নিবৃতা শেষ পর্ব
নেহার ছায়ালিপি
– তোমাদের অল্প বয়সের আবেগে ডুবে করা ভুল এবং সেজন্য সৃষ্টি হওয়া বিরূপ পরিস্থিতি আমার জেদকে এতেটাই বাড়িয়ে দিয়েছিলো যে, সেটা এক গোটা সম্পর্ক আর পরিবার শেষ করে তবেই দম নিয়েছিলো।
জাকির সরোয়ারকে বড্ড ব্যাথিত দেখালো কথা গুলো বলায়। চোখে মুখে তার তীব্র অনুশোচনা বোধ। আঁখি অনতি দূরেই কাউচে বসে শুনছিল তার কথাগুলো। আর তাবিব তখনও স্ত্রীর এক হাত শক্ত করে পূর্বের স্থানেই অটল হয়ে দাঁড়িয়ে। মুখের আদোল কঠোর এবং অসন্তোষে ঘেরা।
– ছোটদের কাজই হচ্ছে ভুল করা এবং বড়দের দায়িত্ব তাদের শুধরে দেওয়া এবং সেই ভুলে ঘটা সমস্যা থেকে তাদের উদ্ধার করা। কিন্তু আমি সেরকম কিছুই করতে পারি নি। উল্টো তাবিবকে ঘরছাড়া করেছিলাম। আমার খেয়ালে রাখা উচিত ছিল যে, দীর্ঘদিন যাবত পাওয়া অবহেলা ও অনাচারের আমার ছেলে মনে মনে ভীষন কষ্ট পেয়েছে। তাই যখন আমি ওকে বেরিয়ে যেতে বললাম, ও থেকে যাওয়ার জন্য তখন আর কোন পিছুটান অনুভব করেনি।
পৌর মানুষটার কথা বলতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে। কন্ঠে স্পষ্ট ক্লান্তি। নিবৃতা আস্তে করে মেয়ের কাঁধে হাত রাখলো। মায়ের ইশারা বুঝে তানহা ছুটে গেলো দাদার পাশে। বেড সাইড টেবিল থেকে পানি ভর্তি করে গ্লাস তুলে দিলো তার নিকট। জাকির হাসলেন নাতনীর সেবা পেয়ে। প্রকম্পিত হাতে কিছুটা পানি পান করেই হাঁপিয়ে উঠলেন।
– আঙ্কেল আপনি অসুস্থ। আজ নাহয় এসব থাক।
আঁখির এসব পুরোনো কথা ভালো লাগছিলো না। সে বরাবরই অনুভূতি প্রবণ কথাবার্তা এড়িয়ে যায়। এগুলো ওকে অস্বস্তিতে ফেলে। জাকির নাকচ করো বললেন,
– অসুস্থ দেখেই তো বলতে হবে। কবে নিঃশ্বাস ফুরিয়ে যায়! তাহলে তো মনের কথা মনেই থেকে যাবে।
হুল ফোঁটার ন্যায় তাবিবের বক্ষে আঘাত হানলো কথাটি। ও মুখ ফিরিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো।
– তরী মারা যাওয়ার পর আমি আমার বড় দুই সন্তানদের চরম অবহেলা করেছি, ওদের নিজ হাতে খেয়াল রাখি নি, আদর যত্ন দেই নি। বিশেষ করে তাবিবকে যেভাবে হেয় করেছি, সেই সত্য স্বীকার করতে এখন আর কোন লজ্জা নেই আমার। দু’দিন পর মারাই যাবো। দোষ ত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিলে বরঞ্চ লাভটা আমারই। তাবিব যখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো তখনও টনক নড়েনি আমার। আমি আমার দম্ভে তখনও অটল। নিজের ভুলটা যে ঠিক কোথায় ছিল সেটা দেখতে না পাওয়ার মতো দর্পে ডুবে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। অথচ আমার উচিত ছিল মৃত স্ত্রীর আমানত, আমাদের সন্তানদের বুকে আগলে রাখার। আমি ব্যর্থ হয়েছি। জীবিত কিংবা মৃত, কোন অবস্থাতেই হয়তো তরী শান্তি পায় নি আমার থেকে।
জাকিরের কন্ঠ রোধ হয়ে আসছে। বাবাকে আজ প্রথম বারের মতো নিজের ভুল স্বীকার করতে দেখে তাওশি তাচ্ছিল্য হাসলো৷ মৃত্যু নিকটবর্তী না হলে এ মানুষটা যে এখনও ভালো হতো না সে ওর খুব ভালো মতোই জানা আছে।
– আমি যদি তাবিবকে আশ্রয় দিতাম, তোমাদের পাশে দাঁড়াতাম তাহলে হয়তো ওতো অল্প সময়ে তোমাদের সংসার ভেঙে যেতো না। এতো ভোগান্তি পোহাতে হতো না। আমার নাতনীটারও ওরকম ছোটবেলা থেকেই টানাপোড়েনের জীবন কাটাতে হতো না। ভাঙা সংসারের স্বাদ যে ঠিক কতটা তিক্ত একটা বাচ্চার জন্য সেটা এখন আমি বুঝি। আমার চোখে ভাসে অনেক আগের কথা। অফিস শেষে বাড়ি ফিরতাম। পরিবারের সবাই একসাথে থেকে আনন্দ করছে, আর আমার তাবিবটা ঘরের এক কোনায় গোমড়ামুখে বসে আছে। আমি তখন ওকে বকতাম! কেন সে সবার সাথে বসে না, কেন সবাইকে হিংসে করে দূরে দূরে থাকে, অথচ আমি বুঝি নি যে ওকে কেউ সে পরিমাণ আপন অনুভবই করায় নি, যার বলে ও সবার কাছে আসতে পারতো! ওর সাথে তো পরের মতো আচরণ করা হতো।
অতীতের সেই বিষাক্ত স্মৃতিচারণ হতেই তাবিবের দু চোখ বুঁজে এলো। আজ কেন সব দুঃখগুলো বারে বারে ফিরে আসছে?
– বাবা, পরিবার ও স্বচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও তাবিবকে জীবনে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে। তোমাদের সংসার ভেঙেছে, আমার নাতনীকে পরিবার বিহীন বড় হতে হয়েছে। এসবই আমার ভুলের কারনে। যা হয়েছে তাতো আর বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু এই অস্থির মনকে একটু শান্ত করার জন্য, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইছি আমি। তাবিব, আঁখি, তানহা সবাই আমাকে দয়া করে ক্ষমা করে দিও। এই বুড়োর উপর কোন মান রেখো না।
জাকিরের গলা ভেঙে এসেছে। কাতর চোখ যুগল থেকে অবিরামে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। তানহা দাদার দু-হাত শক্ত করে ধরলো। সৈকত গিয়ে বাবাকে এক পাশ থেকে আগলে নিলো। আঁখিও উৎকন্ঠায় এগিয়ে এলো দ্রুত। অথচ এসবে তাওশি তখন বেশ বিরক্ত! এসব আদিখ্যেতা ওর কাছে অভিনয়ই ঠেকছে। বাবা এবং মা, এই দু’জন মানুষকে খুব ভালো করেই চেনে সে। প্রচন্ড স্বার্থান্বেষী তারা! এদিকে তাবিব তখনও দৃঢ় পায়ে ওর অবস্থানে দাঁড়িয়ে। নিবৃতা দুর্বল হাতে তাবিবকে খামচে ধরলো। আকুতি নিয়ে তাকিয়ে বোঝালো তার এগিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু তাবিব প্রথমবারের মতো স্ত্রীর ইচ্ছেকে অগ্রাহ্য করলো। গেলো না বাবা নামক মানুষটাকে আশ্বস্ত করতে। তার কিছু অশ্রু বিন্দুর চাইতে তাবিবের কাছে ওর জীবন সমরে ব্যয় করা ঘাম কণার মূল্য বেশি ঠেকলো! আর মনে পরলো সেই কোমলমতির দুঃখে ভরা নেত্রদ্বয়। কি অসহায় ছিল সে! কোমল মনের তাবিব পারলো না তাকে মন থেকে ক্ষমা করতে। শুধুমাত্র পিতা পুত্রের সংঘাতের বিষয় হলে তাবিব হয়তো অনেক আগেই সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতো! জন্মদাতার উপর মান জমিয়ে রাখার মতো শক্ত হৃদয়ের ও নয়! ওর বাবাকে ক্ষমা চাওয়ার মতো অপারগ অবস্থানে আসতে দিতো না। কিন্তু সবটা তো এখানে তাবিব কেন্দ্রিক নয়!
– তাবিব আর আমি দু’জনেই নিজ নিজ জীবনে এগিয়ে গিয়েছি আঙ্কেল এবং ভালোও আছি। পাস্ট ইজ পাস্ট। আমার মনে কোন তিক্ততা নেই। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।
আঁখি নিজের ভাগটা পরিষ্কার করে ব্যক্ত করে দিলো। ওর মনে এতো কুটিলতা নেই। জাকির কৃতজ্ঞতায় মাথা নাড়িয়ে ছেলের দিকে তাকালেন অথচ তাবিব তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। সবাই হতাশ হতেই, খানিক বাদে ওর দৃপ্ত কন্ঠস্বর শোনা গেলো।
– আপনার হয়তো নিজ অতীত জীবন নিয়ে আফসোস থাকতে পারে কিন্তু আমার নেই। আমি আমার জীবন নিয়ে তুষ্ট কারন আমি কখনো কারও সাথে অন্যায় অবিচার করি নি৷ কোন কর্মের জন্য অনুশোচনা হোক সেরকম কিছুও করি নি। আমার প্রথম বিয়ে টিকে নি সেটা ভাগ্যে ছিল বলে। তবে এতে আমার কোন মনোকষ্ট নেই। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে জীবনের লড়াইতে এগিয়ে গিয়েছি। সেই ব্যর্থ সম্পর্ক আমার জন্য এক শিক্ষা ছিল। এতে আমি কাওকে দোষারোপ করি না। বর্তমান জীবনে আমি সর্বোচ্চ সুখী এবং এতোটাই পরিতৃপ্ত যে পেছনে ঘুরে তাকানোর ইচ্ছেও আমার নেই। তাই বলছি, আপনি দায়মুক্ত থাকতে পারেন।
কোন নমনীয়তা ছিল না সেথায়। হাতে গোনা কিছু কঠোর শব্দে তাবিব তার অবস্থান জানিয়ে দিলো। কিন্তু জাকিরের এতে ক্লান্তি আরও বাড়লো। ভগ্ন গলা বললেন,
– তোমার কাছে আমি আরও অনেক বিষয়ে দোষী বাবা।
– সন্তান হিসেবে এক পিতার উপর কোন আক্রোশ জমা রাখতে চাই না। কিন্তু আমি মায়ের ছেলে হয়ে, তার প্রতি অবিচার করা মেরুদণ্ডহীন স্বামীকে ঘৃণা করা অবশ্যই আমার কর্তব্য। আমার আদর্শ স্নেহময়ী মায়ের উপর ব্যর্থ, অযোগ্য পিতাকে জায়গা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের শেখানো হয়েছে, বাবার আগে তিন তিনবার মায়ের উল্লেখ রয়েছে।
তাবিবের বজ্র নিনাদী স্বর উপস্থিত সকলকে কাঁপিয়ে তুললো যেন! ওর জ্বলন্ত লালচে চোখ দেখলে যে কেও চুপসে যেতে বাধ্য। তবুও জাকির থামলেন না।
– আমি জানি আমি তরীর সাথে অনেক অন্যায় করেছি কিন্তু…..
– আমার মায়ের নাম নিবেন না আপনি। জীবিত থাকা অবস্থায় যখন তিনি আপনার কাছে অদৃশ্য প্রায় ছিলেন, তাহলে আজ মৃত অবস্থায় অন্তত তাকে স্মরণ করার প্রয়োজন নেই। আপনাকে ক্ষমা করলে, আমার মাকে অসম্মান করা হবে।
জাকিরের মাথা নত হয়ে এলো। তাবিব দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বললো,
– জাকির সরোয়ারের ছেলে হয়ে আপনার প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার, সব আজ অতীত। তবে তরী আহসানের সন্তান হয়ে আমি আপনাকে তীব্র ঘৃণা করি।
বাবা মা উভয়ের সন্তান হিসেবে তাবিবের পক্ষে যতটুকু সম্ভব ছিল ও করেছে। জাকির সরোয়ারের প্রতি অভিযোগ না রেখেও বুক ভরা কষ্টের ভার ঠিকই রেখে দিয়েছে। ঘরে উপস্থিত কেউ আর কিচ্ছুটি বলতে পারলো না। এক অদ্ভুত স্থবিরতা নেমে এলো ধুপ করে। শুধু থেমে থেমে জাকিরের বড় বড় শ্বাসের ব্যাথাতুর শব্দ কানে এলো।
– তুমি তো অনেক সুন্দর! চোখ ফেরানো দায়!
তাওশি অবাক কন্ঠে বলে উঠতেই নিবৃতা কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলো। গাল দুটো ঈষৎ লালচে হয়ে আসতেই তাওশির মুখটা সহসা আশ্চর্যে ছেয়ে গেলো! কেউ এতো সুন্দরও হয় বুঝি?
আঁখি বিদায় নিয়েছে বেশ আগেই। কিন্ত এতোকিছুর পর তাওশি প্রস্থানের সিদ্ধান্ত আপাতত উহ্য রেখে একটু থেকে যাওয়ার মতলবে বসেছে, সাথে নিবৃতাকে নিয়ে এসেছে নিজের কক্ষে। সে পেশায় একজন আর্কিটেক্ট। বয়স ত্রিশ পেরোলেও এখনো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় নি সে। এবং সবচেয়ে অবাক করা বিষয় সে এখানে থাকেও না। বছরে দু একবার ছাড়া এখানে আসেও না সে। নিজের পরিবারের প্রতি কোন অনুভূতি কাজ করে না ওর। কিছুটা বড় হওয়ার পর যখন তার বাবা মায়ের বিয়ের সত্যটা জানতে পেরেছে, তখন থেকেই তাদের প্রতি প্রবল অনীহা কাজ করে ওর। কোন বিশেষ টান কিংবা মায়া মহব্বত আসে না মন থেকে। মানুষ হিসেবে তাদের খুবই অপছন্দ করে। তাইতো রুচিতে না কুলোনোর কারণে নিজের সার্মথ্য হতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরেছে। বাবা, ভাইরা মিলে কতো চেষ্টা করলো ওকে এ পথে ফেরানোর কিন্তু সব প্রচেষ্টাই গুড়ে বালি। সীমাহীন জেদের অধিকারী এ মেয়েকে কোনভাবেই বাগে আনা সম্ভব হয় নি৷
– আপনিও খুব সুন্দর আপু!
নিবৃতা স্মিত হেসে বলতেই মুখ কুঁচকালো তাওশি। নাকের উপর নেমে আসা চশমাকে উপরের দিকে ঠেলে দিয়ে, নিজের সরাসরি থাকা সম্মুখ ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ও তাকালো। উদ্ভাসিত হলো শ্যাম রাঙা একটি গোলাকৃতির মুখশ্রী। নিজের মাঝে কখনোই তেমন কোন বিশেষত্ব খুঁজে পায় না তাওশি। তাই হাত নাড়িয়ে তুচ্ছ করে বললো,
– কি যে বলো না! সবসময় মানুষকে খুশি করতে নেই।
– আপনি আমার ঝিলমিলের মতোই মায়াবী দেখতে।
নিবৃতার নির্মল হাসি দেখে তাওশি আর বিরোধ করলো না। মেয়েটাকে বড্ড সরল সোজা মনে হচ্ছে। অযথা কথা না বাড়িয়ে তাওশির চুপ থাকাই শ্রেয়।
– তোমাকে দেখে গলে গিয়েই তো তাবিব ভাইয়া এতো বছর পর আবার বিয়ে করেছেন।
– বিষয়ট তেমন না। বিয়েটা মূলত ঝিলমিলের জন্যই হয়েছিল।
তাওশি ভ্রু কুঁচকে চাইতেই নিবৃতা সংক্ষেপে সবটা বলার চেষ্টা করলো। সব শুনে তাওশির মুখটা গম্ভীর করে বললো,
– বুঝলে নিবৃতা, সব বিয়েই একটা সেটেলমেন্ট। প্রয়োজন আর কি। আর এই প্রয়োজন ফুরোলে বিয়েটাও শেষ। যেমন, আমার বাবা তাবিব ভাইয়ার মাকে ছেড়ে আমার মা’কে বিয়ে করেছিল। আবার যেমন তাবিব ভাইয়া আর আঁখির ডিভোর্স হয়েছিল। এজন্যই তো বিয়ে করি না আমি। আমাদের রক্তেই সেপেরশন। বিয়ে করলে জীবন আরও অন্ধকার হয়ে যাবে। তাই এতো ঝামেলা পোহানোর কোন প্রয়োজনই দেখি না আমি!
তাওশির কন্ঠে বিরক্তি। নিবৃতা আগ বাড়িয়ে বললো,
– তানহার বাবা তো ইচ্ছে করে উনাকে ছাড়েন নি।
– আরেহ তাতে কি! পারলে থাকার চেষ্টা করতেই পারতেন কিন্তু করেন নি। এদের এক বিয়েতে হয়ই না!
– তানহার বাবা ওমন নয়। উনি চমৎকার একজন মানুষ। ঠিক সেভাবেই সব খারাপের মাঝে ভালোও আছে। আপনি নিরাশ হবেন না।
তাওশি হেসে উঠলো নিবৃতার কথায়।
– আবেগের বয়সেই কাওকে ভালো লাগে নি, এসবের শখ জাগে নি আর এখন তো আমার বিবেকের বয়স। সবকিছু মাথা খাটিয়ে ভেবে চিন্তে করি। মনকে প্রশ্রয় দেওয়ার অবকাশই নেই।
নিবৃতা সব না বুঝলেও আসল অর্থ ঠিকই উদ্ধারে সক্ষম হলো।
– আপনি কি তানহার বাবার থেকে বয়সে বড়?
তাওশি অবাক হয়ে বললো,
– বড় কেন হবো? পাঁচ বছরের ছোট!
– তানহার বাবা তো আমাকে খুব ভালোবাসেন। আদর, যত্নে রাখেন। তাহলে আপনি কেন পারবেন না?
নিবৃতার সরল স্বীকারোক্তিতে তাওশি কেশে উঠলো হঠাৎ। হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো শুধু। অথচ নিবৃতা ওর এভাবে তাকানোর কারনটাই বুঝলো না। বোকা মুখ করে বসে রইলো।
সালমা খাবারের আয়োজন করলেও তাবিব কোন আগ্রহ দেখায় নি সেথায়। খাওয়া দাওয়ার মতো ঘনিষ্ঠ বিষয় অথচ রাধুনি তেঁতো মনে করেছে, তাহলে সেটা কতটুকুই বা গ্রহনযোগ্য? বিকেল বেলায় এসেছিল ওরা আর এখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামছে। ভাইয়ের সাথে সামান্য আড্ডা ও বাবার সাথে টুকটাক আলাপেই সময় ফুরিয়ে এসেছে। যখন নিবৃতা ও তানহা সমেত তাওশি নেমে এলো তখন তাবিব বেরিয়ে পরার তাড়া দেখালো।
এতোদিন যাবত, চার দেওয়ালে আবদ্ধ থেকে একই বিছানায় ঘুরপাক খেতে খেতে জাকির অতিষ্ঠ হয়ে পরেছিলেন। তাই এই সুযোগে একটু নিচে এসে সকলের সাথে বসেছিলেন। তাবিবকে ত্রস্ত দেখতেই উদাস গলায় বললেন,
– আজ থেকে যাও। তোমার মা রান্নাবান্না করেছে তো।
– মা’য়ের মন নিয়ে রাঁধলে অবশ্যই খেতাম। কিন্তু এখন উঠতে হবে। দেরী হয়ে যাচ্ছে।
জাকিরের মুখে ঘন আঁধার নামলো৷ কিন্তু আসল উদ্দেশ্য তখনও বাকি ছিল, তাই ওদের থামিয়ে দিয়ে ফের বললেন,
– একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল। সেটা শুনে নাও আগে।
– জ্বি বলুন।
জাকির ঘাড় বাঁকিয়ে নিবৃতার দিকে চাইলেন।
– বসো বৌমা। আর একটু আগের জন্য আমি দুঃখিত। আমার জানা ছিলো না যে তাবিব আবার সংসার গুছিয়েছে। নাহলে আমি আঁখিকে ডেকে তোমাকে বিব্রত করতাম না।
– আমি কিছু মনে করি নি আঙ্কেল।
নিবৃতার ভদ্র জবাব। জাকির হতাশায় মাথা নাড়ান। ছেলের মতো তার স্ত্রীও তাকে বাবার মর্যাদা দিলো না। অথচ তাবিব জানে নিবৃতার মনে কোন কলুষতা ছিল না। তাবিব ওকে শিখিয়ে দিলে ও ঠিকই ‘বাবা বলে ডাকতো।
– এসব ব্যবসায়িক কার্যক্রম আমার একার পক্ষে আর সামলে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। সাব্বির অবশ্য অনেক আগ থেকেই সাহায্য করে। আর অসুস্থ হওয়ার পর ইদানীং সৈকতও দেখছে। কিন্তু তুমি তো আমার বড় ছেলে। তোমার হক সবার আগে। আমি চাচ্ছিলাম তোমার প্রাপ্যটা তোমায় বুঝিয়ে দিতে।
সালমা খানিকটা দূরে ডাইনিং টেবিলে বসেছিলেন। এখান থেকে সবটাই শোনা যাচ্ছে। সম্পত্তির কথা উঠতেই উনার মনটা তার বিষিয়ে উঠলো সহসা।
– আমি কোন দাবি রাখতে চাই না।
– দাবি কিসের? এটা তো তোমার অধিকার!
– যে অধিকার প্রয়োজনে খাটানো যায় না সেটার অসময়ে কি দরকার? রবের রহমতে নিজ সফলতায় স্বচ্ছল জীবনে অভ্যস্ত। যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট।
– আমার উপর তোমার হাজার মান অভিমান থাকুক কিন্ত এ বিষয়ে আমি একদম ছাড় দিচ্ছি না।
বাবার বারংবার অনুরোধে সাব্বিরের মুখে বিরক্তি ফুটে উঠলো। মুখটা বিকৃত হতেই সেটা তাবিবের নজরে পরলো। তারা কি আসলেই ভেবে নিয়েছে যে তাবিব আজ কিছু নিতে আসার উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে?
– আমাকে জোর করে দেওয়া কি আদও সম্ভব? আপনি এই চেষ্টা বাদ দিন। তাওশিকে দ্বিগুণ দিয়ে সৈকত আর সাব্বিরকে সমান করে আমার অংশটা ভাগ করে দিয়ে দিবেন।
– আমাকে মাঝখানে টানছেন কেন? আশ্চর্য তো!
তাওশি মৃদু চেঁচিয়ে উঠতেই হাত তুলে ওকে থামার ইশারা করলেন জাকির। তাবিব হতাশায় চোখ ঘুরালো। মেয়েটা এতো অবাধ্য কবে হলো?
– তুমি আসলেই কিছু নিবে না?
– জ্বি না।
তাবিবের শান্ত উত্তর। জাকির বললেন,
– বেশ। তবে তানহার অংশীদারিত্ব খর্ব করার অধিকার তোমার নেই।
তাবিব অবাক হয়ে তাকাতেই তিনি ফের বলেন,
– তোমার ভাগ আমি তানহা এবং তোমার ভবিষ্যৎ সন্তানদের নামে লিখে দিয়ে যাবো। এবং আফসোস এতে তুমি কিছুই বলতে পারবে না।
তাবিব বিরোধিতা করে বলে,
– আমার সন্তানদের জন্য আমিই যথেষ্ট!
– আর আমি তাদের দাদা হিসেবে এতোটুকু করার এখতিয়ার রাখি। তোমার ভালো বাবা না হলাম, অন্তত দাদার হওয়ার দায়িত্ব কর্তব্য ভালো মতন পুরন করে যেতে পারলে একটু তো শান্তি পাবো।
তাবিবের মুখ বন্ধ হয়ে গেলো৷ মাথা হলো নত। প্রতিবাদে আর একটি শব্দও মুখ ফুটে উচ্চারিত হলো না।
কোন এক দুঃসংবাদ ছাড়া হয়তো এ চৌকাঠে এসে পুনরায় দাঁড়ানো হবে না। মনে জেগে ওঠা দীর্ঘশ্বাসকে তাবিব সন্তর্পনে আড়াল করে। সৈকত ভাইকে বিদায় দিতে এগিয়ে আসলো তখন। তাবিব স্বচ্ছ হেসে ওকে জড়িয়ে ধরে। সৈকত হয়তো এতোটা আশা করে নি। ও সহসা আবেগে আপ্লূত হয়ে পরে।
– আবার আসবে ভাইয়া।
– পরের বার আমার বাসায় চলে আসবে। বড় ভাইয়ার বাড়ি তো তোমারও।
তাবিবের কথায় ঝটপট মাথা নাড়ায় সৈকত। আশা নিয়ে সাব্বিরের দিকে তাকালে সে অনীহায় মুখ সরিয়ে নেয়। অথচ তাবিব ঠিকই ওর কাছে গিয়ে কাঁধ চাপড়ে বলে,
– সৈকতের সাথে চলে আসবে৷ ভাইয়া অপেক্ষায় থাকবো।
সাব্বির এক পলক তাকিয়ে আর কিছু বলে না।
– কোথায় যাচ্ছো তুমি?
জাকিরের ভারি গলায় সকলে দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকায়। তাওশি সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিলো এই মাত্র। বাবার কথায় থেমে গিয়ে বলে,
– বাসায় যাচ্ছি।
– এতো রাত করে বের হওয়া লাগবে কেন? কাল সকালে যেয়ো।
– এখানে থাকলে ঘুম হবে না আমার।
তাওশির তেরছা উত্তরে তাবিব সন্দিগ্ধ গলায় বলে,
– তাওশি এখানে থাকে না?
জাকির মৃদু শ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়ান। তাবিব শক্ত মুখে তাওশির সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলে,
– এতো জেদ কেন তাওশি? মেয়ে মানুষের জন্য একা থাকা কি আদও নিরাপদ?
– ওহ প্লিজ আমাকে বুঝ দিতে আসবেন না এখন! এতো বছর যাবত আমি নিজেকে ঠিকই সামলে রেখেছি।
– এই মেয়েটা কারোও কথা শুনে না। নিজের ইচ্ছে মতো চলে আর শুধু জেদ দেখায়৷ বয়সের হিসেব রেখেছে কি? ওকে এখনো বিয়েও দিতে পারলাম না আমি!
– আমাকে নিয়ে তোমাদের এতো মাথাব্যথা করতে হবে না।
জাকির পরাজিত হন। হতাশার সুরে বলেন,
– ও যেখানে যাবে ওকে একটু নামিয়ে দিয়ো তাবিব।
তাওশি ক্রোধ নিয়ে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে পরে সেখান থেকে৷ তাবিব চিন্তিত কন্ঠে বলে,
– ওর কি হয়েছে? সমস্যা কোথায়?
– সবই আমার দোষ। বাবার কৃতকর্মে সে লজ্জিত। হাজার বলেও ওর মন আর গলাতে পারি নি আমরা৷ এখন বয়স হয়েছে, সেই জোরটাও নেই৷ ছেলে দুটোও ওর ছোট। ভাইদের কথা তো ভুলোও কানে তোলে না।
– আমি দেখবো তাওশিকে।
তাবিবের ভরসা পূর্ন কথায় জাকির চমকে তাকান।
– তাওশিকে দেখে রাখবে তুমি? ওর দায়িত্ব নিবে?
– জ্বি। ওকে নিয়ে আপনি আর চিন্তা করবেন না।
দায়িত্বশীল তাবিব এড়িয়ে যেতে পারলো না এরকম অবস্থা। তাওশি তো তার আপনই। ছোটবোনকে আগলে রাখতে তার আরও ভালো লাগবে! বয়স বাড়ার সাথে হম্বিতম্বি স্বভাব আরও বেড়েছে কিন্তু ‘ম্যাচুরিটি’ নামক মানসিক পরিপক্বতা আসে নি ওর মাঝে। বেশ খানিকটা ছেলেমানুষী এই ব্যবহারে। এবার তাবিবের কর্তব্য পালনের সময় এসে গিয়েছে।
– আর্কিটেকচার পেশাটা কেমন ছোট ফুপি?
তাবিবদের চলন্ত গাড়িতে ছোটখাটো আড্ডা জমে উঠেছে। পেছনের সিটে বসা তানহা ও তাওশি তাদের মতো আলাপচারিতায় মত্ত। তাবিবের মনোযোগী দৃষ্টি রাস্তায় আর নিবৃতা মৌনতা অবলম্বন করে শুনছে মেয়ের কথা।
– সব পেশাই ভালো খারাপের মিশ্রন। সেভাবেই বিয়িং এন আর্কিটেক্ট হ্যাজ ইটস্ ওউন প্রজ এন্ড কনস্। কেন বলো তো?
– নাইনে উঠে গিয়েছি কিন্ত এখনও ভবিষ্যৎ পেশা ঠিক করতে পারি নি।
তানহার কন্ঠে হতাশা। তাওশি সামান্য হেসে উঠে বলে,
– এটা আসলেই আগে থেকে ঠিক করে রাখা মুশকিল। এজন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নিজেকে এমনভাবে তৈরী করো যেন সবকিছুই নখদর্পনে থাকে। এরপর দেখবে নির্দিষ্ট একদিকের প্রতি ঝোঁকটা আপনা আপনিই চলে আসবে। তখন আর কঠিন লাগবে না।
নানান কথাবার্তার মাঝেই তাওশি গাড়ি থামানোর জন্য বলে উঠলো।
– সামনের গলির বিল্ডিংয়ে না থাকো তুমি? এটা তো এডভোকেট আব্দুল বাশার স্যারের অফিস।
– আমার রুমমেট তার সহকারী। ওকে সাথে নিয়ে তবেই যাবো।
তাবিবের এতো প্রশ্নে বিরক্ত তাওশি। একদিনেই এতো অধিকারবোধ কেন দেখাচ্ছে সে! গাড়ি থামাতেই তাওশি নেমে এলো। নিবৃতা ও তানহা থেকে বিদায় নিতেই তাবিব পিছু ডেকে বললো,
– নিজের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে রাখবে তাওশি।
– আপনি বললেই আমি শুনবো?
– শুনতে বাধ্য!
তাবিব আর কথা বাড়ায় নি। গাড়ি চালু করে ছুটে চলে গিয়েছে। এদিকে তাওশি ভেবেছিল ওর মেজাজ খারাপ হবে তাবিবের এই অতিরিক্ত দখলদারি স্বভাবের কারণে। অথচ ও স্পষ্ট অনুভব করলো ওর খারাপ লাগছে না। সৎ ভাই নামক মানুষটার বাড়িতে গিয়ে উঠবে সেই চিন্তায় অস্বস্তিও হচ্ছে না। কেন? এসব ভাবনার শেষ পর্যায়ে ও নিজেই বিরক্ত হলো। কপাল কুঁচকে দ্রুত পায়ে হেঁটে যেতেই ধুম করে কারোর সাথে ধাক্কা খেল। মানুষ না বড় পাথর খন্ড? এতোটা শক্ত কেন? তাওশি পুরো আছড়ে পরার ন্যায় নড়চড়ে সরে গেলো। পীঠের ব্যাগটা গিয়ে রাস্তায় পরলো থপ করে। কোনমতে নিজেকে সামলে চেঁচিয়ে উঠলো জোরে!
– এই এই! চোখ কি কপালে নিয়ে হাটেন?
হঠাৎ করে কোন দিক থেকে এক অপরিচিত মেয়ে মানুষ এসে গায়ে ঢলে পরায় এমনিতেই বিরক্ত নিভান, এর উপর এতো উচ্চ কন্ঠ কানে যেতেই চোখ মুখ কুঁচকে তাকালো।
– যে নিজের ভুলই চোখে দেখে না সে অন্যকে বলছে? অদ্ভুত!
তাওশি মেজাজ দেখিয়ে বললো,
– দেখুন মিস্টার! মুখ সামলে কথা বলুন।
– আপনিও সীমায় মাঝে থেকে আচরণ করুন মিস!
নিভান তর্ক বিতর্কের সমাপ্তি ঘটিয়ে চলে গেলো লম্বা লম্বা পায়ে। নিজের হতভম্ব ভাব তখনও কাটিয়ে উঠতে পারলো না তাওশি! এতোটা অপমান! রাগে গজগজ করতে করতে পিচ ঢালা রাস্তায় পরে যাওয়া ওর ব্যাগটা তুলে নিলো কাঁধে।
এডভোকেট বাশার তাওশিকে খুব ভালো মতনই চেনেন। ওর সহকারী সিনথিয়া নামক মেয়েটার বান্ধবী হয়। কাজের ক্ষেত্রে কখনো কখনো অনেক দেরী হয়ে গেলে তাওশি ওর জন্য অপেক্ষা নিয়ে বসে থাকে। তাই তার অফিসে তাওশির আসা যাওয়া এখন খুবই সহজ বিষয় হয়ে উঠেছে।
আজও যখন তাওশি আসলো সিনথি কাজে ব্যস্ত ছিলো। গকজন মোয়াক্কেল এসেছেন। তাই তথ্যাদি গুছাতে হচ্ছে ওকে। তাওশিকে ইশারায় বসতে বলে ও ডেস্কের দিকে এগোলো। অপেক্ষা করার জন্য, দেয়ালের সাথে সেঁটে সাজিয়ে রাখা কয়েকটা চেয়ারের মধ্যে নিজের আসন বুঝে নিলো তাওশি। অনতি দূরেই ডেস্কে এডভোকেট বাশার ও একজন লোক বেশ গুরুতর ভঙ্গিমায় কথাবার্তা বলছেন। খানিক বাদে হঠাৎ করে একটু ঘুরে বসতেই লোকটার চেহারাটা পরিষ্কার হয়ে এলো, ওমনি তাওশির নাক কুঁচকে এলো। এই লোক এখানে কি করছে? এরই মাঝে সিনথি এসে আস্তে করে বললো,
– একটু সময় লাগবে আজ। চা, কফি কিছু নিবি?
– এতো চাপ নিস না। তার আগে বল তো, এই লোকের কি সমস্যা?
– ডিভোর্স কেস!
সিনথি চলে যেতেই তাওশি মনে মনে ছিঃ ছিঃ করে উঠলো।
– আরেক তালাকপ্রাপ্ত লোক। এজন্যই তো এমন বাজে আচরণ! সবগুলো একেকটা বদ!
নিভান তখন নিজস্ব জটিলতায় বড্ড নিপীড়িত। রত্নার পরিবার বেশ ঝামেলা করছে। ও সামান্য ফুরসতই খুঁজে পাচ্ছে না৷ এর মাঝে জানলোই না যে ঠিক পেছনে বসে, ওর নামেই কেউ এ মুহুর্তে বাজে বকছে!
বাসায় পৌছেই তাবিব ক্লান্ত বদনে ঘরে চলে এলো। আজ শারীরিক ঝক্কির থেকে মানসিক অবসন্নতার ভারটা বেশি। শতবার চেয়েও মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কষ্টসাধ্য। তানহা উদাস মুখে মায়ের দিকে তাকাতেই নিবৃতা আশ্বাস দেয় ওকে। তাবিব নিজেকে ঠিকই সামলে উঠবে৷
মেয়ের প্রয়োজন সব পুরন করে নিবৃতা তাবিবের কাছে যায়। দেখে মানুষটা বিষন্ন মুখে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টিতে কোন ভাবাবেগ নেই৷ নিবৃতা কিছু না বললেও সে কিভাবে যেন বুঝে যায় ওর উপস্থিতি।
– কাছে এসো নিবেদিতা।
নিবৃতা নরম পায়ে সেদিকে যেতেই চোখের পলকে, শক্তপোক্ত পুরুষালি আলিঙ্গনে বাঁধা পরে ও। ঘারে টের পায় উষ্ণ শ্বাস। নিবৃতা উৎকন্ঠিত হয়। পীঠে হাত বুলিয়ে বলে,
– আপনি ঠিক আছেন?
– হুম। একটু ক্লান্ত লাগছিলো। তাই শক্তি সঞ্চয় করছি।
নিবৃতা বোকার মতে বলে,
– কোথায়? কিভাবে শক্তি পাচ্ছেন?
অস্ফুটে হেসে উঠে তাবিব। আলিঙ্গন জোড়ালো করে নরম কাঁধে পুরোপুরি মুখ ডুবিয়ে বলে,
– তুমি৷ তুমিই তো আমার আরেক শক্তির উৎস!
– তাওশি চলে এলে, ভাবছি সবাই মিলে একটা ট্যুর দেবো। কি বলেন আমার মা?
খাবার টেবিলের আমেজ আজ কিছুটা ম্লান ছিল। তানহাও পরিস্থিতির বিবেচনায় আগ বাড়িয়ে কথা বলতে ইতস্তত বোধ করছিল বেশ। তবে তাবিবের হঠাৎ এ কথায় জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তাকালো। উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো,
– সত্যি বলছো?
তাবিব হেসে মাথা নাড়ায়।
– তবে আপাতত দেশেই কোথাও যাবো।
– আচ্ছা কোন সমস্যা নেই। একটা হলেই চলবে। আর সত্যি বলতে আমার ছোট ফুপিকে অনেক পছন্দ হয়েছে। সে আসলে মজাই হবে।
তানহার প্রফুল্ল মুখে তাকিয়ে তাবিব বলে,
– পছন্দ হবে না? চোরে চোরে মাসতুতো ভাই যে। দু’জনের ছটফটে স্বভাবে বেশ মিল আছে।
তানহা সলজ্জিত হেসে মাথা ঝাকায়। পরপর খুশি মুখে মায়ের দিকে তাকাতেই নিবৃতা হেসে উঠে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় পরম আদরে।
– আপনার প্রথম ট্যুর মিসেস। কি কি করার ইচ্ছে?
তাবিব রসিক স্বরে জানতে চাইলেই নিবৃতা ঠোঁট উল্টালো। এসব ট্যুরে কি কি হয় সে সম্বন্ধে তেমন কোন জ্ঞানই নেই ওর৷ মেয়েকে দেখলো, শুধু এতো এতো ছবি তুলে এনেছে। নিবৃতার তো তাও পছন্দ না৷ ও আসলে করবেটা কি তাহলে? ওর এই ভাবুক মুখ দেখে তাবিব আলগোছে হেসে উঠলো। এভাবেই একটু একটু করে নিবৃতাকে দুনিয়া চেনাতে হবে ওর। এবং এই কাজটা ও বড্ড সানন্দেই করবে।
সময় ছুটে চলে নিজের মতো করে। সে স্বাধীন, কারও ইচ্ছে সে মানে না৷ কেউ পারে না তাকে বেঁধে রাখতে। মানুষের পক্ষে শুধুমাত্র সম্ভব নিজ মস্তিষ্ক নামক ভান্ডারে সকল স্মৃতি ধারন করে লালন করার। আর লোক মুখে চলে যে, সুখময় ক্ষনগুলো তুলনামূলকভাবে একটু বেশিই দ্রুত চলে। আর সেভাবেই একটু একটু নিবৃতার জীবনে দুঃখময় অন্ধকার কেটে যে সুখের বান ভেসে এসেছিলো, তারই দেওয়া আনন্দ মিশ্রিত সময়গুলো পার হয়ে আজ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিনে এসে পৌছিয়েছে। সরোয়ার ফ্ল্যাটে আজ রমরমা পরিবেশ। গুটিকয়েক আত্মীয়দের আগমনে গমগম করছে বাতাবরণ। নিবৃতা ওর মায়ের সাথে রান্নাঘরে ব্যস্ত। সেরা রাধুনির পটু হাত জোড়া ঘুরছে চুলোয় বসানো হাঁড়িতে। কি যে ভীষন মনোযোগ সেথায়!
– নিবু, আমি এটা নাড়ছি। তুই গিয়ে দেখ, তাবিব ঠিক মিষ্টিটাই এনেছে কি না। নাহলে কিন্তু তানহা পরে রাগ করবে।
– আচ্ছা।
নিবৃতার মাঝে তটস্থতা থাকলেও মুখের আদলে লুকানো সেই বিষন্নতা টের পাওয়া খুব বেশি কষ্টকরও নয়। তাবিব সারি সারি মিষ্টির প্যাকেট এনে রেখেছে টেবিলের উপর। একটু দম নিতে চেয়ারে বসতেই নিবৃতা হাজির। অভিব্যক্তিতে তার নিদারুণ ব্যস্ততা! মাথায় এলেমেলো করে বড় একটা খোঁপা বাঁধা। আঁচল পেঁচিয়ে কোমরে গুঁজে রাখা। ঘর্মাক্ত কপালে ছোট ছোট কেশগুচ্ছ লেপ্টে রয়েছে। সুশ্রী রমনীর এই রূপে আজও তার প্রেমিক পুরুষ শ্বাস হারায়! তাবিব আসেপাশে সর্তক নজর দিলো। না কোথাও কেউ নেই।
নিবৃতা মিষ্টির প্যাকেট খুলতে খুলতে বললো,
– ঝিলমিল যেটা বলেছে সেটাই এনেছেন তো? ঐ যে ছানা আর মাওয়ার সাথে গাজরের যেই আরেকটা লেয়ার ছিল, ওটা দিয়েছে তো ঠিক মতো তারা?
কোন জবাব এলো না প্রশ্নের। শুধু টের পেলো ওর কোমরে সেই চিরচেনা পোক্ত হাতের বিচরন ঘটছে। নিবৃত চট করে তাকাতেই তাবিবের সহজ মুখে নজর করে। ঠোটের কোনে এক চিলতে হাসি৷ এরপর বুঝলো, হুট করেই শাড়িটা ছুটে গেলো সেখান থেকে।
– একটু সাবধানে হুম!
নিবৃতা লজ্জা পেলো। সাথে সাথে শাড়িটা গুছিয়ে ছড়িয়ে নিলো। সেদিকে তাকিয়ে তাবিব ওর পাঞ্জাবির হাতাটা টেনে হাতের মুঠোয় নিয়ে এলো। পরপর নিবৃতার ভেজা কপাল মুছিয়ে দিতে দিতে বললো,
– মুখটা এরকম শুকনো বানিয়ে রাখলে কি তানহার ভালো লাগবে? তুমি তো ওর আম্মু! ওর এতো বড় একটা দিনে, তোমার মুখে থাকবে সবচেয়ে উজ্জ্বল হাসি।
তাবিবের প্রশ্রয় পেয়ে নিবৃতা ফুপিয়ে উঠলো। ভরসা পূর্ণ সেই হাতে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
– ও আমাদের থেকে দূরে সরে যাবে আস্তে আস্তে।
– এমন কেন মনে হলো?
– এরকমই হয়। আমিও তো বিয়ের পর আর মা’য়ের কাছে যাই না। ঝিলমিলও আসবে না।
– বোকা মেয়ে! আমরা কি তানহার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি? হুম? ও আমাদেরই থাকবে৷ এখনও অনেক দেরী। আজ শুধুমাত্র একটা সই-ই তো হবে। আর কিছু না।
নিবৃতার মন তাও মানে না৷ তাবিব ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সিক্ত নয়ন যুগল মুছিয়ে দেয়।
– আর কাঁদে না৷ আজ শুধু হাসবে। আমাদের মেয়ের জন্য অসাধারণ একজনকে নির্বাচন করেছি আমরা। এতে খুশি হওয়া উচিত নয় কি? বলো?
নিবৃতা সামলায় নিজেকে। মাথা নেড়ে বলে,
– হ্যা!
– এই তো। ঝিলমিলের আম্মুটা আসলেই সেরা!
নিবৃতা হেসে উঠে মুগ্ধ চোখে তাকায় তাবিবের পানে। এতোগুলো বছরেও মানুষটা বদলায় নি। এখনও সেই আগের মতোই সামলে রাখে এই অগোছালো, অবুঝ, বোকা নিবৃতাকে। কেন যেন, নিবৃতা চেয়েও পারি নি নিজেকে খুব একটা পরিবর্তন করতে। সত্যি বলতে প্রয়োজনই ছিল না। এই সুপুরুষ তাবিবদের থাকতে নিবৃতাদের নিজেকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই৷ তারা প্রতিটিবার এভাবেই যত্নে ভালোবাসায় আগলে নেয় ওদের।
তাবিবের মুখটাও ক্লান্ত দেখালো। মেয়ের জন্য একয়দিন যাবত বেশ ছুটোছুটি করছে সে। নিবৃতা হাত উঠিয়ে তাবিব অবিন্যস্ত চুলগুলো সামান্য গুছিয়ে দিতে লাগলো। তাবিব হাসে এতে। এইসব ছোট ছোট যত্নেই তো সে কুপোকাত।
স্বামী স্ত্রীর প্রেমময় প্রহরে বাগড়া দিতে সহসা কলিং বেল বেজে উঠে। এতে দু’জনেই সচকিত হয় তৎক্ষনাৎ।
– সবাই চলে এসেছে বোধহয়। তুমি যাও, তানহাকে দেখো।
– আচ্ছা।
নিবৃতা ছুটে যায় ভেতরে। আর তাবিব সোজা চলে যায় দরজা খুলতে।
মেহমানদের নিতে নিভান গিয়েছিলো এবং নিজের সাথে করেই নিয়ে এসেছে। তাবিব তাদের প্রফুল্ল বদনে স্বাগতম জানালো।
– আসুন স্যার!
এনাম মাহমুদ বড্ড খোশ মেজাজে আছেন। চোখে মুখে তার প্রবল খুশীর ঝিলিক বারে বারে চমকে উঠছে। উনি ভেতরে প্রবেশ করতেই সাথে বড় ছেলে, তার স্ত্রী এবং একমাত্র নাতী এফরাজ মাহমুদও এলো। এফরাজের দৃষ্টি নত। তবে বদনে স্পষ্ট দৃঢ়তা। ছেলেটাকে দেখে আবারও মুগ্ধ হলো তাবিব। বাহ্যিক ও আত্মিক কোনদিক থেকেই সৌন্দর্যের কমতি নেই তার। প্রায় বছর পাঁচেক পূর্বে এনাম যখন এফরাজের জন্য তানহার হাত চেয়েছিলেন তখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলো তাবিব। পরে যখন এফরাজের সাথে দেখা হলো, ঢাকা মেডিকেলে ওকে অধ্যায়নরত অবস্থায় দেখলো, নানান কাজে ওকে জানার সুযোগ হলো তখন মনের সকল সংশয় খুব সহজেই দূর হয়ে গিয়েছিল। মেয়ের জন্য ওকে উপযোগী পাত্র বলেই মনে হয়েছে তাবিবের। তাই তো সময় হলে ও আর মানা করে নি।
– আসসালামু আলাইকুম স্যার।
এফরাজের সালাম পেয়ে তাবিব হাসলো। ওর কাঁধে হাত রেখে বললো,
– ওয়া আলাই কুমুসসালাম। কিন্তু এখন থেকে বাবা ডাকতে হবে।
এমবিবিএস এর চতুর্থ বর্ষে এবার এফরাজ, কয় মাস বাদেই পঞ্চমে উঠে যাবে। তবুও বড্ড লাজুক স্বভাবের। তাবিবের কথায় স্মিত হাসলো। তানহা এবং সে, সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তবুও কিভাবে যেন, পরিবার থেকে ব্যবস্থা করা এক সাক্ষাৎেই দু’জন একে অপরকে পছন্দ করে ফেললো। বাসায় গিয়ে কোন অভিযোগ দায়ের করার প্রয়োজনই পরে নি তাদের!
সবাইলে মিলে একত্রে বসতেই সরব আড্ডা জমে উঠলো। খানিক বাদেই কাজি চলে আসবেন। এরপর রেজিষ্ট্রেশন করলেই চিন্তা শেষ!
– সব ঠিকঠাক আছে তো ছোট ফুপি?
তানহার চেহারায় উদ্বেগ। ছটফটে হাত বারংবার শাড়ি টানছে একবার তো আরেকবার গহনা। তাওশি মুচকি হাসে। এ নিয়ে যে মেয়েটা কতো বার এই একই প্রশ্ন করলো!
– সব ঠিক আছে আমার মা। আপনি এবার একটু শান্ত হয়ে বসুন।
তানহা হাঁপ ছেড়ে তাকালো। তাওশি ওকে এক পাশ থেকে আগলে নিয়ে বলে,
– আবেগের বয়স! ছেলেটাকে এক দেখাতেই এভাবে লাট্টু হলেন! আমি তো ভেবেছি ভাতিজি তার ফুপির মতো হবে। একটু ঘুরাবে, নাচাবে, ভাব নিয়ে অপর পক্ষকে ক্লান্ত করে তবেই না মত দিবে।
তানহা হাসে।
– তোমার মতো নিষ্ঠুর মনের হলে সেই এফরাজ কবেই পালিয়ে যেতো।
– তাও ঠিক। তোমার ফুপার মতন কলিজা ক’জনেরই বা আছে!
দু’জনে অট্ট হাসিতে মেতে উঠতেই নিবৃতা প্রবেশ করে। মা দেখে তানহা তৎক্ষনাৎ ছুটে যায়। গায়ে তার ভারি শাড়ি ও গয়না। দেখতে লাগছে অনিন্দ্য সুন্দরী! নিবৃতা দু’চোখ জুড়িয়ে আসে। তানহা নিজেকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলো,
– আমাকে কেমন লাগছে আম্মু?
সেই ছোট তানহা আজ উনিশের তরুনী! বিশ্বাস হয়? অথচ আচরণ তার মোটেও বদলায় নি, এখনও শিশু সুলভ। নিবৃতা হাসার চেষ্টা করে। তানহার চিবুক ছুঁইয়ে বলে,
– মাশাল্লাহ! আমার মেয়ে তো এমনিতেই সবচেয়ে সুন্দর!
তানহা তার মা’কে বেশ বুঝে। যদিও এই প্রতিযোগিতায় বাবার থেকে অনেকটা পিছিয়ে সে, তবুও তার অবস্থান খুব একটা খারাপ নয়। ও নিবৃতাকে এক পেশে জড়িয়ে ধরে বলে,
– তোমার মেয়ে কোথাও যাচ্ছে না। এফরাজকে নিজের নামে লিখিয়ে নিচ্ছে শুধু। বাদবাকি সব তো একই থাকবে।
– তাহলে কে সে, যে চট্টগ্রাম চলে যাচ্ছে?
নিবৃতার খোঁচায় তানহা বোকা হাসলো। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় তার সুযোগ হয়েছে চট্টগ্রাম কলেজে। কিন্তু বাবা মা কেউ তাকে ওতো দূর পড়তে যেতে অনুমতি দেয় নি। তাবিব তো মুখের উপর বলে দিয়েছিলো, ডাক্তারি পড়ার এতোই শখ হলে, তাবিব ওকে বেসরকারিতে ভর্তি করিয়ে দিবে তবুও এতো দূর মেয়েকে পাঠাবে না৷ তানহা কতো বোঝালো কেউ ওকে বিন্দুমাত্র পাত্তা পর্যন্ত দিলো না। পরে ভাগ্য ক্রমে মামার মাধ্যমে সুযোগ পেলো সে। চট্টগ্রামে নিজ শোরুমের বিশাল আউটলেট খুলেছে নিভান। সাথে অন্যান্য খাতেও বিনিয়োগ করেছে৷ নিয়োগ দিয়েছে অনেক কিছু। বুদ্ধি খাটিয়ে চতুর তানহা তাকে বোঝালো চট্টগ্রামে সশরীরে উপস্থিত থেকে কাজে তদারকি করলে বেশি সুবিধার হবে নিভানের জন্য। তানহা অবশ্য ভুল বলে নি। নিভান মেনে নেয় ওর পরামর্শ, এবং এর সাথে তানহার রাস্তাও খুলে যায়।
চট্টগ্রাম গিয়ে তানহা ওর নানুবাড়ি উঠবে। সেখানে আরামে থাকবে। এর চেয়ে সহজ বিষয় আর কি হতে পারে? নিবৃতা তাবিবের মুখে বড়সড় তালা পরলো তখন। মেয়ের ভবিষ্যতের চিন্তায় তারাও আর কিছু বললো না। কিন্তু এনাম মাহমুদ যখন জানতে পারলেন, তখন তিনিই প্রস্তাব দিলেন, তানহা যেহেতু নতুন পরিবেশে যুক্ত হচ্ছে তাহলে নতুন সম্পর্ক শুরু করে তবেই নাহয় যাক। তাবিব জবাব না দিয়ে বাসায় এসে আলাপ করলো। বুঝদার তানহার ইতিবাচক উত্তর পেতেই সবকিছু আজ এ পর্যায়ে এসে পৌছেছে।
– আম্মু চিন্তা করো! তুমি নিজেকে পরিচয় দিচ্ছো, আমি ডাক্তার তানজীব সরোয়ারের স্ত্রী এবং ডাক্তার তানহা সরোয়ারের মা। দেখো তো! শুনো তো! তোমার নামটা কতো ভারি হয়ে যাবে! ভাবা যায়!
মেয়েটা এসব বলে কয়েই সবটা শান্ত রাখছে ওকে। আর সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় শেষমেষ নিবৃতাও যে হেরে যেতে বাধ্য।
রেজিষ্ট্রেশন কাগজে ছোট্ট একটা স্বাক্ষরের মাধ্যমে আকদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ হয়েছে। বিধি অনুয়ায়ী বিয়ে হতে এখনও বেশ দেরী। তানহার লেখাপড়া শেষ করে সফল ডাক্তার হওয়া পর্যন্ত এক লম্বা অপেক্ষা রয়েছে মাঝে! তাদের দেখা হওয়ার রাস্তাও এরপর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হবে। তাই আজ আকদ শেষে দু’জনকে দেখা করার জন্য অল্প খানিকটা সময় দিয়ে একা ছেড়ে দেওয়া হলো।
তানহা নিজের ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখ চেয়ারেই চুপ করে বসেছিল। মাথায় সোনালি হিজাব, গায়ে মিষ্টি রঙা ভারি শাড়ি ও দু’হাত ভর্তি চুড়িতে ওকে লাগছিলো অপরূপা। তানহার কখনো নিজ পছন্দে বিয়ের স্বপ্ন ছিল না। বাবা ও জন্মদাত্রীর সম্পর্কের পরিনতি দেখে ছোটবেলায়ই একটা ভয় ঢুকে গিয়েছিল মনে। ইচ্ছে ছিল ওর বাবা যাকে পছন্দ করবে ওর জন্য তা-ই সই। এজন্য শুরু থেকেই এ বিয়েতে কোন আপত্তি ছিল না ওর।
এফরাজ যখন অন্দরে পা রাখলো তখনই ওর দৃষ্টি জোড়া থমকে গেলো। কিচ্ছুটি আর বলতে পারলো না। কয়েক পল নীরবতায় কেটে যাওয়ার পরও যখন কোন সাড়াশব্দ মিললো না তখন তানহা চোখ তুলে তাকালো। সাধারণ সফেদ রঙা পাঞ্জাবি পরনে সে। চৌকস চেহারায় কিঞ্চিৎ হতবিহ্বলতা স্পষ্ট। চিকন ফ্রেমের চশমার আড়ালে থাকা নরম চোখ দুটোতে অপার মুগ্ধতা ছড়ানো। তানহার কাছে এফরাজকে দেখতে ভালোই লাগলো তবে একটা সমস্যা। ছেলেটা একটু বেশিই ফর্সা। ঠিক ওর আম্মুর মতো। তানহার মাথায় নতুন চিন্তা যোগ হলো। এই ছেলেকে কালো বানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো তানহাকে এর পাশে দাঁড়ালে দেখাই যাবে না। কি করবে ও? হুম! সুযোগ পেলে, একদিন সহজ সরল সাজার নাটক করে এক আবদার করবে। তারপর সারা গায়ে সরিষার তেল মেখে কড়া রোদে দাঁড় করিয়ে রাখবে৷ ব্যস কাজ শেষ! নিজের বুদ্ধিতে যখন নিজ মনেই হাসছিল ও তখন কোমল এক কন্ঠস্বর কানে আসে।
– আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে। ইউ আর শাইনিং এজ ব্রাইট এজ আ স্টার।
তানহা চট করে তাকালো।
– তারার মতোই কেন? তার বেশি নয় কেন?
এফরাজ হকচকালো। হতবুদ্ধি হয়ে কিছু বলবে তার আগেই তানহা হাসলো।
– মজা করছিলাম। থ্যাংকস এন্ড বাইদা ওয়ে, ইউ লুক হ্যান্ডসাম এজ ওয়েল।
এফরাজ চোখ নামিয়ে হাসলো। কিছু একটা মনে পরতেই সহসা পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে একটি ছোট চারকোনা বাক্স বের করলো।
– আপনার জন্য একটা গিফট এনেছি। এক্সেপ্ট করবেন?
তানহা তীর্যক স্বরে বলে,
– উপহার না নিজের দেওয়া সিলমোহর?
মেয়েটা একটু বেশিই বুদ্ধিৃতী! এফরাজ অন্যকিছু আনতে চেয়েছিলো কিন্তু মা বললো আংটি দিতে, অনামিকায় পরে থাকলে তানহাকে নাকি অন্তত তথাকথিত ‘সিঙ্গেল’ লাগবে না তখন। মায়ের উপদেশ পেয়ে এফরাজ অবুঝের মতো চেয়েছিলো শুধু। অথচ এখন, তানহার কথায় এবারে হেসে ফেললো সে। তানহাও বাদ পরে না। মুচকি হেসে নিজের হাতটা তুলে ধরে সম্মুখে।
সরোয়ার ফ্ল্যাটে এখন আর সেই প্রাণোচ্ছ্বলতা নেই। নেই কোন তাড়া। সময়গুলো যেন থমকে থাকে। দুরন্ত কদমে গমগম করে না ঘরের মেঝে। তটস্থায় কাটে না প্রতিটি দিবস। নিবৃতার সবটা সময় এখন আলসেমিতে জড়িয়ে। মেয়ের পছন্দের রান্না করা হয় না। সকালে কলেজ এবং বিকেলে তাকে নিয়ে কোচিংয়ে ছোটাছুটি করা হয় না। সন্ধ্যা বেলায় মা মেয়ের আড্ডা জমে ন৷ খাবার টেবিলে মৃদু গুঞ্জনও উঠে না। সব কেমন বিরান ঠেকে নিবৃতার কাছে। অথচ মেয়ে গিয়েছে কেবল এক সপ্তাহ পার হয়েছে। ওর বাসায় ফেরার এখনো কতগুলো মাস বাকি! কলেজ এখন নতুন নতুন, সবকিছু সামলে নিবৃতার সাথে বেশিক্ষণ কথাও বলতে পারে না সে। যাকে কেন্দ্র করে তাবিব নিবৃতার জীবনের আবর্তন ঘটতো আজ সেই অনুপস্থিত। তাবিবও বাসায় এলে চুপ হয়ে যায়। নিবৃতাকে স্বান্তনা দিলেও সে নিজেও একই পথের পথিক। দুটো ছিমছাম মানুষের জীবনে হঠাৎই কেমন স্থবিরতা নেমে এসেছে। নিবৃতার নিজেকে কেমন অসুস্থ অসুস্থ লাগে। ঘরে মন টেকে না। ইচ্ছে করে কোথাও চলে যেতে! এখন এটা মানসিক নাকি শারীরিক সমস্যা তাও জানে না নিবৃতা। সবকিছুই কেমন অবসাদে ঘেরা।
মাথা ব্যথা করছিলো ওর। তাই চুপচাপ শুয়ে ছিল বিছানায়। হঠাৎ কলিং বাজলেই উঠে বসলো। তাবিবের আজ একটু দেরীতে আসার কথা ছিল অথচ সন্ধ্যা কেটেছে বেশিক্ষণ হয় নি এখনও। ওড়না মাথায় তুলে ও দরজা খুলতে চলে গেলো।
– মুখটা এতো শুকনো লাগছে কেন?
ঘরে প্রবেশ করেই তার প্রথম প্রশ্ন। নিবৃতার ভালোমন্দ তদারকি করাই তার মূখ্য কাজ সবসময়। ও স্মিত হাসলো। তাবিবের অফিস ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললো,
– এমনিই একটু মাথা ব্যথা করছিলো। আপনার জন্য চা আনবো? সাথে কিছু নাশতাও বানিয়ে আনি?
তাবিব হেসে মাথা নাড়িয়ে ‘না বোঝালো। ঝুঁকে এসে ললাট মাঝে ওষ্ঠের ছাপ রেখে বললো,
– তুমি একটু স্থির হয়ে বসো তো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।
তানহার চট্টগ্রাম চলে যাওয়ার পর এই প্রথম লোকটাকে এতো প্রফুল্ল লাগছে। কারণটা কি হতে পারে? ও বসে বসে অপেক্ষা করছিল কিন্তু হঠাৎ করেই অস্থির লাগা শুরু হলো কেমন। ইদানীং এমনটাই হচ্ছে। এ ঘরে দমবন্ধ লাগে। তানহার সাথে সাথে শ্বাস নেওয়ার মতো বিশুদ্ধ বায়ুও কি চলে গেলো নাকি? নিবৃতা উঠে তৎক্ষনাৎ বারান্দায় চলে এলো।
খোলা আকাশের দিকে মুখ তাক করে চুপটি করে দাঁড়িয়ে ছিল নিবৃতা। এখন একটু ভালো লাগছে। নির্মল বায়ুর ঝাপটায় বুকের ভারটা নেমে এসেছে। এরই মাঝে আচমকা আরেকজনের উপস্থিতি মিলে। যে পেছন থেকে খুবই কৌশলে, নিবৃতাকে গভীর আলিঙ্গনে বেঁধে নিয়েছে। শক্ত চিবুক ঠেকেছে ঘাড়ে, পুরুষালি পোক্ত হাত ছুঁয়েছে নরম উদর। কর্ণধারে ওষ্ঠ লাগিয়ে ফিসফিস করে বলে,
– এখানে কেন?
নিবৃতা নিজেকে আয়ত্তে রাখার চেষ্টা চালায়। মানুষটা কেমন যেন! লাজে রাঙা হয়ে উঠে বলে,
– ঘরে দমবন্ধ লাগছিলো হঠাৎ করেই। তাই এখানে চলে এলাম।
– আচ্ছা।
– শুনুন না।
– বলুন না
তাবিবের খোশ মেজাজ অথচ নিবৃতার মুখে আঁধার।
– আমার না হয়তো কোন গুরুতর সমস্যা হয়েছে নয়তো তানহা ছাড়া এই খালি বাসায় একা থাকতে থাকতে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছি। ভালো লাগছে না কিছু।
ক্ষীন হাসির শব্দ মিলে তখন। নিবৃতার মুখ মলিন হয়ে আসে। ও এখানে নিজের কষ্ট শোনাচ্ছে অথচ লোকটা নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়ে কেমন করে হাসছে!
– তোমার কিছুই হয় নি। এগুলো কোন সমস্যা নয়।
– তাহলে?
– কেউ একজন মনে হচ্ছে বেশি দুষ্ট হবে সেজন্য।
নিবৃতা অবাক হয়ে তাকায়! কে দুষ্টুমি করবে আবার?
– কি বলছেন আপনি? কে সে?
তাবিব এ বারে নরম চোখে তাকায়। আলিঙ্গনের প্রগাঢ়তা দৃঢ় করে৷
– এই যে, আমি যেখানে ছুয়ে আছি না?
তাবিব থামে। বড্ড আদর নিয়ে সেথায় বুলিয়ে দিয়ে বলে,
– এখানটায় কেউ একজন আছে।
নিবৃতার পুরো অস্তিত্ব যেন এক লহমায় থমকে গেলো৷ সামান্য নড়চড় অবদি করলো না৷ তাবিব আস্তে করে ওর মুখটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরায়৷ ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে বলে,
– কাওকে নিঃস্বার্থ রূপে সবকিছু উজার করে দিলে মহাব রব তাকে খালি হাতে ফেরান না। তানহার প্রতি তোমার মাতৃত্ব ঠিক এতোটাই শুদ্ধ যে, এর উপহার তুমি পেয়ে গিয়েছ, একদম সঠিক সময়ে। তোমার কোল ভরে উঠবে। এই উদাস শূন্যতা মিটে গিয়ে তুমি পরিপূর্ণ থাকবে আবারও।
তাবিব কথা বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে পরলো। নেত্রদ্বয় হতে এক ফোঁটা করে অশ্রু গড়িয়ে নিবৃতার কোমল গালে পরতেই, মেয়েলি ওষ্ঠ জোড়া তিরতির করে কেঁপে উঠলো। পুরুষালী হাতের উপর নরম হাত রেখে, নিবেশিত লোচনে স্বামীর পানে তাকিয়ে এক সময় ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। তাবিব থামালো না ওকে। স্ত্রীর প্রকম্পিত হাত তুলে পরম আবেশে চুমু খেলো সেখানে। যেন ওকে সম্মানিত করছে ও! পরপর গভীরভাবে ওকে আঁকড়ে ধরে রাখলো নিজের সাথে।
নিবৃতা পর্ব ৩৭
ভেতরটা যে ওর-ও ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসছে, এক অমোঘ খুশির আগমনে তারা আজ ধন্য!
নতুন আশার আলো নিয়ে তাবিব, তানহা; নিবৃতার জীবনে এসেছিলো নাকি নিবৃতা তাদের বাবা মেয়ের জীবনে, সে তর্ক এখন ভিত্তিহীন। কারণ তাদের পরিপূর্ণতা এসেছে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে, ভালোবাসাময় পবিত্র এক বন্ধন গড়ে। নিবৃতা নামক এই মানবীকে আপন করে বাবা মেয়ে নতুন ভুবন সাজিয়েছিলো, আর নিবৃতাকে এই জীবন বাঁচতে শিখয়েছিলো তারা। কিছু কিছু পরিপূরক ঠিক এমনও হয়!
