Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ২৩

নিবৃতা পর্ব ২৩

নিবৃতা পর্ব ২৩
নেহার ছায়ালিপি

সময়টা তখন একুশ শতকেরও পূর্বে! এই মৌসুমে, লিলুয়া বাতাসে মুখরিত চারপাশ। গাছে গাছে গজিয়ে উঠা সবুজ, চকচকে পাতা ও পত্রমুকুল দেখা যায়। বাহারি রঙিন ফুল, পুষ্প ও আম কুড়ির ঘ্রাণে মাতোয়ারা পরিবেশ। দিবাকরের মোলায়েম রশ্মিতে ধরণী, ধীরে ধীরে নব প্রাণে সঞ্চারিত হচ্ছে। থেকে থেকে, আড়াল হতে কোকিলের সুর ভেসে আসে। পরিষ্কার, স্বচ্ছ আকাশে পাখিদের ঝাঁক বেঁধে উড়তে দেখা যায়। শীতল মরসুমের নির্জীবতা কেটে প্রকৃতিতে উচ্ছ্বাস ফিরে আসছে। বসন্ত রমরমা হয়ে উঠেছে মধুর কলতানে৷ নিসর্গের নতুন করে সেজে ওঠা এই নয়নাভিরাম দৃশ্য, মানবজীবনে নতুন আশা জাগায়। উদ্বুদ্ধ করে নয়া জাগরণে মেতে উঠতে। অনুপ্রাণিত করে সবকিছু আবার শুরু করতে। মন মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলে ইতিবাচক মনোভাব।

এমনই প্রাঞ্জল এক দিনে, নীরব ফারুকীর কোল আলো করে আগমন ঘটেছিল তার ফুটফুটে নবজাতক কন্যার।
অধ্যাপক এবং সফল ব্যবসায়ী নীরব ফারুকী এবং শিউলি জামানের ছিল ছোট্ট একটি সংসার। বড় ছেলে নিভানকে নিয়েই বুনেছিলেন সকল স্বপ্ন। তবে স্বপ্নর পরিধির সম্প্রসারণ ঘটাতে দীর্ঘ এক যুগ পরে, আবারও পিতৃত্ব লাভ করেন নীরব। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অধিকারী ছিল তার কন্যা। শুভ্র ত্বক, লালচে, কোমল ওষ্ঠ, শৈল্পিক গড়নের মুখমন্ডল, বাদামী ধাঁচের চুল। প্রথম দৃষ্টিতে যে কেউ-ই নজর ফেরাতে ব্যর্থ! হৃদয়ে দোলা সৃষ্টি করার মতোন রূপ! নীরব ফারুকী এবং শিউলির মন ভরে না মেয়েকে দেখে। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতার কোন কমতি থাকে না। ধীরে ধীরে নিজ পরিবারের প্রাণ হয়ে উঠে সেই বাচ্চাটি। হাসিতে যেন মুক্তো ঝরে। খিলখিলে শব্দ কানে মধুর ঝংকার তুলে। বাবা ভালবেসে নাম রাখলেন, ‘ নিবেদিতা ফারুকী নিবৃতা’। নিবেদিতা নামের মাধ্যমে, স্বীয় কন্যাকে মহান রবের নামেই নিবেদিত করেছিলেন নীরব। আর নিবৃতা নামের স্বার্থকতা প্রমানে, বাচ্চা সে ছিল সত্যিই শান্তশিষ্ট। ছোটবেলা থেকেই হাসি খুশি ধরনের। কান্না কাকে বলে, সেটা ওর জানাই ছিল না। যেই আসবে, তাকে প্রথম দর্শনেই হৃদয় শীতল কারী হাসি সে উপহার দিবে। তাইতো যে-ই ওকে দেখতো, ভালো না বেসে থাকতে পারতো না। এভাবেই মায়ের যত্ন, বাবার অফুরন্ত ভালোবাসা, আদর এবং বড় ভাইয়ের খেলার সঙ্গী হয়ে নিবৃতা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছিল। ছিল সুখী এক পরিবারের অংশীদার। যাকে কখনো কোন সমস্যা কিংবা দুঃখ ছুঁয়ে দেওয়ার স্পর্ধা করে নি, একমাত্র ওর বাবার জন্য। নীরবের জন্য, তার মেয়েই ছিল সব।

সাল – ২০০৭
সকাল এগারোটা পেরিয়েছে। বিদ্যালয়ের মুল ফটকের সম্মুখে ভীড় জমে গিয়েছে ইতিমধ্যে। বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছেন। তাই তো, চেনা মুখটা নজরে আসার জন্য সকলেই উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে। এক সময় দপ্তরির হাতে ভারি লোহার বস্তুে আঘাত পরলো। কাঙ্ক্ষিত এই তীক্ষ্ণ ধাতব শব্দ কানে বাজতেই, অবুঝ প্রাণদের মাঝে হৈ হুল্লোড় লেগে উঠলো। একেকটা নিষ্পাপ মুখশ্রী জুড়ে চওড়া হাসি ফুটে উঠছে। প্রত্যেকে যেন জীবন্ত রঙিন, সতেজ পুষ্প। সকলেই ত্রস্ত দাঁড়িয়ে, বের হতে উদ্যত। প্রথম সারিতে বসা কেউ কেউ, ব্ল্যাক বোর্ড মোছায় উড়ে আসা সাদাটে চকের গুঁড়ো ঝেড়ে ফেলছে রেশমি চুল থেকে। পরপর দেহের সাপেক্ষে তুলনামূলক ভারি ব্যাগগুলো কাধে চাপিয়ে, ওরা ছুটছে চপল পায়ে। শিক্ষকের নির্দেশনায়, লাইন ধরে একে একে বের হয়ে যাচ্ছে শ্রেনীকক্ষ থেকে। পেছনে ফেলে আসছে এতক্ষণের জমে ওঠা অবুঝ আড্ডা, পড়ার প্রতিযোগিতা এবং সাদা চকের ঘ্রাণ। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে শিক্ষককে সালাম জানাতেও কেউ ভুলে নি। বরঞ্চ কে আগে বলবে, কারটা সবচেয়ে জোড়ে শোনা যাবে, সেই প্রতিদ্বন্দে লিপ্ত এরা।

মাঠ প্রাঙ্গনে পৌছতেই, দারোয়ান চাচা, তটস্থ হয়ে খুলে দিলেন, লোহার ভারি দরজাটা। তবে বেশ সতর্ক সে। যে অভিভাবক এগিয়ে আসছেন, ঠিক তার কাছেই নির্দিষ্ট বাচ্চাকে হস্তান্তর করা হচ্ছে। বাবা মায়েদের দেখে কি খুশি তারা। এখনই তাদের বিগত কয়েক ঘন্টায় জমে উঠা গল্পগুলো বলে উঠতে যেন ভীষন মরিয়া! সন্তানের নাজুক কাঁধ থেকে, ব্যাগটা সন্তর্পনে তুলে নিয়ে, আরেক হাতে, কোমল ছোট্ট হাত আঁকড়ে ধরে, প্রস্থান ঘটছে এতক্ষণের অপেক্ষাকৃত মানুষদের।
এরকমই চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে ছিল, কোনায় দাড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক প্রাণ। গোলগাল ক্ষুদ্রাকার একটি মুখ। ডাগর ডাগর দুটো চোখ। লম্বা চুলে, দু পাশে দুটো ঝুটি করে রাখা। পরনে স্কুল ইউনিফর্ম। পীঠে ঝোলানো ব্যাগ।
– নিবৃতা, আম্মা!
পরিচিত কন্ঠের ডাক। ছোট নিবৃতা চওড়া করে হেসে উঠলো। চঞ্চল কদমে দ্রুতই এগিয়ে গেলো সম্মুখে। আগন্তুক ওকে সোজা কোলে তুলে নিলেন। সুস্বাস্থ্য ও উচ্চতার নিবৃতাকে তোলায় তার মাঝে কিঞ্চিৎ ভারসাম্যহীনতা পরিলক্ষিত হলো না, যেন মেয়ের আমোদই তার কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ! নিবৃতা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললো,

– তুমি আজ ক্লাসে যাও নি আব্বু?
নীরব গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলেন,
– না আম্মা। আজ বাসায় মেহমান আসবেন, তাই যাই নি।
নিবৃতা হেসে উঠলো। আজ তাহলে আব্বু সারাদিন বাসায়? কতো মজা হবে তাহলে! ও আহ্লাদী স্বরে বললো,
– জানো আব্বু, আজ অংক খাতা দিয়েছে।
– আমার আম্মা নিশ্চয়ই সবচেয়ে ভালো করেছে!
নিবৃতা সবেগে মাথা নেড়ে বললো,
– বিশে বিশ পেয়েছি আব্বু। ক্লাসে হাইয়েস্ট!
– এই তো! আমার আম্মাই তো পারবে। আমি তো জানি।
নিবৃতা সম্মুখে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলো,

– তাহলে মজা দাও!
নীরব হেসে উঠেন শব্দ করে। মেয়ে তার সবদিক থেকেই অসাধারণ। তুখোড় মস্তিষ্কের অধিকারী। ছোট থেকেই রোল নম্বর এক। পড়ালেখার পাশাপাশি সব বিষয়েই ওর জ্ঞান রয়েছে এবং সেটা একটু বেশিই যেন। মেয়েও তার বড্ড আগ্রহ দেখায় এসবে। তাই তো গর্বে নীরব শান্তি অনুভব করেন। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা।
গাড়িতে নিবৃতা বসিয়ে রেখে, কয়েক মুহুর্তের মধ্যে আবার চলেও এলেন। হাতে পেস্ট্রি। নিবৃতার অত্যন্ত পছন্দের একটি খাবার।
– আমার আম্মার জন্য।
নিবৃতার খুশি তখন সপ্তম আকাশ ছুঁয়েছে। সে লাফিয়ে উঠে লুফে নেয় ওর বলা ‘মজা’। অতঃপর বাড়ির পথটুকু চললো, বাবা মেয়ের নানান গল্পে! যা শুধু মিষ্টি, স্মরণীয় স্মৃতি হয়ে জমা থাকলো, নীরবের হৃদয় জুড়ে।

দুপুরের দিকে, ফারুকী নিবাসে আগমন ঘটলো, নীরবের এক বিশেষ মেহমানের। নীরবের সাথে কিছু দিন হলো তার পরিচয়ের, মূলত ব্যবসায়িক প্রসঙ্গেই। দুজনে মিলে একটি কারখানা স্থাপনার চেষ্টায় আছেন। নীরব এই শাখায় সম্পূর্ণ নতুন। তার অভ্যাস, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করার। এবার কৌতুহল জেগেছে পোশাক শিল্পের প্রতি। বাংলাদেশ এই শাখাটি অন্যন্যদের তুলনায় বেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। যার কল্যাণে, দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। তাই নীরবের এই খাতেই ব্যয় করার ইচ্ছে জাগলো। গার্মেন্টস্ ফ্যাক্টোরি খোলার স্বপ্ন। সে সুবাদেই এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয়। সেখানেই সৌজন্যতা বাড়াতে নীরব তাকে আজ বাসায় নিমন্ত্রিত করেছেন।
রুবেল হোসেন নামক ভদ্রলোক এবং নীরব প্রায় সমবয়সী। মধ্যবয়স্ক বাঙালি সাধাসিধে গড়নের শ্যামল বর্ণের পুরুষ। তবে নীরব তার চেয়ে উচ্চতায় বেশ এগিয়ে আছেন। ফারুকী নিবাস, বেশ পরিপাটি, জাঁকজমক পূর্ণ এর পরিবেশ। এ বাড়ির কর্তা নিজেই অত্যন্ত শৌখিন। এবং তার রুচিবোধ এ ঘরের প্রতি আনাচে কানাচে স্পষ্ট।

– আপনি এসেছেন, আমি অনেক খুশি হয়েছি। তবে দাওয়াত তো সপরিবারে ছিল। ভাবি আর ছেলেকে নিয়ে এলেন না কেন?
নীরবের নরম অভিযোগে রুবেল হোসেন সামান্য হাসেন। ঠান্ডা শরবতের গ্লাস হাতে তুলে বলে,
– ওরা তো ঢাকার বাহিরে থাকে ভাই। আর ছেলেরও পরীক্ষা চলে। তাই রুনা আসতে পারলো না। তবে সমস্যা নেই। একবার যাওয়া আসা শুরু হলে, সেটা তো চলতেই থাকবে। কি বলেন?
রুবেলের রসিক স্বরে নীরব হেসে উঠেন। সায় জানিয়ে বলেন,
– সেটা ঠিক বলেছেন ভাই।
– তা আপনারা বাচ্চারা কোথায়? ডাকেন। ওদের সাথে দেখা করি।
নীরব উচ্চ স্বরে ডেকে উঠলেন,
– নিভান, নিবৃতা। এদিকে আসো।
কয়েক মুহুর্ত বাদেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে নিভান৷ বিশ বছর বয়সী সে, এখনই দেখতে বেশ সুপুরুষ। প্রশংসনীয় অবকাঠামো। আগত বছরেই সে এইচএসসি পরীক্ষা দিবে। ভাই-বোন তারা দুজনই মেধাবী৷ নিভানও তার সম্পূর্ণ মনোযোগ পড়ালেখায় নিবদ্ধ করে রেখেছে। সামনে বসা বাবার বয়সী লোকটাকে নিভান আন্তরিক কন্ঠে সালাম জানালো,

– আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল।
– আরেহ এতো ফর্মালিটিজ করতে হবে না। আসো, আমার পাশে বসো।
লোকটা সালামের জবাব এড়িয়ে গেলো। নিভানের পছন্দ না হলেও সে চুপচাপ গিয়ে বসলো তার পাশে।
– কোন ক্লাসে এবার?
– ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে।
রুবেল অবাক গলায় বলেন,
– তাই?! দেখে তো মনেই হয় না! বড় হয়ে গিয়েছ।
সামান্য অস্বস্তি বোধ হলেও চেপে গেলো নিভান৷ কিছু কিছু গুরুজনেরা সবসময় কেমন করে যেন মন্তব্য করেন! নিভান প্রত্যুত্তরে সামান্য হাসলো।
– আমার ছেলেটা এবার ক্লাস নাইনে। তোমার জুনিয়র!
এভাবেই কথোপকথন চলার মাঝেই হাজির হয় নিবৃতা। গুরুত্বপূর্ণ মেহমান আসবেন বলে, মা ওকে সাদা একটা ফ্রক পরিয়ে দিয়েছেন। পীঠের নিচ অবদি ছোঁয়া চুলগুলো বিনুনি পাকানো। সফেদ জামায় শুভ্র ত্বক যেন আরও ফুটে উঠেছে। গোল মুখশ্রীতে গোলগাল গাল দুটো লালচে দেখাচ্ছে। কি ভীষন আদুরে বাচ্চা! সবার ন্যায় রুবেলেরও সেখানে চোখ আটকে গেলো।

– এদিকে আসো আম্মা!
বাবার ডাকে নিবৃতা ঠোঁট ছাড়িয়ে হাসলো। পরপর দুরন্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে, বাবার কোল ঘেঁষে দাঁড়ালো।
– সালাম দাও আম্মা।
– আস সালামু আলাইকুম।
চিকন, মিষ্টি কন্ঠ! রুবেলের কি হলো, সে ভুল হলেও সালামের জবাবটা দিলো।
– ওলাইকুম সালাম। কি নাম তোমার আঙ্কেল?
– নিবেদিতা ফারুকী নিবৃতা!
একদম স্বচ্ছ উচ্চারণ! রুবেল বিমোহিত স্বরে বললেন,
– তোমার মতো, তোমার নামটাও অনেক সুন্দর।
ছোট্ট নিবৃতা লজ্জা পেলো, আড় নজরে বাবার দিকে তাকিয়ে চোখে হাসলো। নীরবও প্রশস্ত হেসে মেয়ের কপালের চুলগুলো গুছিয়ে দিলেন। কথাবার্তা জমে উঠলো এক সময়, তবে এক জোড়া চোখ ঘুরেফিরে সেই একই মুখ পানে নিপতিত হতে ভুলে নি। ছোট সে বুঝতেও পারলো না, তার সাথে করা এতো মিষ্টি, সহজ ব্যবহার, আদরের পিছনে লুকায়িত থাকতে পারে কোন অযাচিত ভয়ংকর মনোভাব।
যাওয়ার আগে, সুযোগ বুঝে নিবৃতার মাথায় হাত বুলিয়ে রুবেল বললেন,
– আবারও দেখা হবে আঙ্কেল।
– আচ্ছা।
নিবৃতার শিশুসুলভ উত্তরে রুবেলের ঠোঁটের কোনে থাকা হাসির রেখা আরও গাঢ় হয়।

বেশ কয়েকদিন পেরিয়েছে ইতিমধ্যে। সবাই নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত, কর্মমুখী। আজও তেমন সরব একটি দিন। যথা সময়ে, এগারোটা পেরোতেই, স্কুলের ঘন্টা পরে। নিবৃতা অপেক্ষায় ছিল ওর মায়ের। ওর আব্বু, এসময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন। তবে আজ কয়েক মিনিট পেরিয়ে গেলেও, মায়ের দেখা পেলো না নিবৃতা। ছোট তার মনটা বেশ অস্থির। আব্বু বারবার বলে দেয়, গেট পেরিয়ে যেন ও কখনই না বেরোয়। নিবৃতাও সে কথা মেনে চলে। কিন্তু এর আগে ওকে নিতে আসায়ও কখনও দেরি হয় নি। তাই তো, অন্যন্য শিক্ষার্থীদের আড়ালে ও এবার নিজেও বের হয়ে এলো। উদ্দেশ্য, আসেপাশে ভালোভাবে তাকিয়ে মা’কে খোঁজা। যদি না পায়, তাহলে আবার ভেতরে চলে যাবে। ওর চোখদুটো চারপাশে ঘুরছিল, তন্মধ্যেই পেছন থেকে একটি টান এলো। তৎক্ষনাৎ উল্টো ঘুরে যায় নিবৃতা। সম্মুখে একটি লোক দাঁড়ানো। মাথায় ক্যাপ। নিবৃতা ভয় পেলো, অপরিচিত কাওকে দেখে। সেই ভাব চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠতেই, লোকটি নিচু হলে। ক্যাপটা হালকা সরিয়ে দিয়ে বললো,

– আমাকে চিনতে পেরেছ আঙ্কেল?
পরিচিত মুখ দেখে নিবৃতা কিছুটা শান্ত হলো। মাথা নাড়িয়ে বললো,
– জ্বি আঙ্কেল।
– আজ আমি তোমাকে নিতে এসেছি।
অবুঝ সে বললো,
– কেন?
– সেদিন তোমাদের বাসায় আমার দাওয়াত ছিল না? আজ আমার বাসায় তোমরা যাবে।
একটু হলেও নিবৃতা বুঝেছে। কিন্তু মুখটা ছোট করে বললো,
– মা আসবে না?
– সবাই আমার বাসায় আছে। তোমার জন্য অপেক্ষা করছে! নতুন জায়গা তো কেও চিনে না। তাই আমি তোমাকে নিতে আসলাম।
– আচ্ছা।
– চলো তাহলে।
নিবৃতার হাত আঁকড়ে ধরে রুবেল চললেন তার গাড়ির উদ্দেশ্যে। গত দু সপ্তাহ যাবত এই স্কুলের চক্কর কাটছে সে। অবশেষে আজ গিয়ে কাজ হলো। হাঁটতে হাঁটতেই মুখে ফুটে উঠলো পৈশাচিক হাসি!
নিবৃতারা ও প্রান্তে যেতেই শিউলিকে ছুটে আসতে দেখা যায়। মাঝ রাস্তায় হঠাৎ করেই গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পরে সমাধান না পেয়ে, দ্রুত রিক্সায় চড়ে বসেছেন কিন্তু তবুও অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে। মেয়ে তার যেই অস্থির প্রকৃতির! নিশ্চয়ই কাওকে না পেয়ে, এতক্ষণে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন এই রাগ ভাঙাতেও তাকে শ্রম দিতে হবে। বাবার আহ্লাদী কন্যা!

ঢাকার একটি নিস্তব্ধ এলাকা, আসেপাশে মানুষের সংখ্যা কম। মাঝে যথেষ্ট পরিমান ফাঁকা রেখে পাশাপাশি দালান গড়ে উঠেছে। এমনই এক চার তলা বিশিষ্ট ভবনে নিবৃতাকে নিয়ে এসেছে রুবেল। এখানেই, তিন তলায় তার একটি ফ্ল্যাট আছে। খুবই কম এখানে আসা হয়। মূলত কিছু প্রয়োজনেই। দরজা খুলতেই এক ধরনের উটকো গন্ধ এসে নাকে লাগলো। এবার বেশ ব্যবধানে এখানে এসেছে রুবেল। তাই বাসায় ময়লা, ধুলো জমেছে। পরিষ্কার করা হয় নি। অন্ধকারাচ্ছন্ন এমন পরিবেশ দেখে ছোট্ট নিবৃতা ভয় পেলো। অজান্তেই রুবেলের শার্টের এক প্রান্ত আপন কোমল মুঠোয় পুরে নিলো। যা দেখে নোংরা হাসলো রুবেল। অবুঝ, নিষ্পাপ নিবৃতা বুঝলোই না যাকে ভরসা করে সে এখানে এখন অবদি দাঁড়িয়ে আছে, সে আদতেও কোন রক্ষক নয়।
– সবাই কোথায়?
নিবৃতার ভীত কন্ঠে রুবেল কোন জবাব দিলো না। নিবৃতাকে টেনে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজাটা আঁটকে দিলো। অতঃপর দেয়াল হাতড়ে আলো জ্বালিয়ে দিলো। এটা ডাইনিং স্পেইস। অনেকটাই খালি। একটা ফ্রিজ, প্লাস্টিকের একটি টেবিল ও দু’টো চেয়ার ছাড়া কিছুই নেই। জানালাগুলো সব মোটা পর্দায় আবৃত। তাই বাহিরি আলো প্রবেশের সুযোগ নেই। এই ফ্ল্যাটে মোট দু’টো কক্ষ। রুবেল কিছু না বলেই, নিবৃতাকে পীঠ থেকে আগলে নিয়ে চললো একটি ঘরের অভিমুখে। তবে ততক্ষণে নিবৃতা অশান্ত। এ কোথা চলে এলো ও? মা, আব্বুই বা কোথায়? কেমন অন্ধকার জায়গাটা। বাজে গন্ধ! ও অস্থির হয়ে বললো,

– আব্বু কোথায় আঙ্কেল?
রুবেল কোন জবাব দিলো না। আলো জ্বলতেই স্পষ্ট হলো মাঝারি আকৃতির একটি ঘর। মধ্যখানে একটি অগোছালো খাট ও একটি আলমারি ছাড়া কিছুই নেই। রুবেল পিছু ঘুরলো। কিছু না বলেই নিবৃতাকে কোলে তুলে খাটে বসিয়ে দিলো। পরপর হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,
– অনেক ভারি তুমি!
নিবৃতা গুটিয়ে গিয়েছে। অতিমাত্রায় ভয় ওকে এবারে গ্রাস করে নিতে শুরু করেছে। ডাগর ডাগর চোখ ভরে এবারে অশ্রু নামলো। ঠোঁট কেঁপে উঠলো ভীষন করে। রুবেল দৃষ্টি সরালো। সময় অপচয় না করে চললো আলমারির দিকে। স্টিলের পুরোনো আলমারি৷ খুলতেই বিরক্তিকর ধাতব আওয়াজ করে উঠলো। সেখানেই কতক্ষণ লাগিয়ে বেশ কিছু জিনিস বের করলো সে। শেষে বের করলো একটি রুমাল। অতঃপর সেগুলো নিয়ে চললো, জড়সড় হয়ে বসে থাকা নিবৃতার দিকে। নাদান নিবৃতা, তখন মাথা নিচু করে, হেঁচকি তুলে কাঁদছে। সম্মুখে সে লোকটা এসে দাঁড়াতে দেখতে পেয়েই ওর সর্বাঙ্গ থরথর করে কেঁপে উঠলো। অজানা আশংকায় কন্ঠতালু শুঁকিয়ে এলো। ছোট্ট বদন শীতলায় ছেয়ে গেলো। রুবেল তখন নিবৃতার লম্বা লম্বা চুলগুলোতে হাত দিয়েছে।

– তোমার এই চুলগুলো আমার অনেক ভালো লেগেছে। সো শাইনি এন্ড সফ্ট।
বলেই হাতের জোর বাড়লো আচমকা! নিবৃতার চুলে জোরালো টান লাগলো। ও ব্যথায় কুকিয়ে উঠলো তৎক্ষনাৎ। ভয়ার্ত চোখে তাকাতেই দেখলো, ভয়ংকর এই লোকটার হাতে কাঁ/চি ধরা। ওর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে এলো। কিছু একটা বুঝতেই জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো, যা সরাসরি রুবেলের কানে বাজলো! মেজাজ বিগড়ে এলো সহসা। দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত হাতের চড় বসালো নরম গালে। ভারি বল সইতে না পেরে নিবৃতা গিয়ে পরলো খাটের মাঝে। রুবেল বাজে এক গালি উচ্চারণ করে ব্লে/ডের পাশে রাখা রুমালটা হাতে নিলো, পরপর নির্দয়ের মতো সেটা গুঁজে দিলো নিবৃতার মুখের ভেতর। বন্ধ করে দিলো ওর আওয়াজ! এদিকে নিবৃতা প্রাণ পনে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেও সেটা আর পর্যাপ্ত হলো না। গুমোট হাহাকার করে সেটা বাতাসে মিলিয়ে গেলো।

মেয়েকে না পেয়ে শিউলি তখন পাগলপ্রায়। পুরো স্কুলেী আনাচে কানাচে খুঁজেও নিবৃতাকে পাওয়া যায় নি৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মেয়ে হিসেবে নিবৃতাকে, এখানকার সকলেই চেনে। শিক্ষকবৃন্দ থেকে কেরানী পর্যন্ত ওকে স্নেহের দৃষ্টিতে দেখে। আগলে রাখে। আজ সেখানেই, ওকে পাওয়া যাচ্ছে না, এ খবরে এক হুলস্থুল অবস্থা বেঁধে গিয়েছে। নিবৃতা বুদ্ধিমতী হলেও সরল সোজা বাচ্চা। পরিবারের অতিরিক্ত ভালোবাসায় বড় হওয়া ও, কোন জটিলতাই বোঝে না। ওকে সর্বদা এমনভাবে আগলে রাখা হয় যে, কখনও সেগুলো বলারই প্রয়োজন পরে নি৷ আর কিই বা বলবে? সবে সাত শেষে আটে পা দিলো বাচ্চা মেয়েটা। চিন্তায় শিউলির শরীর খারাপ হয়ে আসছে। মেয়েকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারে না তারা। এখন কি হবে? শেষে বাধ্য হয়ে নীরবকে যখন জানালো হলো, তখন কথা অসমাপ্ত রেখেই উনি কল কেটে দিয়েছেন। তার ওতটুকু বাচ্চাটাকে বলে পাওয়া যাচ্ছে না। এসবও শুনতে হয়? ভদ্রলোক এক প্রকার ছুটতে ছুটতে এসেছেন।

– তোমার কেন দেরী হলো নিবৃতাকে নিতে যেতে?
স্ত্রীর উপর নীরব এক প্রকার চেঁচিয়েই উঠেছেন। শিউলি তখন ওড়না চেপে কেঁদেই চলেছেন। কোনরকমে বললেন, গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল মাঝ রাস্তায়। নীরব কি করবেন ভেবে পেলেন না। কত ধরনের চিন্তা যে মাথায় আসছে, সেটা বর্ণনাতীত! নিভান বাসায় নেই। সে খবর পাওয়া মাত্রই বোনের খোঁজে চলে গিয়েছে। এভাবে হাতে হাত রেখে বসা থাকা যায় না কি? কয়েক মুহুর্ত চুপ থেকে নীরব উঠে বেরিয়ে গেলেন বাসা থেকে। যেখান থেকেই হোক, মেয়েকে তো তিনি খুঁজে আনবেনই।

ধরনীতে আঁধার নেমেছে বেশ খানিকক্ষণ হলো। একটু পরই গভীর রাত ঘনিয়ে আসবে। ডাইনিং স্পেইসের চেয়ারে বসে ছিল রুবেল। সম্মুখ টেবিলে এঁটো প্লেট পরে আছে। বাহিরে গিয়েছিল সে। হালকা ঘোরাফেরা করে শেষে খাবার কিনে নিয়ে এসেছে। এই তো একটু আগেই পেট পুরে খেলো। এখন চেয়ারে বসে, অন্য চেয়ারে পা তুলে, সিগা/রেটে লম্বা টান বসাচ্ছে। চোখেমুখে তার শান্ত ভাব। যেন ভীষন তুষ্ট! হঠাৎ চোখ পরলো ঘড়ির দিকে। রাত সাড়ে ন’টা পেরিয়েছে। এবার কাজে নামতে হবে। চট করে উঠে দাঁড়ালো ও। গায়ে থাকা শার্টটা খুলে নিলো এক টানে৷ বিকেলেই গোসল সেরেছে। আবার যদি নষ্ট হয়ে যায়! পায়ে পায়ে চলে এলো সে ঘরে। সুইচ বোর্ডে চাপ দিতেই আলোকিত হলো জায়গাটি, সাথে উন্মুক্ত হলো বিভীষিকাময় এক দৃশ্য। যদিও এতেই রুবেলের তৃপ্তি লুকিয়ে! সেখানকার অবস্থা শোচনীয়। লাল তরলে রঞ্জিত বিছানার পুরো চাদর। মাঝে পরে আছে বিব/স্ত্র, ছোট একটি দেহ, যা পুরোটাই ক্ষত বিক্ষত। পাশবিক নির্যাতনের স্পষ্টতা প্রতিটি কোনে ছেপে গিয়েছে। মেঝেতে পরে আছে, ওর বাবার খুব শখের রেশমি, বাদামী লম্বা চুলগুলো। রুবেল এগিয়ে এলো। গভীর নিবেশে তাকালো অবচেতন নিবৃতার বুকের দিকে। এখনও ধীরে ধীরে শ্বাস চলছে! মেয়েটা এতো শক্ত প্রাণের! সাধারণত কেউ-ই এই পর্যন্ত কুলোতে পারে না। মেয়েটা পেরেছে! পুরোটা সময় জ্ঞানও ছিল। শুধু কেমন নিস্তব্ধ হয়েছিল। তবে রুবেলের এতে কি! সময় নেই হাতে। আজ রাতেই ঢাকা ছাড়তে হবে। ও বিছানায় হাঁটু গেঁড়ে বসলো। নিজের শক্ত দু-হাত চেপে ধরলো চিকন, কোমল গলায়। সর্বোচ্চ বল খাটিয়ে বসলো। প্রচন্ড শ্বাস রোধে একবারের জন্য র/ক্তা/ক্ত দেহটা ভয়ানক ভাবে কেঁপে উঠলো। যেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ মুহুর্ত! ভীষন যন্ত্রণাময়! কি ব্যাথা! আরও কয়েক পল যেতেই রুবেলের বাটন মোবাইলটা বেজে উঠলো। কাজ হয়ে গিয়েছে ভেবে নিবৃতাকে ছেড়ে দেয় সে। হাতটা র/ক্তে চ্যাটচ্যাটে হয়ে গিয়েছে। পাশে থাকা রুমালে হাতটা মুছে সে কলটা রিসিভ করে।

– জ্বি আমি রুবেল হোসেন বলছি।
খালি ঘরে স্বরটা গমগম করে উঠে। অতঃপর কথা শেষে রুবেল চলে যায় রান্নাঘরে। খুঁজে দিয়ে আসে একটি বস্তা ও দড়ি। সব কিছু তৈরীই করা থাকে এ বাসায়। বস্তাটা খাটে তুলে, বেশ কসরত করে, অসাড় দেহটা সেখানে ভরে নেয় রুবেল। মুখটা দড়ি দিয়ে বেঁধে দেয় শেষে। এতটুকুতেই ঘাম ছেড়ে দিয়েছে। মেয়েটা বেশ ভারি। পরিবার অতিরিক্ত আহ্লাদে বড় করেছে। ভাবতেই মুখটা বিকৃত হয়ে আসে তার। এরপর নিজেকে পরিপাটি করে, বস্তাটা নিয়ে সে বের হয়ে পরে ঘর থেকে। একদম নিরিবিলি একটা সময়। এমনিতেও এই দালানে তেমন কেউ না থাকে। এলাকাও তেমন জনবহুল নয়। রুবেল আস্তে ধীরে বস্তাটা টেনে নামালো নিচে। ফের সেটাকে গাড়ির পেছনের ট্রাঙ্কে ভরে হাফ ছাড়লো। নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছে। তবে কাজ এখনও অনেক বাকি। গাড়ি নিয়ে চললো, ঢাকার সবচেয়ে নোংরা একটি জায়গায়। যেখানে রোজকার পুরো শহরের ময়লা আবর্জনা জমা করে রাখা হয়। এমন এক স্থান নির্বাচন করার কারণ হলো, এখানে কুকুরের প্রচুর উপদ্রব। রাতের অন্ধকারেই অনেকটা ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ার কথা। জনমানবশূন্য এলাকা। চারপাশে ভারি দর্গন্ধের বাস। নাক মুখ কুঁচকে গাড়ি থেকে নেমে এলো রুবেল। আসেপাশে জহুরি দৃষ্টি তাক করে কাওকে চোখে পরলো না। এই সময়টাতে প্রত্যেকে নিজ নিজ নীড়ে ফিরে গিয়েছে। সে এক স্বস্তির শ্বাস ফেলে ট্রাঙ্ক থেকে বস্তাটা বের করে। এরপর টেনে নিয়ে আসে ময়লার স্তুপের সামনে। সম্মুখে থাকা বিশালাকার ডাস্টবিনটার পাশেই বস্তার ঠাই হয়। যাকে নিতান্তই এক বস্তা বলা হচ্ছে, সেটার ভেতরে এক নিষ্পাপ প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে। নজর ফেরাতে গিয়েও ওখানে আটকে গেলো। কেমন চোখে পরছে বুঝি! আসেপাশে তাকালো রুবেল। বড় একটা পাথর দেখা গেলো। এগিয়ে গিয়ে সেটাই তুলে এনে ছুঁড়ে ফেললো বস্তার উপর। যেটা সরাসরি গিয়ে নিবৃতার পীঠের উপরে গিয়ে পরলো। এবার ঠিক আছে। সন্দেহজনক লাগছে না। নিজের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে রুবেল উঠে বসলো গাড়িতে। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে চলে গেলো সেটি।

এদিকে নিবৃতার গোটা পরিবার হন্ন হয়ে ওকে এখনও রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। নীরবের চোখের মনির যে আজ কি হাল হয়েছে, সেটা বোধহয় কখনও কল্পনাতেও সম্ভব ছিল না। সারাদিন না খেয়ে, তৃষ্ণার্থ গলায়, এখনও নিরলসভাবে মেয়ের খোঁজে নীরব। পুরোটা দিন পেরিয়ে গভীর রাত নেমে এলো। এতটুকুন বাচ্চা, সারাদিন ঘরের বাহিরে। কোথায় আছে, কি করছে, কি অবস্থায় আছে, সেটা ভাবনাতেও ভয় জরছে। গায়ে কাটা দিচ্ছে। এতক্ষণ বোনের চিন্তায় বুদ হলেও, এবার বাবার জন্য নিভানের কষ্ট বাড়তে লাগলো । মানুষটা এখন এই সময়ে এসে, কেমন যেন ছটফট করছেন। অস্থির হয়ে একবার ডানে যাচ্ছেন তো আরেকবার বামে। নিজে নিজে কি যেন, বিড়বিড় করে বলে চলছেন। চেতনা ওলটপালট হলেও পরম করুনাময়ের নিকট তার নিরবিচ্ছিন্ন চাওয়ায় কোন ব্যাঘাত ঘটছে না।

– আব্বু বাসায় যাবে চলো। তোমাকে ঠিক লাগছে না।
– আমার আম্মাকে রেখে আমি কোথাও যাবো না।
নীরবের উত্তর কেমন জড়িয়ে আসছে। নিভান ওর কান্না আটকে বলে,
– তুমি একটু রেস্ট নিয়ে আবার এসো। আমি আছি তো। আমার সাথে বাকি সবাইও তো আছে।
পাশেই নিভানের চাচাতো ভাইয়েরা। চাচা মামারা এক একজন একেক জায়গায় আছে। পুলিশি সাহায্য নেওয়ারও ব্যবস্থা চলছে।
– নাহ। আমার আম্মা আমাকে দেখলে বেশি খুশি হবে। তারচেয়ে ভালো তুমি বাসায় যাও। সাথে ওদেরও নিয়ে যাও৷ কিন্তু আমি কোথাও যাবো না।

নিবৃতা পর্ব ২২

নীরবকে কোনভাবেই রাজি করানো যাচ্ছে না, অথচ তার একেকটা কদম কেমন থরথরিয়ে কাপছে। নিভানের চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো। হাতের কনুইতে চোখ মুছতেই ধপ করে কিছু পরার শব্দ পেলো। ও অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে, পিচ ঢালা রাস্তায় হাঁটু গেঁড়ে বসে পরেছেন নীরব। মাথা নত রেখো, কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে, হঠাৎ শব্দ করে কেঁদে উঠলেন তিনি৷ এতো ছোট মেয়েটা তার! কার ওর প্রতি এতো ক্ষোভ জমলো! কার নোংরা থাবা পরলো ওর উপর। নাকি মেয়েটা হারিয়ে গেলো, কি অবস্থায় আছে! মাথা কাজ করছে না তার। বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠলো। হাত চাপড়ে ধরলেন সেথায়! সে কি হৃদয়বিদারক দৃশ্য! এক বাবার হাহাকার! নিভান গিয়ে ওর বাবাকে জাপ্টে ধরলো। ওর চাচাতো ভাইয়েরা পানির বোতল নিয়ে দৌড়ে এলো তৎক্ষনাৎ।
ঠিক সেই মুহুর্তেই, প্রধান সড়ক থেকে, নাইট গার্ডের উচ্চ শব্দে বাজানো বাঁশির আওয়াজ কানে বিধলো। সাথে কয়েকজনের দ্রুত গতিতে চলা পদ ধ্বনি।

নিবৃতা পর্ব ২৪