Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ২১

এই অবেলায় পর্ব ২১

এই অবেলায় পর্ব ২১
সুমনা সাথী

ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে উঠল নবনী। তন্দ্রার আচ্ছন্নতায় সে অনুভব করল কারো উষ্ণ আর জোরালো নিঃশ্বাস বারবার তার চোখেমুখে আছড়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে চোখের পলক মেলতেই নবনী আবিষ্কার করল। সে এক মজবুত বাহুবন্ধনে বন্দি হয়ে আছে। দিব্য তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে গভীর ঘুমে মগ্ন। ঘুমন্ত দিব্যর প্রশান্ত মুখের দিকে তাকাতেই নবনীর ওষ্ঠাধরে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। দিব্যর কোনো হুঁশ নেই; সে যেন এক অতল তন্দ্রার সাগরে ডুবে আছে। অবাধ্য চুলগুলো কপালের সীমানা ছাড়িয়ে কিছুটা চোখের ওপর এসে পড়েছে ওর। এই মুহূর্তে মানুষটাকে বড্ড স্নিগ্ধ আর মায়াবী লাগছে। নবনী নিজের অজান্তেই ভাবল। ইদানীং কি লোকটা তার কাছে একটু বেশিই প্রিয় হয়ে উঠছে? সে অত্যন্ত সন্তর্পণে আলতো হাতে অবাধ্য চুলগুলো দিব্যর চোখের ওপর থেকে সরিয়ে দিল। ঘুমের ঘোরেই দিব্যর ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে উঠল। সেই দৃশ্য দেখে নবনীর হাসি পেয়ে গেল। অনেক কষ্টে ঠোঁট কামড়ে সে নিজের হাসি সংবরণ করল। নবনীর মনে হলো এবার তার বিছানা ছাড়া উচিত কিন্তু দিব্যর এই নিশ্চিন্ত ঘুম ভাঙাতে তার মন চাইল না। এমনকি তার মুগ্ধ দৃষ্টিটুকুও দিব্যর মুখ থেকে সরিয়ে নিতে সে এক অদ্ভুত অনিচ্ছা অনুভব করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক পরিচিত চপল কণ্ঠস্বর তার কানে এল,
‘মাম্মা, গুড মর্নিং! তুমি কি উঠে গেছো?’

দিয়ার আকস্মিক ডাকে নবনী যেন সংবিৎ ফিরে পেল। এক ঝটকায় দিব্যর বাহুবন্ধন থেকে ছিটকে সরে এল। ঝাঁকুনির তীব্রতায় দিব্যরও ঘুমটাও ভেঙে গেল; সে অপ্রস্তুতভাবে চোখ মেলল। নবনী তখন তড়িঘড়ি করে বিছানায় উঠে বসেছে। দিয়াকে খুঁজতে গিয়ে নবনীর নজর পড়ল ঘরে থাকা সোফাটার দিকে। সেখানে দিয়া উপুড় হয়ে দু-হাতে ভর দিয়ে শুয়ে আছে। আর মাথা উঁচু করে বেশ কৌতূহলী চোখে তাদেরই পর্যবেক্ষণ করছে। মেয়েটা কখন যে ঘুম থেকে উঠে নবনী টেরও পায়নি। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় নবনী নুয়িয়ে গেল। দিব্য উঠে বসে একবার নবনীর আরক্ত মুখের দিকে চাইল। পরক্ষণেই দিয়ার সেই ভঙ্গি দেখে হো হো করে হেসে উঠল। দিব্যর হাসি দেখে নবনী আবারও দিয়ার দিকে তাকাল। এবার সে নিজেও নিজের হাসি আর চেপে রাখতে পারল না। খাট থেকে নেমে দিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে নবনী আদুরে গলায় বলল,

‘সোনা এটা তুমি কী করছো? কেন শুয়ে আছো শুনি?’
দিয়া উপুড় হয়ে শোয়া অবস্থাতেই বেশ বিজ্ঞের মতো বলল,
‘মাম্মা, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না দিয়া কতটা ফ্যাট হয়ে গেছে? তাই তো দিয়া পাপ্পার মতো ব্যাম করছে। শরীর ফিট রাখার জন্য এসব করতে হয় মাম্মা। তুমি তো কিছুই জানো না!’
শেষের কথাগুলো সে ঠিক দিব্যর কণ্ঠস্বর আর ভঙ্গি অনুকরণ করেই আওড়াল। নবনী প্রথমে অবাক হলেও পরক্ষণেই মেয়ের এমন কথা শুনে হেসে ফেলল। দিব্য ওদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে সায় দিল,
‘একদম ঠিক! দিয়া সবসময়ই বেস্ট সিদ্ধান্ত নেয়।’
নবনী হাসতে হাসতে দিয়াকে কোল তুলে নিয়ে সোফায় বসল। দিয়ার গালে একটা চুমু খেয়ে আদুরে গলায় শুধাল,
‘তা আমার দিয়া সোনার ফ্যাটটা ঠিক কোথায় শুনি?’
দিয়া তৎক্ষণাৎ হাত দিয়ে তার পেটটা দেখাল। স্বাস্থ্যের দিক থেকে দিয়া বরাবরই একটু নাদুস-নুদুস তাই তার ছোট্ট পেটটা সামান্য দৃশ্যমান। মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে নবনী আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল। দিয়া এবার নবনীর চোখের দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখে প্রশ্ন করল,

‘মাম্মা, দিয়াও কি বড় হয়ে তোমার মতো বিউটিফুল হবে?’
নবনী দিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘অবশ্যই হবে। দিয়া তো একটা রাজকন্যা! আর রাজকন্যারা তো অপূর্ব সুন্দরীই হয়। তারপর একদিন দিয়ার জন্য একটা রাজপুত্র আসবে। সেও দেখতে হবে ভীষণ সুর্দশন। সে দিয়াকে সাথে করে নিজের রাজ্যে নিয়ে যাবে।’
নবনীর এই সাধারণ রূপকথার গল্পটা শুনে দিব্যর বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। তার কলিজার টুকরো মেয়ে বড় হয়ে তাকে ছেড়ে অন্য কারো রাজ্যে চলে যাবে; এই কল্পনাটুকুও তার কাছে অত্যন্ত নিষ্ঠুর মনে হলো। সে এক ঝটকায় দিয়াকে নবনীর কোল থেকে নিজের বুকে টেনে নিল। নবনী এমন আকস্মিক আচরণে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। দিব্য মেয়ের কপালে একটি চুমু খেয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
‘দিয়া একটা প্রিন্সেস, আর সে অনেক শক্তিশালী। দিয়াকে আগলে রাখার জন্য সবসময় তার পাপ্পা থাকবে। আর পাপ্পা যদি কোনোদিন নাও থাকে তবে পাপ্পা দিয়াকে এমন এক কুইন বানিয়ে দিয়ে যাবে; যাতে নিজেকে রক্ষা করার জন্য তার কোনো রাজপুত্রের দরকার না পড়ে।’

নবনীর এবার বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে এল। সাধারণ একটা রূপকথার গল্পেও এই লোকটার এমন পুরুষতান্ত্রিক অহংকার আর গাম্ভীর্য দেখাতে হবে? রূপকথার নিয়ম তো এমনই থাকে। নবনী কিঞ্চিৎ ক্ষুব্ধ স্বরে বলল,
‘এত কঠিন আর গম্ভীর কথা বোঝার বয়স ওর এখনো হয়নি। তাছাড়া রাজা ছাড়া তো কেউ রাণী হতে পারে না। আর মেয়ে বড় হলে তাকে একদিন না একদিন বিয়ে দিয়ে অন্য ঘরে পাঠাতেই হয়। এটাই তো নিয়ম!’
দিব্য খানিকটা তপ্ত স্বরেই বলল, ‘নবনী, তোমার কমনসেন্স কোথায়? এইটুকু একটা বাচ্চার কানে এসব বিয়ের কথা কেউ ঢোকায়? আর ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি এতই চিন্তা হয় তবে শোনো, বিয়ের পরেও দিয়া আমার কাছেই থাকবে। ওকে আমি কোথাও যেতে দেব না।’
নবনীর যেন চুপ করে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে মনে মনে সে প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। কী অদ্ভুত জেদ এই লোকটার! দিয়াকে সে ভালোবাসে ঠিক আছে কিন্তু তাই বলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা? সব কিছুতেই যেন একটা বাড়াবাড়ি ভাব। বড় বড় চোখে দিয়া এবার তাদের দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় বলল,
‘মাম্মা-পাপ্পা, তোমরা কি ঝগড়া করছো? ভেরি ব্যাড! এখনই ভাব করো। পাপ্পা, তুমি মাম্মাকে স্যরি বলো।’
নবনীর মুখখানা ভার হয়ে আছে লক্ষ্য করল দিব্য। মনে মনে সে এক চিলতে হাসল। দিয়ার আবদার মেটাতে সে সামান্য এগিয়ে এল নবনীর দিকে। তারপর কিছুটা ঝুঁকে নবনীর বা-গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে অত্যন্ত নিভৃত স্বরে বলল,

‘স্যরি, নবনী।’
নবনীর চোখের পলক থমকে গেল। স্তম্ভিত হয়ে সে দিব্যর পানে চেয়ে রইল। পরক্ষণেই বিষয়টি তার মস্তিষ্কে খেলে গেল। মুহুর্তে লজ্জার এক তীব্র আভা তার সারা মুখে রক্তিম রঙ ছড়িয়ে দিল। দিব্য দিয়ার সামনেই এমন একটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে; তা ছিল নবনীর কল্পনাতীত। অথচ দিব্যর মুখভঙ্গি একেবারেই স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি। সে দিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
‘এবার কি মাম্মা ঠিক আছে মাম্মা? চলো, আজ জিম রুমে গিয়ে আমরা ফাইট প্র্যাকটিস করব।’
দিয়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে মাথা নাড়ল। ‘একদম ঠিক আছে! মাম্মা, তুমি আর রাগ করে থেকো না কেমন? পাপ্পা তো তোমাকেও আদর করে দিয়েছে। দিয়ার পাপ্পা বেস্ট তাইনা? পাপ্পা চলো, দ্রুত চলো!’
বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে থাকা নবনীকে পেছনে ফেলে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল বাবা-মেয়ে। নবনী ঘাড় ঘুরিয়ে তাদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটা যে এতটা অসভ্য হতে পারে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। শুধু অসভ্য নয়, লোকটা রীতিমতো ধূর্ত! পরক্ষণেই নিজের অজান্তেই নবনীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। আপন মনেই হেঁসে ফেলল।

ক্লাব ঘরের এক কোণে জরাজীর্ণ একটা কাঠের চেয়ারে নিঃসাড় হয়ে বসে আছে কলরব। আঙুলের ভাঁজে জ্বলন্ত সিগারেট থেকে নীলচে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। গত কয়েক ঘণ্টায় একের পর এক সিগারেট পুড়িয়ে সে ইতিমধ্যে এক প্যাকেট শেষ করে ফেলেছে। ঘরের চার দেয়ালের ভেতরটা এখন নিকোটিনের ভারী ধোঁয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। শান্ত, অনন্ত আর অভিক সহ আরও একজন ছেলে সেখানে উপস্থিত। তারা সবাই বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে বিমূঢ় হয়ে বসে আছে। বলা যায় একটা গানের ব্রান্ড তাদের। রাতে কনসার্ট অথচ রিহার্সালের বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই। কলরবের এমন বিধ্বংসী মেজাজ কারোই বোধগম্য হচ্ছে না। গিটারে সুর তোলার বদলে সবাই এখন এক অদৃশ্য ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছে। কলরব সাফ জানিয়ে দিয়েছে। তার অনুমতি ছাড়া এখন কেউ যেন টু শব্দটিও না করে। অবশেষে অভিক আর স্থির থাকতে পারল না। ধৈর্য হারিয়ে সে এগিয়ে গিয়ে কলরবের হাত থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল। কলরব ধীরলয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার দুচোখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। যেন ভেতরে কোনো এক প্রলয়ংকরী দহন চলছে। অভিক সামান্য ঘাবড়ালেও পিছু হটল না। ধমকের সুরে বলল,
‘কী শুরু করেছিস বল তো তুই? একবেলায় এক গাদা সিগারেট সাবাড় করে দিয়ে কি আত্মহত্যার নতুন কোনো রেকর্ড গড়ার ধান্দা করেছিস?’

কলরব শীতল গলায় বলল, ‘সিগারেটটা ফেরত দে অভিক। আমার মাথ কাজ করছে না। এসব নীতিবাক্য শোনার মতো অবস্থায় নেই আমি।’
অভিক নাছোড়বান্দার। তপ্ত স্বরে বলল, ‘বললেই হলো? কালকেও তো তোকে বেশ চনমনে মনে হলো। নিজের মুখে বললি ইরার জন্য তোর আর বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। তুই নাকি অনায়াসেই মুভ-অন করেছিস! তাহলে কাল রাতের এমন কী মহাপ্রলয় ঘটল যে আজ সকাল থেকে পুনরায় মরণ নেশায় নিজেকে ডুবিয়ে দিচ্ছিস?’
অভিকের সোজাসাপ্টা প্রশ্নে কলরব যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কাল রাতের সেই ঝড়ো হাওয়া, নিযানার সাথে কাটানো সেই অবিমৃষ্যকারী মুহূর্তগুলো তার অস্তিত্বের গভীরে এখন বিষ হয়ে বিঁধছে। নিজের ওপরই এক চরম বিতৃষ্ণায় তার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে।
‘তুই বুঝবি না অভিক। সমস্যা ইরাকে নিয়ে নয়; সমস্যা আমার ঘরের ভেতর যাকে নিয়ে এসেছি, তাকে নিয়ে।’
কথাটা বলে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল কলরব। অনন্ত সামনে এগিয়ে এসে খানিকটা বিস্ময় নিয়ে শুধাল,
‘তোর নিযানাকে নিয়ে এত কী সমস্যা ভাই? মেয়েটা কোন দিক দিয়ে খারাপ? হাজার গুণ বিচার করলেও সে ইরার চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।’

শান্ত পাশ থেকে সায় দিয়ে হালকা সুরেই যোগ করল, ‘সেটাই তো! তোর সাথে যদি বিয়েটা না হতো; তবে কনফার্ম আমিই ওকে বিয়ে করতাম। তা যেকোনো মূল্যেই হোক।’
বন্ধুদের এমন অকপট প্রশংসা কলরবের কানে স্রেফ তপ্ত সীসার মতো বিঁধলো। সে এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
‘আমার হাতে যদি ম রতে না চাস তবে সব কটা একদম চুপ থাক! তোরা যদি আমার জায়গায় থাকতিস তবে বুঝতিস অশান্তি কাকে বলে। আমার কোথাও এক চিলতে শান্তি নেই। ঠিক আছে। অনেক হয়েছে… আমি চলে যাচ্ছি।’
আর কাউকে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদের সুযোগ না দিয়ে কলরব ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার প্রস্থানের দিকে বাকি সবাই বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। ওদের অপরাধটা ঠিক কোথায় ছিল তা কেউ বুঝে উঠতে পারলোনা।

কলরব যখন ফিরে এলো বাড়ির সবাই তখন সকালের নাস্তার টেবিলে সমবেত। কোনো দিকে না তাকিয়ে সে সোজা নিজের ঘরের দিকেই পা বাড়িয়েছিল কিন্তু অলেখার সজাগ দৃষ্টি এড়াতে পারল না। তার ডাকে বাধ্য হয়েই সে কুহুর পাশের খালি চেয়ারটায় গিয়ে বসল। নিযানা ঠিক তার সম্মুখেই বসা অথচ কলরব একবারও মুখ তুলে সেদিকে তাকানোর সাহস পেল না। নিযানা আজ সকালে ঘুম ভেঙে পাশে কলরবকে পায়নি। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই একরাশ দ্বিধা আর সহস্র প্রশ্ন তার মস্তিষ্ককে কুরে কুরে খাচ্ছিল। যার প্রতিটি উত্তর এখন ওর সামনে বসা ওই মানুষটির কাছেই গচ্ছিত। গত রাতের সেই ঝোড়ো হাওয়ায় উথালপাথাল মুহূর্তগুলোতে ভবিষ্যতের পরিণাম কিংবা তাদের নড়বড়ে সম্পর্কের পরিণতি; কোনো চিন্তাই মাথায় ঠাঁই পায়নি। কলরব সেই অবকাশটুকু দেয়নি। কলরব নিজেও জানে না, কাল রাতে ওর ঠিক কী হয়েছিল। প্রবল তৃষ্ণায় চাতক পাখির মতো স্বস্তির সন্ধানে হাহাকার করা এক তপ্ত মরুভূমি যেন আচমকাই এক পশলা বৃষ্টির দেখা পেয়েছিল। কলরবও ভুলে গিয়েছিল তার গ্লানিভরা অতীত আর চরম অপছন্দের মেয়েটার সাথে সম্পর্কের আজন্ম তিক্ততা। ব্যাস, আর দশটা সাধারণ দম্পতির মতো একটি মধুর রাত কাটিয়েছিল তারা। কিন্তু এখন এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে কী করবে তা ওর বোধগম্য হচ্ছে না। কলরবের মূল অস্থিরতার উৎস আসলে কায়েফ। যদি তাদের মাঝখানে কায়েফ নামক কোনো অধ্যায় না থাকত; তবে হয়তো পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না। সে পরিকল্পনা করেছিল বাজে ব্যাবহার আর তিক্ততা আরও বাড়িয়ে কিছুদিন পর নিযানাকে ডির্ভোস দিয়ে সবকিছু পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু কাল রাতের সেই অবিমৃষ্যকারী ঘটনা সব সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছে।টেবিলের জমাটবদ্ধ নীরবতা ভেঙে আরশাদ তালুকদার বললেন,

‘কলরব, সকাল সকাল কোথায় গিয়েছিলে? আর ফিরছই বা কোথা থেকে?’
কলরব দৃষ্টি নিচু রেখেই খুব সংক্ষিপ্ত জবাব দিল,
‘একটা জরুরি কাজ ছিল।’
আরশাদ তালুকদার কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরেই বললেন,
‘তোমার আবার দরকারি কাজ! তাও সাতসকালে। আচ্ছা ওসব বাদ দাও। যেটা বলছিলাম, অনেকদিন হলো নিযানার কলেজে যাওয়া বন্ধ। সামনে পরীক্ষা। এখন আর কামাই দেওয়া চলবে না। আজ থেকে তুমিই ওকে কলেজে দিয়ে আসবে আর নিয়ে আসবে।’
কলরব কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই অলেখা বেশ অবাক হয়ে বলে উঠলেন,
‘নিযানা কলেজে যাবে মানে? তুমি কি মজা করছো?’
আরশাদ তালুকদার ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘আশ্চর্য অলেখা, এটা মজা করার মতো কথা হলো? নিযানাকে তো পড়াশোনা চালিয়ে যেতেই হবে। বিয়ের সময় আমি আনতাসাকে কথা দিয়েছিলাম। বিয়ের পর নিযানার জীবনে বাড়ি বদলানো ছাড়া আর কোনো পরিবর্তন আসবে না। আমরা সবাই জানি ও পড়াশোনার ব্যাপারে কতটা সিরিয়াস।’

স্বামীর কথায় অলেখা প্রচণ্ড বিস্মিত হলেন। এই বাড়ির দীর্ঘদিনের নিয়ম। বউরা বাইরে চাকরি বা পড়াশোনা করবে না। তবে নিযানার ক্ষেত্রে কেন এর ব্যতিক্রম হবে? তিনি বেশ কঠোর গলায় বললেন,
‘তুমি কি এই বাড়ির নিয়ম ভুলে গেছো? নিযানার বেলায় কেন নিয়মের নড়চড় হবে? আমার মৌনিতার কথা স্পষ্ট মনে আছে। মেয়েটা চেয়েছিল কাব্যর মতোই ডাক্তার হতে। ওদের পরিচয়ও হয়েছিল ডাক্তারি পড়ার সূত্রে। কিন্তু কাব্যকে বিয়ে করে এই বাড়ির বউ হওয়ার পর ওকে সবকিছু ছাড়তে হয়েছে। ও তো দিব্যি সংসার করছে। কই ওর বেলায় তো নিয়মের এদিক-ওদিক হয়নি!’

কথাগুলো কানে যেতেই খাবার গুছিয়ে রাখতে থাকা মৌনিতার হাত দুটো থমকে গেল। চোখের কোণে এক চিলতে পানিকণা চিকচিক করে উঠল তার। অলেখা ভুল কিছু বলেননি। কাব্যকে ভালোবেসে নিজের তিল তিল করে গড়া স্বপ্নকে সে বিসর্জন দিয়েছে; এখন সে শুধুই এই বাড়ির বউ আর সন্তানের মা। জীবন চলছে ঠিকই কিন্তু আজও যখন সে কাব্যর স্টেথোস্কোপ কিংবা সাদা অ্যাপ্রনটা দেখে, বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। এই বেদনার কথা সে কাউকেই বলেনি। এমনকি কাব্যকেও না। আরশাদ তালুকদার মাথা নিচু করে ফেললেন। অলেখার এই অকাট্য যুক্তির বিপরীতে কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। কিন্তু সামনে বসে থাকা নিযানার দিকে চোখ পড়তেই তাঁর বুকটা ভারী হয়ে এলো। মেয়েটা ফ্যালফ্যাল করে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই চোখে আকুতি। আরশাদ তালুকদার নিজেকে শক্ত করলেন। একটু দৃঢ় গলায় বললেন,
‘দেখো অলেখা, সময় বদলেছে। তাছাড়া মৌনিতা আর নিযানার পরিস্থিতি এক নয়। আমার যা বলার আমি বলে দিয়েছি। নিযানা, তুমি খাবার শেষ করে কলরবের সাথে বেরিয়ে যেও।’
কথাটা শেষ করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন আরশাদ তালুকদার। কিন্তু অলেখা আজ সহজে ছাড়বার পাত্রী নন; তিনি তীক্ষ্ণ স্বরে গর্জে উঠে বললেন,

‘খবরদার! কোথাও যাবে না তুমি। আমাদের সাংসারিক ব্যাপারে তোমার কথাই কবে থেকে শেষ কথা হতে শুরু করল? মৌনিতার কথা নাহয় কয়েক বছর আগের পুরনো কাসুন্দি কিন্তু নবনীর কথা ভাবো! ওকেও তো নিজের পড়াশোনা বিসর্জন দিতে হয়েছে। এক বাড়িতে ওদের সাথে হওয়া এমন অবিচার আমি মেনে নেব কী করে? শুধুমাত্র নিযানা তোমার বোনের মেয়ে বলে তাকে সাত খুন মাফ করে দেবে?’
আরশাদ তালুকদার এবার কিছুটা নরম হলেন। কোমল স্বরে বললেন,
‘দেখো অলেখা, আমি এই একটা বিষয়ে তোমার কাছে অনুরোধ করছি করছি। এটা নিয়ে আর কথা বাড়িয়ো না। পড়াশোনা বাদে সংসারের বাকি সব দায়িত্ব, সব নিয়ম তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করব না। কিন্তু এই একটা ব্যাপারে আমি সত্যিই নিরুপায়। দয়া করে বোঝার চেষ্টা করো।’
অলেখা থমকে গেলেন। স্বামীর গলার দৃঢ়তা আর অসহায়ত্ব দেখে তিনি বুঝলেন; এই সিদ্ধান্ত বদলানো তাঁর সাধ্যের বাইরে। রাগে-ক্ষোভে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আরশাদ তালুকদার আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুতপায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। অলেখা তখনো আক্রোশে কাঁপছেন। কলরব এতক্ষণ পাথরের মতো বসে সব শুনছিল। এবার সে উঠে দাঁড়াল। নিযানার দিকে একবারও না তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় কেবল এটুকুই বলল,

‘দশ মিনিট। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।’
কথাটা বলে কলরব যখন বেরিয়ে গেল অলেখার পুঞ্জীভূত ক্রোধের কিছুটা তার ওপর গিয়েও আছড়ে পড়ল। বড় বেশি বিঁধল মনে; যে ছেলের সুখের জন্য তিনি পুরো দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে পারেন, সেই ছেলেই আজ বাবার কথা মেনে নিয়ে তাঁকে একঘরে করে দিয়ে গেল। এমনটাই মনে হলো তাঁর। নিযানা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাইরে বের হলো। দেখল কলরব বাড়ির গেটের সামনেই বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে। মাথায় হেলমেট থাকায় তার মুখচ্ছবি বোঝার উপায় নেই। নিযানা ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই কলরব কোনো কথা না বলে বাইক স্টার্ট করল। নিযানা দ্বিধা নিয়ে বাইকে উঠে বসল। তার মন এবং মস্তিষ্ক উভয়ই তখন এক চরম অস্থিরতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। কলরবের এই রহস্যময় আচরণের অর্থ কী? কেন সে এমন নির্বাক হয়ে আছে? হুট করে কলরবকে ছুঁয়ে বসতেও নিযানার মাঝে এক তীব্র সংকোচ কাজ করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ বাইকটা স্থির দাঁড়িয়ে রইল। যেন কারো অপেক্ষায় আছে। হঠাৎ কলরবের গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে এল নিযানার,

‘আমাকে ছুঁতে কি খুব ঘৃণা লাগছে? ঠিকমতো ধরে বস। নয়তো রাস্তায় পড়ে মরলে দোষটা আমার ঘাড়েই আসবে।’
নিযানা চমকে উঠল। তবে এই রূঢ় কথার আড়ালে কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম যত্ন লুকিয়ে মনে হলো তার। যা নিযানার মনে এক চিলতে ভালোলাগা জাগিয়ে তুলল। ছেলেটা কি তবে তার পরোয়া করছে? এই সামান্য প্রশ্রয়েই যেন তার অস্থির মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরল। সে আলতো করে কলরবের কাঁধে একটি হাত রাখতেই বাইকটা তীরের বেগে ছুটতে শুরু করল। বাইকের গতি ক্রমশ এমন উন্মাদ পর্যায়ে পৌঁছাল যে নিযানা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। কয়েকবার গতি কমানোর অনুরোধ করলেও কলরবের কানে যেন সেসব পৌঁছালই না। সে নিজের ভেতরের সব উগ্রতা বাইকের গতির ওপর উগরে দিয়ে কলেজ প্রাঙ্গণে পৌঁছাল।

বাইকটা থামতেই নিযানা যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল। অপমানে আর রাগে তার শরীর জ্বলছিল। বাইক থেকে নেমে কলরবকে কড়া কিছু শোনানোর প্রস্তুতি নিলো কিন্তু তার আগেই কলরব বাইক নিয়ে দৃষ্টিসীমানার বাইরে চলে গেল। নিযানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অদ্ভুত এক ভালোলাগা আর বিষাদের মিশ্রণ নিয়ে তার কলেজের সময়টা পার হলো। কলেজ ছুটি হওয়ার পর বের হতেই সে আবার কলরবকে দেখতে পেল। গেট থেকে খানিকটা দূরে সেই কালো বাইকটাতে হেলান দিয়ে বসে আছে সে। নিযানার ঠোঁটে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে এগিয়ে যেতেই কলরব যান্ত্রিকভাবে হেলমেটটা মাথায় চড়িয়ে নিল। আবারো কোনো বাক্য ব্যয় না করে বাইক স্টার্ট করল সে। নিযানা উঠে বসার পর দেখল আকাশ মেঘে ঢাকা, সাথে তাল মিলিয়ে শুরু হয়েছে ঝোড়ো হাওয়া। কিন্তু প্রকৃতির সেই ঝড়ের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি বেগে ছুটছে কলরবের বাইক। নিযানা আর সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে উঠল,

‘স্পিড কমাও কলরব! আমার প্রচণ্ড ভয় লাগছে। তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? এত জোরে কেউ বাইক চালায়? তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো না?’
বাইকের গতি এবারও কমল না বরং এক ঝটকায় একেবারে থেমে গেল। সেই নিস্তব্ধতার মাঝে ভেসে এল কলরবের শান্ত কণ্ঠস্বর,
‘নাম!’

এই অবেলায় পর্ব ২০

নিযানা অবাক হলো। কোনো যান্ত্রিক সমস্যা হয়েছে ভেবে সে নিচে নামল। আকাশ ভেঙে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মেঘের গর্জন আর বিদ্যুতের ঝলকানি। নিযানা উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল,
‘কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?’
কলরব কিছুক্ষণ নিরব রইল। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তার নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
‘আই অ্যাম স্যরি। কাল রাতের ওই ঘটনার জন্য। আমি খুব শীঘ্রই তোকে ডিভোর্স দিয়ে দেব।’

এই অবেলায় পর্ব ২২