উন্মাদনা পর্ব ২৫
কায়নাত খান কবিতা
আমার ও বউ নাই, তোমার ও জামাই নাই, চলো আমরা সংসার কইরা খাই।”
হঠাৎ কাঁধে হাত পড়তেই তড়িৎ গতিতে পিছনে তাকায় আনন্দী।আর তাকিয়েই বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়।মুখে সেই চেনা হালকা হাসি, চোখে অদ্ভুত নির্লিপ্ত ভাব। যেন কিছুই হয়নি। যেন তাদের মাঝে কোনো ভয়, ঘৃণা, আতঙ্কের সম্পর্ক নেই।
অভী স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই আনন্দীর ঘাড়ের পেছনে হাত রেখে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে।
দূর থেকে দেখলে মনে হবে তারা খুব কাছের মানুষ। হয়তো ছোটবেলার বন্ধু। হয়তো বহুদিনের সম্পর্ক।
এমনভাবে হাঁটছে সে, যেন ছোটোবেলা থেকেই একসাথে বড় হয়েছে দু’জন। যেন এই স্পর্শে আনন্দীর কোনো অস্বস্তি থাকার কথা না।
এক ঝটকায় নিজের কাঁধ থেকে অভীর হাত সরিয়ে দেয় আনন্দী।তার চোখে তখন স্পষ্ট ঘৃণা আর বিরক্তি।
একবারও পিছনে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করে সে। স্যান্ডেলের শব্দগুলো রাস্তায় ঠকঠক করে বাজতে থাকে। যেন প্রতিটা পদক্ষেপে সে অভী থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে।অভী বোমভোলার মতো দাড়িয়ে বলল, _বা’ন্দী কামডা করলো কী! চাঁদেরে ইগনর করলো!”
অভী থামে না।কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে আবার আনন্দীর পিছনে হাঁটতে শুরু করে।
“ এ বোকাচন্দ্র! ভাব কারে দেখাস?”
আনন্দীর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“রাস্তার কুকুরকে…”
অভী এক ভ্রু তুলে। তারপর ইচ্ছে করেই চারপাশে তাকাল।ডানে, বাঁয়ে, ফাঁকা রাস্তাটার দিকে। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল তার,
“রাস্তায় তো একটা কুত্তাও নাই,” সে অলস ভঙ্গিতে বলল।তার কণ্ঠে বিদ্রূপ ছিল, আর সেই বিদ্রূপ যেন আরও বেশি করে জ্বালিয়ে দিল আনন্দীকে।
এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইল সে। বাতাসে তার ওড়নার কোণা হালকা উড়তে শুরু করলো। তারপর খুব ধীরে মুখ তুলল আনন্দী। চোখদুটো সরাসরি গিয়ে থামল অভীর চোখে।
“নিজের দিকে তাকিয়ে দেখুন।”
অভীর চোখ দুটো হঠাৎই সরু হয়ে এল। চোয়াল শক্ত করে এক পা এগিয়ে এসে সে নিচু, গলায় বলল,
“হবুত বাড়ছোস তুই, শেখের বেটি…”
কথাটার মধ্যে ছিল স্পষ্ট হুমকি। চারপাশের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। দূরে চলন্ত গাড়ির শব্দ থাকলেও এই মুহূর্তে দু’জনের মাঝখানের
উত্তেজনাটাই বেশি স্পষ্ট।আনন্দী ধীরে মাথা তুলল। ভয় পাওয়ার বদলে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু, তাচ্ছিল্যের হাসি।
“সত্যি কথা শুনতে না পারলে রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক,” সে শান্ত স্বরে বলল।
অভীর আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। চোখে সেই চেনা আগুন। কিন্তু আনন্দী এবারও একচুল পিছু হটল না। রাস্তার হলদে আলোয় তাকে অদ্ভুত দৃঢ় লাগছিল।যেন ঝড়ের মাঝেও সোজা দাঁড়িয়ে থাকা কোনো গাছ।
“ তোর জন্য একটা গিফট আছে শেখের বেটি।”
কথাটা বলেই অভী আচমকা আনন্দীর কবজি চেপে ধরল। এতটাই হঠাৎ, আনন্দী প্রথম কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না কী হচ্ছে। তারপর যখন অভী তাকে টেনে সামনে এগোতে শুরু করল, তখন তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। বিকেলের বাতাসে ধুলো আর পেট্রোলের গন্ধ মিশে আছে।
রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোর আলো ফাঁকা রাস্তায় লম্বা ছায়া ফেলছে। অভীর হাতের চাপ ক্রমশ শক্ত হচ্ছে, যেন সে এক মুহূর্তের জন্যও আনন্দীকে ছাড়ার ইচ্ছে রাখে না।
শুরুতে আনন্দীর মাথায় এসেছিল চিৎকার করার কথা। গলা ফাটিয়ে সাহায্য চাইবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই ভাবনা মিলিয়ে গেল। এই নির্জন রাস্তায় চিৎকার মানে শুধু নিজের শক্তি নষ্ট করা। কেউ আসবে না। কেউ শুনলেও জড়াবে না।তাই নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে সে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
অভী থামল না। হাঁটতে হাঁটতেই ঠান্ডা স্বরে বলল,
“কাল মুখে থুথু দিলি। একটা রিটার্ন গিফট তো তোর পাওনা আছে।”
আনন্দীর ভ্রু কুঁচকে গেল!
“মানে?”
কোনো উত্তর দিল না অভী। বাইকের কাছে পৌঁছেই সে আনন্দীকে প্রায় জোর করেই পেছনে বসাল। তারপর নিজের কালো জ্যাকেট খুলে নিল। আনন্দী কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই জ্যাকেটটা পাকিয়ে দু’জনের কোমরের চারপাশে শক্ত করে বেঁধে ফেলল।
আনন্দী হতভম্ব হয়ে তাকাল।
“কী করছেন, অভী?”
অভী বাইকের হ্যান্ডেলে হাত রেখে নির্বিকার গলায় বলল,
“আপাতত কিছু না। করলে দেখবি।”
“মানে?”
ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দিতে অভী হালকা হাসল।
“মানে কাকের মাথা, বকের ঠ্যাং।”
তার গলায় এমন এক উদাসীনতা ছিল, যেন পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে নিছক খেলা।আনন্দীর কথা আর কানে তুলল না সে। বাইকটা গর্জন তুলে ছুটে গেল রাতের ফাঁকা রাস্তায়।
শহরের বড় রাস্তা এড়িয়ে অভী একটার পর একটা সরু গলিতে ঢুকতে লাগল। কোথাও আধো অন্ধকার, কোথাও ঝুলে থাকা নষ্ট সাইনবোর্ড, কোথাও ড্রেনের গন্ধ মিশে থাকা স্যাঁতসেঁতে বাতাস। দূরে দূরে পুলিশের চেকপোস্টের লাল-নীল আলো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু অভী যেন আগেভাগেই জানে কোন রাস্তা এড়িয়ে যেতে হবে।
তার মধ্যে অদ্ভুত এক দক্ষতা আছে—শহরের এমন সব অলিগলি সে চেনে, যেগুলোর অস্তিত্ব বেশিরভাগ মানুষ জানেই না। যেন এই অন্ধকার শহরটার ভেতরে আরেকটা গোপন শহর আছে, আর অভী সেই শহরের প্রতিটা পথ মুখস্থ জানে।
আনন্দী চুপচাপ বসে রইল। বাইকের গতির সঙ্গে তার চুল উড়ছে, বুকের ভেতর অস্বস্তি জমে উঠছে ধীরে ধীরে। কারণ সে বুঝতে পারছে না—অভী তাকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। আর তার থেকেও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, অভীর চোখে এই মুহূর্তে কোনো রাগ নেই।
কিছুক্ষণ পর অভী বাইকটা শহরের পরিচিত আলোর ভিড় ছেড়ে আরও ভেতরের দিকে নিতে শুরু করল। রাস্তা ধীরে ধীরে সরু হয়ে আসছে। পুরোনো, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলো মাথার উপর ঝুঁকে আছে যেন। কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও আধভাঙা বারান্দা থেকে লালচে আলো ঝুলে পড়ছে নিচে।
বাতাসের গন্ধও বদলে গেছে। সিগারেটের ধোঁয়া, সস্তা আতরের তীব্র গন্ধ আর পুরোনো স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের গন্ধ মিশে একটা ভারী আবহ তৈরি করেছে।
বাইকটা একটা গলির ভেতর ঢুকতেই আনন্দীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে তার গলা শুকিয়ে এল। কারও ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, কারও চোখে অতিরিক্ত কাজল, কেউ বা অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে ডাকছে পথচারীদের। তাদের হাসির মধ্যে ক্লান্তি আছে, চোখের ভেতরে জমে আছে বহু রাতের না বলা গল্প।এক মুহূর্তেই আনন্দী বুঝে গেল জায়গাটা কী।নিষিদ্ধ পল্লি।
উন্মাদনা পর্ব ২৪
তার আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে চেপে ধরল বাইকের সিট। শরীরের ভেতর অস্বস্তির ঢেউ বয়ে গেল।এই জায়গায় ভালো মানুষ আসে না—এটাই সমাজ বলে। অথচ যারা আসে, তাদের অনেকেই আবার সেই তথাকথিত ভালো পরিবারের সন্তান। দিনের আলোয় ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকা মানুষগুলোই রাত নামলে এই অন্ধকার গলিগুলোর পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে।
বাইকটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। চারপাশের দৃষ্টি যেন আনন্দীর গায়ে এসে বিঁধছে। আর তার পাশে বসে থাকা অভী। অদ্ভুতভাবে শান্ত। যেন এই অন্ধকার, এই গলি, এই মানুষগুলো তার কাছে নতুন কিছু।
“ আমরা এখানে কেন এসেছি অভী?”’
“ তোরে বিক্রি করতে’’
