Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৮

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৮

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৮
মেহজাবিন নাদিয়া

নওমির তীক্ষ্ণ আর কর্কশ কণ্ঠস্বর মৃধা নিবাসের বিশাল লিভিং রুমের ঝাড়বাতি গুলোকে এক মুহূর্তের জন্য কাঁপিয়ে তুলল। ওঁর চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি বের হচ্ছিল। নওমি নিজের পরনের কালো জর্জেট শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে সারিমের দিকে আরও এক কদম এগিয়ে এলো। ওঁর বুকটা অনবরত ওঠানামা করছে; কোনোভাবেই, কোনো অবস্থাতেই এই চরম সত্যটাকে মেনে নিতে পারছিল না ও।
“সারিম!”
নওমি আবার চিৎকার করে উঠল, ওঁর গলার স্বর এবার সপ্তমে চড়ে গেল।
“তুই এই পিচ্ছি মেয়েটার আড়ালে দাঁড়িয়ে কী ধরনের রসিকতা করছিস, বলবি আমাকে? এই নাবালিকা মেয়েটার পেছনে লুকিয়ে বলছিস ও তোর বউ? তুই কি আমাকে পাগল ভাবিস? ভাবিস আমি এত বড় একটা মিথ্যা নাটক বিশ্বাস করে নেব?”

সারিম অরির কাঁধের ওপর নিজের থুতনিটা হালকা একটু ঠেকিয়ে, ওঁর কানের লতিতে নিজের তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে অত্যন্ত নিরীহ ভঙ্গিতে বলল,
“দেখেছ বউ? ডাইনিটা আমাকে কীভাবে ধমকাচ্ছে! তুমি থাকতে ও আমাকে এসব বলার সাহস পায় কী করে? তুমি ওকে বলছ না কেন যে তুমি আমার বিবাহিত স্ত্রী, আমার অর্ধাঙ্গিনী!”
অরি চরম অস্বস্তি আর রাগে নিজের দাঁতে দাঁত চাপল। সারিমের চওড়া বুকের শক্ত বাঁধন ওঁর পিঠে স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছিল। ওঁর শরীর থেকে আসা তীব্র পারফিউম আর সেই পুরুষালি গায়ের সুবাস অরির মগজে এক ধরনের মাতাল করা অনুভূতি তৈরি করছিল, যা ও এই মুহূর্তে কোনোভাবেই চাইতে পারছিল না। শরীরটা একটু ঝাঁকিয়ে সারিমের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আপনি ছাড়ুন আমাকে! দয়া করে এই সস্তা নাটক বন্ধ করুন। নিজের ব্যক্তিগত ঝামেলা নিজে মেটান, আমাকে মাঝখানে টানবেন না!”

কিন্তু সারিম যেন আজ কোনো কথাই শুনবে না। ও অরির কোমরটা নিজের বাম হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নওমির দিকে তাকাল। মুখের সেই কৃত্রিম ভয়ের চাদরটা সরিয়ে দিতেই সেখানে এক ধরনের অবজ্ঞা আর শীতলতা ফুটে উঠল। সারিম অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,
“নওমি, নাটক আমি করছি না, করছিস তুই। আমার স্ত্রীর সামনে আমার সাথে এমন অসভ্য আচরণ করছিস, লজ্জা করছে না তোর?”
নওমি পাগলের মতো মাথা নাড়াতে লাগল। ওঁর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সেই জলের মধ্যেও কোনো অনুশোচনা ছিল না-ছিল এক তীব্র অধিকারবোধ আর পাগলামি। নওমি নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো খামচে ধরে বলল,
“না! এটা হতে পারে না! তুই অন্য কারো হতে পারিস না, সারিম! চার বছর ধরে আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছি। আমার বাবা তোর বাবার সাথে কথা বলেছিল একবার আমাদের বিয়ের ব্যাপার নিয়ে। আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল! এই সামান্য, কলেজের একটা মেয়ে কীভাবে তোর বউ হয়? ও তো একটা বাচ্চার মতো! ও তোকে কী দেবে? ও কখনো তোকে আমার মতো সুখ দিতে পারবে না। প্লিজ সারিম! এই মেয়েকে ছেড়ে দে তুই।”

নওমির এই উন্মাদের মতো আচরণ আর সারিমের জন্য ওঁর এই তীব্র ব্যাকুলতা, এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা আলভির বুকে তিরের মতো গিয়ে বিঁধল। আলভি নিজের ডান হাতটা শার্টের পকেটের ওপর রেখে এক গভীর ও দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওঁর সদ্য প্রস্ফুটিত ভালোবাসার ফুলটি যেন ফোটার আগেই ঝরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আলভি নওমির ওই চোখের জল, ওই লাল হয়ে যাওয়া মুখ আর অবাধ্য জেদটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“হাহ্ কপাল! কী মারাত্মক ভালোবাসা! এই মেয়ে তো বসের জন্য পুরো দুনিয়া জ্বালিয়ে দিতে পারে, অথচ বস ওরে পাত্তাই দিচ্ছে না! এদিকে আমি এর জন্য এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের কলিজা কয়লা করতেছি।এই জন্মে কি আমি এই জিদ্দি মেয়ের মনে একটুখানি জায়গা পাব? নাকি বসের উচ্ছিষ্ট প্রেম দেখাই আমার ভাগ্যে লেখা আছে?’

আলভির মনটা এক অজানা আশঙ্কায় আর কষ্টে হাহাকার করে উঠল। ও চাইল নওমিকে গিয়ে বলতে,
“ওগো কালো শাড়ি পরা রূপসী, তুমি ওই পাষাণ বসের আশা ছেড়ে দাও।বেডার বউ আছে অলরেডি।এই আলভি তোমার জন্য নিজের জান কোরবান দিতে রাজি আছে।’
কিন্তু বসের সেই ভয়ংকর রূপের কথা চিন্তা করে আলভি মুখে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না।
নওমি এবার অরির দিকে তর্জনী উঁচিয়ে প্রায় ওঁর গায়ের ওপর চড়াও হতে গেল,
“এই মেয়ে! তুই কোন সাহসে আমার সারিমের দিকে চোখ তুলে তাকাস? ও তোর কে হয়? টাকা আর ক্ষমতার লোভে তুই এই বয়সেই একজন মন্ত্রীর গলায় ঝুলে পড়েছিস, তাই না? লজ্জা করে না তোর?”
নওমির এই নোংরা আক্রমণ অরির আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত করল।অরি নিজের মুখটা শক্ত করে নওমির দিকে তাকানোর আগেই, সারিমের পুরো অবয়বটা এক সেকেন্ডের মধ্যে বদলে গেল। এতক্ষণের সেই কৌতুকময়, প্রেমিক পুরুষটি যেন এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল।
সারিম অরিকে নিজের পেছনে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে এক কদমে নওমির মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। এবং কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, লিভিং রুমের বাতাসে একটা তীব্র চড়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো-

‘ঠাস!’
চড়ের তীব্রতায় নওমি ছিটকে গিয়ে পাশের সোফার ওপর আছড়ে পড়ল। ওঁর ঠোঁটের কোণ ফেটে এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে এলো। ড্রয়িংরুমের ভেতরের পরিবেশটা যেন এক সেকেন্ডে জমে বরফ হয়ে গেল। এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা জেবা নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল, ওঁর চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার দশা হলো। জেবা ভাবেনি কখনো সারিমের মতো একজন শিক্ষামন্ত্রী এভাবে একজন নারীর গায়ে হাত তুলতে পারে! আলভি নিজের চোখ বন্ধ করে ফেলল, ওঁর বুকটা নওমির এই আঘাতে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে থাপ্পড়টা নওমিকে নয়, বরং সদ্য ওঁর প্রেমে আশিক হয়ে যাওয়া আলভিকে মারা হয়েছে।
সারিম নিজের শার্টের স্লিভটা বাম হাত দিয়ে একটু ওপরে গুটিয়ে নওমির দিকে তাকাল। ওঁর চোখ দুটো জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মতো লাল। অত্যন্ত শান্ত কিন্তু বরফশীতল গলায় সারিম বলল,
“মুখ সামলে কথা বলবি, নওমি। এতক্ষণ তুই আমার সাথে যা করেছিস, আমি সহ্য করেছি। কিন্তু আমার স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে যদি আর একটা নোংরা শব্দ তোর মুখ থেকে বের হয়, তবে আমি ভুলে যাব তুই একজন নারী। ভুলে যাব কখনো তুই আমার বেস্টফ্রেন্ড ছিলি। মাইন্ড ইট!”

নওমি নিজের গালে হাত দিয়ে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সারিমের দিকে তাকিয়ে রইল। ও কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“তুই… তুই আমাকে মারলি, সারিম? একটা সামান্য মেয়ের জন্য তুই আমার গায়ে হাত তুললি?”
“ও সামান্য নয়, ও মৃধা আবরার সারিমের একমাত্র বৈধ স্ত্রী। ও এই বাড়ির মালকিন,”
সারিম অত্যন্ত দর্পিত গলায় বলল। এরপর ও লিভিং রুমের বাইরের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে ডাকল,
“গার্ডস!”
সারিমের গলার আওয়াজ শোনামাত্রই চারজন সশস্ত্র সিকিউরিটি গার্ড দ্রুত ঘরের ভেতরে এসে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তাদের সবার মুখে চরম পেশাদারিত্বের ছাপ। সারিম তাদের দিকে না তাকিয়েই নওমিকে নির্দেশ করে বলল,
“এই মহিলাকে এই মুহূর্তেই মৃধা নিবাসের সীমানার বাইরে ছুড়ে ফেলে দাও। আর আজ থেকে যেন একে এই বাড়ির আশেপাশেও কখনো দেখা না যায়। যদি ও কোনো ঝামেলা করার চেষ্টা করে, তবে সোজা থানায় নিয়ে কেস ফাইল করো। মুভ!”

“সারিম! তুই এটা করতে পারিস না! সারিম, লিসেন টু মি!”
নওমি পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু গার্ডরা ওঁর কোনো কথাই শুনল না। তারা অত্যন্ত শক্ত হাতে নওমিকে দুই পাশ থেকে ধরে লিভিং রুম থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। নওমির চিৎকারের আওয়াজ আস্তে আস্তে দূর থেকে দূরে মিলিয়ে গেল।পুরো লিভিং রুমে তখন এক থমথমে নীরবতা। সারিম একটা গভীর শ্বাস নিয়ে নিজের শার্টের কলারটা একটু ঠিক করল। ওঁর মুখের সেই খুনে ভাবটা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ও সোজা সোফার কোণে দাঁড়িয়ে থাকা জেবার দিকে তাকাল, জেবা তখনও অবাক হয়ে সব দেখছিল।
সারিম জেবাকে দেখে নিজের গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে বলল,

“জেবা, রুমে যাও। পরীক্ষা দিয়ে এসে নিশ্চয়ই ক্লান্ত তুমি। ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নাও।”
জেবা জাদুমন্ত্রের মতো দ্রুত মাথা নাড়ল। ও আর এক মুহূর্তও সারিমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না; সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।সারিম এবার আলভির দিকে ফিরে তাকাল। আলভির মুখটা তখন শুকিয়ে চুন হয়ে আছে। সারিম ওকে বলল,
“আলভি, তুমি এখন বাসায় চলে যাও। আজ আর এখানে তোমার কোনো কাজ নেই। কোনো দরকার পড়লে আমি তোমাকে ফোনে ডেকে নেব। গাড়িটা গ্যারেজে পার্ক করে দিয়ে যাও।”
“জি… জি স্যার। আমি আসছি,”

আলভি অত্যন্ত বিনীত গলায় বলল। এরপর দ্রুত পা বাড়াল। তবে যাওয়ার আগে ও শেষবারের মতো লিভিং রুমের দরজার দিকে তাকাল, যেখানে নওমির পারফিউমের সুবাস এখনো বাতাসে ভাসছিল। আলভির সদ্য ভাঙা মনটা নিয়ে ও একপ্রকার নিঃশব্দেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সবাই চলে যেতেই লিভিং রুমটা আবার সেই চিরচেনা নীরবতায় ডুবে গেল। অরি এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। ওঁর ভেতরের রাগ আর ক্ষোভ এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ার উপক্রম হলো। ও আর এক সেকেন্ডও এই লোকটার সামনে থাকবে না বলে সিদ্ধান্ত নিল। অরি নিজের ফাইলটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরে সিঁড়ির দিকে যাওয়ার জন্য যেইমাত্র এক পা বাড়াল-
ঠিক তখনই আকস্মিক সারিম চিতার মতো চটপটে ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে এক ঝটকায় অরির ডান হাতটা ধরে নিজের দিকে টানল। অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সারিম নিজের সেই শক্তিশালী ও সুঠাম বাম বাহুটা দিয়ে অরির কোমর জড়িয়ে ধরে ওকে নিজের চওড়া বুকের সাথে শক্ত করে আছড়ে ফেলল! অরির হাতের ফাইলটি ছিটকে গিয়ে মার্বেল মেঝের ওপর পড়ে গেল।

“কী… কী করছেন আপনি? ছাড়ুন আমাকে!” অরি চিৎকার করে ওঠার চেষ্টা করল।
কিন্তু সারিম ওকে কোনো সুযোগই দিল না। ও নিজের ডান হাতের ব্যান্ডেজের তোয়াক্কা না করে অরির দুই কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরল এবং এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের ঠোঁট দুটো অরির নরম, কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল!
অরির পুরো শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ওঁর চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে আর তীব্র ধাক্কায় স্থির হয়ে গেল। সারিম গভীর এক ভালোবাসার টানে অরিকে জোর করে চুম্বন করতে শুরু করল। ওঁর ঠোঁটের সেই পুরুষালি ও মাদকতাভরা স্পর্শ অরির সমস্ত ইন্দ্রিয়কে অবশ করে দিতে চাইল। অরি নিজের দুই হাত দিয়ে সারিমের চওড়া বুকে ধাক্কা মারতে লাগল, নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল। ও নিজের মুখটা ডানে-বামে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু সারিমের সেই ইস্পাত কঠিন হাতের গ্রিপ থেকে ও নড়ার সুযোগ পাচ্ছিল না।

“উমম…”
অরির মুখ থেকে শুধু এই অস্ফুট শব্দটাই বের হতে পারল, যা সারিমের মুখের ভেতরেই মিলিয়ে গেল।
সারিমকে অরি থামতে বলা সত্ত্বেও সে থামল না। উল্টো ও অরির কোমরটা আরও উঁচিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। সারিম অরির ঠোঁটের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি অংশ নিজের করে নিতে চাইল,যেন জমে থাকা সমস্ত তৃষ্ণা আজ এক নিমেষেই মিটিয়ে ফেলবে। অরির এই ছটফটানি, এই প্রতিরোধ সারিমের ভেতরের পুরুষত্বকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছিল। ও প্রায় চার মিনিট ধরে অত্যন্ত গভীর, তীব্র আর অনবরতভাবে অরিকে চুম্বন করতে থাকল। লিভিং রুমের ভেতরের বাতাস যেন তাদের এই তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে ভারী হয়ে উঠল।
অবশেষে, চার মিনিট পর সারিম যখন অরির ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁটটা সরিয়ে নিল, তখন দুজনেরই শ্বাস-প্রশ্বাস মারাত্মকভাবে দ্রুত চলছিল। অরিকে ছেড়ে দিতেই ও দুই কদম পিছিয়ে গেল। ওঁর আকাশী রঙের ইউনিফর্মের কলারটা কিছুটা কুঁচকে গেছে, ঠোঁট দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। অরির ফর্সা গাল দুটো লজ্জায়, অস্বস্তিতে আর চরম রাগে যেন রক্তিম জবা ফুলের রূপ ধারণ করেছে। ওঁর চোখ দিয়ে অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।

অরি নিজের ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নিজের ঠোঁটটা সজোরে মুছে ফেলল, যেন ও সারিমের সেই স্পর্শের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলতে চায়। তীব্র রাগে কাঁপতে কাঁপতে, অরি নিজের চোখের পানি সামলে নিয়ে সারিমের দিকে তাকাল। ওঁর গলার স্বর রাগে আর অপমানে কাঁপছিল,অরি রাগ সামলাতে না পেরে অত্যন্ত কড়া গলায় সারিমকে কথা শুনিয়ে দিতে শুরু করল।
“আপনার লজ্জা করে না, মিস্টার মৃধা? আপনি নিজেকে দেশের শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেন? আপনার এই আচরণ কোনো ভদ্র পুরুষের লক্ষণ হতে পারে না! আপনি কি জানেন আপনি এইমাত্র কী ধরনের জঘন্য আর অস্বাস্থ্যকর কাজ করেছেন? মানুষের লালা বা থুতুর মাধ্যমে কী পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া আর জীবাণু ছড়ায়, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে আপনার?”

সারিম নিজের ঠোঁটের কোণে সেই চতুর হাসিটা ধরে রেখে অরির এই রেগে গিয়ে বিজ্ঞানসম্মত ভাষণ দেওয়া দেখছিল। ও নিজের বাম হাতটা পকেটে পুরে অত্যন্ত অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।
অরি নিজের চোখ দুটো মুছে আরও কড়া গলায় বলল,
“একজনের মুখের থুতু বা লালা যখন অন্য কারোর মুখে যায়, তখন তার মুখের ব্যাকটেরিয়া থেকে গুরুতর ডার্মাটোলজিক্যাল ইনফেকশন বা ছত্রাক হতে পারে! ক্যান্ডিডা আলবিকানস নামক ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে আপনার এই নোংরা স্পর্শের কারণে! তা ছাড়া মুখের ভেতরের স্ট্রেপ্টোকক্কাস ব্যাকটেরিয়া লালার মাধ্যমে ছড়ালে মাড়ির রোগ থেকে শুরু করে আলসার পর্যন্ত হতে পারে। আপনি নিজের এই নোংরা জীবাণু আমার শরীরে প্রবেশ করিয়েছেন! আই জাস্ট হেট ইউ, মিস্টার মৃধা!”
অরি এক ঝটকায় মেঝের ওপর পড়ে থাকা নিজের ফাইলটা নিচু হয়ে তুলে নিল। তারপর সারিমকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। একবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকাল না সারিমের দিকে।
অরি চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘ, গভীর নিশ্বাস ফেলল সারিম। নিজের মনেই বিড়বিড় করে হেসে বলল,

“মৃধা আবরার সারিম! রাজনীতি আর মন্ত্রণালয়ের জটিল সব কাজ তুই এক মিনিটে সামলে নিস, অথচ নিজের আঠারো বছরের এই চাশমিশ পিচ্ছি বউটাকে মানাতে তোকে দেখছি এবার জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হবে! তোকে নিজের বউকে নিজের বুকে ফিরিয়ে আনতে সত্যিই প্রচণ্ড খাটুনি করতে হবে, ব্যাটা! কিন্তু মনে রাখিস, তুইও আরিশান মৃধার ছেলে। চন্দ্রিমার এই অভিমান ভাঙিয়ে ওকে নিজের এই ভালোবাসার জালে সম্পূর্ণ বন্দি না করা পর্যন্ত তুইও থামছিস না!”

করিডোর পেরিয়ে অরি নিজের রুমে এসে ঢুকল, তখন ওর পুরো শরীর কাঁপছিল। ঘরের দরজাটা বন্ধ করে লক করার শব্দ হতেই খাটে বসে থাকা জেবা এক লাফে উঠে দাঁড়াল। জেবার চোখ দুটো তখনো বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে আছে। কলেজের গেটের সামনে সারিমের ওই কাণ্ড, তারপর লিভিং রুমে এসে নওমি নামের ওই মেয়েটার সাথে ঘটে যাওয়া তুলকালাম-সবকিছু জেবার মগজকে পুরোপুরি অবশ করে দিয়েছে।
জেবা অরির দিকে এগিয়ে এসে ওর দুহাত শক্ত করে চেপে ধরল। অরির ঠোঁট দুটো তখনো স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি লাল, গাল দুটো রাগে আর লজ্জায় থমথম করছে।জেবা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও প্রায় চিৎকার করার মতো নিচু স্বরে বলল,
“অরি! তুই আর এক সেকেন্ডও কোনো কথা লুকাবি না। খোদার কসম, আমার মাথা এখন পুরাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! তুই আমাকে এখনই বল, এই সব কী হচ্ছে?সারিম ভাইয়া তোকে কোলে তুলে নিয়ে সবার সামনে বলল তুই ওনার বিবাহিত স্ত্রী! আর ওই মেয়েটার সামনেও ও তোকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী দাবি করল! কী সম্পর্ক তোদের মধ্যে?পাঁচ বছর আগের বিয়ের কথা কোথা থেকে এল? তুই কি আমার সত্যি বান্ধবী, নাকি অন্য কেউ?”

অরি একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ পাঁচ বছরের এক দমবন্ধ করা সত্য আর চেপে রাখার কোনো উপায় নেই। জেবা ওর সবচেয়ে কাছের বান্ধুবী, ওর সুখ-দুঃখের একমাত্র ভাগীদার। অরি টেবিলের ওপর ফাইলটা রেখে খাটের এক কোণে বসে পড়ল। ওর চোখ দুটো সামান্য ভিজে উঠল। ও জেবার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে অত্যন্ত নরম আর ধীর গলায় বলতে শুরু করল,
“জেবা, শান্ত হ। আমি তোকে কিছু ইচ্ছা করে লুকাইনি। পরিস্থিতিটাই এমন ছিল যে, এই সত্যিটা আমার নিজের কাছেও একটা দুঃস্বপ্নের মতো লাগত। আজকে যখন সবকিছু সবার সামনে চলেই এসেছে, তাহলে শোন আমার পেছনের গল্পটা।”
জেবা অরির মুখোমুখি কার্পেটের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল।একদৃষ্টে অরির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
অরি বলতে লাগল।

“আমার মা আমার জন্মের পরেই মারা যায়,এরপর যখন বয়স ছয়, তখন বাবা দেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ মিশনে গিয়ে শক্র পক্ষের গুলিতে মারা যান। আমার বাবা একজন আর্মির মেজর ছিলেন।সেই দুর্ঘটনায়,বাবা মারা যাওয়ার পর আমি পুরোপুরি এতিম হয়ে যাই। আমার আশ্রয় হয়েছিল আমার একমাত্র চাচা আর চাচির সংসারে। কিন্তু ওই বাড়িটা আমার জন্য কোনো আশ্রয় ছিল না,ওটা ছিল একটা জীবন্ত জাহান্নাম।”
অরির গলার স্বর কিছুটা বুজে এল, পুরনো দিনের সেই কষ্টের স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই ওর শরীরটা শিউরে উঠল।ও একটু পানি খেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলল,
“আমার চাচি আমাকে সহ্য করতে পারতেন না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘরের সব কাজ করাতেন, সামান্য ভুলের জন্য মারধর করতেন। এমনকি দিনশেষে আমাকে ঠিকমতো খেতেও দেওয়া হতো না। আমি তখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘরের কোণে বসে কাঁদতাম,চাচা যদিও মাঝেমধ্যে আমাকে খুচরো কিছু দিয়ে পড়াশুনায় সাহায্য করতেন,তবুও সেটা চাচির অগোচরে। তখন আমার কান্না শোনার মতো কেউ ছিল না।
জেবা নিজের মুখে হাত দিয়ে রাখল।ওর অরির অতীত সম্পর্কে শুনে খুব কষ্ট হচ্ছে। না জানি এই ফুলের মতো মেয়েটা,জীবনে কতো কষ্ট সহ্য করে বড় হয়েছে।অরি আবার বলতে শুরু করল।

“ঠিক সেই মুহূর্তে,আমার বয়স তখন তেরো ছিল। বাবা আমাদের গ্ৰামে কোনো একটা অনুষ্ঠান থেকে ফিরছিলেন।রাস্তার মধ্যে হঠাৎ ওনার চোখ পড়ে আমার উপর।ওনি এক দেখাতেই পছন্দ করে ফেলেন নিজের ছেলের জন্য। পরবর্তীতে বাবার সঙ্গে হয়তো চাচা আর চাচির কোনো একটা ডিল হয়েছিল।ওনারা এরপর কয়েকদিন আমার সঙ্গে বেশ ভালো আচরণ করতেন।আমি অবাক হতাম ওনাদের আচরনে তখন। একদিন সকালে ঘুম ভাঙলে হঠাৎ জানতে পারলাম আজ আমার বিয়ে। আমি তখনো বিয়ে মানে কি ভালো করে জানতাম না,সেজন্য কিছু না ভেবে চাচা আর চাচির কথাশুনে বিয়েতে রাজি হয়ে যাই।এরপর লোকটার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায়।”
জেবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তার মানে সারিম ভাইয়ার সাথে তোর বিয়েটা আরিশান আঙ্কেল নিজেই দিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ,” অরি বলল।

“সারিম মৃধা তখন তরুণ,সবে সাতাশ বছর।নিজের ক্যারিয়ার গড়ছিলেন। বাবার কড়া নির্দেশের সামনে সেদিন দ্বিমত করার সাহস পায়নি ওনি। কিন্তু এই বিয়েটাকে মনেপ্রাণে একদমই মেনে নিতে পারেনি তিনি।একটা ১৩ বছরের বাচ্চার সাথে বিয়ে হওয়াটাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অপমান আর ‘ব্ল্যাক স্পট’ মনে করেছিলেন। বিয়ে হওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় ওনি আমাকে সেখানে রেখে চলে আসে।ওনি চলে আসাতে,চাচি আমাকে ঐদিন খুব মেরিছিল,তখন বাবা আমাকে সেই নরক থেকে বাচিঁয়ে এই মৃধা নিবাসে নিয়ে আসেন,আমাকে নিজের মেয়ে বানিয়ে।সেই থেকে ওনি রেগে গত পাঁচ বছরে একবারো মৃধা নিবাসে পা রাখেনি।এমনকি বাবার সঙ্গে ও কোনো যোগাযোগ রাখেনি।
জেবা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। অরি মৃদু হেসে চোখ দুটো মুছল,

“ঢাকায় আসার পর,গত পাঁচটা বছর বাবা, আমাকে একজন বাবা আর একজন মায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করে বড় করেছেন। ওনার জন্যই আজ আমি পড়াশোনা করতে পেরেছি, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতে পারছি। ওনি বাইরে যতই কঠোর হোন না কেন জেবা, ওনার ভেতরের মনটা আল্লাহর দেওয়া এক ফেরেশতার মতো। ওনি আমাকে কখনো বুঝতে দেননি যে আমি ওনার নিজের রক্ত নই।”
অরির মুখ থেকে এই দীর্ঘ অতীত শোনার পর জেবার চোখের কোণ দিয়ে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল।জেবা আরিশান মৃধার প্রতি এক অদ্ভুত, গভীর এবং অতল শ্রদ্ধা অনুভব করল ওর বুকের ভেতর। ওনার সেই গম্ভীর চেহারা, সেই বাঘের মতো চাউনি-যার পেছনে লুকিয়ে আছে এত বড় এক দয়ালু আর সুরক্ষাকারী পিতা! জেবার হৃদয়ের কোনো এক অলিন্দে আরিশান মৃধাকে নিয়ে এক অদ্ভুত,নতুন ধরনে অনুভূতির জন্ম নিল। ওনার প্রতি ভালো লাগা এবং সম্মান যেন এক ধাক্কায় বহু হাজার গুণ বেড়ে গেল। ও মনে মনে ভাবল,

“এই পৃথিবীতে এমন মানুষও কি সত্যিই হয়? যিনি নিজের ছেলের ক্ষোভের মুখে দাঁড়িয়ে একটা এতিম মেয়েকে নিজের মেয়ের মর্যাদা দিয়ে আগলে রাখেন!’
তবে জেবা একটু মুখ ফুলিয়ে অরির দিকে তাকিয়ে বলল,
“সবই তো বুঝলাম রে অরি। কিন্তু তুই আমার এত ভালো বান্ধবী, দিনরাত আমরা একসাথে থাকি, তুই এই এত বড় বিয়ের ব্যাপারটা আমার কাছে এতদিন কেন গোপন করলি? আমি তোর ওপর সত্যিই খুব রাগ করেছি!”
অরি জেবার হাত দুটো ধরে একটু মিষ্টি করে হেসে বলল,
“আই অ্যাম রিয়ালি সরি, বাদামনী! তুই নিজেই ভেবে দেখ, যে বিয়েটা শুধু কাগজের কলমের, যে স্বামী আমাকে ফেলে পাঁচ বছর আগে চলে গেছে এবং যাকে আমি কোনোদিন নিজের স্বামী বলে ভাবতেও পারিনি,সেটা আমি তোকে কীভাবে বলতাম? আমার কাছে তো আরিশান মৃধাই আমার একমাত্র পরিচয়, ওনিই আমার বাবা। আমি নিজেই তো ওসব ব্যাপার ভুলে গিয়েছিলাম রে।”
জেবা অরির মিষ্টি কথায় গলে গেল। ও অরিকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে, তোকে মাফ করে দিলাম। কিন্তু এখন আমার আসল প্রশ্নটা হলো-যে সারিম ভাই পাঁচ বছর ধরে তোকে অবজ্ঞা করল।সে হঠাৎ করে এত বছর পর এভাবে তোর কাছে ফিরে এল কেন? আর আজ কলেজের সামনে যা করল, ওনার লিভিং রুমের ওই আচরণ এসবের মানে কী? ওনার এত বছর পর হঠাৎ তোর ওপর এত উথলানো প্রেম কেন জাগল?”
অরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের টেবিল লাইটের দিকে তাকাল। ওর মনের ভেতর তখন সারিমের সেই গভীর, মাদকতাভরা স্পর্শ আর ওই জোরপূর্বক চুম্বনের তীব্র অনুভূতিটা বারবার হানা দিচ্ছিল, যা ও জেবাকে বলতে পারছিল না।অরি নিজের ঠোঁটটা আর একবার চেপে ধরে বলল,
“সত্যি বলতে আমি নিজেও ওনার এই আচরণের কোনো সঠিক উৎস বা কারণ জানি না।
জেবা অরির কথা শুনে একটু চিন্তা করল, তারপর মুচকি হেসে বলল,

“তবে আমার কি মনে হচ্ছে জনিস!আমার মনে হচ্ছে, সারিম ভাই তোর প্রেমে পড়েছে।তুই দেখতে মারাত্মক সুন্দর রে অরি!তোর এই স্নিগ্ধ চেহারা দেখে ওনার মতো ড্যাশিং পুরুষ যদি প্রেমে উষ্ঠা খেয়ে না পড়ে, তবে ওনাকে তো রোবট বলতে হতো! কিন্তু সারিম ভাই যেভাবে তোকে আগলে রাখছে, আমার তো মনে হয় খেলা এবার সত্যিই জমে উঠেছে।”
“ধুর, তুই ওসব ফালতু কথা বন্ধ কর! চল, ফ্রেশ হয়ে নেই।” অরি জেবাকে ধমক দিয়ে বাথরুমে চলে গেল।

রাত ঠিক পৌনে নয়টা। মৃধা নিবাসের সদর গেটের বাইরে আবার সাইরেনের শব্দ শোনা গেল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধার অফিশিয়াল গাড়িটি এসে থামল।ওনার সাথে ওনার পার্সোনাল বডিগার্ড আর সিকিউরিটি ফোর্সের গাড়িগুলোও ছিল।
আরিশান মৃধা গাড়ি থেকে নামলেন। ওনার সেই চিরচেনা ধবধবে সাদা কটন শার্টের ওপর একটা কালো কোট চড়ানো ছিল। ওনার চওড়া কাঁধ আর নিখুঁত ছাঁটা দাড়ির রুপোলি আভা রাতের আলোতেও এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলেছে। মুখের অবয়বটা বরাবরের মতোই পাথরের চেয়েও শক্ত ছিল, কিন্তু নিজের বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই ওনার চোখের মনিতে এক ধরনের শান্ত, পিতৃত্বের কোমলতা ফুটে উঠল।
ওনি ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই শাহীন মিয়া ওনার কোটটা এগিয়ে নিয়ে সাবধানে রাখলেন। আরিশান মৃধা সোফায় বসার আগেই সোজা সিঁড়ির দিকে তাকালেন। ওনি জানতেন, ওনার আসার শব্দ পেয়ে ওনার অরি-নিশ্চয়ই নিচে নেমে আসবে।

ঠিক তাই হলো। অরি আর জেবা দুজনেই দোতলা থেকে নেমে এল। আরিশান মৃধাকে দেখা মাত্রই জেবার বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অদ্ভুত ছন্দে ধকধক করে কেঁপে উঠল।সোফার কোণে দাঁড়িয়ে ওনার সেই বিশাল ও সুঠাম অবয়বটির দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, ওর নিজের চঞ্চল মনটা ওনার গাম্ভীর্যের সামনে কেমন যেন একদম শান্ত আর নত হয়ে গেল।
অরি দ্রুত এগিয়ে এসে আরিশান মৃধার হাত থেকে ওনার চশমার কেসটা নিল এবং খুব নরম গলায় বলল,
“বাবা! তুমি এসেছ? তোমার শরীর ঠিক আছে তো? কাল রাতে তো তোমার একদম ঘুম হয়নি।”
আরিশান মৃধার শক্ত মুখের রেখাগুলো এক মুহূর্তে গলে গেল। ওনি অরির মাথায় নিজের বড় হাতটা রেখে অত্যন্ত স্নেহভরে বললেন,

“আমি ঠিক আছি,অদ্রিজা। দেশের কাজ তো করতেই হবে। কিন্তু তুমি কেমন আছো? আজকের পরীক্ষা কেমন হলো। কোনো সমস্যা হয়নি তো?”
“পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে, বাবা। তোমার দোয়ায় সব প্রশ্নের উত্তর ঠিকমতো দিয়ে এসেছি,”
অরি মৃদু হেসে বলল, তবে ও দুপুরের ওই সারিমের কাণ্ডের কথা বা কলেজের সামনের কেলেঙ্কারির কথা পুরোপুরি চেপে গেল। ও চায় না বাবা এই সময়ে কোনো বাড়তি চিন্তা করুন।আরিশান মৃধা জেবার দিকে তাকালেন। ওনার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জেবার ওপর পড়তেই জেবা চট করে নিজের মাথা নিচু করে ফেলল, ওর ফর্সা গাল দুটোতে এক হালকা লালচে আভা ফুটে উঠল। আরিশান মৃধা গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বললেন,
“জেবা, তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছে? অদ্রিজা তোমাকে ঠিকমতো দেখে রেখেছিল তো?”
জেবা আমতা আমতা করে কোনোমতে নিজের গলার স্বর ঠিক করে বলল,
“জি… জি আঙ্কেল! পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। অরি আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।”
আরিশান মৃধা আর কিছু বললেন না জেবাকে। শুধু অরির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর আওয়াজে বললেন।
“তোমরা দুজনে এখন ওপরে যাও, আমি একটু সারিমের ঘরে যাচ্ছি। ওর সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।”
“আচ্ছা বাবা,”অরি বলল।

জেবাকে নিয়ে আবার ওপরে চলে গেল অরি। যাওয়ার সময় জেবা আর একবার আড়চোখে আরিশান মৃধার ওই চওড়া পিঠটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওনার এই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব জেবার মনকে এক অদ্ভুত মোহে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
আরিশান মৃধা দৃঢ় পায়ে দোতলার শয়নকক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন,যেখানে সারিমের রুম, অরি আর জেবা তিন তলায় থাকে।আরিশান মৃধা দরজায় নক না করেই এক ঝটকায় দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন।
ভেতরে সারিম তখন বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ওর মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর বাবার এন্ট্রি হতেই ও মোবাইলটা একপাশে রেখে নিজের মুখের সেই চতুর ভাবটা কিছুটা স্বাভাবিক করল। আরিশান মৃধা ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন। ওনার দীর্ঘ অবয়বটা বেডের সামনে এসে দাঁড়াতেই পুরো ঘরের বাতাস যেন এক সেকেন্ডে ভারী হয়ে গেল। ওনি ছেলের সেই ব্যান্ডেজ করা ডান হাতটার দিকে তাকালেন, তারপর সোজা সারিমের চোখের মনিতে নিজের গভীর চোখ দুটো রাখলেন।ওনি কোনো ভূমিকা না করেই অত্যন্ত বজ্রকঠিন ও গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

“সারিম, আমি এইমাত্র রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার আর আমাদের বিশেষ গোয়েন্দা বিভাগের চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পেয়েছি।”
সারিম মনে মনে একটু সজাগ হলো, তবে বাইরে ওর মুখের চামড়া বিন্দুমাত্র নড়ল না। ও শান্ত গলায় বলল,
“রিপোর্ট কী?”
“এই মুহূর্তে আমার শেষ কথা কান খুলে শুনে রাখো- রাজশাহী শহর তোমার জন্য আর নিরাপদ নয়, আমি তোমাকে আমার চোখের আড়াল হতে দেব না। তুমি আর কোনোদিন রাজশাহী ফিরে যেতে পারবে না। দেশের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তোমার সমস্ত কার্যক্রম এখন থেকে ঢাকা থেকেই পরিচালিত হবে। তোমাকে এই মৃধা নিবাসেই থাকতে হবে। এটাই আমার শেষ নির্দেশ।”

সারিম বাবার কথা শুনে মনে মনে এক চিলতে বিজয়ের উল্লাসে মেতে উঠল।ও তো এটাই চেয়েছিল! ওর এই মৃধা নিবাসেই স্বেচ্ছায় বন্দী থাকা, ওর চন্দ্রিমার একদম কাছাকাছি থাকা।সারিম বাইরে ওর মুখের অভিব্যক্তিকে একদম পাথরের মতো শক্ত করে একরাশ অবজ্ঞা আর জেদ নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, বাবা। তোমার ক্ষমতার জোরের সামনে তো আমার কোনোদিন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ছিল না, আজও নেই। আমি এই মৃধা নিবাসেই থাকব, তোমার এই খাঁচাতেই বন্দী হয়ে থাকব।”
আরিশান মৃধা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। ওনি ওনার সাদা শার্টের হাতাটা আর একবার ঠিক করতে করতে অত্যন্ত দ্রুত ও গম্ভীর পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওনি চলে যেতেই সারিম নিজের বাম হাত দিয়ে বালিশের নিচ থেকে মোবাইলটা বের করে আবার অত্যন্ত আনন্দের সাথে মুচকি হাসতে লাগল। ও জানালার বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“খেলা তো মাত্র শুরু হলো, চন্দ্রিমা। এবার এই মৃধা নিবাসের প্রতিটি কোণায় আমাদের ইশকের ফানিয়ার জ্বলবে।”

সময় তার নিজের নিয়মেই বয়ে চলে। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে দেখতে দেখতে পুরো একটা মাস কেটে গেল। তবে মৃধা নিবাসের ভেতরের আবহাওয়ায় খুব একটা বড় রদবদল হলো না। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে সবকিছু ঠিক আগের মতোই শান্ত, পরিপাটি আর নিয়মতান্ত্রিক। কিন্তু সেই শান্ত পুকুরের নিচে যে একটা ওলটপালট করা স্রোত বইছে, তা কেবল বাড়ির বাসিন্দারাই টের পাচ্ছিল।
অরি আর জেবার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র তিনদিন আগে। পরীক্ষার শেষ ঘণ্টাটা বাজার পর জেবা যখন খাতা জমা দিয়ে হল থেকে বের হয়েছিল, তখন ওর আনন্দ দেখে কে! কিন্তু সেই আনন্দের স্থায়ীত্ব বেশিদিন হলো না। গতকাল সকালেই জেবার বাবা সোলেমান শেখ সশরীরে মৃধা নিবাসে এসে হাজির হলেন আর মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
সোলেমান শেখ মানুষটা অত্যন্ত সাধারণ আর অমায়িক। আরিশান মৃধার প্রতি ওনার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কিন্তু জেবার তো অরিকে ছেড়ে যেতে একদমই মন চাচ্ছিল না। গাড়ি ছাড়ার আগ মুহূর্তে ও অরিকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে কাঁদছিল, যেন ওকে কোনো নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে।অথচ ওদের বাড়ি দুরুত্ব কেবল মিনিট বিশেক এর মতো।

অরিও জেবা চলে যাওয়াতে বেশ একা হয়ে পড়ল, তবে ও নিজেকে ভেঙে পড়তে দিল না।সামনে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। যদিও অ্যাডমিশন টেস্ট আসতে এখনো বেশ কয়েকমাস বাকি, তবুও অরি কোনো ধরনের গাফিলতি করতে রাজি নয়। ও খুব ভালো করেই জানে, সরকারি মেডিকেলে একটা সিট পাওয়া কতটা কঠিন। তাই জেবা চলে যাওয়ার পর থেকেই ও নিজেকে পড়ার ঘরের চার দেওয়ালে বন্দি করে ফেলেছে। দিনরাত মোটা মোটা অ্যানাটমি, ফিজিওলজি আর কেমিস্ট্রির বইয়ের পাতায় চোখ ডুবিয়ে রাখছে। সময়টাকে ও বিন্দুমাত্র অপচয় করতে চায় না, নিজের পুরো ফোকাসটা পড়াশোনায় ঢেলে দিয়েছে।
এদিকে আরিশান মৃধাও ওনার রাষ্ট্রীয় কাজে প্রচণ্ড ব্যস্ত। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন কূটনৈতিক বৈঠক আর মন্ত্রণালয়ের ফাইল সই করতে করতে ওনার দিন-রাত এক হয়ে যাচ্ছে।সারিম এখন পুরোপুরি সুস্থ। ডান হাতের সেই ব্যান্ডেজ অনেক আগেই খুলে ফেলা হয়েছে। দেশের তরুণ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ও এখন পুরো দমে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, নতুন কারিকুলাম তৈরি—এসব নিয়ে ওকেও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মিটিং আর সেমিনারে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।

ধরতে গেলে, মৃধা নিবাসের সবাই যার যার কর্মব্যস্ততায় ডুবে আছে। কিন্তু এই চরম ব্যস্ততার মাঝেও একজনের রুটিনে কোনো বদল আসেনি-সে হলো মৃধা আবরার সারিম। ও যতই কাজের মধ্যে থাকুক না কেন, সুযোগ পেলেই অরিকে জ্বালানো, ওর পেছনে লাগা আর ওকে পটানোর জন্য নিত্যনতুন ট্রিক খাটানো ও বাদ দেয়নি।কখনো লাইব্রেরিতে পড়তে বসা অরির সামনে গিয়ে অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বাঁকা হাসি হাসা, কখনো কফি দেওয়ার বাহানায় ওর রিডিং গ্লাসের ওপর আঙুল চালানো—এসব সারিমের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে,অরি অবশ্য সেসবে চরম বিরক্ত হয়ে বই-খাতা বগলে নিয়ে ওখান থেকে হিলহিলিয়ে চলে যেত। কিন্তু সারিম তাতে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ও বুঝতে পেরেছে, এই চাশমিশ ত্যাঁদড় চন্দ্রিমার মন গলানো সাধারণ কোনো কাজ নয়, এর জন্য বিশেষ কোনো চাল চালতে হবে।

দুপুরের কড়া রোদ তখন মাথার ওপর খাঁ খাঁ করছে। ঢাকা শহরের ঘিঞ্জি এলাকা পেরিয়ে গাড়িটা এসে থামল শহরতলির এক নির্জন, পরিত্যক্ত পুরোনো একতলা বাড়ির সামনে। চারপাশটা ঘন জঙ্গল আর লতাগুল্মে ছেয়ে আছে। বড় বড় বট আর পাকুড় গাছের ডালপালা বাড়িটার ছাদকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যে, দুপুরের আলোও সেখানে ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারছে না। একটা স্যাঁতসেঁতে, ভুতুড়ে আর রহস্যময় গন্ধ বাতাসে ভাসছিল।
এই কুচকুচে কালো প্রাডো গাড়িটির ড্রাইভিং সিট থেকে নামল আলভি। আর পেছনের সিট থেকে নামল সারিম।
এই জঙ্গুলে পরিবেশ দেখে সারিম নিজের নাকটা কুঁচকে ফেলল। ও আলভির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিরক্ত ও কর্কশ গলায় বলল,

“আলভি! তুমি আমাকে এই ভরদুপুরে কোন জাহান্নামে নিয়ে এসেছ হ্যাঁ? এটা একটা সভ্য মানুষের থাকার জায়গা? চারিদিকের জঙ্গল আর মশার উপদ্রব দেখে তো মনে হচ্ছে এখানে কোনো জ্যান্ত ভূত বাস করে! তোমার ওই বুদ্ধি যদি আজ কাজে না লাগে, তবে তোমাকে আমি এই জঙ্গলেই চুবিয়ে রেখে যাব, মনে রেখো!”
আলভি নিজের কপালে জমা ঘামটা শার্টের হাতায় মুছে দুই হাত জোড় করে তোতলামি করতে করতে বলল,
“বস! বস! শান্ত হোন। আপনি তো আধুনিক বিজ্ঞানের ছাত্র, তাই এসব আধ্যাত্মিক লাইনের মর্ম বুঝবেন না। এই জঙ্গল বাড়ির ভেতরে যিনি থাকেন, ওনি কোনো সাধারণ মানুষ নন। ওনি হলেন ওপার বাংলার বিখ্যাত কামরূপ কামাখ্যার লিজেন্ডারি কবিরাজ-বাবা চিংফেক্স! ওনার কাছে এমন এমন তুকতাক আর যাদুর মন্ত্র আছে, যা দিয়ে নাকি জ্যান্ত বাঘকেও বিড়াল বানিয়ে দেওয়া যায়! ম্যাম যে আপনার এই হ্যান্ডসাম চেহারা আর মন্ত্রীত্ব দেখেও আপনার প্রেমে পড়ছে না, এর একমাত্র চিকিৎসা এই কবিরাজ বাবার কাছেই আছে। ওনি এমন একটা ভুতুড়ে ফুঁ দেবেন যে, ম্যাম নিজে এসে আপনার পায়ে লুটিয়ে পড়বে! বিশ্বাস রাখুন বস, এই আলভি আপনার কখনো খারাপ চাইতে পারে না।”

সারিম একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখের সানগ্লাসটা ঠিক করল। প্রেমের জ্বরে ও এখন এতটাই অন্ধ যে, যুক্তি-বুদ্ধি সবকিছু যেন লোপ পেয়েছে।মনে মনে ভাবল,
“বিজ্ঞান আর মনস্তত্ত্ব দিয়ে যখন চন্দ্রিমার মন গলানো যাচ্ছে না, তখন এই কবিরাজি ইচিং-বিচিং পদ্ধতিটাই শেষ চেষ্টা হিসেবে দেখা যাক।’
ও আলভিকে ইশারা দিয়ে বলল,
“চলো ভেতরে যাই। দেখি তোমার বাবার কত ক্ষমতা।”

দুজনে ধীর পায়ে জরাজীর্ণ বারান্দা পেরিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল। ঘরের ভেতরের অন্ধকারটা আরও তীব্র। দেওয়ালের কোণে একটা ধূপদানি থেকে নীল রঙের ধোঁয়া বেরোচ্ছে, যার গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা হরিণের চামড়ার ওপর খালি গায়ে বসে আছেন ইয়া বড় গোঁফ-দাড়িওয়ালা এক লোক। ওনার গায়ের রঙ কুচকুচে কালো, কপালে লাল সিঁদুরের মস্ত বড় তিলক, আর গলায় হাড়গোড়ের মালা। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। ওনিই হলেন বিখ্যাত কবিরাজ চিংফেক্স!
সারিম লোকটাকে দেখা মাত্রই চরম নাক সিটকাল। ও আলভির কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
“এই ব্যাটাকে দেখে তো মনে হচ্ছে তিন মাস ধরে গোসল করে না! এর নিজের শরীরের চামড়ায় তো ব্যাকটেরিয়া গিজগিজ করছে, এ আবার মানুষের প্রেম ঠিক করবে কী করে?”
আলভি সারিমকে কনুই দিয়ে একটা গুঁতো মেরে বলল,

“চুপ করেন বস! ওনি মনস্তাত্ত্বিক কথা বুঝে ফেললে কিন্তু অভিশাপ দিয়ে আমাদের এখানেই পাথর বানিয়ে দেবে!”
ঠিক তখনই কবিরাজ চিংফেক্স ওনার সেই ভারী আর কর্কশ গলায় চোখ বন্ধ রেখেই বলে উঠলেন,
“কে আসে? কার মনের ভেতর ইশকের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে? কার চন্দ্রিমা তাকে ছেড়ে দূরে পালাই পালাই করছে?”
সারিম লোকটার মুখে ‘চন্দ্রিমা’ শব্দটা শোনা মাত্রই মনে মনে বেশ চমকে গেল! ভাবল, এই ব্যাটা অন্তর্যামী নাকি!ওর মনের কথা জানল কেমনে?’ ও নিজের মন্ত্রিত্বের ভাবগাম্ভীর্য ভুলে এক কদম এগিয়ে গিয়ে বলল,
“কবিরাজ চিংফেক্স! আমি আসলে একটা মস্ত বড় সমস্যায় পড়েছি। আমার একটা স্ত্রী আছে, মানে ও আমার বিবাহিত বউ। কিন্তু সমস্যা হলো ও আমাকে বিন্দুমাত্র ভালোবাসে না! আমি ওর সামনে গেলেই ও রেগে আগুন হয়ে যায়, বিজ্ঞানসম্মত গালিগালাজ করে। আমি চাই ও যেন আমার প্রেমে পুরোপুরি হাবুডুবু খায়, দিনরাত শুধু আমার নাম জপ করে। এর কোনো সমাধান কি আপনার এই ডেরায় আছে?”

কবিরাজ চিংফেক্স ওনার লাল লাল চোখ দুটো মেলে সারিমের দিকে তাকালেন। ওনার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। ওনি ওনার সামনের একটা তামার পাত্র থেকে কিছু শুকনো পাতা আর শিকড় নিয়ে একটা মাটির প্রদীপের আগুনে ছুড়ে মারলেন। সাথে সাথে একটা নীল রঙের আগুনের ফুলকি দপ করে জ্বলে উঠল।
এরপর কবিরাজ মশাই ওনার হাতের একটা কাঁচের বোতল, যার ভেতরে সাধারণ পরিষ্কার সাদা পানি ছিল, সেটা ওনার মুখের সামনে নিলেন। ওনি চোখ দুটো বন্ধ করে অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গি করতে লাগলেন এবং মুখে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন
“ইচিং বিচিং চিচিং চাং… মনের মানুষ হোক ল্যাংচ্যাং! ওম হ্রিং ক্লিং ফাট… চন্দ্রিমার মন হোক সাবার খাট! চিংফেক্সের এই পবিত্র জল… প্রেমের সাগরে আনবে ঢল!”
ওনি একটানা প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে এই ধরনের হরেকরকম ভংচং আর অদ্ভুত সব মন্ত্র পড়ে বোতলের ভেতরের পানিতে ফু দিলেন। ফু দেওয়া শেষ হতেই ওনি বোতলটা খুব সাবধানে কর্ক দিয়ে আটকে সারিমের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ওনার গলার স্বর এবার বেশ গম্ভীর শোনাল,

“শোনো হে যুবক! এই নাও কামরূপ কামাখ্যার মহৌষধ-ইশকের জল! এই বোতলের পানি সাধারণ কোনো পানি নয়। তোমার ওই অবাধ্য বউকে এখান থেকে দৈনিক নিয়ম করে এক গ্লাস করে পানি খাওয়াবে। এইরকম একটানা দশটা বোতল পানি যদি তার পেটে যায়, তবে তার মগজের সমস্ত কোষ তোমার প্রেমে অবশ হয়ে যাবে। ও তখন নিজের জ্ঞান হারিয়ে স্রেফ তোমার এই রূপের সাগরে ঘায়েল হয়ে ঘুরে বেড়াবে। এই চিংফেক্সের কথা আজ পর্যন্ত বিফলে যায়নি!”
কবিরাজের এই ভংচং মন্ত্র আর ওনার আত্মবিশ্বাস দেখে সারিমের খুশির আর কোনো সীমা রইল না! ও নিজের মনের ভেতর অলরেডি দেখতে পাচ্ছিল যে, অরি ওর কোলে মাথা রেখে মিষ্টি করে হাসছে আর বলছে, ‘”আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি সারিম!”’ সারিম আনন্দের চোখে বোতলটা নিজের হাতে নিল, যেন ও এই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি গুপ্তধন হাতে পেয়েছে।
সারিম খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কবিরাজ চিংফেক্স! আপনার এই মহৌষধের মূল্য কত? বলুন, আমি যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত!”
কবিরাজ চিংফেক্স ওনার গোঁফে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত লোভী চোখে সারিমের দামি শার্ট আর হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এই এক বোতল পবিত্র পানির হদিশ মেলা ভার হে যুবক! এর জন্য তোমাকে দিতে হবে দেড় লক্ষ টাকা! দশ বোতলের হিসাব পরে হবে, আগে এই এক বোতলের মূল্য পরিশোধ করো।”
দেড় লাখ টাকা! একটা সাধারণ এক লিটার পানির বোতলের জন্য দেড় লাখ টাকা চাওয়া মাত্রই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আলভির চোখ দুটো আক্ষরিক অর্থেই কোটর থেকে বের হয়ে আসার দশা হলো! ও নিজের মুখটা হাঁ করে বসের দিকে তাকাতে চাইল ওনাকে বাধা দেওয়ার জন্য।
কিন্তু সারিম তখন প্রেমের ঘোরে পুরোপুরি পাগল! বউ ওর প্রেমে পড়বে—এই একটা কথা শোনার পর ওর কাছে দেড় লাখ কেন, দেড় কোটি টাকাও তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। ও এক সেকেন্ডও চিন্তা না করে ওর পকেট থেকে ওর পার্সোনাল চেক বই আর একটা কলম বের করল। ও অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চেকে ‘দুই লক্ষ টাকা’র অঙ্কটা লিখল এবং নিজের স্বাক্ষর বসিয়ে দিল।
সারিম চেকটা কবিরাজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত তৃপ্তির গলায় বলল,

“আপনার এই পবিত্র পানির উসিলায় যদি আমার চন্দ্রিমা আমার বুকে ফিরে আসে, তবে দেড় লাখ কেন, আমি আপনাকে পুরো দুই লাখ টাকা দিলাম! আপনি বাকি পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে নিজের জন্য ভালো কিছু কিনে নেবেন। আমি আগামীকালই আলভিকে দিয়ে বাকি নয়টা বোতল আনিয়ে নেব।”
কবিরাজ চিংফেক্স চেকে দুই লাখ টাকার অঙ্কটা দেখামাত্রই ওনার সেই সাধু সাজার ভেক এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল! ওনার চোখ দুটো লোভী শেয়ালের মতো চকচক করে উঠল। ওনি দ্রুত চেকটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে সারিমকে আশীর্বাদ করতে লাগলেন,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৭

“যাও যুবক! তোমার মঙ্গল হোক! তোমার ইশকে সফল হোক!”
সারিম পানির বোতলটা অত্যন্ত যত্নে নিজের বুকের সাথে আগলে ধরে ঘর থেকে বের হয়ে এল। ওর পেছনে পেছনে আলভিও তীব্র ধাক্কা খাওয়া মানুষের মতো অবশ পায়ে হেঁটে আসছিল।
গাড়ির কাছে এসে আলভি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ও নিজের কপালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে এক মস্ত বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও সারিমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত অবিশ্বাস্য আর আফসোসের গলায় বিড়বিড় করে বলল,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here