Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ২০

এই অবেলায় পর্ব ২০

এই অবেলায় পর্ব ২০
সুমনা সাথী

ইটের দেওয়াল থেকে প্লাস্টার চটে পড়া ছোট এক কামরার ঘর। উপরে মরচে ধরা ঢেউ খেলানো টিনের চাল। অযত্নে পড়ে থাকা ঘরটির সামনে জরাজীর্ণ একখানা নেমপ্লেট ঝুলছে। যাতে বেশ জাঁকজমক করে লেখা ‘ফাইভ স্টার’। মূলত এই ঘরটিই তারুণ্যের আড্ডাস্থল। যা ওরা নাম দিয়েছে ক্লাব ঘর। বা তাদের অফিস৷ বাইকের টায়ার পিষে দিয়ে একরাশ ধুলো উড়িয়ে ঘরটির সামনে এসে থামল কলরব। হন্তদন্ত হয়ে বাইক থেকে নেমেই ঝড়ের বেগে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সে। ভেতরে তখন অনন্ত আর শান্ত বেশ আয়েশ করে বসে ছিল। কিন্তু কলরব কোনো ভূমিকা ছাড়াই বাঘের মতো গর্জে উঠে অনন্তর দিকে তেড়ে গেল। অনন্ত কলরবের এমন রুদ্ররূপ দেখে ভিরমি খেল যেন। হাতের কাজ ফেলে এক লাফে চেয়ার থেকে উঠে শান্তর পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিল। কলরব রক্তচক্ষু নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

‘শান্ত’র পেছনে লুকিয়ে লাভ নেই শালা, বেরিয়ে আয়! তোর সাথে আজ আমার বোঝাপড়া আছে।’
অনন্ত কাঁচুমাচু মুখে শান্তর কাঁধের ওপাশ থেকে মাথা বের করে কাঁপাকাঁপা স্বরে সুধাল,
‘কেন? তুই কী করবি শুনি?’
‘চুম্মা দেব তোকে!’
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও অনন্ত দমলো না। সে পুনরায় নিজেকে শান্তর আড়ালে লুকিয়ে নিয়ে করুণ সুরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘কেন? তোর ঘরে কি বউ নেই? আমার মতো একটা মাসুম ছেলের সাথে ছিঃ!’
কলরব এবার দ্বিগুণ তেজে এগোতে নিতেই শান্ত দু-হাত বাড়িয়ে ব্যারিকেড তৈরি করল। সে এতক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পুরো তামাশাটা দেখছিল। বন্ধুদের এমন কাণ্ডকারখানা তার বোধগম্য হচ্ছিল না। কলরবকে থামিয়ে দিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,
‘তোদের সমস্যাটা কী বলবে তো? সকাল সকাল এমন বাচ্চাদের মতো হাতাহাতি করছিস কেন? আর কলরব তুই? তুই আচমকা অনন্তর ওপর এমন চড়াও হচ্ছিস কেন? কী হয়েছে তোর? ঘরে কি বউ তোকে দিচ্ছে না? পরপুরুষ কে চুমু খেতে চাচ্ছিস?’

কলরব এক জোড়া অগ্নিদৃষ্টি ছুড়ে দিতেই শান্তর মুখের কথা যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে সে শুকনো মুখে আধো-আধো স্বরে বলল,
‘আরে আমি বলতে চাইছি; তুই এমন করছিস কেন? পাগলামি ছেড়ে আসল কথাটা বল না!’
কলরব দাঁতে দাঁত পিষে আক্রোশের সুরে বলল, ‘অনন্তকে জিজ্ঞেস কর। ওকে কে বলেছে নিযানার কাছে ইরার কথা পাড়তে? তোরা কি আদেও আমার বন্ধু? নাকি তলে তলে শত্রুতা করছিস?’
অনন্ত এবার শান্তর আড়াল থেকে গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে এল। অপরাধী মুখে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
‘ভাই, আমি তো সব তোর ভালোর কথা ভেবেই করেছি। আসলে ভাবি…!’
‘কে ভাবি?’
গর্জে উঠল কলরব। অনন্ত ভয়ে একেবারে চুপসে গেল। থতমত খেয়ে বলল,
‘মানে… ওই নিযানা ফোন করে ইরার ব্যাপারে খুঁটিনাটি জানতে চাইছিল। কেন ও তোকে বিয়ে করল না, তোদের সম্পর্ক কতদিনের ছিল? এসব আরকি। আমি ভাবলাম, ওর বেইমানির কথাগুলো যদি ভাবির কানে যায়; তবে সে তোর প্রতি একটু নরম হবে। মানে সহানুভূতি জন্মাবে আরকি!’
‘তোর মাথায় কি গোবর পোরা শালা?’

অনন্তর কথা শেষ হতে না হতেই শান্ত তার পায়ে সজোরে এক লাথি বসাল। বন্ধু মহলে অনন্তর পেট যে চালুনির মতো ফুটো তা সবারই জানা। আর নিযানা কি না জেরা করার জন্য এই ‘পেট-পাতলা’ ছেলেটাকেই খুঁজে পেল! কলরব একরাশ হতাশা নিয়ে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। শান্ত এবার অনন্তর দিকে তাকালো। ধমক দিয়ে বলল,
‘তোর কি সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানটুকুও লোপ পেয়েছে? এসব আজেবাজে কথা কেন বলতে গেলি? আস্ত এক ন্যাকু কোথাকার!’
অনন্ত কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল, ‘খবরদার! আমাকে ন্যাকু বলবি না। যাই হোক, ভুল যখন হয়েই গেছে। তখন না হয় ‘স্যরি’ বলছি।’
কলরব এবার গজগজ করতে করতে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তিতিবিরক্ত হয়ে বলল,
‘আবার মেয়ে মানুষের মতো ‘স্যরি’ আওড়াচ্ছে! সর তো সামনে থেকে। কথা বলার জন্য আর কেউ ছিল না। ওই গিরগিটিটাকেই পেলি তুই? আমার বাপকে গিয়ে বলতিস। তাও বোধহয় এর চেয়ে ভালো হতো!’
কলরবকে প্রস্থান করতে উদ্যত দেখে শান্ত এবার মূল প্রসঙ্গে ফিরল। পিছন থেকে হাঁক দিয়ে বলল,
‘কাল কিন্তু কনসার্ট আছে। তুই কি যাবি? তুই না গেলে পুরো পরিকল্পনাটা মাঠে মারা যাবে। কারণ অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণই ‘কে.টি’!’
কলরবের পা জোড়া থমকে গেল। ক্ষণিকের জন্য সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
‘অবশ্যই যাব। আমি এতটাও সস্তা নই যে একটা চু*তমারানির বেইমানির শোকে পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াব। আমাকে হারানোটা ওর ব্যর্থতা; আমার নয়। আর এই হারানোর যন্ত্রণায় ও সারাজীবন আফসোস করবে। করতেই হবে।’

ছুটি হওয়ার পর স্কুলের চত্বর পেরিয়ে দিয়াকে নিয়ে বের হলো নবনী। কিন্তু গেট দিয়ে বাইরে পা রাখতেই সে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। কালো রঙা কোট-স্যুট পরে নিজের গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দিব্য তালুকদার। দিয়ার নজরই প্রথম পড়ল তার বাবার ওপর।
‘মাম্মা, দেখো! পাপ্পা এসেছে!’
নবনী ত্বরিত দৃষ্টি ফেরাল। দিব্যর মুখে গাম্ভীর্য। দিয়া প্রজাপতির মতো উড়ে গিয়ে দিব্যর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দিব্যর গম্ভীর মুখটা মুহূর্তেই প্রসন্নতায় ভরে উঠল; দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে তার দুই গালে চুমু দিল। নবনী ধীর পায়ে ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে একরাশ প্রশ্ন। অবাক হয়ে শুধাল,
‘আপনি এখানে? এই অসময়ে?’
দিব্য শান্তভাবে মাথা নাড়ল। ‘আসলে আজ অফিসে কাজের চাপ কিছুটা কম। তাই ভাবলাম আমার প্রিন্সেস আর তার মাম্মাকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি।’

নবনী আকাশ থেকে পড়ল। বাইরে গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ্দুর যেন আগুন ছড়াচ্ছে। বৈশাখের এই কাঠফাটা গরমে সবার প্রাণ ওষ্ঠাগত। আর এই মানুষটা কি না ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে! দিব্য দিয়াকে সযত্নে গাড়ির পেছনের সিটে বসিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নবনীর দিকে চাইল। কোমল স্বরে বলল,
‘নবনী, কোনো সমস্যা? ওভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে আছো যে! গাড়িতে এসো।’
দিয়া জানলা দিয়ে মাথা বের করে উচ্ছ্বসিত গলায় ডাকল,
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! মাম্মা, দ্রুত এসো। ওভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন তুমি? আজ কিন্তু অনেক মজা হবে!’
নবনী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল,
‘এই ভর দুপুরে আপনি ঘুরবেন? কিন্তু কোথায়? চারদিকে যে রোদের তেজ। এমনিতে সবার নাজেহাল অবস্থা।’
দিব্য এবার চারপাশটা একবার খুঁটিয়ে দেখল। নবনীর কথা যে বর্ণে বর্ণে সত্য তা সে এই প্রথম অনুভব করল। এসি রুমের ভেতরে অফিসের কাজ নিয়ে এতটাই বুঁদ হয়েছিল যে, বাইরের প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ তার খেয়ালই ছিল না।কিছুক্ষণ মৌন থেকে বলল,

‘আসলেই তো! এত কিছু তো ভেবে দেখিনি।’
নবনী পরামর্শ দিল, ‘আমরা বরং এখন বাড়ি ফিরে যাই। আপনার কি বিকেলের দিকে কিছুটা সময় ফাঁকা হবে না?’
দিব্য মৃদু হেসে সম্মতি জানাল। গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে বলল,
‘ঠিক আছে প্রিন্সেস, আমরা বরং বিকেলেই বের হবো। তবে এখন চলো। পাপ্পা তোমাকে আর মাম্মাকে আইসক্রিম খাইয়ে নিয়ে যায়।’
দিয়া খুশিতে মাথা নেড়ে সায় দিল, ‘ওকে!’
গাড়ির সামনের সিটে দিব্যর পাশে নবনী আর পেছনের সিটে দিয়া বসেছে। মাঝরাস্তায় একটি আইসক্রিম দোকানের সামনে গাড়ি থামিয়ে দিব্য নেমে গেল। কিছুক্ষণ পর দুটো আইসক্রিম হাতে নিয়ে ফিরল সে। দিয়ার পছন্দের কোণ নিয়ে এসেছে। আর নবনীর জন্যেও সেই একই আইসক্রিম। পুনরায় ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল দিব্য। নবনী আইসক্রিমের মোড়কটা খুলে এক অদ্ভুত দ্বিধায় পড়ল। দিব্যর পাশে বসে একা একা খাওয়াটা কেমন যেন দেখাচ্ছে। তাছাড়া দিব্য নিজের জন্য কেন কিছু আনল না? সেই প্রশ্নটাও নবনীর মনে খচখচ করতে লাগল। সংকোচ কাটিয়ে সে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,

‘আপনি নিজের জন্য নিলেন না কেন?’
দিব্য ঘাড় ঘুরিয়ে একবার নবনীর পানে তাকাল। শান্ত গলায় শুধাল,
‘আমাকে বলছো?’
নবনী মাথা নাড়ল। দিব্য সামনে রাস্তার দিকে দৃষ্টি স্থির করে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
‘আসলে আমি ড্রাইভ করছি তো, তাই। আমি না হয় বাড়ি গিয়েই খেয়ে নেব। তোমরা খাও। শোনো নবনী?’
নবনী চট করে দিব্যর মুখের দিকে তাকাল। দিব্য যখন কথার মাঝে বারবার তার নাম ধরে ডাকে, তখন নবনীর বুকের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত ভালো লাগার অনুরণন জাগে। সে নিচু স্বরে উত্তর দিল,
‘জি?’
দিব্য স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বেশ গম্ভীর গলায় বলল, ‘তুমি আমাকে এইভাবে আপনি, শুনুন, দেখুন বলে আর কতদিন সম্বোধন করবে? আমার নামটা কি উচ্চারণ করা ভীষণ কঠিন?’
দিব্যর সরাসরি প্রশ্নে নবনী মুহূর্তের জন্য বিমূঢ় হয়ে গেল। দিব্যকে সে নাম ধরে ডাকবে? এও কি সম্ভব! লোকটা আবার গোঁ ধরে না বসলেই হয়। কোনো তর্কে যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে সে নিশ্চুপ থাকল। দিব্যর অস্থির চাউনি যখন পুনরায় তার ওপর স্থির হলো নবনী বাধ্য হয়েই বলল,

‘আপনার নাম ধরে ডাকা তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’
‘কেন?’
‘আপনি বয়সে বড়।’
দিব্য একটু থেমে মেনে নেওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। ‘তা হয়তো ঠিক। তবে বিকল্প কিছু তো খুঁজে নিতে পারো। এভাবে ‘আপনি’, ‘শুনুন’ বললে কেমন লাগে না?’
নবনী মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মধুর বিপদ থেকে উদ্ধারের পথ খুঁজতে সে চট করে নিজের হাতের আইসক্রিমটা দিব্যর সামনে ধরল।
‘আপনি একটু নিন না। আমি ধরছি, আপনি ড্রাইভ করুন।’
দিব্য আর দ্বিরুক্তি করল না। এক কামড় দিয়ে পরক্ষণেই কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
‘ধ্যাৎ, একটা ভুল হয়ে গেল! এখন তুমি কী খাবে? আমি তো এটা এঁটো করে দিলাম।’
নবনীর মনে অবশ্য বিন্দুমাত্র সংকোচ জাগল না। বরং এক অদ্ভুত ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল। তবুও কৃত্রিম গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল,

‘আমি কিন্তু আপনাকে দেওয়ার আগেই খেয়েছিলাম।আপনিও আমার এঁটোই খেয়েছেন!’
দিব্যর ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরও চওড়া হলো। নবনী দেখলো না। সে স্বাভাবিকভাবে সেই আইসক্রিমে পুনরায় কামড় বসাতেই দিব্য লুকিং গ্লাসে তা দেখে চমকে উঠল। বলতে চাওয়া কথাটা না বলে নিজেকে সংবরণ করে নিল। নবনী পুনরায় আইসক্রিমটা দিব্যর মুখে ধরল। পেছন থেকে দিয়াও তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘পাপ্পা, দিয়ার থেকেও নাও! মাম্মা, তুমি পাপ্পাকে দিয়ারটা খাইয়ে দাও না!’
নবনী স্নিগ্ধ হেসে দিয়ার আবদার মেটাল। দিয়া উচ্ছ্বসিত হয়ে হাততালি দিয়ে উঠল,
‘মাম্মা, তুমিও একটু খাও! আমরা সবাই একসাথে খাচ্ছি… হাউ সুইট!’
ছোট্ট দিয়ার চোখেমুখে খুশির ঝিলিক ঠিকরে পড়ছে। নবনী একটু খেয়ে আইসক্রিমটা দিয়াকে ফেরত দিল। দিয়া খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। দিব্যর বুকের ভেতর এক গভীর প্রশান্তি অনুভূত হলো। এই তো তার সাজানো পরিবার! এক সময় যা কেবল অলীক স্বপ্ন ছিল; আজ তা জীবন্ত। হঠাৎ দিব্য লক্ষ্য করল, মা-মেয়ে চুপিচুপি একে অপরের কে কী যেন বলছে আর হাসছে। সে কৌতূহলী হয়ে শুধাল,

‘কী চলছে তোমাদের মধ্যে?’
দিয়া নিজের গাল দুটো হাত দিয়ে চেপে ধরে হাসতে হাসতে বলল,
‘পাপ্পা, তোমার নাক আর গালে আইসক্রিম লেগে গেছে!’
দিব্য লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে দেখল তার নাকের ডগায় আর গালের একপাশে আইসক্রিম লেপ্টে আছে। নবনীও মুখ টিপে হাসছে। দিব্য ভুরু কুঁচকে বলল,
‘এটা কি তবে ইচ্ছে করে করলে? ভেরি ব্যাড, নবনী!’
নবনী প্রথমে হাসলেও দিব্যর কথায় একটু কুঁকড়ে গেল। লোকটা কি তবে সত্যিই রাগ করল? সে দ্রুত শাড়ির আঁচলটা একটু তুলে দিব্যর মুখের আইসক্রিমটুকু সযত্নে মুছে দিল। অপরাধী মুখে বলল,
‘স্যরি… আসলে একটু মজা করছিলাম।’
দিব্য মুহূর্তের সুযোগে নবনীর হাতে থাকা আইসক্রিম থেকে সামান্য আইসক্রিম নবনীর গালে লেপে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। দিয়াও খিলখিল করে হেসে উঠল। আচমকা এই আক্রমণে নবনী পাথর বনে গেল। সে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল হাস্যরত দিব্য তালুকদারের দিকে। হাসলে লোকটার এক গালে কি সুন্দর টোল পড়ে! এর আগে কখনোই দিব্যকে এমন হাসিতে ভাসতে দেখেনি নবনী। কতটা স্নিগ্ধ আর প্রাণবন্ত লাগছে তাকে! একটি নির্মল হাসি যেন তার কঠিন গাম্ভীর্যের আবরণটা নিমেষেই চুরমার করে দিয়েছে। নবনী ক্ষণিকের জন্য মোহাবিষ্ট হলো; মনে হলো সে নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। দিব্যর এই হাসিমুখের মুগ্ধতা যেন তার হৃদস্পন্দন থমকে দিল।

দুপুর গড়াতে না গড়াতেই আকাশের মেজাজ বিগড়ে গেল। গুমোট ভাব কাটিয়ে আচমকাই শুরু হলো ঝোড়ো হাওয়ার তান্ডব। সাথে বিদ্যুতের তীব্র চমকানি। জানালার বাইরে বড় বড় ফোঁটায় মুষলধারে বৃষ্টি নামতেই চারপাশ ঝমঝম শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। সেই যে বৃষ্টি শুরু হলো। থামার যেন কোনো নামই নেই। রাতে মৌনিতা রান্না করেছে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর কষা গরুর মাংস। রাতের ডিনার টেবিলে আজ পুরো তালুকদার পরিবার সমবেত হয়েছে। খাবারের ম-ম ঘ্রাণে চারপাশ মউ মউ করছে ঠিকই, কিন্তু অন্দরমহলের গুমোট ভাবটা যেন কাটছেই না। নবনী আর মৌনিতা মিলে সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল। দিনের বেলায় কলরব আর কায়েফের মধ্যকার সেই তিক্ত অপ্রীতিকর ঘটনাটি এখন আর কারো অজানা নেই; সেই খবর পৌঁছে গেছে আরশাদ তালুকদারের কানেও। সচরাচর এমন বৃষ্টিমুখর দিনে খিচুড়ি আর মাংসের আয়োজন হলে কলরবই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেখায়। কাব্য আর কলরব খেতে ভীষণ ভালোবাসে। অথচ আজ পুরো টেবিল জুড়ে এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। আফতাব তালুকদার গম্ভীর মুখে এসে বসলেন। মাজহা বেগমও তাঁর পিছু পিছু এসে দাঁড়ালেন। খাওয়ার মাঝপথেই আরশাদ তালুকদার কায়েফের দিকে চেয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন,

‘কায়েফ, তোমার আব্বু বলছিলেন তুমি নাকি আর ফিরে যেতে চাইছো না? দেশেই নাকি স্থায়ী হয়ে বিজনেস করার মনস্থির করেছ?’
মুহূর্তের মধ্যে সবার উৎসুক দৃষ্টি কায়েফের ওপর স্থির হলো। কায়েফের হাতের গ্রাস থমকে গেল। সে মুখ তুলে অত্যন্ত শান্ত ও স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিল,
‘জি চাচ্চু। আমি আর বিদেশে ফিরতে চাইছি না। আমার নিজের দেশেই মন টিকছে।’
কাব্য অস্থির হয়ে উঠল, ‘এটা কোন ধরনের পাগলামি কায়েফ? ফিরবি না মানে কী? এভাবে মাঝপথে পড়াশোনা জলাঞ্জলি দিয়ে এই দেশে তুই কোন রাজ্য জয় করবি শুনি?’
বড়দের উপস্থিতিতে কাব্যর এমন কড়া মেজাজ দেখে সে নিজেই কিছুটা দমে গেল। আরশাদ তালুকদার শান্ত স্বরে বললেন,

‘দেখো কায়েফ, আমি তোমার সিদ্ধান্তকে ছোট করছি না। কিন্তু তোমার বাবার তোমাকে নিয়ে অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্ন আছে। আমারও মনে হয় না এটা তোমার জীবনের জন্য কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হবে। আর বড়জোর কয়েকটা বছরের তো ব্যাপার তারপর তো দেশেই ফিরবে।’
আরশাদ তালুকদারের কথার মাঝপথেই কায়েফ সপ্রতিভভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে উঠল,
‘কিন্তু কয়েক বছর কেন চাচ্চু? আমি আর একদিনের জন্যও এই অনিশ্চয়তার বিলম্ব চাই না। আমি কাল থেকেই নিজের প্রস্তুতি শুরু করব ভাবছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি এবং এ থেকে আমি একচুলও নড়ব না।’
আফতাব তালুকদারের ধৈর্য সীমা ছাড়াল। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি টেবিল চাপড়ে গর্জে উঠলেন,
‘চড়িয়ে তোমার গাল লাল করে দেব আমি! দিন দিন বড্ড বেয়াদব হয়ে উঠছ। চাচ্চুর সামনে কেউ এভাবে কথা বলে? কালকে আমার সাথে যে আচরণ করছ; তা আমি এখনো হজম করতে পারছি না!’
আরশাদ তালুকদার হাত বাড়িয়ে আফতাবকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। তিনি ধীরস্থির গলায় বললেন,
‘আহ্ আফতাব, থামো তো! ও যখন মনস্থির করেই ফেলেছে তখন জোর করার কী প্রয়োজন? কিন্তু কায়েফ, হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তের পেছনে আসল কারণটা কী?’

কায়েফ এক মুহূর্তের জন্য পাশে বসা কলরব আর নিযানার দিকে তাকাল। নিযানা তখনো বাকিদের মতো একরাশ কৌতূহল আর বিস্ময় নিয়ে ওর দিকেই চেয়ে আছে। অথচ কলরব সম্পূর্ণ নির্বিকার; সে নিজের মতো নিবিষ্ট মনে খেয়ে যাচ্ছে। যেন চারপাশের এই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় তার কানেই পৌঁছাচ্ছে না। কায়েফ নিচু স্বরে উত্তর দিল,
‘আমার এখন মনে হয় চাচ্চু, জীবনের কঠিন পরিশ্রমের চেয়ে কপালে থাকা ভাগ্যটা অনেক বেশি জরুরি। যদি কপাল মন্দ হয় তবে হাজারো চেষ্টা আর শ্রম কোনো কাজে আসে না। আমি আর মরিচীকার পেছনে দৌড়াতে চাই না। আমার ভাগ্যে যা লেখা আছে তা-ই হবে; তা আমি যে দেশেই থাকি না কেন। আর সত্যি বলতে, সবাইকে ছেড়ে একা থাকতে আমার বড্ড কষ্ট হয়। আম্মু যখন ফোনে কাঁদে, তখন নিজের ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করে। মানুষের জীবনের তো কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই আমি চাই জীবনের বাকি সময়টা এই চেনা মানুষগুলোর সাথেই কাটাতে।’
ছেলের এমন আবেগপ্রবণ আর অদ্ভুত যুক্তি শুনে আফতাব তালুকদার পুনরায় ফেটে পড়লেন,
‘জাস্ট শাট আপ কায়েফ! ভাইয়া, দেখছ ওর অবস্থা? এমন উদ্ভট আর অর্থহীন যুক্তি ও তখন থেকে দিয়ে যাচ্ছে। এসব কোনো কাজের কথা হলো?’

কায়েফ আর তর্কে জড়াল না। সে আচমকা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,
‘আমার খাওয়া শেষ। গুড নাই অল।’
আফতাব তালুকদার রাগে কাঁপতে কাঁপতে বারবার পেছন থেকে ডাকলেন কিন্তু কায়েফ কারো বারণ না শুনেই ধীর পায়ে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরশাদ তালুকদার আফতাবকে শান্ত করলেন। তবে বাড়ির প্রতিটি মানুষের মনে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ জমে উঠল। কায়েফের মতো একজন মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছেলের এমন হুটহাট আর অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত কারো মাথাতেই ঢুকছে না। কলরব এতক্ষণ চুপ থাকলেও সে ঠিকই বুঝতে পারল কায়েফের এই অস্থিরতার উৎস কোথায়। কিছুক্ষণ পর সে-ও নীরবে উঠে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। বৃষ্টির শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে তালুকদার বাড়ির ডিনার টেবিলটা এক অসহ্য গুমোট আর বিষণ্ণ নিস্তব্ধতায় ডুবে রইল।

আজ দিয়ার চোখেমুখে উত্তেজনার শেষ নেই। ঘুমের চেয়েও তার কাছে বেশি আনন্দের হলো নবনী আর দিব্যর সান্নিধ্য। সচরাচর দিব্য বাড়ি ফেরার আগেই দিয়া ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়। নয়তো দিব্য যখন কাজের ফাইলের গভীরে ডুবে থাকে তখন নবনী দিয়াকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আজ বৃষ্টির কারণে ঘোরার পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হলেও দিব্যকে পুরোপুরি বশ করে ফেলেছে তার ছোট্ট মেয়ে। দিয়ার কড়া হুকুম। আজ রাতে কোনো ল্যাপটপ বা অফিসের ফাইল খোলা যাবে না। আর মেয়ের হুকুম দিব্য তালুকদার অমান্য করবে; তা ভাবাই দুঃসাধ্য। নবনী ঘরে ঢুকতেই দিয়ার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেল,

‘মাম্মা! জলদি এসো, আমরা সবাই মিলে একসাথে ঘুমাবো।’
নবনী স্নিগ্ধ হেসে সম্মতি জানিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। দিয়া নবনীকে মাঝখানে রেখে নিজে এক পাশে শুলো। নবনীর একটি হাতের ওপর মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে সে যেন নিজের নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেল। এবার হুকুম হলো দিব্যর ওপর। পাপ্পাকে অবশ্যই তাদের দুজনকে জড়িয়ে ধরে শুতে হবে। আজকাল নবনীর কোল ছাড়া দিয়ার চোখে ঘুম নামে না। আর নবনীও অদ্ভুত এক মায়ায় দিয়াকে জড়িয়ে রাখে; দিয়াকে ছাড়া তার নিজেরও এখন জীবনটা বড্ড শূন্য মনে হয়। নবনী দিয়ার দিকে কাত হয়ে শুতেই দিব্য তার পেছনে এক হাত নবনীর ওপর দিয়ে বাড়িয়ে দিয়ার গায়ে বুলাতে লাগল। দিব্যর উষ্ণ বুকের ছোঁয়া নবনীর পিঠ স্পর্শ করতেই তার সারা শরীরে এক মৃদু শিহরণ বয়ে গেল।দুজনের মাঝখানের দূরত্বটুকু যেন আজ মেঘমুক্ত আকাশের মতোই স্বচ্ছ ও বিলীন। দিব্যর হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি নবনী নিজের শরীরে অনুভব করতে পারছে। নবনী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, দিব্য এক হাত মাথার নিচে দিয়ে এক মনে দিয়ার বকবকানি শুনছে। দিয়া তার স্কুলের কোনো এক তুচ্ছ ও অযৌক্তিক ঘটনা মহাউৎসাহে বর্ণনা করছে। আর দিব্য এমনভাবে মনোযোগ দিয়েছে যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ কোনো জরুরি মিটিং চলছে। নবনী অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, এভাবে হাত পেতে থাকতে লোকটার কি কষ্ট হচ্ছে না? নবনী মৃদু স্বরে দিয়াকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করল।কিছুক্ষণের মধ্যেই দিয়া ক্লান্ত হয়ে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল। দিয়া ঘুমিয়ে পড়তেই নবনী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। কিন্তু যেই না সে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতে যাবে, অমনি তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ডিমলাইটের নীলচে মায়াবী আলোয় ঘরটা তখন অপার্থিব এক স্নিগ্ধতায় ভরে আছে। সেই আবছা আলোয় সে দেখল, দিব্যর গভীর দুটি চোখ অপলক দৃষ্টিতে তার দিকেই নিবদ্ধ। দিব্য মূলত নবনী আর দিয়ার এই মা-মেয়ের অটুট বন্ধনই দেখছিল; ওদের খুশি দেখলে দিব্যর নিজের ভেতরেও এক অদ্ভুত তৃপ্তি কাজ করে। নবনীর অবাক চাহনি দেখে দিব্য মৃদু ভ্রু উঁচিয়ে গম্ভীর গলায় শুধাল,

‘কী?’
নবনী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মাথা নাড়ল। অস্ফুট স্বরে বলল,
‘কিছু না। আপনি এখনো ঘুমাননি? হাতটা কি ব্যথা করছে না আপনার?’
দিব্য আর কোনো কথা বাড়াল না। সোজা হয়ে শুলো। নবনীও নিজেকে সামলে নিয়ে আড়ষ্টতা কাটিয়ে ছাদের দিকে মুখ করে শুলো। ঘর জুড়ে এখন পিনপতন নীরবতা। কেবল বাইরের বৃষ্টির রেশ আর ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ সেই নিস্তব্ধতাকে আরও প্রগাঢ় করে তুলছে। বাইরে প্রকৃতি শান্ত হলেও বিছানার দুই প্রান্তে থাকা দুটি অস্থির মন যেন উত্তাল সমুদ্রের মতো গুমরে মরছে। নবনী নিজের মনের অলিগলিতে এক গভীর দ্বিধা আর সংশয় বয়ে বেড়াচ্ছে। দিব্যর পরিবর্তন তাকে বারবার বিস্মিত করে। লোকটা এখন নবনীর সান্নিধ্য পছন্দ করে। তার সঙ্গ উপভোগ করে। এটুকু বোঝার মতো পরিপক্কতা নবনীর হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত কাছে থেকেও দিব্য কেন চূড়ান্ত দূরত্বটুকু ঘোচায় না? কেন তাকে একেবারে নিজের করে টেনে নেয় না? এই ‘কেন’-র কোনো সদুত্তর নবনীর জানা নেই। সে নিজের অবচেতন মনকে অনেক আগেই বুঝিয়ে ফেলেছে যে, দিব্যকে তার আর পর মনে হয় না। দিব্যর স্পর্শে এখন আর কোনো কুুণ্ঠা নেই বরং এক অবাধ্য মাদকতা আছে যা নবনীকে অদ্ভুত এক আবেশে আচ্ছন্ন করে রাখে।

নবনী জানে দিব্য যদি আজ পূর্ণ অধিকার নিয়ে তাকে নিজের করে নিতে চায়; তবে সে হয়তো বাধা দেওয়ার শক্তিটুকুও খুঁজে পাবে না। কিন্তু দিব্যর চিন্তাধারা ভিন্ন। সে নবনীকে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করাতে চায় না। সে চায় না নবনী কেবল পরিস্থিতির চাপে পড়ে বা সামাজিক দায়বদ্ধতার খাতিরে তাকে মেনে নিক। নবনীর মনের গহীনে যে তার জন্য এক চিলতে ভালোবাসার অঙ্কুরোদ্গম হয়েছে, দিব্যর সংবেদনশীল মন তা এখনো পুরোপুরি আঁচ করতে পারেনি। নবনী এমন কোনো ইঙ্গিত বা শব্দ খরচ করেনি যা থেকে দিব্য বুঝতে পারে যে তাদের সম্পর্কের বরফ গলে ঝর্ণা হতে শুরু করেছে। দিব্য ধৈর্যশীল এক নাবিকের মতো অপেক্ষা করছে নবনীর মন জয় করার। এই অপেক্ষার পথ যদি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতরও হয়; তবুও তার কোনো আক্ষেপ নেই। সে কোনো জোড়াতালি দেওয়া অসুস্থ সম্পর্ক বয়ে বেড়াতে চায় না। তপ্ত মরুভূমিতে দীর্ঘ তৃষ্ণার পর যদি এক পশলা শান্তির বৃষ্টি নামে। তবে সেই প্রতীক্ষাই তো সার্থক। দিব্য সেই সার্থকতার জন্যই নিজেকে সংবরণ করে রেখেছে। যেদিন নবনী ধরা দেবে; সেদিন কোনো দ্বিধা অবশিষ্ট রাখবেনা।’

বাইরে তখন ঝুমঝুম বৃষ্টির ছন্দে মুখরিত চারপাশ। প্রকৃতির সেই উন্মাতাল শব্দের মাঝেই নিযানার তন্দ্রাটা হুট করে ছুটে গেল। আচ্ছন্ন ভাবের মাঝেই এক অদ্ভুত গোঙানির শব্দ তার কানে এসে বিঁধল। সে পাশ ফিরে কলরবকে খুঁজতে গিয়ে দেখল বিছানার ওই পাশটা শূন্য। গভীর রাতে ছেলেটা গেল কোথায়? পরক্ষণেই আবারও সেই অস্পষ্ট কান্নার শব্দ আর সেই সাথে এক উৎকট তপ্ত গন্ধ নিযানার নাসারন্ধ্রে আঘাত করল। সে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। গন্ধটা নিকোটিনের কিন্তু ওই ফুঁঁপিয়ে কান্নার শব্দটা কার? নিযানা বিছানা ছেড়ে পা রাখল মেঝেতে। ঘরে নীলচে ডিমলাইট জ্বলছে; অন্ধকারের প্রতি একজাতীয় ভীতি বা ফোবিয়া থাকায় সে কখনোই পুরোপুরি আলো নিভিয়ে শুতে পারে না। ধীরে ধীরে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যেতেই নিযানা থমকে দাঁড়াল। কাঁচের ওপাশে আবছা অন্ধকারে কলরবকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। নিযানা ভেবেছিল নিঃশব্দে ফিরে আসবে কিন্তু বাতাসের ঝাপটায় আসা সিগারেটের ধোঁয়ায় সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কেশে উঠল। সিগারেটের গন্ধে তার দম আটকে আসে। কাশির শব্দে কলরব চকিত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। নিযানা হাতের তালুতে মুখ চেপে ধরে দ্রুত ফিরে আসতে উদ্যত হতেই কলরবের ভারী কণ্ঠস্বর কানে এল,
‘পালিয়ে যাচ্ছিস কেন? দেখে ফেলেছিস যখন তখন বাকিটা উপভোগ কর!’

নিযানার পিত্তি জ্বলে উঠল। সে বিরক্তি নিয়ে ব্যালকনিতে পা রাখল। পা রাখতেই বৃষ্টির শীতল হাওয়া তার সর্বাঙ্গে এক শিরশিরানি শিহরণ জাগিয়ে তুলল। ঝোড়ো বাতাসের ঝাপটায় ব্যালকনির অর্ধেকটা ভিজে একাকার; কলরবের পরনের পোশাকও বোধহয় ভিজে সপসপে হয়ে আছে। সে হাত-পা ছড়িয়ে সেখানে বসে আছে। নিযানা আবারও কাশির দমক সামলে নিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,
‘বন্ধ করো ওটা! আমার কষ্ট হচ্ছে।”
কলরব যেন নিযানার আর্তনাদ শুনতেই পেল না। বরং একরাশ অবজ্ঞা নিয়ে জ্বলন্ত সিগারেটে পুনরায় টান বসাল সে। নিযানা অবশ্য অবাক হলো না; এই নিষ্ঠুর উদাসীনতা এখন কলরবের ভূষণ। সে ধীরপায়ে কলরবের খুব নিকটে ঠিক মুখোমুখি হয়ে বসল। নিযানা হুট করেই কলরবের হাঁটুর ওপর রাখা ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনের আলোয় এক তরুণীর মুখাবয়ব পুরো স্ক্রিন জুড়ে ঝলমল করে উঠল। কলরব ফোনটা কেড়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টাই করল না বরং এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততায় চেয়ে রইল। নিযানা বেশ কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর কলরব ভাঙা গলায় বলল,

‘ওটা ইরা।’
নিযানা ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে কলরবের পানে চাইল। আবছা নীলচে আলো আর অন্ধকারের মিশেলে ছেলেটাকে ভীষণ বিধ্বস্ত আর পরাজিত কোনো সৈনিকের মতো লাগছে। নিযানা শান্ত স্বরে সুধাল,
‘তোমার কেন সবসময় মনে হয় যে আমি তোমাকে কষ্ট পেতে দেখলে আনন্দ পাই?’
কলরব এক চিলতে বিষাদমাখা হাসল। পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
‘তুই ইনজয় করিস না? আমার এই দশা দেখে কি তুই খুব কষ্ট পাস নাকি?’
‘কষ্ট না পেলেও অন্তত অন্যের যন্ত্রণায় আমি উল্লাস করি না। আমি তোমার মতো নই।’
কলরব মাথা নেড়ে সায় দিল। ‘ঠিক বলেছিস। তুই একদম আমার মতো নস। তুই আর আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর দুটো মানুষ। আমাদের চিন্তা-চেতনা, রুচি আর আচার-আচরণ সবই আলাদা। তাই কোনো মিল নেই। আমাদের মিল হওয়া সাঁজে না।’
নিযানা পুনরায় ফোনের ছবিটার দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করল,
‘মেয়েটা সত্যিই খুব সুন্দর। তোমার রুচি ভালো বলতেই হয়। তবে মেয়েটার রুচি ভীষণ খারাপ।’
কলরবের ঠোঁটের কোণে আবারও সেই ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল। নিযানা মুহূর্তকাল চুপ থেকে সরাসরি প্রশ্ন করল,
‘কেন ছাড়ল ও তোমায়? আমি পুরোটা জানিনা।’

বাইরে তখন উন্মত্ত প্রকৃতির তান্ডব চলছে। ঝোড়ো হাওয়ার সাথে বৃষ্টির ঝাপটা ব্যালকনির ভেতরে আছড়ে পড়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে দুজনকে। সেই হিমেল হাওয়ায় শরীর অবশ করা কাঁপন জাগছে। থেকে থেকে বিদ্যুতের তীব্র চমকানি রাতের জমাট অন্ধকারকে চিরে দিয়ে এক অদ্ভুত বিভীষিকার জন্ম দিচ্ছে। নিযানা ভেবেছিল কলরব হয়তো সত্যটা এড়িয়ে যাবে কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে দীর্ঘ এক নিস্তব্ধতার পর কলরব ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল,
‘আমার আগে থেকেই ওর জীবনে একজন ছিল। কোনো এক কারণে ওদের বিচ্ছেদ হয়েছিল, কিন্তু ইরা ওকে খুব ভালোবাসত। কিছুতেই ভুলতে পারছিল না সেই স্মৃতি। ঠিক সেই সময় আমি ওর জীবনে আসি। কয়েকটা দিন পাগলের মতো ওর পিছে ঘুরেছিলাম বলে হয়তো আমায় ও সত্যি পাগল ভেবে বসেছিল। আসলে ওই ছেলেটাকে ভোলার জন্য ও আমায় কেবল একটা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু শেষমেশ ও আর পারেনি। বিয়ের ঠিক আগের দিন যখন ওই ছেলেটা ফিরে এসে ক্ষমা চাইল, ইরা এক মুহূর্তও ভাবেনি। আমাকে কেবল একটা ‘স্যরি’ বলে ও ওর পুরনো ভালোবাসার কাছে ফিরে গেল। কারণ আমাকে ও কোনোদিন ভালোই বাসেনি।’
বলেই কলরব গা দুলিয়ে হাসতে লাগল। সেই হাসি কোনো আনন্দের নয় বরং এক বুক বিষাদের আর্তনাদ। নিযানা স্তব্ধ হয়ে গেল। কলরব এবার অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।

‘আমি আস্ত একটা বলদ, বুঝলি? সব সময় ভুল সিদ্ধান্তই নিই। তোকে বিয়ে করাটাও ছিল আমার জীবনের একটা মস্ত বড় ভুল। আমার মাথার ভেতরটা এখন ভোঁ-ভোঁ করছে। চারপাশটা অসহ্য ঠেকছে। আমি ঠিক কী করব? কোথায় যাব; কিছুই বুঝতে পারছি না। মরে গেলেও বোধহয় শান্তি পেতাম কিন্তু সেটুকু করার সাহসও নেই আমার। তুই-ই বল না নিযানা, একটু স্বস্তি পাওয়ার জন্য আমার এখন ঠিক কী করা উচিত? একটা আইডিয়া দে তো।’
কলরবের এমন ছটফটানি দেখে নিযানার নিজের বুকেও এক অজানা অস্থিরতা ভিড় করল। এমন ভেঙে পড়া মানুষকে ঠিক কোন ভাষায় সান্ত্বনা দিতে হয় তা তার জানা নেই। কাঁপা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল,
‘প্লিজ কলরব, একটু শান্ত হও। এভাবে কেনো বলছো?’

কিন্তু কলরব থামলো না। সে দ্বিগুণ উন্মাদনায় ধরা গলায় আর্তনাদ করে উঠল,
‘আমার বুকের ভেতরটা যেন আগ্নেয়গিরির মতো পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে! মনে হচ্ছে কে যেন মাথার ভেতর হাতুড়ি দিয়ে পেরেক ঠুকছে। এই যন্ত্রণা আমি আর সইতে পারছি না নিযানা। অসহ্য লাগছে সব। আমি… আমি হয়তো পাগল হয়ে যাব, নয়তো ম রেই…’

ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির অবিশ্রান্ত শব্দের মাঝে কলরবের হাহাকার মেশানো কথাগুলো আচমকাই থমকে গেল। নিযানা নিজের কোমল হাতের তালু দিয়ে চেপে ধরল কলরবের মুখ। ঠিক সেই মুহূর্তে দূর আকাশে প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল।বিদ্যুতের সেই ক্ষণিক আলোয় দুজনের মুখশ্রী উদ্ভাসিত হয়ে উঠল এক অপার্থিব আভায়। নিমিষকাল তারা একে অপরের চোখের গহীনে তাকিয়ে রইল। নিযানা ঠোঁট নেড়ে কিছু একটা বলতে চেয়েছিল কিন্তু তার আগেই কলরবের উত্তপ্ত পুরুষালি ওষ্ঠাধর প্রবল ঝড়ের মতো দখল করে নিল নিযানার কম্পিত কোমল ওষ্ঠ জোড়া। মুহূর্তেই এক তীব্র বিদ্যুৎ তরঙ্গ নিযানার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। আকস্মিক এই স্পর্শে তার চেতনা যেন মেঘে ঢাকা চাঁদের মতো আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। মস্তিষ্ক শূন্য, শরীর অবশ; কেবল এক অবাধ্য স্পন্দন তাকে গ্রাস করে নিল। কলরবের ভেতরের পুঞ্জীভূত অস্থিরতা তখন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফেটে পড়ছে। সে কি নিজের নিয়ন্ত্রণ বিসর্জন দিয়েছে? নাকি অদৃষ্টের টানে হার মেনেছে তা বোধগম্য হওয়ার অবকাশটুকুও প্রকৃতি দেয়নি। বাইরের বাতাসের হাহাকার আর বৃষ্টির অঝোর বর্ষণের মাঝেই কলরব নিযানাকে পাজাকোলা করে নিয়ে এল বিছানায়।

এই অবেলায় পর্ব ১৯

জীবনের প্রথমবার কোনো পুরুষের এমন নিবিড় সান্নিধ্য আর গভীর স্পর্শে নিযানার নারীসত্তা এক অদ্ভুত নাজুুুকতায় নুয়ে পড়ল। সে বাধা দেওয়ার শক্তিটুকু হারিয়েছে? নাকি নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক গোপন ইচ্ছায় মৌন হয়েছে বড় বেশি অস্পষ্ট। সময় যত গড়াতে লাগল, কলরবের ছোঁয়া ততই নিবিড় থেকে নিবিড়তর হতে শুরু করল। সেই কালবোশেখীর রাতে যখন জানালার ওপাশে প্রকৃতি ধ্বংসলীলায় মত্ত; ঘরের ভেতর তখন তিল তিল করে গড়ে ওঠা হিমশীতল দেয়ালটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ঘৃণা, অভিমান আর একাকীত্বের দহন মুছে গিয়ে কেবল অবশিষ্ট রইল দুটি তপ্ত হৃদয়ের স্পন্দন। সেই মায়াবী অন্ধকারে তাদের মাঝের সমস্ত দূরত্ব ঘুচে গিয়ে একাকার হয়ে গেল দুটি প্রাণ; নিযানা আর কলরব একে অপরের মাঝে খুঁজে পেল এক বিচিত্র শান্তির আশ্রয়।

এই অবেলায় পর্ব ২১