ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২৫
নওরিন কবির তিশা
চৌধুরী ভিলার দোতলার দক্ষিণমুখী বারান্দাটায় তখন মধ্যাহ্নের অলস রোদ্দুরের আনাগোনা। তিয়াশা একটা উপন্যাসের পাতা মেলে নিবিষ্ট মনে বসে ছিল। বিগত দুটো দিন নিজের চেনা বিছানা, বাবা-মায়ের স্নেহের পরশ আর চিরকালের চেনা আবহে কাটলেও বুকের ঠিক বাঁ পাশটায় কেমন যেন একটা সূক্ষ্ম খালি খালি ভাব অনুভুত হচ্ছিল ওর। পৃষ্ঠা ওল্টানোর মাঝেই কোলের ওপর রাখা মুঠোফোনটা তীব্র কম্পনে সজাগ হয়ে উঠল।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে সেভ করা নামখানা ‘মি. পারফেক্ট রুডনেস’। তিয়াশার ওষ্ঠাধরে অগোচরেই এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। নিজের অজান্তেই ও কবে যেন এই নামে আরাভের নম্বরটা সেভ করে ফেলেছে, ওড়নাটা সামান্য ঠিক করে নিয়ে কলটা রিসিভ করে কানে ধরল। ওপাশ থেকে কোনো ভূমিকা ছাড়াই আরাভের বড্ড আকুল কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
- দুই দিন, চার ঘণ্টা আর ঠিক পঁয়ত্রিশ মিনিট হলো, মেরি জান! একটা মানুষের হার্টবিট চুরি করে নিয়ে এভাবে নিজের বাপের বাড়ি গিয়ে বেখবর হয়ে বসে থাকাটা কি কোনো আইনি ধারায় পড়ে, মিসেস খান?
– আর এই, কয়েক ঘন্টায় আপনি আমাকে কতবার কল করেছেন মিস্টার খান?
আরাভ ওপাশ থেকে একটা নিটোল বোকা হাসি হাসল। স্যুট জ্যাকেটটা খুলে অফিসের ডেস্কে রাখতে রাখতে বলল,,
– আসলে… তোমার ওই মায়াবী কণ্ঠস্বর শোনার তাড়নায় সংখ্যার হিসাবটা আর রাখা হয়ে ওঠেনি, সুইটহার্ট। কবার করেছি বলো তো? খুব বেশি হলে চার-পাঁচ বার?
তিয়াশা ওড়নার প্রান্তটা আঙুলে পেঁচিয়েষ ফোনটা কান থেকে নামাল। স্পিকার অন করে চটজলদি ডায়ালপ্যাডটা ঘেঁটে নিয়ে ফের কানে ধরল। ও এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত পরিমাপিত কণ্ঠে বলল,
– চার-পাঁচ বার নয়, মিস্টার খান। গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় আপনার ইনকামিং কলের সংখ্যা ঠিক তিনশত বাষট্টি বার! অফিসে কোনো কাজ নেই আপনার?
আরাভ চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিয়ে প্রখর নেত্র বুজে একটু শব্দ করে হাসল; আর্দ্র কণ্ঠে জবাব দিল,,
– অফিসের কাজ? তোমার ওই ডাগর চোখের মায়ায় আমি চব্বিশ ঘণ্টাই ফুল-টাইম বেকার। তিনশত বাষট্টি বার বড্ড কম হয়ে গেছে, আজ রাতে সংখ্যাটা চারশো পার করার ইচ্ছে আছে।
তিয়াশা ললাটে কিঞ্চিৎ কৃত্রিম ভাজ এনে গম্ভীর হতে চাইলেও ব্যর্থ হলো; মৃদু স্বরে আওড়াল,,
– অসভ্যতা বন্ধ করে লাঞ্চ করেছেন কিনা বলুন? আর মেডিসিন নিয়েছেন তো?
আরাভ পরম তৃপ্তিতে চোখ মেলল। তিয়াশার এই সূক্ষ্ম কেয়ারিংটুকু ওর হৃদয়ের গহীনে এক অদ্ভুত বসন্তের দোলা দিয়ে গেলো; ভরাট কন্ঠে ও বলল,,
– অভ্যাস যা করে দিয়ে গিয়েছে তাতে তুমি খাইয়ে না দিলে, আর খেতে ইচ্ছা করে, বলো? আজ বিকেলেই গাড়ি পাঠাচ্ছি। আর একটাও মিনিট তোমাকে চৌধুরী ভিলায় রাখার পেশেন্স আমার নেই, মেরি জান। রেডি থেকো।
– এই,না না! আজকের রাতটা বাবাদের সাথে থাকি।
– কেন?
তিয়াশা ভ্রু গোটালো,,
– আপনি জানেন না আজকে কি?
– না তো।
– সত্যিই না?
– সত্যিই না!
– আচ্ছা, ফোন রাখুন!
তিয়াশার এমন খট করে ফোন কেটে দেওয়ার শব্দে আরাভ বিস্মিত নেত্রে স্ক্রীনে চাইলো। মস্তিষ্কে বোধগম্য হলো না কিছুই!
এদিকে তিয়াশা ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বারান্দার রেলিংটা শক্ত করে চেপে ধরে এক দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে চাইল। ওর জন্মদিনের কথাটা এই লোকটার বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছে? ওষ্ঠাধর ইঞ্চি কয়েক বাঁকিয়ে ও আপন মনেই বিড়বিড় করল,,
- ইতর লোক একটা ! সারাদিন শুধু মুখে খৈ ফোটে, আর কাজের বেলায় কিচ্ছু মনে থাকে না। আমিও আর যাব না ওই খান মহলে, থাকুন্ উনি ওনার অফিসের কাজ নিয়ে!
তিয়াশার এই চরম অভিমানের মাঝেই ঘরের দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। রেহানা বেগম ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করে মেয়ের এই থমথমে মুখচ্ছবি দেখে মৃদু হাসলেন। উনি তিয়াশার কাছে এসে ওর চিবুকটা আলতো ছুঁয়ে বললেন,,
- কি হয়েছে টিয়া?
– কিছু না।
– মাকে মিথ্যা বলবি?
তিয়াশা এবার মায়ের বুকে মাথা লুকিয়ে কিঞ্চিৎ আদুরে ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল,,
– অসভ্য লোকটার আমার জন্মদিনের কথা মনে নাই।
– তুই ওকে বলেছিস তোর জন্মদিন কবে?
তিয়াশা মায়ের বুকে মাথা রেখেই ক্ষণিকের জন্য যেন বোকা বনে গেল। ও ঝট করে মাথা তুলে মায়ের নিষ্পাপ মুখের পানে চাইল। রেহানা বেগম মেয়ের ওমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুখশ্রী অবলোকন করে ওষ্ঠাধরে এক চিলতে কৌতুকী হাসি ফুটিয়ে ফের শুধালেন,,
– তুই কি নিজে কখনো ওকে বলেছিস যে আজ তোর জন্মদিন?
তিয়াশা দুই দিকে না বোধক মাথা নাড়ল। ডাগর চোখ দুটো ততক্ষণে গোল গোল হয়ে গেছে;বড্ড অপ্রস্তুত কণ্ঠে ও আওড়াল,,
– না তো! আমি কেন বলতে যাব? ও নিজে থেকে এত শত খোঁজখবর রাখতে পারে, আর এই সামান্য কথাটা জানতে পারত না?
রেহানা বেগম এবার মেয়ের কপালে আলতো করে একটা টোকা দিয়ে মৃদু হেসে বললেন,,
– বা রে! ও কি কোনো জ্যোতিষী নাকি যে না বলতেই সব জেনে যাবে? আমার চঞ্চল, বুদ্ধিমতী মেয়েটা ইদানীং দেখছি বড্ড বাচ্চামো করছে! তিয়াশা চৌধুরী তো আগে এমন ছিল না। ভালোবাসার হাওয়া কি তবে তোর ওই চতুর মস্তিষ্কটাকেও একটু ওলটপালট করে দিল, মা?
মায়ের মুখে সরাসরি ‘ভালোবাসা’ শব্দবন্ধটি শোনামাত্রই তিয়াশার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই লজ্জার তীব্র লালচে আভায় রাঙিয়ে উঠল। ও চট করে মায়ের চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আমতা-আমতা করে বলল,,
– কী যে বলো না, মা! কিচ্ছু না তেমন। আমি জাস্ট ওনার খামখেয়ালিপনার কথা বলছিলাম। ধুর!
রেহানা বেগম মেয়ের এই মিষ্টি লুকোচুরি পরম তৃপ্তিতে উপভোগ করলেন। ওনার মনটা এক অজানা স্বস্তিতে ভরে উঠল;উনি তিয়াশার হাতটা ধরে আলতো করে টেনে নিয়ে বললেন,,
– আচ্ছা, ঢের হয়েছে নিজের স্বামীর নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া! এবার চল, নিচে দুপুরের খাবার বেড়ে রেখেছি। তোর বাবাও তোকে সারপ্রাইজ দেবে বলে বিকেলের আগেই অফিস থেকে চলে আসবেন বলেছেন। জলদি আয়।
তিয়াশা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে মায়ের পিছু পিছু কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
– এইযে,শুনছেন?আরেহ,শুনুন তো! ওইইইইইই সাইদ!
ঘোর আধারে নিমজ্জিত সমগ্র কক্ষ। সায়াহ্নবেলা পেরিয়েছে বেশ অনেকক্ষণ। এতক্ষণ যাবৎ কক্ষের সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও হুট করে নিভে গিয়েছে শেষ আলোটুকুও। আদ্রিতা শাড়ি পরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। রাত আটটার মধ্যে এই চৌধুরী ভিলাতে পৌঁছাতে হবে ওর। প্রতিবারের ন্যায় এবারও ছোটখাটো আয়োজন। সাড়ম্বরে জন্মদিন পালন না করলেও, ঘরোয়া ভাবে কিছু অন্তরঙ্গ আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে।
সেই উদ্দেশ্যেই প্রস্তুতি চলছিল মূলত। শাড়ির কুচিটা গোঁজার ঠিক আগ মুহূর্তে এমন বিরক্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে,ও। সাইদ তো ব্যালকনিতেই ছিলো; কিন্তু আপাতত কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। আঁধার হাতড়ে কোন মতে পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে, ফ্ল্যাশ লাইট অন করলো ও। ভ্রুকুটি মিশ্রিত দৃষ্টিতে আশেপাশের নজর বুলিয়ে বলল,,
– কোথায় আপনি?
ঠিক তখনই ব্যালকনির দরজা ঠেলে ঘরের ভেতর পা রাখল সাইদ। আদ্রিতার হাতের ফ্ল্যাশ লাইটের মৃদু আলোয় ওর ছায়ামূর্তিটা স্পষ্ট হতেই ও কিছুটা বিভ্রান্ত গলায় শুধাল,
– কী হলো, রুমের আলো কোথায়? হঠাৎ ভূতুড়ে অন্ধকার হয়ে গেল কেন?
আদ্রিতা ওষ্ঠাধর উল্টে বিরক্ত গলায় বলল,
– আমি কী জানি! কারেন্ট চলে গেছে মনে হয়।
সাইদ ভ্রু কুঁচকে চারপাশটা দেখে নিয়ে বলল,
– কারেন্ট চলে গেল মানে? কারেন্ট চলে গেলেও তো আইপিএস চলার কথা। ব্যাকআপ কানেকশন তো এভাবে গোলমাল করার কথা না।
আদ্রিতা তখন নিজের শাড়ির আঁচল আর কুচি সামলাতে ব্যস্ত। এক হাত দিয়ে মোবাইলের লাইটটা ড্রয়ারের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখে ও বড্ড অসহায় ভঙ্গিতে সাইদের দিকে তাকাল। শাড়ির শেষ ভাগের কুচিগুলো কিছুতেই মনের মতো গুছিয়ে উঠতে পারছে না ও। অগত্যা লাজুক হেসে অনুচ্চ স্বরে বলল,
– ওসব পরে দেখা যাবে। আপাতত আপনি আমাকে একটু হেল্প করেন তো!
সাইদ চকিত নয়নে ওর দিকে চেয়ে দুষ্টুমির সুরে বলল,
– আমি? কিন্তু আমি তো শাড়ি পরাতে পারি না, লেডি! ওই বিদ্যায় আমি বড্ড কাঁচা।
আদ্রিতা শাসনের সুরে বলল,
– ধুর, কে বলেছে আপনাকে আস্ত শাড়ি পরাতে? আমি শাড়ি পরতে পারি। সব ঠিকই আছে, জাস্ট কুচিগুলো একটু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আপনি একটু ধরে ঠিক করে দিন না, তাহলেই আমার হয়ে যাবে।
সাইদ আর দ্বিরুক্তি করল না। মুখে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটিয়ে ও ধীর পায়ে আদ্রিতার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। ফ্ল্যাশ লাইটের নরম আলোয় আদ্রিতার ফর্সা মুখশ্রী তখন বড্ড মায়াবী লাগছিল। সাইদ নিচু হয়ে আদ্রিতার কম্পিত হাতের ওপর নিজের উষ্ণ হাতটা রাখল। অতি সাবধানে ওর নরম আঙুলের স্পর্শ এড়িয়ে শাড়ির কুচিগুলো একে একে ধরে সমান করতে লাগল। দুজনের অতি ঘনিষ্ঠতায় আদ্রিতার হৃৎস্পন্দন যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। ও নিঃশব্দে চোখ দুটো বুজে ফেলল। সাইদের নিশ্বাসের তপ্ত হাওয়া ওর উন্মুক্ত উদরে আছড়ে পড়ছিল।
কুচিগুলো নিখুঁতভাবে গুছিয়ে আদ্রিতার নাভির নিচে গুঁজে দিতে দিতে সাইদ মুখ তুলে তাকাল। ওর ভরাট কণ্ঠের ফিসফিসানি আদ্রিতার কানে এসে বাজল,
– ডান, মিসেস সাইদ। এবার চোখ মেলতে পারেন।
আদ্রিতা ধীর পায়ে এক কদম পিছিয়ে গিয়ে নিজের শাড়িটা একবার দেখে নিল। সত্যিই বড্ড নিখুঁত হয়েছে! ও মুগ্ধ চোখে সাইদের দিকে চেয়ে বলল,
– বাহ! আপনি তো দেখছি আমার চেয়েও ভালো শাড়ি গোছাতে পারেন। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ!
সাইদ হাসল; আদ্রিতার খুব কাছে এসে ওর দুই কাঁধে নিজের হাত রাখল। ওর প্রখর নেত্রজোড়া আদ্রিতার চোখের ওপর স্থির রেখে গভীর ও আর্দ্র কণ্ঠে বলল,
– তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আদ্রিতা। আমার এই বড্ড সাদাকালো-বেরঙিন জীবনটাকে এক অলীক ক্যানভাস বানিয়ে ভালোবাসার রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য। তুমি না থাকলে হয়তো আমি জানতেই পারতাম না জীবনটা কতখানি সুন্দর হতে পারে!
সাইদের মুখের এই অকপট স্বীকারোক্তি আর গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে আদ্রিতার হৃদগহীনে ভালো লাগারা দোলা দিয়ে গেল। ওর দুই নয়ন বেয়ে যেন আবেগের জল উপচে পড়তে চাইল। ও সাইদের প্রশস্ত বুকে নিজের হাত দুটো রেখে কাঁপা গলায় বলল,
– আর আমার শূন্য জীবনটাকে পূর্ণতায় ভরিয়ে দেওয়ার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ, সাইদ। আমি শুধু আপনার ক্যানভাসটা রাঙাইনি, আপনিও আমার পুরো পৃথিবীটা বদলে দিয়েছেন।
সাইদ দুহাত বাড়িয়ে আদ্রিতাকে পরম আবেশে নিজের বুকের সাথে জাপটে জড়িয়ে ধরল। আদ্রিতাও কোনো দ্বিধা ছাড়াই সাইদের বুকে মাথা রেখে ওর চেনা ঘ্রাণটা ফুসফুসে টেনে নিল। সাইদ আলতো করে ওর মাথায়
দেয়ালঘড়ির কাঁটা দুটো যেন কোনো এক অলস মন্থরতায় ধাবিত হচ্ছে। সময় এখন রাত বারোটার ঘর ছুঁইছুঁই। চৌধুরী ভিলার সুসজ্জিত ড্রয়িংরুমটি আজ এক মায়াবী উৎসবে মুখরিত। চারিপাশে ঝুলছে মৃদু হলুদাভ আলো আর বেলুনের মেলা। টেবিলের ওপর রাখা বিশাল চকোলেট কেকটার পাশে সবাই সমবেত। আনোয়ার খান, ফরিদা খান, তাহের চৌধুরী এবং রেহানা বেগম—প্রবীণ এই চারজন যেন আজ নিজেদের সমস্ত অতীত গ্লানি ভুলে এক পরম আনন্দে মেতে উঠেছেন।
তিয়াশার পরনে আজ এক গাঢ় নীল রঙের জামদানি শাড়ি, কপালে ছোট্ট একটা নীল টিপ, আর চুলগুলো আলতো করে খোঁপা করে রাখা। রূপোলি গহনায় ওকে আজ কোনো অপার্থিব রূপসী বলে ভ্রম হচ্ছে। ঘরের ভেতরে এত মানুষের কোলাহল, আলো আর হাসি তামাশা থাকলেও তিয়াশার ডাগর চোখ দুটো প্রতি সেকেন্ডে অবাধ্য হয়ে সদর দরজার দিকে ছুটে যাচ্ছিল। বুকের ভেতরের ছটফটানিটা ক্রমশ বাঁধ ভাঙছে ওর। এই শুভক্ষণে শহরের সবচেয়ে দাপুটে পুরুষটিই এখনো অনুপস্থিত!
তিয়াশার এই অনবরত দরজার পানে চেয়ে থাকা আর ললাটের চিন্তার ভাঁজটুকু রেহানা বেগমের প্রখর মাতৃস্নেহ এড়াতে পারল না। উনি মেয়ের একদম কাছে এসে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে দুষ্টুমির সুরে শুধালেন,,
- বড্ড মিস করছিস বুঝি? দরজার দিকে তাকাতে তাকাতে তো চোখ দুটোই ক্ষয়ে গেল, মা!
মায়ের এই আকস্মিক টিপ্পনীতে তিয়াশা বড্ড অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ও চট করে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে কৃত্রিম একরাশ রাগ ও গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলল,,
- একদম না, মা! আমি কেন ওনাকে মিস করতে যাব? যার নিজের স্ত্রীর জন্মদিনের কথা মনে থাকে না, তার জন্য আমার এক ফোঁটা অপেক্ষাও নেই। আসুক ওনার কাজের কাজ নিয়ে, আমিও আর ওমুখো হচ্ছি না!
ঠিক তখনই, হঠাৎ ড্রয়িংরুমের ঝলমলে আলো নিভে গেল। মুহূর্তের ব্যবধানে সমগ্র ঘরটি এক ঘন তিমিরে নিমজ্জিত হলো। তিয়াশা কিঞ্চিৎ চমকে উঠে মায়ের হাতটা ধরতে যাবে, ঠিক তখনই সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারের বুক চিরে সুদূর তোরণদ্বার থেকে এক চিলতে সোনালী আলোর বিচ্ছুরণ ঘটল।
একটি ছোট্ট জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে নিয়ে ধীর পদক্ষেপে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল আরাভ।মোমবাতির সেই কাঁপাকাঁপা হলুদাভ আলোয় আরাভের তীক্ষ্ণ ও পৌরুষদীপ্ত মুখাবয়ব আজ কোনো গ্রিক দেবতার ন্যায় দীপ্তিময় লাগছিল। ও তিয়াশার ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক চিলতে মায়াবী ও ভালোবাসায় আর্দ্র হাসি ফুটিয়ে সুর মেলাল,
- হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, মাই লাভ… হ্যাপি বার্থডে টু মাই সোলমেট!
আরাভের কণ্ঠের সেই ভরাট গুঞ্জনে ঘরের গুমোট নীরবতা কেটে যেন এক অপার্থিব সুরের সৃষ্টি হলো। তিয়াশা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, ওর ডাগর চোখ দুটো সজল হয়ে উঠল আনন্দের অতিরেক। আরাভ তিয়াশার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। মোমবাতিটা আলতো করে টেবিলের ওপর রেখে ও তিয়াশার দুই গালে নিজের উষ্ণ হাত দুটো রাখল। ওর প্রখর নেত্রজোড়া তিয়াশার ভেজা চোখের ওপর স্থির রেখে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,,
- কী ভেবেছিলে, মেরি জান? এই আরাভ খান নিজের শ্বাস নিতে ভুলে যেতে পারে, কিন্তু যার জন্য এই হৃদপিণ্ডটা স্পন্দিত হয়, তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনটা ভুলে যাবে? গত কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রতিটা মিনিট গুনেছি সুইটহার্ট, কখন এই রাত বারোটা বাজবে আর আমি সবার প্রথমে তোমাকে উইশ করব।
তিয়াশা ওষ্ঠাধর কামড়ে নিজের কান্নার বেগ লুকানোর চেষ্টা করল। ও এক হাত দিয়ে আরাভের বুকের জামাটা খামচে ধরে কাঁপা গলায় বলল,,
- আপনি বড্ড অসভ্য, মিস্টার খান! তখন ফোনে ওমন নাটক করার কী দরকার ছিল? আমি ভেবেছিলাম…
আরাভ মৃদু হেসে তিয়াশার ললাটে নিজের ওষ্ঠাধর পরম আবেশে ছুঁইয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,,
– সারপ্রাইজটা যদি নাটকীয়ই না হলো, তবে কি আর ভালোবাসার গভীরতা মাপা যায়, সুইটহার্ট? এবার চলো, কেকটা কাটা যাক।
হুট করে, ড্রয়িংরুমের ঝলমলে আলোকরশ্মি পুনরায় সচল হতেই চারপাশের হাততালির শব্দে তিয়াশা লজ্জায় আরক্ত হয়ে মাথা নুইয়ে নিল। আনোয়ার খান আর তাহের চৌধুরী হাসিমুখে এগিয়ে এসে ওদের কেক কাটার তাগিদ দিলেন। আরাভ তিয়াশার নরম হাতটি নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে, ছুরিটা একসাথে ধরে চকোলেট কেকটি কাটল।
কেক কাটা শেষে সবাই এক এক করে তিয়াশার হাতে জন্মদিনের উপহার তুলে দিতে লাগলেন। সবার উপহার নেওয়া শেষ হতেই আরাভ মৃদু হেসে নিজের কোটের ভেতরের পকেট থেকে একটি সুদৃশ্য খাম বের করল। ও খামটি তিয়াশার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বড্ড চঞ্চল কন্ঠে বলল,,
– এটা তোমার, ওপেন ইট।
তিয়াশা ভ্রু কুঁচকে কিঞ্চিৎ কৌতূহল নিয়ে খামটি খুলে ভেতরে উঁকি দিল। দুটি বিমানের টিকিট আর সাথে একটি চমৎকার ট্রাভেল ভাউচার। টিকিটের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘ঢাকা টু শ্রীনগর, কাশ্মীর’।
কাশ্মীর শব্দবন্ধটি চোখের সামনে ভাসতেই তিয়াশা বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেল। ওর স্বপ্নের জায়গা! জীবনে একবার হলেও সেখানে যেতে চেয়েছিল ও। তবে, আরাভ এটা জানলো কোত্থেকে? কৌতুহল অবদমনে ব্যর্থ হয়ে ও ডাগর চোখ দুটো মেলে আরাভের পানে চাইল। থতমত খেয়ে আওড়ালো,
ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২৪
– কাশ্মীর? কিন্তু… আপনি কী করে জানলেন? আমি তো আপনাকে কখনো সরাসরি বলিনি!
আরাভ এক কদম এগিয়ে এসে তিয়াশার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,,
– ভুলবশত আমার প্রিয়তমা একদিন আমাকে এটার কথা বলে ফেলেছিলো! আনমনে, হয়তো।
তিয়াশার বুকের বাম পাশটায় এক তীব্র অনুরাগের হিল্লোল বয়ে গেল। এই দুর্ধর্ষ, বেপরোয়া পুরুষটি যে তাকে কতটা সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং কতটা ভালোবাসে, তা ভেবে ও বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইল।
