নিবৃতা পর্ব ২৭
নেহার ছায়ালিপি
বসার ঘরের আবহাওয়া ধীরে ধীরে আরও গুমোট হয়ে উঠছিল। এক অকল্পনীয়, নীল যাতনা, পৃথিবীর দুই মেরুতে অবস্থানরত পুরুষ দুজনের মনকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। একজন স্মৃতি রোমন্থন, ভয়াবহ অভিজ্ঞতা স্মরনে ক্লিষ্ট, তো অপরজন, আচমকাই অজানা ভয়াল সত্যের মুখোমুখি হয়ে, এর অবর্ননীয় পীড়ার ভারে নতজানু। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, এর বিপরীতে কোন শব্দের উচ্চারণ মানাসই হয় না। সামান্য স্বান্তনা বানীও অযোগ্য, অপরিমেয় ও অসহ্য ঠেকে। কেবল, প্রত্যুত্তরে অন্তঃস্থল চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোয়। মস্তিষ্কে সৃষ্ট আলোড়ন প্রতিবার করে বলে, মাঝে মাঝে কিছু সত্যের আড়ালে, অন্ধকারে ডুবে থাকাই শ্রেয়। কারণ, প্রায়শই এই সমাজের ভয়াবহ বাস্তবতাগুলো বড্ড করুন পরিনতি নিয়ে আসে আমার জীবনে৷ তাবিবের অবস্থাটাও ঠিক তেমনই। নাজেহাল, দিশাহীন, অস্থির। বেশ কিছুক্ষণ যাবত নীরবতা ছড়িয়ে রয়েছে দু পক্ষে। ল্যাপটপ স্ক্রিনের বিপরীত প্রান্তে অবস্থান করা নিভান, কেমন চুপ বনে গিয়েছে। ভাবুক দৃষ্টি তার নত। কিন্তু এভাবে মৌনতা বেছে নিলে তো হবে না। তাবিবের এখনও কিছু প্রশ্নের জবাব শোনা বাকি রয়ে গিয়েছে। এতো দুর এসে, অসহনীয়, তিক্ত ঘটনাক্রম জানার পর, আর থেমে থাকা সাজে না৷ ও শব্দ করে আরেকটি শ্বাস ছেড়ে বলে,
– কিন্ত জন মাধ্যমে তো প্রচার করা হয়েছিলো যে, সেই লোক মারা গিয়েছে!
এ যাত্রা মাথা তুলে তাকায় নিভান। তার সুপুরুষ মুখাবয়বে তখন চাপা আক্রোশের চিহ্ন। তীক্ষ্ণ চোয়াল নিরেট, চোখের দৃষ্টি বড্ড আপোষহীন। তাবিব কিছুক্ষণের জন্য বিচলিত হলো। কিছু বলবে তার আগেই নিভানের শক্ত কন্ঠ শোনা যায়।
– পাওয়ার এন্ড মানি ক্যান ডু এনিথিং। ক্যান ইজিলি বায় সামওয়ান্স মোরাল এন্ড ডিগনিটি। তারা চেয়েছিল আমার আব্বুর সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে। সেটাই সফল করার এক প্রচেষ্টা ছিল এই ভুল তথ্য।
– বাবার কি তবে শাস্তি….
তাবিবের মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে নিভান বলতে থাকলো নিজের মতো।
– আমাদের অবস্থা তখন পাগলপ্রায়। কিভাবে আব্বুকে জামিন পাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়, সে চেষ্টাই চলছিল। তবে এতোকিছুর পর, আব্বুর নির্দেশনা অমান্য করার সাহস আমার হয় নি৷ তাই আমি আড়ালে ছিলাম। তবুও কিছু মানুষদের আপন ভেবে, বাবা তুল্য সম্মান করায়, তাদের দারস্থ হতে বাদ রাখিনি। আমার ছোট চাচ্চু! ঢাকার খ্যাত সরকারি উকিল। নাম বলবে, আপনি অবশ্যই চিনবেন। ভাই হিসেবে তার যেই দায়িত্ব ছিল, সেই কর্তব্য পালনের জন্য তার, কারও জন্য অপেক্ষা করার কথা ছিল না। তবুও তিনি ভাবলেশহীন ছিলেন। এমনকি আমি এবং আম্মু তার কাছে মিনতি করে সাহায্য চাওয়ার পরও তার মন গলে নি। তার রেপুটেশন খারাপ হবে! ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে তার নামে দাগ লাগবে। সেই অযুহাতে আমার আব্বুর বিপদে তিনি পর হয়ে গিয়েছিলেন, অথচ ভুলে গিয়েছিলেন যে কার সাহায্যে উনি এতোদুর এসেছেন৷
স্বার্থের উপর এই সভ্যতা দাঁড়িয়ে। এখানে সেই সভ্যতার আড়ালে, মানুষের হিংস্র চেহারা লুকিয়ে থাকে। অন্যের প্রয়োজনের সময়ই তারা প্রহার বসায়। একের একের ওর নিষ্ঠুর সত্য তাবিবের মনের জ্বালা বাড়ায়৷ তবে ও অবাক হয় না। তার পরিবারই বা কম কিসে! পরম আত্মীয় স্বজন, পরিবার সদস্য সব থেকেও তাবিব একলা জীবন কাটিয়েছে। সবার থেকে দুরে গিয়ে, নিজেকে সামলে নিয়েছিলো, মেয়েকে সহায় সম্বল বানিয়ে।
– আব্বুকে তখন রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে৷ দিনরাত তার উপর অমানবিক নির্যাতন চলছিল। রুবেলের এসিস্ট্যান্ট, সেদিন আমার মুখ স্পষ্ট দেখতে পায় নি, সেজন্যই আমি বিপদমুক্ত ছিলাম। কিন্তু আব্বুর অনুপস্থিতিতে আমাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠে। নিবুকে সামলানো যাচ্ছিলো না। আমাদের কারও মানসিক অবস্থাও ঠিক ছিল না যে, নিবুকে নিয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে ভাববো আমরা। তাই ওরও অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। সবকিছু সামাল দেওয়া দুষ্কর হয়ে উঠে। কয়েক মাসে আমার পরিবারকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল, তা ভুলার নয়। আপনজনের পরিবর্তিত এই রূপ, এই ক্ষুদ্র জীবনে এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা হয়ে রয়েছে।
নিভানের জন্য যেন ওর মুখনিঃসৃত উচ্চারিত প্রতিটার শব্দের ভার সহ্য করা ভীষন কষ্টের হয়ে উঠছে৷ থেমে থেমে জোড়ালো শ্বাস পরছে। তাবিবের মায়া হলো, সামনে বসে থাকা বেদনায় জর্জরিত হয়ে থাকা মানুষটার প্রতি। তবুও আগে জানতে চাওয়ার জন্য বললো,
– এরপর?
– আব্বু তার জীবনে, আপনদের স্বার্থের হাতিয়ার হলেও, বন্ধু মহলে নিঃস্বার্থ সঙ্গ লাভ করেছিলেন। সেভাবেই, সেই কেইসের দায়িত্ব প্রাপ্ত এসপি আঙ্কেল আব্বুর অনেক সাহায্য করেন। রুবেল যে মারা যায় নি, এই সত্য তার নিরলস প্রচেষ্টার সাহায্যেই উন্মোচিত হয়৷ তবুও পরিস্থিতি হাতের নাগালে আসে নি। তৎকালীন সেই এলাকার এমপি, আব্বুকে অনেক স্নেহ করতেন৷ শেষমেশ তাই উপায় না পেয়ে, তার ক্ষমতার প্রয়োগ করে, নানান সংগ্রামের মুখোমুখি হয়ে আব্বুকে ছাড়ানো হয়েছিল।
তাবিব এ বারে বেশ অবাক হলো। নীরব ফারুকী ছাড়া পেয়েছিলেন? তাহলে তার মৃত্যু কিভাবে হলো? নিজের কৌতুলকে দমিয়ে রাখলো না ও।
– বাবার মৃত্যু কিভাবে হয়েছিল তাহলে? আর নিবেদিতাই কিভাবে জীবনে এগিয়ে গেলো।
– আব্বু ছাড়া পেলেও, লোকসমাগমে আমাদের অবস্থান আগের মতো নিরেট ছিলো না। মানুষের কটাক্ষ, তাদের পূর্বের এবং বর্তমান ব্যবহারের মাঝে থাকা ফারাক ছিল আকাশ পাতাল। আব্বুর মতোন আত্ম মর্যাদাবান মানুষের জন্য তা ছিল, অসহনীয়। তার সাথে ছিল পরিবারের থেকে পাওয়া নিরাশা। তাই আমরা আর এ জায়গায় ফিরে আসি নি। সাভারেই থেকে গিয়েছিলাম। সেখানে একটু একটু করে সবটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু ততদিনে নিবুর মানসিক অবস্থা অনেকটাই হাতের বাহিরে। এদিকে আমাকে নিয়ে আব্বুর চিন্তা। এতোকিছুর পরও তার মন থেকে ভয়টা কাটে নি। তাই এইচএসসি এর পরপরই আমাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন আব্বু। পাশাপাশি ছিল নিবুকে সুস্থ করার মতো কঠিন সংগ্রাম।
রুবেলকে আঘাত করতে দেখার দৃশ্য ওর নিজের ট্রমাকে আরও ট্রিগার করে দিয়েছিল। আর তখনকার সময়ে বাংলাদেশে, সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট এর খুব একটা বিস্তারও ছিল না। আব্বুর ইমেজ খারাপ হয়ে যাওয়ায়, ব্যবসায় খুবই ক্ষতির সমমুখী হতে হয়েছিল। এক কথায় বলতে গেলে, সব হারিয়ে আব্বু তখন সর্বশান্ত। তবুও আমাদের বাদবাকি যা পুঁজি ছিলো, সেগুলো খরচ করে নিবুকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল ট্রিটমেন্টের জন্য। তবে দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান সম্ভব হয় নি। ফেরত যেতে হয়েছে দেশে। কিন্তু এতোকিছুর পরও আমাদের নিবুকে আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পারি নি। ওকে বাড়ির বাহিরে নিয়ে আসাই সম্ভবপর হচ্ছিল না। এভাবেই দিন গড়ায়৷ নিবুর পরিস্থিতির উন্নতি হলেও, সেটা খুবই ক্ষীন। ওকে নতুন করে জীবন শেখানো হচ্ছিল, কিন্তু সেই এক আতংক রেখে ও কখনও বের হতে পারে নি। ধীরে ধীরে সকলের সাথে সহজ হলেও, আমাদের সাথে আপন হয়ে মিশে যেতে পারে নি৷ এক দুর্ভেদ্য দেয়াল সবসময়ই ওকে বেষ্টন করে রাখতো। সেভাবেই আব্বু বাসা থেকেই ওর পড়ালেখার ব্যবস্থা করে দিলেন, তার চেনাজানা মানুষের সাহায্যে। একটু একটু করে, সেই করুন অতীতকে সাথে নিয়েই আমাদের ছোট্ট নিবুটা বড় হতে লাগলো।
মৃদু কাশির শব্দ কানে আসে। মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাবিব ঘাড় বাঁকিয়ে চায়। দরজা অভিমুখে রত্না দাঁড়িয়ে। হাতে নাশতা সমেত ট্রে। যখন তাবিব এসেছিল, তখন রত্না বাসায় ছিল না। শিউলি, চুপচাপ তাবিবকে এখানে বসিয়ে দিয়ে বলেছিলেন,
– আমি তো মা। যতই সন্তানের দুরাবস্থা নিজ চোখে দেখে থাকি না কেন, সেগুলো বারবার মনে করাটা একদমই সহ্য হয় না৷ আর আমি চেষ্টা করলেও হয়তো তোমাকে সব ঠিকঠাক বলে উঠতে পারবো না৷ সেজন্যই বৌমাকে বলেছিলাম তোমার সাথে খুলে কথা বলতে। তবে মনে হচ্ছে, সেখানেই আমার সবচাইতে বড় ভুলটা হয়েছে। এখন সেই সমস্যার সংশোধনেরও উপায় নেই। তুমি আমার বড় ছেলের সাথে কথা বলো। যা যা জানতে চাও, ওকে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞাসা করে নিয়ো।
নিভান কল সংযোগে আসতেই শিউলি তড়িৎ বিদায় নিয়েছেন। যেন পালিয়ে বাঁচলেন। এই প্রথম নিজ সুমুন্দির মুখোমুখি হয়ে তাবিব কিছুটা অস্বস্তিতে পরেছিল। তারউপর নিভানের অভিব্যক্তি তেমন সুবিধারও ঠেকেনি৷ তবুও কথোপকথন শুরু করার জন্য প্রথমে সালাম জানালে, নিভান শ্লেষের সহিত প্রত্যুত্তর করে বলে,
– একটা মেয়ে সম্পর্কে সবকিছু ঠিকঠাক করে না জেনেই, বিয়ে করে নিলেন। এতো তাড়া ছিল কিসের জন্য?
কথাটির ইঙ্গিত সহনশীল মনে হয় নি তাবিবের। তাই সে-ও দমে না গিয়ে পাল্টা বলেছিল,
– এটা কি আশা করা স্বাভাবিক নয় যে, বড় ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে নিশ্চয়ই তার স্ত্রী সকল দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন? সেক্ষেত্রে তো বলতে হয়, আমার সাথে অন্যায় হয়েছে। নয় কি?
– অন্যায়? বিয়ে করে আফসোস হচ্ছে বুঝি?
– সেটা সম্পূর্ণই আমার বিষয়। কারপ হস্তক্ষেপ পছন্দ করবো না। তাছাড়া মা আপনাকে অবশ্যই পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করেছেন? আশা করছি এবার আর আমায় নিরাশ হতে হবে না।
নিভান, তাবিব, কেও কাওকে ছেড়ে কথা বলার জন্য তৈরি ছিল না। তবে নিবৃতার প্রসঙ্গ উঠতেই, নিভান কেন যেন আর প্রতিবাদ করতে পারে নি। তাবিব যখন বললো, শুরু থেকে সবটা জানতে চাই, তখন বিনাবাক্যেই, অতীতের সেই ভয়াল ঘটনা সমূহের বিবরণ দিতে থাকে একের পর এক। তবে সেই নিবেশে এবার ছেদ হলো।
– আসসালামু আলাইকুম।
রত্নার চিকন শব্দের সালামে তাবিবের বিতৃষ্ণা জমে গেলো। তবুও আত্মীয়তা রক্ষায় শুকনো মুখে প্রত্যু্ত্তর করতে বাধ্য হলো।
– সরি ভাইয়া, আমি বাসায় ছিলাম না। মা-ও কি আজব কান্ড করে বসলেন, দেখুন তো। আপনি কিছু মনে করবেন না। চা টা নিন। ঠান্ডা হয়ে যাবে।
– সমস্যা নেই ভাবি৷ আমি খেতে আসি নি।
– আরেহ জামাই মানুষের আপ্যায়ন না করে ছাড়ি কিভাবে?
– আমাদের মনে এতো রঙ লাগে নি রত্না।
স্ক্রিনের অপাশ থেকে থমথমে স্বর ভেসে আসতেই রত্নার এতক্ষণে, মুখে সাজিয়ে রাখা নকল হাসিটি খসে পরলো। তাবিবের সম্মুখে এরূপ ব্যবহারে নিজেকে ছোট মনে হলো। তবে এই তিক্ত আচরণের পিছনে কারন কি থাকতে পারে সেটাও রত্নার বোঝা হয়ে গিয়েছে। তাই ও আর কথা না বাড়িয়ে, চুপচাপ আরেক সোফায় আসন পেতে বসলো। এখান থেকে চলে যাওয়ায় মন সায় দিচ্ছে না। রত্নার এই কাজে তাবিব বিরক্ত হলেও কিছু বললো না। পুনরায় নিভানের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বললো,
– কথা শেষ করুন ভাইয়া।
– যা আমাদের কাছে অসম্ভব লাগছিলো, সেটাই বাবার সাহচর্যে অনেকটাই সম্ভব হয়েছিল। নিবু সুস্থ হয়ে উঠছিল। তবে ধীরে ধীরে ওর মাঝে কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, যেগুলো খেয়ালে রাখতে বাধ্য হয়েছিলাম আমরা। একদিন ডাক্তার জানালেন, নিবুর পাস্টে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ওর পক্ষে ফিউচারে কনসিভ করা কষ্টসাধ্য। এমনিতেও নিবুর মানসিক স্থিরি বাগে রাখা মুশকিল ছিল। সেখানে, ডাক্তারের করায় চিকিৎসা, ওসব হরমোনাল ঔষদের ইফেক্ট ওর উপর আরও বাজে প্রভাব ফেলছিল। পরে আব্বুই ওর ট্রিটমেন্ট আর চালু রাখেন নি। তার কখনও ইচ্ছে ছিল না, নিবুকে বিয়ে দেওয়ার৷ সারাজীবন মেয়েকে নিজ ভরসাস্থলে আগলে রাখার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু বাদবাকি সব ইচ্ছের মতোও, সেটাও আর পুরন হয় নি৷ নিবু অনার্স শেষ বছর থাকাকালীন, একদিন হঠাৎ করেই আব্বু ঘুমের মাঝেই, কখনও আর না জেগে ওঠার দেশে চলে যান। ফলে তার মৃত্যুতে নিবু আরও চুপচাপ হয়ে গেলো৷ পড়ালেখা শেষ করে, হঠাৎ এক সময় নিজেই চাকরি করার বায়না করলো, এক পরিচিত আঙ্কেলের সাহায্যে জব নিয়েও নিলো। অথচ বাহিরি দুনিয়ার প্রতি ওর আতংক তখনও জোরদার বহমান। আসলে, বাবার ছায়া না থাকা এবং বড় ভাইয়ের সশরীরে অনুপস্থিতি, একটা মেয়েকে না চাইতেও অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। তিক্ত বাস্তবতা অনুভব করতে বাধ্য করে।
কথাটি বলেই, নিভান অনড় দৃষ্টিতে রত্নার দিকে তাকায়। অথচ রত্না সেই নজরেও ভ্রুক্ষেপ করে না৷ সম্পূর্ণ নির্বিকার। তাবিব সেদিকে লক্ষ্য করলো নিশ্চুপে। তবে অবশেষে নিবৃতা সম্পর্কে অনেকটাই জানা হলো তাবিবের৷ তবে কিছু কথা ও না বলে থাকতে পারলো না।
– আপনার স্ত্রী আমায় বলেছিলেন যে, নিবেদিতার একটা পাস্ট আছে। ওনার ইঙ্গিতটা কোন দিকে ছিলো এবং ঠিক কতটা বাজে ছিল, আশা করি আপনার সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় নি।
স্বীয় স্ত্রীর স্বভাব সম্পর্কে অবগত নিভান৷ কত যে চেষ্টা করলো, তবুও কিছু কিছু মানুষ হয়তো কখনও বদলানোর নয়! ও ক্লান্ত স্বরে বললো,
– কেন এমনটা করেছিলে রত্না?
রত্না নিষ্পলক দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে। ও কখনও মুখ ফুটে আসল সত্য স্বিকার করবে না। এতোকিছুর পরও ওকে চুপ থাকতে থেকে তাবিবের রাগ চাপলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
– কারনটা হলো তার ছোট ভাই রাগিব।
রাগিব’ নামটা উচ্চারিত হতেই নিভান, রত্না উভয়ে অবাক নয়নে তাবিবের দিকে তাকায়।
– রাগিব?
নিভানের বিস্ময়ে তাবিব মাথা নাড়িয়ে বলে,
– জ্বি। রাগিব, নিবেদিতাকে পছন্দ করতো। ভাবির সাথে একদিন ভিডিও কলে থাকা অবস্থায়, ভুলবশত ওকে দেখে ফেলে রাগিব। এবং এরপর থেকেই নিবেদিতাকে বিয়ে করার জন্য সে অস্থির হয়ে উঠে। কিন্তু ভাবি চান নি, তার ভাইয়ের জন্য নিবেদিতাকে নিতে।
– ও বললেই কি আমি আমার নিবুকে রাগিবের কাছে দিয়ে দিতাম?
– মুখ সামলে নিভান! আমার ভাইকে কটাক্ষ করবে না।
রত্নার প্রতিবাদে নিভান শ্লেষাত্মক হাসলো। গলা উঁচিয়ে বললো,
– আর তুমি যে আমার বোনকে ছোট করছো?
– ছোট কোথায় করছি? যেটা সত্য সেটাই তো বলছি! ওর মানসিক, শারীরিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানলে কেও কি ওকে বিয়ে করতে চাইতো? আমি যেমন আমার ভাইয়ের জন্য নিবুকে কখনও নিবো না, সেখানে অন্য কেউ-ই বা কিভাবে রাজি হবে? তোমার শুকরিয়া আদায় করা উচিত যে, আমি তোমার বোনকে পাড় করতে পেরেছি!
– এই! আমার বোন কোনো বোঝা ছিল না যে, তুমি ওকে পাড় করতে পেরো রক্ষা পেয়ে গিয়েছ!
রত্না ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিমায় হেসে বলে,
– রক্ষা পাই নি বলছো? যদি তোমার বোনকে এতো সহজেই সামলানো যেতো, তাহলে বিয়ের মাত্র কয়টা দিন যাওয়ার পর থেকেই তার স্বামী সব সত্য জানার জন্য অস্থির হয়ে যেতো না। আমার কারনেই তো এতো বছর অবদি আসতে পেরেছে তারা! সত্য তো এটাই যে, নিবুকে সহ্য করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। নিজের সাথে বাকি সবার জীবনও কঠিন করে দেয় ও!
– চুপ! একদম চুপ! অনেক বলে ফেলেছ!
নিভান বজ্র কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠতেই, রত্না মুখ ঘুড়িয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলতে থাকে। বিয়ের পর থেকে দেখে আসছে যে, এ বাসায় নিবুকে নিয়ে কিছু বলাই যায় না। তবুও এতো বছর মুখ বুজে সহ্য করে এসেছে৷ কিন্তু আজ আর নয়!
নিভান তখনও নির্বাক হয়ে বসে। রত্নার মনে, ওর পরিবারের জন্য অনীহা, অসম্মান ছিল। সাথে ভালোবাসা এবং স্নেহেরও কমতি ছিল। শুধুমাত্র নিভানের কথায়, আদেশে ও চুপ থেকে এসেছে। কিন্তু ওর জানা ছিল না যে, সেই একটু একটু করে জমা ওঠা রাগগুলো আজ এতো বড় আক্রোশে পরিনত হয়েছে। বিয়ের পর থেকে দুটো দিন শান্তি মিলেছে কি না, নিভান গুনেও বলতে পারবে। ও এক শ্বাস ছেড়ে বললো,
– তোমার অভিযোগ আমি কেন দেশে আসি না, কিংবা কেনোই বা তোমাকে এখানে নিয়ে আসি না। তাই না? তবে আজ আমার বলতে খুশি হচ্ছে যে, অবশেষে এই সব প্রশ্ন এবং এর সমাধান নিয়ে আমি দেশে ফিরছি। খুব শীঘ্রই ফিরছি।
এর কথার পীঠে লুকায়িত হুমকিটা রত্না স্পষ্ট টের পেয়েছে৷ তবে ওর অহং ওকে নত হওয়া থেকে বিরত রাখলো। মুখ বিকৃত করে ও হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো বসার ঘর থেকে। দৃশ্যখানি দেখে তাবিবের মাথা ধরে গেলো। নিবৃতাকে নিয়ে কটাক্ষ করায় ওর মেজাজ খারাপ হলেও, অন্যের স্বামীর উপস্থিতিতে তাকে তিক্ত কিছু বলতেও বিধলো ওর। আসেপাশে কেউ কি ভালো আছে? কথাটা ভাবতেই তাবিবকে প্রবল হতাশা ঘিরে ধরলো।
– রত্না অবশ্য একটা কথা ভুল বলে নি৷ নিবু হয়তো সত্যিই ভালো নেই আপনার কাছে। এর জবাবে কি বলবেন আপনি?
এ প্রশ্নটা তাবিবের নিজেরও। ও কি আদও পেয়েছে নিবৃতাকে ভালো রাখতে? উত্তরটা খুব বেশি কঠিন নয়৷ তানহা ছাড়া ওর ভালো থাকার মাধ্যম কি তাবিব হয়ে উঠতে পেরেছে? না হয়তো। কিন্তু এই ব্যথাতুর কথাটা তাবিব মুখে স্বীকার করতে ব্যর্থ হলো। আর বুদ্ধিমান নিভান সেই নীরবতার মাঝে লুকিয়ে থাকা হাহাকার, হতাশা এবং ব্যর্থতা টুকুন স্পষ্টতই অনুমান করতে পারলো। ও সরব গলায় বলে,
– আমি দেশে থাকলে আপনাদের বিয়েটা কখনই হতো না তাবিব। নিবুর সাথে সরাসরি যোগাযোগের রাস্তা ছিল না। নইলে, আমার আদেশ অমান্য করার সাধ্য ওর কখনই ছিল না।
আমার ভয়ে, মা দু’দিনের মাঝেই বিয়েটা দিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না৷ বড় ভাই আমি, পাশে থেকেও নেই। ভাবিও যে খুব বেশি সুবিধার না সেটা মা নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছিলেন। তাই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করনে এটাই ঠিক মনে হয়েছিল তার কাছে৷
– হয়তো।
তাবিবের মৃদু প্রত্যুত্তরে নিভান হাসলো সামান্য।
– এতোদিনে এগ্রিমেন্টের কারনে আমি দেশে আসতে পারছিলাম না। তবে অবশেষে আমার সকল পিছুটান ছুটে গিয়েছে। খুব দ্রুতই আমি আমার পরিবারকে নিজ হাতে সামলাতে পারবো।
– অবশ্যই ভালো কিছু আগত।
– সেটা তো অবশ্যই। তবে আমার বোনটা হয়তো ভালো নেই আপনার কাছে৷ তাই বলছি, আপনি কি জানেন, আমি যদি একবার ওকে বলি, সব ছেড়ে চলে আসতে, সংসার ত্যাগ করতে, তাহলে ও বিনা প্রতিরোধে সেটা মেনে নিবে? সোজা চলে আসবে আমাদের কাছে৷ আপনাকে ও তোয়াক্কা করবে না।
কথাটায় কি ছিল জানে না তাবিব, তবে সেটা সূক্ষ্ণ সুঁইয়ের মতো বিধলো ওকে। তবুও নিজেকে সামলে মৃদু হেসে বললো,
– আপনার কিছুটা ভুল হচ্ছে। সময় বদলে গিয়েছে ভাইয়া৷ আজ আপনার আদেশকে, কেউ একজন মায়া, মমতা দিয়ে পরিবর্তন করে, নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
– কি বলতে চাইছেন?
– আমার মেয়ে তানহা। নিবেদিতার সবকিছু একমাত্র ও-ই এখন। ওকে ছেড়ে নিবেদিতা কখনোই আসবে না।
– আর তাতে আপনি গর্বিত? মনে মেয়ের আধিপত্য থাকলেও, বাবার জন্য এক ফোটাও জায়গা নেই? এতো বছরে কি খেয়াল রাখলেন আপনি আমার বোনের তাহলে?
তাবিবের ঠোঁটের হাসি প্রশস্ত হলেও, মন গহীনে ক্ষতের গভীর দাগ পরছিল!
– বিষয়টা আমার জন্য গর্বের নয়, বরং আফসোসের। আমি হয়তো সত্যিই ব্যর্থ হয়েছি।
– তাহলে কি করার চিন্তাভাবনা আপনার? একটা বিয়েকে এভাবে টিকিয়ে রাখা যায়?
– বিয়ের মূল ভিত্তি তো আমার মেয়েই ছিল।
– সেটা পুরোনো কথা তাবিব। এখন আমি ফিরছি, একজন সফল মানুষ হয়ে। প্রযুক্তি, পৃথিবী অনেক এগিয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। সেই সাথে আমার বোনের জন্য অনেক কিছু ভেবে রেখেছি আমি এবং সেগুলোই এখন বাস্তবায়িত করার পালা। এডজাস্টমেন্টের লাইফ আর কতই বা টানবে ও? সেই ছোটবেলা থেকে সাফার করছে।
নিভানের কথায় কি কোন ভুল আছে? হয়তো নেই, তবে, নিজেকে বাদ দিলেও, এক বাবা হিসেবে তাবিব অসহায়।
– আমার মেয়েরও তো নিবেদিতা ছাড়া চলবে না।
– আমি একটু স্বার্থপর ঘরনার তাবিব। জীবনের এক সময় অন্যদের নিয়ে ভাবা সত্ত্বেও দিনশেষে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। তাই ওসব এখন দুরেই রাখতে চাচ্ছি। অবশ্য তানহা মামুনিরই বা দোষ কোথায়।
– সমস্যা তাহলে আমাকে নিয়েই তাইতো?
নিভান তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে,
– সেটা ভুল বলেন নি। নিবুর ট্রমা হয়তো আপনার কারনে কখনও নিঃশেষ হবে না। দ্বিতীয় তো, এই বিয়েতে ও আপনার কারনে মত দেয় নি। এরপর যা আছে, সব আমার ভাবনা। বোন জামাই হিসেবে আমার আপনাকে মোটেও পছন্দ হয় নি। আমার হাত বাঁধা ছিল বিধায় এতোদিন অপরাগ ছিলাম তবে এখন আর নয়। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, নিবু আমার জন্য কি? কিশোর বয়সে ওর জন্য খু/ন করতেও হাত কাঁপে নি আমার।
নিভানের ঠান্ডা গলায় বলা প্রতিটি শব্দ তাবিবকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিলো। কোন এক অদৃশ্য অস্বস্তিতে ও৷ নিজের হয়ে কোন সাফাই গাইতে পারলো না। তবুও যতটুকু নিতান্তই না বললে নয়, সেটাই করলো।
– একটা সুযোগ তো আমারও প্রাপ্য।
নিভান ভ্রু উচিয়প বললো,
– এবং সেটা কি?
– নিবেদিতাকে কিছু বলার আগে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করে নিবেন, ও কি আমার সাথে থাকতে চায়? এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায়, ওর তানহাকে নিয়ে ভয় পেতে হবে না৷ সে যদি আমায় না চায়, তাহলে আমার সাধ্য নেই তাকে বেঁধে রাখার। আর আমার মেয়েও ওর সাথে বেশি ভালো ও সুখে থাকবে, সেটা আমি জানি। আমি নাহয় ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরবো। যেমনটা মাঝের দু বছর গিয়েছে, ঠিক সেভাবে বাকি লম্বা সময় টুকুনও কেটে যাবে।
তাবিবের মুখশ্রী কেমন নির্জীব, ফ্যাকাসে হয়ে এসেছে। নিভান সেটা নীরবে পর্যবেক্ষন করে ঠোঁট বাকিয়ে বললো,
– এতোটুকু তো করাই যায়।
তাবিব আর কথা বাড়ালো না। কথোপকথনের সমাপ্তি টানার উদ্দেশ্যে বললো,
– আজ আসি।
– অবশ্যই!
নিবৃতা পর্ব ২৬
উঠতে গিয়েও তাবিবের নজর আটকে গেলো সেন্টার টেবিলে। এখানে এসেই এলবামটা পেয়েছে ও। হয়তো শিউলি ওর জন্যই রেখে গিয়েছিলেন। ও কেন যেন, পারলো না সেটাকে উপেক্ষা করতে। চুপ করে সেটা হাতে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। ওকে বাসায় পৌছতে হবে, কারন হাতে যে খুব বেশি একটা সময় নেই। অস্বীকার করতে চাইলেও ওর অবচেতন মন ঠিক জানে যে, নিবৃতা ওকে কখনও চাইবে না!
