এই অবেলায় পর্ব ২২
সুমনা সাথী
আকাশ আজ উন্মাতাল। চারিপাশ যেন এক প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসলীলায় মেতেছে। ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে গাছপালা সব নুয়ে পড়ছে। দূরে কোথাও তীব্র শব্দে বাজ পড়ার শব্দ শোনা গেল। কিন্তু নিযানার মনে হলো তার চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ স্থির হয়ে গেছে। নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কেও বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। এত কিছুর পর, গত রাতের সেই নিবিড় মুহূর্তের পরেও; কলরব এমন অবলীলায় বিচ্ছেদের কথা বলতে পারল? নিযানার মনে জমে থাকা এক আকাশ প্রশ্ন করার সুযোগটুকুও সে দিল না। তীরের বেগে বাইক চালিয়ে নিযানার ঝাপসা দৃষ্টিসীমানা ছাড়িয়ে চলে গেল কলরব। নিযানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কতক্ষণ তার কোনো হিশেব নেই। কান্নার এক প্রবল দলা তার কণ্ঠনালীতে আটকে গেল। বড় বড় ফোটায় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে আশেপাশে তাকিয়েও কোনো গাড়ির দেখা পেল না সে। রাস্তা একদম জনমানবহীন।
নিভৃত এই রাস্তায় এমনিতেই গাড়ি কম থাকে তার ওপর এই দুর্যোগে সব থমকে গেছে। ঘন ঘন বজ্রপাতে নিযানার শরীর বারবার কেঁপে উঠছে। বৃষ্টির মধ্যে ধীরপায়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো দোষ কলরবের নয়; দোষ আসলে তার ভাগ্যের।বাবা-মায়ের একমাত্র আদুরে মেয়ে হয়েও আজ সে রাস্তার মাঝখানে পরিত্যক্ত। কারো কাছে চরম অবহেলিত। নিজের ওপর এক চরম বিতৃষ্ণা জন্মালো তার। এই মানুষটাকেই কি সে মনে মনে পছন্দ করত? কলরবের প্রতি নিযানার এই দুর্বলতা এক-দুদিনের নয়; প্রায় বছরখানেক ধরে সে এই অনুভূতির ভার বয়ে বেড়াচ্ছে। রূপ আর ব্যক্তিত্বে নিযানা নিঃসন্দেহে অনন্যা; তার পেছনে ছেলেদের ভিড় থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। কত শত প্রপোজাল আসত তার কাছে কিন্তু অদ্ভুতভাবে ওই ছেলেগুলো আর দ্বিতীয়বার আসত না। উল্টো নিযানার কাছে মাফ চেয়ে দূরে সরে যেত। নিযানা একদিন কৌতূহলবশত একজনকে চেপে ধরতেই বেরিয়ে আসে আসল সত্য। কলরব আর তার বন্ধুরা মিলে ওই ছেলেদের মারধর করত। কায়েফের আদেশে কলরব নিযানার ওপর নজর রাখত আর কেউ তাকে বিরক্ত করলে উগ্রভাবে তার বদলা নিত। নিযানা ভেবেছিল হয়তো কলরব তাকে গোপনে ভালোবাসে। তাই এমন করে। শুরুতে কলরবের মতো এমন বেপরোয়া ছেলেকে সে পছন্দ করত না।
কিন্তু বিপরীত মেরুর প্রতি মানুষের এক সহজাত আকর্ষণ থাকে। নিযানার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। যখন শুনল কলরব অন্য কাউকে বিয়ে করছে তখন সে নিজের সুপ্ত ভালোলাগাটাকে বুকের গহীন কোণে কবর দিয়েছিল। খুব একটা যে ভালোবাসা ছিলো তেমনটাও তো না। কিন্তু যখন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিয়েটা হয়েই গেল, নিযানা ভেবেছিল হয়তো সৃষ্টিকর্তা চেয়েছেন তাদের এই অপূর্ণ গল্পটা পূর্ণতা পাক। আর এইজন্য বোধহয় নিযানা না চাইলেও বারবার ওই ছেলেটার কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু আজ নিযানার সব ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। কলরব যতই খারাপ হোক, এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন আর অমানুষ হতে পারে; তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। এমন একটা দুর্যোগের মধ্যে একা একটা মেয়েকে রাস্তার মাঝখানে ছেড়ে যাওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা সে কীভাবে করল? পথিমধ্যে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার নিযানাকে দেখে গাড়ি থামাতে বাধ্য হলো কায়েফ। সে কল্পনাও করতে পারেনি নিযানাকে এই অবস্থায় পথে দেখতে পাবে। হঠাৎ গাড়ির শব্দে নিযানা ঘুরে তাকাতেই কায়েফ বিস্ময় নিয়ে ওকে দেখলো। স্তম্ভিত হয়ে শুধাল,
‘তোর এই অবস্থা কেন? আর এভাবে কেন ফিরছিস? তোকে কলেজ থেকে কেউ নিতে আসেনি?’
কায়েফের অজস্র প্রশ্নের বিপরীতে নিযানা কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না। সে কেবল অপলক আর শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আদতে এই পরিস্থিতির কী জবাব হতে পারে তা তার নিজেরও জানা নেই। কায়েফ আর উত্তরের অপেক্ষা করল না; তড়িঘড়ি করে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বলল,
‘আগে ভেতরে আয়। জলদি!’
নিযানা এক যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো নিঃশব্দে গাড়িতে গিয়ে বসল। কায়েফ আড়চোখে মেয়েটাকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। নিযানা স্বভাবগতভাবেই মিতভাষী কিন্তু কায়েফের কাছে তার রূপ ছিল ভিন্ন; তার সাথে নিযানা সব কথা নির্দ্বিধায় ভাগ করে নিত। পরক্ষণেই কায়েফের মনে পড়ল নিযানা এখন বিবাহিত। তবে কি এই অল্প কদিনে অনেক কিছুই বদলে গেছে? নিযানার এমন বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে কায়েফের মনে হাজারো প্রশ্নের ভিড়। মেয়েটা বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে। বাইরের ঝাপসা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে নিযানা উদাসীনভাবে হুট করেই বলে উঠল,
‘কী হলো? চলো।’
কায়েফ সংবিৎ ফিরে পেয়ে দ্রুত মাথা নাড়ল। নিজের টি-শার্টের ওপর থাকা বাড়তি শার্টটি খুলে সে নিযানার দিকে বাড়িয়ে দিল। নিযানা বিন্দুমাত্র সংকোচ না করেই সেটা গ্রহণ করল; এই মুহূর্তে গায়ের ভেজা কাপড়ের ওপর একটা আবরণের খুব প্রয়োজন ছিল ওর। কায়েফ আর কোনো কথা বাড়াল না। সে বুঝতে পারল। নিযানা এই মুহূর্তে কোনো কৈফিয়ত দিতে ইচ্ছুক নয়। একপলক বিষণ্ণ নিযানাকে দেখে সে গাড়ি চালাতে শুরু করল। ড্রয়িং রুমে তখন বাড়ির সবার দুশ্চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নিযানা। ওকে অক্ষত অবস্থায় ফিরতে দেখে সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও ওর বিধ্বস্ত রূপ দেখে অবাক হওয়া থামল না কারো। সবার কৌতূহলী প্রশ্ন আর উদ্বেগকে উপেক্ষা করে নিযানা সোজা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। কারো কোনো কথার উত্তর দিলোনা। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় মাঝপথে কলরবের সাথে ওর দেখা হলো। দুজনের চোখাচোখি হলেও কোনো বাক্য বিনিময় হলো না; কেবল এক জোড়া শীতল চাউনি বিনিময় হলো। কলরব হয়তো কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। কিংবা অপরাধবোধ থেকেই নিযানার পেছন পেছন ওর ঘর পর্যন্ত গেল। কিন্তু কলরব কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিযানা সশব্দে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। সেই বন্ধ দরজার ওপাশে পড়ে রইল কলরবের অপ্রকাশিত শব্দ আর নিযানার এক বুক চাপা অভিমান।
দুপুরের পরপরই বৃষ্টির তাণ্ডব থেমেছে। ধুয়ে যাওয়া নীল আকাশে এখন কড়কড়ে রোদের ঝিলিক; দেখে বোঝার উপায় নেই যে কিছুক্ষণ আগেও এখানে প্রকৃতির উগ্রতা ফুটে উঠেছিল। সন্ধ্যার নাস্তা তৈরি শুরু করতে নবনী রান্নাঘরে প্রবেশ করল। সেখানে মিলু আর মৌনিতা আগে থেকেই কাজে ব্যস্ত। মৌনিতার গম্ভীর মুখাবয়ব দেখে নবনী সহজেই আঁচ করতে পারল যে আবহাওয়া শান্ত হলেও রান্নাঘরের পরিবেশটা বেশ গুমোট হয়ে আছে। আজকের মেন্যুতে কলিজার সিঙ্গাড়া আর নুডলস। নবনী এগিয়ে গিয়ে বলল,
‘একটু দেরি হয়ে গেল। কিছু মনে করো না। আসলে দিয়াটা আজ কিছুতেই ঘুমাতে চাইছিল না। ওকে সামলাতেই সব সময় চলে গেল।’
মৌনিতার মেজাজ আগে থেকেই তিরিক্ষি হয়ে ছিল। নবনী রান্নাঘরের কাজে এমনিতেই খুব একটা পটু নয়। তার ওপর সবটুকু সময় সে মেয়ের পেছনেই ব্যয় করে। সংসারের বাকি কাজের চাপ মৌনিতার ওপরই এসে পড়ে। তারও তো দুটো সন্তান আছে। কই সে তো ঠিকই সবকিছু সামলে নেয়! মৌনিতা রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
‘সমস্যা নেই। মৌনিতা তো আছেই। সব খাটাখাটুনি আর হাড়ভাঙা খাটুনি তো ওর ভাগ্যেই লেখা। বাকিরা যে যার মতো আয়েশ করতেই পারে!’
নবনীর হাসিমুখটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। মৌনিতা যে ক্ষুব্ধ হয়ে আছে তা সে জানত।তবুও এমন সোজাসাপ্টা কথা মনে গিয়ে বিঁধল। সে মনেপ্রাণে চেষ্টা করে সবকিছু গুছিয়ে নিতে। কিন্তু এই বড় সংসারের চাকা ঘোরানো তার মতো মেয়ের জন্য বড্ড কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবুও পরিস্থিতি শান্ত করতে সে মৌনিতার কথাটুকু মুখ বুজে হজম করে নিল। প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টায় মিলুর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘মিলু আপা, তোমার ওই সমস্যাটার কি কোনো সমাধান হলো?’
মিলু মৃদু মাথা নেড়ে সায় দিয়ে কাজের তাড়া দিল, ‘বড় ভাবি, তুমি বরং নুডলসগুলো প্লেটে বেড়ে ফেলো। নাস্তা দেওয়ার সময় হয়ে এলো।’
মৌনিতা এবার দ্বিগুণ অভিমান হলো। কড়াই নাড়তে নাড়তে গলার স্বরে অভিমান ঢেলে বলল,
‘বাহ! এখন কি আমার কথাও উপেক্ষা করা শুরু করলে নবনী? তা তো করবেই। এখন নতুন জা এসেছে বলে আমি তো এখন পর হয়ে গেছি!’
নবনী আলতো করে হাসল। এই কয়েক দিনে সে মৌনিতাকে বেশ চিনেছে; মানুষটার মেজাজ কখনো কখনো চড়া হলেও মনটা একেবারে কাঁচের মতো স্বচ্ছ। নবনী ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে মৌনিতাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। মোলায়েম গলায় বলল,
‘তোমাকে কি করে ভুলতে পারি? তোমার দরকার তো আমার সবসময় লাগে। তাছাড়া তুমিই তো বলো তুমি আমার জা নও আমার বড় বোন। তাহলে?’
মৌনিতা হেসে ফেলল, ‘হয়েছে হয়েছে আর ঢং করে ভুলিয়ে রাখতে হবে না। যাও, হাত চালাও। সব কাজ কি আমি একাই করব? বাড়ির একজন তো সেই সকালে নাস্তা খেয়ে বের হলো। তারপর দুপুরে ফিরে ঘরে যে খিল দিল। আর বের হওয়ার নামগন্ধ নেই! তাকে তো আর কেউ কিচ্ছু বলবে না।’
নবনী আলতো করে মৌনিতাকে ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজে মন দিল। সে বেশ বুঝতে পারছে মৌনিতা কার দিকে ইঙ্গিত করছে। এই বাড়িতে নিযানার আগমন এবং তাকে ঘিরে নিয়মের যে ব্যতিক্রম ঘটছে। তা নিয়ে ভেতরে ভেতরে সবার মনেই একটা অস্থিরতা দানা বেঁধেছে। মৌনিতা এবার গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে চাপা গলায় শুধাল,
‘আচ্ছা নবনী, তোমার কি একটুও রাগ হচ্ছে না? খারাপ লাগছে না নিজের জন্য?’
নবনীর হাত দুটো ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। খারাপ যে লাগছে না তা তো নয়। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে নিজের একটা পরিচয় গড়ার স্বপ্ন তো তারও ছিল। কিন্তু সে যে এখন এক বিরাট দায়িত্বের আবর্তে বন্দি। বিয়ের আগে সে এতটাই মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল যে নিজের ক্যারিয়ার বা পড়াশোনা নিয়ে ভাবার সুযোগই পায়নি। আর এই বাড়ির কঠিন নিয়মের কথা তো তার অজানা ছিল না। নবনী নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘তোমার কথা ভেবে খারাপ তো অবশ্যই লাগছে। মেয়েরা যে ভালোবাসার টানে কতটা আত্মত্যাগ করতে পারে; তা তোমাকে না দেখলে বুঝতাম না। তোমার কি কখনো আফসোস হয় না?’
মৌনিতা একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আফসোস হয় না। কারণ সিদ্ধান্তটা আমার ছিল। আর কাব্য আমাকে কখনো আফসোস করার সুযোগ দেয়নি। বিয়ের এত বছর পরেও ও আমাকে আগলে রাখে। বড্ড ভালোবাসে। কিন্তু হুট করে আজ এই পুরনো নিয়ম ভাঙা দেখে খুব কষ্ট পেয়েছি। মনে হচ্ছে আমাদের ত্যাগগুলো যেন তুচ্ছ ছিল।’
নবনী শান্ত গলায় বলল, ‘ছেড়ে দাও তো ওসব কথা। এখন শুধু শুধু পুরনো ক্ষত খুঁচিয়ে মন খারাপ করে তো কোনো লাভ নেই।’
‘লাভ আছে নবনী। আমি চাই তুমি এ নিয়ে কথা বলো। আমার বেলা তো সময় পার হয়ে গেছে কিন্তু তুমি কেন এই সুযোগ হারাবে? তুমি বড় ভাইয়ার সাথে কথা বলো। তুমি কেন এই বৈষম্য মুখ বুজে মেনে নেবে?’
নবনী শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। মৌনিতা নাছোড়বান্দার মতো আবারও বলল,
‘শুধু মাথা নাড়লে হবে না নবনী। নিজের অধিকারটা বুঝতে শেখো।’
তাদের আলোচনার মাঝেই নবনীর ফোনটা বেজে ওঠায় কথায় ছেদ পড়ল। রান্নাঘরের কোলাহল থেকে একটু সরে গিয়ে ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে অসীমের পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
‘নবনী বলছো?’
নবনীর নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। ফোনের ওপাশে অসীমের কণ্ঠস্বর নিশ্চিত হতেই তার ধমনীতে রাগের তীব্র স্রোত বয়ে গেল। মুহূর্তের জন্য তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাওয়ার উপক্রম হলেও রান্নাঘরে মৌনিতাদের উপস্থিতিতে সে নিজেকে প্রাণপণ সংবরণ করল। দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত নিচু অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
‘কোন সাহসে তুমি আমাকে ফোন করেছো? কি চাই হ্যাঁ? তোমার স্পর্ধায় দেখে আমি অবাক হচ্ছি?’
ওপাশ থেকে অসীমের ত্বরিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আগে আমার পুরো কথাটা শোনো নবনী! তোমার সাথে প্রেমালাপ করার জন্য ফোন করিনি আমি। ওষুধের তিন নম্বর গোডাউনে আগুন লেগেছে। বড় সাহেবকে বারবার কল দিচ্ছি কিন্তু তিনি ফোন ধরছেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, দিব্য তালুকদার। তোমার প্রিয় স্বামী এখন ওই জ্বলন্ত গোডাউনের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন! আরশাদ তালুকদারকে খবরটা জানিয়ে দাও!’
অসীমের শেষ কথাগুলো নবনীর কানে যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল। চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা এক নিমেষে দুলে উঠল তার। হাতের মুঠো শিথিল হয়ে ফোনটা সশব্দে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। ফোনের সেই আওয়াজে চমকে উঠল মিলু আর মৌনিতা। মৌনিতা হাতের কাজ ফেলে অবাক হয়ে শুধাল,
‘এ কী নবনী! ওভাবে ফোনটা ফেলে দিলে কেন? কী হয়েছে তোমার?’
নবনী সে কথার উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। তার শ্রবণেন্দ্রিয় তখন অসীমের ওই একটি বাক্যে থমকে আছে। এক হাতে শাড়ির কুচি সামলে নিয়ে উন্মাদিনীর মতো সে রান্নাঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। মৌনিতা মুহূর্তকাল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর খারাপ কিছু একটা আঁচ করে নবনীর পিছু নিল। নবনী হন্তদন্ত হয়ে আরশাদ তালুকদারের ঘরে গিয়ে ঢুকল। তিনি তখন দুপুরের ভাত-ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। পাশে অলেখা জেগে থাকলেও নবনীকে এমন বিধ্বস্ত আর পাংশু মুখে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন। নবনী কোনোমতে সবটুকু বলতেই ঘরে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। অলেখা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আরশাদ তালুকদার বিদ্যুৎবেগে বিছানা ছাড়লেন। মুহূর্তের মধ্যে কলরব আর কায়েফকে ডেকে জড়ো করলেন তিনি। বাড়িতে এক হাহাকারময় শোরগোল পড়ে গেল। তড়িঘড়ি করে সবাই গাড়ির দিকে ছুটছে। কিন্তু নবনীর অবাধ্য মন কিছুতেই স্থির হতে পারছিল না; দিব্যর বিপদের কথা ভেবে তার বুকের ভেতরটা যেন দাউদাউ করে জ্বলছে। কিছুক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকার পর সে হুট করেই বাইরের দিকে দৌড় দিল। মৌনিতা বারবার পিছু ডাকলেও নবনীকে আটকাতে পারলো না। ভাগ্যক্রমে আরশাদ তালুকদাররা গাড়ি ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে নবনী সেখানে পৌঁছে গেল। আরশাদ তালুকদার প্রথমে দ্বিধায় ভুগলেও শেষমেশ নবনীকে সাথে নিতে বাধ্য হলেন।
চারিদিকে মানুষের আর্তনাদ আর দিগ্বিদিক দৌড়াদৌড়ি। বাতাসের প্রতিটি কণা এখন মিশে গেছে কুৎসিত সাদা-কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে। অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর গাড়িগুলো এসে পৌঁছেছে; দমকলকর্মীদের অবিশ্রান্ত চেষ্টা আর জলের ধারাও যেন সেই লেলিহান শিখার কাছে হার মানছিল। আগুনের প্রকোপ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। নবনী ভিড়ের মধ্যে পাগলের মতো তার কাঙ্ক্ষিত মুখটি খুঁজতে লাগলো। ধোঁয়ায় ঢাকা সেই বিভীষিকাময় প্রাঙ্গণে তখন এক হাহাকারময় পরিস্থিতি। গোডাউনের ভেতর থেকে শ্রমিকদের একে একে উদ্ধার করে আনা হচ্ছে; তাদের মধ্যে কয়েকজনের শরীর এতটাই ঝলসে গেছে যে চেনার উপায় নেই। সেই দৃশ্য দেখে নবনীর দুচোখ ঝাপসা হয়ে এল। এক তীব্র আতঙ্ক তার হৃৎপিণ্ডকে খামচে ধরল। কায়েফ, কলরব আর আরশাদ তালুকদার তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। যখন কোথাও দিব্যর চিহ্ন পাওয়া গেল না তখন আরশাদ তালুকদার যেন হঠাৎ সব শক্তি হারিয়ে ফেললেন। তিনি মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন; এক জনৈক পিতার বুকফাটা আর্তনাদে চারপাশ ভারী হয়ে উঠল। এর মধ্যেই আফতাব তালুকদার সেখানে এসে পৌঁছালেন। অস্থিরভাবে তিনি এক পরিচিত কর্মচারীকে ডেকে প্রশ্ন করলেন,
‘দিব্য কোথায়? শুনলাম ও নাকি ভেতরেই ছিল! কোথায় আমাদের ছেলেটা?’
পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের সেই যুবক শ্রমিকটি তখনো আতঙ্কে কাঁপছিল। সে ক্ষীণস্বরে বলল,
‘স্যারকে তো ভেতরেই দেখেছিলাম। উনি সবাইকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে সাহায্য করছিলেন। এমনকি আমাকেও তো উনিই আগুনের মুখ থেকে টেনে বের করলেন। কিন্তু স্যারের তো এতক্ষণে বেরিয়ে আসার কথা ছিল!’
কর্মচারীর এই কথাটি যেন নবনীর শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিল। জ্বলন্ত বিল্ডিংটার দিকে চেয়ে সে অনুভব করল তার পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকার শেষ সামর্থ্যটুকু হারিয়ে সে ধুলোর ওপর লুটিয়ে পড়ল। আরশাদ তালুকদার উত্তেজিত হয়ে সেই যুবকের কলার চেপে ধরলেন। চিৎকার করে বললেন,
‘বেরিয়ে আসার কথা ছিল তো বেরিয়ে এল না কেন? কীভাবে তুই ওকে আগুনের মধ্যে একা ফেলে এলি? কেন আমার ছেলেটাকে ভেতরে রেখে আসলি? আফতাব… ভাই, আমার ছেলেটা…!’
উন্মত্ত আগুনের শিখা তখন আকাশ স্পর্শ করার চেষ্টা করছে। বাইরে এক বাবা তার সন্তানের জন্য আর এক স্ত্রী তার স্বামীর জন্য ভাইয়েরা ভাইয়ের অপেক্ষায় অস্থির থেকে অস্থির হয়ে উঠলো। আফতাব তালুকদার নিজের শোক চেপে ভাইকে সান্ত্বনা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সময় যেন আজ থমকে গেছে; প্রতিটি সেকেন্ড কাটছে একেকটি যুগের মতো। প্রায় পনেরো মিনিটের পর আগুনের লেলিহান শিখা নিয়ন্ত্রণে এল। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা একে একে চারটি মৃ তদেহ বের করে আনলেন। দেহগুলো পু ড়ে এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে চেনার উপায় নেই। সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে নবনীর মনে হলো তার চারপাশের জগতটা দুলছে। বাতাসে পোড়া মাং সের সেই উৎকট গন্ধ তার সমস্ত ইন্দ্রিয়কে অবশ করে দিল। উপস্থিত সবার মনেই তখন এক ভ য়াবহ আশঙ্কা। এই চারজনের মধ্যে কেউ কি তবে দিব্য? চারদিকে কান্নার রোল উঠল। নবনী তখন পাথর। তার কানে কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছিল না। দৃষ্টি ঝাপসা। এমন সময় ভিড় ঠেলে ফায়ার সার্ভিসের দুজন কর্মী একজনকে ধরে বের করে আনলেন। লোকটির মুখে অক্সিজেনের মাস্ক লাগানো। নবনী তার ঝাপসা দৃষ্টির আড়ালেও চিনে ফেলল সেই চিরচেনা অবয়ব। চারপাশ থেকে তখন সমস্বরে শুকরিয়া ধ্বনি ভেসে আসছে। নবনী যেন অলৌকিক ভাবে শক্তি ফিরে পেল। সে টলমলে পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে বড় বড় পা ফেলে দিব্যর সামনে গিয়ে থামল। দিব্য তখনো ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। নবনীকে এই অবস্থায় সামনে দেখে সে চরম বিস্মিত হলো। সে ইশারায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সরে যেতে বলল। তাদের সরতে দেরি নবনীর সমস্ত শক্তি দিয়ে দিব্যর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরি হলোনা। দিব্য আগলে নিলো ওকে। ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা পাশ থেকে বললেন,
‘উনি একটুর জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। ভেতরে আর কেউ আছে কি না আমরা দেখছি।’
দিব্য মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে বাবা, চাচা, কায়েফ, কলরব সবাই দাঁড়িয়ে। দিব্যকে জীবিত দেখে তাদের চোখেমুখে স্বস্তির ছায়া নেমে এলো। কেউ কেউ বাকিদের খোঁজ নিতে দ্রুত অন্যদিকে ছুটে গেল। কিন্তু নবনী তখনো দিব্যকে জাপটে ধরে আছে; তার পাগলের মতো কান্নায় দিব্যর শার্ট ভিজে একাকার। দিব্য ভীষণ ঘাবড়ে গেল। নবনীকে একদমই আশা করেনি। পরিস্থিতি এখন অনুকূল হলেও বড়দের সামনে নবনীর এই বাঁধভাঙা আবেগ তাকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে দিল। দিব্য অত্যন্ত কোমল স্বরে ডাকল,
‘নবনী? নবনী শান্ত হও। আমি ঠিক আছি… আই অ্যাম ফাইন।’
আগুন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছিল। দিব্যর বের হওয়ার সব পথ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিরুপায় হয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার একেবারে শেষ প্রান্তে চলে যায়। ভাগ্যক্রমে ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় আগুন সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। নবনী এবার দিব্যর বুক থেকে মাথা তুলে তার মুখের দিকে তাকালো। কাঁপাকাঁপা দুহাতে দিব্যর মুখটা আগলে ধরে সে আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল। নবনীর এই রূপ দেখে দিব্য প্রচন্ড অবাক হলো। তার যেন আজ অবাক হওয়ার পালা। নবনী কম্পিত গলায় বলতে লাগল,
‘আপনি সত্যি ঠিক আছেন তো? আমি ভেবেছিলাম আপনি! আপনি কেন সবার আগে বের হননি হ্যাঁ? কেন অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে এভাবে বিপদে ফেললেন? সবসময় কেনো এত বেশি বোঝেন….!’
নবনীর আর্তনাদে শুধু ভয় ছিলোনা। একটা প্রবল অধিকারবোধ মিশে ছিলো। যা হয়তো এতদিন নবনী নিজেও ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনি। নবনীর কান্নার বেগ যেন থামতেই চাইছে না। দিব্য তার কম্পিত হাতের ওপর নিজের হাত রেখে শান্ত স্বরে বলল,
‘তুমি এখানে কী করছ নবনী? বললাম তো, আমি ঠিক আছি। এই তো দেখো। আমার কিচ্ছু হয়নি। জাস্ট লুক এট মি। তুমি তো আমার দিকে তাকাচ্ছই না!’
নবনী এক হাতে চোখের পানি মুছে ঝাপসা চোখে তাকালো। প্রথমবার কোনো সংকোচ ছাড়া দিব্য তালুকদারের চোখে চোখ রাখলো। দিব্যর সারা মুখে কালচে ছাইয়ের দাগ লেগে আছে। কপাল আর মুখ জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম। পরনের কোটটা কোথাও হারিয়ে গেছে। শার্টটা এখন ধুলো আর কালিতে বিবর্ণ। নবনী উন্মাদের মতো নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে তড়িঘড়ি করে দিব্যর মুখ মুছিয়ে দিতে লাগল। ওর প্রতিটি নড়াচড়ায় এক চরম দিশেহারা ভাব। আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। দিব্য অনুভব করল নবনী স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। সে আলতো করে নবনীর হাত দুটো নিজের মুঠোয় পুরে নিয়ে থামিয়ে দিল।
‘রিলাক্স নবনী, শান্ত হও। দেখো, সব ঠিক আছে।’
কিন্তু ‘সব ঠিক আছে’ শব্দদুটো নবনীর কানে যেন তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। সে চিৎকার করে উঠল,
‘কী ঠিক আছে? আপনি কি জানেন আমার কেমন লাগছিল? ওই পোড়া বীভৎস লাশগুলো যখন ওরা বের করে আনছিল। আমার মনে হচ্ছিল দম আটকে এখনই মা রা যাব। ওরা তো বলল আর একটু হলে আপনাকে পেতাম না। আপনি কি বুঝতে পারছেন না? আমার মনে হচ্ছে আমি… আমি আর বাঁচতে পারতাম না… আমি…!’
এই অবেলায় পর্ব ২১
কথাগুলো বলতে বলতেই নবনীর কণ্ঠস্বর বুজে এল। হুট করে তার চারপাশের পৃথিবীটা বনবন করে ঘুরতে শুরু করল। চোখের সামনে ঘনিয়ে এল নিকষ কালো অন্ধকার। দ আর কিছু উচ্চারণ করার আগেই সে এলিয়ে পড়ল। দিব্য চট করে তাকে নিজের বাহুডোরে জাপটে ধরল। কয়েকবার ব্যাকুল হয়ে নাম ধরে ডাকল সে কিন্তু নবনীর কোনো সাড়া নেই। ভয়াবহ মানসিক আঘাত আর আতঙ্কে তার জ্ঞান হারিয়েছে। দিব্য আর এক মুহূর্ত দেরি না করে অবশ নবনীকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। দিব্যর মনেহলো তপ্ত রোদে ছাইমাখা ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বিধ্বস্ত তার কোলে তখন তার আরও একটা সংজ্ঞাহীন পৃথিবী।
