তোমার আমার গল্প পর্ব ১০
noorayn
ভোর প্রায় ৪ টা বাজে…
এমন সময় আলিশা উঠে বসে আছে। নিজের পেটে আঙুলের টোকা দিয়ে বাবুর উদ্দেশ্য বলছে –
“এই তুই কি আমাকে ঘুমাতে দিবিনা? এতো নড়চড় করছিস কেন হ্যাঁ?”
–বাবু যেন মায়ের কথা বুঝতে পেরে নড়াচড়া বাড়িয়ে দিয়েছে।
“এই আরহামের বাচ্চা? এত জ্বালাচ্ছিস কেন? একটু আগেই না খেয়েছিস এখন আবার ক্ষিদে পেয়েছে তোর?”
“উফ, এত নড়বিনা। ব্যাথা পাচ্ছি আমি…”
আলিশা পেটে হাত বুলাতে বুলাতে পাশে ঘুমন্ত আরহামের দিকে হিংসাত্মক দৃষ্টিতে তাকালো। এই গন্ডারের এত বড় সাহস? তার পেটে বাচ্চা নিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে! আর এদিকে আলিশা একটু আরামে শুতেও পারছেনা।
আরহামের এত সুখ যেন সহ্য হলোনা আলিশার। সে ঘুমন্ত আরহামের নাকে টোকা দিয়ে তাকে বিরক্ত করতে লাগলো।
তবে তার এদিকে কোনো খেয়ালই নেই ; সে তো ঘুমে বিভোর। আলিশার আঙুল সরিয়ে উল্টো দিকে ফিরে গেলো। এতেই আলিশা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে। সে এবার আরহামকে ধাক্কা দিতে দিতে বললো –
“এই উঠো, বাবুর ক্ষিদে পেয়েছে।”
“উহুম বেয়াদব ছেমড়ি…ঘুমাতে দে আমাকে।”
“এই গন্ডার উঠতে বলেছি নয়তো বিছানা থেকে উষ্টা দিয়ে ফেলে দেবো।”
আরহাম এবার বিরক্তিতে নিভু নিভু চোখে আলিশার দিকে তাকিয়েছে।
“কি হয়েছে বেয়াদব? এই সময়ে আবার কোন কৃমি উঠেছে তোর? আমি ঘুমাবো…”
“তুই ঘুমাবি? তোর এত্ত বড় সাহস! আমি এদিকে ঘুমাতে পারছিনা আর তুই ঘুমাবি মানে?”
“কেন? তোকে ঘুমাতে কে মানা করেছে?”
“তোর বাচ্চা আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছেনা গন্ডার।”
আরহাম ঘুমের ঘোরে চোখও মেলতে পারছেনা।
“কার বাচ্চা? কোন বাচ্চা? আমি নিজেই তো একটা কিউট বাচ্চা…”
“এক্ষুনি উঠ কিউট বাচ্চা, নাহলে তোকে মেরে বানিয়ে দিবো লাল গরুর বাচ্চা।”
“কোথায় গরু? গরু কে এনেছে?”
“তুই উঠবি নাকি আমি তোর উপর পানি ঢালবো?”
“উফ, উঠছি দাড়া..”
অনেক কষ্টে আরহাম চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসলো। তারপর আলিশার দিকে কটমটিয়ে চেয়ে শুধাল,
“এবার বল, কি হয়েছে?”
আরহাম উঠরে দেরি করেছে বিধায় আলিশা গাল দুটো ফুলিয়ে জবাব দিলো –
“বলবোনা কিছুই, তুই উঠতে দেরি করলি কেন? আমি রাগ করেছি।”
“এক থাপ্পরে গাল ফাটিয়ে দিবো বেয়াদব। আবার তুই করে বলছিস?”
“ওই না..মানে কিছুনা।”
“বল এখন।”
“বাবুর ক্ষিদে পেয়েছে।”
“কার বাবুর?”
“তোর..”
“আমার বাবু কোথায়?”
“আমার পেটে”
এবার যেন আরহামের হুশ ফিরলো।
“তো খাওয়া বাবুকে”
“এত রাতে কি খাবো?”
“অপেক্ষা কর, ফ্রিজে কিছু থাকবে। আমি গরম করে নিয়ে আসছি”
“না, আমি পাস্তা খাবো”
“এত রাতে পাস্তা কোথায় পাবো?”
“তুমি বানিয়ে দাও।”
“কাল খাবি, এখন অন্যকিছু খেয়ে নে।”
অন্যকিছু খেতে বলায় আলিশা অভিমানী চোখে নিজের পেটে টোকা দিতে দিতে ন্যাকা স্বরে বলল –
“দেখ বেবী দেখ… তোর বাপ তোকে ভালোবাসেনা। থাক, তুই না খেয়েই থাক।”
“ব্যাস হয়েছে আমার শাবনূর ; আর নাটক করতে হবেনা। আমি বানিয়ে আনছি। তুই অপেক্ষা কর।”
-আলিশার চোখ চকচক করে উঠেছে। সেও যেতে চায় আরহামের সাথে।
“আমিও যাবো তোমার সাথে।”
আরহাম কোনো জবাব না দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে দরজার দিকে।
তাকে অনুসরণ করে আলিশাও গেলো তার পিছু পিছু।
আরহাম রান্না করছে এবং আলিশা কিচেন ক্যাবিনেটের উপর বসে বসে পা দোলাচ্ছে।
–আরহামের সম্পুর্ন মনোযোগ রান্নার দিকে আর আলিশার মনোযোগ আরহামের দিকে।
–আরহামের পড়নে কালো রঙের একটি টি-শার্ট আর অ্যাশ রঙের একটি থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। রান্নার কারণে ঘামে ভিজে টি-শার্টটি শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। ফলে তার সুঠাম বাহুর পেশিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অদ্ভুত রকমের আকর্ষণীয় লাগছে তাকে। এমনি এমনি তো সবাই তাকে ‘চকলেট বয়’ বলে না! এসব ভাবতে ভাবতেই আলিশা একদৃষ্টিতে আরহামের দিকে চেয়ে রইল।
তার মস্তিষ্কে হঠাৎ শয়তানি বুদ্ধি এসে হানা দিলো। সে ধীরে ধীরে ক্যাবিনেট থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আচমকা পিছন হতে আরহামকে জড়িয়ে ধরলো।
“লিশা ছাড়, বিরক্ত করবিনা।”
–আলিশা কি কথা শোনার মেয়ে? সে কিছু না বলেই হাত ঢুকিয়ে দিলো আরহামের টি-শার্ট এর ভিতর ; তারপর হাত দিয়ে বিচরন করতে থাকলো আরহামের সারা পিঠ। তার উদ্দেশ্য আরহামকে বিরক্ত করা।
“আজ হঠাৎ এত আদর?”
“তোমায় আজ ভীষণ হট লাগছে তাই।”
আরহাম চপিং বোর্ডে টমেটো কাটতে কাটতে শুধালো –
“কেন সবসময় লাগেনা?”
“না..”
–আলিশার মুখে ‘না’ শুনেই আরহামের হাত থেমে গেলো। সে একবার পিছু ফিরে আলিশার দিকে কটমট করে চেয়ে আবার নিজ কাজে মগ্ন হয়ে গেলো।
“বেয়াদব মহিলা। ফ্রিতে পেয়ে গেছিস আমাকে তাইতো কোনো মূল্য দিচ্ছিস না ; নয়তো আরহামের এক দেখা পাওয়ার জন্যও মেয়েরা তড়পায়। হাহ! সবার পছন্দের চকলেট বয় বলে কথা।”
“এ্যাঁ, আসছে আমার চকলেট বয়..”
“ফ্রিতে পেলে মানুষ মূল্য দেয়না।”
“হুহহ…”
“হয়েছে সর এখন। আমার গরম লাগছে…”
“আমার ঠান্ডা লাগছে।”
“তো?”
“তো আমি ছাড়বোনা এখন।”
“বিছানায় চল, তোকে গরম করে দেই…”
এমন কথায় আলিশা সরে যেতে যেতে আওড়ালো –
“অসভ্য ব্যাটা মানুষ।”
–দুজনের খুনসুটির মধ্যেই তৈরি হয়ে গেলো আলিশার পাস্তা।
আরহাম এক হাতে পাস্তার বাটি আলিশার দিকে এগিয়ে দিলো।
“ধর, খেয়ে আমায় উদ্ধার কর। আমার ঘুম পেয়েছে অনেক।”
আলিশা পেটে হাত বুলাতে বুলাতে আবদার জুরে বসলো –
“খাইয়ে দাও আমাকে।”
আরহাম বিনা বাক্য স্পুনে পাস্তা তুলে আলিশার মুখের দিকে এগিয়ে দিলো।
“উম, মজা হয়েছে…”
“মজা তো হবেই ; দেখতে হবে না কে বানিয়েছে?”
“আমার গন্ডার বানিয়েছে…”
“আবার গন্ডার বলেছিস? যা দিবোনা তোকে আর।”
“আচ্ছা আর বলবোনা, নাও খাইয়ে দাও আর তুমিও খাও।”
“আমি খাবোনা।”
“তুমি না খেলে বাবু রাগ করবে ; আমাকে বলবে মাম্মা তার পাপাকে না দিয়েই সব খেয়ে ফেলেছে।”
কথাটি বলেই আলিশা নিজে আরহামের মুখের সামনে পাস্তা তুলে ধরলো।
–খাওয়ার সময় আলিশার ঠোঁটের কোনে পাস্তা সস লেগে ছড়িয়ে গেছে। দেখতে একদম বাচ্চাদের মতো লাগছে।
“এখনো বাচ্চাদের মতো খেয়ে চলেছিস? মুখের চারিপাশে কি হাল করেছিস এসব?”
“মুছে দাও তুমি।”
–আলিশাকে তখন বড্ড কিউট লাগছিলো। তার পড়নের লাল গোল ফ্রক, লম্বা চুলে বেনী বাধা। যেন একদম ছোট্ট কোনো পুতুল। হ্যাঁ, তাইতো আরহামের পুতুল।
“কি হলো? দাও মুছে…”
–আরহাম টিস্যু দিয়ে না মুছে আচমকা আলিশার ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে নিলো।
আলিশা প্রথমে একটু অবাক হলেও পরে সে নিজেই আরহামের গলা জড়িয়ে তাতে সায় দিলো।
দুজন দুজনাতে এতটায় মত্ত ছিলো যাতে তারা ভুলেই বসেছে যে তারা বর্তমানে কিচেনে রয়েছে।
–হঠাৎ কিছু ভাঙার শব্দ কানে এসে ঠেকতেই দুজনের ঠোঁটজোড়া আপনা-আপনি আলাদা হয়ে গেলো। দুজন একসাথে পিছে তাকাতেই দেখতে পেলো – ইজাজ সাহেবের হাত থেকে পানির গ্লাস নিচে পড়ে গিয়েছে। উনার দৃষ্টি নত হয়ে আছে। কেমন যেন হাসফাস করছেন তিনি।
-এতরাতে ইজাজ সাহেবকে এখানে দেখতে পেয়ে, তারা একজন আরেকজনের কাছ থেকে ছিটকে দূরে সরে গেলো।
–লজ্জায় যেন তারা তিনজন মাটিতে মিশে যাচ্ছিলো। কেউ কারোর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছেনা।
ইজাজ সাহেব জড়ানো শব্দে কোনোমতে আওড়ালেন –
“ওই.. মানে..ওই পা..পানি নিতে এসেছিলাম” বলেই উল্টো পথে হতদন্ত পায়ে ফেরত গেলেন তিনি।
–আরহাম-আলিশাও তাড়াতাড়ি করে নিজেদের রুমে চলে গেলো।
ইজাজ সাহেবকে হতদন্ত করে ঘরে ফিরতে দেখে শাইনা বেগম বললেন –
“কি হলো পানি খেলেন?”
“হ্যাঁ”
“আপনাকে এমন লাগছে কেন? যেন চুড়ি করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন।”
“বাড়তি কথা না বলে ঘুমাও। আর শুনো? আজকের পর থেকে রুমেই পানি এনে রাখবে। যাতে মধ্যেরাতে আমাদের কারও বাইরে বের হওয়া না লাগে।”
“পানি তো ঘরেই থাকে সবসময়। কেবল আজকেই ছিলোনা। মিনু (মেইড) বোধহয় খেয়াল করেনি।”
“তবুও এবার থেকে এসব বিষয়ে খেয়াল রাখবে। আর তুমিও রাত-বিরেতে রুম থেকে বের হবেনা।”
“কি আবোলতাবোল বলছেন আপনি এসব?”
ইজাজ সাহেব কোনো জবাব না করে শুতে শুতে বিড়বিড় করে আওড়াচ্ছেন –
“আজকালকার বাচ্চারা বড়ই নির্লজ্জ ; এরা স্থান কাল কিছুই দেখেনা।”
“কি বিড়বিড় করছেন?”
“কিছুনা, ঘুমাও।”
“আপনিও ঘুমান।”
আরহাম-আলিশা দুজনেই লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। কি হয়ে গেলো এটা?
“সব তোমার জন্য হয়েছে। কে বলেছিলো কিচেনে ওইসব করতে? এখন আমি বড় বাবার সামনে কেমনে যাবো?”
“সব এখন আমার দোষ? তোর এত রাতে ক্ষিদে পেয়েছে কেন? সব দোষ তোর।”
“আমার না তোমার বাবুর ক্ষিদে পেয়েছিলো।”
“সব দোষ এখন আমার অবুঝ বাচ্চার উপর দিচ্ছিস?”
তোমার আমার গল্প পর্ব ৯
“কারন সে বাপের মতোই বজ্জাত হয়েছে। সব সময় আমাকে বিপদে ফেলে।”
“তবে রে…দাড়া তুই আজকে।” বলেই বালিশ ছুড়ে মারলো আলিশার দিকে।
আলিশা সেটা ক্যাচ করে আবার ছুড়ে মারলো আরহামের দিকে। আবার শুরু হলো এদের ঝগড়া!
–এভাবেই আনন্দ খুনশুটিতে পেড়িয়ে গেলো আরও একটি মাস।
