এই অবেলায় পর্ব ১৮
সুমনা সাথী
কলরবের মস্তিষ্ক যেন এক নিরেট কোনো পাথরের দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে অনবরত। পরিস্থিতির গুরুত্ব যত প্রকট হচ্ছে তার ভেতরের অস্থিরতা ততটাই বাড়ছে। মন, মস্তিষ্ক উভয় স্থানে যেন আগুন জ্বলছে। শান্তর ঠাট্টা যেন সেই আগুনে ঘি ঢেলে দিল। সে বিদ্রূপের সুরে বলল,
‘তোর কি মনে হয় তুই এভাবে মরলে আঙ্কেল বড় করে তোর চল্লিশা করবেন? আমার তো মনে হয় তোর লাশটা বাড়ির সীমানায় ঢুকতে দিতেও তাঁর প্রবল আপত্তি থাকবে।’
কলরব রক্তচক্ষু মেলে শান্তর দিকে তাকাল। শান্তর মুখে হাসি লেগে আছে। পাশ থেকে অভিক পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টায় শান্ত গলায় বলল,
‘আরে, এত দুশ্চিন্তা করিস না তো। কোনো না কোনো একটা হিল্লে ঠিক হয়ে যাবে।’
কলরব আর বসে থাকতে পারল না। বিছানা ছেড়ে ঝটপট উঠে দাঁড়াল। মেঝের এক কোণে পড়ে থাকা কুঁচকানো শার্টটা তুলে নিয়ে গায়ে জড়ালো। অভিক আর শান্ত তখনো খাটে বসে ভাবুক ভঙ্গিতে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল অনন্ত। তিনজনকে এভাবে একসঙ্গে দেখে অনন্ত একটুও অবাক হলো না। যেন এই দৃশ্যটা সে আগে থেকেই কল্পনা করে এসেছিল। সরাসরি কলরবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
‘জানতাম তোদের এখানেই পাওয়া যাবে। কলরব, তোর কপালে এবার সত্যিই দুঃখ আছে রে। তুই কি জানিস কাল রাতে দিব্য ভাই পর্যন্ত তোর খোঁজ নিয়েছে? অন্তত শ্বশুরবাড়িতে ঠিকঠাক একটা রাত কাটিয়ে তারপর বাড়ি ফিরতে পারতিস। মাঝপথে নিরুদ্দেশ হওয়ার কী দরকার ছিল?’
কলরব একরাশ বিরক্তি নিয়ে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কিছু একটা বলতে যাবে ঠিক তখনই শান্ত বসা থেকে আক্ষরিক অর্থেই লাফিয়ে উঠল। তার চোখেমুখে অদ্ভুত উত্তেজনা। হাততালি দিয়ে বলে উঠল,
‘থাম, থাম! আমি একটা ফাটাফাটি আইডিয়া পেয়েছি!’
তিনটি জোড়া চোখে তখন কৌতূহল আর অস্থিরতার সংমিশ্রণ। শান্তর মুখের দিকে সবাই এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন সে কোনো মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচন করতে যাচ্ছে। শান্ত গম্ভীর মুখে বলল,
‘দিব্য ভাই কাল রাতে আমাকেও মেসেজ পাঠিয়েছিল। আমি তো ভয়ে রিপ্লাই করার সাহস পাইনি। তাহলে বাকি রইল কে? অভিক!’
অভিক কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ভ্রু কুঁচকাল। পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
‘তাতে কী?’
শান্ত অভিকের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আরে এটাই তো আসল সুযোগ। তোকে এখন একটা বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
‘কী দায়িত্ব?’
শান্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে ঘোষণা করল, ‘তোকে এখন সুইসাইড করার চেষ্টা করতে হবে!’
কথাটা শোনামাত্রই অভিক যেন আকাশ থেকে পড়লো। ছিটকে সরে গিয়ে চিৎকার করে বলল,
‘কী আজেবাজে বকছিস তুই? আমি কেন মরতে যাব। আমার মাথা খারাপ হয়েছে?’
কলরব আর অনন্তও বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে শান্তর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু শান্ত দমবার পাত্র নয়। সে নিজের যুক্তিতে অনড় থেকে বলল,
‘আরে বাবা, আসল কারণ হলো তোর প্রেমিকার অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেছে। সেই শোকে তুই এখন জান দিতে বসেছিস!’
অভিক রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক প্রচণ্ড কিল বসিয়ে দিল শান্তর পিঠে। দাঁতে দাঁত চেপে গালি দিয়ে বলল,
‘শালা চু তিয়া! আমার কোনো প্রেমিকা নেই সেটা তুই ভালো করেই জানিস। আর আমার কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে একটা সামান্য মেয়ের জন্য জীবন দিয়ে দেব? আমার সাথে কেউ এমন বেইমানি করলে আমি পরদিন ওর চেয়েও সুন্দরী কাউকে বিয়ে করে ওকে দেখিয়ে দেব। মরতে যাব কোন দুঃখে? হুহ্!’
শান্ত ব্যথায় ককিয়ে আর্তনাদ করে উঠল। পিঠ ডলতে ডলতে বলল,
‘আরে হারামজাদা, মারছিস কেন? পুরো পরিকল্পনাটা তো আগে শুনবি। আর এই বয়সে একটা প্রেমিকাও জোটাতে পারলি না? তোর তো লজ্জা পাওয়া উচিত। যা, গিয়ে বুড়িগঙ্গার পচা পানিতে ডুবে মরে আয়!’
অভিক চোখ সরু করে শান্তর দিকে তাকাল। ধীরস্থির গলায় প্রশ্ন করল,
‘তোর আছে? তোর প্রেমিকা কোথায়?’
শান্ত করুণ মুখে ডানে-বামে মাথা নাড়ল। অভিক মোক্ষম সুযোগ পেয়ে সজোরে একটা লাথি মারল শান্তর পায়ে। বিদ্রূপের সুরে বলল,
‘নিজে হলো আস্ত একটা বাপ্পারাজ! প্রেম করার আগেই ছ্যাকা খেয়ে বসে আছে। সে এসেছে আবার আমাকে জ্ঞান দিতে। তুই যে কলরবের বর্তমান বউ অর্থাৎ আমাদের ভাবির পেছনে লাইন দিচ্ছিলি। সেই কথা কি আমরা কেউ জানি না ভেবেছিস? নষ্ট কোথাকার!’
কলরব ধমক বলল, ‘থামবি তোরা? শান্ত, যদি কোনো কাজের উপায় থাকে তবে বল। নয়তো আমাকে নিজের মতো ভাবতে দে।’
শান্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, ‘আমি তো সেটাই বলার চেষ্টা করছি। শোন, আমরা আঙ্কেলকে বলব যে অভিক কাল রাতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। কারণ ওর প্রেমিকার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে গেছে। আর বন্ধু হিসেবে তুই আর আমি সারা রাত ওর পাশে থেকে ওকে সামলেছি। এই গল্পটা বিশ্বাসযোগ্য ও হবে আর অন্তত কিছুটা রেহাই পাওয়া যাবে। কী বলিস? কি ভালো আইডিয়া দিয়েছি তাইনা?’
অভিক মুখ বাঁকিয়ে প্রতিবাদ করল, ‘এটা চরম ফালতু একটা আইডিয়া! আঙ্কেলের সামনে আমার অসম্মান হয়ে যাবে। কী অবস্থা হবে ভেবে দেখেছিস?’
অনন্ত পাশ থেকে ফিক করে হেসে দিল, ‘যার সম্মানই নেই তার আবার কিসের অসম্মান? আইডিয়াটা কিন্তু মন্দ না। বন্ধুর বিপদে এতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে পারবি না?’
‘তাহলে তুই কর না। নয়তো শান্ত করুক!’
শান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমাদের দিয়ে যদি হতো। তবে তো হয়েই যেত। একটু পরিস্থিতি টা বোঝ ভাই।’
অভিক ‘না’ বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার নজর পড়ল কলরবের অসহায় দুটি চোখের দিকে। কলরব নিঃশব্দে যেন চোখের ভাষায় মিনতি করছে ‘প্লিজ বন্ধু, বাঁচা!’ অভিক আর না পেরে বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
‘একদম ওভাবে তাকাবি না কলরব। ধ্যাৎ! ঠিক আছে। যা খুশি বলিস।’
মুহূর্তেই কলরব, শান্ত আর অনন্তর মিলিত অট্টহাসিতে ঘরটা মুখরিত হয়ে উঠল। সেই সাজানো ছক অনুযায়ী কলরব ফিরে এল আনতাসাদের বাড়িতে। সাথে করে শান্তকেও নিয়ে এল সাক্ষী হিসেবে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই মুখোমুখি হলো আরশাদ তালুকদার আর কাব্যর। ওরা আনতাসার সাথে আলোচনায় মগ্ন ছিল। কলরব তাদের সাজানো গল্পটা বেশ গুছিয়ে বলল। কীভাবে বন্ধুর জীবন বাঁচাতে সে সারা রাত ব্যস্ত ছিল। শান্তও পাশে থেকে বন্ধুত্বের মহিমা কীর্তন করল। আরশাদ তালুকদার শেষ পর্যন্ত খুব একটা কড়া কথা বললেন না। তিনি কাব্যকে নিয়ে চলে গেলেন। নিযানাকে নিয়ে কালই কলরবকে বাড়ি ফেরার নির্দেশ দিয়ে গেলেন। কলরব বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লো। ঘরে ঢুকে দেখল নিযানা ল্যাপটপ কোলে নিয়ে খাটে বসে আছে। পাশে কুহু। কলরবকে দেখামাত্রই কুহু চঞ্চল হয়ে উঠল,
‘ওই তো, ভাইয়া চলে এসেছে! কোথায় মরে ছিলিস তুই সারা রাত?’
কলরব বিরক্তিতে মুখ কুঁচকাল, ‘তোকে সব কৈফিয়ত দিতে হবে? কে তুই? দূর হ সামনে থেকে।’
কুহু মুখ ভেঙিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ঘরে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। নিযানা স্থির দৃষ্টিতে কলরবের দিকে তাকাল। সারা রাত দুশ্চিন্তায় আর নিজের জীবনের অনিশ্চয়তার কথা ভেবে সে এক ফোঁটা ঘুমাতে পারেনি। অথচ কলরবের চোখেমুখে তার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। কলরব নিযানার দিকে একবার ফিরেও তাকাল না। অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে ব্যাগ থেকে জামাকাপড় বের করে সোজা ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। নিযানা লক্ষ্য করল। কলরব যখন কাপড় বের করছিল তখন তার ফোনটাও ব্যাগ থেকে বের করে বিছানায় রেখে গেছে। নিযানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার আর বুঝতে বাকি রইল না যে কেন সারা রাত এতবার ফোন করার পরেও ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সকাল থেকেই তালুকদার বাড়িতে ব্যস্ততার ধুম পড়েছে। বাজারের থলি উপচে পড়ছে তাজা শাকসবজি আর রকমারি রান্নার জিনিসে। নবনী আর মিলু মিলে সেগুলো গুছিয়ে রাখছিল। ড্রয়িংরুমে অলেখা কিছুটা মুখ ভার করে বসে আছেন; পাশে বসে মাজহা অনুচ্চ স্বরে গল্প করে তাঁর মন ভোলানোর চেষ্টা করছেন। হঠাৎ সেই নিস্তরঙ্গ শান্ত পরিবেশে মৌনিতার তীব্র চিৎকার শোনা গেল,
‘একী কাণ্ড করেছো তোমরা!’
চিৎকার শুনে সবাই আতঙ্কে তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরের দিকে ছুটল। সেখানে পা রাখতেই সবার চোক্ষু চড়কগাছ! ড্রয়িংরুমের নির্বিকতা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল দৃশ্যটা দেখে। রান্নাঘরের মেঝেতে দিয়া, ইহান আর ইভান একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটু আগে মিলু এক খাঁচি ডিম এনে রেখেছিল ফ্রিজে তোলার অপেক্ষায়। তার অর্ধেকই এখন মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। হলুদ কুসুম আর সাদা লালায় মেঝেময় এক বিচ্ছিরি অবস্থা। দিয়া আর ইহানের হাতেও তখনো ভাঙা ডিমের অবশিষ্টাংশ লেগে আছে। কেবল ইভান একপাশে অপরাধবোধ আর বিরক্তি নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। নবনী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বলল,
‘এসব কী করেছো তোমরা? এভাবে এতগুলো ডিম কেন ফাটালে?’
দিয়া হাসি মুখে উত্তর দিল, ‘তুমি জানো মাম্মা? ইভান বলেছে ডিম থেকে নাকি বাচ্চা হয়! তাই ইহান আর আমি মিলে অনেকক্ষণ ধরে ডিমগুলো থেকে বাচ্চা বের করার চেষ্টা করছি। কিন্তু দেখো। কোথাও কোনো বাচ্চা নেই!’
ইহানও তড়িৎ দিয়ার সুরে সুর মেলাল, ‘হ্যাঁ চাচি, ইভান কিচ্ছু জানে না। ও আমাদের একদম মিথ্যা কথা বলেছে। সব দোষ ওর!’
ইভান বিরক্তচোখে দুই ভাই-বোনের দিকে তাকাল। সে বইয়ের পাতায় পড়েছিল ডিম থেকে বাচ্চা হয়। উত্তেজনার বশে সেটা দিয়া আর ইহানকে বলতেই যে এমন প্রলয়কাণ্ড ঘটে যাবে; তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। ইভান গম্ভীর গলায় বলল,
‘তোরা দুজন আস্ত বুদ্ধু! আমি মোটেও মিথ্যা বলিনি। ডিম থেকেই বাচ্চা হয়। কিন্তু সেটা কি আর এভাবে আছাড় মেরে ফাটালে হয়? বোকা কোথাকার! আমি ঠিক বলেছি না আম্মু?’
মৌনিতা তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। চোখের সামনে এতগুলো ডিম নষ্ট হওয়ার শোকে সে প্রায় দিশেহারা। ইহানের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে উঠল,
‘তোরা একী কাণ্ড করলি বল তো? ইহান, তোকে না বারণ করেছিলাম রান্নাঘরে ঢুকতে? কতগুলো ডিম এক নিমেষে সাবাড় করে দিলি! আল্লাহ, এই ছেলেটাকে নিয়ে আমি এখন কী করব?’
মায়ের ধমক খেয়ে ইহান এক দৌড়ে রান্নাঘর থেকে পালাল। তার পিছু পিছু ইভানও প্রস্থান করল। কিন্তু দিয়া নড়ল না। সে নিজের ছোট্ট দু-হাত কোমরে বেঁধে বিজ্ঞের মতো দাঁড়িয়ে রইল। নবনী, মিলু আর মৌনিতা মিলে যখন মেঝে পরিষ্কার করতে শুরু করল। তখনো দিয়াকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৌনিতা বলল,
‘তোর আবার কী হলো? ওভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?’
দিয়া অত্যন্ত গম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুড়ল, ‘চাচি, তুমি কি জানো না চিটিং করা একদম ভালো কাজ নয়?’
মৌনিতা আকাশ থেকে পড়ল, ‘আমি আবার তোর সাথে কোথায় চিটিং করলাম?’
‘এই যে করলে! তুমি ছেলেদের নিয়ে কী করবে; সেটা আল্লাহকে কেন জিজ্ঞেস করলে? তুমিও কি চাচ্চুর মতো কিচ্ছু জানো না?’
মৌনিতা কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। দিয়ার এমন কথায় হাসির রোল উঠল রান্নাঘরে। দিয়া কারো দিকে না তাকিয়ে নিজের ভঙ্গিতে হেঁটে ওখান থেকে বেরিয়ে গেল।
বিকেল পাঁচটার রাঙা রোদ্দুর জানলার কাঁচ ভেদ করে রুমের কার্পেটে লুটোপুটি খাচ্ছে। সোফায় বসে নবনী দিয়ার চুলগুলো বেঁধে দিচ্ছিল। মা-মেয়ের খুনসুটি আর খিলখিল হাসিতে ঘরটা প্রাণবন্ত। ঠিক সেই মুহূর্তেই দিব্যর প্রবেশ। দরজার শব্দ পেতেই হাসির কলতান স্তব্ধ হয়ে গেল। দুইজনেই হঠাৎ কেমন আড়ষ্ট আর চুপচাপ হয়েগেল। দিব্যর তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না কিছুই। দরজার ওপাশ থেকে সে স্পষ্ট শুনেছে তাদের উচ্ছ্বল কণ্ঠস্বর অথচ তাকে দেখামাত্রই এই নীরবতা! সে গায়ের কোটটা আলগা করে সোফার একপাশে রেখে গাম্ভীর্য বজায় রেখেই ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসতেই দেখল। মা-মেয়ের মধ্যে ইশারায় কোনো এক গোপন শলাপরামর্শ চলছে। দিয়া চোখ নাড়িয়ে নবনীকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে। আর নবনীও মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে। দিব্য তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বাঁকা চোখে চেয়ে শুধাল,
‘কী চলছে এখানে? কোনো বিশেষ ষড়যন্ত্র? সরাসরি কেউ আমাকে কিছু বলবে কি?’
দিয়া সোফা থেকে লাফিয়ে নামল। তারপর সেই নিজস্ব ভঙ্গিতে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আধো-আধো কণ্ঠে বলল,
‘পাপ্পা, অনেকদিন হয়ে গেছে দিয়া কোথাও ঘুরতে যায় না। দিয়া এবার পার্কে যেতে চায়। মাম্মাকে সাথে নিয়ে অনেক অনেক ঘুরতে চাই। দিয়া তো মাম্মার সাথে কখনও কোথাও বেড়াতে যায়নি!’
দিব্যর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে ধীরস্থিরভাবে বলল,
‘হ্যাঁ, সেটা তো অবশ্যই হওয়া উচিত। দিয়া যখন বলেছে তখন তো আমাদের যেতেই হবে। তবে মাম্মা, আজ নয়। আমরা বরং কাল যাই? পাপ্পাকে যে আজ একটু পরেই আবার জরুরি কাজে বের হতে হবে।’
দিয়া গাল ফুলিয়ে জেদ ধরল, ‘নাহ! আমি আজকেই যাব। এখনই যাব!’
নবনী নরম গলায় বোঝাতে লাগল, ‘সোনা, পাপ্পা তো বলছে কাল নিয়ে যাবে। কেন এমন জেদ করছ? তার চেয়ে এক কাজ করি আজ বরং আমি আর তুমি গিয়ে ঘুরে আসি। পাপ্পার তো অনেক জরুরি কাজ আছে, তাই না?’
দিয়া মানলো না৷ নবনীর হাত জড়িয়ে ধরে সজোরে মাথা নেড়ে বলল,
‘নাহ, আমি তোমাদের দুইজনের সাথেই ঘুরব। আর সেটা আজকেই। মাম্মা, পাপ্পা আর দিয়া আজকেই যাবে!’
নবনী এবার মহা মুশকিলে পড়ল। দিব্য যখন বলছে কাজ আছে তখন নিশ্চয়ই সেটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। নয়তো দিব্য তালুকদারের কাছে তার কলিজার টুকরো মেয়ের চেয়ে বড় আর কী হতে পারে? নবনী দিয়ার মন ভোলাতে আবার চেষ্টা করল,
‘সোনা, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না? শুধু মাম্মার সাথে গেলে কিন্তু অনেক বেশি মজা হবে। আমরা বরং ইহান, ইভান আর চাচিকেও সাথে নিয়ে নেব। কী বলো?’
দিব্যর নবনীর দিকে চেয়ে বলল, ‘তোমাদের একা যাওয়ার দরকার নেই। আমি তো বললাম কাল নিয়ে যাব। দিয়া, মিছিমিছি জেদ করো না মাম্মা। তুমি তো পাপ্পার গুড গার্ল, তাই না?’
দিয়া দু-পাশে প্রবল বেগে মাথা নেড়ে বলল, ‘তবে আমি শুধু মাম্মার সাথেই যাব। আজই যাব!’
দিব্যর অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষমেশ সম্মতির মাথা নাড়তে হলো। মেয়ের আবদার অগ্রাহ্য করার সাধ্য তার কোনোকালেই ছিল না। সে কিছুটা গম্ভীর স্বরেই বলল,
‘সাবধানে যেও। আমি বরং কায়েফকে বলে দিচ্ছি। ও-ই তোমাদের ঘুরিয়ে আনবে।’
দিয়ার খুশিতে তখন আটখানা অবস্থা! এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ইহান আর ইভানকে এই সংবাদটা দেওয়ার জন্য। দিব্য ড্রয়ার থেকে ল্যাপটপটা বের করে খাটের এক কোণে বসল। নবনী লক্ষ্য করল। আজকের দিব্য যেন অন্যদিনের চেয়েও খানিকটা বেশি গম্ভীর। সেই গাম্ভীর্যের আড়ালে দুশ্চিন্তার কোনো ছাপ আছে কি না; তা নবনীর সাধারণ চোখে ধরা পড়ল না। সে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে আলমারি খুলে একটা শাড়ি বের করল। হঠাৎ শান্ত ঘরটায় দিব্যর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো,
‘ওটা রাখো। অন্য একটা পরো।’
নবনী থমকে দাঁড়াল। কয়েক পলক শাড়িটার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো কথাটা তাকেই বলা হয়েছে। কিন্তু কেন? শাড়িটাতে কোনো খুঁত ছিল নাকি দিব্যর পছন্দের তালিকায় ওটা নেই? সে কোনো প্রশ্ন না করে বোকার মতো দু-পাশে মাথা নেড়ে শাড়িটা যথাস্থানে রেখে দিল। দিব্য ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই আচমকা প্রশ্ন করল,
‘নবনী, তুমি কি ড্রাইভ করতে পারো?’
নবনী অবাক হয়ে ফিরে তাকাল। ‘নাহ তো। কেন বলুন তো?’
‘তোমার ড্রাইভিং শেখা উচিত।’
নবনীর কৌতূহল বাড়ল। ‘কিন্তু হঠাৎ কেন?’
দিব্য সেই কেন’র কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। সংক্ষেপে বলল,
এই অবেলায় পর্ব ১৭
‘আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। যত দ্রুত সম্ভব শিখে নিও। তাছাড়া লাইসেন্সেরও একটা ব্যাপার আছে। আর হ্যাঁ, বাইরে দিয়ার দিকে খেয়াল রেখো।’
কথাটা শেষ করেই দিব্য ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। আলমারি থেকে নিজের পোশাক বের করলো। নবনীর খুব ইচ্ছে করছিল একবার সাহস করে জিজ্ঞেস করতে। কোথায় যাচ্ছেন আপনি? এত জরুরি কী কাজ? কিন্তু এক অজানা দ্বিধা আর সংকোচ তার কণ্ঠরোধ করে দিল।
