নিবৃতা বোনাস পর্ব
নেহার ছায়ালিপি
আমার স্ত্রী, আমার নিবেদিতা, আমার ভালোবাসা! আমার এই নগন্য জীবনে প্রাপ্ত সকল সুখময় স্মৃতির অন্যতম বিরাট এক কারণ! আমি একজন কর্মব্যস্ত মানুষ। জীবন সংগ্রামের সাথে অভ্যস্ত হয়ে, গড়ে ওঠা যৌক্তিক এক পুরুষ। নিজ অনুভূতির প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যথেষ্ট পটু। তবে মনের ক্যানভাসে যখন সেই একটি অবুঝ মুখশ্রীর সরল চাহনি ভেসে উঠে, তখন আর আমার আপন সত্তায় মস্তিষ্ক নামক যুক্তিবাদী অঙ্গের জোর খাটে না। ধ্যান ধারনা সব লোপ পেয়ে শুধু একমাত্র তার সঙ্গ লাভেরই তৃষ্ণা লাগে! এক বিন্দু ছুঁয়ে দেওয়ার তীব্র বাসনা জাগে। অথচ এরূপ অনুভব করা আমার জন্য মোটেও নতুন নয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই, আমার মনে তার নামের এমন দাপটে আনাগোনা চলছে। কিন্তু প্রতিবারই যখন আমি তাকে অনুভব করি ততবারই সে এক নব্য অনুভূতি হয়ে ধরা দেয় আমাকে।
ঠিক সেভাবে আজও তার কাছে ছুটে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে, তাকে মনে পরছে ভীষন। কিন্তু উপায় যে নেই! সে এখানে নেই, আমার হাতের নাগালের চেয়ে বহু দূরে। এবং এই দুরত্বই যেন অনুভূতিমালাকে আরও গাঢ় করে তুলছে। তারই স্মৃতিচারণে, আমার ভীষন যত্নে লালন করা অতিবাহিত কিছু প্রেমময় দৃশ্যপট ঘুরেফিরে চোখের তারায় ভাসছে।
মেয়ের জন্য মা নিয়ে আসার অভিযানে যখন হঠাৎ করেই নিবেদিতা নামক মানবীর খোঁজ পেলাম, তখন এই কঠিন, আপোষহীন হৃদয়ে ছিল না কোন কৌতুহল। শুধুমাত্র ছিল এক দায়িত্ব পালনের তাড়া যা আমার কাছে সে মুহুর্তে অত্যন্ত বিরক্তিকর ও অসহ্য ঠেকছিল! হাতে থাকা মুঠোফোনে তখন সদ্য তার একটি ছবি পাঠানো হয়েছিল। শুধুমাত্র এক স্পর্শের দুরত্বে ছিল সে তবুও এক নজর দেখার সাধ জাগে নি। কিন্তু সেই তাকেই যখন সরাসরি দেখলাম, তখন মনের অজান্তেই নিবেদিতা নামক মেয়েটির মলিন, নিস্তেজ, ও শীর্ণ চেহারার আদলে লুকানো বিষাদ এই চোখের কোনে আটকা পরলো। সেই নিষ্প্রাণ মুখাবয়বে ছড়িয়ে পরা ভীতি, বহুকাল পরে এ মনে অবাঞ্ছিত কারো জন্য প্রশ্নের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। কেন যেন মনের অজান্তে, সম্পূর্ণ অনিচ্ছায় তার রুগ্ন মুখকান্তি স্পষ্ট করে দেখার জন্য আমার দৃষ্টি বারংবার তার পানে উঠে যেতে চাচ্ছিল। নিজের কড়া শাসনে আবদ্ধ মনের আচমকা এই অবাধ্য রূপের কাছে খোদই বিব্রত হয়ে পরেছিলাম। তার সাথে সাথে নিজের উপরেও বিরক্তি চলে এসেছিলো। শুরুটাই কেমন অপ্রসন্ন, অনাকাঙ্ক্ষিত ও ঘোলাটে হয়ে গেলো।
কঠোর নীতিমন্ত্রে বলীয়ান থাকায়,আমার কাছে ব্যক্ত করা তার অতীত জীবনে ঘটনা বানোয়াট গল্প, বড্ড অপছন্দের হলেও, আস্তেধীরে একটু একটু করে, আমাদের বাবা মেয়ের ছোট্ট সংসারে সে যখন নতুন এবং সুন্দর এক সংযোজন হয়ে মিশে যেতে লাগলো, তখন কিভাবে যেন তার প্রতি কোন তিক্ততা কাজ করলো না আমার। মেয়ের প্রতি তার মায়া, স্নেহ, মমতার কোন কমতি ছিল না। সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র কোন অভিযোগ করার জায়গা আমি পাই নি বরঞ্চ ওর প্রতি তার দায়িত্ববোধ আমায় প্রতি পদে পদে আশ্চার্যান্বিত করেছে। তবে মেয়ের নামে এই জীবনে তার পদার্পন ঘটলেও, পুনরায় আঘাত পাওয়ার ভয়ে, শক্ত খোলসে মুড়িয়ে যাওয়া এই হৃদয়ে সে স্থান বুঝে নিয়েছিলো শুধুই মাত্র নিবেদিতা হওয়ার কারণে।
এই জটিল মস্তিষ্ক ও কুটিলতায় পূর্ণ সমাজের প্রতি থাকা তার নির্বোধ অজ্ঞতা, তার অভিজ্ঞতাবিহীন দু’চোখের সংশয় পূর্ণ চাহনি, জড়তায় ঘেরা দুর্বল অভিব্যক্তি এবং নিচু স্বরে বলা সংক্ষিপ্ত শব্দমালা, যাদের আমি সহজেই গুনে শেষ করতে পারবো! এই পৃথিবীর প্রতি তৈরী হওয়া আমার তিক্ত জ্ঞানের সাগরে সে ছিল, বিশেষ পাত্রে ভেসে আসা দুর্লভ মিঠা পানি! এই নতুন সঞ্চারণ যেন আমায় নব্য অনুভূতিদের সাথে পরিচয় করালো। তার প্রতি বাড়তে থাকা অমোঘ টানের দরুণ তখন আমি জনম পিপাসায় কাতর!
কিন্তু নম্রতার প্রতিমা সে তখন অনিচ্ছায় হয়ে উঠলো নির্দয়া! তার বহুভীতির তালিকায় আমার নামটাও যোগ হয়ে গেলো। যেখানে আমার দু’চোখ প্রতিনিয়ত তাকেই খুঁজে বেড়ায়, সেখানে সে তখন এই আমিটা থেকে আড়ালে থাকতেই যেন স্বস্তি পায়! কি করুন অবস্থা হলো আমার! তবে সে বরাবরই ভীষন অনুগত। স্বামী নামক পুরুষে তার ভয় থাকলেও স্বামী নামক অভিভাবকের প্রতি ছিল সে নিরেট বাধ্য। কখনও কোন কথা কিংবা আদেশের হেরফের হয় নি তার মাঝে। আমি যদি বলতাম, ‘নিবেদিতা যাও তো! দরজার সম্মুখে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকো, আমি না বলা পর্যন্ত নড়বে না।’ তাহলে সে মুখ বুঁজে, নীরবে তাই করতো। দিন ফুরিয়ে রাত কিংবা রাত কেটে দিন! সে ‘উহ অবদি উচ্চারণ করতো না। এটা ছিল তার বাধ্যতার সবচাইতে নিম্নস্তরের উদাহরন। আমি চাইলেই সে সুযোগের ব্যবহার করতে পারতাম, তবে কিভাবে করতাম সেটা? সে-ও তো ঠিক আমার মতোই এই এক জীবনে বহু আঘাতে জর্জরিত হয়ে এ পর্যন্ত এসেছে। আমার মতো দুঃখী মানুষটা খুঁজে পেয়েছিলো আরেক ক্লেশে ডোবা মানবীকে। আমি না বুঝলে কে আগলে নিতো তাকে? কে খেয়াল রাখতো তার সকল ছোট ছোট প্রয়োজনের? সেই ভাঙাচোরা সত্তাকে কে যত্ন করতে? জীবন সঙ্গী’ নামক সংজ্ঞায় থাকা নানান রূপের মাঝে তখন আমি বেছে নিলাম; তার সংকোচের পর্দায় আবৃত থাকা শত শত না বলা শব্দগুলো, নীরবে বোঝার দায়িত্ব। সানন্দে গ্রহন করলাম প্রতীক্ষার লম্বা পথ।
কিন্তু ভালোবাসার তীব্রতায় অপেক্ষা নামক বস্তুটি একসময় না পেরে উঠতে বড্ড জ্বালায়। কন্টকের মতো প্রতিনিয়ত অন্তঃস্থলকে খোঁচাতে থাকে। করে তুলে প্রেমিক মনকে ক্লান্ত, ব্যথিত। প্রেয়সী সে নাগালের মাঝে, হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলে শান্তি, তবুও মাঝে থাকা অদৃশ্য যোজন যোজন দুরত্বের কারনে মনে ঘোর অশান্তি। অবশ্য নিজেকে ধৈর্যশীল দাবি করা এই আমিটার কিছু প্রচেষ্টায় তখন সে আমার প্রতি সহনশীল। তবে সেই সহজ আচরনই আমার তপ্ত হৃদয়ে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরীর জন্য যথেষ্ট হলো। দীর্ঘকাল ভালোবাসা নামক পবিত্র এক বন্ধন ও সান্নিধ্যে থেকে দূরে থাকা আমার এতেই লোভ বেড়ে বহুগুণ হলো। মাত্রা ছাড়ালো। মন গহীন তখন দু’জনের জন্য নানান রঙের স্বপ্ন বুনছিলো। থামাতে পারি নি নিজেকে, অধিকার প্রয়োগ করে তাকে নিয়ে আসলাম নিজের অতি নিকটে। তবে আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে, দৃশ্যমান নৈকট্যও কখনো কখনো অদৃশ্য দুরত্বের ইঙ্গিত হতে পারে। আমার আবারও নিবেদিতাকে পেয়েও পাওয়া হলো না। হৃদয়ের খেলায় পুনরায় পরাজিত হবো বুঝতে পেরে মন মস্তিষ্ক তখন আমার বিপর্যস্ত। তবে জীবন আমাকে বৈরী পরিস্থিতির সম্মুখীন করাতে কখনোও কার্পন্য করে নি৷ যেই ফুল সামান্য মুষড়ে পরবে সেই চিন্তায় আমি তাকে প্রতিনিয়ত প্রেমময় পরশে, অতি আদরে আহ্লাদে, সযত্নে লালন করি আমার বক্ষ নামক বৃক্ষে, তাকে না-কি কেউ কুড়ি থাকতেই ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলো। সেই করুন সত্য আমার সহ্য হয় নি৷ আমি তানজীব, সময়ের কালে বহুবার পর্যুদস্ত হয়েছি কিন্তু কবু কারও জন্য মনে খেদ রাখি নি, তাদের খারাপ চাই নি। অথচ সেই আমি, আমার জীবনের আদর্শতাকে পিছে ফেলে কাওকে মরণঘাতী আক্রমণ করেছি এবং তাতে বিন্দুমাত্র আফসোসও জাগে নি আমার মনে। কারন,
” সে আমার আঁধার রাত্রি মাঝে এক ফালি জোৎস্নার কিরন,
সে আমার শত দুঃখ পেরিয়ে পাওয়া রংধনুর সাত রঙা স্বপন ” ©
কিন্তু আমার হৃদয় তখন ভাঙনের মোড়ে, যখন উপলব্ধি হলো সে আমার থেকে বহু দূরে চলে যাবে। আমার মানুষটা ভালো থাকবে, সে আশায় আমিও তাকে যেতে দিলাম। অথচ আমার যে তখন সাত কপাল তা কি আমি জানতাম! সর্বদা আমার থেকে পালিয়ে বাঁচা সে তখন নিজে দিলো ধরা। সে কি করুন তার মুখের দশা, কন্ঠে বিরল আকুতি, থরথরে হাত দুটোয় আমার স্পর্শ পাওয়ার তাড়া। সেসব নাকি আমার জন্য। ভাবা যায়? ভালোবাসার পথে হারতে হারতেও শেষে এসে আমার জয় এলো। শুনতে পেলাম সেই স্বীকারোক্তি, অনুভব করতে পারলাম তার মাঝেও আছে সেই বিশেষ অনুভূতি। তবে এ জীবনে সেই স্বপ্নালু শব্দ তিনটি হয়তো শাব্দিকঅর্থে আবারও আর কখনোও শোনা হবে না। কারণ সে বলবে না৷ সে জানে, আমি তার চোখের মাঝে লুকিয়ে থাকা প্রতিটি শব্দ পড়ে নিতে পারি, সে জানে গুরুতর মুহুর্তে তার পেলব ঠোঁট দু’টো গুটিয়ে এলে সে কি চিন্তা করে সেটা আমি চট করে ধরে ফেলতে পারি, তার তিরতিরে কম্পিত অভিব্যক্তি দেখেই আমি তার অবস্থা বুঝতে পারি। যেখানে আমার আয়ত্তে তার গোটা সত্তা রয়েছে সেখানে আবার আলাদা করে কিছু বলার কি আছে? নেই তো। তাইতো, আমি আজও সানন্দে নিবেদিতাকে সেই আগের মতোই সামলাই। সে বদলে যেতে চেয়েও কেন যেন ঠিক আগের মতোই আছে।
এবং এরজন্য তার অনেক বড় এক ধন্যবাদ প্রাপ্য আমার থেকে কিন্তু আমি সেটা কখনো ব্যক্ত করবো না৷ আমি আমার কৃতজ্ঞতা আমার কর্মে বোঝাই। তার আমার প্রতি এই নির্ভরশীলতা আমাকে স্বস্তি দেয়, মনোবল বাড়ায়, সকল পুরোনো আক্ষেপগুলো ঘুচিয়ে দেয়। যেই আমিটাকে এককালে কেউ বড্ড অবহেলায় ছেড়ে গিয়েছিল কারন আমার কোন উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল না তার জীবনে, আর আজ, কালের পরিক্রমায়, সেই আমিই এখন অন্য আরেকজনের ভরসাস্থল, তার সঙ্গী। এতেই আমার প্রাপ্তি, নিবেদিতাই আমার পৌরুষের পূর্ণতা, আমার মনে রাজত্ব চালানো একমাত্র প্রিয়তমা।
ডায়েরির মসৃণ পাতায় চলন্ত কলমটি এবারে থামতে বাধ্য হলো। সাথে থমকে গেলো পুরুষালি পোক্ত হাতটি। রিমলেস চশমার আড়ালে থাকা উষ্ণ চোখ দুটো কিঞ্চিৎ নেমে আসে নিচে। নয়নের মনি যুগল চক্রাকারে ঘুরে, পড়ে শেষ করে এতক্ষণের লেখাগুলো। এ বয়সে এসব কান্ড নিতান্ত পাগলামিই বটে! তাবিব বিব্রত ভঙ্গিতে চুলের ভাজে হাত বুলায়। পরপর মাথা নামিয়ে হেসে ফেলে। একটা সময়, দু’হাতে মুখ চেপে তাকায় পুরো ঘরময়। একাকিত্ব! এই শব্দটা ওকে দিয়ে আজ আরেক অদ্ভুত কাজ করালো। অবশ্য খারাপ লাগে নি! বরঞ্চ অনেকটাই হালকা লাগছে নিজেকে। ডায়েরির উন্মুক্ত পাতা বন্ধ করে চট করে উঠে দাঁড়ায় তাবিব। খোলা বারান্দা দিয়ে হেলে পরা দুপুরের আলো প্রবেশ করে পুরো মেঝে তপ্ত করে তুলেছে। আজ গরমটা যেন একটু বেশিই। তাবিবের চিন্তা হলো। চট্টগ্রামের বর্তমান অবস্থা কেমন? তানহার গরম সহ্য হয় না। আর সে? তার তো শত খারাপ লাগলেও মুখ ফুটে কিছু বলবে না সে। কপালে গুটিকয়েক ভাজ নেমে এলো তাবিবের। আজ শুক্রবার, ও বাসায়ই আছে তাই৷ সকাল থেকে এ পর্যন্ত দু’বার কল করাও হয়ে গিয়েছে তাকে। তাবিব তো পারলে সারাক্ষণই সংযোগে থাকে। কিন্তু সেখানে শাশুড়ির উপস্থিতি তাকে কিছুটা লজ্জায় ফেলে দেয়। এজন্যই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। কিন্তু দুপুর নামতেই সেই মুখটা আবারও এতো বেশি করে মনে পরতে লাগলো যে তাবিবের আর ভালো লাগছিলো না। কিন্তু অস্বস্তি কাটিয়ে সে আর কলও করতে পারে নি। মুখটায় সহসা গহন আঁধার ঘনিয়ে এলো। কিছু না পেয়ে উদাস ভঙ্গিতে অলস পায়ে বিছানায় আছড়ে পরলো।
নিবৃতার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। এদিকে তাবিবের ব্যস্ততাও যেন কমে না। চাইলেও খুব বেশি সময় দেওয়া হচ্ছিল না বাসায়। সেজন্যই গত সপ্তাহে নিবৃতাকে চট্টগ্রাম দিয়ে এসেছে ও। পরিবারের সাথে থাকলে সে ভালো লাগবে এই ভেবে৷ অথচ এই সিদ্ধান্তই এখন নিজ গলায় ফাঁ/স হয়ে আটকে আসছে৷ বিরস বদনে তাবিব বিছানা জুড়ে ঘুরপাক খায়। কিন্তু আরাম বোধ হয় না। ঠিকমতো ঘুমও হচ্ছে না ক’দিন ধরে। তাবিবের এ কি বেহাল দশা হলো?
একলা ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে তখনই কলিং বেল বেজে উঠলো। ভ্রু কুঁচকে চাইলো তাবিব। কে আসতে পারে এখন? নিবৃতার অন্তর্মুখী স্বভাবের জন্য সচরাচর প্রতিবেশী কারো আনাগোনা হয় না এখানে। ট্রাউজারের উপরে থাকা টি-শার্টটা টেনেটুনে তাবিব গেলো দরজা খুলতে।
দরজার ওপারে সেই চেনা অবয়বটি দাড়িয়ে। মাথাটা কেমন নুইয়ে রাখা। অবনত কাঁধ অনবরত উঠছে নামছে। মনে হচ্ছে জোরে জোরে শ্বাস ছাড়ছে সে। বিষয়টা খেয়ালে আসতেই তাবিব নিজের বিস্ময়কে এক পেশে চেপে গিয়ে নিবৃতাকে আগলে ধরলো।
– আজ তো সার্ভিসিংয়ের জন্য লিফট বন্ধ। কিভাবে উঠলে তুমি? আশ্চর্য তো!
নিবৃতা জবাব দেওয়ার অবস্থায় নেই। সিঁড়ি উঠে আসলেই ওর অবস্থা তখন বড্ড নাজেহাল। তাছাড়াও ইদানীং পীঠে ব্যথাটাও বেশ বেড়েছে। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে ওর। তাবিব ওকে সামলে আরেক হাতে কোনমতে লাগেজ টেনে ভেতরে আনলো। অতঃপর নিবৃতাকে নিয়ে চললো ঘরে৷
– দেখি দেখি!
যত্নশীল তাবিব তার চিরায়ত রূপে ফিরে এসেছে তৎক্ষনাৎ। নিবৃতার মুখটা উন্মুক্ত হতেই চোখে পরলো লালচে ত্বক। মনে হচ্ছে টোকা দিলেই যে র/ক্ত ঝড়বে! পাশাপাশি ঘেমে নিয়ে একদম শেষ। তাবিব উদ্বিগ্ন স্বরে বলে,
– কি অবস্থা করেছ নিজের?
নিবৃতা হাঁপাচ্ছে ভীষন। অবস্থা দেখে এ মুহুর্তের জন্য আপন শাসক সত্তাকে সরিয়ে রাখলো তাবিব। নিবৃতার অবস্থার কথা চিন্তা করে এসি না ছেড়ে, ওকে খাটে বসিয়ে রেখে ছুটলো বাহিরে। বরফ ঠান্ডা পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে আনলো দ্রুত।
– পা’টা একটু সরাও তো।
বিছানার ধারে বসা নিবৃতার একদম সম্মুখ বরাবর দাঁড়ালো তাবিব। ঘর্মাক্ত অবসন্ন মুখটা নিজ হাতে তুলে নিয়ে আরেক হাতে ভিজে তোয়ালে ছুঁইয়ে দিলো সেথায়। আস্তেধীরে নরম হাতে মুছিয়ে দিতে লাগলো সমস্ত ক্লান্তি। আমোদে দু’চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসলো নিবৃতার। দুঃসাহস করে একা একা এতোদূর চলে আসা অবশেষে সার্থক হলো! তবুও মনে লোভ জাগে। চোখের পাতা সামান্য খুলে পরোখ করে সেই চিন্তিত মুখখানি। এরকম এক কান্ড ঘটিয়ে, ওর নিজেকে দোষারোপ করা উচিত। মানুষটাকে কিভাবে জ্বালালো! অথচ সেসবের বদলে এক অন্যরকম ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো অভ্যন্তর। ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো মিষ্টি হাসির রেখা। কপাল হয়ে এলো টানটান মসৃণ, ভারমুক্ত। পরিবর্তনটুকুন চোখে পরলো তাবিবের। এবার সে নিজেও সহজ হলো। ধেয়ে আসা মুচকি হাসিটা গিলে নিয়ে বললো,
– এতো বড় একটা কাজ করেও মনে ভয়ের ছিটেফোঁটাও নেই দেখছি। উল্টো হাসা হচ্ছে! হুম!
চেয়েও কন্ঠে কোন দৃঢ়তা আনতে পারে নি তাবিব, কারন খুশিতে তখন ওর মনটা নেচে উঠেছে যে। তাইতো নিবৃতাও আপন সাফাইয়ে কিছু বললো না। মুখ নামিয়ে শুধুই হাসলো। তাবিব সরে এলো তবে ওর প্রশ্নের বানের অতর্কিত হামলা থামলো না।
– কিভাবে এলে? নিভান ভাইয়া আসেন নি সাথে?
এবার সঠিক প্রশ্ন চলে এসেছে। নিবৃতা চোখ নামিয়ে ছোট করে বললো,
– না।
তাবিব কি ভুল কিছু শুনলো? হতবাক হয়ে বললো,
– না মানে? কি বলছো?
– একা এসেছি আমি।
অপরাধীর দু’চোখ সংকোচের দরুন গাট হয়ে বন্ধ হয়ে এসেছে। তাবিব কিয়ৎক্ষণ চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকলো সেখানে। তবে উত্তেজিত না হয়ে নরম স্বরে বললো,
– ভয় লাগে নি?
নিবৃতা সাহস পেলো। প্রফুল্ল চিত্তে গোল গোল চোখে তাকালো যেন সে নিজের এই বড় কীর্তিতে ভীষন গর্বিত।
– সামান্য লেগেছে। কিন্তু আপনি তো আমায় সবসময় সবকিছু শিখিয়ে দেন। সেটাই ঠিকমতো কাজে লাগিয়েছি এবার। আমরা না কতোবার বিদেশ গেলাম! তাই প্লেনে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসা তেমন গুরুতর কিছুই মনে হয় নি আমার।
যেন অতি সাধারণ ডাল ভাত তার কাছে। নিবৃতার কন্ঠস্বর এরকমটাই শোনালো। নিবৃতাকে একা ছাড়ার জন্য নিভানের প্রতি সামান্য ক্ষোভ কাজ করলেও ওর এই সাহস তাবিবকে সত্যিই পুলকিত করলো। তাবিব সাথে না থাকলেও নিবৃতা এখন সামলাতে জানে। ও মিষ্টি হেসে নিবৃতার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিলো। বোঝালো যে, সে খুশি হয়েছে। নিবৃতা চমৎকার করে হাসলো, যা একদম ওর নেত্র যুগলের তারায় খেলে গেলো! সে কি নয়নাভিরাম দৃশ্য! তাবিব আর কিচ্ছুটি বলতে পারলো না। বিনা শাসনে, উল্টো পরাজিত হয়ে চলে গেলো পানি আনতে।
– লাগেজ….
তাবিবকে শেষ না করতে দিয়ে নিবৃতা দ্রুত বললো,
– দারোয়ান ভাইয়া তুলে দিয়ে গিয়েছেন।
তাবিবের নাখোশ হওয়ার উপায় নেই। অভিযোগ করারও অবাকাশ দিলো না! ও ঠোঁট চেপে হাসলো। নিবৃতার পাশে বসে গ্লাস এগিয়ে দিলো। এতো গরম তারউপর সিঁড়ি বেয়ে উঠে সত্যিই পিপাসা পেয়েছে ওর। ঝটপট পুরো গ্লাস শেষ করলো। তাবিবের মায়া হলো। আহ্লাদী স্বরে বললো,
– আরেকটু আনবো?
নিবৃতা মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। ও একটু স্থীর হতেই এবার তাবিবের জহুরি দৃষ্টির শিকার হলো। কয়েক মুহুর্ত গড়ালো তবে তাবিব চোখ সরালো না ঐ নাজুক মুখ থেকে। শীর্ণকায় মুখটাতে এখন প্রাণের স্পন্দন এসেছে। শুকনো গাল দুটো সামান্য ভরাট হয়েছে ইদানীং। দেখতে যে কি আদুরে লাগে! তাবিবের হাত উঠে গেলো সেথায়। আবির মাখা ফুলো ফুলো গালে আঙুল বুলাতে লাগলো বড্ড আমোদে।
– মিসেস তানজীব কেমন আছে?
মদিরা কন্ঠ তার! কেমন ঘোর জাগানিয়া। নিবৃতা মিইয়ে গেলো তবে ভড়কালো না। প্রসন্ন চোখে তাকিয়ে বললো,
– এখন ভালো আছে।
তাবিবের ভ্রু নাচিয়ে চাইলো।
– এখন?
সে প্রশ্নের উত্তর নেই। আছে শুধু লাজুকতায় ঘেরা আরক্তিম কোপল জোড়া। তাবিবের মনে যদি কখনো ক্ষীনকায় পরিমানও না পাওয়ার আফসোস জমে থাকে তাহলে আজ, নিবৃতার এই অনাকাঙ্ক্ষিত কর্ম তারও নিষ্পত্তি ঘটিয়ে ছেড়েছে। প্রাপ্তিতে কোমল মনে প্রেম ছলকে উঠে। আলতো হাতে বক্ষস্থলে আগলে নিলো স্ত্রীকে। উষ্ণ গালে অনবরত ওষ্ঠের গাঢ় শীতল স্পর্শ দিতে দিতে বলে,
– একটু বেশিই আদুরে হয়ে যাচ্ছেন না আপনি?
হাতে গোনা কয়েকবারই তাকে শব্দ করে হাসতে শোনা যায়। তাবিবের হয়তো সেগুলোর প্রত্যেকটাই স্মৃতিতে ধারন করা আছে। আর আজ সেই তালিকায় এই মুহুর্তটিও যোগ হলো। হাসির দরুন ঝকমকে মুক্ত দানার ন্যায় পেলব ওষ্ঠপুট ছাপিয়ে সফেদ দন্তের ঝলকানি দেখা যায়। মায়াময় সরল মুখের ঐশ্বর্য যেন কয়েকগুন বৃদ্ধি পেলো তাতে। তাবিব নিবৃতা, দু’জন নির্ঝঞ্ঝাট মানুষের মাঝে এরকমভাবেই মিষ্টি মুহুর্তগুলো নিজেদের জায়গা করে নেয়।
– আর আমার বাবা’টা? মা কি তার যত্ন ঠিকঠাকভাবে নিয়েছে?
চার মাস গর্ভকালীন সময়। সামান্য স্ফীত উদর। সেখানে পিতার আদরমাখা ছোঁয়া।
– নিয়েছে হয়তো কিন্তু এখন আর সে পারবে না ওসব। সত্যি বলতে, সে আসলে পারেই না!
নিবৃতা ঝটপট উত্তর দিয়ে সেখানেই কাত হয়ে শুয়ে পরলো। এসব সে খুব একটা বোঝে না৷ তাবিবই সব বলে কয়ে করায় ওকে দিয়ে এবং বাদবাকি যা সম্ভব হয় সব স্বীয় হাতে করে দেয়। নিবৃতা যতটুকুই সাহস জুগাক, শেষে গিয়ে মনে হয় ওর দ্বারা কোন না কোন একটা ভুল হয়েই যাবে। দ্বিধাদ্বন্দে থাকে মন। তানহা ওকে ঠিক যতটা সাহস জুগিয়েছে, এই অনগাতের ক্ষেত্রে ততটাই নিজেকে ভীতু হিসেবে পেয়েছে ও।
তাবিব ওকে আশ্বস্ত করার জন্য কিছু বলবে তার পূর্বেই ওর মুঠো ফোনটি বেজে ওঠে। স্ক্রিনে মেয়ের নাম ভাসছে। ভিডিও কলটি রিসিভ করতেই তানহার রণমুর্তি ধারন করা রূপের মোকাবেলা করতে হলো তাবিবকে।
– বাবা তোমার বৌ কোথায়? বাসায় পৌছেছে সে?
তাবিব হোঁচট খেলো। নিবৃতাকে তো তানহা কখনো এভাবে সম্বোধন করে না৷ মুখ ফুটে কথা বলার আগে খেয়াল করে মেয়ের পেছনে তার শাশুড়ীও চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছেন। ও ক্ষীণ হাসার চেষ্টা করে বললো,
– হ্যা। কিন্তু কি…..
তাবিবের মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে তানহা ফের রাগান্বিত স্বরে বললো,
– তোমার বৌকে বলবে আমার সাথে যেন আর কখনো কথা না বলে। কল টল দিলে কিন্তু আমি একদম ধরবো না।
তাবিব অবুঝ চোখে নিবৃতার দিকে তাকাতেই দেখে সে কুণ্ঠিত হয়ে মাথা নত করে, আঙুল দিয়ে বিছানার চাদর খুঁটছে। ও দৃষ্টি সরিয়ে গুরুতর ভঙ্গিতে বলে,
– কি হয়েছে সেটা তো বলবে আগে?
তানহা হতবাক হয়ে বললো,
– তোমার বৌ বাসায় চলে গিয়েছে এটাই বা কম কিসের?
– হ্যাঁ, সে তো কোথাও একা যাওয়া আসা করে না। আমিও নাখোশ হয়েছি এতে। কিন্তু আমি নাহয় জানতাম না এ বিষয়ে কিন্তু তোমরা? কিভাবে একা আসতে দিলে তাকে?
তানহা এক পল থমকে তাকিয়ে থেকে পরপর আরও উচ্চ গলায় বলে,
– বাহ কি উন্নতি! উনি বলেন নি তোমাকে যে আমাদের না জানিয়ে এই কাজ করা হয়েছে?
তাবিব বিস্ময়ের অন্তিম চূড়ায়। অবাক গলায় বলে,
– জ্বীহ?
– আমরা কেউ কিছুই জানি না। আমি কলেজে গিয়েছিলাম প্রোজেক্ট এর কাজের জন্য। মামারা বাসায় নেই। নানুমনি রান্না শেষে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পরেছিলেন। এর মধ্যে সে কাওকে কিছু না বলে পালিয়ে এসেছে। আমার মোবাইলে শুধু একটা ম্যাসেজ দিয়ে গেছে যেটা একটু আগেই দেখলাম আমি। চিন্তা করো অবস্থা! নানুমনি তো চিন্তায় শেষ। তোমাকে কল করবেন, ভয়ে সেটাও পারছিলেন না।
তাবিব শুনছে আর শুনছে। বলার মতো যৌক্তিক কোন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। তানহা ফের বলে,
– তোমার বৌ সুস্থ আছে তো? ভাই এলে ওকে আমি আমার কাছে নিয়ে আসবো। তোমার বৌকে তুমিই রাখো। স্বামীকে রেখে মেয়েকে আর ভালো লাগে না এখন, তাইতো না বলে চলে আসলো!
তাবিব কোনমতে বললো,
– হ্যাঁ, তোমার আম্মু ঠিক আছে।
তানহা আর কিচ্ছু বললো না। খট করে কলটা কেটে দিলো। তাবিব মোবাইল হাতে নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকায় তার বিব্রত স্ত্রীর দিকে! আস্তেধীরে বলে,
– কেন করলে এমন?
নিবৃতার মিনমিনে স্বর ভেসে আসে সময় নিয়ে,
– বললে তো তারা আমাকে কখনোই আসতে দিতো না। জোর করে হলেও রেখে দিতো।
তাই বলে এরূপ বাচ্চামি? তাবিব অসন্তোষ প্রকাশ করতে গিয়েও পারলো না। শিশুসুলভ আচরন করার সুযোগই বা সে পেয়েছে কখন? তাই আজ নাহয় একটু অবাধ্য হোক। দোষ কি তাতে?
– ঝিলমিল অনেক রেগে আছে আমার সাথে।
নিবৃতার দুঃখী স্বরে তাবিব হাসলো।
– একটু পর রাগ ঠান্ডা হবে। তখন কল করো। ও কি তোমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারে?
নিবৃতা সুবোধ বালিকার ন্যায় মাথা নাড়ালো। অথচ তাবিব তখনও এক মোহাচ্ছন্নে আবদ্ধ। এগিয়ে গিয়ে শুয়ে পরলো ওর পাশে। ললিত হস্তে, স্ত্রীকে আগলে নিলো নিজের সাথে। কি যে অপার শান্তি এই সান্নিধ্যে! আরামে দু’চোখ বুঁজে বললো,
– কার যেন এ বাসায় ভালো লাগছিলো না?
নিবৃতা প্রতিবাদ করে উঠলো সহসা!
– বাসার সমস্যা তো না। আমার স্বাস্থ্যের সমস্যা। তাই একটু দমবন্ধ লাগছিলো। আর কিছু না।
তাবিব হাসে। আলিঙ্গনের প্রগাঢ়তা বৃদ্ধি করে বললো,
– কার জন্য এতো পাগলামি করলে নিবেদিতা?
এহেন প্রশ্নে, নিবৃতা অক্ষিপল্লব নামিয়ে হাসে শুধু। তাবিব জানে এখন কোন শাব্দিক উত্তর সে পাবে না। ওকে নিজের মতো করেই তার নিবেদিতাকে পড়ে নিতে হবে। অনুভব করে নিতে হবে তার অপ্রকাশিত সকল অনুভূতি।
– আমার জন্য। কিন্তু কেন? কি আছে এই আমিটার মাঝে? কোন বিশেষত্ব নেই। আর দেখো, এখন তো এই চুলেও পাঁক ধরা শুরু হয়ে গিয়েছে। বয়স হচ্ছে যে!
কথাটি শেষ করেই তাবিব মাথাটা এগিয়ে দেয় নিচে। নিবৃতা চোখ তুলে দেখে সেখানটায়। পরপর, তাবিব নিজেকে তুচ্ছ করে মাত্রই যা বললো, সেটিকে সম্পূর্ণ না শোনার মতোই উপেক্ষা করে তাবিবের কানের কাছে উপরের অংশে হাত রাখলো। ওখানে সত্যি সত্যিই কয়েকটা চুল সাদা হতে শুরু করেছে। ওর দৃষ্টিতে তখন বিস্ময়ের পাশাপাশি স্পষ্ট মুগ্ধতা নেমে এলো। মুচকি হেসে বলে,
– অনেক সুন্দর তো!
কন্ঠের গভীরতা এমন যেন বিশ্বের কোন অপার সৌন্দর্যের সাক্ষী হলো সে। তাবিব আর কিছু বলে না। চুপ করে রয়। এই সত্য, সারল্য ও সাধারনতায় ঘিরে থাকা তাদের এই ছোট্ট অসাধারণ সংসারের আরেকটি সুখময় ক্ষণ উপভোগ করতে থাকে।
পড়ন্ত বিকেল। হালকা সোনালী রঙা গগন। সারাদিন গ্রীষ্মের দাবদাহ শেষে এখন সূর্য বিদায়ের অন্তিম প্রহরে, মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। খোলা বারান্দায় ঝুলতে থাকা পর্দাগুলো বেসামাল উড়োউড়িতে ব্যস্ত। উচ্চ গতিতে বৈদ্যুতিক পাখা ঘোরার আওয়াজ ছাড়া দ্বিতীয় কোন শব্দ নেই ঘরটিতে। বিগত কয়েকদিন, নিবৃতার বিরহে তাবিবের ভালো ঘুম হয় নি। তাই তো যখন অবশেষে আজ একত্র হয়ে দুজন টুকটাক কথাবার্তায় মশগুল ছিলো, তখনই ধীরে ধীরে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় তাবিব। আপন প্রশান্তির উৎসকে কাছে পেয়ে মনটা ওর ভীষন ভালো। আর নিবৃতা? ওর চোখে কোন ক্লান্তি নেই। সে তো ওর কোমড় জড়িয়ে নিদ্রায় ডুবে থাকা একান্ত পুরুষটিকে দেখতে ব্যস্ত। যাকে সাথে না পেয়ে গোটা এক সপ্তাহ মনে মনে ভীষন ছটফট করেছে ও। যার অনুপস্থিতিতে বুকের মাঝে অস্থির অস্থির লেগেছে। তারই কাছে আসার জন্য আজ অকল্পনীয় এক দুঃসাহসিক কাজ করে বসেছে। এতোকিছুর পরও সে হয়তো কখনও তাবিবের সম্মুখে স্বীকার করতে পারবে না এসব। ভয় হয়! যদি নিজেকে যথাযথভাবে প্রকাশ করতে না পারে? যদি ভুল কিছু বলে ফেলে? তারচেয়ে ভালো, মানুষটা ওকে নিজের মতো করে বুঝে নিক।
নিবৃতার নরম হাত জোড়ার বিচরন ঘটছে প্রিয় মানুষটার ঝরঝরে চুলের ভাজে। মাঝখানে কিছু কিছু সাদাটে কেশও চোখে পরছে। নিবৃতা গভীর নিবেশনে তাকিয়ে দেখে। ওর ঘোর কাটে না। পছন্দের মানুষের সাথে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেওয়ার মুনাফা বোধহয় এগুলোই! এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো তো তাদের একসাথেই দেখার কথা!
– আপনি আমার পরম বিশ্বাসের জায়গা। আমার আপন নীড়। আপনি না থাকলে যে মোটেও শান্তি মিলে না এখন আর। মাথার উপর এই শক্ত হাতের নরম ছোঁয়া না পেলে আমি স্বস্তি পাই না। পরিবারের সবাই আমাকে কতো ভালোবাসে, আদর করে কিন্তু সেগুলোও একটা সময় ফিকে লাগে একজনের অনুপস্থিতিতে! কারণ আপনার দু’হাত থেকে পাওয়া যত্নের লোভ যে আমার কমে না৷ আপনার মতো কেউ নয়! এরপর থেকে, আপনাকে ছাড়া একা একা আর কোথাও যাচ্ছি না আমি।
নীরবতার মাঝে নিবৃতার মিহি কন্ঠের স্বগোতক্তি। অন্যজন চৈতন্যে নেই, সে ভরসায় আপন মনে বলে চলেছে লুকায়িত কত-শত কথা। ব্যক্ত করছে এলোমেলো, অগোছালো সব অনুভূতি। অথচ একটি বারের জন্যও সে খেয়াল করলো না যে, ওর কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে থাকা স্থীর মানবটির চিকন ঠোঁটের কিনারায়, কখন যেন প্রসন্নতার এক চিলতে রেখা ভেসে উঠেছে।
নিবৃতা শেষ পর্ব
এভাবেই সময় গড়ায়। বাহিরে বাতাসের বল বেড়েই চলতে থাকে যার দাপটে হঠাৎ করেই টেবিলে থাকা ডায়েরির পাতাগুলো একসময় স্বাধীনভাবে উড়তে শুরু করে। হয়তো সেথায় জড়ো হওয়া কারো মনের একান্ত গোপন তথ্যগুলো এবার মুক্ত হতে চায়। পৌঁছতে চায় বিশেষ একজনের কাছে!
সমাপ্ত
