Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৪৪

উন্মাদনা পর্ব ৪৪

উন্মাদনা পর্ব ৪৪
কায়নাত খান কবিতা

“ পা ঘেঁষাঘেঁষি করলেই কেউ প্রেগন্যান্ট হয় না, সোনামনি!’’
অভীর কথাগুলো শুনে যেন সময়ের স্রোত থমকে গেল আনন্দীর কাছে। বিস্ময়ে তার দুটি চোখ স্থির হয়ে রইল অভীর মুখে। শব্দগুলো কানে পৌঁছালেও সেগুলোর অর্থ যেন এখনো তার মস্তিষ্কে জায়গা করে নিতে পারেনি। সে শুধু নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অবিশ্বাস, বিস্ময় আর অজস্র প্রশ্ন নিয়ে।
পরক্ষণেই অভী হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে ছিলো স্বাভাবিকতার ছোঁয়া, যেন ভারী হয়ে ওঠা মুহূর্তটাকে একটু হালকা করে দেওয়ার চেষ্টা। হাসতে হাসতেই সে আলতো করে আনন্দীকে উঠে বসতে সাহায্য করল।কিন্তু আনন্দী তখনও যেন বাস্তব আর কল্পনার মাঝখানে কোথাও আটকে আছে। তার ভেতরে একের পর এক প্রশ্নের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। অভী এমন কথা বলল কেন? এতক্ষণ ধরে সে কী বোঝাতে চাইছিলো? নাকি এমন কোনো সত্যের সামনে তাকে দাঁড় করাতে চাইছে, যা এতদিন সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারেনি?

সে শুধু চুপচাপ অভীর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, এই মানুষটাকে সে এতদিন দেখেছে ঠিকই, অথচ কোনোদিন সত্যিকার অর্থে চিনতে পারেনি।
কোনো উত্তর না দিয়ে অভী ধীর ভঙ্গিতে পাশ থেকে নিজের ফোনটা তুলে আনন্দীর হাতে ধরিয়ে দেয়।আবারও সেই ভিডিও।ভিডিওটির এক ঝলক দেখেই অস্বস্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিল আনন্দী। মনে হলো, আর একবারও সেই স্মৃতির মুখোমুখি হওয়ার সাহস তার নেই। অভী ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে আঙুলের গাঁট দিয়ে আলতো করে তার মাথায় টোকা দেয়।
“চুপচাপ দেখ, বোকাচন্দ্র।”
আনন্দীর ঠোঁট কাঁপল।
“বারবার নিজের…”

বাকিটুকু আর উচ্চারণ করতে পারল না। গলা যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে এলো। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দুগুলো নীরবে চিকচিক করে উঠল।
এবার অভী আর কোনো রসিকতা করল না। নিঃশব্দে আনন্দীকে নিজের কোলে টেনে নিল, যাতে সে স্বস্তিতে বসে ভিডিওটি দেখতে পারে। তারপর ফোনের পর্দাটা তার সামনে স্থির করে ধরল।ভিডিও চলতে শুরু করে।
প্রথমেই ভেসে এলো আনন্দীর আতঙ্কে কাঁপা কণ্ঠস্বর। সেই পরিচিত শব্দগুলো যেন ফিরে এসে তার বুকের গভীরে তীব্র আঘাত হানল। অজান্তেই অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল, ততই বদলে যেতে লাগল তার অভিব্যক্তি।কান্না ধীরে ধীরে স্তব্ধ হলো।অস্থির চোখ দুটি নিবিষ্ট হয়ে রইল পর্দার দিকে।সে গভীর মনোযোগে দেখতে লাগল প্রতিটি মুহূর্ত। অভীর প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি সংযত পদক্ষেপ, প্রতিটি সচেতন দূরত্ব। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই সুযোগের অপব্যবহার; আছে শুধু এক অদ্ভুত সতর্কতা, দায়িত্ববোধ আর আত্মসংযম।
প্রতিটি দৃশ্যের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দীর ভেতরে জমে থাকা ভুল ধারণাগুলো যেন একে একে ভেঙে পড়তে লাগল।ধীরে ধীরে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।একসময় ফোনের পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে সে মাথা তুলে তাকাল অভীর দিকে।

“ আমাদের মাঝে কিছুই হয় নি?”
অভী ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি টেনে বলল,
” কিছু হইলে খুশি হইতি?”
আনন্দীর ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোলো না।তার চোখ আবারও ফোনের পর্দায় ফিরে গেল।এতদিন ধরে যে ভয়, যে অপরাধবোধ, যে ভুল ধারণা তাকে প্রতিদিন ভেতর থেকে গ্রাস করেছে, সেগুলো একে একে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
সে স্পষ্ট দেখতে পেল প্রতিবার অচেতন হয়ে পড়ার পর অভী তাকে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করেছে, প্রয়োজনের বাইরে এক মুহূর্তের জন্যও সীমা অতিক্রম করেনি। তার সম্মান, তার অসহায় অবস্থার প্রতি যে শ্রদ্ধা দেখিয়েছে, তা শব্দে প্রকাশ করার মতো নয়। আনন্দী জ্ঞান হারাতেই অভী তাকে চুপচাপ বিছানায় সুইয়ে দিতো। তারপর কিছুটা অবচেতন অবস্থায় খাওয়াতো। চোখে কাপড় বেধে আনন্দীকে নিজের টিশার্ট পড়িয়ে রাখতো ইচ্ছে করে। আনন্দী একটু চোখ খুলতেই আবার ফোন নিয়ে ভিডিও রেকর্ড অফ করে ফেলতো অভী।
এভাবে মোট তিনবার করা হয়েছে তার সাথে এমন আচরণ। পরক্ষণেই আনন্দীর মনে পড়ে ভিডিও কলে অভী যখন তাকে ড্রেস খু লে সামনে দাঁড়াতে বলেছিলো সেদিনের কথা। আনন্দী কপাল কুঁচকে অভীর দিকে তাকিয়ে বলল,

‘ ভিডিও কলে সেদিন..?’
‘ চোখ বন্ধ ছিলো আমার। আর তুই তো কেঁদেই কূল পাস না, দেখবি কেমনে। কতবার কইলাম ভিডিও দেখ বা:ন্দী, ভিডিও দেখ বা’ন্দী। কিন্তু তুই তো তুই-ই! আবার নাচতে নাচতে থানাতে গেছিলি।”
অভীর দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আনন্দী।
“ ধরলাম না, ছুঁইলাম না, শুধু শুধু মাম:লা খাইতাম!”
আনন্দীর চোখের কোণ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রুর স্বচ্ছ রেখা। মনে হলো, এতদিনের জমে থাকা ভয়, সংশয় আর ভুল বোঝাবুঝিগুলো সেই অশ্রুর সঙ্গেই ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। তবু তার ঠোঁট নড়ল না। বলার মতো কোনো ভাষা যেন আর অবশিষ্ট নেই।অভী উঠে আনন্দীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। কোনো তাড়াহুড়ো নয়, কোনো অস্থিরতা নয় শুধু এক নিঃশব্দ আশ্বাস। তারপর আলতো করে আনন্দীর দুটো হাত নিজের মুঠোয় তুলে নিল।তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটুখানি কোমল হাসি।
“আমি মুসলিম, বোকাচন্দ্র।বিয়ার আগে মাইয়া ছোঁয়া হারাম আমার ধর্মে। জাতে হারামি হইলে ও, তালে ঠিক আছি।”

আনন্দী কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে অভীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কথাগুলো নিঃসন্দেহে খাটি ছিলো, কিন্তু তার মন যেন এখনো সেগুলো হালকাভাবে নেওয়ার অবস্থায় নেই। বুকের ভেতর জমে থাকা অজস্র প্রশ্নের ভার এখনো অটুট।সে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিল। গভীর একটা শ্বাস নিয়ে মনটা শক্ত করল। তারপর শান্ত, কিন্তু কাঁপা কণ্ঠে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“এতদিন… এতসব নাটক কেন করলেন, অভী?”
অভী একদম গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,
“বিয়া করার জন্য।”
আনন্দী কপাল কুঁচকে তাকাল।
“মানে?”
অভী বিরক্তির ভান করে মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
“আহ্, সোনামণি! কী প্রশ্ন ডাই না করলা! আমি বিয়ার কথা বললাম, আর তুমি নাচতে নাচতে যাইতা আমার সাথে? কাজীর সামনে কানলে পরে ফুকুটে মামলা খাইয়া না বইসা থাকতাম!”
“শুধু বিয়ে করার জন্য… এত কিছু করলেন?”
অভী কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

“ইয়েস।”
“কেন?”
এক মুহূর্তও দেরি করল না অভী।
“কারণ তুই ফর্সা।”
আনন্দীর চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল। বিয়ের কারণ কখনো এটা হতে পারে? সে ফর্সা তাই?
“এ্যা?”
“বাপের জন্মে খুঁজলেও এমন ফর্সা মেয়ে পাইতাম নাকি? বোকাচন্দ্র বুঝে না!”
অভীর শেষ কথাটা শুনেই আনন্দীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। মুহূর্তেই তার মুখ গাঢ় রাগে লাল হয়ে উঠল। কোনো সতর্কতা ছাড়াই দু’হাতে অভীকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে বসিয়ে দিল সে।রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠল,
“চোখের সামনে থেকে দূর হন!”
অভী মেঝেতে বসেই নির্বিকার মুখে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা হাসি টেনে বলল,
“সোনামনি… বাসর করব না?”
“আপনি বের হন তো!”
অভী বিস্ময়ের ভান করে ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আজব তো! করলামটা কী?”
কথাটা শুনে আনন্দীর যেন আরও রাগ চড়ে গেল। এতক্ষণ ধরে তার ভেতরে যে আবেগের ঝড় বইছিল, অভীর একেকটা কথায় যেন তাতে আরও আগুন জ্বলতে লাগল।অভী উঠে দাঁড়াতেই আনন্দী আবারও তাকে ধাক্কা দিতে দিতে দরজার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়!
“সোনামনি… বাসর?”
“বের হন! চোখের সামনে থেকে বের হন!”
একপর্যায়ে দরজা খুলে প্রায় ঠেলেই অভীকে বাইরে বের করে দেয় সে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।দরজার ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল অভী। ভেতর থেকে আর কোনো শব্দ এল না।

এদিকে আনন্দী ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। এতক্ষণ ধরে নিজেকে সামলে রাখলেও এবার আর পারল না। মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।তাহলে এত বছরের তাকে চোখে চোখে রাখার প্রধান কারণ কি শুধুই তার গায়ের রং?প্রশ্নটা বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
অথচ অভী নিজেও তো শ্যামলা। তবে কি সে সত্যিই শুধু ফর্সা বলেই আনন্দীকে বেছে নিয়েছিল?রাগ, অভিমান আর অদ্ভুত এক কষ্টে চোখের পানি থামলো না আনন্দীর। কাঁদতে কাঁদতেই একসময় ক্লান্ত শরীর ঘুমের কাছে হার মানলো।
বাইরে দাঁড়িয়ে অভী কিছুক্ষণ বন্ধ দরজার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ভেতরে থাকা মেয়েটার রাগ সে বুঝতে পারছিলো ঠিকই কিন্তু কী আর করার? ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠলেও চোখে ছিল অন্যরকম কোমলতা।আর কোনো শব্দ না করে সে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গ্যারেজের দিকে চলে যায় ।

উন্মাদনা পর্ব ৪৩

“ জাতির ব্রো এন্ড ভাবি এখন কী করতাছে কো দেখি!”
গ্যারাজে ঢুকতেই অভীর কানে পলাতক শহিদুলের কথা ভেসে আসে।এমনিতেই বউ তাড়িয়ে দিলো,তার উপরে তার শয়তান সাঙ্গপাঙ্গরা। অভী দাঁত পিষে বলে,
“ নিজের বা*ল! নিজেই ছিড়তাছে জাতির ব্রো!”

উন্মাদনা পর্ব ৪৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here