Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ২২

নিবৃতা পর্ব ২২

নিবৃতা পর্ব ২২
নেহার ছায়ালিপি

ঘরের প্রাণ, আজ তার আঙিনায় পা রেখেছে, ফিরে এসেছে সে। মুখরিত হয়ে উঠেছে বাড়ির প্রতিটি কোন। মিষ্টি চঞ্চলতা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বিরান দেয়ালগুলোতে। প্রাপ্তবয়স্কদের নীরবতা কেটে গিয়েছে অবুঝ প্রাঞ্জলতার প্রভাবে৷ মেঝেতে অশান্ত পায়ের ধুপধাপ আওয়াজ ছড়িয়ে পরছে ক্ষনে ক্ষনে। একবার সেটা চলছে বাবার ঘরের দিকে তো আরেকবার রান্নাঘরে, কাজে ব্যস্ত থাকা মায়ের টানে। কি যেন একটা ঠিক নেই, তবুও সেটা ধরতে বারংবার ব্যর্থ হচ্ছে তানহা। বাবা কথা বললেও এক সুপ্ত গম্ভীরতা লুকিয়ে আছে তার মাঝে, আর মা আগ্রহে, সানন্দে ওর কথা শুনলেও, বিপরীতে কিছু বলতে অপারগ৷ যথাযথ কারণের উপস্থিতি থাকলেও শান্তি মিলছে না কোন এক জায়গায়। তাইতো একবার যাচ্ছে বাবার সাথে আলাপ জমাতে, তো আরেকবার আসছে মায়ের কাছে জমে থাকা বুলি আওড়াতে।

মেয়ের আগমনে, অসুস্থ নিবৃতা এখন সুস্থ, একদম চনমনে। দুরন্ত গতিতে কদম চলছে, তুরন্ত বেগে কাজে হাত নড়ছে। অথচ বিগত মাসে, সবল, সার্মথ্যবান থেকেও দেহ ছিল বলহীন। মনে ছিল না কোন ইচ্ছে শক্তি। গুমোট, নিস্পৃহ অনুভূতির ঠায় ছিল সবটা জুড়ে। অথচ মুহুর্তে আজ সেথায় সজীবতা ছেয়ে গিয়েছে। গায়ে এপ্রোন জড়িয়ে, গভীর নিবেশে রান্নায় মত্ত নিবৃতা। মেয়ের জন্য বিশেষ আয়োজনের ব্যবস্থা চলছে।
– ঘ্রানে তো আর থাকতে পারছি না আম্মু! কখন শেষ হবে তোমার রান্না!
তানহা এসে একদম নিবৃতার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। বাহুতে মাথা দিয়ে চুলোয় উঁকি দিলো। আহ্লাদী কন্যার আদুরে স্বভাব। নিবৃতা প্রশস্ত হেসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পাঁচ আঙুল নাড়িয়ে বোঝায় আর মাত্র পাঁচ মিনিট লাগবে৷ তানহাও সহাস্যে মাথা নাড়িয়ে বলে,
– তোমার হাতে খাবো। আর কোন কষ্ট করতে পারবো না ভাই! এমনিই কতগুলো দিন বিদেশ থেকে এলাম। আর কতো?
এরূপ কথায় ওর দিকে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকায় নিবৃতা। মুখের সরু করে এমন ভাব করলো যেন বলতে চাইছে,
– তাহলে গিয়েছ কেন? তোমাকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল বুঝি? মজা করে এসে এখন মা’কে তোষামোদ করা হচ্ছে!
তানহার হাসি প্রসারিত হলো। নিবৃতাকে জাপটে ধরে বললো,

– ওগুলো তো চোখের মজা। মনের শান্তি তো আমার আম্মুর কাছেই!
সহজ সরল স্বীকারোক্তি। নিবৃতার মনটা বিগলিত হয়ে আসে। মেয়েটার তার এতোটা সোহাগী। প্রত্যেক কথায়, ভঙ্গিতে শুধু আদর ঝরে পরে৷ প্রশান্তিতে ছেয়ে যায় অন্তর।
এই নয়নাভিরাম দৃশ্যখানি অনতি দুরে দাড়িয়েই অবলোকন করে তাবিব। বুক চিরে বেরিয়ে আসে ব্যথাতুর দীর্ঘশ্বাস। তার মেয়েকে সুখ দেওয়ার জন্যই নিবৃতাকে এ সংসারে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অথচ সময়ের ফেরে, শুধু মেয়ে নয়, তাবিব নিজেও তার সুখের চাবি নিবৃতার পদধূলিতে উৎসর্গ করে দিয়েছে। কিন্তু আজ জীবনের এ পর্যায়ে এসে, যখন কিছু তিক্ত সত্য সম্মুখে চলে এলো, তখন থেকে মনটা বড্ড বিচলিত হয়ে আছে। প্রবল সংশয়, ভয় জেঁকে ধরেছে ওর পুরো অস্তিত্বকে। তানহা এবং নিবৃতা, এ দু’জন ছাড়া তাবিবের জীবনে কোন প্রাপ্তি নেই। মা যতদিন ছিলেন, ততদিন তাও তাবিব নিজের ভালো লাগা তার মাঝে বুঝে নিয়েছিল। কিন্তু তার প্রস্থানের পর যেই বিষাক্ত সময় এলো, নানান সম্পর্কের বিভীষিকাময় পরিনতি মিললো, এরপর তাবিব ব্যক্তি জীবনে সুখের আশা ছেড়ে দিয়েছিলো। ভুলে গিয়েছিল সত্যিকারের খুশি হওয়া কাকে বলে।

এরপর আঁখি এলেও কয়েক সময়ের মধুর সময় ছাড়া বাকিটা তাবিবকে ধারালো, সরু কণ্টকের মতো প্রতি নিয়ত বিদ্ধ করে গিয়েছিল। ছিন্নভিন্ন হয়েছিল হৃদয়। নিজেকে ভালো রাখার আশা ত্যাগ করেছিল অবশেষে। কিন্তু এবার যখন বুঝলো, জানলো, যে সামান্য কঠিন পথ পেরিয়ে এলেই সুখময় এক জীবনের দেখা পাবে, আদুরে ছোট্ট, পূর্ণ সংসার সাজাবে, তখনই এই ঘৃণ্য অতীত সামনে চলে এলো। এখন চেয়েও নিজেকে শান্ত রাখতে পারছে না। কোথাও মনস্থিরেও ব্যর্থ হচ্ছে ও। দ্বিধা ওকে বাজেভাবে পাকড়াও করে নিয়েছে। তবে ও জানে, স্বীয় পরিবার রক্ষার্থে ওর যা করার তাই করবে। আজ এনাম মাহমুদ নামক এক লোক সেই অতীতের সাক্ষী, কাল আরেকজন আসবে৷ এভাবে কতজনের উঠানো আঙুল ও এড়িয়ে যাবে? তাই তো ঠিক করেছে, ও দুরে কোথাও চলে যাবে। হ্যা! বহু দুর! যেখানে নিবৃতার সাথে শুধু এবং কেবলমাত্র তাবিবেরই পরিচয় সংবদ্ধ থাকবে। ফারুকী নাম মুছে যাবে ওর অস্তিত্ব থেকে!
– আরেহ বাবা! দাঁড়িয়ে আছো কেন? কিছু লাগবে?
তানহার ডাকে তাবিবের ধ্যায়ান ছুটে৷ ও নিজেকে সামলাতে সামান্য হাসার চেষ্টা করে। তবে আজ সেই হাসি ওর চোখ ছুতে অক্ষম হয়। এগিয়ে গিয়ে বলে,

– শুধু মায়ের সেবা পেলে হবে? ভাবলাম বাবাও কিছু সাহায্য করি।
তানহা দন্ত কপাটি মেলে হাসলো। তাবিব ফের বললো,
– তোমরা যাও ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি টেবিল সেট করি।
– আমিও হেল্প করি। নো প্রবলেম।
তাবিব মেয়ের চুলগুলো ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলে,
– কাল থেকে করবে। আজ টায়ার্ড না? যাও।
– আচ্ছা।
বাবা মেয়ের কথা এক প্রকার উপেক্ষা করেই চুলোয় নিজের রান্নায় মনোযোগ দেওয়ার ভান করছিলো নিবৃতা। সেই বিকেলের পর থেকে, সবকিছু কেমন অস্পষ্ট ঠেকছে ওর কাছে। ও তাবিবের উপর রাগ করে নেই। তাবিবের অধিকার ছিল, সত্য টুকুন জানার। কিন্তু সেই মুহুর্তে নিজেকে বরাবরের মতোই নিয়ন্ত্রিত করতে সক্ষম হয় নি নিবৃতা। বাবা নামক মানুষটার অবস্থান, নিবৃতার জীবনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। হয়তো, বেশিরভাগ মেয়েদের ক্ষেত্রেই তাদের বাবার চাইতে উত্তম কেও হয় না, কিন্তু নিবৃতার জীবনের কাহিনি ভিন্ন, ওর জীবনটা তো আর সবার মতো ছিল না! নিবৃতার বাবার জায়গায় অন্য কোন বাবা থাকলে কি হতো, সেটা নিবৃতা জানতে চায় না। ও যতটুকু জেনেছে, বুঝেছে, অনুভব করেছে ততটুকুই যথেষ্ট। ওর সমস্যাটা হলো, ওর পরিবার নিয়ে। কেউ কেন তাবিবকে এ বিষয়ে জানায় নি। শুধু এতোটুকুই নয়, পূর্বেও তাবিবে কথায় বোঝা গিয়েছে যে সে অনেক বিষয়েই অজ্ঞাত। কিন্তু সেটা কেন, সেটাই নিবৃতার বোধগম্য নয়।
– চলো আম্মু। ফ্রেশ হবে। ঘেমে গিয়েছ তুমি।
তানহা কথায় থেমে নেই। তৎক্ষনাৎ নিবৃতাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো নিজের সাথে। আর নিবৃতা, তাবিবের দৃষ্টির সম্মুখে দুর্বল বনে, মাথা নিচু করে চলে এলো।

খাবার টেবিলেও তানহারও নিরন্তর বলা কথাগুলো শোনা যাচ্ছে। মায়ের হাতে খাচ্ছে আর গল্প করছে। সাধারণত এ সময়ে তাবিব মৌনতাই পছন্দ করে তবে আজ এতো দিন বাদে মেয়ে এসেছে, মনটা এখনও ওর উৎসুক হয়ে আছে তাই আর কিছু বলছে না। এমনিতেই না জানিয়ে বাসায় ফিরেছে সে। চমকে দেওয়ার উদ্দেশ্য। এমনকি এয়ারপোর্ট থেকে একা এসেছে, উবার ঠিক করে। মা যতটা ভীতু মেয়ে ঠিক ততটাই সাহসী হয়ে উঠছে। তবে এতোটাও স্পর্ধা দেখানো উচিত না, যা মা বাবার মনকে শঙ্কিত করে চলে। এতোটা দুঃসাহস! বাবার থেকে কয়েকটা কড়া বানী শুনে মুখটা সারা সন্ধ্যা ওর গোমড়া করেই রাখা ছিল। পরে তাবিব বাহির থেকে ওর পছন্দের নাশতা আর ডাবের পুডিং নিয়ে আসার পর, আহ্লাদী তার কথা বলেছে। তাই এখন আর কিছু বলে, মনটা ছোট করলো না তাবিব।
– আর পারবো না খেতে। পেট ফেটে যাবে তো।
মায়ের যত্ন শুরু হয়ে গিয়েছে। জোর করে বেশি বেশি খাওয়াবে। নিবৃতা মানলো না। মেয়েকে চেপে ধরে শেষ দু লোকমা খাইয়েই ছাড়লো।

– বড় হচ্ছি। এরকম গুলুমুলু থাকলে কি আর চলবে? ভাবছি এবার ডায়েটে নেমেই যাবো। হেলদি এন্ড ক্লিন মিলই নেবো শুধু।
বলতে দেরি, দু’পাশ থেকে দু’জনের কান মলা খেতে একটুও বিলম্ব হয় নি ওর। তাবিব, নিবৃতা দু’জনেই ক্ষেপাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে। মা’য়ের জবান পরিস্থির কারণে বন্ধ থাকলেও বাবা থামলেন না।
– এতো সুবুদ্ধি আপনাকে কে দেয় শুনি?
তানহা আইঢাই করে উঠে বললো,
– তোমার ভাগনিদের থেকেই তো শিখে এলাম।
– আপনার বাবা মা আছে শেখানোর জন্য। তাই বাহিরে চোখ কান বন্ধ রাখবেন।
– আচ্ছা আচ্ছা! এখন ছাড়ো তো!
তাবিব ছেড়ে দিয়ে সরে বসলোও নিবৃতা আঙুল তুলে, চোখ রাঙিয়ে ওকে আবারও শাসিয়ে দিলো। মেয়ে এখন বড় হচ্ছে! কতোই না উদ্ভট, খামখেয়ালি কথাবার্তা যে বলবে তার হিসেব থাকবে না। আবার, বিদেশ ঘুরে আসার ফল দেখাচ্ছে। এখনই লাগাম টেনে ধরতে হবে বলে, মনে মনে স্থির করলো নিবৃতা।
তানহার মোবাইলটা বেজে উঠতেই ও লাফিয়ে উঠলো।

– আপু কল করছে। আমাকে ছবিগুলো পাঠানোর কথা ছিল। আমি কথা বলে আসি৷
সে কি আর অনুমতির অপেক্ষায় থাকে। দৌড়ে চলে গেলো ঘরে। ও চলে যেতেই কেমন অস্বস্তি নেমে এলো খাবার ঘর জুড়ে। নিবৃতা কিয়ৎক্ষণ চুপ করে বসে থাকলো। অতঃপর চুপচাপ প্লেটে ভাত নিতে উদ্যত হতেই পাশে কিছু একটা রাখার শব্দ হলো। ও আড়চোখে দেখে ধোঁয়া উঠা গরম স্যুপের বোল। গলা ব্যথায় যে ওর ঢোক গলাধঃকরণ করতেও কষ্ট হচ্ছিল সেখানে ভাত খাওয়া এক প্রকার স্বপ্নই ছিল। তবুও নিজের জন্য কিছু করার ইচ্ছে জাগে নি। তবে বরাবরের মতোই লোকটা ভুলে নি তার দায়িত্ব। যতই রাগ থাকুক, নিজ যত্নশীল সত্তা থেকে সে কঠোর, বিবেকহীন হতে পারে না।

– এটা গরম গরমই শেষ করবে। তারপর এই ঔষধটা খাবে। কাল বিকেলে আমি হাসপাতালে নিয়ে যাবো। একটা এক্স-রে করাতে হবে। আর অবশ্যই এ’কদিন কথা বলার চেষ্টায় গলায় চাপ দিবে না। যেমন সবসময় চুপ থাকতে পছন্দ করো, সেভাবে চুপই থাকবে।
থমথমে ভারি তার কথা বলার ভঙ্গিমা। তীর্যক কিছু শব্দ থাকলেও সেখানে কর্তব্যপরায়নতাও স্পষ্ট। নিবৃতা চুপ করে স্যুপের বোলটা টেনে নিলো নিজের কাছে। তাহলে তখন ওদের রান্নাঘর থেকে পাঠিয়ে এই কাজটাই করেছে সে। আড়ালে মুচকি হাসলো ও৷ মনটা তুলতুলে নরম মেঘের মতো সিক্ত হলো৷ তাবিব টেবিল গুছিয়ে নিয়ে আবার চেয়ারে বসে রইলো। কেউ খেতে বসলে তাকে একা করে দিয়ে যাওয়াটা দৃষ্টিকটু। ও অপেক্ষা করলো যতক্ষণ না নিবৃতার খাওয়া শেষ হয়। আড়চোখে দেখলো ও ঔষধ নেয় কি না। এবং ওকে সন্তুষ্ট করে নিবৃতা সকল নির্দেশনা চুপচাপ মেনে নিলো। এরপর আর তাবিব অপেক্ষা করে নি। চলে এসেছে সেখান থেকে। নিবৃতাকে একা রেখে রেখে।

ক্লান্ত তানহা আজ দ্রুতই ঘুমিয়ে গিয়েছে। মায়ের উষ্ণতা পেয়ে, তাকে জড়িয়ে ধরে, আমোদে চোখ বুজে নিদ্রায় ডুবেছে। ঘড়ির কাটা একসময় এগারোটা পেরোতেই নিবৃতা নড়েচড়ে উঠে। ধীর গতিতে তানহাকে নিজ থেকে ছাড়িয়ে নেমে পরে বিছানা হতে৷ ঘর থেকে বের হওয়ার আগে, উঁকি দেয় আরশিতে। ম্লান আলোয় নিজেকে খানিকটা পর্যবেক্ষন করে। কপালের কাছে এলোমেলো হওয়া চুলগুলো গুছিয়ে কানের পেছনে গুঁজে নিলো। মাথার ঘোমটা সুন্দরমতন টেনে এরপর চললো তাবিবের বলা ‘আমাদের ঘরের’ উদ্দেশ্যে।
এই ঘরটাতে, আপন সংস্পর্শে থাকা নিবৃতা নামক মৌন মানবীর অভাব বোধে, আজ মনটা কেমন অসাড় লাগছিল। কিছুতে মনোযোগ দিতে পারছে না ও। হাতের বইয়ে অনীহার দৃষ্টি। মনে লালিত বিষাদ। অন্যমনস্ক সকল ভাবনারা। তবে সেই শূন্যতা পুরনে যখন গুটি গুটি কদমে, পর্দার আড়াল হতে অন্দরে নিবৃতার প্রবেশ ঘটলো তখন নির্বাক হয়ে শুধু তাকিয়েই ছিল তাবিব। ও এটা মোটেও আশা করে নি। তাইতো অপ্রত্যাশিত এই কর্মে ওর চমক সরছিল না। তবে নিবৃতা যখন ওর নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে বসলে, তখন ওর বোধ শক্তি ফিরলো। দৃষ্টি সরিয়ে এলোমেলো ভাবনাদের সংযম টেনে বললো,

– কোন প্রয়োজন?
কি প্রয়োজন? নিবৃতার কাছে এর উত্তর নেই। ও চুপ করে রইলো। তবে এই নীরবতার মাঝে থাকা উত্তরটা তাবিবের পছন্দের হলেও কেন যেন আজ মন কিছুতেই সায় দিচ্ছে না। একটু আগেও মন পুড়ছিলো। এখন কাছে পেয়ে গ্রহনেও দ্বিধা।
– মেয়ে অনেক দিন বাদে বাসায় ফিরেছে। ওকে সময় দাও। আমার চিন্তা করতে হবে না।
আবারও সেই ভারিক্কি কণ্ঠস্বর। নিবৃতা চোখ তুলে চেয়ে দেখলো, মানুষটা ওর দিকে তাকিয়ে নেই। হাতে কি এক উটকো বই ধরে রেখেছে, সেখানেই তার সকল মনোযোগ। জনাব রাগ করেছে। কোথায়? নিবৃতাও তো তাহলে পারতো আক্রোশ দেখাতে, সে কি করেছে সেটা? না তো! তাবিবও তো ওর সাথে কর্কশ ব্যবহার করেছে। তবুও নিবৃতা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় নি। নিবৃতা অবুঝ হয়েও যদি এমন কিছু না করে তাহলে, বুঝদার তাবিব কেন আজ আপোষহীন। নিবৃতা নড়লো না। ঠাই বসে রইলো নিজ জায়গায়। সেটা লক্ষ্য করে খানিকবাদে তাবিব আবারও বললো,

– যাও ঘুমিয়ে পরো। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমিও ঘুমাবো।
নিবৃতা কি তার ঘুমের রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে? পথে কোন অবরোধ জড়ো করেছে? ঘুমাক তাহলে। নিবৃতাকে কেন যেতে হবে? নিজেই বললো, এটা তোমারও ঘর। তাহলে নিবৃতার ইচ্ছে ও যাবে না থাকবে। এরই মাঝে তাবিব বেড সাইড টেবিলে বইটা রেখো দিয়েছে। চোখ থেকে চশমাটা খুলে, আস্তেধীরে নিজ জায়গায় শুয়ে পরলো। কপালের উপর হাত ঠেকিয়ে রেখে বললো,
– যাওয়ার সময় লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে যেয়ো।
এতোটা অবহেলা! চরম উপেক্ষা! নিবৃতার মোলায়েম মনে আঘাত লাগলো। ঠোঁট ভেঙে কান্না চলে এলো। পারলো না আর বসে থাকতে। উঠে এলো সহসা। জেদও জমলে মনে। ভারি পায়ে মৃদু আওয়াজ করে ছুটে এলো ঘর থেকে। আলো তো নিভিয়ে দিলোও না উল্টো আসার সময় দরজাটা বেশ শব্দ করে ভিড়িয়ে দিয়ে এলো, যেন প্রলয়ের ঝাপটা! যার কারণে চমকে তাকিয়ে উঠে বসলো তাবিব। বিশ্বাস হলো না এ কোন নিবৃতাকে দেখলো ও!

সকালে নাশতার সময়ে তাবিবের কাছে এক অপ্রত্যাশিত কল এলো। নামটা দেখতেই ও ছুটে গেলো ঘরে। পুরো আধ ঘন্টা পার হয়ে গেলেও ও যখন এলো না, তখন তানহাকে খাইয়ে ঘরে পাঠালো নিবৃতা আর নিজে বসে রইলো টেবিলে, তাবিবের অপেক্ষায়। শত অভিমান জমে থাকুক লোকটার নামে, নিজ দায়িত্ব কর্তব্যের হেরফের ও করবে না। মাথা নামিয়ে ও অন্যমনস্ক হয়েই বসে ছিল, তখন তাবিব দ্রুত কদমে এলো। বেখায়ালে মোবাইলটা ঠিক নিবৃতার সম্মুখে রেখে গুরুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে বললো,
– খুবই স্পেশাল একজন গেস্ট আসবেন এ সপ্তাহের মাঝেই। আমার অত্যন্ত কাছের মানুষটা। তোমাকে জানিয়ে রাখলাম, তার আপ্যায়নে কোন ত্রুটি রাখা যাবে না। প্রয়োজনে যা যা লাগবে, তার সব মিলিয়ে একটা লিস্ট করে দিয়ো।

তাবিব নিজের মতো বলে যেতে লাগলো নানান কথা। সে আসলে খুবই উৎসুক হয়ে পরেছে। তবে নিবৃতার কানে আর কিছুই পৌছালো না। ওর নিষ্পলক দৃষ্টি মোবাইল স্ক্রিনেই নিবদ্ধ ছিল। যখন গিয়ে স্ক্রিনের জ্বলজ্বলে আলোটা নিভে এলো তখন আচমকাই ও দাঁড়িয়ে গেলো। কোনকিছু না বলেই চপল কদমে চলে গেলো নিজের ঘরে। হঠাৎ কি হলো সেটা বোধগম্য হলো না তাবিবের। এখনই তালিকা তৈরি করতে চলে গেলো কি? হয়তো। ও নির্বিগ্নে খেতে বসলো। কিন্তু মাঝপথে ওকে থামাতে মোবাইল টুংটাং শব্দ করে উঠলো। মিসেস তানজীব’ নামটা ভেসে উঠেছে। একই ছাদের নিচে উপস্থিত থেকে আবার বার্তা পাঠানো হচ্ছে কেন? ও কৌতুহলে সেটা পড়ার জন্য উদ্যত হলো।

নিবৃতা পর্ব ২১

– গতকাল মা বাসায় এসেছে। আপনার যা যা জানার ইচ্ছে, সেটা এখনই গিয়ে জেনে আসবেন। এখনই!
তাড়া দিয়ে বলছে! তাবিব বাকি খাবার টুকুন আর শেষ করার স্পৃহা পেলো না। ওকে এখনই যেতে হবে। ইতিমধ্যে বেশ অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে। অপচয় করার মতো সময় আর অবশিষ্ট নেই। ও তৎক্ষনাৎ উঠলো। ওয়ালেট আর গাড়ির চাবি নিয়ে কোন রকমে বের হয়ে গেলো বাসা থেকে।
আজ এমন কিছু সত্য ও অসহনীয়, কালো অতীত থেকে পর্দা সরানো হবে, যেগুলো জানতে পেরে, হয়তো তাবিব নিজেই বলতে বাধ্য হবে, যদি এগুলো আমাকে কখনও শুনতে না হতো!

নিবৃতা পর্ব ২৩