Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ২০

নিবৃতা পর্ব ২০

নিবৃতা পর্ব ২০
নেহার ছায়ালিপি

তানহা বিহীন সারোয়ার ফ্ল্যাট খুব একটা সরব থাকে না। তবুও আজ, এখানকার আবহাওয়া যেন তুলনামূলক একটু বেশিই গুমোট, ভারি। দরজা, জানালার ফাঁক থেকে, অন্দরে প্রবেশ করা বাহিরি হীম শীতল বাতাসের স্পর্শ অনুভূত হয় ত্বক জুড়ে, তবে মানুষের অস্তিত্ব থাকলেও দেয়ালে কোন শব্দ প্রতিধ্বনিত হয় না। যে লোকটা, প্রতিদিন সকালে, মসজিদ থেকে ফিরেই সবার আগে কাছে এসে আহ্লাদ করবে, আগ বাড়িয়ে কথা বলবে, গল্পের আসর জমাতে চাইবে, হাতে হাত মিলিয়ে কাজে সহোযোগিতা করবে, সেই আজ সম্পূর্ণ নীরব, নির্বিকার। মুখাবয়ব শ্রান্ত, অনুভুতিহীন৷ নিবৃতা গরম গরম, ধোঁয়া ওঠা চা দিয়ে এলেও ওর উপর চোখ তুলে তাকায় নি৷ দেখেও না দেখতে পাওয়ার ভান, নাটক! একেই বোধহয় উপেক্ষা বলে। তবে এই শব্দটা যেমন একবারে উচ্চারণ করা যায়, এর বাস্তব প্রতিক্রিয়া, ততটা সহজে, একবারে গ্রহন করা যায় না৷

নিবৃতা জানে, রাতে ওকে ওভাবে উদ্বাস্তুদের ন্যায় বসে থেকে, অশ্রু ঝরানো দেখেই, লোকটা রেগে আছে। পছন্দ হয় নি কাজটা। সাথে আরও কতকিছু হয়তো ভেবে বসে আছে, যা নিবৃতা জানে না, বুঝেও না। এখন ও কি বলবে, কি করবে, সেই দিশাও খুঁজে পাচ্ছে না। সত্য বললে, সবকিছু আরও ঘোলাটে হবে৷ মানুষটা দুঃখ পাবে। অথচ ভুল তার নয়। দোষ সম্পূর্ণ, নিবৃতার একার। সমস্যা ওর, সহ্য হয় না ওর। এতে লোকটার তো ভাগ নেই। কিন্তু এ কথা বোঝাতে গেলে, ও যে আরও ঘেঁটে দিবে পুরো বিষয়টাকে, সেটা ওর নির্বোধ মস্তিষ্ক বুঝে নিয়েছে। তাই তো প্রতিযোগিতা করে তাবিবের ন্যায় নিবৃতাও মৌনতা অবলম্বন করছে৷ পার্থক্য এতটুকুই নিবৃতার মাঝে থাকা তফাতখানি স্পষ্ট নয়।

নাশতার টেবিলেও আজ অদ্ভুত শীতলতা বিরাজমান। কারও সাথে কারও চোখাচোখি নেই, মনে জমা বুলির আদান প্রদান নেই। নীরবতা ছেয়ে গিয়েছে। যন্ত্র মানবের ন্যায়, শুধুই নিজের প্রয়োজন পূরণ করা হলো। তাবিবের মুখ থমথমে, চোয়াল নিরেট। চোখের সফেদ অংশের মাঝে আজ লালিমার অস্তিত্ব। সারারাত নিদ্রাহীন কাটার ফল। রিমলেস চশমার আড়ালে থাকা নয়নযুগল বড্ড তীক্ষ্ণ। সরু নাকের অগ্রভাগে থাকা মসৃণ কপালে গুটিকয়েক ভাজ। যে কেউ দেখলে বলবে, আজ জনাবের মন মেজাজের হাল বড্ড শোচনীয়। নিবৃতার মনে জমা ভয় গাঢ় হয়। মানুষটাকে কখনও এরূপ নিস্পৃহ থাকতে দেখেনি ও। নাশতা শেষ করে, ঘরে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে তাবিব পুনরায় বেরিয়ে এলো। চলন্ত পায়ে, হাত হাত, বাঁ হাতে ঘড়ি পরাতে ব্যস্ত। তবে আজ তার মনোযোগ ও ধৈর্যের বেশ অভাব। বারংবার হাত থেকে পিছলে পড়তে থাকে মেটালের ঘড়িটি। অথচ প্রতিদিন, অভ্যাস অনুযায়ী কোন প্রকার কসরত ছাড়াই কিন্তু কাজটা হয়ে যায়। সহসা নাকমুখ কুঁচকে এলো। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকলো বিরক্তি। আজ সবকিছু এতো অসহনীয় কেন ঠেকছে?

আরেকটু হলে হয়তো, আজ শান্ত, ধৈর্যশীল তাবিব, অশান্ত, বেপরোয়া হয়ে উঠতো। ঘড়িটা হয়তো ছুঁড়ে ফেলেই দিতে, কিন্তু এর আগেই চিকন, দুটো মেয়েলি হাত ধীর ভঙ্গিতে ওর হাতটা আঁকড়ে ধরে৷ খুবই কৌশলে ঘড়িটা ছিনিয়ে নেয় ওর মুঠো থেকে। তাবিব বেখেয়ালি দৃষ্টিতে তাকাতেই, নজর নিবদ্ধ হয় সেই অবুঝ, কোমল মুখ পানে। অবয়বে শঙ্কা স্পষ্ট, হাতও হয়তো কাঁপছে মৃদুমন্দ। কিন্তু ইদানীং সে তাবিবকে সামলাতেও শিখছে। এই যে, কয়েক পলের মধ্যে ঘড়িটা পরিয়ে দিলো। কাজ শেষ হতেই নিবৃতা একটু দুরে সরে আসলো। আইঢাই করে উঠা অস্থির চিত্ত নিয়ে ঠাই দাঁড়িয়ে থাকলো। এই যে, এই সরল মুখশ্রীটা। এই অবুঝ দৃষ্টি! সংশয় পূর্ণ অবয়ব! এগুলো এই মেয়েটাকে বড্ড নিষ্পাপ করে তুলে তাবিবের সম্মুখে। ওর মনটাকে এক মুহুর্তে প্রভাবিত করে ফেলে। বুঝিয়ে দেয়, ওর সাথে রাগ করা, অভিমানে ডুবা তাবিবকে সাজে না। ওর দায়িত্ব হলো, সর্বাবস্থায় মেয়েটাকে আগলে রাখা। ওর যত্ন নেওয়া। ওর জন্যই নিয়োজিত থাকা। কে তাবিব? কি-ই বা মূল্য ওর অনুভূতির? সব এই নিবেদিতা ফারুকি নিবৃতা নামক মেয়েটার সম্মুখে অদৃশ্য! মূল্যহীন। ও ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে। কিঞ্চিৎ সকল তিক্ত অনুভূতিগুলো ঝেরে ফেলার ন্যায় মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে। কথা বলার জন্য উচিত কোন শব্দ খুঁজে পায় না৷ তাই কোনমতে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,

– দেড় মাসের মতো হয়ে গেলো, বাজার করে এনেছিলাম। শেষ তো বোধহয় হয়ে এলো। কি কি লাগবে, সেটার একটা লিস্ট করে আমাকে ম্যাসেজ দিয়ে রেখো।
নিবৃতা মিনমিনে স্বরে বলে,
– আপাতত কিছুই লাগবে না।
– লাগবে না মানে? আমি তো সেদিন, তাড়াহুড়োয় সব কম কমই কিনেছিলাম। আবার বলছো লাগবে না?
তাবিব অবাক হলো। এদিকে নিবৃতা কি বলবে, সেটা ভেবে পেলো না। মাথা আরও খানিকটা নত হলো। তাবিবের বিস্ময় বাড়লো। মাথায় আসলো, কেন মেয়েটা বয়সের তুলনায় এতোটা রোগাটে গড়নের! গত কয়েকদিনে, ওর ওজন আরও পরে যাওয়া লক্ষ্য করেছে তাবিব। খাওয়া নিয়ে তো ও সবসময়ই জোর দেয়। তবে মনে হলো, সমস্যা ঠিক অন্য জায়গায়। মস্তিষ্ক দপদপ করে উঠলো! ওকে কেন জানানো হয় নি? নিশ্চয়ই নিবৃতার ‘ইটিং ডিসঅর্ডার’ রয়েছে! আর কি কি লুকানো হয়েছে ওর কাছ থেকে? বুঝতে পারছে না ও। অস্থির হয়ে কোমরে হাত ঠেকিয়ে ও লম্বা করে শ্বাস নেয়। মাথা নামিয়ে, অক্লিষ্ট এক ঢোক গলাধঃকরণ করে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য লহু গলায় বলে,
– ইটিং ডিসঅর্ডার আছে তোমার?
আছে হয়তো। নিবৃতাকে তো ওতো কিছু বলা হতো না। তবে মনে আছে, ওর বাবা মাকে এ বিষয়ে কথা বলতে। তাইতো সরল মনে ও মাথা নাড়িয়ে বলে,

– জ্বি।
– আমাকে কেন বলো নি?
– ভাবি কিংবা মা বলে নি? আমি তো এতোকিছু বুঝি না।
– বুঝো না, জানো না। তাহলে পারোটা কি তুমি?
তাবিব এক প্রকার ধমকেই উঠলো। ওর নিজেকে দিশেহারা লাগছে। স্বীয় সঙ্গিনীর মাঝে যদি এসব ঘাতক সমস্যা লুকায়িত থাকে, তাহলে কি ওর জানার অধিকার ছিল না? ও অন্তত এ বিষয়ে খেয়াল রাখার চেষ্টা করতো। মেয়েটার অবস্থার উন্নতির প্রয়াস করতো। গোটা এক পরিবার থাকতেও কেন ওকে কিছু বলা হয় নি। সবকিছু তাবিবকে এভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে বের কেন করতে হবে? তাদের মেয়ের প্রতি এই দায়িত্ব? ওর মাথা ধরে এলো। আপাতত খেয়ালেও রইলো না যে নিবৃতার সাথে উঁচু গলায় কথা বলেছে। ও আর না পারতে বেরিয়ে গেলো বাসা থেকে। এদিকে কোমল, নম্র মনের নিবৃতার চেহারা একটুখানি হয়ে গেলো। ওষ্ঠ যুগল তির তির করে কেঁপে উঠে, একসময় গাল ভেসে যেতে লাগলো, বাধ ভাঙা অশ্রুর দাপটে!

তাবিব ফেলোশিপ থেকে ফিরে আসার পর, তেমন একটা সময় হয় নি ওর সাথে বিস্তারিত আলাপ জমানোর। ওর প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা ও শিখন সম্পর্কে জানার কৌতুহল জমেছে মনে। তাই তো আজ হাসপাতালে চলে আসতেই, এনাম মাহমুদ, সোজা তাবিবের কেবিন বরাবর চললেন। ভীষন খোশমেজাজে আছেন। তার অন্যতম স্নেহভাজন জুনিয়রদের মধ্যে তাবিবও একজন। ছেলেটা বেশ ভালো। ওর ব্যক্তিত্ব অসাধারণ। একদম চোখে লাগার মতো। তাবিব যদি সন্তানসহ তালাকপ্রাপ্ত না হতো, তাহলে স্বীয় কন্যা ওকে হস্তান্তরের ভীষন ইচ্ছে ছিল উনার। কিন্তু এই সংগত কারণেই আর হয়ে উঠে নি। তবে যাই হোক, আপন ছেলের মতোই ওর পরোয়া করেন উনি। কেবিন অভিমুখে চলে আসতেই কানে বাজে ভারিক্কি পুরুষ কন্ঠস্বর। রীতিমতো চেঁচাচ্ছে যেন। এনাম মাহমুদ পায়ের গতি বৃদ্ধি করেন। এগিয়ে যেতেই নজরে আসে দরজা খোলা কেবিনে ঘটা দৃশ্যখানি।

– এতোটা কেয়ারলেস কেউ কিভাবে হয়? সামান্যতম কমনসেন্স নেই আজকালকার লোকজনের মাঝে৷ কর্ম নিষ্ঠা এক প্রকার হারিয়ে যাচ্ছে।
ক্রোধান্বিত মুখে তাকিয়ে আছে তাবিব। সম্মুখেই নত মুখে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরুষ নার্স। অপরাধবোধ তার মুখাবয়বে স্পষ্ট। তাবিব আবারও উচ্চ কন্ঠে বলে উঠে,
– সামান্য ভুল একজনের জীবনে কেড়ে নিতে সক্ষম। সেই খেয়াল কি মাথায় থাকে না? আমি কতবার বুঝিয়ে দিয়েছিলাম ডোজ সম্পর্কে। তারপরও ভুল। মনোযোগ নেই তো এই পেশায় এসেছ কেন?
সিনিয়র ডাক্তারের কর্কশ বাক্য নিশ্চুপে হজম করা ছাড়া উপায় নেই। তাইতো, এই মুহুর্তে আসামীর কাঠগড়ায় দাড়িয়ে থাকা ব্যক্তি নিরুত্তর। হঠাৎই তাবিবের চোখ যায় দরজার সম্মুখে। সিনিয়র দেখে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নেয় ও। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টায় এগিয়ে এসে বিনয়ী স্বরে সালাম জানায়। এনাম মাহমুদ গম্ভীর গলায় প্রত্যুত্তর করে বলেন,

– কি হয়েছে তাবিব?
– কিছু না স্যার। নার্সের দ্বারা মেডিসিন ডোজের পরিমাণে সামান্য মিস্টেক হয়েছে।
এনামকে জবাব দিয়ে ও নার্সের উদ্দেশ্যে বলে,
– আমি অন্য কাওকে দায়িত্ব দিবো। তুমি যাও।
বেচারা অসহায় মুখ করে চলে যেতেই তাবিব গোপনে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নিজেকে শান্ত করে স্মিত হাসার চেষ্টা করে বলে,
– হ্যাভ আ সিট স্যার।
এনাম বসতে বসতে বললেন,
– যদি মিস্টেকটা সামান্যই হয়ে থাকে তাহলে এতো হট টেম্পার্ড হয়ে আছো কেন?
তাবিব বিব্রত হয়ে বলে,
– স্যার আপনি তো জানেন, সবার বডি একইভাবে টলারেট করতে পারে না। রিস্ক হয়ে যায়।
– কিন্তু তাবিব তো কঠিনতম সিচুয়েশনেও কখনও তার টেম্পার হারায় না। তাহলে আজ কি হলো? মেন্টালি ডিস্টার্বড্?
তাবিবের সামনে বসা মানুষটা, অমায়িক ব্যক্তিত্বরে অধিকারী। গোটা হাসপাতালের সবার আস্থাভাজন এক গুরুজন। জানে প্রয়োজনে সাহায্য চাইলে কখনও খালি হাতে ফিরতে হবে না। মুখে সর্বদা আন্তরিকতার মুচকি হাসি বিদ্যমান। এমনই অসাধারণ এই মানুষটা। তাবিব ক্ষীণ গলায় বললো,

– ফেমিলি ইস্যু স্যার।
– ক্যান আই হেল্প ইউ?
স্যার অবশ্য সাহায্য করতেই পারেন। আলোচনা করাই যায়। তাবিব সুক্ষ্ম শ্বাস ফেলে বললো,
– আমি আজই ডিস্কভার করলাম স্যার যে, আমার ওয়াইফের ইটিং ডিসঅর্ডার রয়েছে। ওর ফেমিলি জানা সত্বেও আমাকে কিছুই বলে নি এ বিষয়ে। হোয়েন ইটস্ এ কম্পলিকেটেড ম্যাটার!
এনামকে চিন্তিত দেখালো। গম্ভীর স্বরে বললেন,
– অবশ্যই সামান্য কোন কারণে এই অবস্থা তার হয় নি।
– জ্বি স্যার। ওর জন্য আমার চিন্তা যাচ্ছেই না। কতোটা কষ্টে আছে সেটা আমি ভাবতেও পারছি না। তাই ঠিক করেছি, রিনোওনড্ কোন কনসাল্টেন্ট এর সাথে এ বিষয়ে আলোচনায় বসবো।
– সেক্ষেত্রে আমি তোমায় রিকমেন্ড করতে পারি।
– থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।

আড়াই বছর আগে, তাবিবের বিয়ের দিনও ঠিক একইভাবে খটকা লেগেছিল এনামের। মনে হচ্ছিল, ওর স্ত্রীর পরিবারে নিশ্চয়ই কোন গভীর সমস্যা লুকিয়ে। এখন সেটা প্রমানিত হলো, তাবিবের স্ত্রীর এই জটিলতা সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকায়। এনামের শুধু মনে হলো, তাবিবের সাথে একটু কথা বলতে হবে। সেটা আজ নাহোক, কাল। তাকে বলতেই হবে। এখন এর পেছনে ভালো, মন্দ যাই নিহিত থাকুক। তার বিশ্বাস এতে একটু হলেও তাবিবের সাহায্য হবে। উপরন্তু ওর অধিকারও বটে। তিনি চান না, তাবিবের মতো ব্রাইট ফিউচারের অধিকারী ছেলেটার জীবনে অন্যের কারণে কোন দাগ লাগুক। জীবন বড্ড বৈচিত্র্যময়। কখন কোথা থেকে অজানা আশঙ্কা এসে ভীড় জমায়, সেটা আন্দাজ করা কঠিন। এর চেয়ে প্রতিরোধ তৈরি রাখাই শ্রেয়!

হাসপাতাল থেকে আজ ফিরতে দেরি হয়েছে বেশ। কাজের চাপ ছিল ভয়াবহ। ক্লান্ত দেহে তাবিব ফিরতেই, নিশ্চুপে, ছায়ার ন্যায়ই ওর সেবায় লেগে গিয়েছে নিবৃতা। যা যা লাগে, তা তা একদম চোখের সম্মুখে তৈরি মিলেছে। সবসময়ই মিলে, তবে আজ সেবকের মাঝে তটস্থতা বেশি। হয়তো তাবিবের ক্রোধকে পানি করার চেষ্টা। অথচ তাবিব আছে নিজ অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে। মাথা একটু ঠান্ডা হতেই মনে পরেছে, সকালে নিবৃতার সাথে কি বাজে ব্যবহারটা করে এসেছে! সে হিসেবে, এখানের দৃশ্যপট হওয়া উচিত ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বামীর থেকে প্রথমবারের মতো ধমক খেয়ে, নিবৃতার মুখ ফুলিয়ে অভিমান করা উচিত ছিল। অবশ্য সে যে মোটেও রাগ করে নি, সেটা অনুমান করা একটু কষ্টসাধ্যই বটে! অনুভূতিদের লাগাম টানায় সে বেশ অভিজ্ঞ। নিগূঢ় পর্যবেক্ষণ ছাড়া বোঝার উপায় নেই। বরাবরের মতোই নীরবতা টেনে মুখে বন্ধ করে রেখেছে। তাবিবও লজ্জায় আগ বাড়িয়ে বলতে পারছেই না কিছু। খাবার পর্ব শেষে, নিবৃতা যখন ঘরে এলো তখন রাত এগারোটা পেরিয়েছে। তাবিব তখন বিছানায় কিছু বইপত্র ঘাঁটছিল। সেগুলো মূলত নিবৃতার জন্যই৷ ইটিং ডিসঅর্ডার সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান লাভের চেষ্টা করছিল। সে কাজে মগ্ন ভেবে নিবৃতা গিয়ে দাঁড়ালো জানালার সম্মুখে। কিঞ্চিৎ ফাঁকা করে খুলে রাখা সেটা। হিমবাহ বইছে। নিবৃতা গায়ে থাকা শালটা আরেটু টেনে নিয়ে নিজেকে আবৃত করে। উদাস চোখ জোড়া আধারিয়া অন্তরিখে কিছু খোঁজার চেষ্টায় মত্ত। তবে ধ্যান ছুটলো সন্নিকটে কারও অবস্থানে। মানুষটা পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। একদম গা ঘেঁষে। নিবৃতা আজ সত্যিই কষ্ট পেয়েছিল তাবিবের ব্যবহার। তবে ও মুখ বুজে মেনে নিয়েছে। ভুল তো ওরই৷ তাহলে কেনো পাল্টা রাগ করবে ও? এতো জটিলতা এই নির্বোধ, সরল মস্তিষ্কে নেই। তখনই ও অনুভব করে মাথার ঘোমটা টেনে নামিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্যাচ বাধা খোঁপায় কিছু একটা গেঁথে দিচ্ছে তাবিব।

– আমার মানুষটা অভিমান করতে পারলেও সেটা প্রকাশ করতে জানে না। তাই আমি এর দ্বায় ভার নিজ কাঁধেই তুলে নিলাম।
নিবৃতা বোধহয় এই প্রথম মন থেকে, তাবিবের বিষয়ের পুলকিত অনুভব করলো। এই যে, ওর কষ্টকে গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি ওর মৌনতার মাঝে লুকোনো সুপ্ত অনুরাগও খুঁজে নিয়েছে। লোকটা এতো ভালো কেন? ও ঘাড় বাঁকিয়ে চাইতেই তাবিব হেসে উঠলো। হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিলো আরও একটা লাল টকটকে গোলাপ। নিবৃতা ডাগর ডাগর চোখে মেলে তাকালো। মাথার পেছনে হাত দিয়ে বুঝলো সেখানে কয়েকটা গোলাপ আরও রয়েছে।
– এই অধমকে আপনি ক্ষমা করবেন না?
ফুলটা হাতে নিতেই, পেলব ওষ্ট ছাপিয়ে মুক্ত ঝরা হাসির স্ফুরণ জাগলো। চোখদুটোও জ্বলজ্বল করে উঠলো। সামান্য এক নিবেদন, তবুও কতটা খুশি হয়েছে এই মেয়েটা! তাবিবের বুকে ব্যথা হয়। নিজেকে দোষী লাগে। আবেগপ্রবণ হয়ে তৎক্ষনাৎ স্বীয় স্ত্রীকে জড়িয়ে নেয় বক্ষ মাঝে। চোখের পাতা বুজে আসে প্রশান্তিতে। নিবৃতাও চুপটি করে সেটে রয় ওর সাথে। লোকটার এই ছোট ছোট আহ্লাদ ওর দিনকে দিন ভীষন প্রিয় হয়ে উঠছে।

– তোমার কষ্ট আমার সহ্য হয় না। একটুও না। সকালে যখন এতো বড় বিষয় সম্পর্কে জানতে পারলাম, তখন আমার মস্তিষ্ক এমনিতেই কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপর যখন বললে যে, তুমি এ সম্পর্কে অবগত, অথচ আমাকে একবারও বলা হয় নি, তখন মেজাজ চটে গিয়েছিল। আমার স্ত্রী, যাকে আমি এই মনে, এতোটা আদরে লালন করি, সে চোখের সম্মুখে থেকেও আড়ালে ভালো নেই। সেটা আমি মানতে পারছিলাম না।
তাবিবের কথাগুলো ভীষন বেদনাদায়ক শোনায়। নিবৃতার অপরাধ বোধ বাড়ে৷ মিইয়ে যাওয়া গলায় বলে,
– আমি অনেক ভালো আছি। শুধু শুধু এতো চিন্তা করতে নেই।
ভ্রু তুলে নিচের দিকে তাকায় তাবিব। রসিক স্বরে বলে,
– আসলেই কি এই তানজীব সারোয়ার তার মিসেসকে ভালো রাখতে পারছে?
প্রশস্ত বক্ষে মুখ দাবিয়ে হাসে নিবৃতা। একসময় বলে উঠে,
– মিসেস তানজীব অনেক সুখে আছে।
নিবৃতা বললেও, সে যে ভালো নেই, এটা তাবিবের জানা আছে। তবে ও সেই দিনটার অপেক্ষায় লড়ে যাবে যেদিন নিবৃতা সত্যিই ভালো থাকবে, সুখে থাকবে।

নিবৃতা আজ আমোদেই তাবিবের সংস্পর্শে আছে। হয়তো এই পছন্দের মানুষের করা আজকের এই কাজটায় সে ভীষন প্রসন্ন হয়েছে। সেই লাজুক মুখের নরম হাসি, খুশির ঝিলিক দিয়ে উঠা চোখের উষ্ণ দৃষ্টি! তাবিবকে ব্যকুল করে তোলে। ইচ্ছে জাগে এই মেয়ের জন্য পৃথিবীর সমস্ত সুখ কুড়িয়ে আনতে। ওর হৃদয় কেঁপে উঠে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসে একটু একটু করে। গভীর সান্নিধ্য লাভের তাড়নায় হয়ে উঠতে থাকে নিয়ন্ত্রণহীন। এই পরিবর্তনে নিজেকে সামলায় নিবৃতা। হাতের মুঠোয় পিষ্ট হয় গোলাপের নাজুক পাপড়িগুলো। শক্ত করে বুজে রাখে অক্ষি পল্লব। অনুভুতির স্রোতে ভেসে যাওয়া তাবিব যখন চোখ তুলে তাকায় তখন নজরে পরে, শক্ত হয়ে থাকা, ফ্যাকাসে মুখখানির দিকে। উজ্জ্বল আলোয় সেটা স্পষ্ট! কয়েক পল সেদিকে তাকিয়ে থেকে, তৎক্ষনাৎ সরে আসে তাবিব। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস টেনে, শান্ত হয়ে বলে,

– ঘুমিয়ে যাও।
চট করে চোখ মেলে তাকায় নিবৃতা। কি হলো বুঝতে পারছে না। আতংকিত দৃষ্টিতে পাশে তাকাতেই দেখে তাবিব ওর দিকে নিস্প্রভ চাহনি নিবদ্ধ করে রেখেছে। ও অস্বস্তিতে গাঁট হলো। অস্থির ভঙ্গিতে বারংবার পলক ফেলে বললো,
– কি হয়েছে?
– কাল মাঝ রাতে যখন আমার হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে গেলো, তখন আমি, লজ্জা, সংকোচ, সংশয় এর সাথে অনুভূতিহীনতা, অনীহা ও অপছন্দের পার্থক্য খুঁজে পেয়েছি।
নিবৃতা বুঝে নি তাবিবের কথা। ও বিভ্রান্ত হলো। তাবিব দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
– আমায় পছন্দ করো, সেটা আমি মানি৷ কিন্তু যেদিন ভালেবাসবে, সেদিন তোমার নিজ থেকেই আমাকে অনুভব করিয়ে দিতে হবে। আর আমি সেদিনের অপেক্ষায় থাকবো। তবে এই ভুল তার আগে আর কখনই করবো না।

নিবৃতা পর্ব ১৯

– কোন ভুল?
– তুমি যে আমায় চাও না, সেটা আমি ঠিক বুঝতে পারি নি। সরি।
নিবৃতা মাথা নিচু করে থাকে। মানুষটা বুঝে গেলো? নিজের প্রতি ঘৃনায় ওর মনটা সংকুচিত হয়ে গেলো। অন্তঃস্থল কেঁপে উঠলো দুঃখের তাড়নায়। পারলো না সামলাতে। নোনাজলে ভাসিয়ে দিলো নিজের প্রতি থাকা অভিযোগগুলো। তাবিব কিছুই বললো না। আলোটা নিভিয়ে দিয়ে, নিবৃতাকে আশ্রয় দিলো আপন বাহুডোরে। মাঝে মাঝে স্বান্তনার কোন শব্দ থাকে না। শুধু স্বীয় উপস্থিতি বুঝিয়ে দিয়ে অনুভব করাতে হয় যে, আমি আছি তোমার পাশে। তুমি নিজেকে প্রশ্রয় দাও। আমি নাহয় সামলে নিবো তোমার এই অগোছালো সত্তাকে।

নিবৃতা পর্ব ২১