Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ২১

নিবৃতা পর্ব ২১

নিবৃতা পর্ব ২১
নেহার ছায়ালিপি

শীতের দাপট কমে আসতে শুরু করেছে। এখন আর বেলা করে সূর্য উঠে না৷ নয়া ভোরের শুরুতেই ধোয়াটে কুজ্ঝটিকা, দিবাকরের উজ্জ্বল আলোয় মিশে গিয়ে আপন চিহ্ন হারিয়ে বসে। মাঝ দুপুরে, হেলে থাকা রবি, তার উত্তপ্ত কিরণ বিলিয়ে দেয় চারিপাশে। নতুন বছর এসেছে বেশ কয়েকদিন হলো। জনজীবনে ব্যস্ততা বেড়েছে। এসেছে নতুন দায়িত্ব কর্তব্য। সকলে ছুটছে নিজ নিজ প্রয়োজনে। এমনই এক কর্ম মুখর দিনে তাবিব, দুপুরের খাবারের সময়ে, না খেয়ে, ক্লান্ত দেহে সিনিয়ের কেবিন অভিমুখে চলছে। স্যার এনাম মাহমুদ ওকে আচমকাই ডেকে পাঠিয়েছেন। তাবিবের মনে হয়েছে, হয়তো নিবৃতারের জন্য কোন কনসাল্টেন্ট ঠিক করেছেন তিনি, সেটা জানানোর জন্যই আসতে বলেছেন৷ তাবিব উত্তরে দুপুরে একসাথে খাওয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি সেটা নাকচ করে দিয়েছেন। গম্ভীর হয়ে বলেছেন যেন তাবিব তার সাথে একান্তে, কেবিনেই দেখা করে। গুরুজনের আদেশ আর অমান্য করে নি তাবিব। চলে এসেছে।

দরজায় করাঘাত পরার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতর থেকে অনুমতি চলে এলো। তাবিব স্মিত হেসে সালাম জানিয়ে এগিয়ে এলো। এনাম মাহমুদকে বড্ড গম্ভীর দেখাচ্ছে। উনি ইশারায় ওকে বসতে বলতেই, তাবিব তার ডেস্কের বিপরীতে রাখা একটি চেয়ারে বসে পরলো। স্যারের মুখশ্রীর ভাব ভঙ্গিমা খুব একটা সুবিধার নয়। কিছু একটা সমস্যা যে নিশ্চিত হয়েছে, সেটা বুঝতে পেরে তাবিব চুপ রইলো। এনাম মাহমুদ এর বয়স্ক চেহারায় কিছুটা বেদনার ছাপ। কয়েক মুহুর্ত পর তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন,
– তুমি আমার অনেক পছন্দের একজন স্টুডেন্ট তাবিব। ইউর ইনটেলিজেন্স, ডিগনিটি ইন বিহেভিয়ার, অনেস্টি, স্টিল আমেজেস মি। একজন পিতার মতোই আমি তোমাকে স্নেহ করি। আশা করি সেটা আমার ব্যবহারেও প্রকাশ পায়। সেই অবস্থান থেকেই বলছি, আমি সবসময় তোমার ভালোটাই চাইবো।
অকস্মাৎ এরূপ কথার প্রয়োজনটা ঠিক কোথায় সেটা বুঝলো না তাবিব। ও চিন্তিত স্বরে বলে,
– এভাবে কেন বলছেন স্যার! ইউ হ্যাভ মাই আটমোস্ট রেসপেক্ট এন্ড ওবিডিয়েন্স!
– তাহলে আজ তোমাকে আমি কিছু কথা বলবো। সেগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনো। আমার মনে হচ্ছে এতে তুমি তোমার স্ত্রীর সমস্যাটা মূল থেকে সমাধান করার চেষ্টা করতে পারবে।
চমকিত হলো তাবিব। এমনকি বিষয় যেটা স্যারের আয়ত্তে আছে? ও বিভ্রান্ত মনে শুধু বললো,

– জ্বি স্যার। আপনি বলুন।
এনাম মাহমুদ ডেস্কের ড্রয়ার থেকে একটি বহু পুরোনো নিউজপেপার বের করলেন। কাগজটির অবস্থা বেশ করুণ। অনেক লেখাই এখন আর স্পষ্ট নয়। কালি লেপ্টে গিয়েছে। কাগজ নরম, ছিঁড়ে ভাব। তিনি সেটা মেলে ধরলেন ডেস্কের উপর। হাত দিয়ে একটি মোটা ফন্টের লেখায় ইঙ্গিত করলেন।
“ঢাকার এক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যপকের হাতে খুন হয়েছেন এক বিশিষ্ট শিল্পপতি”
একটা ছবি রয়েছে নিচেই, তবে সেটাও নষ্ট হয়ে গিয়েছে অনেকটা। বোঝা যাচ্ছে না কিছুই। তাবিব ভ্রু কুঁচকে চাইতেই এনাম বলেন,

– নীরব ফারুকী। তোমার শ্বশুর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন। আমার বেশ চেনাজানা আছে ওখানে। আজ থেকে প্রায় অনেক বছর আগে ঘটনাটি ঘটেছে। তখন তো ইন্টারনেট প্রচলিত ছিল না৷ তাই খবরটা খুব বেশি ছড়ানোর অবকাশ পায় নি৷ তবে যতটুকু আলোড়ন তুলেছিলো সেটাও কোন অংশে কম নয়। ভদ্রলোককে আমি দেখেছিলাম। কথাও হয়েছিল সামান্য। আচার আচরণ বেশ প্রশংসনীয় লেগেছিল। তাই তার নামে হঠাৎ এরূপ নিউজে আমি অনেকটা অবাকই হয়েছিলাম। কি মনে করে যে, নিউজটা কালেকশনে রেখেছিলাম সেটা আর ঠিক মনে নেই। উনাকে অন স্পটই ধরা হয়েছিল। পালাতে পারেন নি। বলা হয়েছিল, টাকার লোভে তিনি এমনটা করেছিলেন।
তাবিব মূক বনে তাকিয়ে আছে। যেন ওকে বলা কথাগুলো বুঝতে এখনও ওর মস্তিষ্ককে বেগ পেতে হচ্ছে।
– কলিগদের সাথে কথা হয়েছিল আমার। শুনেছিলাম উনাকে ফাঁসি দেওয়া হবে নয়তো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কারণ ভিক্টিম বেশ প্রভাবশালী ছিলেন। বিচার হওয়া বাধ্যতামূলক। পরে সবাই মিলে তার পরিবারের খবর নিলে জানতে পারে যে, তারা সকলেই রাতারাতি শহর ছেড়ে দিয়েছেন। এ নিয়েও বেশ আইনি ঝামেলা হচ্ছিল অবশ্য। এরপর তো আমার ট্রান্সফার হয়ে গেলো। আর খবর নেওয়া হয় নি৷ এখন কাওকে যে কল করে এ বিষয়ে জানতে চাইবো, সেই সাহসও হয় নি আমার৷ তোমার নাম এখন ফারুকী পরিবারের সাথে জড়িত। আমি চাই না তোমার নামে কোন অভিযোগ উঠুক। গায়ে দাগ লাগুক।
ভারি অর্থের কথাগুলো শেষ করে হাঁপ ছাড়লেন এনাম। গত কয়েক বছর ধরে মনের মাঝে এই শব্দগুলোর জমে ওঠা ভার সয়ে ছিলেন৷ আজ সেগুলো ঝেরে দিয়ে অনেকটাই হালকা লাগছে।

– তোমার বিয়ের দিন, যখন তুমি তোমার শ্বশুরের নাম বললে, আমার মাথায় তখনই বিষয়টা নাড়া দিয়ে উঠে। কিন্তু অতীতকে পেছনে ফেলে সদ্য নতুন শুরু করেছিলে, তাই আর কিছু বলতে পারি নি। তবে এবার যখন তোমার স্ত্রী সম্পর্কে জানতে পারলাম, তখন মনে হলো, হয়তো তার জীবনের জটিলতার সাথে এই ঘটনাটার সম্পৃক্ততা রয়েছে। আর মানসিক এই সমস্যাগুলোর মূল কারণ না জানলে তো, তা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
এনামের বলা থামতেই তাবিব মুখ তুলে চাইলো। ওর চোখ দুটো ইতিমধ্যে লাল হয়ে এসেছে। চোয়াল নিরেট, শক্ত। চেহারা জুড়ে অপার কাঠিন্যতা বিরাজমান। ও শুধু কোন রকমে শক্ত কন্ঠে বললো,
– ধন্যবাদ স্যার। আমাকে এ বিষয়ে অবগত করার জন্য। আমার কিছুই জানা ছিল না। আসলে কখনোই থাকে না। কারণ তারা আমাকে কিছু জানানোর প্রয়োজন বোধ করেন নি।
এনামের মায়া হলো। ক্লান্ত স্বরে বললেন,
– তোমার শ্বশুর আদোও মৃত না এখনও কারাগারে তার বসবাস। সেটা আমি জানি না। এখন বাকিটা খতিয়ে দেখা তোমার দায়িত্ব।
– আজ আসি স্যার।
– সাবধানে বিষয়টা হ্যান্ডেল করবে।
তাবিব কিছুই বললো না। কেবলমাত্র নীরবে মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে। প্রতিটি কদম ওর জোরালো। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এসেছে। চোখের ভাষা যেন উত্তপ্ত অগ্নিশিখা। গন্তব্য সারোয়ার ফ্ল্যাট।

ফাঁকা বাসায় নিবৃতার বিশেষ কিছু করার ছিল না। দুপুরের এই অলস সময়টায় এমনিতেও কেমন গুমোট অনুভূত হয়। আজ আশ্চর্যজনকভাবে সে দুপুরে রান্না করেছে। সেদিন, তাবিবের প্রতিক্রিয়া দেখার পর, নিজেকে বড্ড অপরাধী লাগছিল। মনে হচ্ছিল কেন বাকি সবার মতো, সে নিজ সমস্যাগুলো ঝেরে উঠতে পারে না ও। মনকে শক্ত করতে অক্ষম সে! ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে রান্না করা হলেও, সে খাবারের দানা গ্রহণ করা হয় নি। মনটার দশা শোচনীয় যে! ভীষন উদাস তার অবস্থা। এর অন্দরমহলে মন খারাপের হাওয়া বইছে। খেতে গিয়েও সেটা গলাধঃকরণ সম্ভব হয় নি। কিছুই ভালো লাগছে না। ও যতে সবকিছু বাগে আনতে চাইছে, ততই যেন আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাবিব নামক চমৎকার মানুষটাকে সন্তুষ্ট ও খুশী রাখতে চেয়েও, দিনশেষে নিবৃতা ব্যর্থ। নিদারুণভাবে অযোগ্য প্রমানিত হয়েছে ও। সেই অপরাধবোধ থেকেই অন্তঃস্থলে শান্তি মিলছে না। কেমন অসহনীয় ঠেকছে সব! ইচ্ছে করছে মায়ের কোলে মাথা রেখে কাঁদতে অথচ তাও সম্ভব নয়। তানহা ছাড়া, এই পুরুষের সংসারে পদার্পনের আরেক কারণ ছিল, তার পরিবারকে রেহাই দেওয়া। ওর জন্য হওয়া সকলের ভোগান্তিকে সমাপ্ত করা ছিল লক্ষ্য। আর কতো কষ্ট দিবে সে। অথচ এই পরিবারে এসেও, তাবিবের ন্যায় ভালো মানুষটাকেও ব্যাথিত করছে ও। ওর জন্মই হয়েছে আজীবন কষ্ট পাওয়া এবং অন্যকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। কি নিদারুণ, নিষ্ঠুর ভাগ্য।

নিস্তব্ধ, উদাস, ম্লান এই দুপুরের শেষবেলায় এসে, বিছানায় মাথা ঠেকিয়ে, বিষন্ন চিত্তে, আরও একবার নিজ জীবন নিয়ে আফসোসে ভুগছে নিবৃতা। দু’রাত যাবত রাতে ঘুম হয় না। মস্তিষ্ক কেমন অসাড় লাগছে। দেহে বলের অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। নিভু নিভু চোখের বিষাদপূর্ণ দৃষ্টি খোলা বারান্দার দিকে। এই নীরবতা চিরে হঠাৎই কলিং বেল বেজে উঠে। এই সময়ে, কখনোই কেউ আসে না। তাছাড়া তাবিব কখন বাসায় ফিরবে, সেটা আগে থেকেই কল করে জানিয়ে দেয়। তাই নিবৃতা ভীতসন্ত্রস্ত হলো। আতংক নিয়ে বসে রইলো মিনিট খানেক। কিন্তু কলিং বেলের আওয়াজ থামে না। উপায় না পেয়ে, শঙ্কিত সে কল করলো তাবিবকেই। সেই যে এখন ওর একমাত্র ভরসার আশ্রয়স্থল! কল রিসিভ হওয়ার সাথে সাথেই অনমনীয় এক কন্ঠস্বর কানে আসে।
– আমিই এসেছি। দরজা খোলো!
নিজ বাক্যের সমাপ্তি ঘটিয়ে সে কল কেটেও দিলো। নিবৃতা অবাক হয়ে তৎক্ষনাৎ মাথায় কাপড় তুলতে তুলতে ছুটলো দরজা অভিমুখে।
বিপরীত প্রান্তে দাঁড়ানো লোকটিকে আজ বড্ড অচেনা লাগছে। এই শীতল অভিব্যক্তি, কঠোর দৃষ্টি, তীক্ষ্ণ, ক্ষুরধার চোয়াল। এক দুর্বোধ্য জটিল অনুভব। নিবৃতা সমস্ত বদন অস্বস্তি ও শঙ্কায় ছেয়ে গেলো। নজর নামিয়ে কিছু বলবে তার আগেই হাতে প্রবল চাপ অনুভূত হলো। এতোটা কর্কশ স্পর্শ! এর আগে কখনও এর ছোঁয়া পায় নি। ও হতবিহ্বল হলো। চমকিত দৃষ্টিতে চাইতেই দেখলো তাবিব ওকে টেনে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। পরপর সেখানে পৌছে ওকে এক প্রকার ছিটকে ছেড়ে দিলো। নিবৃতা ভারসাম্য হারাতে নিয়েও নিজেকে সামলে নিলো। কি হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। তবে তাবিবের এতোটা ভয়াল রূপের সম্মুখীন এর আগে ও কখনও হয় নি। তাই তো আতংক গ্রাস করে নিলো ওকে।

– তোমার বাবা কোথায়?
তাবিবের শক্ত কন্ঠে করা প্রশ্নটা ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারলো না নিবৃতা। অবুঝ দৃষ্টিতে তাকাতেই তাবিব বললো,
– এভাবে তাকাবে না। বলো তোমার বাবা কোথায়? মারা গিয়েছেন? তাহলে কিভাবে? ফাঁসিতে ঝুলে? নাকি বেঁচে আছেন, জেলখানায়? যেটা লজ্জায় তোমরা আড়াল করেছ!
তাবিব নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে না! নিজের চাইতেও মেয়ের জন্য ওর চিন্তা বেশি হচ্ছে। কোন ধরনের পরিবারের সাথে ওরা জুড়ে গেলো! কেমন তাদের আসল রূপ? আর এই যে নিবৃতা! ওর আচরনই বা এতো অদ্ভুত কেন? এই মানসিক উৎপীড়নের পিছে থাকা কারণ কি? ওর মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারছে না আর!
– কি হলো? চুপ করে আছো কেন? জবাব দাও! আর কি কি গোপন রেখেছো তুমি এবং তোমার পরিবার? কতোটা কুৎসিত তোমাদের লুকায়িত চেহারা!
নিবৃতা এসব কথার কিছুই বুঝতে পারছে না৷ হঠাৎ কি হলো? তার পরিবার এবং বাবার কথা কেন উঠছে? ওর বাবাকে কেন তাবিব এভাবে উল্লেখ করছে? সমস্যা কি? ও বিভ্রান্ত স্বরে বললো,

– আপনি এসব কি বলছেন? মা কি আপনাকে সব বলে নি?
তাবিব হুংকার দিয়ে উঠে এক প্রকার যার তোড়ে কয়েক পা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয় নিবৃতা!
– বারবার মা’কে মাঝখানে আনবে। মা মা মা! এই তোমার নিজ থেকে কিছু বলার নেই? আসলে কি বলো তো, তোমরা সবাই আমার সাথে প্রতারণা করেছ! এই এক কৌশলে সব আড়াল করে গিয়েছ যেন আমি কিছুই বুঝতে না পারি।
– আপনি এসব কি বলছেন?
– তুমি এখনও বুঝতে পারছো না? তোমার বাবার কথা বলছি। আসলে তোমার বাবা কে? একজন আসামী!
আসামী” শব্দটা উত্তপ্ত অগ্নিশিখার ন্যায়ই বোধহয় নিবৃতার দু কানকে ঝলসে দিলো। বৃহদাকার দৃষ্টি মেলে অস্ফুটে বললো,

– আসামী!
– একজন খুনী! লোভী ধুরন্ধর! শিক্ষকের লেবাসধারী এক সমাজ ধ্বংসকারী অস্তিত্ব!
– আমার বাবার সম্পর্কে আপনি এভাবে বলতে পারেন না!
নিবৃতা শক্ত স্বরে বিরোধিতা করে উঠলো! তাবিব তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
– সত্য কথা সহ্য হয় না তাই না? তাহলে এই সত্য কেন লুকানো হলো আমার থেকে?!
– আপনি ভুল ভাবছেন।
– এতোদিনে আসলে ঠিক জায়গায় এসেছি আমি। নীরব ফারুকীর মতো লোক বাবা হলে যে তার সন্তানের কেমন দুর্দশা হওয়া সম্ভব, সেটা তো তোমাকে দেখলেই বোঝা যায়। ট্রমাটাইজড্, হেল্পলেস এন্ড ভালনারেবল!
নিবৃতা দু’হাতের তালুতে কান চাপা দিয়ে উঠলো। ওর গোটা শরীর থরথর করে কাঁপছে। এক সময় অস্থির হয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো সর্ব শক্তি দিয়ে। হঠাৎ এমনটা হওয়াতে তাবিব থেমে গেলো। অবাক হয়ে তাকাতেই নজরে এলো অতিপ্রাকৃতস্থদের ন্যায় আচরণ করা নিবৃতাকে। এভাবে উচ্চ কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো সে? তাবিবের হতবাকতা কাটলো নিবৃতার করুণ দশায়। মেয়েটার পুরো চেহারা লাল হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। কান থেকে হাত সরে সেটা দখল করে নিয়েছে আপন কন্ঠদেশ। বড় বড় করে শ্বাস ছাড়ছে কেমন করে। মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে এলো এখনই। তাবিব ভয় পেলো। হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ছুটলো বেড সাইড টেবিলের দিকে। পানির গ্লাস হাতে নিতেই ধপ করে ভারি কিছু পরে যাওয়ার শব্দ হলো। নিবৃতা শরীরের বল ছেড়ে নিচে পরে গিয়েছে৷ মেঝেতে কাত হয়ে শুয়ে গলা আঁকড়ে ধরে রীতিমতো ছটফট করছে ও। তাবিবের অসহায় লাগলো নিজেকে। পানি নিয়ে কোনমতে পৌছালো ওর কাছে। মেয়েটার কাছে গিয়ে শুনলো ওর একনাগাড়ে বিড়বিড় করে বলে যাওয়া শব্দগুলো।

– আমার বাবা আসামী নয়। আমার বাবা সবচেয়ে ভালো। সবচেয়ে ভালো৷ আমার বাবা খারাপ নয়। সবচেয়ে ভালো সে।
তাবিব ওকে বল খাটিয়ে তোলার চেষ্টা করতেই বুঝলো, নিবৃতা পুরো হাল ছেড়ে দিয়েছে৷
– ওঠো, পানি খাবে একটু। এতো অস্থির হয়ো না। শরীর আরও খারাপ করবে তো। নিবেদিতা। নিবেদিতা!
নিবৃতা হুশে নেই। নিজের অবচেতন মনে হারিয়েছে সে। তাবিব দিশেহারা হলো। অত্যাধিক ক্রোধ যে কখনও ভালো কিছু বয়ে আনে না, আজ আবারও সেটার প্রমান পেলো। আর কেউ না বুঝুক, ওর তো জানা ছিল, নিবৃতার অবস্থা ঠিক কতটা নাজুক। ও বুকের পাজর ভেঙে এলো। নিজের প্রতি ঘৃনা, বিতৃষ্ণায় অন্তর ক্ষয়ে এলো। হাঁপ ছেড়ে বদনের সমস্ত শক্তি ব্যায় করে নিবৃতাকে তুলে জাপটে নিলো বাহুডোরে। পাশ থেকে পানির গ্লাস হাতে নিয়ে ওর মুখের সম্মুখে ধরতেই মেয়েটা, আজন্ম তৃষ্ণা নিয়ে পানি পান করতে লাগলো। অতঃপর ক্লান্তিতে তাবিবের বক্ষেই ঠাই খুঁজে নিলো। চোখ দুটো বন্ধ তার। অশ্রু, ঘামে ভেজা আরক্তিম মুখটা দেখে তাবিবের বুলি ফুরালো। আজ এটা কি হয়ে গেলো? ওর সবকিছু কেমন কল্পনা ঠেকছে। কোনভাবে একটু আগের তিক্ত মুহুর্তটা মিটে গেলে কি কারও খুব বেশি ক্ষতি হতো? বরঞ্চ তাবিব হাজার শুকরিয়া জানাতো। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে, নিবৃতাকে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে বসে রইলো ও৷ শুধু চুপটি করে মেয়েটার সিক্ত কেশগুলো গুছিয়ে দিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। এই ভয়াল ঘটনার কথা, নিবৃতার বেহাল দশা, ও কখনও ভুলবে না। আর এরজন্য তো কেবল একমাত্র তাবিবই দায়ী!
অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেলেও কেউ কোন কথা বললো না৷ নাই বা তাদের অবস্থানের নড়চড় হলো। তবে এই ক্ষনকে ভেঙে দিতে তখম কলিং বেল বেজে উঠলো। সময়টা এখন প্রায় বিকেল। কে আসতে পারে? তাবিব কিঞ্চিৎ নড়ে উঠলো। বুকের কাছে তাকাতেই দেখলো নিবৃতা চুপ করে রয়েছে। চোখের পলক অবদি পরছে না ওর৷ কেমন শান্ত, নির্জীব। তাবিব গভীর করে শ্বাস টেনে বললো,

– আমি একটু দেখি আসি কে এলো।
নিবৃতা আস্তে করে সরে গেলো তাবিবের থেকে। মেঝেতে দু’হাত ঠেকিয়ে বসে রইলো। যেন শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি খুঁজে পাচ্ছে না ও। এই অবস্থা দেখে তাবিব দ্রুত উঠলো। নিজের বেশভূষা কোনমতে দু’হাতে ঠিক করতে করতে গিয়ে দরজা খুলতেই কানে সেই প্রিয় কন্ঠস্বরটি উচ্চ আওয়াজে গমগম করে উঠলো!
– সারপ্রাইজ!
সে শব্দ ঘর অবদি পৌছে যেতেই নিবৃতার টনক নড়লো। ওর চেনায় ভুল হতে পারে না। মস্তিষ্ক সচল হতেই অস্থির হয়ে আসেপাশে তাকালো। কি যে হলো, মুহুর্তে সকল দুর্বলতা গায়েব হয়ে গেলো। ও কোনমতে উঠে দাঁড়িয়ে সেখানে ছুটবে তার আগেই আয়নায় নিজের বীভৎস অবস্থা নজরে এলো। এভাবে, এই বেহাল অবস্থায়, কোনভাবেই সেখানে যাওয়া যাবে না। উল্টো ঘুরে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকলো। বেসিনে দাঁড়িয়ে পানির ঝাপটা দিলো বেশ কয়েকবার। অতঃপর ভালোমতন পরিপাটি হয়ে নিলো। যদিও এতে চেহারার অবস্থা ঢাকায় খুব বেশি একটা লাভ হয় নি৷ কিন্তু অন্তত গোছালো লাগছে। ওর আর অপেক্ষা সইলো না। চপল পায়ে চলো এলো বাহিরে। তানহা তখন বাবার বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে। সম্মুখে মা’কে দেখতেই দৌড়ে চলে এসে জাপটে ধরলো। নিবৃতাও ওকে পাল্টা জড়িয়ে ধরে, মুহুর্তে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। এই স্পর্শ, এই উষ্ণতা, এই মমত্ববোধ! কি যে স্বর্গীয় অনুভুতিতে ভরা! যদি ব্যক্ত করা যেত! অবশ্য চটপটে তানহাও আজ অনুভুতির ঝাটে ধরাশায়ী। মায়ের সাথে সেও অশ্রু ঝরাচ্ছে পাল্লা দিয়ে। এদিকে তাবিব বরাবরই নীরব দর্শক! নিবৃতাকে ছেড়ে ওর সামনাসামনি এলো তানহা। ভেজা গাল মুছিয়ে দিয়ে, নাক টেনে রসিক স্বরে বললো,

– মেয়েকে পেয়ে এখন কেমন লাগছে আমার আম্মু?
নিবৃতা হেসে ফেললো। নিজেও পরম মমতায় তানহার অশ্রু সিক্ত নরম কপোলদ্বয় নিজের ওড়নায় মুছিয়ে দিলো। একসময় কিছু একটা বলতে গিয়ে হঠাৎই অনুভব করলো ওর ভেতর থেকে কোন শব্দ আসছে না৷ গলার অভ্যন্তরীণ অংশটা আগুনে পোড়া ক্ষতের ন্যায় জ্বলছে৷ ও অবশ্য অবাক হয় নি এতে। এমনটা হওয়ারই ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎক্ষনাৎ ইশারায় গলায় হাত ঠেকিয়ে বোঝালো সে কথা বলতো পারছে না। পরপর নাকও ছুঁয়ে দিলো। নিবৃতার সাথী তানহার বুঝতে বেগ পেতে হলো না।
– ঠান্ডায় গলা বসে গিয়েছে?

নিবৃতা পর্ব ২০

নিবৃতা অকপটে মাথা নাড়লো। তানহা আফসোসের সুরে তাবিবকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– ডাক্তারের মনিটরে রেখে গিয়ে কি লাভ হলো, যদি রোগ বালাই বাঁধানোরই ছিল!
পরপর নিবৃতার আলতো চাপড় পরলো ওর বাহুতে। তানহা দন্ত কপাটি মেলে হাসলো। এরপর ওর কথায় কথায় দুজন চলে গেলো ঘরের দিকে। এদিকে বেকুব বনে তাবিব দাঁড়িয়ে। মেয়েটা স্পষ্ট মিথ্যা বললো। এতে অবাক সে। দ্বিতীয় চিন্তা এই যে, হঠাৎ করেই কেন কথা বলতে পারছে না ও? ওভাবে চিৎকার দেওয়ার কারণে? আবার কোন সমস্যা লুকিয়ে রেখেছে সে?

নিবৃতা পর্ব ২২