Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ১৯

এই অবেলায় পর্ব ১৯

এই অবেলায় পর্ব ১৯
সুমনা সাথী

আকাশের মেজাজ আজ বেশ ভারাক্রান্ত। সন্ধ্যা থেকেই ঝোড়ো বাতাসের বইছিল। তবে কিছুক্ষণ আগে থেকেই শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি। জানলার বাইরে প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ আর ঘরের ভেতরে বিরাজমান এক নিবিড় স্তব্ধতা। দিব্য যখন ঘরে ফিরল তখন সে বৃষ্টির পানিতে সিক্ত। জুবুথুবু অবস্থা। ঘরে ঢুকেই তার নজর গেল বিছানার দিকে; দেখল নবনী আর দিয়া পাশাপাশি অঘোরে ঘুমাচ্ছে। নবনীকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে ঘুমাতে না চেয়েও অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে তন্দ্রায় ডুবেছে। অপেক্ষা কি তবে তার জন্যই ছিল? নবনীর শান্ত ঘুমন্ত মুখখানি দেখে দিব্যর বুকের ভেতরটা এক অজানা স্বস্তিতে ভরে উঠল। সে নিঃশব্দে ওয়াশরুমে ঢুকে ভেজা পোশাক বদলে নিল। কিন্তু দরজার মৃদু শব্দেই নবনীর আলগা ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ কচলে উঠে বসতেই সে দেখল দিব্য সিক্ত চুলে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসছে। ঘড়ির কাঁটা তখন এগারোটা ছুঁইছুঁই। এই মাঝরাতে দিব্যকে ভেজা অবস্থায় দেখে নবনী কিছুটা বিচলিত হয়ে শুধাল,
‘আপনি কখন এলেন?’

দিব্য কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করল। যদিও সে জানে নবনী তাকে জেরা করবে না। তবুও এই অসময়ে ফেরা নিয়ে একটা ব্যাখ্যা দেওয়াটা হয়তো তার অধিকারের মধ্যেই পড়ে। দিব্য স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
‘এই তো, কিছুক্ষণ হলো এলাম। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে; তাই একদম ভিজে গিয়েছিলাম। তুমি ওভাবে কেন শুয়েছিলে? ঠিকঠাকমতো ঘুমিয়ে পড়তে পারতে।’
নবনী তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়ল। ‘আপনি আসার পর আমাকে ডাকলেন না কেন?’
দিব্য তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
‘ডাকার কী আছে? তুমি ঘুমাচ্ছিলে। তাই ডিস্টার্ব করাটা ঠিক মনে হয়নি।’
‘আপনি এখনো খাননি মনেহয়? আমি কি খাবারটা গরম করে নিয়ে আসব?’
দিব্য মাথা নেড়ে বাধা দিয়ে বলল, ‘এখন আর কষ্ট করে খাবার আনতে হবে না। রাত অনেক হয়েছে। তুমি শুয়ে পড়ো।’
নবনী কোনো কথা বাড়াল না। তবে দিব্যর বারণও কানে তুলল না। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। দিব্য অবাক হয়ে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। অল্প পরেই নবনী খাবারের থালা গুছিয়ে ঘরে ফিরল। দিব্য সোফায় বসেছিল; নবনী টেবিলের ওপর খাবারগুলো সাজিয়ে রাখল। দিব্য আর দ্বিরুক্তি না করে খাওয়া শুরু করল। পরিবেশটা সহজ করতে সে নিজেই কথা বলল,

‘তোমাদের ঘোরাঘুরি কেমন হলো? ঠিকঠাক মতো ঘুরেছো তো? দিয়া নিশ্চয়ই খুব মজা করেছে?’
নবনী লক্ষ্য করল দিব্যর কণ্ঠস্বরে কেমন একটা সূক্ষ্ম সংকোচ। সে ধীরস্থিরভাবে বলল,
‘ঘোরাঘুরি ঠিকঠাকই হয়েছে। তবে আমার আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার ছিল…!’
দিব্য যেন আগে থেকেই প্রশ্নটা আঁচ করতে পেরেছিল। সে খাবারের গ্রাস মুখে তোলার আগে দ্রুত বলে উঠল,
‘আসলে একটা খুব জরুরি মিটিং ছিল। ক্লায়েন্ট ফরেনার, তাই সময়টা হাতে ছিল না। আর আকাশের অবস্থা তো দেখছই। ঝড়-বৃষ্টির তান্ডবে আটকে গিয়েছিলাম। এই কারণেই ফিরতে একটু দেরি হলো আরকি!’
খেতে খেতে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে কথাগুলো বলল দিব্য। নবনী যেন মুহূর্তের জন্য বোকা বনে গেল। সে কি আদৌ এসব কৈফিয়ত চেয়েছিল? লোকটা নিজের মনেই একটার পর একটা ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছে। অথচ নবনীর জিজ্ঞাস্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েই বলল,

‘আমি তো এসব জানতে চাইনি। আপনি আমাকে অযথা কৈফিয়ত দিচ্ছেন?’
দিব্য শান্ত চোখে নবনীর দিকে চাইল। ধীরস্থির গলায় বলল,
‘প্রয়োজন মনে হলো। তাই বললাম। তা তুমি ঠিক কী জানতে চাইছিলে?’
‘আপনার কাছে কি আপুর কোনো ছবি নেই?’
কথাটা শুনে দিব্যর হাত থমকে গেল। অত্যন্ত স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে সে পাল্টা প্রশ্ন করল,
‘অবনীর ছবি? হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?’
‘আমি আসার পর থেকে বাড়ির কোথাও তার কোনো চিহ্ন দেখিনি, তাই জিজ্ঞেস করলাম। এমনকি দিয়াও জানে না তার জন্মদাত্রী অন্য কেউ। সে আমাকেই নিজের মা বলে চেনে; কারণ সে তার আসল মাকে কখনো দেখেনি।’
দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘কারণ আমি কখনোই চাইনি দিয়া ওর মায়ের অভাব বোধ করুক। তাই আমি ওকে অবনীর কথা বলিনি।’

‘হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি। আমিও চাই দিয়া আজীবন আমাকেই নিজের মা ভাবুক। কিন্তু এটা কি আপুর প্রতি অন্যায় হবে না?’
নবনীর কণ্ঠে বিষণ্ণতা ফুটে উঠল। দিব্যর ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে বলল,
‘কী আজেবাজে কথা বলছ নবনী! তাছাড়া তুমি তো জানো, মৃত মানুষের ছবি এভাবে ঘরে ঝুলিয়ে রাখা সবসময় ঠিক নয়। আর দিয়াকে এসব বলে ওর শৈশবটা কেন জটিল করব? আমি চাই না ও এসব জেনে মন খারাপ করুক।’
‘দেখুন, আমি বলতে চাইছি….’
‘তুমি খেয়েছ?’
দিব্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর নবনীর কথা কেড়ে নিল। নবনী ডানে-বামে মাথা নেড়ে ‘না’ সূচক উত্তর দিতেই দিব্য নিজের প্লেট থেকে এক লোকমা খাবার নবনীর মুখের কাছে বাড়িয়ে ধরল। নবনী যেন আকাশ থেকে পড়ল! বিস্ময়ভরা চোখে সে দিব্যর দিকে চেয়ে রইল। মুহূর্তের জন্য তার সব যুক্তি আর কথা যেন হারিয়ে গেল। দিব্য পুনরায় ইশারা করে বলল,
‘কী হলো? হাঁ করো। এভাবে রাত অবধি না খেয়ে বসে থাকার কোনো মানে হয় না। আমার কাজ বা পরিস্থিতির প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে এমন দেরি হতে পারে। তাই বলে তুমি না খেয়ে থাকবে না। নিজের মতো খেয়ে ঘুমিয়ে যেও, মনে থাকবে?’

নবনী মাথা নাড়ল। অতঃপর বিনাবাক্যে সেই লোকমাটি গ্রহণ করল। এরপর আর দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না। খাওয়া শেষে নবনী যখন প্লেটগুলো রাখতে বাইরে বের হলো তখন কিছু শোরগোল আর উচ্চস্বরে কথা বলার আওয়াজ তার কানে এল। মনে হলো আফতাব তালুকদার প্রচণ্ড রেগে কাউকে তিরস্কার করছেন। নবনী দ্রুত ঘরে ফিরে এসে দেখল দিব্য বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে। সচরাচর দিয়া তাদের মাঝখানে থাকলেও গত রাত থেকে সেই অভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নবনীর চিন্তিত মুখ দেখে দিব্য কৌতূহলী চোখে শুধাল,
‘কী হয়েছে? কোনো সমস্যা? আরও কিছু কি বলতে চাও?’
নবনী ধীরপায়ে বিছানায় উঠে বসল। ঘরের মেইন সুইচ টিপে আলোটা নিভিয়ে দিয়ে দিব্যর পানে চেয়ে বলল,
‘ছোট চাচু খুব রাগারাগি করছেন। বোধহয় কায়েফ ভাইয়ের সাথে কোনো বিষয়ে তর্কে জড়িয়েছেন।’
নবনী বালিশে মাথা রাখতেই দিব্য চট করে ওর ওপর ঝুঁকে এল। অবাক কণ্ঠে বলল,
‘বলছ কী? কায়েফের সাথে? এটা তো অবিশ্বাস্য!’
নবনীর হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি বাড়লো। আচমকায় চমকেছে ও। বিমূঢ় হয়ে সে শুধু মাথা নাড়ল। দিব্যর যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। সে বিড়বিড় করে বলল,

‘কাব্য হলে না হয় মানা যেত কিন্তু কায়েফ তো উনার চোখের মণি। তুমি জানো ঠিক কোন বিষয় নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে?’
‘না তো, আমি ওভাবে শোনার চেষ্টা করিনি।’
‘বেশ করেছ। অন্যের কথা আড়ি পেতে শোনা ব্যাড ম্যানার্স। আচ্ছা নবনী, আজকে যদি আর একটু বিরক্ত করি; তবে কি রাগ করবে? মাথাটা আজও খুব ধরেছে। বৃষ্টির কারণে হয়তো। জ্বরও আসতে পারে।’
নবনী অন্ধকারেই ঠোঁট টিপে হাসল। তবে সেই হাসিটা সযত্নে আড়াল করল। ঘুরে শুয়ে দিব্যর কপালে আর চুলে নিজের নরম আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই দিব্য দু-হাতে জড়িয়ে ধরল নবনীর মেদহীন ছিপছিপে কোমর। আরেকটু নিবিড়ভাবে নবনীকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে কাঁধের খাঁজে মুখ গুঁজে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নবনীর শরীর যেন মুহূর্তেই পাথরের মতো শক্ত হয়ে এলো। বুকের ভেতরটা অনিয়ন্ত্রিত। ঝড়ে মতো কাঁপছে। দিব্যর উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শে সর্বাঙ্গে শিহরণ বয়ে গেল। দুইজনের মাঝে এক নিমেষেই সব চিন্তা আর শব্দ নিস্তব্ধ হয়ে গেল সেই বর্ষণমুখর রাতে।

পরের দিন ভোরের আলো ফুটতেই তালুকদার বাড়িতে নিযানাকে নিয়ে হাজির হলো কলরব। নিযানার বুকের ভেতর অভিমানে ঠাসা এক বিশাল পাহাড় জমে থাকলেও মুখ ফুটে কিছু বলার আগ্রহ তার অবশিষ্ট নেই। কোন অধিকারেই বা বলবে? কলরব তো কেবল তার সাথে নয়, আনতাসা কিংবা কুহুর সাথেও সৌজন্যের সীমা ছাড়িয়ে বিয়াড়বতা করে চলেছে। গাড়ির চাকা থামতেই নিযানা আর কুহু গুমোট মুখ করে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। কলরব গাড়িটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে যেই না ভেতরে ঢুকতে যাবে; অমনি মুখোমুখি হলো কায়েফের। কায়েফের দুই চোখের দৃষ্টি আজ তলোয়ারের মতো ধারালো। সে স্থির চোখে কলরবের দিকে চেয়ে রইল; কলরবের মনে হলো সেই চাহনিতে মিশে আছে একরাশ বিষাক্ত বিদ্রূপ। কায়েফ তাকে অবজ্ঞা করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই কলরব সাহস করে ওর পথ আগলে দাঁড়াল। কায়েফ ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করতেই কলরব নিচু স্বরে বলল,

‘কায়েফ, একবার শোন ভাই। আমি আসলে…’
বাক্যটি শেষ করার অবকাশ পেল না কলরব। তার আগেই কায়েফের শক্তকঠিন হাতের এক প্রচণ্ড ঘুষি আছড়ে পড়ল ওর চোয়ালে। আকস্মিক এই আঘাতে কলরব টাল সামলাতে না পেরে পিছিয়ে গেল। কোনোমতে নিজেকে সামলালো সে। আবারও মুখ তুলে চাইতেই কায়েফ বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর শার্টের কলার খামচে ধরল। রাগে কায়েফের পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। রক্তবর্ণ চোখে চেয়ে গর্জে উঠল,
‘ভাই? খবরদার! আর একবার যদি আমাকে ‘ভাই’ বলে ডেকেছিস; তবে তোর জিব টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি!’
কলরব পাথরের মতো নিস্পৃহ বোধ করলো। সে যন্ত্রণাকে আমল না দিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল,

‘আরও দুটো মার কায়েফ। তাতে যদি তোর মন শান্ত হয়, তবে মার। আমি একটা শব্দও করব না বিশ্বাস কর। শুধু আমার কথাটা একবার শোন…’
কলরবকে এক ঝটকায় দূরে ঠেলে সরিয়ে দিল কায়েফ। ঘৃণায় মুখ কুঁচকে বলল,
‘কী বলবি তুই? তোর মতো বেইমানের মুখে কি আর কোনো কথা মানায়? আমি তোর একটা অজুহাতও শুনতে চাই না। আমার সামনে থেকে এখনই দূর হ। নয়তো আজ সত্যি তোকে খুন করে ফেলব!’
কলরব পুনারায় পথ আটকে কিছু বলার চেষ্টা করতেই নিয়ন্ত্রণ হারালো কায়েফ। প্রথমে একটা ঘুষি অতঃপর তার উপরে আরও। কায়েফের প্রথম কয়েকটা আঘাত কলরব প্রায় সাধরেই গ্রহণ করে নিয়েছিল। নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত ভেবে। কিন্তু কায়েফ যখন ক্রমশ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হিংস্র হয়ে উঠল, তখন আত্মরক্ষার তাগিদেই কলরব পাল্টা হাত চালিয়ে বসল। শৈশবের এমন দৃশ্য খুব পরিচিত তার। ছোট বেলায় কত শতবার তুচ্ছ খেলনা বা সামান্য খুনসুটি নিয়ে ওরা এভাবে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে আবার দিনশেষে সেই মারামারির ক্ষততে ওরাই একে অপরকে মলম লাগিয়ে দিয়েছে। কলরবের অবচেতন মন ভেবেছিল আজকেও পরিস্থিতিটা তেমনই হবে। কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল, সময় আর পরিস্থিতি মানুষের সম্পর্কের ব্যাকরণ বদলে দেয়। এটা শৈশবের কোনো ছেলেমানুষি লড়াই নয় বরং এক জীবন্ত রক্তমাংসের নিযানা আছে কেন্দ্রবিন্দুতে৷ এখানে ভ্রাতৃত্বের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভালোবাসা। মুহূর্তের মধ্যে কুহু আর নিযানা হন্তদন্ত হয়ে সেখানে ছুটে এল। দুইজনকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে গিয়ে নিযানার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তার মনে হলো, কলরব বুঝি এখনো সেই দাম্ভিকতা আর উগ্র মেজাজেই আছে। যা দিয়ে সে কয়েকদিন ধরে সবার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। অপমানে, ক্ষোভে আর একরাশ হতাশায় নিযানা নিয়ন্ত্রণ হারাল। আচমকা কলরবের গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল। কায়েফ আর কলরব দুজনেই স্থির হয়ে গেল সেই আকস্মিকতায়। নিযানা রাগে কাঁপতে কাঁপতে ফুঁসে উঠে বলল,

‘কী করছোটা কী তুমি? মাথা কি একদম খারাপ হয়ে গেছে তোমার? কায়েফকে কেনো মারছো? পাগল হয়ে গেছ তুমি?’
কলরবকে স্তব্ধ হয়ে গেল। বাড়ির আঙিনায় তখন তপ্ত রোদের চেয়েও বেশি উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। নিযানার চড়টা কলরবের গালে শুধু আঘাত করেনি তার পুরুষালি অহংকারে সজোরে ধাক্কা দিলো। নিজের রক্তচক্ষু নিযানার ওপর স্থির করে গর্জে উঠল সে,
‘হাউ ডেয়ার ইউ নিযানা! তুই আমার গায়ে হাত তুললি? তোর এত বড় সাহস হয় কী করে?’
ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল কলরব। তার হাতটা যখন প্রতিশোধের নেশায় নিযানার গালের দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই একটা শক্তিশালী হাতের মুঠোয় তার কবজি বন্দি হলো। দিব্য কঠোর দৃষ্টিতে কলরবের দিকে তাকিয়ে তাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিল। শীতল কণ্ঠে বলল,
‘আজ তুই সব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিস কলরব। আম্মু, তুমি কি এখনো বলবে ও যা করেছে ঠিক করেছে? আমি এখন কিছু বললে তো তোমার সহ্য হবে না!’

ততক্ষণে ঘরের ভেতর থেকে অলেখা বেগম, কাব্য আর নবনী হন্তদন্ত হয়ে সেখানে এসে হাজির হয়েছে। অলেখা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। বিষয়টা তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। কাব্য ছুটে এসে কলরব আর কায়েফকে খুঁটিয়ে দেখল। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এরা দুইজন হাতাহাতি করতে পারে। সে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে শুধাল,
‘তোরা দুজন মারপিট করেছিস? সিরিয়াসলি? আজ কি সূর্য পশ্চিম দিকে উঠেছে নাকি?’
কায়েফ নিজের শার্টের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে বলল,
‘ও নিজে থেকে গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে এসেছে। ওর তো আজীবনের স্বভাবই এটা। প্রথমে নিজে দোষ করবে তারপর মেয়েদের মতো ন্যাকামি করে ভিকটিম সাজবে।’
কায়েফের মুখে এমন কথা শুনে উপস্থিত সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। শান্ত স্বভাবের কায়েফ যে এতটা উগ্র হতে পারে, তা কারোর কল্পনাতীত ছিল। কাব্য এবার ধমক দিয়ে উঠল,
‘কায়েফ! তুই কিন্তু মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস। ও তোর বড় ভাই, তুই ওর গায়ে হাত তুলিস কী করে?’
কায়েফ সামান্য হেঁসল অবজ্ঞার সুরে বলল, ‘বড় ভাই! মাই ফুট!’
কথাটা ছুড়ে দিয়ে সে হনহন করে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল। কাব্য রেগে তার পিছু নিতে চাইলে দিব্য তাকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত হতে বলল। কাব্য গজ গজ করতে করতে বলল,
‘তুই আমাকে কেন থামাচ্ছিস? ওর ব্যবহারটা দেখলি? ছেলেটার মাথা একদম গেছে। কলরবকে ও এভাবে মারতে পারল?’

দিব্য একবার ম্লান চোখে কলরবের দিকে তাকিয়ে কাব্যকে মনে করিয়ে দিল,
‘কলরবই বা এমন কী ধোয়া তুলসী পাতা? ও নিযানার গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছিল। ওর স্পর্ধাটা একবার ভেবে দেখেছিস? আমার মনেহয় না কায়েফ কিছু ভুল করেছে। আমি থাকলেও আমি ও একই কাজ করতাম। আরও খারাপ করতাম।’
কলরব আর কোনো তর্কে জড়াল না। অপমানে আর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে বাড়ির ভিতরে চলে গেল। অলেখাও ব্যাকুল হয়ে ছেলের পিছু নিলেন। নিযানা এতক্ষণ একপাশে মাথা নিচু করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। দিব্য আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখতেই সে ম্লান এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে দ্রুতপায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল। কাব্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে অফিসের দিকে রওনা হলো। দিব্য দিয়া আর নবনীকে নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলরবের ঘরে পা রাখতে হলো নিযানাকে। কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই এক ভ্যাপসা উটকো গন্ধ তার নাসারন্ধ্রে আঘাত করল। সিগারেটের কটু গন্ধ বুঝতে পেরে ঘৃণায় নাক-মুখ কুঁচকে এল নিযানার। ঠিক তখনই তার নজরে পড়ল ব্যালকনিতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা কলরবকে। উৎকট গন্ধে আচমকাই কাশিতে দম আটকে এল ওর। সেই শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল কলরব। ওর চোখের রক্তাভ আভা দেখে নিযানার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এল। কলরব হাতের সিগারেটটা অবজ্ঞাভরে নিচে ফেলে দিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এল নিযানার দিকে। তীক্ষ্ণ ও হিংস্র দৃষ্টিতে সে যেন নিযানার অস্তিত্বকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। কলরবের ঠোঁটের একপাশ ফুলে নীলচে হয়ে আছে। ফর্সা গালের নিচে লালচে আঘাতের দাগটা এখনো স্পষ্ট। ওমন উন্মত্ত চাহনির সামনে এক গভীর আড়ষ্টতা অনুভব করল নিযানা। সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কলরব তার সামনে থাকা দু-থাকের ড্রয়ারটায় সজোরে এক লাথি বসাল। মুহূর্তেই ওটা উল্টে পড়ে এক বিকট শব্দ তুলল। নিযানা ভয়ে শিউরে উঠল। তার স্তম্ভিত চোখের সামনে কলরব দাঁতে দাঁত পিষে গর্জে উঠল,

‘আমাকে মারলি তুই? এত সাহস কোথায় পেলি নিযানা? আমাকে চড় মেরে আবার আমারই ঘরে এসেছিস? তোরা সবাই মিলে আমাকে ঠিক কী পেয়েছিস বল তো?’
মুহূর্তেই কলরব যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক উন্মাদে পরিণত হলো। চোখের সামনে যা পেল ছোটখাটো শোপিস, ফুলদানি সব একের পর এক আছড়ে ফেলতে লাগল নিযানার চারিপাশে। কাঁচের চুরমার হওয়ার শব্দ আর কলরবের ক্রোধে নিযানা আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল। তাকে স্বাভাবিক কোনো মানুষ নয়, বরং এক বদ্ধ পাগলের চেয়েও ভয়ংকর মনে হচ্ছিল। নিযানা চাইলেও ওখান থেকে পালানোর পথ খুঁজে পেল না। এক সময় তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল; ঠোঁট কামড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কম্পিত গলায় অস্ফুট স্বরে বলল,
‘স্যরি কলরব! আমি বুঝতে পারিনি… আই অ্যাম স্যরি। প্লিজ স্টপ ইট!’
কলরব ক্ষণিকের জন্য থামল। পরক্ষণেই ঝড়ের বেগে এগিয়ে এসে নিযানার বাহু শক্ত মুঠোয় পিষে ধরল। গর্জে উঠে বলল,

‘এখন কেন স্যরি বলছিস? আমাকে যন্ত্রণায় দগ্ধ করতে পারলে তো তোর বরাবরই খুব আনন্দ হয়, তাই না? তবে এখন সেই যন্ত্রণার উল্লাসটা প্রাণভরে উপভোগ কর! আমি খুব কষ্টে আছি নিযানা। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে… জাস্ট ইনজয় ইট!’
কলরবের মুঠির চাপে ব্যথায় নিযানার চোখ-মুখ কুঁচকে এল। কোনো প্রতিবাদ করতে পারল না। শুধু নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল। কলরব লক্ষ্য করল নিযানা থরথর করে কাঁপছে। ওর দু-চোখে ভয়। ফর্সা মুখটা আতঙ্কে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে গেছে। কলরব কিছুটা শান্ত হলো ঠিকই কিন্তু নিজের দাম্ভিকতা বজায় রাখলো। নিযানাকে নিজের দিকে এক ঝটকায় টেনে নিয়ে বলল,
‘আজকের পর আর কোনোদিন এই দুঃসাহস দেখাবি না। নয়তো এর পরিণাম হবে তোর কল্পনার চেয়েও ভয়াবহ। তুই-ই তো বলেছিলি যে তুই আমার বিবাহিতা স্ত্রী? তবে তাই সবি। আর দশটা সাধারণ বাঙালি বউরা যেভাবে নুয়ে থাকে, ঠিক সেভাবেই থাকবি। তোর কোনো পাণ্ডিত্য আমি আর সহ্য করব না!’

নিযানার ভেতরের পুঞ্জীভূত রাগের পারদ তুঙ্গে উঠল।কলরবের এই চরম অপমান আর আধিপত্য সহ্য করতে পারলো না। আচমকাই সর্বশক্তি দিয়ে কলরবকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তীব্র কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,
‘আমি আমার স্যরি ফেরত নিলাম। তুমি যদি ভেবে থাকো আমি তোমার বিবাহিতা স্ত্রী বলে কোনো অবলা পতিব্রতা নারীর মতো তোমার পা ধরে পড়ে থাকব; তবে সেটা তোমার মস্ত বড় ভুল ধারণা কলরব! তুমি মাঝরাতে মদ্যপান করে মাতাল হয়ে ঘরে ফিরবে আর আমি তোমার জুতো খুলে দেব কিম্বা চাদর টেনে দেব; এমন কাল্পনিক দৃশ্য স্বপ্নেও ভেবো না। আমি তেমন কিছুই করব না। বেশ করেছি তোমায় চড় মেরেছি। প্রয়োজন হলে আরও একশবার মারব! অন্তত আমার মনে হচ্ছে তুমি এটারই যোগ্য!’
কলরব দাঁতে দাঁত পিষে বলল, ‘একটা আস্ত গিরগিটি তুই নিযানা! আজ হোক বা কাল, যাই হয়ে যাক না কেন; তোর সাথে সংসার করার প্রশ্নই ওঠে না। জানিস তো, কাক তার সঙ্গী হারালে দ্বিতীয়বার আর কখনও জোড়া বাঁধে না। ঠিক তেমনি, আমার জীবনেও আমি তোকে কোনোদিন বউ হিসেবে মেনে নিতে পারব না। কারণ… আমি শুধু ইরাকেই ভালোবাসি!’

কথাটা তীরের মতো নিযানার হৃদপিণ্ড ভেদ করে ওপাশে চলে গেল বোধহয়। বুকের ভেতরটা তীব্র এক মোচড় দিয়ে উঠল তার। কিন্তু সে দমল না। ভেতরের সেই রক্তক্ষরণ আড়াল করে নিজের অশ্রু গিলে নিল নিযানা। ধীরস্থির পায়ে কলরবের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

এই অবেলায় পর্ব ১৮

‘কাকের সঙ্গী তো মরে যায়; তাই সে একলা থাকে। কিন্তু তোমার সঙ্গী তো মরে যায়নি; সে তো স্রেফ উড়ে গেছে! অন্য কোনো ডালে, অন্য কারো সান্নিধ্যে সে এখন দিব্যি ডানা ঝাপটাচ্ছে। এখন তার বিরহে যদি তুমি সারাজীবন সাধু সেজে একাকীত্ব উদযাপন করতে চাও, তবে করো। আমার তাতে বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না। অবাক হচ্ছো? জানতে চাইবে না, আমি কিভাবে জানলাম?’

এই অবেলায় পর্ব ২০