Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ২৬

নিবৃতা পর্ব ২৬

নিবৃতা পর্ব ২৬
নেহার ছায়ালিপি

জায়গাটি বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন, নিস্তব্ধ। সামান্য শব্দও যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে কানে বাঁধছে! সম্মুখের বন্ধ দরজাটি খোলার জন্য ভিন্ন কায়দা ফলাতে হবে৷ বল প্রয়োগ করে সম্ভব নয়। গুটিকয়েক যাও মানুষজন রয়েছে, তারা সজাগ হয়ে যাবে। নিশুতি রাত। সকলেই হয়তো এ সময়ে গভীর ঘুমে মগ্ন।

– ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালাতে হবে।
পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে বিড়বিড় করে বলে উঠলো লোকটি। বয়স তার ত্রিশের কোঠায় হবে৷ নীরব কিছু না বলে চুপচাপ তার বাটন মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালিয়ে দিলেন। তৎক্ষনাৎ মৃদু আলো ছড়িয়ে পরলো চারপাশে। পকেট থেকে তারকাঁটা জাতীয় কিছু একটা বের করে, সেটাকে কয়েক প্যাচে ঘুড়িয়ে নিলো অভিজ্ঞ গোছের লোকটা। অতঃপর অত্যন্ত গম্ভীর মুখে তালাটা খোলার চেষ্টা করলো। অভিনব কৌশলের প্রয়োগে সেটা প্রথমবারেই চট করে খুলে এলো৷ লোকটা বিজয়ী হাসি দিয়ে বললো,

– আমার জন্য দুধ ভাত ছিল।
নীরব কিছু বললেন না। গাম্ভীর্য ভাব সেটে রাখলেন অবয়ব জুড়ে। দরজা খুলে লোকটা ভেতরে প্রবেশের জন্য পা বাড়াতেই নীরব থমথমে গলায় বলেন,
– এ পর্যন্ত আপনি সাহায্য করেছেন, এরজন্য আমি কৃতজ্ঞ। এবার বাকিটা পথ আমায় বুঝে নিতে দেন।
লোকটা আর মানা করলো না। তার কাজ ছিল রুবেল হাসান নামক লোকটার সকল গোপন রহস্য ফাঁস করা। তার কাজ শেষ হয়েছে এবং ফিরতি ভালো বিনিময়ও মিলেছে। তাহলে আর আপত্তি করে লাভ কোথায়?
– আমি বাহিরেই দাঁড়ালাম। আপনি কাজ শেষ করে আসেন।

নীরব চুপচাপ মাথা নেড়ে ভেতরে চলে এলেন। দেয়াল হাতড়ে সুইচ বোর্ড খুজে আলো জ্বালাতেই উদ্ভাসিত হলো একটি অগোছালো ডাইনিং স্পেইস। বাসাটির বাতাস বড্ড গুমোট এবং অস্বস্তিকর। লাইটের ভোল্টেজ যথেষ্ট কম। ম্লান আলোয় সবকিছু অদ্ভুতুরে আকার ধারন করেছে। সম্মুখে পা বাড়াতেই নীরবের বুকের ভেতরটা কেমন করে যেন কেঁপে উঠলো। রুবেল হাসানের সম্বন্ধে খুব বেশি না জানতে পারলেও, যতটুকু কানে এসেছে, এতে উনি যা আশংকা করেছিলেন, সেটা অনেকটাই সত্য বলে ঠেকেছে৷ আর আজ সেই সত্যের মুখোমুখি হতে এসে কেমন যেন শরীরের বল ফুরিয়ে আসছে। উনি বুক ভরে শ্বাস টানলেন, অথচ দম যেন আরও বন্ধ হয়ে এলো। এ বায়ুতে প্রাণ নেই, উল্টো বিষাক্ত লাগছে। চারপাশে তাকাতেই দুটি কক্ষ নজরে এলো। একটিতে খিল দেওয়া, অপরটি খোলা। আগে উন্মুক্ত ঘরে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলেন। শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসা ভারি দেহটা টেনে নিয়ে গেলেন সেখানে। অতঃপর যখন আলো জ্বললো, তখন নীরবের দু চোখে গহন আঁধার ঘনিয়ে এলো। নাকে ঠেকলো লৌহযুক্ত, তীক্ষ্ণ গন্ধ! এ মুহুর্তটি জীবনে আসায়, নিজেকে অভিশপ্ত মনে হলো। পিতা হিসেবে ঠিক কতটা অভাগা হলে, এরূপ কিছুর সম্মুখীন হতে হয়? নীরবের বুকে ব্যথা বাড়লো। দেয়াল ধরে নিজের ভরকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেন। পারলেন না নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরলো পীড়াদায়ক অনুভুতি। গাল ভিজে যেতে লাগলো পরপর৷ কতটুকু সময় গড়ালো জানা নেই, এক পর্যায়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন তিনি। দৃষ্টি হঠাৎই কেমন নিরেট, নিষ্প্রাণ হয়ে এলো। এগিয়ে গিয়ে উঁবু হয়ে বসলেন মেঝের উপর। কুড়িয়ে নিলেন মেয়ের ছেঁড়া ফাটা, র/ক্তা/ক্ত স্কুল ইউনিফর্মটা। এরপর এক এক করে চুলের ক্লিপ ও ফিতা। কেটে ফেলা লম্বা চুলগুলো মুড়িয়ে নিলেন কাপড়ের ভাজে। শুষ্ক ঢোক গলাধঃকরণ করে দরজার দিকে ফিরে গেলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলেন লালে রঞ্জিত বিছানার উপর, এরপর সোজা বেরিয়ে এলেন সেখান হতে।

সময়টা এখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছে। চারপাশে এক চটপট ব্যস্ততা বিরাজমান। এর মাঝে বেশিরভাগেরই, দ্রুত কাজ শেষে বাসায় ফেরার তাগিদ। সিলেটে, নিজ অফিসের, ব্যক্তিগত কেবিনে উপস্থিত ছিল রুবেল হাসান। কাজে ভীষন চাপ যাচ্ছে। এরই মাঝে ডেস্কে রাখা তার মোবাইলটা বেজে উঠতেই, আড়চোখে তাকায় সে। স্ক্রিনে ভাসছে অপ্রত্যাশিত একটি নাম। কয়েক মাস আগে যখন ঢাকা থেকে এলো, এরপর আর সে ও মুখো হয় নি। নীরব ফারুকীর সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। আজ হঠাৎ? মেয়ের মৃত্যুর শোক বোধহয় এতোদিনে কাটিয়ে উঠতে পেরেছে তাহলে।
পুলিশের এসপি, নীরবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায়, নিবৃতার খবর জনমাধ্যম অবধি পৌছতে পারে নি। এরজন্যই রুবেল হাসান সেই বাস্তবতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। ওষ্ঠে বিকৃত হাসি ঝুলিয়ে কলটার জবাব দেয় সে তড়িৎ।

– কি ব্যাপার ফারুকী সাহেব! আজ এতোদিন পর আপনার খবর পেলাম ভাই। আমি তো ভেবেছি, আপনি সেই রাস্তায় হাটবেন না। এরজন্য কোন মতামতও জানালেন না আর।
অপর পাশ থেকে তীক্ষ্ণ, যান্ত্রিক শব্দ ভেসে আসছে৷ সাথে ভীষন কোলাহলও। রুবেলের মাথা ধরে এলো মুহুর্তেই!
– পারিবারিক সমস্যায় জড়িয়ে গিয়েছিলাম মিস্টার রুবেল। তাইতো জবাবে দেরী হয়ে গেলো।
মিস্টার রুবেল’ সম্বোধনটা বড্ড খেয়ালি শোনালো। তবুও সেটা এড়িয়ে গেলো রুবেল। ব্যবসায়িক লাভের আগে অন্য কিছুতে দৃষ্টিপাত করা সাজে না৷
– তাহলে কি সিদ্ধান্ত নিলেন?
– আপনি ঢাকা আসছেন দ্রুতই। আমরা সেই ফ্যাক্টরিটা আয়ত্তে নিয়ে নিব। এস সুন এস পসিবল।
রুবেল শব্দ করে হেসে উঠলো, যার প্রতিধ্বনি কাঁটার মতো বিধলো নীরবের কানে।
– আমাদের তাহলে জলদিই দেখা হচ্ছে। বিশেষ খাতিরদারির ব্যবস্থা করুন ভাই।
– কথা দিচ্ছি, এমন আপ্যায়ন করবো যে, আপনি জীবনেও ভুলবেন না।
আবারও জোরালো হাসির মাধ্যমে কথোপকথনের সমাপ্তি ঘটে। নীরব শক্ত মুখে দাড়িয়ে ছিলেন। তখনই পেছন থেকে ডাক এলো,

– ভাই আপনার ব/টি ধার দেওয়া হইয়া গেসে!
নীরব ঘাড় বাঁকিয়ে চান৷ হার্ডওয়্যারের দোকানে এসেছেন তিনি। এগিয়ে যেতে যেতে বলেন,
– শক্ত হাড় অনায়াসে কাটা যাবে তো?
– হাড্ডি এবার কাটবো না ভাই, পুরা গুঁড়া গুঁড়া হইবো!
দোকানী উচ্চ শব্দে হেসে উচতেই নীরবের ঠোঁটের কোনটা তীর্যকভাবে বেঁকে আসে।

দীর্ঘ সংগ্রাম এবং জটিল সময়ে পেরিয়ে, অবশেষে নিবৃতাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে হাসপাতাল থেকে। ওর শারিরীক অবস্থা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। যদিও মানসিক পরিস্থিতি এখনও বেশ সংকটাপন্ন। তেমন কোন উন্নতি ঘটে নি বললেই চলে৷ তাই আজ সকালে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে, আপাতত ওর হাওয়া বদলের প্রয়োজন। তাই এখন ওকে বাসায় পাঠানো হচ্ছে। নিবৃতা চুপটি করে বেডে বসেছিল, আর শিউলি সব জিনিসপত্র গোছগাছ করছিলেন। এরই মাঝে নীরবের আগমন ঘটে।
– রেডি?
– হ্যা।
– নিভানকে তো দেখছি না।
শিউলি মনে পরার ভঙ্গিতে বলেন,
– ওর বলে কি পরীক্ষা আছে আজ। তাই সকাল থেকে আর আসে নি।
– এখন সরাসরি এখানে চলে এলে?
– ওকে আসতে মানা করেছি আমি৷ পরীক্ষা চলছে৷ ছেলেটার মনোযোগ নেই সেখানে৷ তাই বকাও শুনেছে।
– ঠিক করেছ।

নিবৃচা গোল গোল চোখে, বাবা মায়ের কথা শুনছিল। ওর অভিব্যক্তি ভীষন অবুঝ দেখাচ্ছিল। যেন কিছুই বুঝতে পারছে না সে। নীরবের চোখ তার নিষ্পাপ কন্যার মুখ পানে যেতেই থমকে যায়। কতদিন যাবত তার তোতাপাখিটার সাথে কথা হয় না। খুনসুটি জমে না। আহ্লাদ করে সে আর মজা খেতে চায় না৷ কোন বায়না নেই। সব কেমন থেকেও যেন শান্ত, শূন্য, ম্লান। বুকে শুধু হাহাকারই জমে উঠে। উনি আঁড়চোখে শিউলিকে ইঙ্গিত দিতেই, উনি মেয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন। আগলে ধরে ওকে বেড থেকে নামালেন। নীরব ব্যাগপত্রগুলো হাতে তুলে নিলেন। তবে বিপত্তি ঘটলো শেষে৷ নিবৃতাকে কোনভাবেই এই কেবিন থেকে বের করা গেলো না। যেই না বাহিরে কদম রাখবে ওমনি আতংকিত চোখে চেয়ে, অস্ফুটে কেঁদে উঠলো ও৷ অস্থির হয়ে পা দাপাদাপি শুরু করে দিলো। রুগ্ন শরীরে বল খাটিয়ে, শিউলির বাধন থেকে ছুটতে মরিয়া হলো৷ শিউলি পারলেন না ওকে সামাল দিতে। নীরব ছুটে এসে ধরতেই নিবৃতা আরও ব্যকুল হয়ে উঠলো। কেঁদেকেটে নাজেহাল করে ছাড়লো নিজেকে৷ অতঃপর যখন ওকে হাসপাতাল বেডে রাখা হলো, তখনই ছুটে গিয়ে এক কোনে, হাটুতে মুখ দাবিয়ে বসে রইলো। নীরব, শিউলি ব্যাথাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। অভাবনীয় ভয় ওর ছোট্ট মনকে জেঁকে ধরেছে৷ কোথাও ভরসা খুঁজে পাচ্ছে না। শান্তি মিলছে না কিছুতেই। বসে বসে অপেক্ষা করতে হলো ওর ঘুমিয়ে পরার। এরপর, চুপচাপ, ঘুমন্ত মেয়েকে কোলে তুলে নীরব বেরিয়ে এলেন হাসপাতাল থেকে। বাসায় পৌছে, ঘুম থেকে উঠে ওর প্রতিক্রিয়া কি হবে, তা জানা নেই। তবে যে করেই হোক, নিবৃতাকে তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতেই হবে।

সকাল সকাল নিজের সহকারীকে নিয়ে ঢাকায় পৌছেছে রুবেল। নীরবকে তৎক্ষনাৎ কল করলে সে জবাব করে নি। তবে পরপর একটি বার্তা চলে এসেছিল মোবাইলে।
– দুপুরে চলে আসুন বাসায়।
ঠিক দুপুরে আসতে পারে নি রুবেল। নির্দিষ্ট সময়টা জানিয়ে দিয়ে, দুপুরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে খাবার খেয়ে, এরপর নীরবদের বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে সে। এখন বেলা তিনটা গড়িয়েছে। এটা আবাসিক এলাকা। দোকান-পাট নেই৷ সাধারণ বাঙালি এসময়ে ভাত ঘুমে মগ্ন থাকে। চারিপাশ কেমন থমথমে। দু একজন লোক ছাড়া কেউ নেই। এপার্টমেন্ট দালানের সম্মুখে এসে গাড়ি থামতেই, রুবেল এবং তার সহকারী মামুন বেরিয়ে আসে।
– স্যার, আপনি যেতে থাকেন। আমি আসছি।
কাচুমাচু মুখে মামুন কথাটি বলতেই রুবেল হাসলো।
– খাবারের পর টানা হয় নি?
মামুন বিব্রত মুখে মাথার পেছন চুলকায়। রুবেল হাটা ধরে বলেন,
– তিন তলায় চলে এসো।

আশ্চর্যজনকভাবে দরজাটা হাট করে খোলা ছিল। রুবেলের ভ্রু কুঁচকে এলো। ভেতরে যাবে না কলিং বাজাবে? কি মনে করে, মিনিট কয়েক দাড়িয়ে থাকার পর ভাবলো ওর জন্যই হয়তো অপেক্ষা করা হচ্ছিলো, সেজন্যই দরজা খোলা। তাই সহজ মনে ভেতরে ঢুকতেই, আচমকা দরজাটা ভিড়ে গেলো, পরপর ওর মাথার পেছনে ভারি কিছুর আঘাত মিললো। মস্তিষ্ক কেমন নড়ে উঠলো তৎক্ষনাৎ। নিজের ভারসাম্য রক্ষায় নাস্তানাবুদ হয়ে এলো। অসহ্য ব্যথায় মাথার পেছনটা আঁকড়ে ধরে। ক্রমশ ঝাপসা হয়ে এলো চোখের দৃষ্টি। সম্মুখে এক দীর্ঘ অবয়ব নজরে এলেও, চেহারা স্পষ্ট নয়৷ চেতনা ফুরিয়ে আসার পথে, তাল হারিয়ে নিচে পরার আগেই এক বিকট প্রহার এসে ঠেকলো তার ডান হাতের উপর। ফাঁকা মস্তিষ্ক কেমন ভোঁ ভোঁ শব্দ করে উঠলো। হাতটা কাধ হতে অনুভূতিশূন্য ভারি লাগলো। পরপর মুখ থুবড়ে পরলো সে মেঝের উপরে।

বাতাবরণে ভারিক্কি স্বরের আর্ত্মনাদ ছড়িয়ে পরলো সহসা। থেমে থেমে জোরালো নিঃশ্বাসের শব্দ প্রকট হচ্ছে যেন। মেঝেতে পরে রুবেল, ভীষন করে তড়পাচ্ছে! যেন জল বিহীন অসহায় মাছ! পা দুটো ছটফট করছে অসহনীয় পীড়ায়। থেমে থেমে মুখ দিয়ে গোঙানির মতো হালকা শব্দ হচ্ছে। সফেদ টাইলস্ এর মেঝে ইতিমধ্যে নিষ্ঠুরভাবে লাল তরলে ছেয়ে গিয়েছে। নিচে পরে কাতড়ানো লোকটার দিকে হিস্রাত্তক চোখে তাকিয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে প্রহারকারী! চোখদুটো আরক্তিম, চোয়াল পাথুরে শক্ত। হাতে বড় একটি ব/টি পাকড়াও করে রাখা। সেটি চুইয়ে চুইয়ে তাজা গরম র/ক্ত বিন্দু বিন্দু আকারে গড়িয়ে পরছে নিচে। এক পলকেই অবিশ্বাস্যকর একটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে এখানে। আর এই ভয়াল দৃশ্যটির সাক্ষী এমন একজন ধারণ করলো যার এরুপ কিছু দেখা মোটেও উচিত হয় নি। দরজার আড়াল থেকে এক জোড়া হতবিহ্বল, অচল, অনড় চোখে, দেখে নিয়েছে এর পুরোটা। পরপর প্রবল মানসিক ধাক্কায় নিজের শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে সেখানেই হাঁটু গেরে বসে পড়লো ও। কম্পিত হাতটি এগিয়ে দিয়ে দুর্বল কণ্ঠে ডেকে উঠতে চাইলো কাওকে, কিন্তু সম্ভব হল না। সবেগে চলা হৃদপিণ্ডটি খেই হারিয়ে ফেলল সহসা! ধপ করে মুখের ওপর পরে গেলো শরীরটি! মস্তিষ্ক অস্থির হলেও চোখ দুটো বন্ধ হল না। অনবরত গড়িয়ে পরা অশ্রুর ঝাটে দৃষ্টি অস্পষ্ট হয়ে গেলো। চেতনা না লোপ পাওয়ায় সে দেখে গেলো একের পর ঘটতে থাকা সব অশুভ, মর্মান্তিক দৃশ্যাবলী।

গেটের কাছে আসতেই, কারও ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ কানে এলো। অস্থির, অধীর গতিতে নেমে আসছে কেউ। হাঁপাচ্ছে তার কন্ঠস্বর। কানে মোবাইল ঠেকিয়ে রাখা।
– পুলিশ?
নীরবের কদম থমকে গেলো। তাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত বেগে বেরিয়ে যাওয়া লোকটাকে চেনা মনে হলো। সাবধানী নজরে তাকিয়ে তার অনুমান সত্য হলো। লোকটা তো মামুন!
– জ্বি এখানেই। তিন তলায়। আপনারা তাড়াতাড়ি আসুন প্লিজ!
তিন তলা! কথাটি নীরবের মস্তিষ্কে আলোড়ন তুললো। অশনিসংকেত এসে বিধলো অন্তরে। আর ডানে বাঁয়ে তাকানোর অবকাশ মিললো না। ঝড়ের বেগে ছুটলেন নিজ বাসার উদ্দেশ্যে।

কেঁ/টে ফেলা হাতটা ছিটকে গিয়ে ঘরের অপর প্রান্তে পরেছে। রুবেলের জ্ঞান তখন নেই বললেই চলে। ব/টি হাতে তখনও হাঁপাচ্ছে নিভান৷ কিন্তু চিত্তে শান্তি মিলছে না। আবারও উঁচুতে হাত তুলতেই কেউ তুরন্ত ওর হাতটা পাকড়াও করলো। ধারালো বস্তুটা ছিনিয়ে নিয়ে পরপর গালে প্রকান্ড এক থাপ্পড় পরলো। নিভান টলে উঠতেই ওর কলার আঁকড়ে ধরলেন নীরব!
– এই ছেলে! পাগল হয়েছ? এই? এই? কি করলে তুমি এটা? কি করলে? এর পরিনাম কি হবে সেটা বুঝতে পারছো?
নিভান আচমকা হেসে উঠলো। মাথা নেড়ে বললো,
– যেটা তুমি করতে চাইছিলে, সেটা আমি করে দিলাম। পার্থক্য কোথায়?
গালে আরেকটা চড় পরলো। নিভানকে ঝাঁকিয়ে তুলে নীরব হাহাকার করে বললেন,

– আমার চোখের সামনে এক সন্তানের জীবন নষ্ট হয়ে গেলো, এখন আরেকটাও সে পথ ধরলো! কি কপাল আমার! কি কপাল!
নিভান কিছু বলছে না। এই কর্মকান্ডে ওর কোন আফসোস নেই। বরঞ্চ উচিত কাজ হয়েছে। নীরব আর কিছু না বলেই তড়িৎ ওকে টেনে নিয়ে গেলেন, তার ঘরের দিকে। দরজা ঠেলতেই কিছু একটা বাধ সাধলো। নিচু হয়ে দেখলেন, নিবৃতা অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। বিপদের উপর বিপদ। হতভম্ব নিভান গিয়ে বোনকে ধরলো। এরা কখন বাসায় এলো? টনক নড়লো তৎক্ষনাৎ। এ কি বোকামি করে বসলো ও?
– শিউলি!
হাসপাতাল থেকে এসে প্রচন্ড মাথা ব্যথায় ভুগছিলেন শিউলি। সেজন্য ঔষধ খেয়ে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গিয়েছিলেন। তাইতো এতো কোলাহলেও তার ঘুম ভাঙে নি। এবারে শূন্য মস্তিষ্কে উঠে বসতেই, নীরব গিয়ে দ্রুত আলমারি খুললেন। ব্যাগ বের করে, সেটায় কিছু টাকা তুলে ধরিয়ে দিলেন শিউলির হাতে। অতঃপর নিভানের কাছে গিয়ে ওর কাঁধ আকড়ে ধরে ওকে দাড় করালেন। ওর গায়ের র/ক্তে ভরা শার্টটা টেনেটুনে খুলে নতুন আরেকটা টিশার্ট পরিয়ে দিতে দিতে বলেন,

– পুলিশ আসছে৷ তার আগেই, তোমার মা ও বোনকে নিয়ে সাভার চলে যাও। বাহিরে রুবেলের লোক আছে৷ সবুজ শার্ট পরা। তাই সাবধানে বের হবে। ও যেন তোমাদের না দেখে।
নিভান কেঁদে উঠে বলে,
– না আব্বু!
– আর বোকামি করবে না নিভান। নিবৃতার পর এখনও আমার শ্বাস চলছে৷ কিন্তু এবার তোমার কিছু হলে, সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে।
নিবৃতাকে আগলে নিয়ে নিভান হাপিত্যেশ করে উঠলো। ঝোঁকের মাথায় এ কি করলো ও? নির্বোধ সে!
– আমি সরি আব্বু। আমি… আমি….।
কান্নার তরে শ্বাস রোধ হয়ে আসতে চাইলো ওর।
– যাই হয়ে যাক, নিজের মুখ বন্ধ রাখবে। কোনভাবেই কিছু বলবে না। খবরদার বলে দিলাম!
– তুমিও চলো আমাদের সাথে!
নিভান আকুতি করে উঠলো!
– সেই রাস্তা খোলা নেই। আমি চাই না, আমার ছেলের সুন্দর জীবনটা নষ্ট হোক।
– কি হয়েছে? কেউ কি আমায় কিছু বলবে?
নীরব আর কথা বাড়ালেন না। ওদের টেনে ঘর থেকে বের করলেন। বাহিরে এসে, র/ক্তা/ক্ত, এক হাত বিহীন লোককে দেখে শিউলি আর্তনাদ করে উঠেন।

– এসব কি?
– সময় নেই শিউলি। সাভার গিয়ে চুপ করে বসে থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে যা শুনবে, না জিজ্ঞাসা করা হবে, এসবের উত্তরে শুধু একটা কথাই বলবে যে, তোমরা কিছুই জানো না। হাসপাতাল থেকে সরাসরি ওখানেই গিয়েছ, নিবৃতার হাওয়া বদলের জন্য। ঠিক আছে?
– আপনি এসব কি বলছেন?
শিউলির প্রশ্নের জবাব দিলেন না নীরব। নিচে নামতেই দেখা গেলো, ঐ লোকটা গলির ডান দিকে দাড়িয়ে, উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছে। নীরব তার পরিবারকে ঠেলে দিলেন বাম দিকে, একদম চুপিসারে। শিউলি, নিভান, কারও পা চলছিলো না। মনে বল আসছিলো না। তবুও মা, বোনের জন্য নিভানকে যেতে হলো। আজ ওর একটা ভুলের জন্য, আসন্ন এই ভয়াল ঝড়টা হয়তো সব শেষ করে দিবে।

অনতি দুর হতে পুলিশের জিপের, সাইরেনের শব্দ বেজে উঠলো, আকাশ বাতাস গমগম করে। নীরব দ্রুত আবার তার বাসায় চলে এলেন। আসেপাশে তাকিয়ে আপন মনস্থির করলেন। নিজের পরনের পোশাকটা এখনও পরিষ্কার। বিষয়টা সন্দেহজনক। যদিও পরিকল্পনা তার অনেকটা এরকমই ছিল, তবে সবকিছুই হতো লোকচক্ষুর আড়ালে। তবে এখন আর সে সুযোগ নেই। দ্রুতই, নিচে পরে থাকা ব/টিটা পুনরায় হাতে নিলেন তিনি। পরপর এগিয়ে গিয়ে রুবেলের পীঠে বার কয়েক আঘাত করে উঠলেন। র/ক্ত ছিটকে তার মুখে, গায়ে পরলো। নিজ জীবনের জন্য আর পরোয়া নেই তার। ছেলে নিরাপদ থাকলেই হলো, এবং মেয়ের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার করতে পেরে মনে এক অদ্ভুত শান্তি মিললো। জাগতিক অনুভূতি তখন তার অনুভবের উর্ধ্বে! কেমন ইচ্ছে করলো অপর হাতটাও ঐ শরীর থেকে আলাদা করে দিতে। যেই নোংরা, অশুভ হাত, তার নিষ্পাপ মেয়েটাকে নরক যন্ত্রণা ভোগ করিয়েছে, সেটা তার যোগ্য শাস্তির প্রাপ্য। যেই সাধে, আবার হাত উঁচু করতেই কানে আসলো ভারি কন্ঠস্বর,
– হ্যান্ডস্ আপ!

সোফায়, জড় পদার্থের ন্যায় বসেছিল তাবিব। অনুভূতিশূন্য দৃষ্টি ওর হাতে থাকা একটি এলবামে। যেখানে হাসিখুশি ছোট ফারুকী পরিবারের অতীত স্মৃতিরা জ্বলজ্বল করছিল। এর প্রতিটি পাতায় উড়ন্ত প্রজাপতির ন্যায় দুরন্ত নিবৃতারই উপস্থিতি। একসময় তাবিব এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো। যার ক্ষীণ শব্দটাও ওর নিজের কানে বিধলো। অতঃপর সোজা তাকিয়ে, শুষ্ক গলায় বললো,

নিবৃতা পর্ব ২৫

– এরপর কি হলো?
সম্মুখের ল্যাপটপ স্ক্রিনে, দৃশ্যমান এক সুপুরুষ মুখশ্রী। মুখের আদলে নিবৃতার সাথে বেশ মিল রয়েছে। বেদনার্ত দৃষ্টি তার নত, মুখাবয়ব বড্ড নিরেট, শান্ত। একসময় পুরুষালী গমগমে স্বরটা বলে উঠলো,
– আব্বুর শুধুমাত্র একটাই আফসোস ছিল যে, সেই অমানুষটার দম তিনি চিরতরে কেঁড়ে নিতে পারেন নি।

নিবৃতা পর্ব ২৭