নিবৃতা পর্ব ২৫
নেহার ছায়ালিপি
বিভীষিকাময় এক সময়ের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে ফারুকী পরিবার। একদিকে নিজের বাবা তো অন্যদিকে বোন। নিভান যেন বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছে৷ নিশ্চল, অনুভূতিশূন্যের নেয় বোনের র/ক্তা/ক্ত, আহত শরীরটা আগলে রেখে, হাসপাতালের বারান্দা পথে, সাজানো থাকা সারি সারি চেয়ারের একটিতে, অসহায়, অবলার্তের ন্যায় বসে আছে ও। সম্মুখেই চাচাতো, মামাতো ভাইয়েরা হাসপাতালের লোকজনের সাথে বাকবিতন্ডায় ব্যস্ত। বড়রা এখনও এসে পৌছাতে পারেন নি।
গভীর রাতে, হাসপাতালে কর্মরত মানুষদের সংখ্যা নিতান্তই কম। এরমধ্যেই গুরুগম্ভীর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায়, সিনিরয় ডাক্তারদের খোঁজ করা এবং তাদের জরুরি বার্তা পাঠানো হচ্ছে। নীরব ফারুকীর জন্য প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, নিবৃতাকে তারা ভর্তি করাতে অনিচ্ছুক। আইনি জটিলতা থাকায়, পুলিশের উপস্থিতি ছাড়া তারা কোন প্রকার পদক্ষেপ নিতে পারবে না বলে, জানিয়ে দিয়েছেন। সেজন্যই কবিরের উচ্চ কন্ঠের চিৎকার ভেসে বেড়াচ্ছে পুরো দালানপথ জুড়ে।
– আপনারা মশকরা করার আর জায়গা পান না? দেখতে পারছেন না, ছোট একটা বাচ্চা ধুঁকে ধুঁকে কষ্ট পাচ্ছে? এখন ওর কিছু হয়ে গেলো এর দায়ভার কে নিবে?
কর্তৃপক্ষ বরাবরের ন্যায়ই চুপ রইলেন। ছেলেরা সবাই মিলে চেষ্টা করেও, এই সিদ্ধান্তের কোন প্রকার হেরফের করতে পারলো না। নিভানও চুপচাপ বসে ছিল। ঠিক তখনই অবস্থার অবনতি ঘটাতে, অবচেতন নিবৃতার ছোট্ট তনুটা হঠাৎ করেই কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। নিভান হতবুদ্ধির মতো চাইতেই দেখে, ও দেহাকৃতি পুরো বেঁকে যাচ্ছে এক প্রকার। শরীরের তাপমাত্রা আগের চাইতেও নিচে নেমে গিয়েছে। নিভানের শরীরের একাংশ রক্তে ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। সাদা সেন্ডো গেঞ্জি লালে রঞ্জিত। এতটুকু শরীর থেকে মাত্রারিক্ত র/ক্ত ক্ষরন হচ্ছে। স্বাভাবিক থাকার কথা কি আদও? নিভানের চোখ ছাপিয়ে আবারও জল গড়ালো। শক্ত করে আগলে ধরলো প্রকম্পিত নিবৃতাকে। শুভ্র ত্বক, ভয়ংকরভাবে ফ্যাকাসে হয়ে এসেছে। র/ক্তশূন্য! প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত অবস্থা।
– সোহান!
নিভান ভয়ার্ত গলায় চেচিয়ে ডেকে উঠতেই সোহান তৎক্ষনাৎ দৌড়ে এলো। চিন্তিত স্বরে বললো,
– কি হয়েছে রে?
– আমার নিবুটা মনে হয় বাঁচবে না রে। চাচ্চুরা সবাই কোথায়? মা কোথায়? আমার কিন্তু আর ভালো লাগছে না!
সোহানও এ পর্যায়ে অসহায় বোধ করলো। বড়দের সবার আসতে এতো দেরী হচ্ছে কেন? মোবাইলে তো কথা হলো। জানালেন যে, সব ব্যবস্থা সমেতই আসছেন তারা। তাহলে এখন সমস্যাটা ঠিক কোথায় হচ্ছে?
সেই মুহুর্তেই অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে, একাধিক পদধ্বনির আওয়াজ পাওয়া গেলো। সোহান তাকিয়ে দেখে ওর বাবা আর চাচারা চলে এসেছেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে আগে আগে ছুটে আসছেন, অস্থির, ভঙ্গুর দশাগ্রস্ত এক নারী যে একইসাথে একজন মা এবং স্ত্রী। তার এই দুই সত্তাই যখন হুমকির মুখে, তখন সে স্থির ঠিক থাকবে কিভাবে? শিউলি উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়ে এসে হামলে পরলেন নিভানের উপর।
– আমার নিবু! আমার নিবু!
নিভান, মা’কে দেখে আরও ভেঙে পরলো, অথচ ওর প্রয়োজন ছিল শক্ত হাতে মাকে সামাল দেওয়া, স্বান্তনা বানী শোনানো, কিন্তু সে যে পারছে না! একের পর এক দুর্দশা, আর ওর সহ্য হচ্ছে। ও সেভাবেই, শরীর কাঁপিয়ে কেঁদে ফেললো। শিউলিও তখন বল ছেড়ে দিয়ে পাশের চেয়ারে বসে পরেন। কান্নারত স্বরে বলেন,
– নিবুকে দাও আমার কাছে।
নিবৃতার শরীরটা, সময়ের সাথে ক্রমশ আরও শিথিল ও ভারি হয়ে এসেছে আগের তুলনায়। নিভান ওকে সম্পূর্ণ ছেড়ে না দিয়ে মা’য়ের কাছে বাড়িয়ে দিলো। শিউলি দেখলেন, তার প্রস্ফুটিত রঙিন পাপড়ির ফুলকে কেউ নৃশংসভাবে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে। সেই করুণ দৃশ্য তার সহ্য হলো না। সেখানেই আর্ত চিৎকার করে উঠলেন। এক মায়ের হৃদয়বিদারক কান্নার স্বর সেখানে উপস্থিত সকলের অন্তরে কাঁপন ধরিয়ে দিলো। শিউলি পারলেন না, মেয়েকে ছুঁয়ে দিতে। সারা অঙ্গে, প্রতিটি কোনে, লাল রঙা ক্ষত জ্বলজ্বল করছে, তাহলে সেখানে কিভাবে স্পর্শ করবেন উনি? অথচ বাচ্চাটাকে আজ পর্যন্ত শাসনের নামে প্রহার তো দূর, উচ্চ গলায় ধমকেও উঠেন নি৷ কখনও প্রয়োজনও পরে নি যে। মেয়ে তার এতোটাই শান্ত ও ভদ্র ছিল। পবিত্র, শুভ্রতার প্রতীক ধারন করা তার এই ছোট বাচ্চাটার উপর কোন অমানুষের নজর পরলো? শিউলি এই চাপ নিতে পারলেন না। জ্ঞান হারানোর উপক্রম হতেই পাশ থেকে তামিম এসে ধরলো তাকে। পরপর শিউলিকেও চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলো। ততক্ষণে হাসপাতালে পুলিশ এসে পৌছিয়েছেন। তাদের মাঝে একজন ছিলেন, এসপি শফিক ভুঁইয়া। তার সাথে নীরবের বন্ধুত্ব বেশ গাঢ়৷ তাই তো প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের আগেই, নিবৃতাকে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা হলো। সিনিয়র ডাক্তারদের আগমন ঘটলো দ্রুতই। তবুও নিবৃতাকে নিয়ে কেউই আশাবাদী নয়৷ কল্পনাতীত বাজে ওর অবস্থা। তবে ওকে বাঁচানোর জন্য শেষ চেষ্টা করতে পারাটাই যেন, সে মুহুর্তে সকলের নিকট স্বস্তিকর ঠেকলো। অন্তত নিজেকে স্বান্তনা তো দেওয়া যাবে!
জীবন – মৃত্যুর এক জটিল সমীকরণে বাধা নিবৃতা এখন। কোন পক্ষ শূন্য প্রমানিত হবে, সেটা জানার জন্য আগে ধৈর্য্য পরীক্ষার বলে উত্তীর্ণ হতে হবে। একটু আগেই শিউলির জ্ঞান ফিরেছে। তবে তার দ্বিতীয়বার আর সাহস হয় নি, মেয়ের খবরাখবর জানার। মাতৃ হৃদয় ঠিক এতোটাই নাজুক যে চিত্ত বড় নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। কখন যে কোন বার্তা, সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঘোষণা নিয়ে আসে, সে দুশ্চিন্তায় ধরাশায়ী সে। তাইতো, না পারতে স্বামীর শিয়রে চুপচাপ বসে থেকে চোখের পানি ফেলছেন উনি। নীরবের অবস্থা এখন বেশ নিয়ন্ত্রণে। ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ হয়েছিল। তবে অবস্থা শংকাজনক ছিল না। সময়ের মাঝে ব্যবস্থা গ্রহন করা গিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার রহমত, এবং নীরবের স্বাস্থ্য সচেতন জীবনধারার অভ্যাস তাকে এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছেন উনি। এক হাতে ক্যানোলা লাগানো। দুর্বল শরীরে আইভি ফ্লুইড দেওয়া হচ্ছে। দম বন্ধকর, কালো সেই রাতের অবসান ঘটেছে, তবে নতুন দিনের উজ্জ্বল আলো, ফারুকী পরিবারকে রাঙাতে পারে নি। ডাক্তাররা কোন কিছুই জানাচ্ছেন না আপাতত। সকলে গুমরে বসে, কিছু শোনার অপেক্ষায় আছেন।
কিয়ৎক্ষণ বাদেই, ঘুমন্ত নীরবের কপাল কুঁচকে এলো। ভদ্রলোকের জ্ঞান ফিরছে। নজরে আসতেই শিউলি দ্রুত কদমে উঠে, কেবিনের বাহিরে উপস্থিত থাকা নিভানদের জানালেন। দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত ডাক্তার এসে নীরবকে দেখে, সবাইকে আশ্বস্ত করলেন যে, উনি ঠিক আছেন। তবে বিশেষ যত্নে রাখতে হবে৷ কেবিন ফাঁকা হয়ে গেলেও, নিভান ও শিউলি রয়ে গেলো। নিভান চুপচাপ বাবার পায়ের কাছে, নত মুখে বসে আছে। গায়ে তখনও রক্তাক্ত গেঞ্জিটা। কারও মাথায়ই আসে নি যে, সেটা পরিবর্তন করা উচিত৷ নীরবের স্থির দৃষ্টি তখন ছেলের গায়ের পোশাকেই নিবদ্ধ। মস্তিষ্কে কি চলছে, সেটা বলা কষ্টসাধ্য। কেবিনের এই অসহনীয় নিস্তব্ধতা কেটে নীরব হঠাৎই বলে উঠলেন,
– নিবৃতার শেষ ব্যবস্থা করা হয়ে গিয়েছে?
কন্ঠে কোন আবেগ নেই। কেমন পাথর, অবিচল। নিভান দৃশ্যমান রূপে কেঁপে উঠলো। শিউলি ওড়নায় মুখ চেপে ঘুরে গেলেন উল্টো। নিভান কি বলবে বুঝে পেলো না। বেঁচে তো আছে, কিন্তু কতক্ষণ? আশা জাগিয়ে আবার যদি দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দেয়? তখনই কেবিনের দরজায় করাঘাত হয়ে পরপর সেটা মৃদু খুলে গেলো। তামিম উঁকি দিয়ে বলে উঠে,
– ডাক্তার বেরিয়েছেন। নিবুর বিষয়ে কথা বলবেন। দ্রুত আয় নিভান!
নীরব কানে বাণীগুলা পৌছাতেই উনি কম্পিত গলায় বলেন,
– আমার আম্মা এখনও আছে?
নিভান চুপচাপ মাথা নাড়ায়। মুখ দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না৷ নীরব তৎক্ষনাৎ তার হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেন,
– আমাকে তুলে ধরো তো নিভান৷ আমার আম্মার কাছে যাবো আমি।
পাশ থেকে শিউলি বাঁধ সেধে বলেন,
– আপনি অসুস্থ। এতো অস্থির হবেন না।
– আমাকে তুলবে না আমি একাই যাবো?
বাবার আদেশ অমান্য করার স্পর্ধা কখনও হয় নি নিভানের। ও কথা মতোন নীরবকে তুলতে সাহায্য করে। শিউলিও পাশ থেকে স্বামীকে আগলে ধরেন। স্যালাইনের স্ট্যান্ডটা অন্য হাতে নিয়ে নেন। স্ত্রী, পুত্রের সাহায্যে, স্বীয় কন্যার টানে, অসুস্থ, ভগ্ন দেহে নীরব ছুটে আসেন বাহিরে।
সিনিয়র দু’জন পুরুষ এবং একজন মহিলা ডাক্তার তখন, নিবৃতার চিকিৎসা করে বেরিয়েছেন। এরকম জটিল এবং ভয়াবহ কেসের সম্মুখীন তাদের এর আগে হয়তো করতে হয় নি। কারণ ‘ শিশু নির্যা/তন” এর মতো এরূপ ভয়ংকর ঘটনায়, খুব কমই বেঁচে ফিরতে পারে, আর বেঁচে গেলেও, পরিবারের মূর্খতায়, তাদের চিকিৎসায় বড্ড দেরী হয়ে যায়। এরপর বিশেষ কিছু আর করার থাকে না।
ডাক্তাররা গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তন্মধ্যে নীরবের প্রবেশে তারা একটু অপ্রস্তত হলেন। অসুস্থ এমন কারও নিকট এতো এক জটিল বার্তা প্রদান মোটেও উচিত নয়।
– আপনার বিশ্রামে থাকা প্রয়োজন ফারুকী সাহেব।
নীরব সে কথায় কোন কর্ণপাত করলেন না। শারীরিক দুর্বলতা তাকে গ্রাস করলেও, পিতৃ সত্তা তার এখনও বলীয়ান৷ যথাসম্ভব শক্ত কন্ঠে বললেন,
– আমার মেয়েটার কি অবস্থা ডাক্তার সাহেব? আমি সবটা জানতে চাই।
এতো ছোট এক বাচ্চার করুন দশা সচক্ষে পর্যবেক্ষন করার পর, বিষয়টি ডাক্তারদের মস্তিষ্কেও বেশ আলোড়ন তুলেছে। তারা নিত্যদিন, নানান জটিলতার সাথে বোঝাপড়ায় অভ্যস্ত থাকলেও, ঘটনা যখন কোন নিষ্পাপ সত্তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তখন তাদেরও হাত কাঁপে। মানসপটে আপন পরিবার, সন্তানদের চেহারা ভেসে উঠে। আজ নিবৃতার করুন অবস্থা দেখে তাদের নিজেরই রূহ কেঁপে উঠেছে। মনটা নরম হয়ে, চোখ ভিজে আসতে চেয়েছে বারংবার। তবুও নিজেকে সামলাতে স্বীয় কর্মে তাদের অনড় থাকতে হয়েছে। সবার সিনিরয় ডাক্তারটি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই, পাশ থেকে মহিলা ডাক্তারটি সরে গেলেন। একজন নারী হয়ে, এরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। যেগুলো নিজ চোখে দেখে এসেছেন, সেগুলোকে এখন অকপটে মৌখিক স্বীকারোক্তি দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি নিজেও এক কন্যা সন্তানের জননী। আজ তার মেয়ের সাথে এমন কিছু হলে, উনি কি সহ্য করতে পারতেন? এটা শুধুমাত্র এক প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যায়। কারণ কেউই চায় না, বাস্তবে সেই কল্পনাতীত ব্যথা অনুভব করতে।
– আমি একান্ত পরিবার সদস্যদের কাছেই সবকিছু খুলে বলতে চাই৷ এখানে কিছু গোপনীয়তার প্রয়োজন বলে আমি মনে করছি।
সেখানে উপস্থিত সকলের মুখেই আঁধার নামলো তড়িৎ। গতকাল যাবত তারা তো কম ছুটাছুটি করে নি, নিবৃতার জন্য। তবুও কেন এই পর্দা? তবে কেউ মুখে সেটা উচ্চারণ করতে পারলেন না। নীরব, শিউলি ও নিভান চলে গেলো, ডাক্তারের পিছু পিছু তার কেবিনে।
– বিষয়টা খুবই সেনসেটিভ, তবুও লুকানোর সামর্থ্য আমার নেই। নিবৃতা অমানবিক নির্যা/তনের শিকার হয়েছে। নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, তবুও স্বীকারোক্তি দিতেই হচ্ছে। ‘ধ/র্ষন’ এর শিকার হয়েছে বাচ্চাটা।
ডাক্তারের গলা কাঁপার সাথে সাথে, নিবৃতার এই ছোট পরিবারের, আপন মানুষগুলোর হৃদয়ও দগ্ধ হয়েছে। যদিও সবারই খেয়ালে ছিল বিষয়টা, তবুও সমাজের সবচেয়ে ঘৃণ্য এই অপকর্ম, কারোরই সহন সীমায় নেই। নিভান মাথা নিচু করে নেয়, অথচ নীরব তখনও নিশ্চল চোখে, মাথা উঁচিয়ে তাকিয়ে।
– ওর শরীরের প্রতিটি অঙ্গে ধারালো ধাতব পদার্থের ব্যবহার করা হয়েছে। নিশ্চিত করে বললে, ব্লে/ড! অপরাধী অবশ্যই সুস্থ কেউ নয়। বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী। তাই তো বাচ্চাটাকে বারংবার আ/ঘাত করে র/ক্তা/ক্ত করা হয়েছে। অনেকগুলো ক্ষতই বেশ গভীর এবং বড়। পীঠের উপর র/ক্ত জমাট বাঁধা বিশাল কালসিটে এক দাগ পরেছে। শুনেছি, পাথর চাপা দেওয়া ছিল। ধারনা করছি, এতে ওর মেরুদন্ডে প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সেটা কতুটুকু নিরাময় যোগ্য এটা আপাতত বলা সম্ভব হচ্ছে না। চুলও এবড়োখেবড়ো করে কাটা হয়েছে। মাথার ত্বকেও বেশ কাটা/ছেঁড়া রয়েছে। সারা শরীরে অসংখ্য দাঁত, গভীর কাম/ড়ের চিহ্ন। গলায়ও আঙুলেরও ছাপ পেয়েছি আমরা। হয়তো শ্বাসরোধ করে মা/রার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাছাড়া চিৎকার করার চেষ্টাও করে থাকতে পারে। ছোট বাচ্চা, এতে নিশ্চয়ই কন্ঠ নালীতে চাপ পরেছে৷
এতোটুকু বলেই থামলেন ডাক্তার সাহেব। শব্দগুলো উচ্চারণ করতে তার নিজেরই কতো কষ্ট হচ্ছে। সেদিক থেকে, ভুক্তভোগীর পরিবারের মনোভাব ঠাওর করা অসম্ভব। গুমোট এই কক্ষ জুড়ে, শুধু এক মায়ের করুন কান্নার আওয়াজ ভেসে বেড়াচ্ছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন শিউলি।
– সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেই জটিলতা হলো, ওকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে, যদ্দরুণ আমাদের বেশ কয়েকবার সার্জারির দ্বারগ্রস্ত হতে হবে। অসংখ্য সেলাই পরবে। তাছাড়াও ভেতরের অন্ত্রের ক্ষত বিপর্যস্ত পর্যায়ের। বিষয়টা মোটেও আর সাধারণ ঠেকছে না। নিবৃতা খুবই শক্ত গোছের মেয়ে, এতোকিছুর পরও ওর শ্বাস যে চলছে, সেটাই অকল্পনীয়। সৃষ্টিকর্তা ওকে এ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন, এতে তাঁরই মর্জি রয়েছে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবো। তবে দিনশেষে তাঁর রহমত ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। এখন ওর একটু স্টেবল হওয়ার অপেক্ষায় আমরা, তাহলেই পরবর্তী ধাপে এগোনো সম্ভব হবে৷ আপনারা ধৈর্য ধরুন।
দুর্বোধ্য এক নীরবতা ছড়িয়ে পরলো কেবিন জুড়ে। কারও মুখে আর কোন কথা নেই, প্রশ্ন করার জন্য মস্তিষ্ক সচল নয়, চিত্তে সাহসের অভাব। নিবৃতা নামক ছোট প্রাণটির তরে আজ মুক বনে বসে আছে ও স্বজনেরা। ওর পাওয়া আঘাত, কষ্টে মর্মাহত হয়ে অশ্রু বিসর্জন দিবে, না মত্ত হবে ওর জীবনের আলো নিভে না যাওয়ার একনিষ্ঠ প্রার্থনায়!
মেয়ের সুস্থ হয়ে ওঠায় এবং উন্নত চিকিৎসায় কোন কমতি রাখেন নি নীরব। দু’হাতে খরচ করেছেন, এক দ্বার থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছেন হন্য হয়ে৷ সাথে বাবার একান্ত সহযোগী হিসেবে নিভানের উপস্থিতি ছিল সরব, অনড়! তবে বিপদের মুখে পড়লে, দেখা যায় আমাদের রক্ষার্থে কতগুলো হাত এগিয়ে এলো। এবং অভূতপূর্বভাবে সেই সংখ্যা এতোটাই সীমিত যে গুনে ওঠার আগেই ফুরিয়ে যায়। নীরবরা মোটে পাঁচ ভাই! একে অপরের সাথে ভীষন সখ্যতা ছিল! তবে বিপদের দিন বাড়ার সাথে সাথে সম্পর্কের সেই প্রজ্জ্বোলতাও ম্লান হয়ে আসতে শুরু করলো। নিবৃতার পরিবার সবই দেখছিলো চুপিসারে, তবে অভিযোগ করার মতো মন কারোরই ছিল না। সবকিছুকে এক পেশে রেখে, ওর পরিবার নিবেদিত ছিল ওর তরেই! শুধুমাত্র নিবৃতার সুস্থ হয়ে ওঠার আশায় ছিল, নির্নিমেষ পথ চেয়ে!
ততদিনে বেশ কয়েকদিন পেরিয়ে গিয়েছে। মুমূর্ষু অবস্থা থেকে, পরম করুনাময়ের দয়ায়, নিবৃতা ফিরে এসেছিল। বিষয়টা বেশ সময়সাপেক্ষ ছিল, তবে ধৈর্যের সুমিষ্ট ফল মিলেছে। তবে, নিবৃতার থেকে সরব কোন আচরণ পাওয়া যায় নি। কথা বলে না মেয়েটা, তাকিয়েও দেখে না। কেমন যেন জড়বস্তুর মতো উপস্থিতি ওর! ডাক্তাররা জানিয়েছেন, হয়তো মস্তিষ্কে পাওয়া আঘাতের কারণে সে এরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ওদের অপেক্ষা করতে হবে! অপেক্ষা! ফারুকী পরিবার, এই শব্দটির উপর ভিত্তি করেই গত কতগুলো সময় পাড় করলো। আর কতো? হৃদয় ভেঙে গুঁড়িয়ে এলেও, এর কোন শব্দ হয় না! নিবৃতার ছোট্ট শরীরটা, চার বার সার্জারির মধ্য দিয়ে গিয়েছে। এর আগের দু’বার ইনফেকশন ছড়িয়ে পরেছিল। তবে, অবশেষে ওর ক্ষতগুলো একটু একটু করে সেরে আসার পথ ধরেছে! একদিন ব্যথা নিঃশেষ হলেও, এর ধারণ করা দাগগুলো হয়তো, সময়ের তালে মিটে যাবে, নয়তো কিছু কিছু তাদের ছাপ আজীবনের জন্য ফেলে যাবে।
নিভানকে বসিয়ে রেখে শিউলি বাসায় গিয়েছিলেন। কতগুলো সময় পেরিয়ে আজ নিবৃতাকে ঘরের খাবার দেওয়া যাবে বলে ডাক্তার জানিয়েছেন। সে খুশিতেই শিউলি গিয়েছিলেন নিজ হাতে রান্না করার জন্য। আজ আবহাওয়া বড্ড উত্তপ্ত। ঘাম ঝরছে ভীষন। শিউলিকে নামিয়ে দিয়ে, নীরব গাড়ি পার্ক করতে গিয়েছিলেন। এমনিতেও দেরী হয়ে গিয়েছে, শিউলিও তখন আর অপেক্ষা না করে, খাবারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে চললেন হাসপাতালের ভেতরে। তবে নিবৃতার কেবিনের সম্মুখে আসতেই কিছু কন্ঠস্বর কানে বাজে। ভ্রু কুঁচকে শিউলি সেখানে প্রবেশ করতেই, কিছু চেনা মুখের দেখা পান। তার মেজো ভাসুর এবং জা এসেছেন। দেওয়ালের এক পাশে রাখা কাউচে তারা বসে আছেন৷ অনতি দূরেই নিভান, থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আর নিবৃতা তখন ঘুমে। মেয়েটার অধিকাংশ সময় ঘুমিয়েই ব্যয় হয়। শক্তিশালী ঔষধের কারণেই এমনটা হয়। তাছাড়া যতটুকু সময় জাগ্রত থাকে, ততক্ষণ এভাবেই, সোজা টানটান হয়ে শুয়ে থাকে। মেরুদন্ডে পাওয়া আঘাতটাও জোরালো ছিল। নাজুক হাড়ে ওতো ভার সয় নি৷ তাই ডাক্তারের নির্দেশনায় ওর শোয়ার তরিকা বিশেষ নজরদারিতে রাখতে হয়।
– আসসালামু আলাইকুম।
শিউলি নম্র স্বরে সালাম দিতেই তার জা প্রত্যু্ত্তর করলেন। শিউলি এরপর কি বলবেন ঠিক বুঝে পেলেন না। আজ এতোদিন বাদে হঠাৎ এসেছেন! কোন প্রয়োজন কি? নতুবা আজ যখন নীরবরা সবকিছু মোটামুটি অনেকটাই সামলে নিয়েছেন, তখন কেন হাজির হলেন? যখন প্রয়োজন ছিল তখন তো পীঠ বাচিয়ে পালিয়েছেন।
– আমাদের নিবু এখন কেমন আছে শিউলি?
শিউলি একবার তাকালেন হাসপাতাল বেডে। এর ঠিক মাঝেই নিবৃতা ঘুমিয়ে। শরীরের অর্ধাংশ সাদা চাদরে ঢাকা, তবে যতটুকু উন্মুক্ত, তার প্রায় পুরোটাই সাদা ব্যান্ডেজে মোড়া। বাকি থাকা মাথার চুল গুলোও ছেঁটে ফেলা হয়েছে ব্যান্ডেজের জন্য। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোলেও, উনি সাবলীলভাবেই জবাব দিলেন,
– জ্বি, আগের চাইতে ভালো।
– হ্যা দেখতেই পাচ্ছি, আরামে ঘুমাচ্ছে।
– আরামে নয়, আঘাতের ব্যথাগুলো সহ্য করা যায় না, তাই হাই ডোজের মেডিসিনের প্রভাবে ঘুমিয়ে থাকতে হয়।
নীরব কেবিনে প্রবেশ করতে করতে অনমনীয় স্বরে তার ভাবির কথার পাল্টা জবাব দেন। মাহফুজা বেগমের কথা গায়ে লাগলেও উনি কিছু বললেন না।
এরই মাঝে নিবৃতার হাতটা কিঞ্চিৎ নড়ে উঠে। নিভান দ্রুত বোনের শিউরে গিয়ে বসে। গায়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে যে আদর করবে, সে জায়গাটুকুনও অবশিষ্ট নেই। মনে হয়, যেখানে ছুঁয়ে দিবে, সেখানেই ব্যাথা লাগবে। ও সবসময়ের মতো আলতো করে ওর আরেক হাতের তালুতে ছুঁয়ে দিলে, আজ আশ্চর্যজনকভাবে, নিবৃতা সেই বাধন ছাড়িয়ে নেয়। মৃদু বল ছিল সেখানে। নিভান অবাক হয়ে চাইতেই দেখে নিবৃতা চোখ খুলে তাকিয়েছে। কেমন বড় বড় করে অক্ষিকোটর চারপাশে ঘুরছে৷ ওর এই সামান্য প্রতিক্রিয়া দেখানোতে খুশি হলো নিভান৷ চমকিত কন্ঠে কিছু বলবে তার আগেই কানে আসে ঘৃণ্য এক বাক্য!
– নিবুতো তো নষ্ট হয়ে গেছে। যে কেউ দেখলে নাক সিটকাবে! নীরব, তোমার মেয়ের ভবিষ্যৎ তো এখন অন্ধকার!
মাহফুজা বেগম কেমন অনায়াসেই কথাটি বলে ফেললেন। তার মুখের ভাবভঙ্গিও বড্ড বিকৃত। নীরব মুক বনে তার বড় ভাইয়ের দিকে তাকালেন৷ অথচ সেই ভদ্রলোকও এমনভাবে স্ত্রীর কথায় মাথা ঝাকালেন যেন এর চেয়ে বড় আর দ্বিতীয় কোন সত্য নেই! নিভান বজ্রাহতের নেয় ওর বাবার দিকে তাকালো। ‘নষ্ট! এতোকিছু সয়ে, এই পর্যন্ত আসায়, ওর বোনকে এই ডাকটা শুনতে হলো? ওর সইলো না৷ একে তো আজ এতোদিন পর এসেছে, তারউপর এমন তিক্ত বাক্য শোনানোর জন্য? ও ঝট করে দাড়িয়ে গেলো। কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই শুনলো ওর বাবার জবাব!
– আমার মেয়ে আমার কাছে রত্ন! ও যে লড়াই করে বেঁচে, আমার কোলে ফিরে এসেছে, এতেই আমি ধন্য। বাদবাকি কোনকিছুর পরোয়া আমি করি না।
– মুখের কথায় কি দুনিয়া চলে নীরব?
– আমি আমার দুনিয়া চালাবো। বাকিদের দিকে তাকানোর সময় কিংবা ইচ্ছে কোনটাই আমার নেই ভাবি।
মাহফুজা বোঝানোর সুরে বললেন,
– তোমাদের ভালোর জন্যই তো বলছি। এতো কষ্ট করে মেয়েটাকে তো বাঁচালে, কিন্তু ওর কারণে কি শান্তি মতো এই সমাজে বাঁচতে পারবে তোমরা? তুমি তো সারাদিন এখানেই থাকো। অথচ মানুষের কথা শুনতে হয় আমাদের!
নীরব তাচ্ছিল্য হাসলেন।
– আজ যদি মাইশা মামুনির সাথে এমন কিছু হতো তখনও কি এমনই বলতেন ভাবি?
– এখন কি আমার মেয়ের উপর হিংসে করবে তুমি? এগুলো কোন ধরনের কথা!
– সামান্য নাম নেওয়া সহ্য হচ্ছে না, অথচ আমার আম্মা, এগুলো সহ্য করে বেঁচে আছে৷ ওর পরিবার, আমরা বেঁচে আছি৷ মানুষ তো সামান্য সহানুভূতিও দেখায়, অথচ আপনি আজ আপন হয়েও, কাঁটা গায়ে নুনের ছিটা দিতে এসেছেন ভাবি!
নীরবের বেদনাদায়ক স্বর, এ যাত্রায় তার ভাই মুখ খুললেন।
– এভাবে কেন কথা বলছিস? তোর ভাবি ভুল কি বলেছে? কাল যখন আবার নিজ জায়গায় ফেরত যাবি, তখন দেখবি কোনকিছুই আর আগের মতো নেই। ভুক্তভোগী আমরা হলেও, মানুষ বাঁকা নজর আমাদের দিকেই দেয়।
নীরব মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। তিনি কি অবোধ? বাস্তবতা বুঝেন না? সব বুঝেন এবং দেখছেনও। কিন্তু এতে তার কিছুই যায় আসে না। তার মেয়ে, তার পরিবার সুস্থ, নিরাপদ এবং সুখী থাকলেই তিনি তুষ্ট। বাহিরি মানুষের কথায় তার কি যাবে বা আসবে?
– আমি তাদের পরোয়া করি না।
– তুই তো একা নস। আমাদের পুরো পরিবার একে ওপরের সাথে জড়িত। এভাবে তো দায় এড়ানো যায় না।
নীরব শ্লেষাত্মক হেসে বলেন,
– ভুগবোও আমি, দায়ও মিটাবো আমি? ভালোই তো। তাহলে বলো, এর বদলে কি চাও।
ভদ্রলোক আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিলেন। অতঃপর ইতস্তত করে বললেন,
– আমার রাইয়ানের কথা বলছিলাম…..
– অমানুষ!!!
নীরব এক প্রকার চিৎকার করে উঠলেন। মেয়ে যে তার এখানেই উপস্থিত আছে, সেই খেয়াল আর রইলো না। অতিরিক্ত রাগ চড়ে বসেছে মস্তিষ্কে। শিউলি দৃশ্যমান রূপে কেঁপে উঠলেন। ওদিকে এই নামটা শুনে, নিভানও উত্তেজিত হয়ে পরলো। সীমাহীন ক্রোধে দু হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো।
– তোমার অল্প বয়সে বিগড়ে যাওয়া মাস্তান ছেলের সাথে আমার ফুলের মতো বাচ্চার নাম জড়াবে না বলে দিলাম।
– এরজন্যই বলে, মানুষের ভালো করতে নেই।
মাহফুজা মুখ বাকিয়ে কথাটি বলতেই নীরব শব্দ করে হাসলেন। চমৎকৃত গলায় বললেন,
– মানুষের ভালো? না মানুষের দুঃসময়ে তাদের গলায় পারা দিয়ে নিজের ভালোটা বুঝে নিতে চাইছেন?
– নীরব মুখ সামলে কথা বল!
– বলবো না আমি মুখ সামলে। বিপদে পরার পর থেকে তোমাদের প্রত্যেকের আসল চেহারাটা দেখতে পাচ্ছি আমি। আর আজ তো খাপে খাপ আমার বিশ্বাসও মিলে গেলো। আমার মেয়ের থেকে পনের বছরের বড়, এক বেয়া/দপ, বখে যাওয়া, নে/শা/খোর ছেলের সাথে এরূপ কিছু কল্পনায় আনতেও বাধে নি তোমাদের?
– নাহ! কেন বাঁধবে? তুই কি তোর মেয়ের দিকে তাকিয়েছিস একবার?
– কি তাকাবো? আমার মেয়ে পবিত্র, নির্মল। এক অবোধ শিশু! অপরদিকে তোমার ছেলে নষ্ট! নষ্টের অর্থ বুঝো তুমি? আর কি মনে করেছ? আমি কিছু জানি না? সম্পত্তির লোভ কমাও! বহু বছর ধরে তোমার অপচেষ্টা আমি দেখে আসছি! কিন্তু শুধুমাত্র বড় ভাই দেখে নিজেকে সংযত রেখেছিলাম৷ অথচ আজ মনে হচ্ছে, আমার সকল ধৈর্য অপাত্রে দান করেছি!
– নীরব!
নাইমের ভারি চিৎকারে পুরো কামড়া কেঁপে উঠলো। এর সাথে এক খুনখুনে, মৃদু কন্ঠস্বরও পাওয়া গেলো। নীরব তড়িৎ বেডের দিকে তাকালেন। নিবৃতা কেঁদে উঠেছে। সাথে সমান তালে বিছানার উপর দু’পা দাপিয়ে চলেছে। দু হাত আঁকড়ে ধরেছে নিজের গলা। নিভান ছুটলো বোনের কাছে। শিউলিও নীরবকে ছেড়ে মেয়েকে সামলাতে গেলেন।
– তুমি এখন আসতে পারো ভাইয়া। তোমাদের উপস্থিতি আমার মেয়ের কাছে অসহনীয় ঠেকছে।
– তুই কি তোর আচরণে একটুও অনুতপ্ত নস?
– নাহ!
– সম্পর্ক কিন্তু আজ এখানেই শেষ হয়ে যাবে তাহলে।
নীরব আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন,
– স্বার্থের উপর টিকে থাকা সম্পর্ক দিয়ে আমি কি করবো বলো? দিনশেষে কষ্টই তো পেতে হবে৷
নীরব আর তাকালেন না ভাইয়ের দিকে। ওদিকে নিবৃতার অবস্থা ক্রমশ খারাপের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। ওকে সামলানো যাচ্ছে না৷ চিৎকার করতে কষ্ট হচ্ছে, গলায় পাওয়া আঘাতের কারণে তবুও মেয়েটা থামছে না। হঠাৎ কি হলো?
ডাক্তার এসে, ঘুমের ঔষধ দেওয়ার মাধ্যমে নিবৃতাকে শান্ত করেছেন। নাহলে কোনভাবেই ওকে বাগে আনা সম্ভব হচ্ছিল না৷ উপরন্তু গলায় মারাত্মক চাপের সৃষ্টি হয়েছে। উল্টো আরও ক্ষতি হয়ে গেলো। মুহুর্তে আবারও নতুন চিন্তা ছড়িয়ে পরলো নিবৃতাকে নিয়ে। প্রতিবারই যখন ওর ঘুম ভাঙ্গে, তখন এমন অশান্ত আচরণ করা শুরু করে। কাওকে পরোয়া করে না। কারও ছোয়া সহ্য করে না। নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সবাই বলে, মা’য়ের চেয়ে আপন কেউ নেই! অথচ শিউলি এগিয়ে গেলেও নিবৃতা নিরুত্তর থাকে। চিৎকার করার চেষ্টা করে, কিন্তু গলা ব্যথার জন্য পারে না। নিভান, নীরব কতকিছু বলে ওকে সামলানোর চেষ্টা করে, কিছুই কাজে আসে না। গলায় জোর দিয়েও যখন লাভ হয় না, তখন গুটিয়ে বসে থাকে। পীঠে ব্যথার জন্যও তাও পারে না বাচ্চাটা। সবদিক থেকেই দুর্ভোগ। তবে মাঝে মাঝে শান্ত হয়ে এলে, চুপচাপ নজর চুরি করে, আসেপাশে থাকা সকলকে পর্যবেক্ষণ করে, কিন্তু কিছুই বলে না। অতএব দীর্ঘ এক তত্ত্বাবধান ও সমস্যা নিরাময়ের প্রচেষ্টায় ডাক্তাররা জানালেন, নিবৃতা মারাত্মক ট্রমায় ভুগছে। যতটুকু বোঝা গিয়েছে, সেই ট্রমা এবং মাথায় লাগা আঘাতের কারণে ও অতীতের সবকিছু ভুলে গিয়েছে। সমস্ত কিছু ওকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, সেই ভয়ানক, মূল ঘটনা ব্যতীত ওর মস্তিষ্কে আর কিছুই বাকি নেই৷ তাই তো ও যা দেখছে, যাকে দেখছে, তাকেই ও ভয় পাচ্ছে। ভরসা করতে পারছে না। একধরনের ‘ডিসোসিয়েটিভ এমনেশিয়া’ তে আক্রান্ত হয়েছে ও। এই খবর পাওয়ার পর, নীরব পুরোপুরি ভেঙে পরেন। যেকোন ধরনের যন্ত্রণাদায়ক অতীতকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য, আপনজনের কর্তৃত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে। তাদের সাহচর্যে আমরা মানসিক শান্তি পাই কিন্তু, এরকম অবস্থায়, যেখানে আপনজনদেরই সে চেনে না সেখানে ওকে সাহায্য কিভাবে করা যাবে? মেয়ের কষ্টে নীরব, শিউলির বুক ভেঙে আসে। নিরবচ্ছিন্ন হাহাকারে জব্দ হয় মন৷ নিভান, নিশ্চুপে দেখে যায়, সবকিছু। বাকি সবার মতো, সেও অসহায় এই পরিস্থিতিতে।
তবে দিনে দিনে, করা একান্ত প্রচেষ্টায়, নিবৃতাকে সামলানো, খাওয়ানো একটু সহজতর হয় শিউলির জন্য। ওকে ভরসা না করলেও, সংস্পর্শে না এলেও, প্রাথমিক সাহায্যগুলো নিবৃতা করতে দেয়। তবে, নিভান, নীরব কারও দিকে ভুলেও তাকিয়ে দেখে না ও। হয়তো পুরুষ জাতি বিধায়! আগের সেই সুস্বাস্থ্য পুরোটাই ভেঙে গিয়েছে নিবৃতার। গোল গোল গাল দুটো শুকিয়ে গিয়েছে। ডাগর ডাগর চোখগুলোর জ্যোতি নেই। কেমন নিষ্প্রাণ। অক্ষিকোটর দেবে গিয়েছে। রোগা, পাতলা শরীর, সাথে নানান শারীরিক জটিলতা। দেহের অসহনীয় পীড়ায়, দিনের বেশিরভাগ সময়ই নিষ্পাপ নয়ন যুগল হতে অশ্রু ঝরে! কেমন ছটফট করে সারাক্ষণ। এক বুক ভরা অসহায়ত্বকে বরণ করে, চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই সম্ভব হয় না করার। কারণ নিবৃতার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলেই, ওর আচরণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠে। এভাবে উন্নতির বদলে আরও অবনতিই সাধিত হয়। এজন্যই ডাক্তাররা আগে ওর শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে চাইছেন। ওর ক্ষতগুলো সেড়ে উঠলে, ওর মানসিক চিকিৎসা শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
সময়টা তখন রাত দশটা। নীরব, ঘুমন্ত মেয়ের শিয়রে বসেছিলেন। মেয়েটা ঘুমিয়ে গেলেই, ওর কাছে একটু আসা যায়, নয়তো বোধ অবস্থায়, নীরবের ছায়াও সহ্য করা নিবৃতার জন্য কষ্টসাধ্য। মায়েরা সবচাইতে আপন হলেও নিবৃতা ছিল তার ‘আব্বুর ন্যাওটা। যদিও মেয়েরা বাবার আহ্লাদী হয়, তবুও নিবৃতার প্রতি নীরবের স্নেহের মাত্রা একটু বেশিই ছিল৷ মেয়েও তাকে সবচেয়ে বেশি মেনে চলতো। সকল আবদার ওর বাবার কাছেই তো ছিল। কিন্তু আজ সেই নিবৃতাই, ওর কঠিন, দুঃসময়ে, ওর আব্বুকে পাশে চাইছে না। চোখ তুলে তাকিয়েও দেখছে না৷ বরঞ্চ উল্টো ভয় পায়, অথচ একসময় আব্বুই ছিল ওর সবচেয়ে ভরসার পাত্র, নিরাপদ আশ্রয় স্থল! আজ এক নরপশুর কারণে, নীরব সেখান থেকে স্থানচ্যুত হয়েছেন। সোজা মুখ থুবড়ে পরেছেন। বিষয়টা তার পিতৃ হৃদয়কে পুড়িয়ে ছারখার করে। পুরুষ সত্তাকে ভর্ৎসনা জানায়। কেন এমনটা হলো? মেয়ের মুখের দিকে তাকালে অন্তরটা ঝাঁঝরা হয়ে যায়। কোথায় সেই সদ্য ফোটা ফুলের ন্যায় কোমল মুখকান্তি! আজ নিষ্ঠুরভাবে পদদলিত হয়েছে সেটি। নীরবের ফুলদানিতে সাজানো অতি যত্নের, শখের পুষ্প, অন্য কারও আঙিনায় অবহেলায় পিষ্ট হয়েছে! মাথা নিচু করে চুপচাপ গভীর ধ্যানে বিভোর ছিলেন নীরব। তখনই এই নিস্তব্ধ কেবিনে, মৃদু কন্ঠস্বর কানে আসে। নীরব অবাক হয়ে আসেপাশে তাকান। কেউ-ই তো নেই। তারপর কি মনে করে, নিচে তাকাতেই দেখেন, নিবৃতা ঘুমের মাঝেই কিছু একটা যেন বিড়বিড় করছে। শুষ্ক ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে। নীরব আগ্রহে মুখ নামিয়ে আনেন নিচে৷ কান এগিয়ে নেন। নিবৃতা এতোদিন একটা শব্দও উচ্চারণ করে নি। মনে হয়েছে, ও হয়তো কথা বলতেই ভুলে গিয়েছে। তাহলে কি হচ্ছে এখন? পরপর একদম ক্ষীণ এক স্বর শোনা যায়। তবুও সর্বদা স্পষ্ট কথায় অভ্যস্ত নিবৃতা ঠিকঠাকই নামটা উচ্চারণ করলো।
– রুবেল হাসান। রুবেল হাসান। রুবেল হাসান।
অনবরত এই একই নাম ও বলতে লাগলো। অবিরাম, অক্লান্ত, থেমে গেলো না ওর স্বর। এক পর্যায়ে ছটফট করে উঠলো ঘুমের মাঝেই। সজোরে কেঁদে উঠলো! অথচ নীরব তখন নিজ জায়গায় জমে গিয়েছেন। এ কি শুনলেন তিনি? এই নামটা নিবৃতা কিভাবে জানলো? কেনই বা বিশেষ করে এটাই উচ্চারণ করলো?
– মেয়েকে একটু ধরবেন না? কি হয়েছে?
ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই, ছুটে এসে নিবৃতাকে আগলে ধরলেন শিউলি, কিন্তু নীরবের মুখ ফুটে কোন শব্দ বেরোলো না। তিনি চুপচাপ পকেট থেকে মোবাইল বের করতে করতে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।
– ব্যবসায়ী রুবেল হাসান। আমার সহকর্মী। তার সম্পর্কে সবকিছু জানতে চাই আমি। সাধারণ কিছু না বরং সবচাইতে গভীর এবং লুকায়িত সকল তথ্য! বিনিময়ে যতই চাওয়া হোক, ঠিক ততই দেবো!
নিবৃতা পর্ব ২৪
কল কেটে পকেটে ঢুকিয়ে, হাসপাতাল বারান্দা পথের এক কোনে থাকা জানালার সম্মুখে এসে দাড়ালেন নীরব। চোখের সম্মুখে ঘন আঁধার অথচ চিত্তে তখন ভয়াল আগুন জ্বলছে! যদি তার আন্দাজ সঠিক হয়, তাহলে এক পিতা তার কন্যার ন্যায় বিচারের জন্য যা যা প্রয়োজন, সব করবে, এবং সেটা নিশ্চয়ই কোন আইনের মাধ্যমে নয় বরঞ্চ নিজ হাতে! কারণ নিবৃতার বর্তমান অবস্থার জন্য যদি কাওকে দায়ী করা যায়, তাহলে প্রথম নামটা নীরবেরই হবে। তার মাধ্যমেই তো সেই নরপশু, তার নিষ্পাপ কন্যার দিকে হাত বাড়ানোর রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। এই সত্য নীরবকে বেঁচে থেকেও মে/রে ফেলার জন্য যথেষ্ট। এখন এই দগ্ধ অনুভূতি এবং অপরাধবোধ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোন সুরাহা তো নেই, তবে স্বস্তি অনুভব করার একমাত্র উপায় অবশ্যই!
