ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২২
নওরিন কবির তিশা
ইদানিংকালে প্রাণপ্রিয় স্বামীকে চিনে উঠতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে রেহানা বেগমকে। এমনিতেই মেয়ের আকস্মিক প্রস্থানের পর থেকে বয়সের ভারিক্কি দ্বিগুণ রূপে প্রতীয়মান হয়েছে তার মুখাবয়বে। বিষাদগ্রস্ত নেত্র কপালে চার স্তরের প্রবল দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ভাঁজ।
নিশীথ রাতের থমথমে আঁধার তখন সমগ্র চৌধুরী ভিলাকে আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করেছে। ড্রয়িংরুমের কোণে জ্বলতে থাকা মৃদু ল্যাম্পপোস্টের হলুদাভ আলোয় সোফায় পাথরের মূর্তির ন্যায় স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন ডিআইজি তাহের চৌধুরী। উনি শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন দেয়ালের দিকে।
রেহানা বেগম বড্ড ধীর পায়ে এক কাপ গরম চা হাতে নিয়ে স্বামীর পাশে এসে বসলেন। চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর আলতো করে রেখে উনি এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। স্বামীর এই নিঃশব্দ দাহ তার হৃদয়কে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করছে, অথচ সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা ওনার জানা নেই। উনি তাহের চৌধুরীর বরফশীতল হাতখানার ওপর নিজের কম্পিত হাতটি রাখলেন। অতঃপর অত্যন্ত ব্যাকুল ও কোমল কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন,,
- তুমি এভাবে কেন নিজেকে শেষ করছো? বলো তো !শরীরটা এভাবে শেষ হয়ে গেলে মেয়েটার কি হবে?
তাহের চৌধুরী স্ত্রীর স্পর্শে চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নিলেন। ওনার চোয়ালমুখ মুহূর্তে নিদারুণ শক্ত হয়ে উঠল, চোখ দুটো ক্রোধ আর অপমানে লালচে আভা ধারণ করল। উনি অত্যন্ত ভারী ও ক্ষুব্ধ গলায় বললেন,,
— মেয়ে? কার মেয়ের কথা বলছ রেহানা? যে মেয়ে খোদ পুলিশের ডিআইজি বাবার মুখের ওপর এক অপরাধী, পলিটিক্যাল গুন্ডাকে নিজের স্বামী বলে স্বীকৃতি দিয়ে চলে গেল, সে আর আমার মেয়ে নয়! আমার তিয়াশা ওই হাসপাতালের করিডোরেই মরে গেছে। আমি ওর ডিভোর্সের সমস্ত লিগ্যাল পেপারস রেডি করতে বলেছিলাম, অথচ ও ধর্ম আর আইনের দোহাই দিয়ে ওই ন’র’পি’শা’চে’র কাছে ফিরে গেল! এই অপমান আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।
রেহানা বেগম অশ্রুসজল নেত্রে স্বামীর দিকে চাইলেন। ওনার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। তবে এবার উনি দমে গেলেন না; একজন মায়ের ভেতরের সমস্ত শক্তি আর সমাজের রূঢ় বাস্তবতা এক করে দৃঢ় কণ্ঠে স্বামীকে বোঝানোর আপ্রাণ প্রয়াস চালালেন। উনি বললেন,,
— তুমি বড্ড ভুল করছ। রেগে গিয়ে বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে তো সত্যটা বদলে যাবে না। তুমি যাকে অপরাধী বলছ, সে আইনত আর ধর্মত আমাদের মেয়ের স্বামী। ওরা দুজনেই প্রাপ্তবয়স্ক। তিয়াশা কাল কোনো ভ্রমের ঘোরে ওই সিদ্ধান্ত নেয়নি, ও বড্ড ম্যাচিউরিটি আর দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে।
— ম্যাচিউরিটি?একটা গুন্ডার পাশে দাঁড়ানোকে তুমি ম্যাচিউরিটি বলছ?
— হ্যাঁ, বলছি! একটু ঠান্ডা মাথায় সমাজের বাস্তবতাটা ভেবে দেখেছ কি? আনোয়ার খানের মতো ক্ষমতাধর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের বউ তিয়াশা। আজ যদি তুমি জোর করে ওকে ওই বাড়ি থেকে বের করে এনে ডিভোর্সের নোটিশ পাঠাতে, তবে সমাজ কি আমাদের মেয়েকে সসম্মানে গ্রহণ করত? মিডিয়া যেভাবে হাসপাতাল ঘেরাও করে রেখেছিল, সেখানে তিয়াশা যদি আরাভকে এই সংকটাপন্ন সময়ে ফেলে চলে আসত, তবে এই সমাজই ওকে ‘স্বার্থপর’ আর ‘কুলক্ষ্মী’ বলে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিত। আনোয়ার খানের পলিটিক্যাল অপজিশন তখন তিয়াশাকে ঢাল বানিয়ে আমাদের পুরো ফ্যামিলির ওপর নোংরা আক্রমণ করত। তুমি পুলিশের বড় কর্তা হতে পারো, কিন্তু এই নোংরা সমাজের কুৎসিত চাউনি থেকে নিজের মেয়েকে সারাজীবন খাঁচায় আটকে আড়াল করতে পারতে না।
তাহের চৌধুরী স্ত্রীর এই অকাট্য ও মনস্তাত্ত্বিক যুক্তির পিঠে ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ওনার কপালের পার্শ্ববর্তী শিরাগুলো ক্রোধে কাঁপতে লাগল, কিন্তু মুখে কোনো প্রত্যুত্তর এলো না। রেহানা বেগম স্বামীর এই নীরবতা অনুধাবন করে ওনার আরও কাছে ঘেঁষে বসলেন। বড্ড আর্দ্র কণ্ঠে বললেন,,
- আরাভ খানের শুরুর মেথডটা হয়তো বড্ড ভুল ছিল, জবরদস্তিমূলক ছিল। তবে, আরাভ সর্বদা নিজের জীবন বিপন্ন করে তিয়াশাকে প্রটেক্ট করেছে। আজ যদি আমরা জোর করে ওদের আলাদা করি, তবে সেটা কি আসলেও উচিত হবে?
তাহের চৌধুরী এক গভীর, ম্লান দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন। ওনার প্রখর দৃষ্টিজোড়া এবার মেঝেতে নিবদ্ধ হলো। শান্ত চিত্তে সমস্ত কিছু বিশ্লেষণ করে উনি অত্যন্ত ক্লান্ত স্বরে, চোখ দুটো বুঁজে বললেন,,
— আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না রেহানা। তবে একটা কথা মনে রেখো, আরাভ খানের পলিটিক্যাল লাইফটা বড্ড অনিশ্চিত। আজ ও বেঁচে ফিরেছে, কাল যদি অন্য কিছু ঘটে? তিয়াশার লাইফে যদি কোনো আঁচ আসে, আমি কিন্তু ওই আনোয়ার খানের পুরো সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেব।
রেহানা বেগম স্বামীর হাতটা এবার পরম ভরসায় নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন,,
– আচ্ছা! তখন দেখা যাবে। এখন শান্ত হও।
সময়ের নিত্য প্রবাহে কেটে যায় দিনক্ষণ। স্মৃতির পাতায় একে একে জমাবদ্ধ হতে শুরু করে মধুর কিছু ক্ষণ। প্রায় একটি মাস গত হয়েছে। দিনপঞ্জির পাতা হতে খসে গিয়েছে জুন। জুলাইয়ের মধ্যবর্তী সময়টা। তিয়াশার অক্লান্ত সেবা-শুশ্রূষায় অবশেষে ভঙ্গুর দেহ সুস্থ হয়েছে আরাভের। তবে একটি হৃদয়ের উচাটন কমে নি লেশমাত্র। বরং তরতরিয়ে বেড়ে চলেছে তা। কারন একটাই, সময় যত গড়াচ্ছে দূরত্ব তত বেড়ে চলেছে।
দপদপ করে জ্বলতে থাকা শিরাগুলো শক্ত করে চেপে সমস্যা নিরাময় চিন্তায় তৎপর। হুট করে পাশে থাকা ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। ধ্যান টুটলো আরাভের। স্ক্রিনের ওপর ‘মালিকাতুল কালব’ নামটা ভেসে উঠতেই ওর প্রখর চক্ষুদ্বয় মুহূর্তে উজ্জ্বল হলো। আর এক মুহূর্তও কালবিলম্ব না করে ও কলটা রিসিভ করে কানে ধরল। ওপাশ থেকে তিয়াশার সেই অতি পরিচিত অথচ কিঞ্চিৎ দ্বিধাকুল কণ্ঠস্বর ভেসে এল,,
– হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন?
আরাভ ওষ্ঠাধরে এক চিলতে মধুর হাসি ফুটিয়ে বলল,,
– যার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য, সারাদিন চাতক পাখির মত বসে থাকি তাকে শুনতে পারব না? বলো, এই অসময়ে হুট করে স্বামীর কথা মনে পড়ার কারণটা কী? কোনো বিশেষ আবদার?
তিয়াশা ওপাশ থেকে একটু চুপ রইল, ভেতরকার জড়তা ভাঙার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল ও। অতঃপর গলাটা সামান্য খাঁকারি দিয়ে বলল,,
– আমি কলেজের লাইব্রেরিতে এসেছিলাম জরুরি কিছু বুক’সের জন্য। এখন কাজ শেষ। রোদ বড্ড বেশি, আর বাইরে কোনো ভালো রিকশাও পাচ্ছি না। আপনি কি… আপনি কি আমাকে নিতে আসতে পারবেন?
শ্রবণান্দ্রেয়কে আপাতত মীর জাফর হিসেবে ঠাওর হলো আরাভের। যে মেয়ে ওর মুখাদর্শনেও হাজারবার থুঁ থুঁ ছুঁড়তো, সেই আজ নিজে থেকে তাকে নিতে আসার আহ্বান জানাচ্ছে! ওর বুকের ভেতরটা এক পরম শান্তিতে জুড়িয়ে গেল। ও সটান উঠে দাঁড়িয়ে বড্ড চঞ্চল কণ্ঠে বলল,,
– তুমি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো সুইটহার্ট। দশ মিনিটের মাঝে আরাভ খান তোমার সামনে হাজির হচ্ছে।
– শুনুন, এত তাড়াহুড়ো করে ড্রাইভ করার কোনো প্রয়োজন নেই। সাবধানে আসবেন।
কথাটা শেষ করেই তিয়াশা চট করে ফোনটা কেটে দিল। আরাভ প্রিয়তমার অব্যক্ত মনোভাব বুঝে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে এক চিলতে মুগ্ধ হাসি হাসল।
মিনিট দশেক অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই আরাভের দেখা মিলল। গেটের পাশেই অপেক্ষমান ছিল তিয়াশা। এত দ্রুত আরাভকে দেখে কিঞ্চিৎ বিস্ময়ভরে এগিয়ে এসে ও শুধালো,,
– এত দ্রুত?
গাড়ির কাঁচ নামিয়ে আরাভ ওর পানে চাইলো অতঃপর গাড়ির দরজাটা ভেতর থেকে খুলে দিয়ে ওষ্ঠাধরে চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,,
— প্যাসেঞ্জার রেডি? কুইক ইন, সুইটহার্ট। রোদের যা তেজ, তোমার দুধে আলতা বরণ তো কালো হয়ে যাবে!
তিয়াশা ওড়নাটা সামান্য ঠিক করে নিয়ে সামনের সিটে বসল। এসি-র হিমশীতল হাওয়া চামড়ায় লাগতেই ও এক পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আরাভের দিকে আড়চোখে চাইল। অতঃপর কিঞ্চিৎ কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলল,,
— আমি আপনাকে সাবধানে আসতে বলেছিলাম না? এত দ্রুত ড্রাইভ করার কী প্রয়োজন? আপনার ক্ষতগুলো যে পুরোপুরি শুকায়নি, সে খেয়াল কি আছে?
আরাভ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গিয়ারবক্সে হাত রেখে জবাব দিল,,
– যার অর্ডারে এই আরাভ খানের হৃদস্পন্দন চলে, সে যখন তীব্র দাবদাহে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, তখন স্পিড লিমিটের তোয়াক্কা করে কার সাধ্য, বলো? ক্ষত তো কবেই শুকিয়ে গেছে, মেরি জান। শুধু বুকের বাম পাশের এই ক্ষতটা দিন দিন গভীর হচ্ছে।
– তুই মানিস আর না মানিস সাইদ, আদ্রিতা মেয়েটা তোকে পছন্দ করে। ইভেন,সেটা পছন্দ অব্দি সীমাবদ্ধ আছে কিনা বলা দায়। ভালোও বেসে ফেলতে পারে।
ক্লাবের আড্ডায় মশগুলরত অবস্থায় এমন কথায় হইহুল্লোড়ে ভাটা পড়ল উপস্থিত সকলের। ঠোঁটের কোনে বিদ্যমান হাসির রেখা মুহূর্তেই উবে গেলো সাইদের। গুরুগম্ভীর দৃষ্টি রাফসানের দিকে নিক্ষেপ পূর্বক সে বলল,,
– আমি মানি,বাট আই ডোন্ট টেক ইট সিরিয়াস। ইট’স জাস্ট হার অ্যাট্রাকশান নট লাভ!
পাশ থেকে আরিয়ান বলল,,- আর তুই সেটাকে প্রশয়ও দিচ্ছিস?
– নট অ্যাট অল!
– হোয়াট ইজ দিস ব্রো?
গুরুতর এমন মুহূর্তে হঠাৎ সকলের মনোযোগ কাড়লো সাইদের মুঠো ফোনের কর্কশ ধ্বনি। সাইদ এক ঝলক ফোনের পানে চেয়ে স্ক্রিনের উপর জ্বলতে থাকা নামটা দেখে ভ্রু যুগল কুঁচকে নিলো। স্পষ্ট জ্বলে উঠেছে সেভ করা নামটা “আদ্রিতা”! সকলের বিস্ময়বোধক দৃষ্টি সেখানেই নিবন্ধ। সাইদ একটু সংকুচিত হলো পরমুহূর্তেই ফোন রিসিভ করে কিছুটা দূরে সরে গেল।
– হ্যালো, আসসালামুয়ালাইকুম।
ভেসে আসা মেয়েলী রিনরিনে কন্ঠটায় ধমকগুলো কন্ঠনালীর মাঝেই আটকা পড়লো সাইদের। স্বাভাবিক স্বরেই জবাব দিল সালামের। অতঃপর বলল,
– কিছু বলবে?
আদ্রিতা কিছুক্ষণ থামল অতঃপর কিঞ্চিৎ দ্বিধান্বিত কন্ঠে বলল,,
– জ্বী,আসলে।
– এই মেয়ে? কি আসলে নকলে করছে? স্পষ্ট বলো, কি বলতে চাও?
– বলছিলাম…. আপনি একটু! আপনি একটু ক্লাবের বাইরে আসতে পারবেন প্লিজ। আমি ওয়েট করছি।
– হ্যোয়াট! বাট, এখানে কেন?
– আসুন না, প্লিজ। এগুলো ফোনে বলা যাবে না।
সাইদ পূব পার্শ্বের জালনা দিয়ে বহিরপানে চাইল; তবে দেখা মিলল না কাঙ্খিত মানবীর।
– ওয়েট,আ’ম কামিং!
মিনিট দুয়েকের মাথায়, গেটের বাইরে এলো সাইদ। আশেপাশের দৃষ্টি বোলাতেই নজর গেল নারীকায়াটির দিকে। ও অবাক হলো স্তোকমাত্র। গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতির জানান দিল। আদ্রিতা চমকে পেছন ঘুরে সাইদকে দেখেই মাথা নুইয়ে নিতেই সাইদ কোনোরূপ ভনিতা ছাড়াই বললো,,
– এখন এখানে কেন?
– অনেক কথা। ভিতরে বসার জায়গা হবে?
– মানে?
– মানে কথাগুলো এত দ্রুত শেষ হওয়ার না।
– কি কথা বলতে চাও তুমি?
– দেখুন, ইট’স টু সিরিয়াস এন্ড আর্জেন্ট। এখানে দাঁড়িয়ে বলা যাবে না।
বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে আসতে চাইলো সাইদের। তবুও যথা সম্ভব নিজেকে সামলে বলল,,
– ওয়েট, আমি বাইক নিয়ে আসছি। এটা বয়েস ক্লাব। ভেতরে মেয়েদের নিয়ে যাওয়ার মত পরিবেশ না।
আদ্রিতা অবনত মস্তকে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালো। কিছুক্ষণ বাদে সাইদ বাইক এনে ওকে নিয়ে সোজা অদূরের এক ক্যাফের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
বাড়ির পথ বদলে অন্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে গাড়ি ঘুরেছে বহুক্ষণ আগে। অথচ সেটা মাত্র টের পেল ধুরন্ধর তিয়াশা চৌধুরী। তীক্ষ্ণ নাসিকা কুঞ্চনপূর্বক আরাভের দিকে চেয়ে বলল,,
– কোথায় যাচ্ছি আমরা?
আরাভ কোনোরূপ হেলদোল দেখালো না;বলল,,
– আশেপাশে কোথাও।
– মানে?
– মানে আর কি? স্বামীকে তার বিলাভড ওয়াইফ নিজে থেকে ফোন দিয়ে ডেকেছে। মোমেন্ট গুলো স্পেশাল না করলে হয়?
– দেখুন,আমি আপনাকে জাস্ট বলেছিলাম বাড়ি যাওয়ার কথা।
– উসসস! আমি তোমার হাজব্যান্ড, আমার সাথে গেলে মান যাবে না।
– সবসময় দুই লাইন বেশি বোঝা কি আপনার স্বভাব?
আরাভ গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল তিয়াশার দিকে,,
– দুই লাইন বেশি বলতে?
– আমি কি একবারও বলেছি,আপনার সাথে যেতে আমার সমস্যা?
অগোচরে প্রশান্তময় চাপা হাসির রেখা ফুটে উঠলো আরাভের ওষ্ঠাধর প্রান্তে,
– তারমানে, আমার সাথে কোথাও যেতে তোমার প্রবলেম নেই?
– আমি কি সেটাও বলেছি?
– দেখো তুমি তো কিছুই বলছো না। তাহলে আমি বুঝবো কিভাবে?
– আপনার কিছুই বুঝতে হবে না। আপাতত গাড়িটা ঠিকঠাক চালান। এমনিতেই আপনার উপর ভরসা নেই, নিজে মরলে মরুন আমাকে নিয়ে ম’রবেন না প্লিজ।
দিলো! এতক্ষণের সব রোমান্টিকতায় একহমায় পানি ঢেলে দিলো! মানে রোম্যান্টিসিজমের মধ্যেও ত্যাড়া কথা দিয়ে আগুন লাগানো এই মেয়ের স্বভাব! নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে আরাভ বললো,,
– আমি কখনোই তোমার কিছু হতে দেব না।
– হাহ, বাংলা সিনেমার ইমোশনাল ডায়লগ বাদ দিন।
– এটা বাস্তব তিয়াশা।
– ওহ রিয়্যালি?
– হ্যাঁ।
– তো, যদি আপনি সাথে থাকাকালীনই আমি মা’রা যাই তাহলে কি করবেন?
– হয় মা’রা যাব না হলে জীবন্ত লা’শ হয়ে যাব।
তিয়াশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,,
– এটা রিয়েল লাইফ মিস্টার খান। এখানে কেউ কারো জন্য মা’রা যায় না। আর না তো জীবন্ত লা’শ হয়ে যায়।
আরাভ নিশ্চুপ রইল। কেবলই একখানা মলিন হাসির রেখা খেলে গেল ওষ্টাধর প্রান্তে।
– বলো মেয়ে,কি বলতে চাও?
আদ্রিতা মুখ কুঁচকে তাকালো। এই লোক ভালোভাবেই তার নাম জানে। অথচ যতবার দেখা হয় ততবারই “এই মেয়ে” বলে সম্বোধন করে। বিষয়টা বিরক্তিকর! এবার আর নিজেকে দমালো না আদ্রিতা সাহসের সঞ্চয় করেই বললো,,
– আচ্ছা আপনি কি আমার নাম জানেন না?
– জানি।
– তাহলে নাম ধরে বলেন না কেন?
– প্রয়োজনবোধ করি না।
কি আজব লোক রে বাবা! মুখাবয়ব এবার প্রকৃতপক্ষেই বিশ্রী আকৃতি ধারণ করল আদ্রিতার,
– বখাটেদের মতো কথা বলেন কেন?
– কারণ,আমি বখাটে।
– কে বলেছে?
– বলার প্রয়োজন হয় না। বাই দা ওয়ে, কাজের কথা বলো। এসবের জন্য তো আর এখানে ডাকো নি?
আদ্রিতা চেয়ারটাতে বেশ আয়েশে ভঙ্গিতে বসলো। কিঞ্চিত দুষ্টু হাস্যে বলল,,
– আর যদি বলি এসব বলার জন্যই ডেকেছি?
সাইদ কুঁচকে ওঠা দৃষ্টিতে আদ্রিতার পানে চাইলো;বড্ড নিরাসক্ত গলায় বলল,
– ফালতু কথা শোনার মতো সময় আমার নেই। আমি উঠছি।
সাইদ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াতে যাবে, ঠিক তখনই আদ্রিতা ঝট করে টেবিলের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে সাইদের শক্ত হাতখানা আঁকড়ে ধরল। আচমকা এই নরম স্পর্শে সাইদ কিছুটা থমকে গেল, ভ্রুদ্বয় কুঁচকে একাকার হলো ওর। বিস্মিত দৃষ্টিতে আদ্রিতার দিকে চাইতেই আদ্রিতা ততক্ষণাৎ নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে কিঞ্চিৎ লজ্জিত কিন্তু অনড় গলায় বলল,
— স্যরি! প্লিজ বসুন। রাগ করছেন কেন?
সাইদ আবার চেয়ার টেনে বসে, গম্ভীর বদনে বলল,
– তোমার এই চাইল্ডিশ বিহেভিয়ার বন্ধ করবে আদ্রিতা? হোয়াট ইজ দিস?
– আচ্ছা, আপনি সবসময় এত সিরিয়াস থাকেন কেন বলুন তো? একটু হেসে কথা বলা যায় না?
– আমাদের সম্পর্কটা হেসে হেসে কথা বলার মতো নয়।
– তাহলে বানিয়ে নিলেই তো হয়।
– মানে?
বিড়বিড় করে বলা কথাটা সাইদ শুনে ফেলেছে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে উঠল আদ্রিতা। বোকা হেসে বললো,,
– ক-ক-কিছু না।
– শোনো মেয়ে, আগাম সতর্ক করি। আমার বাবা প্রভাবশালী হলেও এই সমাজে আমার পরিচয় শুধুই অকর্মণ্য বখাটে! যার সঙ্গে নিজের জীবনের বাধা পড়া যে কোন মেয়ের জন্য অভিশাপ স্বরুপ। আশা করি বুঝতে পেরেছো, কি বলতে চাইছি?
– তাহলে আমি সেই অভিলাপ-ই নাহয় সানন্দ চিত্তে গ্রহণ করলাম।
– এটা বাস্তব।
– আমার কথাও বাস্তবতার পরিপন্থী নয়।
– সীমালংঘন করো না।
– সীমাটা ঠিক কে নির্ধারণ করেছে? আপনি, নাকি আপনার চারপাশের এই বানিয়ে রাখা দেয়ালগুলো?
– দেয়ালগুলো আমি বানাইনি। সমাজ অলরেডি তুলে রেখেছে। আমি শুধু সেই দেয়ালের ওপাশে নিজের একটা জগত বানিয়ে নিয়েছি, যেখানে তোমার মতো ইনোসেন্ট মেয়েদের কোনো এন্ট্রি নেই।
– আর আমি যদি বলি, ওই দেয়াল ভাঙার জেদ নিয়েই আমি এসেছি? আপনি নিজেকে বখাটে বলেন, অকর্মণ্য বলেন—তাতে আমার কী? আমার চেনা সাইদ তো এই মুখোশের আড়ালে অন্য কেউ।
– ভুল করছ। মুখোশ নয়, এটাই আসল আমি। যাকে তুমি দেখতে পাচ্ছো, সে একটা অন্ধকার গলি। এই গলির শেষে কোনো আলো নেই, শুধু একরাশ অনুশোচনা আছে। আমার সাথে জড়ানো মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।
– কুড়াল যদি মারতেই হয়, তবে জেনেশুনেই মারব। জীবনের সব হিসেব কি লাভ-ক্ষতির দাঁড়িপাল্লায় মেপে করতে হয়? কিছু ভুল তো মানুষ ইচ্ছে করেই করে।
– এই ভুলটার মাশুল বড্ড ভারী, আদ্রিতা। তখন সামলাতে পারবে না। আবেগের জোয়ারে ভেসে আজ অনেক কথাই সহজ মনে হচ্ছে, কিন্তু যখন বাস্তবতার রূঢ় ধাক্কাটা লাগবে, তখন এই ‘অভিশাপ’ আর ‘ভুল’ শব্দগুলোই বি’ষা’ক্ত মনে হবে।
– আমি অতশত বুঝি না। আমি শুধু জানি, যে মানুষটা সারাক্ষণ নিজেকে অপরাধী ভেবে গুটিয়ে রাখে, তার ভেতরে একটা ভীষণ যত্নশীল মন আছে। আপনি হাজার তাড়িয়ে দিলেও আমি যাচ্ছি না।
– জেদ ভালো, তবে অতিরিক্ত জেদ মানুষকে ধ্বংস করে দেয়।
– তবে সেই ধ্বংসের শেষটা আমি আপনার সাথেই দেখতে চাই, সাইদ।
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২১ (৩)
– আদ্রিতা?
– জ্বী?
– তুমি কি বুঝছো না?
– আপনিও কেন অবুঝের মতো করছেন?
– তুমি অপরিচিত ছিলে অপরিচিত-ই থাকো, প্লিজ।
– আপনি আমার হন না প্লিইইজ!
