Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ২৪

নিবৃতা পর্ব ২৪

নিবৃতা পর্ব ২৪
নেহার ছায়ালিপি

নিশুতি রাত। চারিদিকে গভীর নিস্তব্ধতা। চারিপাশ জুড়ে নিশী পোকাদের তীক্ষ্ণ শব্দ ঘুরে বেড়াচ্ছে। অদূরে ল্যাম্পোস্টের টিমটিমে আলোর চারিদিকে নানান পতঙ্গেরা ওড়াউড়ি করছে। বহমান এই নীরবতা ভেদ করে হঠাৎই এখানে কারও উপস্থিতি অনুভব করা যায়। জুতো বিহীন খালি পা, পীচ ঢালা রাস্তার কিনার দিয়ে সন্তর্পনে হেঁটে যাচ্ছে। শরীরের উপরিভাগ বস্ত্রহীন। নিম্নাংশে, ছিঁড়া ফাটা প্যান্ট পরনে। কাঁধে একটি অর্ধ খালি বস্তা ঝুলছে। হাতে, ভাঙা একটি গাছের ডাল, যেটাকে লাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে হয়তো। অন্য হাতে একটি ব্যাটারি চালিত টর্চ, যা থেকে ক্ষীণ আলোর কীরণ ছড়িয়ে পরছে। সচল এই কিশোরটির গড়ন ভীষন রোগা পাতলা, দৃষ্টি বড্ড বেখেয়ালি। হাঁটতে হাঁটতে সে একসময় এসে পৌছলো সেই ময়লা আবর্জনার স্তুপের কাছে।

প্রতিদিন, ঘন আঁধার নামলেই সে এখানে চলে আসে। হতদরিদ্র ঘরের সন্তানদের দুর্ভোগের শেষ নেই৷ সমাজের উচ্চ শ্রেণীর লোকদের কাছে যা হেয়, পরিত্যক্ত কিংবা অপ্রয়োজনীয়, প্রায়শই সেই ক্ষুদ্রকায় একটি বস্তুই এই নিম্ন শ্রেনীর লোকদের কাছে মহামূল্যবান। তাইতো এই কিশোরটি রাতের অন্ধকারে এখানে, কিছু খুজে পাওয়ার আশায় চলে আসে। সেটা বাসী, পঁচা খাবার হোক, কিংবা ছেঁড়া ফাটা পোশাক থেকে শুরু করে নানান জিনিসপত্র। সকাল বেলা দায়িত্বভার লোকেরা চলে আসেন এই জায়গায়, এগুলোর ব্যবস্থা করতে। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় কিংবা মাটি চাপা। তাইতো এর আগেই নিজের কাজ করে নিতে হয় ওকে। নিত্যদিনের ন্যায় আজও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি৷ টর্চের আলো নিক্ষেপ করে, লাঠির সাহায্যে, সেই স্তুপের মাঝে ব্যবহার উপযোগী কোন কিছু পাওয়া যায় কি না, সেটাই দেখছিলো ও। এবং বরাবরের মতোই পুরোপুরি নিরাশ হতে হয় না৷ কিছু না কিছু খুঁজে পাওয়াই যায়৷ সেগুলোই তুলে কাঁধে রাখা বস্তায় ভরে নিচ্ছিল সে। তখনই হঠাৎ হাতের লাঠিটা গিয়ে ঠেকলো এক বস্তার উপর৷ কেমন যেন নমনীয় ঠেকলো ভেতরের বস্ত। ভ্রু কুঁচকে আসে ওর৷ বস্তাটার উপর আবার পাথর চাপা দেওয়া।

কিছু খুঁজে পাওয়ার আশায় সেখানে উবু হয়ে বসলো সে। বস্তার মাথায় বাঁধা দড়িতে হালকা করে টান দিতেই সেটি খুলে গেলো। হয়তো টানাহেঁচড়ায় বাঁধন ঢিলে হয়ে গিয়েছিল। তবে যেই না প্যাচ ছুটে গেলো, ওমনি বস্তার ভেতর থেকে কিছু একটা ছিটকে বের হলো। টর্চের ম্লান আলোয় দৃশ্যমান বস্তুটি দেখে কিশোরের শ্বাস আটকে এলো এক মুহুর্তের জন্য। এই ছোট পরিধির জীবনে, বহু নিশৃসংতার শিকার হয়েছে, ভুগে হয়েছে চরম পরিণতি তবে কখনো এরূপ ভয়াল দৃশ্যের সম্মুখীন হতে হয় নি এর আগে৷ কয়েক পল বাকরুদ্ধ হয়ে থেকে সে আচমকাই দেহের ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পরলো পেছনে। ঠোঁট দুটো তার রীতিমতো কাঁপছে। কি করবে, কি বলবে সেটা মাথায় আসছে না৷ তবে শরীরে বলও আসছে না৷ কিছুক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করে, পরপর হামাগুড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়ালো ও। অতঃপর কোথাও না তাকিয়ে সোজা দৌড়ে চললো উল্টো পথে। রাতের এই অসহ্য স্থীরতা চিরে শুধু এক অস্থির, মর্মাহত এবং শঙ্কিত একটি শব্দই বাতাসে গুঞ্জন তুললো।

– লাশ! লাশ! লাশ!
আর দু রাস্তা পরেই, মধ্যবয়স্ক এক নাইট গার্ড টহল দিচ্ছিলেন। সর্বদার ন্যায়ই এক হাতে লাঠি ও অন্য হাতে তার বাঁশি প্রস্তুত। যেকোন সমস্যায় পরলে সেটিতে শব্দ তুলে উঠবেন উনি। খালি, জনমানবশূন্য পথে তিনি ধীর গতিতে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন। তখনই কিশোর ছেলেটির ভয়ার্ত কন্ঠ কানে লাগে।
– লাশ!
নাইট গার্ড চমকে উঠেন। এ সময়ে কি হলো? উনি দ্রুত বেগে এগিয়ে যেতেই দেখেন, একটি ছেলে প্রানপনে এদিকেই দৌড়ে আসছেন। উনি কাছে গিয়েই, তুরন্ত ওকে এক পেশে ধরে ফেলেন।
– এই ছেলে! কি হয়েছে? এভাবে চিল্লাচিল্লি করছিস কেন?
ছেলেটা হাঁপাতে হাঁপাতে আতংকিত সুরে বললো,
– চাচা! লাশ! লাশ!
– কিসের লাশ? কি কস এগুলা?
– ময়লার ওহানে। ছোড বাইচ্চার লাশ!
– কি বলিস!
– হ চাচা। নিজের চোহে দেখলাম। র/ক্তে ভরা হাত! বস্তার ভিতরে!
নাইট গার্ডের কপাল কুঁচকে এলো। এই ছেলেকে উনি চেনেন। এই এলাকায় নিয়মতি আসা যাওয়া করে। মিথ্যা বলার কথা নয়, তাহলে আজ আবার হঠাৎ কি হতে পারে? তবে একটু হলেও ভয় তো তার মাঝেও দানা বাধলো এবার। একা যাওয়া সমীচীন নয় বলে তার মনে হলো। তিনি তৎক্ষনাৎ বাঁশি বাজালেন, জোড়ালো আওয়াজ তুলে। পকেট থেকে, বাটন মোবাইলটা বের করে কল করলেন আসেপাশে থাকা অন্যন্য নাইট গার্ডদের। এভাবেই ধীরে ধীরে জরুরি বার্তা আদান প্রদানে এক হুলস্থুল কান্ড বেঁধে গেলো।

অনতি দূর থেকে হট্টগোল ভেসে আসায়, নিভানের এক চাচাতো ভাই সোহান, নিছক কৌতুহল বশতই এগিয়ে গেলো সেখানে। তবে আপন প্রশ্নের উত্তরে যা শুনতে পেলো, সেটাতে তড়িৎ ওর মস্তিষ্কে ভয়াবহ এক ধারনা চলে এলো। আমসে মুখে করে, শুষ্কো এক ঢোক গলাধঃকরণ করে ফিরতি পথে চলে এলো। ততক্ষণে পাশের ফুটপাথে নীরবকে বসানো হয়েছে। অতিরিক্ত চিন্তায়, ভদ্রলোকের রক্তচাপ মাত্রাতিরিক্ত উচ্চ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। তবে সময়মতো মাথায় পানি ঢালার কারণে খারাপ কিছু এখনও ঘটতে পারে নি। অবস্থা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তাকে স্বস্তি দিতে, সবাই কেমন চুপ হয়ে আছে, কথা বলছে না মোটেও। নিভান পাশে থেকে বাবাকে আগলে ধরে বসে আছে৷ পীঠে, ঘাড়ে শক্ত হাতে মালিশ করে দিচ্ছে, একটু যদি ভালো লাগে। নীরব এখনও থেমে থেমে ভারি শ্বাস ফেলছেন। শরীরটা ক্লান্ত হয়ে এসেছে। বল প্রায় শূন্যের কোঠায়। সোহান এসে, এক বার সেদিকে অসহায় নজর দিয়ে, ওর আরেক চাচাতো ভাইয়ের কাছে গেল। তামিম তখন ছোট মুখে দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ।

– তামিম একটু শুনবি?
তামিম ঘাড় বাকিয়ে ওর দিকে চেয়ে, পরপর একটু দূরে সরে আসে।
– কি হয়েছে?
সোহানের বলতে ইতস্তত হচ্ছে তবে না পেরে থাকাও যাচ্ছে না। বিষয়টা ফেলে দেওয়ার মতোও নয়। ও নিচু গলায় বলে,
– সামনের ল্যান্ডফিলে নাকি এক ছোট বাচ্চার লাশ পাওয়া গিয়েছে। সবাই এখন সেখানেই যাচ্ছে।
তামিম ভ্রু কুঁচকে চায়। বিরক্তি নিয়ে বলে,
– তাই কি হয়েছে? এসব আবোলতাবোল কথা কেন তুলছিস কেন এখন? মাথা ঠিক আছে?
সোহান অসহায় নজরে তাকিয়ে বলে,
– তুই কি সত্যিই বুঝতে পারছিস না?
কিয়ৎক্ষণেই তামিমের টনক নড়ে। ও হতবিহ্বল হয়ে বলে,
– কত নবজাতক পাওয়া যায় এসব জায়গায়। ওরকমই কিছু হয়তো।
– আমি ঠিক মতো জিজ্ঞাসা করলাম। বাচ্চাটা বলে বেশি ছোট নয়। র/ক্তা/ক্ত আর বস্তায় ভরা ছিল।
এই কথাতেই তামিমের মুখটা শুকিয়ে এলো। ও তড়িৎ চাইলো নিভানের দিকে, যার সন্দিগ্ধ চোখ এখানেই নিবদ্ধ ছিল। তামিম নজর চুরি করে বলে,

– এখন কি করবি?
– আমাদের একবার সেদিকে গিয়ে দেখা উচিত না?
– নিভান মেরে ফেলবে রে! নিবুকে নিয়ে এসব ও শুনতে পারবে বলে তোর মনে হয়? আর চাচ্চু? না ভাই, আমার এতো সাহস নেই।
– গালি আসছিলো মুখে, উচ্চারণ করলাম না। তুই কোন কামেরই না। সর তো!
তেঁতো মুখে কথাটি বলে সম্মুখে এগিয়ে যায় সোহান। ভাইদের মাঝে আচমকা ফিসফাসানি উঠায় ও বেজায় বিরক্ত ও ত্যাক্ত! সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এদের মাঝে অনীহা প্রকাশ পায়৷ সেটা নিভানের একদম অপছন্দের। তাই তো সন্দেহ মনে তখন নিভান উঠে এসেছে। ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠে,
– এই কি হয়েছে তোদের? সমস্যা কি?
ওর গলার স্বর উঁচু। চোয়াল নিরেট। সব ভাই বোনদের মাঝে ও যেমন সবচাইতে বুদ্ধিমান তেমনি রাগীও বটে। সেই আওয়াজে কি যেন ছিল যে, এমনকি নীরব পর্যন্ত ঘাড় তুলে ছেলের দিকে তাকিয়েছেন। অকস্মাৎ এমন রেগে যাওয়ায় সোহানও বেশ হকচকিয়েছে। অস্থির, এলোমেলো দৃষ্টি চারপাশে ফেলতেই নিভান এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠে,
– এখন মুখ বন্ধ কেন? কি হয়েছে, জিজ্ঞাসা করলাম না? জবাব দে!
বোনের চিন্তায় ওর মস্তিষ্ক তখন দিশা হারিয়েছে। তাল সামলাতে পারছে না। স্নায়ুর উপর অতিরিক্ত চাপ পরছে। এহেন পরিস্থিতিতে, নীরব এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে আসতে নিলেই সোহানের কম্পিত স্বর কানে বাজে,

– সামনের ল্যান্ডফিলে এক বাচ্চার র/ক্তা/ক্ত লাশ পাওয়া গিয়েছে, বস্তার ভেতরে। আমি বলছিলাম কি, যদি আমরা…
সোহানের কথা শেষ হয় না এর আগেই নিভান বজ্র কন্ঠে চিৎকার করে উঠে,
– এই চুপ! কি বলতে চাইছিস তুই!
একটু হলেই ওর হাত উঠে যেত, তখনই নীরব পাশ থেকে ওর উত্থিত হাতটা থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলেন,
– বাড়াবাড়ি করবে না নিভান।
বাবার উপস্থিতিতে নিভান থেমে যায়। তবে ওর রাগ কমে না। মাথা নামিয়ে রীতিমতো ফোঁসফোঁস করতে থাকে।
– তামিম!
– জ্বি চাচ্চু!
– বাইকে উঠো। আমরা ওখানে এখনই যাবো।
নীরব আচমকাই একদম শান্ত, স্থীর আচরণ করছেন। হয়তো পিতৃত্বের কোন এক অদৃশ্য টান তাকে কিছু একটা অনুভব করাতে পেরেছে। তামিম দৌড়ে গিয়ে ফুটাপাতে থামিয়ে রাখা ওর বাইকটা নিয়ে আসে।
– আমিও যাবো।
নিভান ভারি গলায় বলে উঠে। বাবাকে ও একা ছাড়বে না। তামিম ওর বাইকটা নিয়ে আসতেই তিনজনে কোনরকম উঠে বসলো সেথায়। বাকিরাও দ্রুত কদমে গন্তব্যে ছুটল, কিছু পাওয়ার আবার না পাওয়ার আশায়!

কিশোর ছেলেটার দেখানো স্থানে যখন নাইট গার্ডরা এসে পৌছালো, তখন টর্চের আলোয়, বস্তা থেকে বেরিয়ে আসা র/ক্তে রঞ্জিত ছোট হাতটা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল। তারা কি করবে ভেবে না পেয়ে, তৎক্ষনাৎ পুলিশকে কল করলেন। এতো রাত প্রথমেই কেউ জবাব দিলো না। এ দেশের প্রশাসন অবস্থা সবসময়ই এমন নাজুক। তবুও তারা চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। বিষয়টা বেশ জটিল এবং ঘোলাটে। ঢিলেমি করা যাবে না মোটেও। এরমধ্যে বাকি দুজন গেলেন, বস্তাটা তুলে নিয়ে আসার জন্য। তন্মধ্যে নিভানদের বাইক এসে সেখানে থেমেছে। ততক্ষণে আসেপাশে এলাকার কিছু মানুষও এসে জমা হয়েছে। সকলে উৎসুক ঘটনা কোন দিকে গড়ায়, সেটা দেখার জন্য।
প্রথমেই নজরে এলো, একজন গার্ড সেখান থেকে বড় একটি পাথর তুলছেন। কতটা পাশবিক কার্যকলাপ! পাথর দিয়ে চাপা পর্যন্ত দেওয়া৷ নীরব তখন তার নামের মতোই নীরব ছিলেন। অবয়ব তার স্থবির। স্থীর দৃষ্টি সম্মুখে ঘটা দৃশ্যপটে। ভাবভঙ্গি তেমন একটা সুবিধার নয়। গার্ড দু’জনে মিলে বস্তাটি তুলে এনে রাস্তায় রাখতেই, সকলের কাছে বিষয়টি বিভৎস ঠেকলো। একটি শুভ্র ত্বকের হাত পুরোটাই বেড়িয়ে গিয়েছে। বস্তা সরে মাথার চুলগুলোও দেখা যাচ্ছে। প্রথম দিকে চোখ সরিয়ে রাখলেও, হঠাৎ সেদিকে তাকাতেই নিভানের নজর থমকালো। কি যেন একটা! পরপর ওর সমস্ত বদন কেঁপে উঠে।

– তামিম!
চিৎকার দিয়ে সেদিকে দৌড় লাগায় নিভান৷ ওর হাত দুটো তখন, ত্রস্থ পরিহিত শার্টের বোতামগুলো খুলছিল। তামিম নিজের নাম শুনে, হতবুদ্ধির মতো সেদিকে ছুটলো, নিভানের পিছু পিছু।
– এই কি করছেন? পুলিশ আসতাছে তো। আপনারা দুরে সরেন। মার্ডার কেস, বুঝেন না?
নিভানকে একজন গার্ড থামাতে গেলে, ও উল্টো শরীরের পুরো বল খাটিয়ে তাকে সরিয়ে দেয়। রোগা লোকটা তাল সামলাতে না পেরে, রাস্তায় ছিটকে পরেন। সেদিলে সকলেই ভ্রক্ষেপহীন। নিভানের অবস্থা তখন পাগলপ্রায়। কি করবে বুঝতে পারছে না। প্রথমেই বস্তা ধরে আগে মুখ পর্যন্ত নামায় সেটা। অতি প্রিয় মুখটার ওরূপ বিভৎস, করুণ দশা দেখে তখন ওর শ্বাস আটকে আসার জোগাড়। তবে এর মাঝেও, মাথা তুলে, নীরবের দিকে তাকাতে ভুলে না ও। ভদ্রলোক কেমন অনুভূতি শূন্য হয়ে আছে৷ চোখের দৃষ্টি অনড়। নিভান তড়িৎ কান্নার সুরে চেঁচিয়ে বলে,
– আমার বাবাকে কেউ ধরুন প্লিজ!
নীরব ভারসাম্য হয়ে পরেই যাচ্ছিলেন, তখনই পাশ থেকে কয়েকজন এলাকাবাসী এসে তাকে আগলে ধরেন।
এদিকে তামিম এসে কাঁপা কাঁপা হাতে নিভানকে সাহায্য করে। বোনের সাথে কি হয়েছে বুঝতে পেরে সেখানেই শব্দ করে কেঁদে উঠে, শক্ত গোছের ছেলেটা। কাঁদতে কাঁটতেই নিবৃতাকে আড়াল করে নেয় ও নিজের, খুলে ফেলা শার্টের মাঝে। বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে শীতল, ঠান্ডা অসাড় ছোট্ট দেহটা। উন্মাদগ্রস্তের ন্যায় বোনের ক্ষত বিক্ষত মুখটায় হাত বুলিয়ে বলে,

– নিবু! এই নিবু! তাকাও ভাইয়া! এই দেখো বড় ভাইয়া ডাকছি। তুমি শুনতে পাচ্ছো না? নিবু! নিবু!
কতভাবে, কতবার ও ডাক দিতেই থাকে, তবে আজ আর নিবৃতা ছুটে এসে চঞ্চল গলায় বলে না,
– বড় ভাইয়া! তুমি কি আমাকে ডাকছো?
প্রজাপতির মতো সতেজ, প্রানবন্ত, চপলতাপূর্ণ মেয়েটা আজ আর সাড়া দেয় না। আজ ছোট বোনটার ভার নিভানের কাছে অসহনীয় ঠেকে। ওর দমটা বন্ধ হয়ে আসতে চায়। অথচ, দিনে যে কতবার ওকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় নিভান, তার হিসেব নেই। বোনটা যে তার এতটাই আদুরে! ইচ্ছে করে, সমস্ত ভালোবাসা ওর উপর নিঙরে দিতে! ওরা তো মোটেও কাছাকাছি বয়সের নয়। বেশ ব্যবধান! এজন্যই তো স্নেহ। নিবৃতার প্রতি ওর মমতাটা একটুই বেশিই প্রগাঢ়! বড় ভাইয়ের মাঝে এক সুপ্ত পিতৃ অনুভূতিও মিশে আছে৷ সেই ফুলটা আজ মলিন, নিষ্প্রাণ! কোলে পীঠে মানুষ করা বাচ্চাটার এমন শোচনীয় অবস্থা ওর সহ্য হয় না। হৃদয়ে দগ্ধ হয় গভীর ক্ষতে!
এরই মাঝে সকলে এসে হাজির হয়। নিবৃতাকে যে এখানে পাওয়া যেতে পারে সেটা কেউ-ই আশা করে নি৷ অপার কষ্টে সকলেরই বুক ভার হয়ে এলো। ওদিকে কবির গিয়ে নীরবকে ধরতেই বুঝে, উনি জ্ঞান হারিয়েছেন৷ খারাপ কিছু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, সে তৎক্ষনাৎ বললো,

– চাচ্চুকে হাসাপাতালে নিতে হবে। স্ট্রোক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। দেরী করা যাবে না। তোরা বাইকে করে গিয়ে, দ্রুতই গাড়ি নিয়ে আয়। যা!
কবিরের কথায় সায় জানিয়ে সোহানের সাথে আরেকজন তড়িৎ স্থান ত্যাগ করলো।
নিভান তখনও একচিত্তে কেঁদেই যাচ্ছিলো আর সম্মুখে তামিমও মাথা নিচু করে বসে ছিলো। তবে তখনই একটি বিষয়ে ওর চোখ আঁটকে যায়। ও নিভানের কাঁধে হাত রেখে ব্যতিব্যস্ত গলায় বলে,
– নিবু এখনও বেঁচে আছে নিভান।
নিভান অবাক নয়নে তাকাতেই সোহান আঙুল নিয়ে তাক করে নিবৃতার হাতের দিকে। কিঞ্চিৎ নড়েচড়ে উঠছে ছোট, গোলগোল আঙুলগুলো। খুবই ধীর গতিতে। তবে নড়ছে। আশার প্রদীপ জ্বলে উঠেছো যেম! নিভান হতবিহ্বল হয়ে দ্রুতই নিবৃতাকে নিয়ে উঠতে গিয়ে হোচট খায়। তামিম ওকে এক পাশ দিয়ে ধরায় রক্ষা হয়। দু’জন মিলে দাঁড়াতেই একজন নাইট গার্ড এগিয়ে এসে বলেন,

– দেখেন এটা পুলিশি কেস। আপনারা এভাবে যেতে পারেন না।
– রাখেন আপনার পুলিশ! এখনও কি তারা আসতে পেরেছে?
তামিম চেচিয়ে উঠতেই গার্ড থতমত খেয়ে বলেন,
– আইসা পরবো। এতো অস্থির হইতাসেন কেন?
– আর তাদের অপেক্ষায় এখন, আমাদের দু দুটো মানুস গাঙে ভেসে যাক তাই না? মানুষ মরুক এটাই চান আপানারা? সরেন!

নিবৃতা পর্ব ২৩

তামিমের ধারালো গলায় কেউ আর বিরোধ করতে পারলো না। ততক্ষণে সোহানরা গাড়িয়ে নিয়ে চলে এসেছে। গাড়িতে তোলা হলো, অচেতন দেহগুলোকে, যাদের দু’জনেরই অবস্থা আশংকাজনক। এক দিনের মাঝেই ফারুকী পরিবারে নেমে এলো ভয়াল অন্ধকার। প্রাণে লেগেছে আঘাত। নিভান দু চোখের সম্মুখে শুধু ঘোর আঁধারই দেখতে পাচ্ছে। নিবৃতার মোটেও অবস্থা ভালো নয়। ওর মনটা বড্ড কু ডাকছে৷ এখন একমাত্র মহান করুনাময়ের রহম ছাড়া ওদের জীবনে সুখ ফিরে আসার আর কোন রাস্তা অবশিষ্ট নেই। একদিকে বাবা, যে তাদের পরিবারের খুঁটি, অন্যদিকে বোন, সেই ছোট নীড়ের তাজা প্রাণ! কাওকে ছাড়াই যে চলবে না!

নিবৃতা পর্ব ২৫