উন্মাদনা পর্ব ২৪
কায়নাত খান কবিতা
“ আহা গো সোনা আমার। আসো কোলে নেই।”
অভীর একের পর এক তাচ্ছিল্যভরা কথা নীরবে সহ্য করে যেতে থাকে আনন্দী। তার ননসেন্স মন্তব্যগুলো ধীরে ধীরে সব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। আনন্দী তেতে বলে,
“কী চাই আপনার, অভী?”
আনন্দীর গলায় ছিল তীব্র বিরক্তি আর ঘৃণার মিশ্রণ। প্রতিটি শব্দ যেন ভেতর থেকে জ্বলে উঠেছিল, তার মনের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভের প্রতিফলন। তার কণ্ঠস্বর কম্পিত না হলেও চোখে ছিল এক অস্বস্তিকর আগুন—যেন আরও এক কথায় সে পুরো অবস্থা ধ্বংস করে দেবে। এটা ছিল আর সহ্য করার সীমার শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো এক মানুষের প্রশ্ন।
আনন্দীর কথা শুনে অভী হেসে উঠল।তার চোখের কোণে এক অদ্ভুত ঝিলিক খেলে গেল, যেখানে মানবিক কোনো আবেগ ছিল না। সে যেন কোনো নাটকের মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে হাসছে—কিন্তু তার মনের ভেতর কিছুই নেই। শুধু একটা খালি, বিকৃত আত্মতৃপ্তি। আনন্দীর মুখ বরাবর নিজের মুখ নিয়ে অভী বলে,
“তোমার দে’হ।”
কথাটা বলেই আবার হেসে উঠল সে। এই হাসিতে ছিল একটা ভয়ঙ্কর খেলা।যেন ভয় দেখানো তার কাছে কোনো মজার বিষয়। আনন্দীর শরীরটা সেই মুহূর্তে যেন বরফ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে লাগল, কিন্তু সে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল।
এই হাসিটাই আর সহ্য করতে পারল না আনন্দী। তার ভেতর জমে থাকা সব রূঢ়তা, সব ঘৃণা তখন একত্রিত হয়ে একটা হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটাল। হঠাৎ করেই সে অভীর মুখের দিকে থুথু ছুড়ে মারে।
মুহূর্তে থেমে যায় অভীর হাসি। চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড স্থির আনন্দীর মুখের সামনেই বসে থাকে । বাতাসে যেন একটা অদৃশ্য ভারী ভাব নেমে আসে। তারপর ধীরে ধীরে হাত দিয়ে মুখ মুছে নেয়। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, কিন্তু আশ্চর্যভাবে গলায় এখনো সেই ঠান্ডা সুর।
“দিন দিন ভালোই উন্নতি হইতাছে তোর, শেখের বেটি।”
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। মুন্ডটি কোমরে শক্ত করে বেঁধে নেয়,প্রতিটি নড়াচড়ায় একটা গম্ভীর আত্মবিশ্বাস। তারপর দরজার দিকে এগিয়েও আবার থেমে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে আনন্দীর দিকে তাকায় অভী। ঠোঁট বাঁকায় একটা বিকৃত হাসি।
“চল, দেখা হইবো কাল। যা পুরস্কার দিলি, তার রিটার্ন গিফট তো দিতে হইবো… না-কি?”
আনন্দীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু সে চোখ নামায় না। তার চোখে এখন একটা জেদ।যেন আরও বেশি করে নিজেকে সামলাচ্ছে। তার শরীর কাঁপছে, কিন্তু সে চুপচাপ বসে রয়েছে ।
অভী আবার ও নিচু স্বরে বলে, ” বাল_ইকা, আমি তোমার বমি বমি ভাবের কারণ হতে চাই।”
কথাটা বলেই বিকৃতভাবে হেসে ওঠে সে। সেই হাসিতে ছিল একটা অস্বস্তিকর আত্মতৃপ্তি। আনন্দী চোখ বন্ধ করে ফেলে এক মুহূর্তের জন্য। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আপনাকে দেখলে এমনিতেই আমার বমি আসে।”
কথাটা শুনে অভীর চোখের কোণে অদ্ভুত এক ঝিলিক খেলে যায়। যেন অপমানেও সে সুখ নামক বস্তুটি খুঁজে পায়। তার মনে হলো, এই গল্পটা এখন থেকে আরও মজার হবে।
রুমের ভেতর যেন একটা অদৃশ্য ভোল্টেজ বৃদ্ধি পেয়েছে। দু’জনের মধ্যে থাকা সুতোটা এখন খুব সরু, যে কোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে।
দরজার বাইরে গিয়ে আবার ও থামে অভী। অন্ধকার ছাদের দিকে এক পা বাড়িয়ে হঠাৎ পিছনে না তাকিয়েই বলে ওঠে,
“খেলা হবে।”
তারপর ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায় সে।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা যেন পুরো ঘরটাকে আরও ভারী করে তোলে।আনন্দী কিছুক্ষণ স্থির বসে থাকে। অভীর শেষ কথাটার মানে বুঝতে পারে না সে। কিন্তু বুকের ভেতর অকারণ একটা আতঙ্ক জমতে শুরু করে। অভীর প্রতিটা কথা, প্রতিটা হাসির পেছনে যেন অন্য কোনো ফাঁদ লুকিয়ে থাকে।তার হাত কাঁপতে থাকে।হঠাৎই মনে পড়ে ফোনটার কথা।রেকর্ড হলো না।কিছুই প্রমাণ হিসেবে রইলো না।এক মুহূর্তে যেন সমস্ত আশা ভেঙে চুরমার হয়ে যায় আনন্দীর। এতক্ষণ যে সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সেটাও ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে আসে।তাহলে কি সত্যিই সব আশা শেষ?বাকি মেয়েদের মতো তার জীবনও কি অন্ধকারে ডুবে যাবে? কেউ কি কোনোদিন জানতেও পারবে না এই মানুষটার আসল মুখ?আনন্দীর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। চোখ বেয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ে।এই লড়াইয়ের কি কোনো শেষ নেই?নাকি এটাই সমাপ্তি…?
“পূরাণ_ঢাকা”
নিজের গ্যারেজে ঢুকেই পুরো বদলে যায় অভী। কয়েক মিনিট আগের সেই বিকৃত হাসি, উসকানিমাখা আচরণের মানুষটাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানে সে ঠান্ডা মাথার, হিসেবি।
গ্যারেজের ভেতরটা আধো অন্ধকার। এক কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, তেলের ক্যান, মরিচা ধরা টুলবক্স। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটা ওয়ার্কশপ মনে হবে। কিন্তু এই জায়গাটাই অভীর আসল ঘাঁটি।
লোহার টেবিলের সামনে বসে ধীরে ধীরে একটা ফাইল খুলে সে। চোখ স্থির। মাথার ভেতর তখন শুধু হিসাব।
আজ বড় চালান নামবে।ভুল করার সুযোগ নেই।
ড্রা’গ সাপ্লাইয়ের জগতে অভী এক ভয়ংকর নাম। অথচ আশ্চর্যের বিষয়—আজ পর্যন্ত কেউ তার চুলও ছুঁতে পারেনি। পুলিশ, গোয়েন্দা, প্রতিদ্বন্দ্বী—সবার চোখের সামনে দিয়েই সে কাজ করে গেছে বছরের পর বছর।কোথা থেকে মাল আসে,কোথায় যায়,কীভাবে যায়,কেউ জানে না।
সবচেয়ে বড় রহস্য হলো তার পরিবহনের কৌশল। শহরে এতগুলো চেকপোস্ট, তল্লাশি, নজরদারি থাকার পরও কীভাবে সে প্রতিবার মাল পার করে দেয়—এটা আজও ধাঁধা হয়ে আছে সবার কাছে।
অভী ঠান্ডা চোখে টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা ম্যাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।
” যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। পাইলে ও পাইতে পারো, অমূল্য রতন।’
অভীর হেঁয়ালি পূর্ণ কথার আগামাথা কিছু বুঝলো না নোবেল। হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে হাত দু-খানা প্রায় জড়োবস্তু তার। কোনো অনুভূতি নেই, শুধু ঘুরছে তো ঘুরছে। পাশ থেকে অ’স্ত্র মামুন, এবং ঘাতক সুৃমন কবিকে ইশারা করে। কারণ একমাত্র কবিই রয়েছে যার উল্টো পাল্টা গান এবং কবিতা আবৃত্তির ফলে অভী মাঝেমধ্যে হাসে। কিন্তু মজার বিষয় হলো কবি ইশারা বুঝে না। সে বরাবরই গায়ে পড়া লোক। তাই তাকে হাফ লেডিস ও ডাকে সকলে। মাঝখান থেকে ডিজে শহিদুল বলে ওঠে,
‘ ভাই, অনুমতি দিলে একটা কথা কইতাম।’
অভী হাত দিয়ে ইশারা করে। ডিজে শহিদুল সাহস জুগিয়ে বলে, ‘ ভাই! আপনের মনে হয় না, আপনার ঘরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা।’
‘ ক্যান! ফার্নিচার কী কম পড়ছে?’
‘ ভাই ওইটা কই নাই।’
‘ তাইলে?’
‘ বিয়া-শাদি’
বাকি কথা শেষ করার আগেই টেবিলে থাকা পানির বোতল ছুঁড়ে মারে অভী ডিজে শহিদুলের উপরে। সে ভিজে একাকার হয়ে যায়।
‘ মাথায় গরম উঠছে তোর। পানি ঢাল মদনা।’
‘ কিন্তু ভাই! একটা ভাবিসাপ।’
অভী ঘাতক সুমানের দিকে তাকিয়ে তাকে ইশারা করে। অর্থাৎ, শহিদুলকে এখন পঁচা ড্রেনে চুবাতে হবে। অভীর ইশারা মাফেক ঘাতক সুমন শহিদুলকে ধরতে চলে যায়। কিন্তু কাজে কাজ কিছুই হয় না। এর আগেই শহিদুল পালিয়ে যায়। একদম রাতের আঁধারে মিশে যায় সে। অভী একটু কাজে মনোযোগ দিবে, ঠিক সেই মূহুর্তেই নোবেল জানায় শহরের রাস্তায় বিশাল চেকপোস্ট বসবে কাল। আর এর নেপথ্যে রয়েছে রেহমান। যাকে অভী রেহমান ডাকাত বলে ও ডাকে। কয়েক মাস আগে হিন্দিতে একটা মুভি বের হয়, ধূরানধার। যেখানে একটি চরিত্রের নাম থাকে
রেহমান ডা’কাত। চরিত্রটি অভীর বেশ পছন্দ হয়। কিন্তু নামটি হয়না। কারণ রেহমান। এই নামটি তার সাথে ভালোই লড়াইয়ে নেমেছে। একদম অভীর সতীনের মতো। অভী যেখানে রেহমান সেখানে। কিন্তু মজার বিষয় হলো আজ অব্দি রেহমান অভীকে হাতেনাতে ধরতে পারেনি। বেশ অনেক ক্ষণ চুপ থাকার পর অভী বলে,
‘ তল্লাশি কয়টা থেকে শুরু? ‘
‘ হুমমম! রাত থেকে ভাই।’
অভী হাল্কা হেঁসে উঠে। তারপর সিগারে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে বলে, ‘ ওইটা তো ফাঁদ। দেখ আজ থাইকায় শুরু হইছে।’
‘ বুঝলাম না ভাই।’
‘ এইটারে বলে দাবার উল্টো চাল! রাতে কথা কইছে। মানে আজ সবাইরে সর্তক করলো। সব মাল নিয়ে আজ বের হতে হইবো। যারা আজ বের হইবো ইন্না-লিল্লাহ হইবো।’
‘ আর না বের হলে ভাই?’
‘ তাতে ইন্না-লিল্লাহ।’
‘ এখন করনীয় কী ভাই?’
অভী কিছু ক্ষণ চুপ থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর আড়মোড়া দিয়ে শীররের অলসতা কাটিয়ে বলে, ‘ খিচুড়ি খাইতে ৃন চাইতাছে রে! সবজি আনা।’
‘ দুই_দিন_পর’
দেখতে দেখতে প্রায় দুটো দিন কেটে যায়। আনন্দীও এখন অনেকটা সুস্থ। অন্তত বাইরে থেকে দেখলে তাই মনে হয়। ভেতরের ক্লান্তি, ভয় আর অস্বস্তিগুলো সে জোর করেই চাপা দিয়ে রাখে।
পরীক্ষা পিছিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাতিল তো হয়নি। কোনো না কোনোদিন পরীক্ষা হবেই। তাই আবার কোচিং শুরু করে দেয় আনন্দী। বন্ধুদের কাছ থেকে টাইম টেবিল জেনে নিয়মিত ক্লাসেও যেতে থাকে।
দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বেশ মনোযোগ দিয়েই ক্লাস করে সে। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও বইয়ের ভেতর ডুবে থাকতে পারলে মাথার ভেতরের দুঃস্বপ্নগুলো একটু শান্ত থাকে।
কিন্তু সেদিন সমস্যা হলো ফেরার পথে।
ক্লাস শেষ করে বাইরে বেরিয়েই দেখে একটা রিকশাও নেই। রাস্তার পরিবেশও অদ্ভুত থমথমে। একটু পরপর পুলিশি চেকপোস্ট। গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চলছে।মনে হয় শহরে বড় কিছু ঘটেছে।
আনন্দী কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো যানবাহন না পেয়ে হাঁটতে শুরু করে। ভাবলো, একটু সামনে গেলেই হয়তো রিকশা পাওয়া যাবে।কিন্তু কষ্টের বিষয় হলো, এদিকে রাস্তা একদম ফাঁকা। কোনো চেকপোস্ট ও নেই। আর যানবাহন ও নেই। একটু ভিআইপি এলাকার মধ্যে পড়ে তাই হয়তো এখানে এতোটা নীরবতা। তার উপরে দাদা সাহেবের দাপট রয়েছে। চেকপোস্ট বসলে ও আর কী হতো?যেই লাউ, সেই কদু! যেই অপকর্মে মন্ত্রীরা জড়িত, সেই অপর্কমের সমাপ্তি নেই। ওগুলো শুধু সিনামাতেই সমাপ্তি ঘটে। বাস্তবে তো জোর যার মূলক তার।
উন্মাদনা পর্ব ২৩
ধীরে ধীরে রাস্তা ধরে এগোতে থাকে আনন্দী।বিকেলের আলো তখন ফিকে হয়ে আসছে। চারপাশে অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা। আজ এতোটা শূন্য কেন রাস্তাটি? কেমন যেন খা খা করছে এই শূন্যতা। হাজারটি প্রশ্ন মাথায় চলতে থাকে আনন্দীর।ঠিক তখনই, হঠাৎ পেছন থেকে কেউ শক্ত করে তার কাঁধ চেপে ধরে।আনন্দীর পুরো শরীর কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে আতঙ্ক। সে ঘুরে তাকানোর আগেই কানের কাছে নিচু, পরিচিত কন্ঠস্বর ভেসে ভেসে আসে,
“ আমার ও বউ নাই, তোমার ও জামাই নাই, চলো আমরা সংসার কইরা খাই! ”
