এই অবেলায় পর্ব ২৩
সুমনা সাথী
আরশাদ তালুকদারদের আশ্বস্ত করে নবনীকে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল দিব্য। ঘটনাস্থল থেকে মাত্র দশ মিনিটের দূরত্বে তালুকদারদের নিজস্ব হাসপাতাল। সেই পথটুকু যেন দিব্যর কাছে মনে হলো মাইলের পর মাইল। নবনীকে পাঁজাকোলা করে যখন সে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সবার কৌতূহলী দৃষ্টির চেয়েও ওর কাছে নবনীর নিস্তব্ধ মুখটাই বেশি ভারী মনে হচ্ছিল। করিডোরেই দেখা হয়ে গেল সিনিয়র নার্স অরুনিমার সঙ্গে। দিব্যকে তিনি ভালো করেই চেনেন কিন্তু তার কোলে এক অপরিচিতা তরুণীকে এভাবে দেখে বেশ অবাক হলেন। ত্বরিত পায়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
‘স্যার, উনি? কী হয়েছে ওনার?’
অরুনিমা নবনীকে চেনেন না। তাই দিব্যর কোলে তাকে দেখে বিস্মিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। দিব্য পরিস্থিতিটা আঁচ করে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
‘উনি মিসেস দিব্য তালুকদার। অরুনিমা, জলদি কাব্য অথবা অন্য কোনো ডাক্তারকে ডেকে পাঠান। আর আমাকে একটা খালি কেবিনের ব্যবস্থা করে দিন।’
অরুনিমা উত্তর দিল, ‘স্যার, ওদিকের কেবিনটা ফাঁকা আছে। ওখানে নিয়ে চলুন। তবে সমস্যা হলো। এই মুহূর্তে কোনো ডাক্তার পাওয়া বড্ড কঠিন। আগুনের ঘটনায় অনেক রোগী এসেছে। কাব্য স্যারও ওদিকেই ব্যস্ত। অবশ্য আপনি বললে উনি নিশ্চয়ই আসবেন। আমি কি ডেকে আনব?’
দিব্যর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। নবনীর জ্ঞান এখনো ফিরছে না কিন্তু ওপাশে আগুনে পোড়া মুমূর্ষু মানুষগুলোর গুরুত্ব সে অস্বীকার করতে পারল না। সে জানে ওই মানুষগুলোর এখন ডাক্তারকে বেশি প্রয়োজন। দিব্য নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
‘সমস্যা নেই। ওখানে যারা কাতরাচ্ছে ওরাও আমার পরিবারের মতোই। সবাইকে বলে দাও ওদের চিকিৎসায় যেন কোনো ত্রুটি না থাকে। নবনী সম্ভবত প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে জ্ঞান হারিয়েছে। ভয়ের কিছু নেই তো। কী মনে হয় আপনার?’
অরুনিমা দিব্যর কোলে থাকা নবনীর মুখটা একবার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর আশ্বস্ত করে বলল,
‘আপনি ওনাকে কেবিনে নিয়ে চলুন। যদি আমার ওপর ভরসা করেন তবে আমিই দেখতে পারি। দেখে মনে হচ্ছে তেমন সিরিয়াস কিছু নয়। জাস্ট নার্ভাস ব্রেক-ডাউন।’
দিব্য মুহূর্তকাল দ্বিধা করল। তারপর নবনীর ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ঠিক আছে। তাই হোক।’
কেবিনে পৌঁছানোর পর নবনীকে বেডে শুইয়ে দিয়ে দিব্যর অস্থিরতা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। অরুনিমা শান্ত মাথায় নবনীকে পরীক্ষা করছিলেন একপর্যায়ে ধৈর্য হারিয়ে দিব্য বলে উঠল,
‘এখনো জ্ঞান ফিরছে না কেন অরুনিমা? প্রায় পনেরো মিনিট হয়ে গেল ও সংজ্ঞাহীন! এতটা সময় তো স্বাভাবিক না। কোনো ভয়ের কিছু নেই তো? নাকি আমি অন্য কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাব?’
দিব্যর কথা বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছিল পনেরো মিনিট নয়, পনেরো ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। অরুনিমা বিষ্ময় ভরা চোখে তার বসের দিকে তাকালো। দিব্যর মতো একজন গম্ভীর আর ধীরস্থির মানুষ যে নিজের স্ত্রীর জন্য এমন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়তে পারে তা তার কল্পনার অতীত ছিল। অরুনিমার ভেতরটা হাসিতে ফেটে পড়তে চাইলেও বসের সামনে গম্ভীর মুখ বজায় রাখাটা জরুরি ছিল। সে হাসি চেপে আশ্বস্ত করে বলল,
‘স্যার, শান্ত হোন। পনেরো মিনিট খুব বেশি সময় নয়। কেউ কেউ তো কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত অবচেতন থাকে। এই তো এখনি জ্ঞান ফিরে আসবে ওনার। এসব ছোটখাটো বিষয় সামলানোর মতো অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমায় ভরসা রাখতে পারেন। নয়তো আমি কি কাব্য স্যারকে খবর দেব?’
দিব্য কিছুটা লজ্জিত হয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
‘না, ঠিক আছে। ইট’স ওকে।’
অরুনিমা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, আপনি ওনার পাশে বসুন। ওদিকে বোধহয় রোগীদের ভিড় বাড়ছে। আমাকে যেতে হবে। আপনি একদম দুশ্চিন্তা করবেন না। কিছুক্ষণেই ওনার জ্ঞান ফিরবে।’
দিব্য মাথা নেড়ে সায় দিল। অরুনিমা যেতে উদ্যত হলে সে একটু কুণ্ঠিত স্বরে যোগ করল,
‘আমার হাতটাও কিছুটা পুড়েছে। যদি একবার দেখতেন।’
অরুনিমা আঁতকে উঠলো। নিজের হাত ঝলসে গেছে অথচ লোকটা এতক্ষণ মুখ ফুটে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি! ও তড়িঘড়ি করে দিব্যর হাতটা পরীক্ষা করলো। কনুয়ের নিচের বেশ খানিকটা জায়গা আগুনে ঝলসে গেছে। দ্রুত হাতে ওষুধ লাগিয়ে জায়গাটা ব্যান্ডেজ করে দিয়ে কাব্যর কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন লিখিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বেরিয়ে গেল। কেবিনে এখন কেবল তারা দুজন। দিব্য নবনীর পাশে এসে বসল। নিস্তেজ হয়ে শুয়ে থাকা নবনীকে দেখে মনে হচ্ছিল সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দিব্যর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল কিছুক্ষণ আগের সেই দৃশ্য। নবনীর পাগলের মতো আর্তনাদ আর কান্না। আজকের নবনী যেন একেবারেই অন্য এক মানুষ। দিব্য অত্যন্ত আলতো করে হাত বাড়িয়ে নবনীর কপালে লেপ্টে থাকা অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিল। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই ম্লান কিন্তু অপরূপ শ্রীমুখের দিকে। শুভ্র গায়ের রং, টিকলো নাক আর গোলাপের পাপড়ির মতো পাতলা ঠোঁট। নিঃসন্দেহে এই মেয়েটিকে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দরীদের কাতারে ফেলা যায়। দিব্য নিজের হাতটা নবনীর গালের কাছে নিয়ে পরখ করল। তার মনে হলো, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেমানান অথচ অদ্ভুত সুন্দর এক দৃশ্য। নবনীর দুধে-আলতা গায়ের রঙের পাশে তার কৃষ্ণবর্ণ দেহটা বড্ড বেমানান লাগছে। দিব্য নিজের মনেই একটু হাসল। হঠাৎ নবনীর চোখের পাতা নড়ে উঠল। দিব্য মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে বসল। নবনী ধীরে ধীরে চোখ মেলতেই দিব্যর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে গেল। ব্যাকুল হয়ে ডাকল,
‘নবনী? নবনী, শুনতে পাচ্ছো আমাকে?’
নবনী চোখ মেলে ঝাপসা দৃষ্টিতে দিব্যর মুখটা দেখল। পরক্ষণেই যেন এক তীব্র আতঙ্ক ওকে গ্রাস করল। একটু উঁচু হয়ে সে জড়িয়ে ধরল সামনে সামান্য ঝুঁকে থাকা দিব্যর গলা। দিব্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। নবনীর দেহের কম্পন সে নিজের অস্তিত্বে অনুভব করতে পারল। নবনী বলল,
‘আমার খুব ভয় লাগছে।’
দিব্য ওর মাথায় হাত রেখে শান্ত স্বরে জানতে চাইল,
‘কেন নবনী?’
‘ওই লা শগুলো… কতটা বি কৃত ছিল ওগুলো! আমি দৃশ্যগুলো কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছি না। বারবার মনে হচ্ছে… আর আপনি… আচ্ছা, আমরা এখন কোথায়?’
ছোট করে উত্তর দিল দিব্য, ‘হাসপাতালে।’
‘ভাই? ওহ্ স্যরি! ভুল করে ঠিক জায়গায় চলে এসেছি!’
হঠাৎ কলরবের কণ্ঠস্বর কানে আসতেই বিদ্যুদ্বেগে দিব্যর বুক থেকে সরে এল নবনী। দিব্য ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। কলরব দরজার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল,
‘নাটক না করে এবার ভেতরে আয়।’
কলরব এবার ঘুরে তাকাল। দিব্য বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। অবাক করে দিয়ে কলরব ছুটে এসে দিব্যকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দিব্য এবার সত্যিই হতভম্ব। বিরক্ত গলায় বলল,
‘সমস্যা কী তোদের বল তো? সবাই এমন অদ্ভুত আচরণ করছিস কেন? এখন কি তুইও জ্ঞান হারিয়ে আমায় জ্বালবি নাকি?’
কলরব কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘আমি অজ্ঞান হলে কি তুমি আমাকেও ভাবির মতো ওভাবে কোলে তুলে নেবে?’
‘একদম না! লাথি দিয়ে তোর জ্ঞান ফেরাব আমি।’
কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘জানি তো। সব সময় আমার সাথেই যত বৈষম্য হয়!’
‘এবার আমাকে ছাড়। নাটক না করে কী বলবি বল।’
নবনী দুই ভাইয়ের এই খুনসুটি দেখে অবাক হলেও মনের এক কোণে প্রশান্তি অনুভব করল। ওদের সম্পর্কটা সহজ হয়েছে। তবে পরক্ষণেই কলরবের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। তার চোখ দুটো ছলছল করছে। সে মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল,
‘ভাইয়া, আই অ্যাম স্যরি। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। ওইদিন আমার মাথা ঠিক ছিল না। আজ যখন সবাই বলছিল তুমি আগুনের ভেতর আটকে পড়ে আছ; আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আব্বু চিৎকার করে কাঁদছিল কিন্তু আমি কাঁদতে পারছিলাম না; তার মানে এই না যে আমি তোমাকে ভালোবাসি না। বিশ্বাস করো ভাই, আমার মনে হচ্ছিল ওই আগুনেই ঝাঁপ দিয়ে তোমাকে বের করে আনি।’
দিব্য মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এই তো তার ভাই। ছোটবেলার সেই দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। কলরব ছিল ওর আদরের ‘পুতুল’। পুতুল বলে ডাকতো ওকে। যেমন দুধে-আলতা গায়ের রং, তেমনই গোলগাল চেহারা ছিলো ওর। সবাই তাই বলে হাসাহাসি করত কিন্তু কলরব কখনো রাগ করত না। সে ছিল ভাই-অন্ত প্রাণ। ভাইয়ের কথাই তার কাছে ছিল একমাত্র সত্য। দিব্য কিছু বলেছে মানে সেটায় ঠিক। দিব্য আলতো করে কলরবের কাঁধে হাত রাখল। কলরব মুখ ফিরিয়ে নিজের চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করল। দিব্য নরম স্বরে বলল,
‘আমি তোর ওপর এক ফোঁটাও রাগ করিনি। শুধু শুধু কেন মাফ চাইছিস?’
কলরব মাথা নেড়ে বলল, ‘উঁহু! আমি জানি তুমি রাগ করেছিলে।’
দিব্য মৃদু হেসে কলরবের পিঠে চাপড় দিল। ‘একটু বেশিই বুঝিস তুই। চল এবার বাড়ি ফিরি। কিন্তু তুই আবার হাসপাতালে আসতে গেলি কেন? আমি তো বাড়িতে আসতামই।’
কলরব হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে ফেলল। বলতে পারল না যে ভাইয়ের জন্য তার বুকটা কতটা অস্থির হয়ে ছিল। সে হাসিমুখে প্রসঙ্গ পাল্টে দিয়ে বলল,
‘ভাবি ওভাবে অজ্ঞান হয়ে গেল; তাই ভাবলাম বড় কোনো সুখবর আছে কি না! সেই উত্তেজনায় চলে এলাম।’
পুরো কথাটা মাথায় আসতেই দিব্যর কপাল কুঁচকে গেল। সে চোখ রাঙিয়ে তাকাল ভাইয়ের দিকে। নবনী লজ্জায় সিঁটিয়ে গিয়ে মুখ নামিয়ে ফেলল; তার ফরসা মুখটা মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। কলরব হাসতে হাসতে আবারও টিপ্পনী কাটল,
‘কী খবর বলো ভাইয়া? মিষ্টি কি খেতে পারব?’
দিব্য কড়া গলায় বলল, ‘মার খাবি তুই। আমার সাথেও ফাজলামি শুরু করেছিস?’
নবনী আর কলরবকে সাথে নিয়ে দিব্য যখন বাড়ি ফিরল, তখন অন্দরে যেন দ্বিতীয় দফার কান্নার রোল পড়ল। অলেখা ছেলেকে ফিরে পেয়ে হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার মতো হাহাকার করে উঠলেন। প্রিয়জনকে হারানোর ভয়ে মানুষ যতটা কাঁদে। ফিরে পাওয়ার কৃতজ্ঞতায় বোধহয় তার চেয়েও বেশি অশ্রু বিসর্জন দিলেন তিনি। সবার সাথে কুশল বিনিময় আর আশ্বাসের পালা শেষ করে দিব্য অবশেষে নিজের ঘরে ফিরে এল। ঘরে ঢুকতেই ওর নজর কাড়ল বিছানায় শুয়ে থাকা সেই ছোট্ট দেহটি। দিব্য ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। দিয়া তখনো বাইরের পৃথিবীর কোনো খবর না রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। সন্ধ্যার ছায়া নামছে চারদিকে। দিব্য ওর ছোট্ট মুখটার ওপর ঝুঁকে পড়ে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। দুহাতে সেই আদুরে মুখটা আগলে ধরে সারা মুখে চুমু আর আদরে ভরিয়ে দিল সে। নিজের অজান্তেই দিব্যর দুচোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল দিয়ার গালের ওপর। কিন্তু সে আজ অশ্রু সংবরণ করার চেষ্টা করল না। বরং অবদমিত এক ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নায় ওর বুকটা কেঁপে উঠল। দিয়ার মাথার কাছে বসে ওর কপালে হাত রেখে দিব্য ধরা গলায় বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
‘পাপ্পা তোমাকে বড্ড মিস করেছে মা। মনে হচ্ছে যেন কত যুগ তোমাকে দেখি না। তুমি কি জানো, যখন ওই আগুনের লেলিহান শিখাগুলো আমায় চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছিল তখন সবার আগে পাপ্পার চোখের সামনে তোমার মুখটাই ভেসে উঠেছিল? আমার বারবার মনে হচ্ছিল আমি আর কোনোদিন তোমার মুখটা দেখতে পাব না। কোনোদিন তোমাকে কোলে নিয়ে আদর করতে পারব না। তোমাকে কাঁধে বসিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারব না। সেই ভাবনায় মৃ ত্যুর আগেই আমি মৃ ত্যু যন্ত্রণা পাচ্ছিলাম মা। পাপ্পা লাভ ইউ… লাভ ইউ ইনফিনিটি। তুমি আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আমার সবচেয়ে দামী সম্পদ। আমার কাছে এই পৃথিবীতে সব কিছুর আগে তুমি। পাপ্পা তোমার সাথে আরও অনেক অনেক সময় কাটাতে চায় সোনা…!’
হঠাৎ কারো পায়ের শব্দে দিব্যর কথাগুলো থেমে গেল। সে তড়িঘড়ি করে হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। নবনী ঘরে ঢুকেছে। সে এগিয়ে এসে বলল,
‘আপনি এই অবস্থায় ওকে কেন ছুঁলেন? আগে তো একটু ফ্রেশ হতে পারতেন। আপনি বরং গোসল করতে যান। আমি ওকে ডেকে তুলছি। এমনিতে আজ ও অনেক বেশি ঘুমিয়েছে।’
দিব্যর আর্দ্র চোখের কোণ আর চেহারার ভঙ্গি দেখে নবনী কিছুটা আঁচ করতে পারল। দিব্য তালুকদার যে তার মেয়ের জন্য কতটা পাগল তা নবনীর অজানা নয়। দিব্য মৃদু মাথা নেড়ে সায় দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ঠিক তখনই নবনীর নজর গেল দিব্যর হাতের ব্যান্ডেজটার দিকে। আশ্চর্য! এতক্ষণ এই ক্ষতটা তার নজরেই আসেনি। সে অস্থির হয়ে শুধাল,
‘আপনার হাতে কী হয়েছে?’
দিব্য নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল, ‘সামান্য পুড়েছে। তেমন কিছু না।’
নবনীর মনে এবার একরাশ লজ্জা আর অনুশোচনা দানা বাঁধল। মানুষটার হাত পুড়েছে। আগুনের সাথে লড়াই করে ফিরেছে; অথচ জ্ঞান হারাল কি না সে! শুধু জ্ঞান হারানোই নয়। দিব্যর এই আহত শরীরটার ওপর ভর দিয়েই তো সে হাসপাতাল পর্যন্ত গেল। নবনী অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘আপনাদের বোধহয় বেশ ক্ষতি হয়েছে তাই না? আব্বু নিচে বলছিলেন…!’
দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘হ্যাঁ, ক্ষতি তো কিছুটা হয়েছেই। যাইহোক ওসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আমি একটা গোসল দিয়ে আসি। তোমার শরীর কি এখন ঠিক আছে? আর খারাপ লাগছে না তো?’
নবনী মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করল। দিব্য আলমারি থেকে নিজের পোশাক বের করে ধীরপায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। নবনী এবার দিয়ার কাছে গিয়ে ওকে জাগানোর চেষ্টা করল। দিয়া চোখ না মেলেই আধো-ঘুমে জড়িয়ে থাকা গলায় বলল,
‘মাম্মা, দিয়া এখন জঙ্গলে যাচ্ছে। আমায় ডিস্টার্ব করো না তো!’
মেয়ের কথা শুনে নবনী প্রথমে অবাক হলেও পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। বোঝা গেল মেয়েটা স্বপ্নের রাজ্যে কোনো এক গহীন বনে পাড়ি জমিয়েছে। সে জোর করে দিয়াকে টেনে তুলে বসাল। দুষ্টুমি করে বলল,
‘জঙ্গলে তো বড় বড় বাঘ থাকে সোনা। ওরা কিন্তু কামড়ে দেবে!’
দিয়া উঠে বসে পিটপিট করে তাকাতে লাগল। তার চোখে ঘুমের ঘোর থাকলেও গলায় বেশ জোর দিয়ে বলল,
‘মাম্মা, তুমি কিচ্ছু জানো না। বাঘ কামড়ায় না। ওরা একদম ভর্তা করে খেয়ে ফেলে। আমি টিভিতে দেখেছি তো!’
নবনী হেসে ফেলল। আদুরে গলায় বলল, ‘আচ্ছা বাবা, তাই সই। এখন আর ঘুমিয়ে কাজ নেই আর ঘুমালে কিন্তু রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারবে না।’
দিয়া মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, ‘আজকে রাতে তাহলে পাপ্পার সাথে ফাইট ফাইট খেলব। তুমিও খেলবে আমাদের সাথে?’
নবনী শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘পাপ্পা আজ খেলতে পারবে না সোনা। পাপ্পা ভীষণ ক্লান্ত। ওনার একটু বিশ্রামের দরকার। আমরা বরং কাল খেলব? তুমি বরং ইহান আর ইভানের সাথে খেলতে যাও।’
কথাটা শুনেই দিয়ার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। সে গাল ফুলিয়ে দুহাত বুকের ওপর বাঁধলো। বিষণ্ণ গলায় বলল,
‘ইভান এখন খেলবে না মাম্মা, ও তো পড়াশোনা করবে। আর ইহান টিভি দেখবে। ধুর বাবা, কিচ্ছু ভালো লাগে না!’
মেয়ের অভিমানী রূপ দেখে নবনী যেমন মজা পেল তেমনি একধরণের অস্থিরতাও কাজ করতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে এল দিব্য। ভেজা চুলে তোয়ালে ঘষতে ঘষতে সে এগিয়ে এসে শুধাল,
‘কী সমস্যা? আমার মাম্মা তো দেখছি উঠে পড়েছে। কিন্তু কী ব্যাপার আমার প্রিন্সেসের মুখটা এমন ভার হয়ে আছে কেন?’
দিয়া জানাল, ‘দিয়া খেলবে পাপ্পা!’
দিব্য মেয়েকে কোলে তুলে নিল। বলল, ‘আচ্ছা, তো দিয়া কী খেলবে?’
‘ডিসুম ডিসুম!’
দিব্য হেসে মাথা নেড়ে সায় দিল, ‘ওকে, চলো। এখনই খেলব আমরা।’
নবনী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে চেয়েছিল দিব্যকে কিছুটা বিশ্রাম দিতে কিন্তু দিব্য যেন মেয়ের কাছে সব ক্লান্তি ভুলে গেছে। দিব্য নিজের হাতের ভেজা তোয়ালেটা নবনীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে দিয়াকে নিয়ে হাসিমুখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নবনী শুধু চেয়ে রইল সেদিকে।
সেই দুপুরের পর নিযানা একবার যে ঘরের দরজা দিয়েছিল তারপর আর বাইরের পৃথিবীর মুখোমুখি হয়নি। কুহু বেশ কয়েকবার ডাকলেও নিযানা যাইনি। আর কলরব? সে তো একবারের জন্যও ঘরের ত্রিসীমানায় আসার প্রয়োজন বোধ করেনি। বাড়িতে কী ঘটছে; না ঘটছে তা নিযানার অজানা। ফেরার পর প্রচন্ড অভিমানে অনেকটা সময় কেঁদেছে সে। তারপর একসময় ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। রাতে খাওয়ার জন্য মৌনিতা আর কুহু ডাকাডাকি করলেও সে ওঠেনি; তার শরীরের ভেতরটা কেমন যেন অবসন্ন হয়ে আছে। কিছু খাওয়ার রুচিটুকুও অবশিষ্ট নেই। রাত গড়িয়ে দশটা। কলরব তখনো ফেরেনি। নিযানা এতক্ষণ দরজাটা ভিড়িয়ে রেখেছিল কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার মেজাজটা আরও তিক্ত হয়ে উঠল। এত রাত পর্যন্ত কোথায় থাকে এই ছেলেটা? রাগের চোটে উঠে গিয়ে এবার সশব্দে দরজা আটকে দিয়ে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে। কলরব যখন ফিরল তখন রাত একটা। অবশ্য এই সময়ে ফেরা তার জন্য নতুন কিছু নয়। রাত দশটার পর বাড়ির সদর দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও তার জন্য অসাধ্য কিছু নেই। কিন্তু আজ ঘরে ঢোকার পর এক অদ্ভুত বিপত্তির মুখে পড়ল সে। ব্যালকনি টপকে চোরের মতো ঘরে ঢুকে সে অবাক হয়ে দেখল ঘরের মূল দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ।
বিছানায় নজর পড়তেই দেখল নিযানা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। কলরবের মেজাজটা এবার চড়ে গেল। কত বড় স্পর্ধা এই মেয়েটার! তার ঘরেই তাকে না জানিয়ে ভেতর থেকে খিল তুলে রাখা? তার মানে কি দুপুরের পর এই দরজা আর খোলাই হয়নি? এভাবে রাগ মিটে নাকি? শুধু বাড়াবাড়ি! এখন যদি জিজ্ঞেস করে সে ঘরে ঢুকল কী করে? কি হবে? এটা ভেবে সে ধীরপায়ে গিয়ে অতি সন্তর্পণে দরজার খিলটা খুলে দিল। তারপর কোনো শব্দ না করে খাটের এক পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। শোয়ার পর কলরবের মনে হলো, নিযানা ঘুমের ঘোরে অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলছে। কলরব চমকে উঠল; বুকটা তার এক মুহূর্তের জন্য ধক করে উঠল। মেয়েটা কি তবে জেগেই ছিল? সে ভয়ে ভয়ে নিযানার মুখের কাছে একটু ঝুঁকে আসতেই ওর তপ্ত নিশ্বাস অনুভব করল। এই তাপ মোটেও স্বাভাবিক ঠেকলো না তার কাছে। দ্বিধা নিয়ে আলতো করে নিযানার কপালে হাত রাখতেই সে আঁতকে উঠল। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে! তবে কি মেয়েটা জ্বরের ঘোরেই প্রলাপ বকছে? কলরব এবার ভেতরে ভেতরে কিছুটা সংকুচিত হলো। অনুশোচনা না কি কর্তব্যবোধ তা সে জানে না। তবে নিচু গলায় কয়েকবার তাকে ডাকল। নিযানা অনেক কষ্টে তার চোখের ভারী পাতা দুটো খুলে তাকালো। কলরবের আবছা অবয়ব দেখে অত্যন্ত ক্ষীণ আর নিচু গলায় বলল,
‘কী হয়েছে? আমাকে কেন বিরক্ত করছো?’
কলরব দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধাল, ‘তোর গায়ে কি জ্বর এসেছে?’
নিযানা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিল, ‘আমি জানি না।’
‘তুই জানবি না তো কে জানবে?’
নিযানা আর কোনো উত্তর দেওয়ার শক্তি পেল না। কলরব বিছানা ছেড়ে উঠে ঘরের মূল আলোটা জ্বেলে দিল। তীব্র আলোয় নিযানার চোখদুটো আরও কুঁচকে এল। কলরব ওকে ধরে একপ্রকার জোর করেই বসিয়ে দিল। নিযানা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না ওর সাথে ঠিক কী হচ্ছে। প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে ও চোখ মেলে তাকালো। কলরবের কপালে বিরক্তির ভাঁজ। নিযানা তপ্ত গলায় বলে উঠল,
‘তোমার সমস্যাটা কী?’
কলরব কোনো তর্কে গেল না। সে উঠে গিয়ে ড্রয়ার হাতড়ে থার্মোমিটারটা বের করে আনল। ওটা নিযানার পাশে ছুড়ে দিয়ে বলল,
‘মনে হচ্ছে ভালোই জ্বর এসেছে। চেক করে দেখ।’
নিযানার বিরক্তির ভ্রুকুটি এবার কিছুটা শিথিল হয়ে এল। রাগের জায়গায় এবার এক অজানা চিন্তা ভর করল ওর মনে। কথা না বাড়িয়ে সে যন্ত্রটা হাতে তুলে নিল। ঘরে কিছুক্ষণ নিশ্ছিদ্র নীরবতা বিরাজ করল। থার্মোমিটারের তীক্ষ্ণ ‘পিপ-পিপ’ শব্দে সেই নিস্তব্ধতা ভাঙলে ওটা চোখের সামনে ধরতেই নিযানা চমকে উঠল। কলরব উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কত দেখাচ্ছে?’
নিযানা শুকনো গলায় ছোট করে উত্তর দিল, ‘একশ তিন।’
কলরব বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘১০৩ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে তুই দিব্যি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিস? তুই কি মানুষ?’
নিযানা কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে চাইল কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ওর ভেতরটা ওলটপালট করে গা গুলিয়ে এল। সে তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়তে গেল। আচমকায় পা টলে উঠল ওর। ধপ করে আবার খাটের ওপর বসে পড়ল সে। কিন্তু বমি ভাবটা কিছুতেই সামলাতে পারছিল না। এবার দাঁতে দাঁত চিপে সর্বশক্তি সঞ্চয় করে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে ছুটে গেল ও। প্রায় সারাদিন পেটে দানাপানি কিছু না পড়ায় কেবল তিতকুটে জল বের হয়ে এল গলা দিয়ে। কলরব বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুটা উঁচু গলায় বলল,
‘আমি ঔষধ নিয়ে আসছি।’
নিযানা শুনল ঠিকই কিন্তু প্রত্যুত্তর করলো না। কলরবও উত্তরের জন্য অপেক্ষা করলো না। দ্রুতপায়ে কাব্যর ঘরের দরজায় গিয়ে সশব্দে করাঘাত করতে লাগল। মাঝরাতের অন্য কেউ হলে হয়তো কুণ্ঠাবোধ করত কিন্তু কলরবের মনে সংকোচের লেশমাত্র নেই। সে অস্থির হয়ে কাব্য আর মৌনিতাকে ডাকতে লাগল। খানিক বাদেই মৌনিতা চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে দিল। কলরবকে দেখে অবাক হয়ে শুধাল,
‘কী হয়েছে ভাইয়া? কোনো দরকার?’
মৌনিতার পেছনে কাব্যও এসে দাঁড়িয়েছে। কলরব বলল,
‘নিযানার জ্বর এসেছে। ওষুধ লাগবে।’
কাব্য কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘বলিস কী! জ্বর মেপেছিস? কত উঠেছে?’
‘একশ তিন।’
‘১০৩! একশ তিন? এতটা জ্বর?’
কাব্যর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। মৌনিতা পাশ থেকে আফসোসের সুরে বলল,
‘দুপুরে তো একদম কাকভেজা হয়ে কলেজ থেকে ফিরেছিল। বৃষ্টির পানিতে জ্বর এসেছে মনেহয়। মেয়েটা সারাদিন দানাপানিও কিছু পেটে দেয়নি। আমি ডাকতে গিয়েছিলাম। ও বলল ভালো লাগছে না। শরীর খারাপ থাকলে কি আর কারো কিছু ভালো লাগে? আমার তখনই জোর করে দেখা উচিত ছিল। ইশ!’
কাব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতর গেল ওষুধের সন্ধানে। মৌনিতা আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। কাব্য ঔষধ হাতে ফিরে এসে কলরবকে বলল,
‘আগে ওকে সামান্য কিছু খেতে দিস। তারপর ওষুধ। খালি পেটে দিস না।’
কলরব মাথা নাড়ল কিন্তু তার দ্বিধা কাটল না। সে আমতা আমতা করে নিচু গলায় বলল,
‘জ্বর আসার কি অন্য কোনো কারণ হতে পারে? ও বমিও করছে। আসলে… ওই কাল রাতে আমরা…!’
কাব্যর সাথে কলরবের সম্পর্কটা বন্ধুর মতো সহজ হলেও এই কথাটি বলতে গিয়ে সে প্রচণ্ড সংকোচ বোধ করতে লাগল। কাব্য মুহূর্তকাল চুপ করে রইল। পরমুহূর্তেই সবটা আঁচ করতে পেরে তার চোখমুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। মৌনিতা ঘুমিয়ে পড়েছে কি না একবার দেখে নিয়ে সে নিচু গলায় দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
‘হারামজাদা! তোকে না জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল? একেবারে বাচ্চা একটা মেয়ে। সামান্যতম কাণ্ডজ্ঞান কি তোর নেই? একটু লজ্জাশরম থাকা উচিত ছিল। অবশ্য তোর তো লজ্জা কোনোদিনই ছিল না। নির্লজ্জ কোথাকার! ইচ্ছে করছে তোকে!’
কাব্য নিজের উত্তেজিত মেজাজকে কোনোমতে সংবরণ করল। সে পুনরায় ঘরের ভেতরে গিয়ে অন্য ওষুধ এনে কলরবের হাতে ধরিয়ে দিল। বিরক্তি গলায় বলল,
‘সমস্যা নেই। আপাতত এগুলো খাইয়ে দে। আর ওকে বলিস ওষুধ পাল্টে নিতে। হয়তো ওগুলো ওর শরীরে সহ্য হয়নি। এমনিতে জ্বরের কারণে বমি হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। চিন্তার কিছু নেই। এবার আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ তো! জা*নোয়ার কোথাকার।’
কলরব কটমট করে কাব্যর দিকে তাকালো। বলল,
‘এবার কিন্তু তুই একটু বেশিই বলে ফেলছিস!’
‘গেলি তুই? করলে দোষ নেই অথচ বললে দোষ!’
কলরবের আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই তার মুখের ওপর সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল কাব্য। কলরবও কম গেল না; দরজায় একটা জোরালো লাথি বসিয়ে চলে গেল। কাব্য বিছানায় ফিরতেই মৌনিতা উৎসুক হয়ে শুধাল,
‘আবার কী করেছে ও? ঝগড়া করছিলে নাকি? আর তুমিই বা ওকে জানোয়ার বললে কেন?’
কাব্য কোনোমতে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘বললে বুঝবে না।’
‘কেন বুঝব না?’
কাব্য বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শুলো। ‘আহ্ মৌনিতা! এত কৌতূহলে কাজ নেই তোমার। একদিন সুযোগ বুঝে ভালো করে বুঝিয়ে দেব। আপাতত মেজাজটা আরও বিগড়ে না দিয়ে ঘুমাতে দাও তো!’
নিযানার সামনে ধোঁয়া ওঠা একটা বাটি রেখে দিল কলরব। বাটির ভেতরে নুডলসগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে। কলরব বিছানায় পা তুলে বসতে বসতে অত্যন্ত নির্বিকার গলায় বলল,
‘আপাতত এর চেয়ে বেশি কিছু করতেপারলাম না। কাব্য বলেছে খালি পেটে ওষুধ খাওয়া যাবে না।’
নিযানার মনে হলো এ যেন অনেকটা জুতো মেরে গরু দান করার মতো। কলরবের ওপর তার রাগটা এখন আকাশচুম্বী। যে কিনা ভর দুপুরে তাকে রাস্তার মাঝখানে চরম অপমান করে ফেলে চলে গিয়েছিল। তার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই; একটা স্যরি পর্যন্ত বলেনি। উল্টো সে এমন আচরণ করছে যেন কিছুই ঘটেনি। অসুস্থ শরীরে এই স্ববিরোধী ব্যবহার নিযানার কাছে অসহ্য মনে হলো। সে অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলল,
‘আমি খাব না।’
কলরব খাটে আরও জাঁকিয়ে বসে বাঁকা গলায় বলল,
‘তোর বাপের তো অনেক টাকা। এই যে গভীর রাতে তোর সেবা-যত্ন করছি এর বদলে আমাকে পাঁচশো টাকা দিয়ে দিস। আমার মেহনত তো আর আমি বৃথা যেতে দিতে পারি না! তাই টাকা উসুল করতে হলেও তোকে খেতে হবে। এখন ভদ্র মেয়ের মতো খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর। নয়তো জোর করে গেলাতে বাধ্য হব।’
নিযানার কথা বাড়ানোর মতো মানসিক শক্তি বা ইচ্ছা কোনোটাই অবশিষ্ট নেই। ক্ষুধার অস্তিত্বও সে অস্বীকার করতে পারল না। বাটিটা তুলে নিয়ে এক চামচ মুখে দিতেই কলরব উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কেমন হয়েছে?’
নিযানা তড়িৎ উত্তর দিল, ‘জঘন্য!’
কলরবের ইচ্ছে হলো নিজের কপালে একটা থাপ্পড় মারতে। এই মেয়েটার জন্য কিছু করাই বৃথা। তবুও সে নিজেকে সামলে নিল। নিযানা খাওয়া শেষ করতেই কলরব ছোঁ মেরে বাটিটা কেড়ে নিয়ে নির্দিষ্ট দুরুত্বে রাখল। তারপর ঔষধ গুলো নিযানার হাতে দিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,
‘এই নে, খেয়ে ম রে যা!’
নিযানা হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। কলরব ততক্ষণে আয়েশ করে শুয়ে পড়েছে। রাগান্বিত গলায় উত্তর দিল,
এই অবেলায় পর্ব ২২
‘তুমি যাও! তাও একদম জাহান্নামে!’
কলরব বিরক্ত চোখে একবার ওর দিকে তাকাল। ইচ্ছে করল মেয়েটার গলাটা একবার টিপে দেয় কিন্তু শরীর আর সায় দিচ্ছে না। এত দৌড়ঝাঁপ করে এখন সে বিধ্বস্ত। এই মুহূর্তে নিস্তার আর শান্তিটুকু বড্ড জরুরি। তর্কের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিটুকুও আর নেই তার শরীরে। তাই সে নিজেকে সংবরণ করে চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
