Home তোমার আমার গল্প তোমার আমার গল্প পর্ব ৯

তোমার আমার গল্প পর্ব ৯

তোমার আমার গল্প পর্ব ৯
noorayn

আরহাম সন্ধ্যা নাগাদ বাড়িতে ফিরলে দেখতে পায় তার রুমের কোথাও আলিশা নেই তবে এটা নিয়ে সে তেমন একটা মাথা ঘামালোনা ; এই মেয়ে কবে কোথায় থাকে তা বলা যায়না। পরে দেখা যাবে, ডাইনিং টেবিলের উপর উঠে বসে বসে চিপস খাচ্ছে। তাই আরহাম এতকিছু না ভেবে ফ্রেশ হয়ে এলো।
–বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পরেও আলিশার কোনো দেখা নেই। আরহামের বেশ বিরক্ত লাগছে ; তার এখন কফি লাগবে। সে বিরক্তি নিয়ে উঠে চলে গেলো কিচেনের দিকে।
সারাদিন অনেক কাজ ছিলো তার; মাথাটা ধরে গেছে।
–আরহাম কিচেনে গিয়ে দেখলো – শাইনা বেগম থমথমে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে সবজি কাটছেন। মুখে কোনো হাসি নেই। আজ মায়ের পাশে ছোট মা ও নেই? ব্যাপার কি?
“কি হয়েছে মা? মুখটা এমন বেজার করে রেখেছো কেন?”
“কিছু হয়নি। তুমি এখানে কেন? কিছু লাগবে?”
“হুম, কফি লাগবে।”

“অপেক্ষা করো, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”
আরহাম কফির অপেক্ষা করতে করতে কিচেন ক্যাবিনেটের উপর বসে পা দোলাতে লাগলো একমনে।
“লিশা কোথায়? আসার পর থেকে দেখিনি।”
“তোমার দাদির রুমে হবে। সেখানেই কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে। জ্বর এসেছে বোধহয়।”
আরহামের শান্ত মুখটায় মুহুর্তেই চিন্তা এসে হানা দিলো।
“জ্বর এসেছে! বিকেলেই না ঠিক ছিলো? আর কান্না করেছে কেন?”
শাইনা বেগম বেশ থমথমে মুখে জবাব দিলেন –
“বিকেলে তো আর মার খায়নি তাই জ্বরও আসেনি।”
মায়ের এতো ঘুড়িয়ে পেঁচিয়ে কথা শুনে আরহামের বিরক্তির মাত্রা যেন আগের চেয়ে বাড়লো।
“মা প্লিজ, সোজাসাপ্টা বলবে কি হয়েছে?”
“আয়শা আজও পুতুলের গায়ে হাত তুলেছে ; এবার বেশ জোড়েই মেরেছে। মেয়েটা আরেকটুর জন্য পিছে পড়তে নিয়েছিলো তবে আমি সঠিক সময়ে চলে আসায় রক্ষা হয়েছে নয়তো আজ কোনো বড় দূর্ঘটনা হতে পারতো।
কথা শেষ করতেই শাইনা বেগমের চোখ ছলছল করে উঠলো। অন্যদিকে আরহাম রাগে কাঁপছে।

“কেন মেরেছে?”
–ছেলেকে বলার কোনো শব্দ এবার খুজে পায়নি শাইনা। মা হয়ে কি ছেলেকে সব কথা বলা সাজে?
“চুপ করে থেকোনা, মা। কি হয়েছে বলো? কি করেছে লিশা?”
“আমি বিস্তারিত জানিনা। তুমি বরং পুতুল থেকেই জেনে নিও।”
কথা বলতে বলতে শাইনা হাতে থাকা কফির মগ আরহামের দিকে এগিয়ে দিলে সে রাগে গজগজ করতে করতে কফি না নিয়েই চলে যায়।

আরহাম তার দাদির কামরায় গিয়ে দেখলো আলিশা গভীর ঘুমে মগ্ন। আশেপাশে তাকিয়ে কোথাও মেহরোজা আক্তারকে দেখতে পায়নি ; হয়তো নামাজের রুমে আছেন।
আরহাম ধীরে সুস্থে আলিশার পাশে বসে তার কঁপালে আলতো ঠোঁটের স্পর্শ আঁকলো তারপর ডান গালে যেখানে পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট। মেয়েটার শরীর বেজায় গরম হয়ে আসছে। সে আর দেরি না করে আলিশাকে সতপর্নে কোলে নিয়ে নিজেদের কামরায় ফিরে আসলো।
–নিজেদের কামরায় ফিরে আলিশাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তাকে ভালোভাবে কমফোর্টার দিয়ে ঢেকে দিলো। অপেক্ষা করতে লাগলো আলিশার জেগে উঠার। কোনো কিছু বলা বা করার আগে সবটা জানতে হবে ; কি কারনে এই অবস্থায় ছোট মা নিজের অন্তসত্বা মেয়ের গায়ে হাত উঠিয়েছে সেটা তার জানতে হবে।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর…

আলিশার ঘুম অনেকটা হালকা হয়ে এসেছে তবে মাথাটা কেমন ভার ভার লাগছে। তার মস্তিষ্ক সচল হলে, সে বুঝতে পারে তাকে কেউ বাহুবন্ধনে আগলে রেখেছে। আলিশার বুঝতে বাকি নেই এটা কে ; যার বুকের সাথে লেপ্টে প্রতিটা রাত কাটে তার শরীরের ঘ্রান চিনতে কি ভুল হতে পারে?
তবে একটু আগেই মায়ের বলা কথা মনে পড়তেই আলিশা লাফিয়ে উঠে গেলো আরহামের বুক থেকে।
“লিশা…আস্তে। এভাবে লাফাচ্ছিস কেন?”
“আমাকে এখানে এনেছো কেন? আমি তো দাদির কাছে ছিলাম।”
“আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই এনেছি। তুই আমাদের কামরা ছেড়ে ওখানে ঘুমিয়েছিস কেন?”
“আমি এখানে থাকবোনা।”
“তবে কোথায় থাকবি?”
“আমার রুমে।”
“এটা কার রুম?”
“তোমার।”

“তোর না? তাহলে তোর সব জিনিসপত্র এখানে কেন? সব ফেলে দেই?”
“না, এমন কিছুই করবেনা তুমি।”
“করবো। পারলে রুখে দেখা।”
“আমি যাচ্ছি।”
আলিশা চলে যেতে নিলে আরহাম তার হাত আঁকড়ে রাখে।
“এই দাড়া…কি হয়েছে এমন করছিস কেন?”
–কোনো রেসপন্স নেই।
“কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি?”
আলিশা ভয়ে ভয়ে জবাব দিলো –
“আমি এখানে থাকলে মাম্মা অনেক রাগ করবে।”
আলিশার কথা শুনে আরহামের ভ্রুকুটি কুঁচকে গেলো।
“ছোট মা রাগ করবে কেন? আমি কি পরপুরুষ যার সাথে থাকলে তোর মা রাগ করবে?”
“আমি জানিনা। আমায় ছাড়ো, আমি যাবো।”
“আগে সব খুলে বল। আজ কি হয়েছে? ছোট মা কেন মেরেছে তোকে?”
“সব তোমার জন্য হয়েছে।”
“আমার জন্য মানে? আমি তো বাড়িতে ছিলামই না।”

“হ্যাঁ, তোমার জন্যই হয়েছে সব। কালরাতে কত করে মানা করেছিলাম আমার কাছে আসতে। তুমি শুনোনি বলেই আজ আমার মার খেতে হয়েছে।”
“আমাদের কাছে আসার সাথে এসবের সম্পর্ক কি?”
“ডাক্তার সব বলে দিয়েছে মাম্মাকে। এইজন্যই মাম্মা আমাকে এত বকেছে সাথে মেরেছেও।”
“হোয়াটটট! কি বলেছে ছোট মাকে?”
“তা আমি জানিনা। তবে যাই বলেছে তাতে মাম্মা অনেক রেগে গিয়েছে। আমাকে অনেক বকা দিয়েছে আর বলেছে আজ থেকে যাতে তোমার সাথে এক কামরায় না থাকি। যদি মাম্মার কথা অমান্য করেছি তবে নাকি তার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।”

“তুই কিছু বলিস নি?”
“বলেছি তো। আমি সব শুনে বলেছি ; আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবোনা আর…”
আলিশা কথা শেষ করার আগেই ফোপাঁচ্ছে।
“আর কি?”
“আমি যখন বলেছি তোমায় ছাড়া থাকবোনা তখন মাম্মা রেগে গিয়ে আমায় থাপ্পড় মেরেছে। এই দেখো আমার গাল লাল হয়ে আছে…”
–সব শুনে আরহাম যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো।
ইতিমধ্যে, আলিশা আরহামের বুকে মুখ গুজে গুনগুনিয়ে কান্না করছে।
–আরহাম কিছু বলছেনা।
“আমি এখন যাই। মাম্মা আমাকে এখানে দেখলে অনেক বকবে।”
“কোথাও যাবিনা তুই। চুপচাপ এখানে থাক।”
“কিন্তু মাম্মা?”
“আমি দেখে নিবো। তুই এখন ফ্রেশ হয়ে এসে কিছু খেয়ে নে। আমি খাবার পাঠাচ্ছি..”
কথা শেষে আরহাম দরজা লাগিয়ে চলে গেলো আয়শা বেগমের কাছে।

আয়শা রকিং চেয়ারে বসে আছে কপালে হাত দিয়ে; মনটা বড্ড অশান্ত হয়ে আছে। মা হয়ে নিজের সন্তানকে মেরে তিনি কিছুতেই ঠিক থাকতে পারছেন না। আলিশা তার বড্ড শখের সন্তান। একেতো মেয়ের এত অল্প বয়সে বিয়ে নিয়েই উনার বেশ আপত্তি ছিলো তার ওপর এখন আবার প্রেগন্যান্সি! সব মিলিয়ে মা হয়ে তিনি আলিশার আগাম জীবন নিয়ে বেশ চিন্তিত।
–আয়শার ধ্যান ভঙ্গ হলো দরজার শব্দে….
–ঠক ঠক…
“কে?”
“আমি..আরহাম।”
আয়শা নিজেকে সামলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দিলেন।
“এসো বাবা।”
আরহাম ভেতরে প্রবেশ করেই সোজাসাপ্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলো –
“লিশাকে মেরেছো কেন?”
–নো রেসপন্স…

“ছোট মা? কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি?”
“আমি আমার মেয়েকে কেন মেরেছি তার কৈফিয়ত কি আমার এখন তোমাকে দিতে হবে?”
“অবশ্যই দিতে হবে। তুমি যাকে মেরেছো ; সে আমার বউ।”
“বিয়েটা মেনে নিয়েছো আদৌ? বিয়ের মানেও বুঝো তুমি?”
“আমি বিয়ে মানলেও সে আমার বউ আবার না মানলেও সে আমার বউ; এবং আমি কাউকে অধিকার দেইনি আমার বউয়ের গায়ে হাত তোলার। তবে তুমি এই নিয়ে দ্বিতীয়বার আমার বউয়ের গায়ে হাত তুলেছো!”
“নিজের সীমানা অতিক্রম করোনা আরহাম। ভুলে যেওনা, তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছো?”
“নিজের সীমানা আমি জানি এবং আমার জানা মতে, আমি কোনোদিন তা অতিক্রম করিনি।”
আরহাম এবার আয়শার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে আবারও বললো –
“তুমি তো আমার ফ্রেন্ডের মতো ছিলে ছোট মা। আমি সবসময় সবকিছু তোমার সাথে শেয়ার করতাম। তবে আমি খেয়াল করছি, আলিশার প্রেগন্যান্সির পর থেকেই তুমি কেমন দূরে দূরে থাকছো? এর কারন কি? এই ছোট মাকে তো আমি চিনিনা!”

“এখনো, ছোট মানুষ আছো তাই সেভাবেই আচরন করো আরহাম।”
“লিশাকে মারার কারন কি আমি জানতে পারি?”
“আমি ওর মা। আমার থেকে বেশি ভালো ওকে কেউ বাসবেনা। তবে, এই মেয়ে বারবার এমন কিছু করে যা ; আমাকে হাত তুলতে বাধ্য করে।”
“এবার কি করেছে?”
“তা আলিশাকে গিয়েই জিজ্ঞেস করো।”
“ওকে আমার সাথে থাকতে কেন মানা করেছো?”
আয়শা বেগম একটু ইস্তগেত করলেও শক্ত কন্ঠে জবাব দিলেন,
“কারন এখন তোমাদের একসাথে থাকা ঠিক নয়।”
“সেটা বলার তুমি কেউ না।”
“আরহাম…”

“অনেক হয়েছে আর না। আমার বউ কোথায় থাকবে না থাকবে সেটা দেখার জন্য আমি রয়েছি। তোমাদের এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।”
“হ্যাঁ, এখন তো আমিই খারাপ। তুমি, তোমার দাদি সবাই আমাকেই খারাপ বলবে। কারন আমি ওকে মেরেছি। তবে একবারও কি ভেবে দেখেছো যে ; ওকে মারার পর আমার কতটা কষ্ট হয়?”
আরহামের কাছে এর কোনো উত্তর নেই। সে কিছু না বলে প্রস্থান করলো সেখান থেকে।

আলিশা আরহামের হাঁটুর উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে।
আরহাম আলতো হাতে তার চুল টেনে দিচ্ছে।
“লিশা, কিছু খাবি? নিয়ে আসবো?”
“না…”
“অনেকক্ষন ধরে না খেয়ে আছিস। এতে বাবুর কষ্ট হবে। আমি কিছু নিয়ে আসি?”
“মাম্মাকে কি বলেছো?”
“এসব তোর জানার বিষয় নয়।”
“বলো।”
আরহাম প্রশ্ন এড়িয়ে শুধালো –
“খাবার আনছি, চুপচাপ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।”
আলিশা বুঝলো আরহাম এই ব্যাপারে কথা বলতে চাইচহেনা তাই সেও আর জোড় করলোনা।
“আচ্ছা, নিয়ে এসো।”
–আরহাম যখনই বেড থেকে উঠতে যাবে তখনই আলিশা তাকে থামিয়ে দিলো।
“দাঁড়াও…”
“কি হয়েছে?”

–আলিশা কিছু না বলেই আরহামের হাতটা নিজের পেটের উপর রাখলো।
“কিছু টের পাচ্ছো?”
আলিশার বাড়ন্ত পেটে হাত রাখতেই যেন আরহামের হাত শিথিল হয়ে গেলো। কিছু একটা নড়ছে কি? হ্যাঁ তাই তো, তাদের বাবু নড়ছে, তাদের অংশ, তাদের অস্তিত্ব…
–আরহাম ঝুকে আলিশার গোল ফ্রকটা পেটের উপর তুলে ধরলো। সেখানে হাত রেখে যেন কিছু অনুভব করার চেষ্টা করছে সে।

তোমার আমার গল্প পর্ব ৮

“কি করছো?”
আরহাম কিছু না বলেই আলিশার বাড়ন্ত উদরে চুমু দিলো।
“চুপ থাক। দেখতে দে…”
–বাবার হাতের স্পর্শ পেয়েই যেন ছোট্ট প্রানটি আবার নড়ে উঠলো। যেন সে তার বাবার আদরের উত্তর দিচ্ছে…

তোমার আমার গল্প পর্ব ১০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here