ইশকে এ নিকাহ পর্ব ৩
লাইরা আয়নাত
আয়াজ তীক্ষ্ণ, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইনায়াতকে ধমকে ওঠে, “হোয়াট দ্য হেল! তোমার স্পর্ধা তো কম নয়! আমার সাথে মজা করে এমন অ্যাবসার্ড প্রশ্ন করছ তুমি?”
আয়াজের এই ক্রোধ ইনায়াতের গায়ে আঁচড়টুকুও কাটতে পারল না। সে আগের মতোই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, চেহারায় বিন্দুমাত্র ভাবান্তর নেই। অত্যন্ত সিরিয়াস এক্সপ্রেশন নিয়ে, চোখের পলক না ফেলেই সে শান্ত স্বরে বলে, “আমি মোটেই জোক করছি না, স্যার। এই কন্ট্রাক্টের এত হাইলি পার্সোনাল ক্লজগুলো দেখে আমার মনে হলো, আপনি হয়তো ‘গে’।”
কথাটা শোনামাত্রই অপমানে আর রাগে আয়াজের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। গলার রগগুলো সামান্য ফুলে ওঠে তার। ও দাঁত চেপে, প্রায় হিসহিস করে বলে ওঠে, “তোমার মতো মেয়ে যাতে আমার ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে না পারে, সেজন্যই কন্ট্রাক্টে এত স্ট্রিক্ট রুলস রেখেছি আমি! আর তুমি আমার ম্যাসকুলিনিটি নিয়ে ডাউট করছ? আজ রাতে যদি তোমার সাথে বাসর করি, তবে এক বছর ঘোরার আগেই তুমি তিন বাচ্চার মা হয়ে যাবে!”
আয়াজের এই পুরুষতান্ত্রিক আস্ফালন ইনায়াতকে বিন্দুমাত্র ভীত করার বদলে উল্টো চরম বিরক্ত করে। সে একরাশ অবজ্ঞায় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। গলার স্বরে শীতলতা এনে বলে, “এক্সকিউজ মি, স্যার! আমি শুধু লজিক্যালি জানতে চেয়েছিলাম। তাছাড়া বায়োলজিক্যালি এক বছরে কেউ তিনটা বেবি ডেলিভার করতে পারে না। একজন হাই-প্রোফাইল প্রফেসর হয়ে আপনার মুখে অন্তত এমন ইলজিক্যাল কথা মানায় না, তা-ও আবার আমার মতো একজন ‘ক্লাসহীন’ মেয়ের সামনে।”
কথাগুলো কোনো রাখঢাক ছাড়াই সোজাসাপটা ছুড়ে দিয়ে ইনায়াত আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না সেখানে। আয়াজকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে হাঁটা দেয়। একজন সাধারণ মেয়ের মুখের ওপর দেখানো এমন কোল্ড এটিটিউড আয়াজের মতো মানুষের পক্ষে টলারেট করা অকল্পনীয় হয়ে দাঁড়ায়। ইনায়াতের এই স্পর্ধা তার আকাশচুম্বী ইগোতে হাতুড়ি দিয়ে মারাত্মক আঘাত করে। সে রাগে ক্ষোভে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে হিসহিস করে বলে ওঠে, “তুমি কি আমাকে তোমার ইগো দেখাচ্ছ, ইনায়াত? ডেয়ার নট! এমন দুঃসাহস ভুলেও কোরো না।”
ইনায়াত হাঁটার গতি কমিয়ে দিয়ে দাঁড়ায়। ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে আয়াজের দিকে তাকায় সে। চোখের পাতা দু-একবার নেড়ে ভাবলেশহীন কণ্ঠে তাকে বলে, “স্যার, আপনাদের মতো এলিট রয়্যালদের কি আর আমাদের মতো অর্ডিনারি মানুষ ইগো দেখাতে পারে? আমি তো শুধু নিজের জায়গায় ঠিক আছি।”
কথাটার কোনো যুতসই কাউন্টার রিপ্লাই আয়াজের মাথায় এল না। একবুক অস্বস্তি আর ক্রোধ চেপে সে অন্যদিকে ঘুরে লম্বা পায়ে হেঁটে সোজা ব্যালকনিতে চলে যায়। ব্যালকনির রেলিং চেপে ধরে সে গভীরভাবে ভাবতে থাকে সত্যিই তো, ইনায়াত তো নিজের জায়গায় একদম ঠিক। আয়াজ তো ভেবেছিল, আর দশটা মেয়ের মতো ইনায়াতও হয়তো তার সম্পদ আর স্ট্যাটাস দেখে তাকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করবে অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য করলে হার্ট হয়ে কাঁদবে, ভেঙে পড়বে। কিন্তু এই মেয়ের তো কোনো রিয়্যাকশনই নেই! তার মানসিক দৃঢ়তার কোনো দেওয়ালই আয়াজ ভাঙতে পারছে না। মেয়েটা এমন কেন?
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সন্ধ্যা সাতটা। লর্ড অ্যাশ পরিবারের গ্র্যান্ড লিভিং রুমে এক জমকালো পরিবেশ বিরাজ করছে। চারপাশের চোখ ধাঁধান রয়্যালিটি মাঝেই এই পরিবারের সদস্যরা একে একে সবাই উপস্থিত আছেন। চলুন, এই আ্যাশ পরিবারের সমীকরণটা একটু গভীরভাবে মিলিয়ে নেওয়া যাক।
আয়াজের বাবা, মিস্টার লর্ড কেনিথ অ্যাশ। ভাইদের মধ্যে তিনি সবার বড় এবং পরিবারের প্রধান। উনার স্ত্রী, লেডি আয়রা অ্যাশ। এই দম্পতির বড় সন্তান একত্রিশ বছর বয়সী আয়াজ। আয়াজের জন্মের এক দীর্ঘ সময় পর উনারা আজওয়াকে জন্ম দেন। মূলত এই কারণেই ভাই-বোনের মাঝে বয়সের এতো হিউজ ডিফারেন্স। বিশ বছর বয়সী আজওয়া বর্তমানে দেশের বাইরে, ফিনল্যান্ডে অবস্থান করছে। আয়াজের সেকেন্ড আঙ্কেল মিস্টার কায়রান অ্যাশ এবং উনার স্ত্রী মিসেস লুইসা। এই দম্পতির সংসার এক ছেলে এবং তিন মেয়েকে ঘিরে। বড় ছেলে আইভান অ্যাশ বয়স উনত্রিশ। আর মেয়েদের মধ্যে লারার বয়স চব্বিশ, থিয়ার বাইশ এবং পরিবারের অন্যতম ছোট সদস্য লেক্সির বয়স আঠারো। আয়াজের থার্ড আঙ্কেল, মিস্টার এডওয়ার্ড আর উনার স্ত্রী মিসেস রুবি। উনাদের সংসারে রয়েছে দুই ছেলে আর দুই মেয়ে। ছেলেদের মাঝে ঊনত্রিশ বছর বয়সী আইজ্যাক আর সাতাশ বছর বয়সী এরিক। মেয়েদের মধ্যে একুশ বছরের ফেইথ এবং উনিশ বছরের ইনেস।
আর হ্যাঁ, ইনায়াত এর পুরো নাম হলো ফ্লোরেন্স ইনায়াত।
ইনায়াত ট্রে হাতে সবাইকে কফি সার্ভ করছে। এটাই এই ফ্যামিলির নিয়ম নতুন বউকে নিজের হাতে কফি বা কোনো স্পেশাল ডিশ বানিয়ে সবাইকে সার্ভ করতে হয়। ইনায়াতও একদম রোবটের মতো সেই ডিউটি পালন করছে। কে কেমন ফ্লেভার পছন্দ করে, সেই ডিমান্ড অনুযায়ী কফি বানিয়ে সবার হাতে হাতে তুলে দিচ্ছে সে। যদিও এই বাড়ির কেউই তাকে খুব একটা পছন্দ করে না, সবার চোখেই একটা জাজমেন্টাল লুক, তবুও ফরমালিটি মেইনটেইন করে কফিটা সবাই রিসিভ করছে।
আয়াজ একদম রিল্যাক্সড মুডে কাউচের মাঝখানে বসে আছে, তার একপাশে থিয়া আর অন্যপাশে ফেইথ। আয়াজের এই প্লেবয় টাইপ পজিশন আর অ্যাটিটিউড দেখে ইনায়াতের ভেতরে তাচ্ছিল্যের একটা হাসি তৈরি হয়। “তাহলে এর ক্যারেক্টারেই মেইন প্রবলেম!” সে মনে মনে বিড়বিড় করে, “ঠিক এই রিজনটার জন্যই ফ্রেয়া নামের ওই কালসাপটা নিজে সেফলি স্কিপ করে আমাকে এই টক্সিক সিচুয়েশনে ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে।”
কথাটা ভেবে তপ্ত একটা শ্বাস ছাড়ে ইনায়াত। ফেইথ আর আয়াজের হাতে কফির মগ দুটো হ্যান্ডওভার করে সে যখন থিয়ার দিকে এগোয়, ঠিক তখনই ঘটে ইনসিডেন্টটা। থিয়া ইচ্ছে করেই ইনায়াতের হাতের ওপর পুরো বয়েলিং হট কফির মগটা উল্টে দেয়। ধোঁয়া ওঠা ফুটন্ত কফি সরাসরি ইনায়াতের ফর্সা হাতের চামড়ার ওপর আছড়ে পড়ে।
আয়াজ আর ফেইথ সিচুয়েশনের আকস্মিকতায় সাথে সাথে বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এত সিভিয়র একটা বার্ন হওয়ার পরও ইনায়াতের ফেসাল এক্সপ্রেশন একটুও চেঞ্জ হয় না, তার মুখ থেকে সামান্য ‘উহ্’ সাউন্ডও বের হয় না। সে একদম স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
থিয়া একটা ফেক প্যানিক ক্রিয়েট করে ওভারঅ্যাক্টিংয়ের সাথে উঠে দাঁড়ায়, “ওহ মাই গড! আই অ্যাম সো সরি! আমি আসলে একদম নোটিশ করিনি। তোমার ড্রেসটা পুরো স্পয়েল হয়ে গেল, সাথে হাতটাও তো বার্ন হয়ে গেল!”
সেই টকটকে লাল হয়ে যাওয়া, ফোস্কা পড়ার উপক্রম হওয়া হাত দিয়েই ইনায়াত ট্রে থেকে আরেকটা ফ্রেশ মগ থিয়ার হাতে ধরিয়ে দেয়। মুখে একটা পারফেক্ট ফেক স্মাইল ঝুলিয়ে সে খুব ক্যাজুয়ালি আই কন্ট্যাক্ট করে বলে, “ইটস ওকে, এটা খুব মাইনর একটা ব্যাপার। তোমার তো কোথাও হার্ট হয়নি? দ্যাটস ইট। তুমি কফি এনজয় করো, আমি ড্রেসটা চেঞ্জ করে আসছি।”
এ কথা বলে ইনায়াত জাস্ট টার্ন করতেই থিয়ার মা মিসেস লুইসা একটু ফরমালিটি দেখিয়ে বলে ওঠেন, “থিয়া, একটু কেয়ারফুলি হ্যান্ডেল করবে তো! মেয়েটার হাতটা তো ব্যাডলি বার্ন হয়ে গেল মনে হচ্ছে।”
পুরো ইনসিডেন্টটা আয়াজ খুব ক্লোজলি নোটিশ করেছে। থিয়া যে কতটা ইনটেনশনালি কাজটা করেছে, সেটা তার শার্প চোখ এড়ায়নি। সে নিজের চোখেই দেখেছে গরম কফিতে ইনায়াতের হাতের চামড়া উঠে যাওয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দৃশ্যটা দেখে তার নিজের ভেতরেও একটা গিল্ট ফিল হয়, বুকের ভেতরটা একটু হলেও ছ্যাঁত করে ওঠে। কিন্তু নিজের ইগো স্যাটিসফাই করতে আর ইনায়াতকে মেন্টালি হার্ট করার ইনটেনশন থেকে সে বলে ওঠে, “আরে জাস্ট ইগনোর ইট আন্টি! সামান্য হাতই তো পুড়েছে। থিয়া মিসেসের মেয়ে, ওর অন্তত এতটুকু করার রাইট বা প্রিভিলেজ তো এই বাড়িতে আছেই।”
এই কথাগুলো ইনায়াতের ব্রেনে একটুও হিট করে না। সে একদম সাইলেন্টলি, এক্সপ্রেশনলেস ফেস নিয়ে নিজের রুমে চলে যায় । রুমে গিয়ে ড্রেসটা চেঞ্জ করে একটা ডার্ক টি-শার্ট আর কমফোর্টেবল ট্রাউজার পরে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পোড়া হাতটা একবার দেখে সে। এই সামান্য বার্ন তার কাছে লিটারেলি একটা জোক। আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনিংয়ের সেই ডার্ক ডেইজগুলোর কথা মনে পড়ে তার। যখন চাবুক দিয়ে স্কিন ছিঁড়ে সেখানে কাঁচা লবণ ঘষে দেওয়া হতো, যাতে এক্সট্রিম পেইন টলারেন্স বাড়ে। এনিমি ক্যাম্পে ধরা পড়লে যাতো যেকোনো ব্রুটাল টর্চার সহ্য করার ক্যাপাসিটি থাকে। তার কাছে এই কফির ছ্যাঁকা তো নথিং! ফোনটা হাতে নিয়ে ইনায়াত নাভিদকে টেক্সট করে, “আমি কিছু করতে চাই।”
উইদিন সেকেন্ডস ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসে, “গো অ্যাহেড, যা ইচ্ছে কর।”
মেসেজটা স্ক্রিনে দেখেই ইনায়াতের ঠোঁটের কোণে একটা ডেডলি স্মাইল ফুটে ওঠে। ঠিক তখনই রুমে আয়াজের প্রবেশ করে। আয়াজের উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই ইনায়াত তার ইমোশন হাইড করে একদম প্রফেশনাল আর গম্ভীর হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
আয়াজের চোখ পড়ে গিয়ে সরাসরি ইনায়াতের হাতের ওপর। সে লিটারেলি শকড! পুরো হাতটা এখনো টকটকে লাল হয়ে আছে, স্কিন ড্যামেজ স্পষ্ট। ও কি একটু ঠান্ডা পানিও হাতে দেয়নি? কোনো বার্ন-অয়েন্টমেন্ট বা মেডিসিন অ্যাপ্লাই করেনি? এই মেয়েটার বডিতে কি কোনো পেইন-রিসেপ্টর নেই?
আয়াজ আস্তে আস্তে ইনায়াতের দিকে এগোয়। কনফিউজড টোনে জিজ্ঞেস করে, “এই, তোমার হাতে কি সিরিয়াসলি কোনো পেইন হচ্ছে না? এখনো কিছু লাগাওনি কেন?”
কথাটা শুনে ইনায়াত তাচ্ছিল্যের একটা শান্ত হাসি দেয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জাস্ট একটা ওয়ার্ডে একদম ক্যাজুয়ালি রিপ্লাই করে, “লাগব।”
ওকে এভাবে ডেমকেয়ার অ্যাটিটিউডে হাসতে দেখে আয়াজ টোটালি স্পিচলেস হয়ে যায়। সে এক্সপেক্ট করেছিল, ইনায়াত হয়তো অন্তত এখন ফেটে পড়বে। রেগে গিয়ে বলবে, “আপনি কী করে থিয়ার পক্ষে কথা বলতে পারলেন? আপনি তো সত্যিটা নিজের চোখেই দেখেছিলেন!” কিন্তু না, ইনায়াত এমন কিছুই করল না। তার এই ডেডলি সাইলেন্স আর কেয়ারলেস অ্যাটিটিউড আয়াজকে আরও বেশি কনফিউজড করে দেয়।
ইনায়াত জাস্ট একটা শর্ট রিপ্লাই দিয়ে একদম চুপ হয়ে যায়। আয়াজ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বেডসাইড ক্যাবিনেটটা খোলে। ভেতর থেকে একটা দামি অয়েন্টমেন্ট বের করে ইনায়াতের দিকে এগিয়ে দেয় সে। ওর চোখেমুখে স্পষ্ট একটা অ্যারোগ্যান্ট অ্যাটিটিউড, মনে হচ্ছে সে অনেক বড় কোনো ফেভার করছে। বেশ তাচ্ছিল্যের সাথেই সে বলে, “যদিও তোমার এই ইনজুরি নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, তারপরও নাও অয়েন্টমেন্টটা অ্যাপ্লাই করে নাও। পরে ইনফেকশন হলে আবার নতুন ড্রামা শুরু হবে।”
ইনায়াতের চোখের পলকও পড়ে না। একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে সে নিজের পকেট থেকে এক্সাক্টলি সেম ব্যান্ডের অয়েন্টমেন্টের একটা টিউব বের করে আয়াজের চোখের সামনে মেলে ধরে, “আমার কাছেও আছে। থ্যাংকস, বাট আমি নিজেই অ্যাপ্লাই করে নিতে পারব।”
আয়াজ রীতিমতো এমব্যারাসড ফিল করে। হাতটা মাঝপথেই আটকে যায় তার। হিরো সাজতে গিয়ে এই মেয়ের সামনে তাকে বারবার এভাবে ইনসাল্টেড হতে হচ্ছে! হোয়াট আ পেইন! নিজের ম্যাসকুলিন ইগোতে বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খায় সে। দাঁতে দাঁত চেপে সে হাতটা নামিয়ে নেয়।
ইনায়াত খুব ক্যাজুয়ালি টিউবের ক্যাপটা খুলে নিজের পোড়া ক্ষতের ওপর মেডিসিন লাগাতে শুরু করে। ক্ষতটা বেশ গভীর। আয়াজ তো লিটারেলি শকড হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে! এই কড়া মলমটা স্কিনে টাচ করলেই প্রচণ্ড জ্বালা হওয়ার কথা, অথচ ইনায়াতের ফেসাল এক্সপ্রেশনে বিন্দুমাত্র কোনো চেঞ্জ নেই। ওর কি একটুও পেইন হচ্ছে না? হোয়াট কাইন্ড অফ গার্ল ইজ শি! আয়াজ নিজের হাতের অয়েন্টমেন্টটা সশব্দে ক্যাবিনেটের ওপর রেখে দিয়ে বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করে, “এজন্যই বোধহয় বলে, দাসীকে কখনো কুইন-এর স্ট্যাটাস দিতে নেই! এরা কদর বোঝে না।”
“তো আপনাকে কে বলেছে সেই স্ট্যাটাস দিতে?” ইনায়াত এবার কথার উত্তর দেয় আয়াজ তো ঠিক এই মোমেন্টটার জন্যই ওয়েট করছে। সে ইনায়াতের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়, “একটু দয়া দেখাতে চেয়েছিলাম, বাট ট্রাস্ট মি, তুমি সেটার যোগ্যই নও!”
ইনায়াত এবারও কোনো রিঅ্যাকশন দেখায় না। একদম কোল্ড, রোবোটিক ভয়েসে সে বলে, “আপনি মহান, তাই দয়া দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু আপনার মতো হাই-ক্লাস মানুষের দয়া নেওয়ার মতো স্ট্রেংথ কি আমার আছে? অবভিয়াসলি নেই, তাই আমি নিইনি। ইটস দ্যাট সিম্পল।”
আয়াজ এবার কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে, “নিজের পজিশনটা তাহলে ভালোই বুঝতে পারছ দেখছি!”
“জি, অন্তত অতটুকু সেন্স আর রিয়্যালিটি চেক আমার আছে।”
আয়াজ আরও কিছু একটা বলতে যায়, ঠিক তখনই কোনো নক ছাড়াই থিয়ার কাজিন এভা রুমে প্রবেশ করে।যে কিনা আয়াজের বেশ ক্লোজ ফ্রেন্ড। এভা এসেই খুব এক্সাইটেড ওয়েতে ক্যাজুয়ালি আয়াজকে হাগ করে নেয়। উচ্ছ্বসিত হয়ে হাসতে হাসতে বলে, “হোয়াটস আপ হ্যান্ডসাম! কেমন আছিস তুই? শুনলাম বিয়েও করেছিস?”
আয়াজ বেশ আনকমফোর্টেবল ফিল করে। সে এভাকে পাল্টা হাগ করে না, বরং নিজের হাত দুটো আলতো করে ওর কাঁধে রেখে একটু দূরে সরিয়ে দেয়। নরমালি নিজের হাজব্যান্ডকে অন্য কোনো মেয়ের সাথে এতটা ফিজিক্যালি ক্লোজ হতে দেখলে যেকোনো মেয়েরই জেলাস হওয়ার কথা। কিন্তু ইনায়াত এই পুরো সিনারিওটা টোটালি ইগনোর করে। সে অবজ্ঞার সাথে জানালার বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, মনে হচ্ছে রুমে সে একদম একা। তখনি এভার নজর পড়ে ইনায়াতের দিকে “ওহ! এই তাহলে ইনায়াত? সেই কনকিউবাইন-এর মেয়ে?”
আয়াজ আড়চোখে ইনায়াতের এই ‘ডোন্ট কেয়ার’ অ্যাটিটিউডটা নোটিস করে। সে মনে মনে ভাবে, “কী ইগো এই মেয়ের! ওর হাজব্যান্ডের সাথে অন্য একটা মেয়ে এতটা ক্লোজ হচ্ছে, আর সে এমন ভাব করছে যেনো নাথিং হ্যাপেন্ড! ডাজ শি ইভেন কেয়ার?”
ইনায়াত এবার জানালার বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে ডিরেক্ট এভার দিকে তাকায়। তার আই-কন্ট্যাক্ট এতটাই শার্প যে এভা একটু হলেও থতমত খেয়ে যায়। ইনায়াত তীক্ষ্ণ গলায় বলে , “মিস এভা ওহ সরি, মিসেস অ্যাশি বলা উচিত আপনাকে। এনিওয়ে, আপনি বরং নিজের কথা বলার ম্যানারটা একটু ঠিক করুন। কনকিউবাইন-এর সন্তান বলে কি আমি মানুষ নই? আমার জন্ম তো ইল্লিগ্যাল কোনো ওয়েতে হয়নি যে আপনি আমার সামনে এমন চিপ ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজ করছেন। নেক্সট টাইম কথা বললে নিজের লিমিটে থেকে বলবেন।”
কথাগুলো শার্প অ্যারোর মতো থ্রো করেই ইনায়াত ঘুরে সোজা ব্যালকনির দিকে পা বাড়ায়। আয়াজ আর এভা দুজনেই স্তব্ধ হয়ে ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। আয়াজ একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে হাসে, “যাক, ফাইনালি এই ইমোশনলেস রোবটটা অন্তত কোনো রিয়্যাক্ট তো করল! সামথিং ইজ দেয়ার আন্ডার দ্যাট কোল্ড ফেস।”
( অতিরিক্ত ইংরেজি ইউজ করে ফেলেছি আগামী পর্বে এমন হবে না একটু ম্যানেজ করে নিয়েন প্লিজ )
সকাল দশটা। অ্যাশ ক্যাসেলের ড্রয়িংরুমে প্রলয়ংকরী ঝড় বইছে। থিয়া যে পেশায় নামজাদা গায়িকা, যার অহংকার আর নামডাকে চারপাশ মুখরিত তার ক্যারিয়ারের কফিনে আজ শেষ পেরেকটা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। রাত একটা থেকে শুরু হওয়া এই তাণ্ডব সকাল দশটায় এসে চরম আকার ধারণ করেছে। চারজন প্রভাবশালী ডিরেক্টর আর ম্যানেজারের সাথে তার গোপন, আপত্তিকর ছবিগুলো এখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। নিখুঁত পরিকল্পনায় কেউ এই নোংরামিগুলো ফাঁস করে দিয়েছে। বাইরে মিডিয়ার ফ্ল্যাশলাইট আর সাধারণ মানুষের ‘ছিঃ ছিঃ’ তে কান পাতা দায়।
নিচে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে থিয়া। পরিবারের মানুষদের ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে সে। রাগের বশে ইতিমধ্যেই তার গালে বসেছে সাত-আটটা কষানো চড়।
ইশকে এ নিকাহ পর্ব ২
অপমানে, আতঙ্কে থিয়ার মেকআপ গলে নামছে কান্না হয়ে। আর এই পুরো ধ্বংসযজ্ঞটা দোতলার করিডোর থেকে থেকে তৃপ্তিতে উপভোগ করছে ইনায়াত। তার ভঙ্গিটা একদম স্থির, পুড়ে যাওয়া হাতটা অবলীলায় রাখা রেলিংয়ের ওপর, হাতের আঙুলগুলো শিথিলভাবে শূন্যে ঝুলে আছে। বাঁ হাতটা আলতো করে চিবুকে ছোঁয়ানো। নিচে থিয়ার এই পতন, এই আর্তনাদ সবকিছু তার কাছে কোনো এক নিখুঁত থিয়েটারের দৃশ্য, আর সে নিজে তার একনিষ্ঠ দর্শক। ইনায়াতের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একবার নিচের থিয়ার ওপর থেকে সরে আসে নিজের ডান হাতের দিকে। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, ফিসফিসে ধারালো স্বরে সে নিজের মনেই বলে ওঠে, “আমায় পোড়ালে নিজেকেও যে ছাই হতে হবে, এটুকু তো জানা উচিত ছিল ডার্লিং তোমার।”
