ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২৩
নওরিন কবির তিশা
চক্ষের পলকে প্রবাহিত সময় গুলোকে স্বচ্ছস্ফটিকের পাত্রে বন্দি করতে পারলে কেমন দেখাতো? হয়তো নীলচে ধূসর, কিংবা এক বুক আকুল রঙে রঞ্জিত কোনো অলীক ক্যানভাস। সময়ের এই অদ্ভুত মায়াজাল কাউকেই এক স্থানে স্থির থাকতে দেয় না, অথচ স্মৃতির পাতায় রেখে যায় এক অমলিন দাগ।
তিয়াশার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে দিন সাতেক হলো। বিগত দীর্ঘ দেড়টা মাসের ক্লান্তি, বিনিদ্র রজনী আর পরীক্ষার তীব্র ঝুঁকি-ঝামেলার ধকল সামলে ও এখন বড্ড অবসন্ন। তবে এই কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিতে নিজের জন্মদাতা বাবা-মায়ের স্নেহমাখা সঙ্গটুকু তিয়াশার ভাগ্যে জোটেনি। নিয়তির নির্মম পরিহাসে চৌধুরী ভিলার সেই চিরচেনা ছাদ হাতছাড়া হলেও, তিয়াশার জীবনে এক পারফেক্ট গার্ডিয়ান হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছিল আরাভ খান।
পরীক্ষার প্রতিটি দিন হলের বাইরে তপ্ত রোদে ঘন্টার পর ঘন্টা ঠায় বসে থাকা, ওকে হলে দিয়ে আসা আর নিয়ে আসার সমস্ত গুরুদায়িত্ব আরাভ নিজের স্কন্ধেই তুলে নিয়েছিল পরম যত্নে। তিয়াশার যেন এতটুকু কষ্ট না হয়, সেই ভাবনায় ও সর্বদা সজাগ থাকত। আজ সপ্তাহখানেক ধরে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তিয়াশা কেবল সারাদিন বিশ্রাম আর আলসেমিতেই দিন কাটাচ্ছে। করার মতো কোনো কাজ নেই ওর।
সায়াহ্নের সমাপ্তি ঘটিয়ে রজনীর কৃষ্ণবর্ণের আঁধার তখন চারিপাশে নিজের রাজত্ব কায়েম করতে শুরু করেছে। নৈশ প্রহরের এই শান্ত ও গুমোট আবহে তিয়াশা ঝুল বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আকাশের ওই একাকী চাঁদটার পানে চেয়ে রইল। ঠিক তখনই কক্ষের সম্মুখদ্বারে চাবির মৃদু টুংটাং শব্দ আর সুপরিচিত পদশব্দ জানান দিল—অফিস পাড়ার সমস্ত ব্যস্ততা চুকিয়ে এই শহরের দাপুটে পুরুষটি নিজের নীড়ে প্রত্যাবর্তন করেছে।
পদশব্দ শুনতেই তিয়াশা বারান্দার রেলিং ছেড়ে ধীর পায়ে কক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। দীর্ঘক্ষণ একটানা এসি চলার দরুন ঘরের বাতাস হিমশীতল। আরাভ স্যুট জ্যাকেটটা খুলে খাটের কোণে ছুঁড়ে দিয়ে টাইয়ের নটটা আলতো করে আলগা করছিল, ঠিক তখনই তিয়াশার মুখোমুখি হলো ও। ওর প্রখর নেত্র জুড়ে সারাদিনের ক্লান্তি থাকলেও তিয়াশাকে দেখামাত্রই সেখানে এক চিলতে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটল। ও এক হাত পকেটে পুরে বড্ড চঞ্চল টোনে শুধাল,,
- কি অবস্থা মাই লাভ? অলসতা কমেছে?
তিয়াশা নিজের অবিন্যস্ত ওড়নাটা কাঁধের ওপর টেনে নিয়ে কিঞ্চিৎ মুখ বাঁকিয়ে বলল,,
– পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মানুষ একটু রেস্ট নেয়। ওটাকে অলসতা বলে না। বেশি কথা বলেন কেন?
আরাভ ওষ্ঠাধরে এক চিলতে মলিন হাসি ফুটিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘড়িটা খুলে রাখতে রাখতে ও আয়নার প্রতিবিম্বে তিয়াশার শান্ত মুখশ্রী অবলোকন করে বড্ড নিচু ও গম্ভীর স্বরে বলল,,
– কথা না বললে যে তুমি আমার অস্তিত্বটাই ভুলে যাবে, বউপাখি। এখন তো তোমার এক্সামও শেষ, কোনো প্রেসার নেই। আচ্ছা, ডিনার কি ঘরেই করবে, নাকি বাইরে কোথাও নিয়ে যাব?
তিয়াশা আলমারি থেকে আরাভের জন্য একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল,,
– বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি নিচে গিয়ে খাবার আনার ব্যবস্থা করছি, আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন।
কথাটা শেষ করে তিয়াশা যেই না দরজার দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই ঘরের নৈঃশব্দ্য চূর্ণ করে আরাভ এক অভাবনীয় প্রশ্ন ছুড়ে দিল,,
– তুমি কি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাও, তিয়াশা?
আরাভের এই আকস্মিক – মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নটি শ্রবণগোচর হওয়ামাত্রই তিয়াশার চঞ্চল চরণ দুটি দরজার চৌকাঠের কাছে এসে থমকে গেল। ও বিমূঢ় নেত্রে পেছন ফিরে চাইল। আরাভ তখনো ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় হাত রেখে নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওর প্রখর চোখের মণি জোড়ায় এক অদ্ভুত, নিঃসীম হাহাকার। তিয়াশা শুকনো ঢোক গিলে কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ন কণ্ঠে শুধাল,,
– মানে? হঠাৎ এমন অদ্ভুত প্রশ্নের মানে ঠিক বুঝলাম না!
আরাভ এবার তিয়াশার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। ওর অবয়বে সেই দাপুটে পুরুষের চেয়ে এক ক্ষতবিক্ষত, অবুঝ বালকের সত্তা বেশি স্পষ্ট। ও তিয়াশার ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড্ড ভাঙা কণ্ঠে বলল,,
– আমি খুব ভালো করেই জানি, তিয়াশা। সেদিন হাসপাতালে যখন আমার ওই বীভৎস অবস্থা হয়েছিল, তখন তুমি কেবল মানবিকতা আর করুণার বশবর্তী হয়ে আমার পাশে ছুটে এসেছিলে। তোমার ওই নরম মনে আমার এই ক্ষ’তগুলো দাগ কেটেছিল বলেই তুমি বিগত দেড়টা মাস নিজের সমস্ত জেদ ভুলে আমাকে আগলে রেখেছ। কিন্তু এখন তো আমি সম্পূর্ণ সুস্থ, আমার শরীরে আর কোনো ক্ষ’ত নেই। তাই ভাবছিলাম, করুণার মেয়াদ তো শেষ; এবার হয়তো আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছ!
আরাভের এমন সূক্ষ্ম-ধারালো বাক্যবাণটি তিয়াশার হৃদয়ের গহীনে সজোরে আঘাত করল। ওর ডাগর চোখ দুটো ক্ষণিকের জন্য আর্দ্র হলেও নিজের ভেতরের অবাধ্য অনুভূতিটাকে শক্ত করে চেপে ধরে,কণ্ঠস্বর কিছুটা কড়া করে পাল্টা জবাব দিল,,
– আমি কি কখনো নিজের মুখে বলেছি যে আপনাকে ছেড়ে আমি চলে যেতে চাই? নাকি আমার কোনো আচরণে আপনার এমনটা মনে হলো?
আরাভ মৃদু, বড্ড ম্লান একটু হাসল; তিয়াশার খুব কাছে এসে ওর চোখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত গভীর ও ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,,
– তুমি মুখে না বললেও তোমার মৌনতা বড্ড ভয়ংকর, সুইটহার্ট। এখনো কি তবে ওই করুণার খাতিরেই আমার পাশে নাটক করছ? দেখাও সমস্যা নেই, আমার না হয় এই করুণাটুকুই প্রাপ্তি! ছোটবেলা থেকে বড্ড অযত্নে আর একাকীত্বে বড় হয়েছি তো, তাই তোমার এই করুণাটাকেও আমার কাছে পরম ভালোবাসা বলে ভ্রম হয়। তবে একটা অনুরোধ, মায়াটুকু আর বাড়িও না। মায়া বাড়িয়ে যদি কোনোদিন হঠাৎ করে এই অন্ধকার পৃথিবীতে আমাকে একা ফেলে চলে যাও, তবে ওই দ্বিগুণ কষ্টটা সহ্য করার ক্ষমতা এই আরাভ খানের আর থাকবে না। সত্যি বলছি সুইটহার্ট, আমি বাঁচতে পারব না।
‘বাঁচতে পারব না’শব্দবন্ধটি তিয়াশার কান ঘেঁষে যেতেই ওর ললাট জুড়ে রাগের এক তীব্র লালচে আভা ফুটে উঠল। ও এক কদম এগিয়ে এসে আরাভের শার্টের কলারটা নিজের ছোট ছোট মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বড্ড ক্ষুব্ধ ও জেদি গলায় বলল,
– জাস্ট স্টপ ইট! আপনার এই ফালতু ইমোশনাল ড্রামা বন্ধ করবেন? কেন আপনার বারবার মনে হচ্ছে যে আমি আপনাকে করুণা দেখাচ্ছি? আমি কি এতটাই সস্তা যে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কেবল করুণার খাতিরে একটা মানুষের সাথে একই ছাদের নিচে দিনের পর দিন সংসার করব?
তিয়াশার এই আকস্মিক অধিকারবোধে আরাভের ওষ্ঠাধরের কোণে স্বস্তির হাসি ফুটলো,,
– ওহ! তাহলে করুণা নয়? তাহলে কি আমি ধরে নেব যে এই শহরের মোস্ট ইগোইস্টিক মেয়েটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নষ্ট ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছে? স্বীকার করেই ফেলো না, মেরি জান!
মোক্ষম সময়ে তিয়াশাকে একদম কোণঠাসা করে ফেলল আরাভ। তিয়াশা ক্ষণিকের তরে জড়ো পদার্থের ন্যায় জমে যেতে চাইলেও পরক্ষণে,অত্যন্ত অপ্রস্তুত ও চঞ্চল পায়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
নৈশপ্রহরের নীরবতা গ্রাস করেছে চরাচর। তিয়াশা অত্যন্ত অপ্রস্তুত ও চঞ্চল পায়ে কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করল। অতঃপর নিচে গিয়ে রাতের খাবার ট্রেতে সাজিয়ে পুনরায় কক্ষে প্রবেশ করল। আরাভের কনিষ্ঠ আঙুলের ক্ষতটি পুরোপুরি না শুকানোয় বিগত দিনগুলোর মতো আজকেও তিয়াশা নৈশভোজের প্লেটটি হাতে তুলে নিল।
চামচে করে ভাত মেখে অভ্যাসবশত আরাভের মুখের সামনে ধরতেই আরাভ ওর হাতটি নিজের শক্ত মুঠোয় বন্দি করল। ও স্যুপ বা ভাতের দিকে না চেয়ে সরাসরি তিয়াশার সজল অক্ষিপটে প্রখর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বড্ড অনুতপ্ত, ভারী গলায় আওড়াল,,
- আগেই বলেছি না মায়া আর বাড়িও না, সুইটহার্ট? ছেড়ে গেলে বাঁচতে কষ্ট হবে।
তিয়াশা ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। ওর কণ্ঠরোধ হয়ে এল, ফিরিয়ে নেওয়ার মতো কোনো ভাষা ওনার জানা ছিল না। আরাভও আর কথা বাড়াল না। তিয়াশার এই মৌন সম্মতির মাঝেই ও নিশ্চুপে খাবার গ্রহণ করতে লাগলো।
– হোয়াট ইজ দিস আদ্রিতা? এগুলো কোন ধরনের পাগলামি?
– ভালোবাসার ধরনের।
– হ্যোয়াট দ্য ….!
বিশ্রী ভাষাটা মুখ থেকে বের হওয়ার পূর্বেই নিজেকে ধাতস্থ করল সাইদ। এই মেয়ের পাগলামি দিন দিন বাঁধ ভাঙছে। ললাটের শিরাগুলো রাগে ও চরম অস্বস্তিতে দপদপ করছে সাইদের। ও ফোনটা কানের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে বড্ড মেজাজি ও চড়া গলায় বলল,,
– আর একদিন যদি তোমাকে ওই ক্লাবের সামনে দেখেছি।
– কি করবেন?
– থাপড়িয়ে কান লাল করে দিব বেয়াদব।
– থাপ্পড় মারার জন্য তো সামনে আসতে হবে। আর আপনি তো আমার সামনে আসতেই নারাজ। ভয় পান বোধ হয়!
সাইদ অবাক হলো এই মেয়ের এমন কথায়।
– ভয় পাই মানে?
– ভয় না পেলে, অবশ্যই আমার সামনে আসতেন।
– দেখো মেয়ে…!
ফের একই সম্বোধনে নাক কুঁচকে আসলো আদ্রিতার। কথার মাঝখানে তাকে থামিয়ে বলল,,
– আদ্রিতা। আদ্রিতা আমার নাম।
– আই ন্যো!
– তাহলে বলেন না কেন?
– প্রয়োজন বোধ করি না।
আদ্রিতা চূড়ান্ত বিরক্ত। এই লোক কি বোঝেনা? নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করে? এতবার বলেছে প্রমাণ দিয়েছে সে ওর প্রতি কতটা দুর্বল তারপরও। ও ওষ্ঠাধর ইঞ্চি কয়েক বাঁকিয়ে বলল,,
– একটা সত্যি কথা বলবেন?
– আমি মিথ্যা বলি না।
– ওকে! তো বলুন, আপনি আগে ছ্যাঁকা-ঠ্যাঁকা খেয়েছেন কিছু?
সরাসরি এমন প্রশ্নের ভ্রু যুগল কুঁচকে গেলো সাইদের। এই কোন ধরনের প্রশ্ন? ও প্রশ্ন করতে যাবে তার আগেই আদ্রিতা ফের বলল,,
– আই থিংক ছ্যাকাই খেয়েছেন। না হলে,আমার মত একটা মিষ্টি মেয়েকে এভাবে রিজেক্ট করবেন কেন?
সাইদ পুনর্বার কিছু বলার চেষ্টায় রতো হতেই আদ্রিতা ফের বলল,,
– আচ্ছা ব্যাপার না। ছ্যাঁকা খেলেও কোনো ব্যাপার না। আমি ভালোবেসে পুষিয়ে দিব। কিন্তু, আপাতত অ্যাকসেপ্ট তো করুন আমায়! প্লিইইইজ!
– এই মেয়ে, তোমার সাহস তো দিন দিন দেখছি আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে! ছ্যাঁকা খেয়েছি মানে কী? আবোলতাবোল বকার একটা লিমিট থাকা দরকার। আমি জাস্ট রিলেশনশিপ নামক এই ঝামেলার ভেতরে জড়াতে চাই না, ব্যস!
- ওহ, তাই নাকি? ঝামেলার ভেতরে জড়াতে চান না, নাকি আমার এই তীব্র ভালোবাসার ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা আপনার ওই শক্ত বুকের ভেতর নেই?
– দেখো আদ্রিতা, উল্টোপাল্টা লজিক দিয়ে আমাকে কনফিউজড করার ট্রাই কোরো না। ছেলেদের ক্লাবের সামনে গিয়ে ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, যখন-তখন কল দেওয়া—এসব বড্ড চাইল্ডিশ বিহেভিয়ার।
– চাইল্ডিশ নয় মিস্টার, এটাকে কেয়ারিং বলে
– আদ্রিতা! বেশি কথা বলছ কিন্তু তুমি। মুখটা বন্ধ করো এবার।
- করব না বন্ধ! আপনি যতক্ষণ না সোজা ভাষায় স্বীকার করছেন যে আপনার মনের ভেতরেও আদ্রিতা নামের মেয়েটা একটু হলেও জায়গা করে নিয়েছে, ততক্ষণ আমি এভাবে বলতেই থাকব। এবার বলুন, আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছেন নাকি?
– হোয়াট দ্য হেল! আমি কোনো ক্রাইসিসে ভুগছি না।
– তাহলে সোজা বাংলায় হ্যাঁ অথবা না বলুন। আমাকে কি আপনার একদমই ভালো লাগে না? একটুও না?
– তোমার এই ন্যাকামো মার্কা ‘প্লিইইইজ’ শোনার মতো পেশেন্স আমার নেই। এখন রাখছি, নিজের চরকায় তেল দাও গিয়ে!
- শুনুন মিস্টার! ব্লক কিন্তু আর করবেন না বলে দিচ্ছি!
- ইচ্ছা!
টুস করে কলটা কেটে দিল সাইদ। ওপাশ থেকে আদ্রিতা ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে রাগ করলেও, সাইদের বুকের বাম পাশে তখন এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড় বইছে। ও নিজের কপালে হাত বুলিয়ে বড্ড চড়া এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আপন মনেই বিড়বিড় করে উঠল,,
– আজব মেয়ে! এত ধমক খাওয়ার পরও শান্ত না হয়ে, উল্টো আমারই হার্টবিট বাড়িয়ে দিচ্ছে!
সময়ের চাকায় ভর করে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে খসে গিয়েছে আরও বেশ কিছু দিন। জুলাইয়ের সেই তপ্ত রৌদ্রালোক ম্লান হয়ে প্রকৃতিতে এখন অক্টোবরের মৃদু হিমেল হাওয়ার ছোঁয়া। সকালের সোনাঝরা প্রভাতী রোদ্দুরেও এখন এক চিলতে শীতের আমেজ।
চৌধুরী ভিলার সুপ্রশস্ত ড্রয়িংরুমের সোফাটায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন ডিআইজি তাহের চৌধুরী। আননে ক্লান্তি আর একাকীত্বের ছাপ স্পষ্ট ওনার। রেহানা বেগম বড্ড ধীর পায়ে দু-কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা হাতে নিয়ে স্বামীর পাশে এসে বসলেন। চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে, উনি তাহের চৌধুরীর বরফশীতল হাতখানার ওপর নিজের কাঁপতে থাকা হাতটি রাখলেন।
মায়ের অবাধ্য মনটা আজ আর কোনো নিয়ম-নীতির শৃঙ্খল মানতে চাইল না। রেহানা বেগমের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল, কণ্ঠস্বর ভেঙে এলো হু হু কান্নায়। উনি অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে বললেন,,
– তুমি আর কতদিন এভাবে নিজেকে এবং আমাদের মেয়েকে শাস্তি দেবে, বলো তো? একটা মাত্র তো মেয়ে আমাদের! কলিজার টুকরোটাকে আর কতদিন এভাবে দূরে ঠেলে রাখবে? মা হয়ে এই নিঃসীম শূন্যতা আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
তাহের চৌধুরী স্ত্রীর এই আকস্মিক কান্নায় ভেতরে ভেতরে বড্ড কেঁপে উঠলেন। চোখের প্রখরতা শিথিল হলো মুহূর্তের তরে; রেহানা বেগম নিজের চোখের জল মুছে বড্ড বাস্তববাদী কণ্ঠে পুনরায় বললেন,,
– দুদিন বাদেই তিয়াশার জন্মদিন। জন্মের পর থেকে একটা বছরও ও আমাদের ছাড়া কাটায়নি। তুমি যতই রাগ দেখাও না কেন, আমি জানি মেয়ের জন্য তোমার এই শক্ত বুকের ভেতরটাও প্রতিনিয়ত দগ্ধ হচ্ছে। এবার অন্তত নিজের জিদটা ভেঙে ওকে ক্ষমা করে দাও।
দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লেন তাহের চৌধুরী। কঠোরতা আর পরাস্ত বাবার যুদ্ধে শেষমেষ জয়ী হল পিতৃসত্তা। এতদিনকার সহস্র অভিযোগের সমাপ্তি ঘটিয়ে উনি বললেন,,
– তুমি ঠিকই বলেছ রেহানা। তিয়াশাকে ছাড়া চৌধুরী ভিলার এই নিস্তব্ধতা আমাকেও প্রতি রাতে গ্রাস করে। আমি আর ওকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারছি না। এবারের জন্মদিনটা ও আমাদের সাথেই পালন করবে। তুমি প্রস্তুতি নাও, আমি নিজেই ওকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করছি।
রেহানা বেগম স্বামীর হাতটা পরম ভরসায় নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ওষ্ঠাধরে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফোটালেন। তাহের চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন,,
– ও যেখানে সুখে থাকে সেখানেই থাকুক। আমার আপত্তি নেই। হয়তো আগেও থাকতো না,প্রথম থেকে যদি ওদের সম্পর্কটা নরমাল হতো। অথবা টিয়া ভালোবেসে গ্রহণ আরাভকে গ্রহণ করত।
– তিন কবুলের জোর অনেক। ঘোর শত্রুকেও অভ্যাসে পরিণত করে ওটা। ওরা তো এতদিন একসাথে থাকলো। ইনশাআল্লাহ কিছুটা হলেও নরমাল হয়েছে সম্পর্ক। আর,ধীরে ধীরে আরো হবে।
– আমি একটা রিকোয়েস্ট করব?
নিজের শ্রবণান্দ্রেয়কেও বিশ্বাসযোগ্য ঠেকলো না আরাভের। তাই নিশ্চিত হতে পুনরায় শুধালো,,
– কিছু বলছো?
তিয়াশা সবে আরাভের কার্যকক্ষে এসে থেমেছিল; কক্ষটার অবস্থান বাড়ির উত্তর-পূর্ব পার্শ্বে। আরাভ যেদিন বাসায় থাকে, সেদিন এই রুমে থেকেই সমস্ত অফিসিয়াল কাজ হ্যান্ডেল করে।
– জ্বী? একটা রিকোয়েস্ট ছিল?
– রিকোয়েস্ট কি? অর্ডার করো। রানীর অর্ডার সাজে রিকোয়েস্ট নয়।
আরাভের এমন কথায় কিঞ্চিত অপ্রস্তুত হয়ে উঠল তিয়াশা। কিন্তু আজ যে কথাটা বলতে এসেছে সেটা বলতেই হবে। শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করল অতঃপর বলল,,
– আজকেরটা রিকোয়েস্টই।
– জ্বী বলুন?
এরপর খানিক সময় নিলো তিয়াশা।আরাভ ল্যাপটপ বন্ধ করে তিয়াশারের দিকে চেয়ে আছে, পুরোটা মনোযোগ দেওয়ার প্রয়াসে। ওর ভ্রু যুগল হঠাৎ কুঁচকে গেল,,
– কি হলো ম্যাডাম?
– আমি চাই, আপনি জয়নব ম্যাম কে এই বাড়িতে ফিরিয়ে আনুন।
দমবন্ধ করে কোনোমতে কথাটা আওড়ালো তিয়াশা। বলার পর চোখগুলো সেই যে কুঁচকে বন্ধ করলো খোলার নাম নেই! মূলত, কিছুদিন আগে ম্যামের সাথে দেখা করতে তার বাড়িতে গিয়েছিল তিয়াশা। খান বাড়ির প্রত্যেকের নজর ফাঁকি দিয়ে। কারণ একটাই, নিজের কৌতুহল অবদমন। কি ঘটেছিল না ঘটেছিল, সবটা জানার প্রয়াস।
প্রথমদিকে যে জয়নব বেগম সব টা খুলে বলেছিল এমনটা নয়। তবে বহু প্রচেষ্টা শেষে মূল কারণ উদ্ঘাটনের সক্ষম হয়েছিল তিয়াশা। তবে সে যেমনটা ভেবেছিলো, কাহিনীটা আরো জটিল। জয়নব আর আনোয়ার খান কাজিন ছিলেন। পারিবারিক ভাবে এক প্রকার জোর করেই তাদের বিয়ে হয়। তবে পরবর্তীতে আনোয়ার খানের ক্ষমতার দাপট একদম অপছন্দনীয় ছিল জয়নব বেগমের।
সেখান থেকেই সমস্যার উৎপত্তি। যেটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিচ্ছেদে রূপ নেয়। তবে বিচ্ছেদটাও অন্যরকম, কাগজে-কলমে কিংবা মৌখিক কোনোভাবেই বিচ্ছেদ হয়নি আনোয়ার খান আর জয়নব অর্থাৎ ফরিদা খানের। তবে মৌন বিচ্ছেদ এক্ষেত্রে মুখ্য হিসেবে কাজ করেছিল বিধায়,জয়নব ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এ সাম্রাজ্য।
– কোথায় হারিয়ে গেলেন, মিসেস খান?
তিয়াশার ভাবনায় ছেদ পড়লো আরাভের কন্ঠে, ও চোখ মেলে তাকাতেই দেখলো আরাভের মুখাবয়ব,,
– আসলে!
– আমি জানতাম রিকোয়েস্টটা এটাই হত। তবুও বলেছিলাম অর্ডার করুন। আপনার কথা আমি কখনো ফেলতে পারবো না ম্যাডাম। কি মনে করেন আপনি? আপনার মনের কথাই যদি না বুঝলাম তাহলে আপনি আমার মনের মানুষ হলেন কিভাবে?
– মানে? আপনি সবটা জানতেন?
– আমি সবটাই জানতাম।
– কিন্তু আপনি তো আমাকে কিছু বলেননি?
– আমি অপেক্ষা করছিলাম তুমি কখন বলো।
– কিন্তু কেন?
– এখানে বসো।
আরাভ নিজের পাশের আসনটা ইশারা করলো। তিয়াশা না চাইতেও বসলো সেথায়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আরাভের দিকে চাইতেই আরাভ বলল,,
– আমি চিরকাল ভালোবাসার কাঙ্গাল। জানো? কিন্তু কেউ আমাকে ভালোবাসে নি। মাই ব্যাড লাক! সবাই হয়তো বাবার সম্পত্তি দেখে কাছে আসতো অথবা সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে। তবে আমি আজীবন চাইতাম আমাকে কেউ নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসুক। যদিও কেউ বাসেনি! তবে আমার আরেকটা ইচ্ছা ছিল, আমার জীবনে এমন কারো সাথে দেখা হোক যে আমার সৌন্দর্য টাকা-পয়সার কিছু তোয়াক্কা করবে না। হয় প্রাণ ভরে ঘৃণা করবে, যেটাকে পরবর্তীতে আমি ভালোবাসার রূপান্তর করব অথবা প্রাণ ভরে ভালবাসবে।
তিয়াশা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এক প্রসঙ্গের মধ্যে এই প্রসঙ্গ টেনে আনার ব্যাপারটা বোধগম্য হলো না ওর। আরাভ পুনরায় বলতে শুরু করল,,
– অবশেষে তোমার দেখা পেলাম। যে আমার সৌন্দর্য আমার অর্থবিত্ত কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই প্রাণভরে ঘৃণা করে আমায়। অন্যরা মনে মনে করলেও,তুমি সরাসরি প্রথম সেটা দেখানোর সাহস করেছিলে। তাই প্রথম দেখাতেই হয়ত তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল এ মন। হ্যাঁ, প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম কই? না তুমি আমাকে ভালবাসলে না আমি তোমার থেকে মুভ অন করতে পারলাম। শেষমেষ,এক অনাকাঙ্ক্ষিত বন্ধনে জড়ালাম তোমাকে। ফলশ্রুতিতে, এখন আমরা কেউ সুখী নই!
তিয়াশার শক্ত মুখাবয়ব শিথিল হতে শুরু করেছে দেখে আরাভ বললো,,
– এতো কিছু বলার কারণ,কি জানো? আমি জয়নব বেগমকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারিনি। কারণ, উনি উনার আদর্শ রক্ষা করতে গিয়ে আমার শৈশবটাকে এক তীব্র একাকীত্বের নরকে ঠেলে দিয়েছিলেন। তবে অনুরোধ যখন আমার অর্ধাঙ্গিনীর তখন অর্ধাঙ্গের রাগ থাকাটা বড্ড বেমানান দেখায়!
তিয়াশা স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল এই দুর্ধর্ষ পুরুষের পানে, অতঃপর বলল,,
– কিন্তু বাবা যদি না মানে?
– মেনে যাবে।
– একটা কথা বলি?
– বলো।
– আমার মনে হয়, বাবা-মাকে অনেক ভালোবাসেন। না করতে পারবে না।
– শুধু শুধু তোমাকে আমার অর্ধাঙ্গিনী বলি? একদম ঠিক জানো তুমি। মন্ত্রী সাহেব নিজেও নিজের সহধর্মিণীকে খুব মিস করেন। আমি নিজ চোখে দেখেছি।
– তাহলে ফিরিয়ে আনেন না কেন?
– অতি উচ্চমাত্রার ইগো দুজনেরই। যেটা সম্পর্কের ধ্বংস ডেকে আনে।
তিয়াশার মুখখানা পানসুটে বর্ণ ধারণ করলো। ইগো-ইগো এবং সেই ইগো! যারা বশবর্তী হয়ে এখনো অব্দি এই লোকটাকে মেনে নিতে পারছে না ও।
অশনি ঘূর্ণিঝড়ের বেগে সম্পর্কের সমীকরণগুলো বদলে গেছে। জীবনের মোড়টা যে এভাবে কোন চোরাবালিতে এসে থমকে দাঁড়াবে, তা ভাবতেও মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে আসে নয়নিকার। রঙিন দিনগুলোর অবসান ঘটিয়ে একরাশ বিষণ্ণতা এখন ওর নিত্যদিনের সঙ্গী। অথচ যে রুদ্রকে ও দূর থেকে ভালোবেসেছিল, যার একটা চাহনির জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত, সেই পুরুষই আজ ওর স্বামী। তবে এ যেন এক অলীক প্রহসন!
রুদ্রর মা নিজের অসুস্থতার দোহাই দিয়ে, এক প্রকার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করেই রুদ্রকে বাধ্য করেছিলেন নয়নিকার গলায় তিন কবুলের মালা পরাতে। সেই জোরপূর্বক পরিণয়ের পর থেকেই রুদ্রর আচরণে এক হিমশীতল উদাসীনতা। আগে তাও কদাচিৎ রুদ্রর একটু সঙ্গ মিলত, আর এখন সে যেন ডুমুরের ফুল।
দেয়ালঘড়ির কাঁটা দুটো জানান দিচ্ছে সময় এখন রাত তিনটে ছুঁইছুঁই। নিশীথ রজনীর এই স্তব্ধতা বিদীর্ণ করে হুট করেই সদর দরজায় কড়া নাড়ার মৃদু শব্দ হলো। নয়নিকা বিছানায় আধশোয়া ছিল, শব্দটা শোনামাত্রই ও নিজের সুতি শাড়ির আঁচলটা সামলে নিয়ে ত্রস্ত পায়ে গিয়ে দরজাটা উন্মুক্ত করল।
সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা অবিন্যস্ত চেহারার রুদ্রকে দেখে নয়নিকার ডাগর চোখ দুটো ক্ষণিকের জন্য থমকালো। রুদ্রর চোখ দুটো ক্লান্তিতে লালচে, কোটের বোতামগুলো আলগা। ও নয়নিকার দিকে একপলকও না চেয়ে, কোনো বাক্যব্যয় না করেই গটগট করে ভেতরে প্রবেশ করল। নয়নিকা পিছু পিছু ড্রয়িংরুম পর্যন্ত এসে কিঞ্চিৎ কুণ্ঠিত ও যত্নশীল স্বরে শুধাল,,
- এত রাত করলেন যে? শরীর ঠিক আছে তো? কিছু খাবেন কি, রুদ্র ভাই?
রুদ্র ঘাড়টা কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে অত্যন্ত কড়া স্বরে বলল,,
- রাত তিনটের সময় মানুষ ডিনার করতে বসে না, নয়নিকা! নিজের চরকায় তেল দে গিয়ে। আমার জন্য বাড়তি আদিখ্যেতা দেখানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
রুদ্রর এমন রুক্ষ ও ধারালো জবাবে নয়নিকার বুকটা এক তীব্র অভিমানে মোচড় দিয়ে উঠল। ও নিজের ওষ্ঠাধর শক্ত করে চেপে ধরে, চোখের কোণে জমতে থাকা অবাধ্য অশ্রুটুকু আড়াল করতে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ও ওপরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২২
রুদ্র একটা দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে সোফাটায় গা এলিয়ে দিল। প্রতিদিনের ন্যায় আজকেও ওপরের ওই সুসজ্জিত ঘরটা ওর কাছে এক নিষিদ্ধ নগরী, আর এই ড্রয়িংরুমের নিঃসঙ্গ সোফাটায় শুয়ে রাত পার করাই ওর নিয়তি। মা আর সমাজের চাপে বিয়েটা করলেও, নয়নিকাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা যে ওর এই শক্ত মনের ভেতর নেই। তবে কারণটা কি? এখনো অজানা রুদ্রর।
