Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ১৭

এই অবেলায় পর্ব ১৭

এই অবেলায় পর্ব ১৭
সুমনা সাথী

রাত বাড়ছে। নিস্তব্ধতার বুক চিরে দূর থেকে ভেসে আসছে নাম না জানা সব নিশাচর প্রাণীর অদ্ভুত ডাক। নিযানা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশে আজ চাঁদও নেই; যেন প্রকৃতির এই ঘোর অমানিশা নিযানার মনের গহীনে জমে থাকা অন্ধকারেরই প্রতিচ্ছবি। মস্তিষ্কের কোণে কলরবের সেই বিঁধিয়ে বলা কথাগুলো বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধছে। নিযানা কি শুধুই একটা বস্তু? যাকে চাইলেই ড্রয়িংরুমের শোপিসের মতো ইচ্ছামতো সাজিয়ে রাখা যায় বা অবহেলায় এক কোণে সরিয়ে দেওয়া যায়? স্মৃতির পাতা ওল্টালে নিযানা দেখে, তার জীবনের লাগাম বরাবরই অন্য কেউ টেনে ধরেছে। কী পোশাক পরবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, এমনকি খাবারের তালিকায় কি থাকবে কতটা থাকবে; সবই ছিল এক অদৃশ্য নিয়মের শৃঙ্খলে বন্দি।

বাকি বন্ধুদের মতো হুট করে বিকেলের আকাশে ডানা মেলা তার কোনোদিন হয়ে ওঠেনি। এতকাল সব মুখ বুজে সয়ে নিলেও এবার ভেতরের অভিমানটা আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুটছে। যে সম্পর্কের কোনো ভিত্তি নেই। যেখানে কলরবের মনে অন্য কেউ আছে। সেই সত্যটা জেনেও কেন তাকে এই অনিশ্চিত গন্তব্যে ঠেলে দেওয়া হলো? মায়ের ওপর জমে থাকা এক পাহাড় সমান অভিমান তাকে পাথর করে দিয়েছে। বাবার মুখ চেয়ে এখানে এলেও নিযানা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে। আনতাসার সাথে সে আর কথা বলবে না। যেখানে অনুভূতির কোনো মূল্য নেই, সেখানে অভিযোগ করে আর কী লাভ? আনতাসা হয়তো ভাবছেন তিনি মেয়ের জন্য সঠিক সিন্ধান্ত নিয়েছেন কিন্তু নিযানা ভাবছে অন্য কথা। ভালোবাসা আর সম্মানহীন এই অদ্ভুত সম্পর্কের শেষ কোথায়? শূন্যতার হাহাকারে অজান্তেই দু-ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গাল বেয়ে চিবুকে এসে থমকে দাঁড়াল। কাঁপা হাতে সে আবার ফোনটা তুলে নিল। কলরবের নাম্বারটা ডায়াল করতেই সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো ‘সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়’। ছেলেটা এত উগ্র কেন? নিযানা তো অন্তত লোকসমাজে স্বাভাবিক থাকার অভিনয়টুকু চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কলরব কেন সব ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে? হঠাতই একটা তীব্র ভয় নিযানাকে ভাবিয়ে তুলল। ছেলেটা রাগের মাথায় নিজের কোনো ক্ষতি করে বসবে না তো?

অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের হওয়ার পর থেকেই এক অদ্ভুত আড়ষ্টতা নবনীকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। মনের কোণে বারবার সেই মুহূর্তটা ফিরে আসছে। অত লোকের সামনে, অতগুলো উৎসুক চোখের সামনে সে নিজে থেকে তাকে কোলে নেওয়ার কথা বলেছিল! ভাবতেই লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে সে। মনে হচ্ছে পায়ের নিচের মাটি যদি দু-ভাগ হয়ে যেত; তবে অনায়াসেই সেই অতলে নিজেকে লুকিয়ে ফেলত। বিপরীতে দিব্যর চেহারা যেন পাথরে খোদাই করা এক নিস্পৃহ মূর্তি, ভাবলেশহীন। বাসায় ফিরেই নবনী দীর্ঘ সময় নিয়ে শাওয়ার নিল। শরীরে পানির ধারায় মনের সব দ্বিধা ধুয়ে ফেলার বৃথা চেষ্টা। ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখল দিয়া খাটের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে। ছোট্ট মুখখানিতে চিন্তার গাঢ় ছায়া। নবনী সিক্ত চুলে এগিয়ে গিয়ে নরম স্বরে শুধাল,
‘কী হয়েছে সোনা? তোমাকে এমন চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?’
দিয়া ঝটপট উঠে দাঁড়াল। নবনীর কোমরের সমান উচ্চতা তার। খাটে থাকায় কিছুটা সমতায় আসলো। ভঙ্গিটা বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ। নিজের ছোট্ট দু-হাত কোমরে বেঁধে প্রশ্ন করল,

‘তোমার আর কষ্ট হচ্ছে না তো মাম্মা?’
নবনী হাসল। চুলে তোয়ালে জড়িয়ে মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করল তাকে। মুহূর্তে দিয়া হাত বাড়িয়ে আবদার করল,
‘তোয়ালেটা আমাকে দাও তো।’
নবনী কিছুটা অবাক হয়ে বলল, ‘এটা তো ভেজা সোনা। তুমি এটা নিয়ে কী করবে?’
‘দাও না, প্লিজ মাম্মা!’
এমন আদুরে গলার আবদার অগ্রাহ্য করার সাধ্য নবনীর নেই। সে তোয়ালেটা ওর হাতে তুলে দিল। ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল দিব্য। তাকে দেখামাত্রই নবনী দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। লজ্জার আভা যেন তার গাল বেয়ে চিবুক ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই লোকটার চোখের দিকে সে এখন তাকাবে কী করে? দিয়া তখন তোয়ালেটা হাতে নিয়ে ঠিক নবনীর ঢঙে নিজের মাথায় চেপে ধরল এবং অদ্ভুতভাবে চুল ঝাড়ার অনুকরণ করতে শুরু করল। দৃশ্যটা দেখে নবনী আর দিব্য দুজনেই মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। নবনী থতমত খেয়ে বলে উঠল,

‘সোনা, একী করছ তুমি? ওটা তো একদম ভিজে! আমাকে দাও ওটা। তোমার মাথায় কি কিছু লেগেছে?’
দিয়া ছোট্ট হাত বাড়িয়ে ভেজা তোয়ালেটা ফেরত দিল। মুখে তার গভীর ভাবুকতা। কোনো এক গূঢ় রহস্যের সমাধান খুঁজছে যেন। বড় বড় চোখে নবনীর দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
‘আচ্ছা মাম্মা, আর কতদিন এভাবে ঝাড়লে আমার চুলগুলোও তোমার মতো বড় হবে? তোমার চুলগুলো আমার খুব পছন্দ।’
নবনীর ওষ্ঠাধরে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটে উঠল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দিব্য বলে উঠল,
‘এভাবে তো হবে না মাম্মা। তুমি যখন তোমার মাম্মার মতো বড় হবে; তখনই তোমার চুলগুলো ওমন লম্বা হবে। দিয়াকে তো এই ছোট চুলেই অনেক কিউট লাগে!’

দিয়া অমনি মাথা দুলে প্রতিবাদ জানাল, ‘না পাপ্পা, আমি কিউট হতে চাই না। আমি মাম্মার মতো বিউটিফুল হতে চাই।’
নবনী মৃদু হেঁসে দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে তার দুই গালে স্নেহের পরশ এঁকে দিল। আদুরে গলায় বলল,
‘তুমি তো মাম্মার চেয়েও বেশি বিউটিফুল সোনা। তুমি জানো না, দিয়া ইজ দ্য বেস্ট?’
কথাটা শেষ করেই অবচেতন মনে নবনীর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল দিব্যর ওপর। দেখল, দিব্যর চোখেমুখে এক অদ্ভুত কুটিল কৌতুক। সে সোফার দিকে এগোতে এগোতে গলার স্বরে কিছুটা বিদ্রূপ মিশিয়ে বলল,
‘কেউ একজন তো আমায় জ্ঞান দিচ্ছিল যে বাচ্চাদের সামনে এসব বলা ঠিক নয়। এখন দেখছি সেই মানুষটাই একই কাজ করছে। সেই ‘কেউ’টা ঠিক কে বলো তো?’

নবনী ঠোঁট টিপে হাসল। লোকটার ইগো আকাশচুম্বী! সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। দিব্য ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। রাত তো কম হয়নি। এই অসময়ে লোকটা কি কাজ নিয়ে রাত জাগবে? নবনী আর কথা না বাড়িয়ে দিয়াকে পাশে নিয়ে শুয়ে পড়ল। দীর্ঘক্ষণ ধরে রূপকথা আর নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে একসময় দিয়া ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল। শুয়ে থাকা অবস্থাতেই নবনীর নজর গেল দিব্যর দিকে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তার পূর্ণ মনোযোগ। পরনে একটা হালকা সবুজ রঙের টি-শার্ট, চুলগুলো বরাবরের মতোই গোছানো। এই হেয়ারস্টাইলটা যেন ওর ওকে দারুন মানায়। হঠাৎ নবনীর মনে হলো সে কি তবে একদৃষ্টে লোকটাকে দেখছে?পরক্ষণেই নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল। এতে তো কোনো দোষ নেই বরং তার অধিকার আছে। দিব্যর চিন্তাভাবনা, রুচি আর পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা নবনীকে বারবার মুগ্ধ করে। বিয়ের পর থেকে প্রতিটি পদক্ষেপে সে নবনীকে অবাক করেছে। বিস্মিত করেছে। বলতে হয় লোকটার মানসিকতা ভীষণ সুন্দর। ভাবনা, চিন্তায় নবনীর থেকে কয়েকগুন পরিণত। হঠাৎ নবনী লক্ষ্য করল। দিব্য কিছুটা বিরক্ত বোধ করছে। বারবার কপালে হাত দিচ্ছে। নবনী বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে দিব্যর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে একবার চোখ তুলে তাকাল। পরক্ষণেই আবার ল্যাপটপে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে যান্ত্রিক স্বরে সুধাল,

‘কিছু বলতে চাও?’
নবনীর বুকটা ধক করে উঠল। সেই চেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বর। শীতলতা মেশানো। দিব্য কি তবে রেগে আছে? নাকি সুপ্ত কোনো অভিমান তাকে ঘিরে ধরেছে? নবনীকে নিরুত্তর দেখে দিব্য ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই পুনরায় বলে উঠল,
‘এক কাজ করো, আগে বিছানায় গিয়ে শুয়ে শুয়ে ভালো করে ভেবে নাও কী বলবে। তারপর এসে না হয় বলো। আর শোনো নবনী। তোমার অতীত নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। তার বাইরে কিছু বলার থাকলে বলতে পারো।’
নবনীর বিরক্ত হলো বেজায়। এই লোকটা কি সবসময় নিজেকে অন্তর্যামী মনে করে? ইচ্ছা হলো মুখের ওপর বলে দিতে ‘সব তো আগে থেকেই জেনে বসে আছেন। নতুন করে আর জানবেনই বা কী!’ কিন্তু নবনী তো তেমন নয়। সে নিজের স্বভাবজাত নম্রতা বজায় রেখে শান্ত স্বরে বলল,

‘অনেক রাত হয়েছে। এখনো কাজ করছেন কেন? অন্তত এখন তো শুয়ে পড়া উচিত।’
দিব্য কিবোর্ড থেকে হাত সরাল। ক্লান্ত চোখে নবনীর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমি আসলে কলরবকে ট্র্যাক করার চেষ্টা করছি। ও মাঝেমধ্যেই হুটহাট নিরুদ্দেশ হয়ে যায় বলে ওর ফোনের সাথে আমার একটা কানেকশন রাখা ছিল। নিযানা ফোন করেছিল। ও ফুফুদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। এখনো ফেরেনি।’
নবনী অবাক হয়ে বলে ফেলল, ‘কিন্তু ভাইয়াকে তো বাড়িতে দেখলাম না!’
বলার পর মুহূর্তেই দিব্য যখন তীক্ষ্ণ নজরে ওর দিকে তাকাল, নবনী বুঝতে পারল সে কতটা কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো কথা বলেছে। অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে শুধরে নিল,
‘স্যরি, আমার বুঝতে ভুল হয়েছে। বাড়িতে থাকলে তো আর আপনি তাকে এভাবে খুঁজতেন না। তা… জানতে পারলেন কিছু?’

দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। বিরক্তির সুরে বলল,
‘কী বলব বুঝতে পারছি না। কোনোভাবে ও বুঝে ফেলেছে যে আমি ওর ফোনের সূত্র ধরে ওকে খুঁজে বের করব। ছেলেটার মাথা এসব বিষয়ে বড্ড বেশি কাজ করে। ও ফোনটা ফুফুদের বাড়িতেই ফেলে রেখে গেছে।’
নবনীর মনের কোণে এখন আশঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করেছে। কলরব যে মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাতে এই মাঝরাতে তার নিরুদ্দেশ হওয়াটা মোটেও স্বস্তির নয়। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে নবনী বলল,
‘তাহলে ও কোথায় যেতে পারে? দেখুন, আমার কিন্তু সত্যি খুব চিন্তা হচ্ছে।’
দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ‘আমার যে হচ্ছে না, তা নয়। তবে চিন্তার চেয়ে রাগই বেশি হচ্ছে। কেউ এতটা বেপরোয়া আচরণ কীভাবে করতে পারে? অতীতে যা-ই ঘটে থাকুক এখন তো একটা সামাজিক বন্ধন তৈরি হয়েছে। বিয়েটা ও মনেপ্রাণে না মানুক সেটা আলাদা বিষয়; কিন্তু এভাবে একটা মেয়েকে সবার সামনে অবহেলা আর অসম্মান করার কোনো অধিকার ওর নেই। ও তো আর ছোট বাচ্চা নয়। যথেষ্ট বয়স হয়েছে ওর।’

নবনী বলল, ‘আচ্ছা, আপনি একটু শান্ত হোন। আমার মনে হয় ওকে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত আপনাদের।’
দিব্য আর কোনো উত্তর দিল না। পুনরায় বাম হাতটা কপালে চেপে ধরল। নবনী লক্ষ্য করল। যন্ত্রণায় তার ভ্রু যুগল কুঁচকে আছে। সে আন্দাজ করে শুধাল,
‘আপনার কি খুব মাথা ব্যথা করছে?’
দিব্য সামান্য মাথা নেড়ে সায় দিল। নবনী বলল, ‘যদি খুব জরুরি কাজ না থাকে তবে এখন ল্যাপটপটা বন্ধ করে শুয়ে পড়ুন। আমি মলম বের করে দিচ্ছি। এভাবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে ব্যথাটা আরও বাড়বে।’
দিব্য আর দ্বিরুক্তি করল না। ক্লান্ত শরীরে উঠে দাঁড়িয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করল। ধীরপায়ে খাটের দিকে এগোতে এগোতে বিড়বিড় করে বলল,
‘আমার পরিচিত ওর সব কটা বন্ধুকে মেসেজ দিয়েছি কিন্তু কেউ ওর হদিস দিতে পারল না। আব্বুকে এখনো কিছু জানাইনি। জানি না ফুপি এতক্ষণে বাড়িতে ফোন করে সব বলে দিয়েছে কি না। কী এক আপদ বলো তো! উফ, মাথাটা মনে হচ্ছে দু-ভাগ হয়ে যাচ্ছে!’
নবনী মাথা নাড়ল। দিব্য খাটে গিয়ে বসার পর সে ড্রয়ার থেকে মলমটা বের করে আনল। ধীরপদে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে নরম গলায় প্রশ্ন করল,

‘ওষুধ খাবেন কি একটা?’
দিব্য আলতো করে মাথা নাড়ল। নবনী খানিকক্ষণ দ্বিধা নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর বলল,
‘আপনি চাইলে আমি একটু ম্যাসাজ করে দিতে পারি।’
দিব্যর নিস্পৃহ দৃষ্টি কয়েক পলক নবনীর মুখে থমকে রইল। তারপর নিঃশব্দে সম্মতি জানিয়ে মাথা দোলাল সে। নবনী মেইন সুইচ টিপে ঘরের উজ্জ্বল আলোটা নিভিয়ে দিয়ে ডিমলাইটের নীলচে আভা ছড়িয়ে দিল। অতঃপর বিছানায় পা তুলে বসতেই দিব্য ধীর স্বরে শুধাল,
‘মাইন্ড না করলে…আমি শুয়ে পড়ি?’
নবনী চট করে চোখ তুলে চাইল। দিব্যর গভীর চোখের মণি দুটো যেন ওর সত্তাকে খুঁটিয়ে দেখছে। সহসা কোনো উত্তর খুঁজে পেল না নবনী; এক অজানা আড়ষ্টতায় তার কণ্ঠনালি রুদ্ধ হয়ে এল। তাকে নিরুত্তর দেখে দিব্য পুনরায় বলল,
‘আচ্ছা ঠিক আছে। মলমটা আমাকে দাও। আমি নিজেই লাগিয়ে নিচ্ছি।’

নবনীর ঘোর কাটল। সে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, ‘না না, আমি মাইন্ড করব না। এতে আর এমন কী!’
দিব্য আর কোনো বাক্যব্যয় করল না। কিন্তু তার পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য নবনী মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে ধীরলয়ে নবনীর কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। আচমকা এই সান্নিধ্যে নবনীর পুরো শরীর কেঁপে উঠল। কোমর থেকে পা পর্যন্ত যেন অবশ হয়ে আসছে তার। শাড়ির পাতলা আবরণ ভেদ করে দিব্যর তপ্ত নিঃশ্বাস যখন তার উদর ছুঁয়ে গেল নবনীর সর্বাঙ্গে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি তীব্র হলো। দিব্য নবনীর থমথমে মুখের দিকে চেয়ে আরও গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,

‘কী হলো?’
নবনী সম্বিত ফিরে পেয়ে মাথা নাড়ল। কাঁপাকাঁপা হাতে মলম নিয়ে দিব্যর কপালে স্পর্শ করতেই সে দু-চোখ বুজে নিল। এক পশলা শীতল বৃষ্টির মতো এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাকে ঘিরে ধরল। এই মেয়েটা তাকে ভয় পায়। দিব্য তা জানে। অবনীর থেকে নবনী সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের। অবনী ছিল কঠোর প্রকৃতির। তার কথার ধরন ছিলো শক্ত। দিব্যর সঙ্গে অবনীর বিয়েটা যে পারিবারিক চাপে ছিলো। তা অবনী তার আচরণে বুঝিয়ে দিত বারবার। তবুও দিব্য চেষ্টা করত তার মন যুগিয়ে চলার। সমস্ত আবদার পূরণ করার। একটা নিটোল সুন্দর পরিবারের স্বপ্ন সে আজীবন দেখে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর; মানুষ যা চায়, তা কি সবসময় পায়? অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দিব্যর পৌরুষদীপ্ত চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল সে। ঘরে এখন নিস্তব্ধতা। নবনী এক অদ্ভুত অপরাধবোধে ভুগতে লাগল। তার আঙুলগুলো এখন আপন মনেই দিব্যর চুলে বিলি কাটছে। কপালে আঙুলের আলতো চাপে ব্যথা কমানোর আপ্রাণ চেষ্টা। নবনী একদম নিচু স্বরে বলে উঠল,

‘আই অ্যাম স্যরি…!’
দিব্য চোখ মেলল না। ও শরীরটাও একবিন্দু নড়ল না। কেবল গভীর তন্দ্রাচ্ছন্ন এক ভারী গলায় উচ্চারণ করল,
‘স্টপ নবনী… অনেক হয়েছে।’
নবনী দমল না। ধীরস্থির কণ্ঠে বাধা দিয়ে বলল, ‘উঁহু, আজ আমাকে বলতে দিন। না বললে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি থেকে যাবে।’
দিব্য এবার একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল। নবনী একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিজেকে গুছিয়ে নিল। তারপর পষ্ট স্বরে বলতে শুরু করল,

‘আমার জীবনে আপনি আর দিয়া ছাড়া বর্তমানে আর কারোর বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব নেই। অতীতকে আমি অনেক আগেই ধুলোবালিমাখা কোনো পুরনো ডায়েরির মতো পেছনে ফেলে এসেছি। আমি ভাবতাম আমি বুঝি ভীষণ শক্ত মনের মানুষ কিন্তু আজ উপলব্ধি করলাম আমি আসলে তেমনটা নই। মনের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকে বলুন? তবে বিশ্বাস করুন, অসীম বিয়ে করছে বলে আমি কাঁদিনি। আমার কান্নার কারণটা ছিল সম্পূর্ণ অন্য। এখন আপনি যদি আমায় বিশ্বাস না করেন। তবে আমার আর কিছু করার নেই। কিন্তু…!’
নবনীর কথার মাঝপথে দিব্য বলল, ‘কিন্তু কী?’
নবনী এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। ‘কিন্তু আমি মনেপ্রাণে চাই, আপনি অন্তত আমাকে বিশ্বাস করুন।’
‘আমি তোমাকে ভীষণ বিশ্বাস করি নবনী।’
নবনীর বিস্ময়ের সীমা রইল না। সে স্তব্ধ হয়ে মানুষটার শান্ত মুখপানে চেয়ে রইল। কত অবলীলায়, কত সহজভাবে কথাটা বলে দিল লোকটা! তার কি উচিত ছিল না একটু সন্দেহ করা? অন্তত একটা প্রশ্ন তো ছুড়ে দিতে পারত ‘তবে কাঁদছিলে কেন?’কোনো কৈফিয়ত না চেয়েই এত বড় একটা আস্থার কথা কীভাবে বলে দিল সে? নবনী যখন গভীর চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। ঠিক তখন নিঝুম ঘরের আবছা নীল আলোয় তার অগোচরেই দিব্য তালুকদারের ওষ্ঠাধরে এক চিলতে রহস্যময় কিন্তু তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে কলরব। উদোম গা তার। এলোমেলো চুলে তপ্ত রোদেরা ঝিলিক দিচ্ছে। কারো অনবরত এবং কর্কশ কণ্ঠের ডাকাডাকিতে ওর গভীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছে। যন্ত্রণায় মুহূর্তেই চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল সে। কণ্ঠস্বরটা চিনতে পারার পর বিরক্তির মাত্রাটা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। আধো-ঘুমে থেকেই চড়া গলায় ধমক দিয়ে উঠল কলরব,
‘সমস্যা কী তোর শান্ত? সকাল সকাল মেয়ে মানুষের মতো এমন চিঁ চিঁ করছিস কেন?’
শান্তর বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছাল। বন্ধুর এমন নির্লজ্জ উক্তিতে কপালে ভাঁজ ফেলে একটা বিশ্রী গালি গিলে ফেলল সে। দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল,

‘শালা, বলে কিনা সকাল! বেলা এখন এগারোটা বাজে। তুই কি আঙ্কেলের হাতে আজ খু ন হতে চাস?’
কথাটা কানে যেতেই কলরবের নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক যেন বৈদ্যুতিক শক খেল। মুহূর্তের মধ্যে বিছানায় ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল সে। ওর এমন আকস্মিক লাফে শান্ত আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অভিক দুজনেই চমকে উঠল। কালকের স্মৃতিগুলো একে একে মনের পর্দায় ভেসে উঠছে। ইরার সঙ্গে দেখা করার তীব্র তাড়নায় ফুফুদের বাড়ি থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। দেখাও হয়েছিল কিন্তু যা জানতে পারল তা সহ্য করার ক্ষমতা ওর ছিল না। সেই যন্ত্রণার দহন সইতে না পেরে শান্তর আশ্রয় নিয়েছিল। শান্ত, অভিক আর কলরব মিলে মদ্যপানও করেছিল কাল রাতে। তবে কলরব নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আকণ্ঠ ডুবেছিল নেশায়। অতঃপর বন্ধুর বাড়িতেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতেই কলরবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। নিজের বাড়িতে হলেও না হয় একটা অজুহাত খাড়া করা যেত কিন্তু সে তো কাল ছিল আনতাসাদের বাড়িতে! আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড সে কীভাবে করল? দু-হাতে মাথার চুল খামচে ধরে বলে উঠল,

এই অবেলায় পর্ব ১৬

‘শিট! এখন কী হবে?’
অভিক একপাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে ফোড়ন কাটল,
‘এই ‘কী হবে’টা কাজটা করার আগে ভাবা উচিত ছিল না?’
কলরব এবার অগ্নিদৃষ্টিতে অভিকের দিকে তাকাল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
‘এখন আমাকে নীতিবাক্য শুনিয়ে জ্ঞান দিস না। পারলে কোনো উপায় বের কর। নয়তো আজ বাড়ি ফিরলে তোদের তিনদিন পর আমার চল্লিশা খেতে যেতে হবে!’

এই অবেলায় পর্ব ১৮