস্টার মজনু! দুই সপ্তাহ ধরে তো মশা মারছিস, ভাবী তো দূর, ওনার কোনো একটা মিসড কলও কি ফোন স্ক্রল করে দেখাতে পারবি? নিজে নিজে ডায়ালগ মারলে তো আর ভাবী উড়ে উড়ে আসবে না!
রাফসান কফির মগটা টেবিলে ঠকাস করে রেখে সাঈদের কথায় সুর মেলাল,
— একদম ঠিক বলেছিস, সাঈদ। আমাদের আরাভ খান সালমান খান হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেচারা ভাবছে ভাবী ভালোবাসার টানে ফিরে আসবে! অথচ দেখা গেল ডিভোর্সের দিন,ভালোবাসার টান তো দূরে থাক, ঝাড়ুর টানে একদম তেজগাঁও পাঠিয়ে দিলো!
আবির সোফার কুশনটা কোলের ওপর টেনে নিয়ে হাসতে হাসতে প্রায় গড়িয়ে পড়ল,
— আরে না, ও তো ভাবছে ভাবী উইন্ডো দিয়ে চাঁদের দিকে চেয়ে গান গাইছে ‘ওরে নীল দরিয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া!’ অথচ ভাবী ওদিকে হয়তো ডক্টরের দেওয়া প্যারাসিটামল খেয়ে আরাভ খানের গুষ্টি উদ্ধার করে মনের সুখে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে!
সাঈদ এবার আরাভের সিগারেটের প্যাকেটটা নিজের পকেটে চালান করতে করতে বলল,
— একটু রিয়্যালিটি চেকে আয়, বাট! নয়তো পরের বার মিষ্টির বদলে তোকে সান্ত্বনার টিস্যু বক্স গিফট করতে হবে!
জানলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে তিয়াশা। এক সপ্তাহ যাবৎ তীব্র জ্বরে ভোগার দরুন মুখশ্রীতে এখনো ম্লান আভা স্পষ্ট। পাশেই বেজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিতা।ও পাশে দাঁড়িয়ে তিয়াশাকে বোঝানোর আপ্রাণ প্রয়াস চালাচ্ছে,,
— দোস্ত, প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড! তুই আর কতদিন নিজের সাথে এই চোর-পুলিশ খেলবি বল তো? নিজেকে এভাবে তিল তিল করে শেষ করার কোনো মানে হয়?
তিয়াশা কঠিন দৃষ্টিতে চাইলো,,
— আমি আবার কী করলাম? আমি তো বেশ ভালো আছি, আদ্রু। নিজের চেনা ঘরে, নিজের বাবা-মায়ের কাছে এর চেয়ে শান্তিতে আর কোথায় থাকা যায়?
আদ্রিতা এবার এগিয়ে গিয়ে তিয়াশার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। ও তিয়াশার চোখের দিকে প্রখর নেত্রে চেয়ে বলল,,
— তুই ভালো নেই তিয়াশা, আর এই মিথ্যেটা অন্তত আমার সামনে বলিস না। তুই নিজে জানিস তুই আরাভ ভাইকে কতটা মিস করছিস! আগের দিন করার ঘোরে কার নাম ধরে বিড়বিড় করছিলি, জানিস? তুই আরাভ ভাইয়ের নাম ধরে কাঁদছিলি, দোস্ত। কেন নিজেকে নিজে এভাবে ধোঁকা দিচ্ছিস?
আদ্রিতার এই অতর্কিত ও তীক্ষ্ণ সত্য উন্মোচনে তিয়াশার ভেতরের সমস্ত শক্ত দেওয়াল যেন এক লহমায় ধসে পড়তে চাইলো। ও মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে রুদ্ধকণ্ঠে বলল,
— ওটা জ্বরের ঘোরে অবচেতন মনের প্রলাপ ছিল, আদ্রু। ওটা ভালোবাসা নয়। যে মানুষটা আমার জীবনটা ওভাবে ওলটপালট করে দিল, তাকে আমি…
— তাকে তুই ভালোবেসে ফেলেছিস, তিয়াশা! ভালোবাসার শুরুটা হয়তো সুন্দর ছিল না, কিন্তু আরাভ ভাইয়ের পাগলামি আর তোকে সসম্মানে ফিরিয়ে দেওয়ার এই সুগভীর আত্মত্যাগ-কোনোটা কি মিথ্যে? আজ তুই মুক্ত, কিন্তু তোর মন তো এখনো আরাভ ভাইয়ের বুকেই বন্দি হয়ে আছে। নিজের ইগো আর জেদ ছেড়ে সত্যটা মেনে নে, তিয়াশা। ওনাকে তুই বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলেছিস!
আদ্রিতার এই অকাট্য ও মনস্তাত্ত্বিক সত্যের আঘাতে তিয়াশা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও আদ্রিতার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে অবাধ্য কান্নায় ভেঙে পড়ল। দুই চোখ বেয়ে নোনা জলের ধারা নেমে এসে ওর এতদিনের পুঞ্জীভূত অহংকার ধুয়েমুছে সাফ করে দিচ্ছে। ও রুদ্ধকণ্ঠে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেবল এটুকুই আওড়াল,,
— আমি সত্যিই বড্ড অসহায় রে, আদ্রু। আমি ওনাকে ঘৃণা করতে চেয়েও পারলাম না!
নিশীথ রজনীর গাঢ় স্তব্ধতা তখন সমগ্র চরাচরকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করেছে। দেয়ালঘড়ির কাঁটা দুটো জানান দিচ্ছে সময় এখন রাত দুটো ছুঁইছুঁই। এমন এক অসময়ে নিজের আইফোনের কর্কশ রিংটোনের শব্দে গভীর নিদ্রাভঙ্গ হতেই চরম বিরক্তিতে চোখ মেলল সাঈদ। তন্দ্রাচ্ছন্ন নেত্রে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে কোনো অপরিচিত নম্বর দেখে ও ললাটে কিঞ্চিৎ কুঞ্চন রেখা ফুটিয়ে কলটা রিসিভ করে কানে ধরল। ওপাশ হতে কোনো ভূমিকা ছাড়াই এক নারী কণ্ঠ বলে উঠল,,
— হ্যালো? শুনতে পারছেন?
সাঈদ বিছানায় উঠে বসে এক হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো সামান্য আউড়ে নিয়ে বড্ড কর্কশ ও মেজাজি গলায় শুধাল,,
— হ্যাঁ বলুন, কিন্তু কে আপনি?
আদ্রিতা মনের সমস্ত সংকোচ আর ভয়কে এক পাশে ঠেলে বলল,,
— আপনি কি সাঈদ চৌধুরী?
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে এমন এক অচেনা মেয়ের জেরা শুনে সাঈদের মেজাজটা এবার চট করে সপ্তমে চড়ল। ও বহু কষ্টে নিজের পুরুষালী রাগ সংবরণ করে ওষ্ঠাধর বাঁকিয়ে বলল
— হ্যাঁ, মক্কেল বলুন? মাঝরাতে এই দুটো সময় ফোন দিয়ে আমার পরিচয়পত্র নেওয়ার মানেটা ঠিক বুঝলাম না!
সাঈদের এমন কথায় আদ্রিতার ফর্সা ললাট জুড়েও রাগের লালচে আভা ফুটে উঠল। ও এক প্রকার ক্ষুব্ধ কণ্ঠে পাল্টা জবাব দিল,,
— আমি আপনার কোনো পরিচয়পত্র নিচ্ছি না, মিস্টার সাঈদ! একটা অতি জরুরি হেল্প লাগত, তাই ফোন দিয়েছি।
আদালতের কাঠগড়ার ন্যায় এক অচেনা মেয়ের এমন রাগী কণ্ঠস্বর শুনে সাঈদ রীতিমতো বিছানা থেকে সটান সোজা হয়ে বসল। ও অত্যন্ত তপ্ত এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে আপন মনেই বিড়বিড় করে উঠল,,
— হোয়াট দ্য হেল! মায়াবিনী নিজেই মাঝরাতে ফোন দিয়ে আবার নিজেই রাগ ঝাড়ছেন! এটা তো আচ্ছা মুসিবত!
সাঈদের এই বিরক্তি বুঝতে পেরে আদ্রিতা নিজের কণ্ঠের তীক্ষ্ণতা কিছুটা হ্রাস করল। ও জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশের পানে চেয়ে বললো,,
— দেখুন সাঈদ সাহেব, অহেতুক ঝগড়া করার কোনো মানসিকতা আমার নেই। আমি তিয়াশার বেস্ট ফ্রেন্ড আদ্রিতা। আরাভ ভাইয়ের ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যে একমাত্র আপনাকেই আমি চিনি তাই এই অসময়ে ডিস্টার্ব করতে বাধ্য হয়েছি।
‘তিয়াশার বেস্ট ফ্রেন্ড’ শব্দবন্ধটি শ্রবণগোচর হতেই সাঈদের চোখের সমস্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ও অত্যন্ত গম্ভীর ও সতর্ক হয়ে শুধাল,,
— ভাবীর ফ্রেন্ড? আদ্রিতা? কিন্তু এই গভীর রাতে হঠাৎ কী এমন জরুরি বিষয় হলো,?
আদ্রিতা নিজের পরিচয় দিয়ে সমস্ত কথা একে একে খুলে বলতে শুরু করলো। সমস্ত কিছু বিশ্লেষণ করে,সাঈদ নিজের চিবুক হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে আশ্বস্তকারী কণ্ঠে বলল,,
— ডোন্ট ওরি, আদ্রিতা। আই উইল হ্যান্ডেল দিস। বাট তোমার আমাকে হেল্প করতে হবে।পারবে?
আদ্রিতা কিছু না ভেবেই বললো,,— অবশ্যই!
সাঈদ ওকে নিজের পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিল। বলল কি কি করতে হবে। আদ্রিতাও কোনোরূপ ভনিতা ছাড়াই সম্মতি জানালো ওকে!
— দোস্ত আ-আরাভ ভাই!
সময়টা মধ্যরাত বলা যায়। ঘড়ির কাটার টিকটিক ধ্বনি তিনটের জানান দিচ্ছে বোধহয়। এত রাতে বান্ধবীর আকস্মিক কলে বিভ্রান্ত তো হয়েছিলই তার ওপর আরাভের নাম শোনা মাত্র তন্দ্রাচ্ছন্নতা উবে তড়িঘড়ি বিছানায় উঠে বসলো তিয়াশা। উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,,
— কি? কি হয়েছে ওনার?
আদ্রিতা শুকনো ঢোক গিললো,,— উনার উপর হামলা হয়েছে। অবস্থা ভালো না হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে র’ক্তা’ক্ত অবস্থায়।
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ১৯
এহেন বিস্ফোরক তথ্যে ক্ষণিকের তরে নিশ্চল হয়ে পড়ল তিয়াশা। কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতেই ভুলে গেল যেন! শ্বাস-প্রশ্বাস অবরুদ্ধ হয়ে আসছে। হঠাৎই হাত থেকে ফোনটা মেঝেতে পড়ে শব্দ তুলল। পুরাতন মডেলের হওয়ায় মুহূর্তে এই দ্বিখন্ড হয়েছে ফোন খানা। তবে সেদিকে হেলদোল নেই তিয়াশার। ওর চতুর্পাশ্বে শুধু প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আদ্রিতার বলা কথাগুলো,‘আরাভ ভাইয়ের অবস্থা ভালো না হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে র’ক্তা’ক্ত অবস্থায়।’
