Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ৩৭

নিবৃতা পর্ব ৩৭

নিবৃতা পর্ব ৩৭
নেহার ছায়ালিপি

দেড় দশকেরও বেশি সময় পর, এই ঘরের দুয়ারে কদম রেখেছে তাবিব। হৃদয়ে গাঁথা চিরচেনা নীড়, এখন কাল বিবর্ধনে শুধুমাত্র ইট পাথরের তৈরী সাধারণ এক দালানে পরিনত হয়েছে। হারিয়ে গিয়েছে সেই রঙিন অনুভূতি। মেঝেতে ছাপ ফেলা দুরন্ত শৈশবের চিহ্ন আজ মুছে গিয়েছে। সোনালী অতীত আজ স্মৃতির পাতায় মৃত! যে রমনীর মায়াময় পরশে এই বাড়ির প্রতিটি কোনের প্রতি ছিল এক দূর্বোধ্য টান, ক্ষণকাল পরে তারই অনুপস্থিতি সেই টানই গলায় ফাঁস হয়ে শ্বাস রোধ করার চেষ্টা করেছিল তাবিবকে! কি আশ্চর্য! এক নারীর ছোঁয়ায় যেমন তুচ্ছ এক দালানকোঠা আপন আলয়তে পরিনত হয়, প্রাণের সঞ্চার হয়ে উঠে। আবার আরেক নারীর সহযোগে সেটি নরকতুল্য, জেলখানায় রূপান্তর হতেও সময় নেয় না। ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে অবহেলা, অবজ্ঞা, সম্পর্কের টানাপোড়েনে পাওয়া ভয়াল আঘাত পেয়ে এবং নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তাবিব বাধ্য হয়েছিল পিতৃ ছায়া ত্যাগ করতে। সেই তরুণ বয়সে, অপরিপক্ক হাতে কিভাবে সবটা সামলে উঠেছিল সে, নাকি অপ্রতিরোধ্য এক প্রতিযোগিতায় মত্ত এই সমাজের নিষ্ঠুর নিয়মের বেড়াজালে হারিয়ে গিয়েছিল তাবিব, সেই সামান্য খবরাখবর পর্যন্ত নেওয়ার চেষ্টা করেনি তার জন্মদাতা। বিন্দুমাত্র আলোকপাত করেন নি ওর উপর। একই ছাদের নিচে অবস্থান করা সত্বেও আপন পিতৃ দায়িত্ব থেকে তো উনি কবেই দু হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু যখন অবশেষে, দিনের অন্তিম প্রহর কাটিয়ে আপন নিলয়ে ফিরে আসার গন্তব্য ভিন্ন হলো, তখন নিজ পরিচয়ও ছিনিয়ে নিলেন ওর থেকে। যোগাযোগ হলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন! মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন ছেলের থেকে। কঠোর সংগ্রামে তাবিব যখন ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পরাজয় স্বীকারের দ্বারপ্রান্তে চলে যেতো, তখন কখনও একবার মনোবল যোগাতে তিনি জানতে চাননি,

– বাবা আমার! কেমন আছো তুমি?
সন্তানের সাথে কিসের এতো অহং! কেন অমানবিক কঠোরতা? তাবিব তো কখনও সজ্ঞানে তাকে অসম্মান করে নি, উচু গলায় কথা পর্যন্ত বলে নি। সর্বদা নত স্বীকার করেছে। তাহলে কেন এতো অপছন্দ ওকে? তবুও তাবিব অপেক্ষা করেছিল তার জন্য। বেহায়া মনের এক কোন তখনও বাবার পথ চেয়ে। কিন্তু ওকে হতাশ হতে হয়৷ তবে নিলর্জ্জের মতো সেই দুয়ারে গিয়ে উপস্থিত হয় নি ও আর। যতবার মুখ থুবড়ে পরতে চেয়েছে, ততবারই মেয়ের নিষ্পাপ, আদুরে মুখ খানি ওকে শক্তি জুগিয়েছে। তারা বাবা মেয়ে একে অপরের হাত ধরে আজ এতো দূর এসেছে!
তাই তো সেদিন রাতে যখন, তাবিবের সৎ মা নামক নারীটির ওর সাথে যোগাযোগ করলেন, জানালেন যে তার বাবা প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পরেছেন. যদি শেষ সময় নিকটবর্তী হয়ে থাকে তাহলে বড় ছেলের মুখটা একটি বারের জন্য হলেও তিনি দেখে যেতে চান, তখন স্বভাবতই মস্তিষ্কে সকল তিক্ত অভিজ্ঞতারা হুড়মুড়িয়ে ফেরত চলে আসে৷ মনে জমা ক্ষোভ, আক্রোশ ও গহন ক্লেশে জর্জরিত হয়ে তৎক্ষনাৎ সেই প্রস্তাব নাকোচ করে বসে তাবিব। অস্বীকার করে যাওয়ার কথা। মুখের উপর মানা করে নিয়ে কল কেটে দেয় ও৷ স্বীয় জীবনের প্রথম কালো অধ্যায় হলো তার পারিবারিক অবস্থান৷ অস্থির হয়ে ওঠা মন নিয়ে সারারাত তাবিব ছটফট করেছে।

উপায়ন্তর না পেয়ে বেদনাবিধুর হৃদয়ে হাহাকার করে উঠেছে। স্নেহময় স্ত্রীর বাহুডোরে নিজেকে ভাঙতে দিয়েছে, গড়িয়েছে দুর্লভ কিছু অশ্রুকণা। বাবা নামক মানুষটার প্রতি অজস্র অভিযোগ থাকলেও দিনশেষে নিজের বিবেকের কাছে হেরে গিয়েছে ও। এভাবেই নীতিবান ব্যক্তিরা চাইলেও কখনো এড়িয়ে যেতে পারে না৷ তাদের নরম মনটায় সেই ভয়াল কাঠিন্যতা নেই। স্ত্রী এবং বড় বোনের ক্রমাগত করে যাওয়া অনুরোধ ও ঠেকাতে পারে নি ও শেষ পর্যন্ত। চলে এসেছে সেই ফটকের সম্মুখে, যেখান হতে কণ্টকাকীর্ণ অপমানে জব্দ হয়ে বেরিয়ে এসেছিল ও। তবে সেদিন তাবিব কেবলই ছিল এক অসহায়, স্বর্বহারা, নত মস্তকের রিক্ত তরুণ কিন্তু আজ? সে সফল এক পুরুষ। কর্ম কিংবা ব্যক্তি জীবন, দু’পক্ষেই সে আজ পরিপূর্ণ। এক হাতে স্ত্রী অন্যতে কন্যাকে আঁকড়ে ধরে শিরদাঁড়া উঁচু করে তাবিবের আগমন ঘটেছে। সেই অতীতের অতি সাধারণ, বিশেষত্বহীন এক নড়বড়ে অস্তিত্ব আজ এক অন্যতম ব্যক্তিত্ববান বিশেষে রূপ নিয়েছে, যার আত্মবিশ্বাসী অভিব্যক্তি প্রথমবারেই সকলের নজর কাড়তে যথেষ্ট। সুদীর্ঘ সুপুরুষ অবয়ব, সুদর্শন শ্যামল মুখশ্রী। গুরুগম্ভীর গোটানো ভ্রু জোড়া সমেত অদ্ভুত স্থিরতায় ছায়া মুখকান্তি, অভিজ্ঞতায় ঘেরা অটল তীব্র দৃষ্টি! তাকে অবজ্ঞা করার কোন উপায় নেই!

বসার ঘরে জড়ো হওয়া প্রত্যেকেই এক ঘোরে আচ্ছাদিত ছিল। বয়সে কনিষ্ঠ একজনের মুখে নির্মল হাসি ফুটলেও, সালমার মুখায়বে তখন ছিল অপার অবিশ্বাস! এতোদিন লোকমুখে তাবিবের কথা তিনি শুনে এসেছেন, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাবিবের বেশ নামডাক। তবুও প্রতিবারই হেয় দৃষ্টিতে এড়িয়ে গিয়েছেন তিনি। কিন্তু আজ যখন সামন-সামনি ওকে দেখলেন, তখন আর কিছু বলতে পারলেন না। সত্যিই তো কয়লা পুড়ে হিরক খন্ডের খোঁজ মেলে। সেরকমই অবহেলার পাত্র একদিন ঠিকই চমকের কারণ হয়। প্রতিহিংসায় তার মস্তিষ্ক জ্বলে উঠলো! সেদিন যখন তাবিব আসবে না বলেছিল তখন তিনি মনে মনে খুশিই হয়েছিলেন। কারন তার স্বামী, তাবিবকে কেন এতো করে বারংবার আসার জন্য অনুরোধ করতে বলছিলেন সেটা খুব ভালো করেই জানেন তিনি, এবং সেই উদ্দেশ্য সফল হোক সেটা কোনমতেই উনি চান না। এতো বছরের সমস্ত শ্রম বৃথা যাবে তাতে! কিন্তু এতো ভাব দেখিয়ে নাকোচ করে কি হয়েছে? সে তো তাবিব এসেই পরেছে শেষমেশ। তাইতো তেঁতো মনে ওকে লোভী’ খেতাব দিতে ভুললেন না সালমা!

– তাবিব ভাইয়া!
বয়স পঁচিশের এক যুবক, হাসোজ্জল মুখে এগিয়ে গিয়েছে তাবিবের পানে। বড্ড আপন শোনালো সেই কন্ঠস্বর। আচমকা এরূপ সম্বোধনে তাবিবকে কিছুটা হতবিহ্বলই দেখালো৷ তবে সহজ হতে সময়ও নিলো না। আস্তে করে স্ত্রী কন্যার হাত ছেড়ে দিয়ে, নিজেও কাছে গেলো। যতই হোক, রক্তের আত্মীয়তা অস্বীকার করা সম্ভব নয়, তাবিবের এখতিয়ারে নেই সেটা৷ বরঞ্চ আত্ম গৌরবে ডুবে গিয়ে, একজন বাদে অন্যান্য নিকট সম্পর্ক ত্যাগ করা উচিত হয় নি ওর, কারন ভাইদের মধ্যে সর্ব জৈষ্ঠ তো সে-ই!
– কেমন আছো সৈকত?
তাবিব হাসিমুখে জবাব দিতেই সৈকত বিস্ময় নিয়ে চাইলো। হতবিহ্বলতা প্রকাশ করে শব্দ করে হাসলো শেষে। সুউচ্চ সুরে বললো,
– ভালো আছি। কিন্ত! আমি ভাবি নি, এতো সময় বাদেও তুমি আমাকে আলাদা করে চিনতে পারবে! সাব্বিরও তো হতে পারতো আমার জায়গায়!

– তোমার দুষ্ট কন্ঠই যথেষ্ট ছিল।
হালকা করে সৈকতের বাহু চাপড়ে দেয় তাবিব। ভাই দুটোর সাথে খুব বেশি আত্মিক মিল কিংবা ভ্রাতৃত্বের গভীর বন্ধন না থাকলেও তাবিবকে কখনও খুব বেশি জ্বালাতন করে নি তারা। তবে সৈকত খুবই প্রাণোচ্ছ্বল বালক ছিল।
– কেমন আছো তুমি?
সৈকতের কন্ঠস্বর এ পর্যায়ে কিছুটা ম্লান হয়ে এলো। ভাইরা বড় হয়েছে। ভালোমন্দ নিশ্চয়ই বেশ বুঝতে পারে? তাবিব হাসলো প্রশস্ত।
– আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো।
পাশ থেকে তানহাকে কাছে নিয়ে আসে তাবিব। সৈকতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে,
– তানহা এ হলো তোমার মেজো চাচ্চু!
সৈকতের দিকে তাকিয়ে তানহা মুখ ছড়িয়ে হাসলো। দ্রুত সালাম দিয়ে দুরন্ত স্বরে বললো,
– কেমন আছো মেজো চাচ্চু?
সৈকতের মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো। তানহার চটপটে ও প্রানবন্ত ভাবভঙ্গি দেখে ওকে নিজেরই আরেক প্রতিফলিত রূপ মনে হলো। ও করমর্দনের জন্য হাত এগিয়ে দিয়ে রসিক স্বরে বললো,

– আফটার মিটিং ইউ, আ’ম ফিলিং এবসোল্যুটলি আমেজিং!
তানহাও এবার শব্দ করে হেসে ফেললো। হাত মিলিয়ে লম্বা সময় ধরে দুজনে কেবল হাসলোই! মেজো চাচ্চু নামক লোকটাকে প্রথম সাক্ষাৎেই দারুণ লাগলো তানহার কাছে।
– ভাবির সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে না?
নিবৃতার উন্মুক্ত চোখ জোড়া এতোক্ষণ চুপটি করে চারপাশ পরোখ করছিল। অচেনা গুটিকয়েক মুখশ্রী দেখে তাদের পরিচয় বোঝার চেষ্টা করছিলো। তাই আচমকা ‘ভাবি’ সম্বোধনে কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে চাইলো ওর স্বামীর পানে। তাবিব স্মিত হেসে ওকে পাশ থেকে আগলে নিলো। গর্বিত হেসে বললো,
– মিসেস তানজিব সারোয়ার।
সৈকত তীর্যক হেসে বললো,
– তাই বলে বৌয়ের নামটা পর্যন্ত লুকিয়ে রাখলে! এতো পজেসিভ!
আচমকা তাবিবের নিজেরই কিছুটা অবাক লাগলো। তাই তো! নামটা কেন প্রকাশ করলো না? অবশ্য কি করার! তাবিব পুরোপুরি নির্দোষ! নিবৃতার মতো ওর নামটাও যে অনিন্দ্য সুন্দর!
– এনিওয়েজ, ফিল এট হোম ভাবি৷ কিছু লাগলেই আমাকে বলবেন। আ’ল বি এট ইয়োর সার্ভিস৷
নিবৃতা হালকা করে মাথা নাড়ালো। ছোট করে বললো,
– ধন্যবাদ!

সৈকত মিষ্টি হাসি দিয়ে তানহাকে নিয়ে সরে গেলো। সৈকতের কৌতুহলী, অস্থির মনে অজস্র প্রশ্ন জমা হয়েছে। ইনিয়েবিনিয়ে তানহা থেকে সবটা জানতে হবে নাহলে শান্তি মিলছে না যে।
তাবিব তখনও নিবৃতাকে আগলে ধরে দাঁড়িয়ে। চাপা কন্ঠে কথাবার্তা চলছিল ওদের। নিবৃতার কোন সমস্যা হচ্ছিল কি-না জিজ্ঞাসা করছিলো।, তাছাড়া প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু সম্পর্কেও কিছুটা আলাপ জমে উঠেছিল। এই সাবলীল ঘনিষ্ঠতা দেখে, অনতি দূরেই সোফায় বসে থাকা এক রমনীর মুখে সুপ্ত আক্রোশের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। কঠিন দৃষ্টিতে পরোখ করতে করতেই হাত হয়ে এলো মুষ্টিবদ্ধ।
অকস্মাৎ পাশে খেয়াল পরতেই তাবিবের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় নিবৃতা। নীরব ইশারায় কিছু একটা বোঝাতেই তাবিব হতাশাময় ভঙ্গিতে তাকায়, কিন্তু স্ত্রীর চোখের সেই আকুতি দেখে প্রতিবাদ করে উঠতে পারে না। তাবিবের থেকে এই অদৃশ্য সায় পেয়ে সেথায় এগিয়ে যায় নিবৃতা। নিচু কন্ঠে সালাম দিয়ে বলে,

– ভালো আছেন আপনি?
ন্যুনতম ভদ্রতা টুকুন দেখানো নিবৃতার দায়িত্বে ছিল। ও জানতো, তাবিব কখনও তার মুখোমুখি হতে চাইবে না। তাই ওর ভাগের কর্তব্য খানিও নিবৃতার পালন করার ইচ্ছে হলো। গুরুজনকে অসম্মান করা সাজে না। তবে এতে সালমাকে খুব বেশি একটা প্রসন্ন দেখালো না। উল্টো মুখের ভঙ্গিমা বিকৃত করে বলেন,
– অভিনয় করার প্রয়োজন নেই। তোমার স্বামী যেখানে আমাকে গোনায় পর্যন্ত ধরে না সেখানে ওর হয়ে তোমাকে ভদ্রতা দেখাতে হবে না। নিজের মতো থাকো। আমার এসব আদিখ্যেতার কোন দরকার নেই।
কর্কশ ও বড্ড তিক্ত কথার ধরন। নিবৃতা মিইয়ে গেলো। এসবের অভ্যাস যে ওর নেই। মা তূল্য মানুষেরা কি এভাবে কথা বলে? সালমার ভুল ভাঙানোর জন্য ও বলে উঠলো,
– আপনি ভুল বুঝছেন, আমি তো…
নিবৃতার নম্রতায় কাঠিন্যতার থাবা বসালেন সালমা। রাগান্বিত গলায় বললেন,
– এতো বছর পর এসেছ স্বামীর পৈতৃক ভিটায়। ভালো! অধিকার তো আছেই। তাই বলছি, খাও দাও, আরাম করো এরপর অন্ধকার নামার আগেই চলে যাও। একদম, অংশীদারত্ব ফলাতে আসবে না।

তাবিবকে একলা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে পারে নি সে। আসন ছেড়ে উঠে এসেছে৷ অথচ তাবিবের নজর আসেপাশে কোথাও নয় বরঞ্চ জহুরি দৃষ্টি খানিকটা দূরে দাঁড়ানো দু’জন নারীর কথোপকথনের ধরন পরিবর্তনের পর্যবেক্ষনে ছিল।
– কি অবস্থা তাবিব?
ঈষৎ পরিচিত কন্ঠস্বর। ভ্রু কুঁচকে তাকায় তাবিব। পরপর বিস্ময় বাস্তবতায় রূপ নিতেই মসৃণ কপালে গুটিকতক ভাজ পরে যায়। অনমনীয় চোখে তাকিয়ে ধারালো গলায় বলে,
– তুমি এখানে?
এককালে নম্রতার প্রতিমা বহন করা তাবিব আজ কঠোর ব্যক্তিত্ববান সুপুরুষ৷ অবশ্য এই ব্যবহারের এক ঝলক ক’বছর পূর্বে অস্ট্রেলিয়ায় পেয়েছিল সে। তবুও আজ যেন সেই আচরণে আরও বেশি রুক্ষতা এসে যোগ দিয়েছে। আঁখি নিজেকে সহজ সাজিয়ে বললো,

– ডিসেম্বরে দেশে এসেছিলাম হাজবেন্ড আর বাচ্চাদের সাথে। এই তো ক’দিন পরেই ফ্লাইট আবার। এরই মাঝে মৃতপ্রায় একজন বাবা সমতূল্য মানুষ অনুরোধ করলেন তাই আর তাকে মানা করতে পারি নি।
জাকির সরোয়ারের মস্তিষ্কে কি চলছে সেটা বুঝতে পারছে না তাবিব। ওকে সপরিবারে ডেকে পাঠিয়ে এখন ওরই প্রাক্তনকে এখানে উপস্থিত করার কি এমন যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে? বিষয়টা ওর আত্ম সম্মানে ফের আঘাত করলো। পাল্টা কিছু বলবে তার আগেই নজর পরলো সালমার উপর। প্রচন্ড আক্রোশ নিয়ে নিবৃতার উপর চেচাচ্ছে সে। তাবিবের মুখাবয়ব মুহুর্তেই ক্রোধে রক্তিম বর্ণ ধারন করলো। মুষ্টিবদ্ধ হাতে, দ্রুতই স্থুল কদমে এগিয়ে গিয়ে নিজের সাথে শক্ত করে আগলে নিলো নিবৃতাকে।

– আগে ভাবতাম আমার মাঝে ধৈর্যের বড্ড কমতি ছিল বোধহয় সেজন্যই ওতো গুলো বছরেও আপনার সাথে মানিয়ে নিতে পারি নি। অথচ দেখুন! আজ আপনার সাথে আমার স্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎই ওকে বাজে অভিজ্ঞতা দিলো।
সেই মাথা হেট করে, দুর্বল কন্ঠে নিজের হয়ে বলার চেষ্টা করেও বাজেভাবে ব্যর্থ হওয়া ভঙ্গুর ছেলেটা আজ আর নেই। সালমার সম্মুখে উপস্থিত ভিন্ন এক কেউ, যে কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেকে আজ দুর্বোধ্য এক আঙিনায় পৌছিয়েছে, যেখানে তাকে স্পর্শ করাও কষ্টসাধ্য! তাইতো সালমার আর কোন রাখঢাক রাখলেন না। নিজের নিচু মানসিকতার পরিচয় দিয়ে বসলেন।
– অনেকগুলো বছর আগে, তোমাকে যেমন নিজের যোগ্য অবস্থানটা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম ঠিক সেভাবেই আজ তোমার স্ত্রীকেও তার সীমানা দেখিয়ে দিচ্ছিলাম।
তাবিব বিরোধ করে বললো,

– আপনি সীমানা নির্ধারন করার কে?
– সেটা তুমি খুব ভালোভাবেই জানো।
সালমার কন্ঠে দর্প! তাবিব শ্লেষাত্মক হেসে বললো,
– তা তো অবশ্যই। আপনাকে আমি না চিনলে কে চিনবে বলুন তো! সেজন্যই তো মা হারা দুটো বাচ্চাদের মুখে কখনও সেই অকৃত্রিম ডাকটা শোনার যোগ্য হয়ে উঠেন নি আপনি।
পরপর নিবৃতার দিকে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
– আমার নিবেদিতার মতো নির্ঝঞ্ঝাট, সরল মানুষটাকেও যার সহ্য হয় নি, তার সাথে কথা লম্বা করে, রুচির অবক্ষয় ঘটানোর প্রয়োজন আমি দেখছি না।
নিবৃতা বিস্ময় নিয়ে চায়। এ কোন তাবিবকে সে দেখছে! সদা নিজেকে গুটিয়ে চলা, ভদ্র সভ্য ও বিনয়ী লোকটা আজ এভাবে কথা বলছে? সৎ মা নামক মানুষটার থেকে পাওয়া কষ্টটা কি এতোই গভীর? ওর ভীষন মায়া হলো। তাবিবকে পাল্টা আঁকড়ে ধরলো ও।

– এসো নিবেদিতা!
সালমার মুখটা অপমানে গাট হয়ে এলো। তাকে স্তব্ধ বনে তাকিয়ে থাকতে দেখে আঁখিও আড়ালে হাসলো। আজ এতোগুলা বছর পর, উচিত জবাব পেয়েছে সে! তাবিবের জীবনের অন্যতম দুঃখের কারণ ছিল এই নারী! আঁখির আফসোস হয় মাঝে মধ্যে! তাবিবের প্রতি সালমার এতো অবিচার না থাকলে তাবিবকে সেই সংগ্রামী জীবন বেছে নিতে হতো না। সেই সুবাদে আজ হয়তো তাবিব আঁখি ও তানহার সেই সুখের সংসারটাও শেষ হয়ে যেতো না। এমনটা নয় যে আঁখির বর্তমান জীবনে কোনকিছুর কমতি রয়েছে! যা যা আঁখিকে তৃপ্তি দেয় সে সবকিছুর স্বাদই ও আস্বাদন করতে পেরেছে নতুন জীবনে।
তবুও তাবিব! ওর সেই একান্ত ব্যক্তিগত তাবিব! সেই পুরুষটার জায়গা ওর মন থেকে কখনও মিটবে না। সুখময় স্মৃতিগুলো আজও ও যত্নে লালন করে। সেই ছেলেটা সাধারণের মাঝেও অসাধারণ কেউ ছিল! হাজার চেষ্টা করলেও ওর মতো কাওকে পাওয়া কখনও সম্ভব নয়! বছর খানিকেরও বেশি সময়ের সংসার, তার সন্তানের জন্ম দেওয়া। সেসব অনুভূতি ভুলবার নয়! অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও আঁখির জন্য যা যা করেছে তাবিব! সেই অল্প বয়সের আবেগে, অপরিপক্ক হাতেই আঁখিকে রানী বানিয়ে রেখেছিল সে। ছটফটে আঁখি যদি একটু ধৈর্য ধরতে জানতো! একটু অপেক্ষা! একটু ধীরতা! কিন্তু সেসব ওর থেকে ছুটে গিয়েছে বহু আগে! এবং আজ সেই তরুন এখন পূর্ণবয়স্ক সুপুরুষ! সাথে ঘটেছে আমূল পরিবর্তন। মানুষটার যে আরও উন্নতি ঘটেছে এ আর বলতে অপেক্ষা রাখে না।
নিবেদিতা নামক মানবীটি ভাগ্যবতী। কারণ দিনশেষে তাবিবকে পেয়েছে সে। কেউ পেয়েও হারিয়ে ফেলে আর কেউ কোন কিছুর আশা না করেও সেরাটাই লাভ করে।

জাকির সরোয়ার সবাইকে তার ঘরে ডেকে পাঠিয়েছেন। দীর্ঘদিন যাবতই নানা রোগ এই পৌর দেহে বাসা বাঁধছিল। অতঃপর সেদিন নিকট আত্মীয় ও ব্যবসায়িক সহকর্মী রুবেল হাসানের আকস্মিক বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে নিজের প্রতি ভরসা হারিয়ে বসেছেন জাকির। মাইনর হার্ট অ্যাটাকও করে বসেন সাথে৷ এরপর থেকে বিশ্রামেই রয়েছেন তিনি৷ কিন্তু মস্তিষ্ক বারংবার মৃত্যু বরণের নির্মম সত্যটি মনে করিয়ে দিচ্ছিলো। আর সেই থেকে চিত্তে এক ফোঁটা শান্তি মিলছে না। পুরো জীবনে হিসাবকিতাব চোখের পাতায় স্পষ্ট ভেসে বেড়াচ্ছে। নিজের কর্মকীর্তি অন্যের জীবনে কি ভয়াবহ পরিনতি উপহার দিয়েছে সেই চিন্তা ও জাগ্রত বিবেকবোধ তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছিলো। এজন্যই শেষে আর পেরে উঠেন নি তিনি। হঠাৎই বড় ছেলের সাথে যোগাযোগ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। স্ত্রীর নাখোশ মেজাজ উপেক্ষা করে গিয়েছেন। এই এক নারীর জন্য জীবনে কম অপরাধ করেন নি তিনি। কিন্তু সেগুলোর স্মৃতচারণ করে কি লাভ! দোষের পাল্লা দু পাশেই সমান সমান!

তাবিব চলে এসেছে শুনতে পেয়ে, জাকিরকে ঠিকঠাক মতো তৈরী করিয়ে বসিয়ে দিয়ে, সাব্বির নিচে নামছিল এক কাজে, মাঝপথে দেখা হয়ে গেলো তাবিবের সাথে, যে তার স্ত্রীকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিল।
আচমকা সাব্বিরকে সম্মুখে দেখে থমকে গেলো তাবিব। পরিচিত মুখমন্ডল। দু ভাইয়ের মধ্যে তফাৎ বের করা তেমন একটা সহজও নয়। তবে ছোটবেলায়, সৈকতরে মতো সে মোটেও সহজ স্বভাবের ছিল না। তবুও আগ বাড়িয়ে তাবিব কিছু বলবে তার পূর্বেই ওকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে নিচে নেমে গেলো সাব্বির। পুরোপুরি উপেক্ষা! যেন তাবিবকে ও দেখেই নি। কিছুটা খারাপ লাগলেও অবাক হয় নি তাবিব। বরঞ্চ কিয়ৎপল আগে, সৈকতের আন্তরিক আচরণ ওকে বিস্মিত করেছে। শিষ্টাচার পিতামাতা কর্তৃক লাভ হলেও মন মানসিকতা স্বনির্ভর বস্ত। সৈকত এবং সাব্বিরের ব্যবহার আচারের পার্থক্য সেটাই প্রমান করে দিলো আজ।
– ভাইয়া এসো আমার সাথে।
সিঁড়ি অভিমুখে তানহাকে নিয়ে সৈকত দাঁড়িয়ে আছে। মুখে আদোল ম্লান হয়ে এসেছে। হয়তো মাত্র ঘটে যাওয়া দৃশ্যের চাক্ষুষ সাক্ষী হয়েছে সে। তাবিব স্মিত হেসে এগিয়ে গেলো। অথচ নিবৃতা ক্ষণে ক্ষণে অবাক হচ্ছে। আপন মানুষদের এ কেমন নিষ্ঠুর রূপ! এই জটিল দুনিয়াকে বোঝার এবং দেখার এখনও বাকি আছে অনেক!

জীবনের অধিকাংশ সময়, দারুণ দাম্ভিকতার ভরে চলা মানুষটির অবস্থা আজ ভঙ্গুর। চেহারা রুগ্ন, শরীরে গড়ন হয়ে এসেছে জীর্ণ শীর্ণ। ভাজ পরা চামড়ার পরতে পরতে মলিনতা। মাথার পাকা চুলগুলো প্রায় নিঃশেষের পথে। কাতর, ক্লান্ত চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বিছানার সাথে পীঠ হেলিয়ে বসে আছেন তিনি। তাবিব পূর্ণ দৃষ্টি মেলেই বাবাকে দেখলো। আজ আর হীনমন্যতায় মাথা নত নয়, বরঞ্চ উদ্যম সাহস এবং আত্ম গৌরবের মহিমায় শীর উন্নত। ছেলের সেই প্রতাপি নজরে উল্টো নড়েচড়ে উঠলেন জাকির। দৃষ্টি আপনা আপনিই সরতে বাধ্য হলো। অসুস্থতার দায় ফলিয়ে ছেলেকে ডেকে তো নিয়ে এলেন কিন্তু মাঝে সৃষ্টি হওয়া এই বিভেদের দেওয়াল কিভাবে ভাঙবেন তিনি? এক সময়ে দেওয়া আঘাত, পরিচর্যার অভাবে ছড়িয়ে সর্বস্ব নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছে। ছেড়ে গিয়েছে প্রবল ছাপ! সেটা কি আর মুছে ফেলা সম্ভব?
– আসসালামু আলাইকুম। আপনার শরীরের কি অবস্থা এখন?
ভারি পৌরুষ স্বরে অদ্ভুত দৃপ্ততা। দায়িত্বের দ্বার ভারে ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা করলেও এক সম্মানীয় সম্বোধনের অনুপস্থিতি ছিল সেথায়। জাকিরের কাছে নিজেকে আরও ছোট মনে হলো। তার উচিত ছিল মুখ ফুটে আগে কথা শুরু করার, অথচ এখানেও ভুল করে বসলেন। অসুস্থ, ভাঙা স্বরে জবাব দিলেন তিনি,
– ওয়া আলাই কুমুসসালাম। এই তো বয়স হয়েছে এখন। আর যতদিন হায়াত আছে তা-ও বড় নিয়ামত।
বৃদ্ধ হাসিমুখে বলতেই তাবিবের নজর নেমে এলো। এযাবতকাল বাবার ছায়া মাথার উপর না থাকা সত্ত্বেও কেন যেন, এতিম বিশেষনটা নিজ নামের সাথে মেনে নেওয়া এখনও কষ্টসাধ্য। ও তানহার হাত ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলো।

– আমার মেয়ে তানহা।
জাকিরের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে এলো। তার ছেলের ঘরের একমাত্র সন্তান। বড় মেয়ের ঘরের কাওকে তো সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য হয়ে উঠেনি। কত দূরে থাকে তারা! জাকির সামনে হাত বাড়িয়ে তানহাকে কাছে ডাকেন।
– দাদুভাই!
বাবার থেকে সমর্থন পেয়ে তানহা হাসিমুখে গিয়ে জাকিরের পাশে বসে। তানহা যেন তাবিবেরই নীরব প্রতিচ্ছবি! মুখের আদলে বেশ খানিকটা মিল। তবে তাবিব নিজেও যে অন্য কারও অংশ বহন করে। মস্তিষ্কের দৃশ্যপটে এক সুশ্রী রমনীর মুখাবয়ব ভেসে ওঠে! তার জীবনের এক অনবদ্য সত্য যাকে এড়িয়ে যাওয়ার শত চেষ্টা কারণে আজ তিনি সব থেকেও নিঃস্ব। প্রকম্পিত মনে নাতনীর মাথায় আবেগে আপ্লূত হয়ে হাত বুলান জাকির। সাথে শুরু করে দেন কিছুটা এলোমেলো ও অনেকটা আদুরে আলাপ।
তাবিবের চোখের পলক পরছিল না। চোখের সম্মুখে দৃশ্যমান ঘটনাবলী ওর বেশ আগে থেকেই পাওনা রয়েছিল। এগুলো ছিল ওর চরম অধিকারে তবুও তাবিবসহ ওর মেয়েকে এসব ঘনিষ্ঠ আপনজন থাকা সত্বেও তাদের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। সব থেকেও কাঙালের ন্যায় বাঁচতে হয়েছে। কেন যেন খুশীর বদলে তাবিবের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আক্রোশ জমা হচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল তানহাকে ছিনিয়ে নিয়ে আসতে। সেই মানুষটা এসব সুখ প্রাপ্তির যোগ্য নয়! অথচ তখনও ও পারছিল না মনের কথা শুনতে। কদম আটকে ছিল দৃঢ়তার সাথে। মন মস্তিষ্কের দোলাচালে ক্লান্ত হয়ে!

– আবার কিসের নাটক শুরু করেছেন আপনি মিস্টার সরোয়ার! সুস্থ সবলই তো আছেন দেখছি! তাহলে অযথা আমাকে কেন ডেকে পাঠিয়েছেন?
আবেগঘন মুহুর্ত এক রৌদ্র রূপী রমনীর তেজী কণ্ঠে ভাটা পরে। আচমকা তার কন্ঠস্বরের দৃপ্ততায় সকলে কিঞ্চিৎ হতবিহ্বল হয়ে পরেছে। তাবিব সাথে সাথেই তার পানপ ঘাড় ঘুরিয়ে চায়।
দরজা অভিমুখে এক রমনী দাঁড়িয়ে। পরনে তার পা সমান দীর্ঘ ঘিয়ে রঙা গোল জামা। মাথায় নীল রঙের হিজাব মোড়ানো। কাঁধের দুপাশে ওড়না মেলে রাখা। মুখটা মাস্কের আড়ালে ঢাকা। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। কাঁধে একটি ব্যাগ ঝুলানো, যার সামান্য পরিমাণ খোলা চেইনের মাঝ থেকে লম্বাটে একটি প্যাচানো সাদাটে কাগজ বেড়িয়ে আছে। মেয়েটি কে হতে পারে তা আন্দাজ করতে পেরেই তাবিব ক্ষীণ হাসলো। এখনও সেই ঠাটবাট স্বভাবেরই রয়ে গিয়েছে সে। সকলের উপর আধিপত্য বিরাজ করা তেজস্বীনি! কাওকে পরোয়া না করা এক নির্ভীক সত্তা! দূর্দমনীয় সে!
উচু গলার আওয়াজ পেয়েই জাকির এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। এই মেয়ে তার মৃত্যুর আগে হয়তো-বা আর নরম হবে না৷

– এই ভন্ড পরিবারের অযৌক্তিক মিলনমেলা দেখার কোন শখ নেই আমার৷ ভেবেছিলাম গুরুতর কিছু হয়তো অবশেষে ঘটে গিয়েছে! তাই চলে এসেছিলাম।
ভেতরে আসতে আসতে ফের বললো সে। তাবিব ভ্রু কুঁচকে চাইলো। বেপরোয়া ব্যবহারটা কি এবার বেয়াদবিতে রূপ নিচ্ছে না? ও শান্ত সুরে বললো,
– এভাবে কেন বলছো তাওশি?
তাওশি ছোট ছোট চোখে তাকায় সামনে দাঁড়ানো পুরুষটির দিকে। চিনতে অসুবিধা হয় নি৷ এককালের ভীষন প্রিয় ছিল সে। তবে র/ক্ত যে কথা বলেই! জাকির সরোয়ারের রূপ নিতে খুব বেশি দেরী করেনি সে।
– সেই লোকের আরেক ফটোকপি আপনি। দূরে থাকবেন আমার থেকে।
এতোটা রূঢ় ব্যবহার! তাবিব হতবাক হলো। ও আবার কি করলো?
– বড় ভাইয়া হয় তোমার তাওশি। সম্মান দিয়ে কথা বলো!
জাকির মৃদু ধমকে উঠলেন মেয়েকে। তাওশি অবজ্ঞায় চোখ ঘোরালো। এসব পুরুষদের আবার কিসের সম্মান? স্বেচ্ছায় সংসার নামক দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিবে আবার পরে সেটাকে ছেলেখেলা ভেবে ছিটকে দূরে ফেলবে। আর কি পারে তারা!

– কিছু মনে করো না বাবা! ও একটু ওমনি।
‘বাবা! এই নামেই তো তাবিবকে বোঝালো সে। কি স্নেহ সেই সম্বোধনে। অথচ তাবিবের মনে থাকা ক্ষত যেন আরও বাড়লো এতে। এদিকে এতো আদিখ্যেতা তাওশির সহ্য হলো না। বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বের হতে নিবে তখনই এক পাশে, কালো এক অবয়বে চোখ পরলো ওর। এই মেয়ে আবার কে? অনুসন্ধানের জন্য সেদিকে এগিয়ে যেতেই ঘরে আরেকজনের আগমন ঘটলো।
– আঙ্কেল!
চৌকাঠে আঁখি দাঁড়িয়ে। জাকিরের সেদিকে নজর পরতেই ওকে নরম স্বরে ভেতরে আসার আহ্বান জানান।
– এসো এসো।

তানহার দৃষ্টি থমকে গিয়েছিল। মানুষটাকে ও চিনে। ছোটবেলায় একবার খুব বায়না করেছিল বাবার কাছে, তাকে দেখার জন্য। বাবা অবশেষে বাধ্য হয়ে দেখিয়েছিল তার একটি ছবি। সেখান থেকেই এই চেহারাটি খুব করে চেনা ওর। আজীবনের জন্য একেবারে মস্তিষ্কে ধারণ করে নিয়েছিল। কিন্তু আজ অকস্মাৎ, তাকে প্রথমবারের মতো সরাসরি সামনে থেকে দেখে তানহার কেন যেন খুশি, দুঃখ, রাগ কিংবা আফসোস কোন অনুভূতিই হলো না। সাবলীল ভঙ্গিতেই আগের মতো বসে রইলো ও। আঁখিও তখন মেয়েকে দেখছিলো। নিচে তখন কিছু বলতে পারে নি। এতো বছর পর আচমকা সন্তানকে এতোটা পরিনত অবস্থায় দেখে ওকে বিস্ময় জেঁকে ধরেছিল। এই তো, সেদিনই না কতটুকু ছিল ও! দু হাতের মাঝে নিলেও এতো ছোট দেখাতো! আর আজ? সময় দ্রুত পরিবর্তনশীল। ও ধীর পায়ে কাছে গিয়ে তানহার সম্মুখে দাঁড়ালো। নরম হাতে ওর গালে তুলে দিয়ে স্নেহ বুলিয়ে দিলো। তানহাও পলকহীন চোখে তাকিয়ে, আখিঁর দিকে মিষ্টি এক হাসি ফেরত দিলো। এরকম সুন্দর আচরণ হয়তো আঁখি আশা করে নি। অপরাধবোধ কিছুটা কমে এলো ওর। সাথে মমতায় ভিজে এলো চোখ দুটো।

– অনেক বড় হয়ে গিয়েছ! বিশ্বাসই হচ্ছে না আমার।
মাতৃ মনটা স্নেহে উপচে পরছে। এতো আদুরে তার মেয়েটা! আঁখির মন ভরে না একটুও।
– দেখতে অনেক কিউট হয়েছ! ঠিক আমার মতো!
আত্ম অহংয়ে তুষ্ট হয়ে আঁখি হেসে ফেললো এ পর্যায়ে! তাবিবের সাথে ওর মুখের আদলের সংমিশ্রণ খুবই সুন্দর করে লাভ করেছে তানহা। তাবিব, আঁখি দু’জনকেই আলাদা আলাদাভাবে চেনা যাবে ওর মধ্যে। নিবৃতা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। ওর ঝিলমিলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়ও নিবৃতার নখদর্পনে। আঁখিকে নিচেই দেখেছিল ও। কিন্তু কিছু বলে নি কারণ তাবিবের থেকে বিশেষ কোন গুরুত্ব পায় নি সে৷ কিন্তু এবার সন্দেহটা পুরোপুরি সঠিক প্রমানিত হতেই মনটা আনচান করে উঠলো। এক অজানা যাতনা ওকে তৎক্ষনাৎ আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে নিলো। বেদনায় ক্লিষ্ট হয়ে ও আগ বাড়িয়ে তাবিবের পীঠের দিকের শার্টটা খামচে ধরলো শক্ত করে। নিবৃতার হাতটা মৃদুমন্দ কাঁপছে তখনও। তাবিব ওর দিকে তাকালো না ইচ্ছে করেই। মেয়ের উপর যদিও ভরসা আছে ওর, তবুও নিজেকে দোষী লাগলো, আজ নিবৃতাকে এ পর্যায়ে এনে দাঁড় করানোর জন্য।
আঁখির প্রশংসায় তানহা গাল ভরে হাসলো। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো,

– থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনিও খুব সুন্দর। কিন্তু আমার আম্মু আমার থেকেও বেশি কিউট আর প্রিটি!
আঁখিকে চমকে ওঠারও অবকাশ না দিয়ে তানহা ছুটে গিয়ে নিবৃতাকে জাপ্টে ধরলো এক প্রকার। পরপর ঠোঁট ছাড়িয়ে হেসে তাকালো ওর আম্মুর দিকে। মা’ শব্দটার অর্থ যার মাধ্যমে বুঝেছে তাকে ছাড়া আর কার আশ্রয়ে যাবে ও! নিবৃতা সিক্ত চোখে মেয়ের গালে হাত বুলিয়ে দিলো। মনটা প্রশান্তিতে ছেয়ে গিয়েছে। মা মেয়েকে দেখে তাবিব মুখে গর্বের হাসি ফুটে উঠলো!
এতক্ষণে এই অপরিচিত নারীর উপর নজর গেলো জাকিরের। উনাকে বিস্মিত দেখালো। কে হতে পারে সে? তানহা কেন তাকে মা ডাকছে? সব প্রশ্নের উত্তর পরে জানার জন্য বাকি রেখে, উনি আঁখির উদ্দেশ্যে বললেন,

নিবৃতা পর্ব ৩৬

– আমার কথার মান রেখে, সময় বের করে তুমি এখানে এসেছ এতে আমি ভীষন কৃতজ্ঞ মা। ধন্যবাদ।
ভদ্রলোকের আন্তরিকতায়, একটু আগে মেয়ের থেকে পাওয়া ভদ্র প্রত্যাখানকে কোনমতে হজম করে আঁখি সামান্য হাসলো।
– সমস্যা নেই আঙ্কেল, আপনি বলুন।
জাকিরের মুখাবয়ব গম্ভীর হয়ে এলো এবার। নিজের করা ভুলগুলো শুধরানোর উপায় নেই এখন, তবে যতটুকু অন্তত করলে মনে একটু হলেও শান্তি মিলবে ততটুকু আজ না করলেই নয়।

নিবৃতা শেষ পর্ব