এই অবেলায় পর্ব ২৯
সুমনা সাথী
রাতের অন্ধকার ফিকে হয়ে ক্রমশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে ভোরের উজ্জ্বল আভা। সূর্যের তীব্র রশ্মি ধীরে ধীরে ধরিত্রীকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সেই সাথে প্রতিটি প্রাণী নতুন উদ্যমে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে যার যার দৈনন্দিন কর্মে। নবনী ঘুম থেকে উঠেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। চোখ মেলেই সে পাশে দিব্যকে পায়নি। তবে সেটা নিয়ে সে মোটেও বিচলিত নয়। সে জানে এই সময়টাতে দিব্য নিশ্চিতভাবেই জিমরুমে আছে। এখন নবনীর প্রধান কাজ হলো এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে সেখানে হাজির হওয়া; এটা যেন এখন তাদের জীবনের এক অলিখিত রুটিনে পরিণত হয়েছে। সেই উদ্দেশ্যেই ধীর পায়ে রান্নাঘরে ঢুকতেই নবনী অবাক হয়ে দেখল নিযানা সেখানে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। এত ভোরে মিলুও ওঠে না অথচ নিযানা উঠে পড়েছে। নবনী গিয়ে পাশে দাঁড়াতেই নিযানা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। একটি বড় গামলায় সে ময়দা মাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। সামনে রাখা ফোনের স্ক্রিনে চলছে ইউটিউবের কোনো এক রান্নার ভিডিও। ময়দা মাখতে গিয়ে নিজের কালো টিশার্টের হাতা দুটো সে সাদা করে ফেলেছে; এমনকি কপালে আর অবিন্যস্ত চুলেও লেগেছে সাদা গুঁড়ো। এত চেষ্টার পরেও কাজটা যেন ঠিক আয়ত্তে আনতে পারছে না সে। নিযানার এই অবস্থা দেখে নবনীর মনে এক চিলতে মায়া হলো। আসলেই তো, এই মেয়েটার তো এসব কাজ করার অভ্যাস নেই। কত আদর আর আহ্লাদে বড় হওয়া একটা মেয়ে আজ রান্নাঘরে হিমশিম খাচ্ছে। নবনী কোমল স্বরে বলল,
‘আমাকে দাও। আমি করে দিচ্ছি।’
নিযানা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখেমুখে বিস্ময়। হয়তো নবনী তাকে সাহায্য করবে সেটা সে আশা করেনি। তবুও মৃদু হেসে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
‘ঠিক আছে। আমি করে নিতে পারব।’
নবনী আর তর্কে গেল না। কফির জন্য চুলায় দুধের পাতিল বসিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
‘বললাম তো দাও। আমি শুধু ময়দাটা মেখে দিচ্ছি। বাকিটা তুমিই কোরো। একটু তাড়াতাড়ি করো। আমাকে আবার তোমার ভাইয়ার জন্য কফি নিয়ে যেতে হবে।’
নবনীর আন্তরিকতায় নিযানা আর না করতে পারল না।
নিঃশব্দে গামলাটা নবনীর দিকে এগিয়ে দিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো সামান্য এই টুকু কথাতেই ওর চোখ দুটো অশ্রুতে ভরে উঠল। তুচ্ছ এই ঘটনায় কান্নার কী আছে তা ওর জানা নেই। তবুও বুকের ভেতর থেকে একটা হু হু করা কান্না ঠেলে আসছে। ওর খুব ইচ্ছা করছে কাউকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মনের সবটুকু ভার নামিয়ে দিতে। নবনী শাড়ির আঁচলটা কোমরে ভালো করে গুঁজে নিয়ে দক্ষ হাতে ময়দা মাখতে শুরু করল। কাজ করতে করতেই খুব নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,
‘তুমি মুখ বুজে এসব কেন করছো, নিযানা?’
নিযানা চট করে চোখের পানি মুছে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
‘মানে?’
নবনী বলল, ‘মানে হলো তোমার তো কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তুমি চাইলে অনায়াসেই এসব এড়িয়ে যেতে পারতে। তবুও কেন সব চুপচাপ সহ্য করছো? তোমার মাকে কেন কিছু জানাচ্ছ না?’
নিযানা শান্ত গলায় বলল, ‘মাম্মিকে বললে হয়তো তিনি এখানে এসে অনেক ঝামেলা করবেন, নয়তো আমাকে জোর করে নিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু আমি আর মাম্মির কাছে ফিরে যেতে চাই না।’
নবনীর মনে কৌতূহল দানা বাঁধল। কলরব আর নিযানার অগোছালো সম্পর্কটা তাকে প্রায়ই ভাবিয়ে তোলে কিন্তু কোনোদিন সাহস করে কিছু জিজ্ঞেস করা হয়নি। সে আবারও প্রশ্ন করল,
‘তাহলে তুমি আসলে কী চাও?’
‘আমার আবার চাওয়ার কী থাকতে পারে! তাছাড়া বিয়ের পর সব মেয়েরাই তো এসব করে। তুমিও তো করছো।’
নবনী শুধু মাথা নাড়ল। রান্নাঘরে কিছুক্ষণ কেবল নিরাবতা বিরাজ করলো। নিযানা খানিক বাদে নিজেই আবার নীরবতা ভাঙল,
‘জানো, আমি আর দশটা মানুষের মতো একটা সাধারণ জীবন চাই। আমার জীবনটা কোনোদিনই স্বাভাবিক ছিল না। ছোটবেলা থেকে আমার সবকিছুই মাম্মি নিয়ন্ত্রণ করত। আমি কখন ঘুম থেকে উঠব, কী খাব, কতটুকু খাব, এমনকি কী পোশাক কতক্ষণ পরে থাকব সবই ছিল তার ইচ্ছে। আমি যেন কেবল একটা জীবন্ত পুতুল ছিলাম। আমার কখনোই সেসব ভালো লাগত না। আর নাতো নিজেকে নিয়ে চিন্তা করা লাগতো। এই যে এখন এসব করতে হচ্ছে, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ঠিকই কিন্তু আমি এটা উপভোগ করছি। নিজের মতো করে কিছু একটা করতে পারছি ভেবে আমার অতটাও খারাপ লাগছে না। হয়তো আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যাবে।’
নবনীর হাতের কাজ থেমে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে নিযানার দিকে তাকাল। যে মেয়েটিকে সবাই অহংকারী আর আহ্লাদী ভেবে এসেছে তার ভেতরে যে এত গভীর একটা মুক্তির তৃষ্ণা লুকিয়ে ছিল; তা নবনী আজ প্রথম অনুভব করল। হঠাৎ হাড়ির দুধ উথলে উঠতেই নবনী তড়িঘড়ি করে সামলাতে গেল। কিন্তু সেই অসাবধান মুহূর্তে ফুটন্ত দুধের কিছুটা নিযানার হাতের ওপর ছিটকে পড়ল। সে আনমনা ছিলো। খেয়াল করেনি। তীব্র জ্বালায় নিযানার চোখমুখ কুঁচকে এলেও সে অদ্ভুতভাবে নিথর হয়ে রইল। নবনী আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত ওকে বেসিনের কাছে নিয়ে গেল। কল ছেড়ে দিয়ে বলল,
‘ইশ! কতটা পড়েছে দেখেছ? একটু সাবধানে থাকবে তো!’
আশ্চর্যের বিষয় হলো নিযানা কোনো বাক্য বিনিময় করল না। ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেও তার কণ্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। নবনী অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল; মেয়েটার সবকিছুই কেমন যেন হিসেব করা। এমনকি হাসলেও সে যেন মেপে হাসে। ওর মনের গহীনে ঠিক কী চলছে তা সাধারণ বুদ্ধিতে বোঝা দায়। ঠিক সেই মুহূর্তে রান্নাঘরে প্রবেশ করলো মৌনিতা। নিযানার লাল হয়ে যাওয়া হাত আর নবনীর অস্থিরতা দেখে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। শংকিত গলায় বললেন,
‘আল্লাহ! তোমার হাতে এসব কী হয়েছে?’
নবনী জবাব দিল, ‘অসাবধানে গরম দুধ পড়ে গিয়েছে।’
মৌনিতার মনটা মুহূর্তে ভারী হয়ে উঠল। বাইরে থেকে সে নিজেকে যতটা কঠোর বা নিয়মনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরে ওর ভেতরটা তাঁর আদতে বড্ড নরম। নিযানার এই সামান্য আঘাতটুকু দেখেই ওর মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল। এমনকি সকালের সব রান্নার দায়িত্ব সে নিজে নিয়ে নিলো।
‘তোমাকে কেউ প্রাণে মারতে চাইছে দিব্য। আমরা জানি না তারা কারা। এই অবস্থায় তুমি বাড়ির বাইরে একদম যাবে না, ব্যস! এটাই আমার শেষ কথা।’
নবনী হাতে কফির কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকতেই দিব্য ইশারায় কথা থামাতে বাধ্য করল তার বাবাকে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে; আরশাদ তালুকদারের শেষ কথাগুলো নবনী স্পষ্ট শুনে ফেলেছে। আরশাদ তালুকদার তখনও কঠিন চোখে দিব্যর দিকে চেয়ে রইলেন। নবনী কাঠের মতো দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। এই মুহূর্তে কী বলা উচিত বা কী করা উচিত; তা তার মাথায় খেলছে না। আরশাদ তালুকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিব্যর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
‘দেখো দিব্য, আমি তোমার বাবা। আমি যা বলছি। সেটাই হবে। আমি এক কথা দ্বিতীয়বার বলতে ভালোবাসি না।’
কথাটা বলেই তিনি গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ঘরের পরিবেশ তখন থমথমে। দিব্য নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটের কোণে জোরপূর্বক এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। যেন কিছুই হয়নি। স্বাভাবিক গলায় বলল,
‘নবনী, ওইভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভেতরে এসো।’
নবনী ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে পা রাখল। সে আসতেই দিব্য নিজে থেকেই এগিয়ে গিয়ে কফির কাপটা তার হাত থেকে নিয়ে নিল। তারপর খুব আয়েশ করে কফিতে একটা চুমুক দিয়েই চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল সে। অনেকটা অবাক হওয়ার ভান করে জিজ্ঞেস করল,
‘কফিতে কি আজ চিনি দিয়েছ?’
নবনী স্থির দৃষ্টিতে দিব্যর দিকে তাকিয়ে রইল। সে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। দিব্য এই হালকা কথা দিয়ে মূল বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাইরের এই ভয়াবহ বিপদের কথা এভাবে এড়িয়ে যাওয়াটা নবনীকে মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ করে তুলল। সে কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু মাথা নেড়ে বোঝাল যে সে চিনি দেয়নি। দিব্য আবারও কফির কাপে চুমুক দিয়ে মাথা নাড়ল। তারপর নবনীর খুব কাছে এসে কফির কাপটা ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে মৃদু হেসে বলল,
‘চিনি দাওনি বলছ অথচ আমার কাছে কেন জানি কফিটা বেশ মিষ্টি লাগছে। বিশ্বাস না হলে একটু টেস্ট করে দেখো!’
নবনীর মেজাজ তখন আরও খারাপ হচ্ছে। এই চরম উৎকণ্ঠার মাঝেও লোকটা কীভাবে এত সহজভাবে মজা করছে তা তার বোধগম্য হলো না। সে শুধু স্তব্ধ হয়ে দিব্যর এই অভিনয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। নবনীর মনে হলো সত্যি কি সে ভুল করে চিনি দিয়ে ফেলেছে৷ এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। তবুও কাপটা নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াতেই চোখমুখ কুঁচকে এলো ওর। মোটেও মিষ্টি নয়৷ তিতকুটে স্বাধের এমন জঘন্য কফি কেউ কিভাবে খেতে পারে। আবার বলছে মিষ্টি৷ দিব্য মনে মনে হাসলো নবনীর মুখভঙ্গি দেখে। মুখ স্বাভাবিক রেখে বলল,
‘কী হলো? মিষ্টি নয়?’
‘নাহ!’
‘সিরিয়াসলি?’
দিব্য আবারও কাপটা নিজের হাতে নিয়ে নিল। আরেকবার চুমুক দিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
‘মিষ্টিতে মিষ্টিতে বোধহয় মিষ্টিক্ষয় হয়ে গেছে। এখন ঠিক লাগছে।’
নবনী বড় বড় চোখে দিব্যর দিকে তাকাল। সেই মুহূর্তেই দুজনের চোখাচোখি হলো। দিব্যর গভীর চোখের মণি দুটো যেন হাসছে। নবনী সহ্য করতে পারলো না। সরাসরি বলল,
‘আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন?’
দিব্য খুব নিরীহ মুখ করে মাথা নেড়ে বোঝাল যে সে মোটেও মজা করছে না। কিন্তু নবনী জানে এই লোক নিজে থেকে কোনো সত্য স্বীকার করবে না। আরশাদ তালুকদারের সেই ভয়াবহ কথাগুলো এখনো নবনীর কানে তীরের মতো বিঁধছে। অথচ দিব্যর এমন উদাসীন আচরণ তাকে ক্রমশ আরও ক্ষুব্ধ করে তুলল। সে আর কথা না বাড়িয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই দিব্য এক ঝটকায় নবনীর কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিল। আচমকা এই সান্নিধ্যে নবনী থমকে যেতেই দিব্য তার নিজস্ব কায়দায় ভ্রু নাচাল। নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
‘রাগ করলে?’
নবনী মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘নাতো।’
‘মিথ্যা বলছ কেন?’
‘মিথ্যা বলছি না তো।’
‘তোমার চোখমুখ এমন লাল হয়ে গেছে কেন?’
দিব্যর সরাসরি প্রশ্নে নবনী কিছুটা ঘাবড়ে গেল। তার মনের অস্থিরতা ধরা পড়ে যাচ্ছে। দিব্য নবনীর আরও কাছে এসে আশ্বস্ত করে বলল,
‘শোনো নবনী, টেনশন করার মতো তেমন কিছু ঘটেনি।’
‘আমি তো আপনার কাছে কিছু জানতে চাইনি!’
‘তুমি জানতে না চাইলেও আমি বলছি। পরে উদ্বেগে তুমিই আবার জ্ঞান হারাবে।’
নবনী গরম চোখে চাই। অভিমান আর ক্ষোভের সংমিশ্রণে নাকের পাটা ফুলে উঠেছে তার; থরথর করে কাঁপছে রক্তিম দুই অধর। রাগে-অনুরাগে ফর্সা মুখটা এবার সত্যিই গোধূলির রক্তিম আভা ধারণ করেছে। দিব্য অবশ্য বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। উল্টো অত্যন্ত ভাবলেশহীন কণ্ঠে বলল,
‘দিয়ার মাম্মা তো ভীষণ দুর্বল! কেবল ধপাস ধপাস করে পড়ে যায়। তার উচিত দিয়ার পাপ্পার মতো একটু শক্তিশালী হওয়া।’
কথাটা শোনামাত্র নবনী প্রথমবার দিব্যর বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করে উঠল। রাগের পারদ তখন তুঙ্গে। দিব্য অবাক হলো বটে কিন্তু নবনীকে ছেড়ে দিল না। এক হাতে নবনীর সেই ছিপছিপে ছোটখাটো গড়নটা কব্জা করে রেখেছে সে। আর অন্য হাতে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে আয়েশ করে। নবনী জেদী গলায় বলল,
‘ছাড়ুন আমাকে! দিয়াকে তৈরি করতে হবে। আমার শক্তিশালী হওয়ার কোনো শখ নেই। আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন না?’
দিব্য এবার মৃদু হাসল। মুগ্ধ গলায় বলল, ‘এখন তোমায় কেমন যেন বউ বউ লাগছে!’
রাগ ভেঙে নবনী না চাইতেও হেসে ফেলল। ওই সম্বোধনটা কানে যেতেই এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল তার শরীরে। মুহূর্তেই লজ্জায় মুখটা পুনরায় আপেলের মতো লাল হয়ে উঠল। দিব্যর গলার স্বর এবার একটু গম্ভীর হলো,
‘দেখো নবনী, পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকে না। না তুমি থাকবে, না আমি। তাই কোনো কারণে যদি আমাকে আগে বিদায় নিতে হয়; তবে তাতে কারোরই কিছু করার নেই।’
নবনীর বুকটা ধক করে উঠল। বলল, ‘আমি কিছু জানি না। কিন্তু আপনাকে কেন কেউ আঘাত করতে চাইছে?’
‘সত্যি বলতে আমিও জানি না।’
‘আব্বু আপনাকে ঠিক কী বলছিলেন?’
‘আমাকে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন তিনি।’
‘আপনি শুনবেন না?’
‘নাহ।’
‘বেশ তো! না শুনলে না শুনবেন। আমার তাতে কী।’
দিব্য সরু চোখে নবনীর দিকে তাকিয়ে শুধাল, ‘সত্যিই তোমার কিছু না?’
‘নাহ!’
‘ওকে।’
দিব্য আলগা করে দিল তার হাতের বাঁধন। মুক্ত হতেই নবনী কয়েক কদম সরে দাঁড়িয়ে ধরা গলায় প্রশ্ন করল,
‘নিজের কথা না ভাবুন, দিয়ার কথা তো অন্তত ভাবেন। তাই না?’
দিব্য একটু উদাসীনভাবে হাসল। যেন বিষয়টি খুবই তুচ্ছ। শান্ত গলায় বলল,
‘নবনী, এটা আমার মনের ভুলও হতে পারে। রাস্তাঘাটে চলতে গেলে এমন কত অঘটনই তো ঘটে। তাই বলে কি আমি সারাজীবন ঘরের কোণে বন্দি হয়ে থাকব? আমার গাড়ির আগেও একবার দুর্ঘটনা হয়েছিল আর এবার তো…..!’
বাকি কথাটুকু দিব্যর কণ্ঠেই আটকে গেল। সে লক্ষ্য করল। নবনীর দুচোখ ছলছল করছে। টলমলে সেই অশ্রুভেজা চাহনি দেখে সে থমকে গেল। নবনীর বুকের ভেতর তখন এক তীব্র দাবদাহ জ্বলছে। তার মানে এর আগেও দিব্যর বড় কোনো বিপদ হয়েছিল অথচ সে টেরও পায়নি! কেউ তাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। নবনীর ভীষণ কষ্ট হলো। নিজের অজান্তেই তার আত্মসম্মানে বড় একটা চোট লাগল। মনে হলো দিব্যর জীবনে তার গুরুত্ব কতটাই না নগণ্য! এতই তুচ্ছ যে জীবনের এত বড় একটা ঝুঁকি বা বিপদের কথা তাকে বলা তো দূরে থাক; আভাসটুকুও দেওয়া হয়নি। আজ সে ঘটনাক্রমে শুনে ফেলেছে বলেই হয়তো দিব্যর মুখ থেকে এটুকু বের হলো। লোকটা আর না জানি কত কী গোপন করে রেখেছে তার কাছ থেকে! ভাবতে ভাবতে নবনীর ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। অপমানে আর অভিমানে তার শরীর কাঁপতে শুরু করল। মাথাটা যেন ভনভন করে ঘুরছে। দিব্যকে আর কোনো কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যার সুযোগ না দিয়ে সে এক প্রকার দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দিব্য নিজের জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে রইল। নবনীর এই আকস্মিক প্রস্থানে সে ভীষণ হতভম্ব।
খাবার টেবিল থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। বাড়ির ছোট-বড় মোটামুটি সবাই উপস্থিত। অলেখা টেবিলের খাবারগুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়েও কোনো মন্তব্য করলেন না। আয়োজনের সবটুকু মৌনিতার করা হলেও সে আজ অদ্ভুত এক মৌনব্রত পালন করছে। কাউকে কিছু বুঝতে দিলো না। নীরবতা ভাঙলেন আরশাদ তালুকদার। অত্যন্ত স্বাভাবিক ও গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
‘তা কলরব, আর কতদিন এভাবে বাড়িতে সময় কাটবে তোমার? এবার তো অফিসে মন দেওয়া দরকার। দিব্যর সাথে গিয়ে কাজগুলো বুঝে নাও। শিখতেও তো খানিকটা সময়ের প্রয়োজন।’
কথাটা শোনামাত্র কলরব মুখ তুলে তাকাল। তার হাতের খাবার মাঝপথে থেমে গেল। অবিশ্বাসের স্বরে সে শুধাল,
‘আমি অফিসে যাব?’
আরশাদ তালুকদার নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, ‘তো আর কে যাবে? তুমিই তো বলেছিলে যে বিয়ে দিলেই তুমি অফিসের দায়িত্ব নেবে।’
কলরব ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠলেও নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করল। চোয়াল শক্ত করে শান্ত গলায় বলল,
‘হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম। কিন্তু এখন আমি সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছি। আমি অফিসে যাচ্ছি না। কায়েফ তো যেতে চাচ্ছে। ওকে কেন সব বুঝিয়ে দিচ্ছ না? এসব করপোরেট মারপ্যাঁচ আমার ভালো লাগে না।’
আরশাদ তালুকদারের কণ্ঠ এবার কিছুটা কঠিন হলো। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
‘তাহলে কী ভালো লাগে তোমার? কোন পথে চললে তোমার মন ভরবে?’
‘বললে সহ্য করতে পারবেন না।’
আরশাদ তালুকদারের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তিনি গর্জে উঠলেন,
‘কলরব!’
পুরো টেবিল জুড়ে মুহূর্তেই যেন তুষারপাত হলো। সবার খাওয়া থেমে গেল। দিব্য অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
‘শান্ত হও আব্বু। এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন? আমি ওকে বুঝিয়ে বলব। আর খাওয়ার টেবিলে এসব আলোচনা না তোলাটাই বোধহয় বেটার। কলরব, তুই তো কথা দিয়েছিস যে অফিসে যাবি। তবে এখন এমন করছিস কেন? এখনই তো তোকে সব দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না।’
দিব্যর কথায় কলরব খানিকটা দমে গেল। মাথা নিচু করে অস্ফুট স্বরে বলল,
‘ঠিক আছে, আমি বিষয়টি ভেবে দেখব।’
আরশাদ তালুকদার পালটা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু আফতাব তালুকদার তাকে থামিয়ে দিলেন। কলরবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘দেখো কলরব, এই ছেলেমানুষিগুলো এবার তোমার ছাড়া উচিত। বড় ভাই হিসেবে দিব্য কত কিছু সামলাচ্ছে আর বাবা হিসেবে তোমার আব্বু তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা চিন্তিত সেটা কি একবারও ভেবে দেখেছ? আর একটা কথা পরিষ্কার করে দিই। কায়েফ অফিসে যাবে না। ও অচিরেই বিদেশে ফিরে যাবে।’
বাবার মুখে এমন সিদ্ধান্ত শুনে কায়েফ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। সে কখন যাওয়ার কথা বলল? অবিশ্বাসের সুরে বলল,
‘আমি কখন বললাম যে আমি অফিসে যাব না?’
আফতাব তালুকদার বললেন, ‘তুমি অফিসে যেতে পারবে না। আমি একবার যখন বলেছি। তখন সেটাই শেষ কথা। অহেতুক তর্কে জড়িও না।’
কায়েফ জেদ করে বলল, ‘কেন? কলরব যদি যেতে পারে, তবে আমি কেন পারব না?’
‘কারণ অফিসটা ওর বাবার। সবকিছু ওর বাবার। তোমার বাবার নয়।’
আরশাদ তালুকদার নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ভাইয়ের এমন রূঢ় ও নির্লিপ্ত উক্তিতে তিনি প্রচণ্ড ব্যথিত হলেন। আহত কণ্ঠে শুধালেন,
‘আফতাব! এসব তুই কী ধরনের কথা বলছিস?’
আফতাব তালুকদার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বললেন,
‘কথাটা খারাপভাবে নিও না ভাইয়া। আমি শুধু ওকে জীবনের সত্যটা বোঝাতে চাইছি। কলরব আর কায়েফ কখনোই এক পাল্লায় মাপা যায় না। কোম্পানিটা তোমার, একে আজকের এই উচ্চতায় দাঁড় করিয়েছে দিব্য। কাব্য হাসপাতালের স্বনামধন্য ডাক্তার। তুমি ওকে হাসপাতালের অংশীদার করেছ সেটা ওর নিজস্ব যোগ্যতায়। আমাকেও তুমি কোম্পানির অংশ দিয়েছ ঠিকই কিন্তু আমি নিজেকে তার যোগ্য মনে করি না। আমি বড়জোর একজন অনুগত কর্মচারীর মতোই দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র। কলরব তোমার রক্ত। সেই সূত্রে এই প্রতিষ্ঠান ওরও। কিন্তু কায়েফের ক্ষেত্রে তো বাস্তবতা ভিন্ন। ওকে নিজের সীমাবদ্ধতাটুকু বুঝতে হবে।’
দিব্য বাধা দিয়ে বলল, ‘তুমি এসব কী বলছো চাচ্চু? কায়েফ আর কলরব ওরা দুজনেই তো আমার ভাই। ওদের মাঝে পার্থক্যের দেওয়াল আসছে কোত্থেকে? আর এই প্রতিষ্ঠান কবে থেকে তোমার-আমার আলাদা হয়ে গেল? আমার জন্মের আগে থেকেই তো তুমি আব্বুর পাশে ছিলে।’
আফতাব তালুকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ম্লান হাসলেন।
‘তুই জানিস না দিব্য। আমি অনেকটা কলরবের মতোই ছিলাম। কাজ বা ক্যারিয়ার নিয়ে কোনোকালেই আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল না। ভাইয়া নিজের মেধা আর পরিশ্রমে এই কোম্পানি গড়ে তুলেছেন। যখন দেখলাম আমার আর বিশেষ কিছু করার নেই তখন কেবল ভাইয়ার পাশে থাকার জন্য এখানে যোগ দিয়েছিলাম। এই বিশাল সাফল্যের পেছনে আমার ব্যক্তিগত কোনো অবদান নেই।’
আরশাদ তালুকদার ধমক দিয়ে উঠলেন, ‘খবরদার আফতাব! এই বিষয়ে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করবে না। কায়েফ, কলরব, দিব্য কিংবা কাব্য আমার কাছে কেউ আলাদা নয়। এই ধরনের হীনম্মন্যতা আর কখনো মনে স্থান দিবি না। কায়েফ অফিসে যাবে এবং অবশ্যই যাবে। এই প্রসঙ্গের এখানেই ইতি।’
আরশাদ তালুকদারের কথার রেশ কাটতে না কাটতেই কায়েফ উঠে দাঁড়াল। তার পেছন পেছন কলরবও নিঃশব্দে টেবিল ত্যাগ করল। কোনো বাক্যব্যয় না করেই দুজনে বাইরের দিকে পা বাড়াল। নিযানা বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল কলরব তার বাইকে বসে আছে। আশপাশে চোখ বুলিয়ে কায়েফকে আর কোথাও দেখা গেল না। কলরব বাইকের ওপর রাখা হেলমেটটা মাথায় চড়াতে চড়াতে বলল,
‘যাকে খুঁজছেন, তিনি অনেক আগেই প্রস্থান করেছেন। অবশিষ্ট বলতে কেবল এই অধমই আছে। যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে উঠতে পারেন। নয়তো সুবর্ণ সুযোগটি হাতছাড়া হবে।’
নিযানা ঠোঁট টিপে একটু হাসল। ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে বলল,
‘যেতে পারি, তবে একটা শর্ত মানতে হবে।’
‘পারব না। পথ ওইদিকে।’
কলরবের জবাবটি ছিল একদম সোজাসাপ্টা। নিযানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু স্বরে বলল,
‘আগে শুনে তো নিতে আমি কী বলতে চাই!’
‘প্রয়োজন মনে করছি না। তোকে যে সাথে নিয়ে যাচ্ছি; এটাই কি যথেষ্ট নয়? যা করার জলদি কর। আমার হাতে সময় খুব কম।’
নিযানা আর কথা বাড়াল না। এই বদমেজাজি ছেলের সাথে তর্কে জেতা অসম্ভব বুঝে সে চুপচাপ বাইকের পেছনে উঠে বসল। সে যা আশঙ্কা করেছিল ঠিক তা-ই হলো। নিযানা বলতে চেয়েছিল যেন বাইকের গতি একটু নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় কিন্তু সেই সুযোগ কোথায়! কলরব বোধহয় গতিসীমার সর্বোচ্চ মাত্রায় বাইক ছোটানো শুরু করেছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর তীব্র গতির ঝাপটায় নিযানা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। প্রাণভয়ে সে শক্ত করে কলরবকে জাপটে ধরে চোখ বুজে রইল। মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগল।
তালুকদার বাড়ির ঠিক পাশেই চৌধুরীদের সুদৃশ্য বাসভবন। তাদের ঘরেও ইভানের সমবয়সী ছোট এক শিশু আছে। নাম তার নীরব। বিকেলে সময় পেলেই ওরা একসাথে খেলা করে। আজ বিকেলেও ইহান আর ইভান ছোট্ট দিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল চৌধুরীদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়ির কোল ঘেঁষেই সবুজ ঘাসে ঢাকা ছোট্ট এক চিলতে মাঠ; আজ সেখানে ক্রিকেট খেলা হবে এমনটাই পরিকল্পনা। মাঝখানে খুদে দিয়া আর তার দুপাশে দুই হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে ইহান আর ইভান। বাইরে বেরোলে এই দায়িত্বটুকু তাদের কাউকে শিখিয়ে দিতে হয় না। ঠিক সেই মুহূর্তে পঁচিশ-ত্রিশ বছর বয়সী এক আগন্তুক দূর থেকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল শিশু তিনটিকে। একসময় সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে ওদের পথ আগলে দাঁড়াল। ইভান খানিকটা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল লোকটার দিকে। আগন্তুক এক চিলতে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে বলল,
‘তোমরা দুজন তো দেখতে একদম একরকম! বেশ মজার ব্যাপার তো। তোমাদের নাম কী শুনি?’
ইহান চটপটে গলায় উত্তর দিল, ‘আমি ইহান, আর ও আমার ভাই ইভান। আমরা জমজ। তাই তো সেম সেম দেখতে। তাই না ইভান?’
ইভান কোনো উত্তর দিল না। সে একই রকম সন্দেহী দৃষ্টিতে লোকটার দিকে চেয়ে রইল। লোকটা এবার দিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে আবারও প্রশ্ন করল,
‘আর এই পুচকে মামণিটা কে?’
ইভান গম্ভীর গলায় জবাব দিল, ‘শি ইজ মাই লিটল সিস্টার।’
ইহান যোগ করল, ‘ওর নাম দিয়া। মামণি নয়।’
লোকটা মাথা নেড়ে হাসল। চোখেমুখে কৃত্রিম কৌতূহল ফুটিয়ে বলল,
‘তা তোমরা যাচ্ছ কোথায়?’
দিয়া বড় বড় চোখ মেলে বলল, ‘আপনি কে? আপনি কি কিছুই জানেন না? দিয়া তো খেলতে যাচ্ছে।’
ইভান স্পষ্ট গলায় বলল, ‘আঙ্কেল, আপনার যদি কোনো প্রয়োজন না থাকে। তবে আমরা কি যেতে পারি?’
লোকটা এবার অত্যন্ত আদুরে ভঙ্গিতে দিয়ার কোমল গালে হাত ছোঁয়াতে গেল। কিন্তু তার আঙুল দিয়াকে স্পর্শ করার আগেই ইহান লোকটার হাতটা ধরে ফেলল। কঠিন গলায় বলে উঠল,
‘ডোন্ট টাচ হার! ও ব্যথা পাবে।’
আগন্তুক লোকটা আবারও অমায়িক এক হাসি দিল। মোলায়েম সুরে বলল,
‘আরে, আমি তো কেবল আদর করছিলাম। তোমরা তো দেখছি ভীষণ মিষ্টি আর বুদ্ধিমান বাচ্চা! চলো, তোমাদের পছন্দমতো চকোলেট কিনে দিই। তোমাদের কার কোন চকোলেট প্রিয়? বলো তো আমাকে?’
ইহান চটপটে স্বভাবের। লোভনীয় প্রস্তাব শুনে সে এক মুহূর্ত না ভেবেই বলে উঠল,
‘কিট ক্যাট!’
ইভান তক্ষুনি বিরক্ত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল। লোকটার উপস্থিতি তার ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করছে। মৌনিতা ওদের আগে থেকেই সতর্ক করে দিয়েছিল। অচেনা মানুষ চকোলেটের প্রলোভন দেখালে যেন তারা সাবধান থাকে। লোকটার চাহনি আর কথা বলার ভঙ্গি ইভানের কাছে একদমই স্বাভাবিক ঠেকছে না। ইহান কেন যে এত বোকা! ইভান লোকটার দিকে সরাসরি তাকিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
‘আমাদের কোনো চকোলেটের প্রয়োজন নেই। আমরা খেলতে যাচ্ছি। আমাদের যেতে দিন।’
লোকটা তবুও পথ ছাড়ল না। সে আরও কিছু একটা বলার তোড়জোড় করছিল কিন্তু ইভান লক্ষ করল অদূরেই কায়েফের অবয়ব। সে কোনো দ্বিধা না করে গলার সবটুকু জোর দিয়ে ডেকে উঠল,
‘চাচ্চু! এদিকে এসো!’
ইভানের অতর্কিত ডাক শুনে লোকটা কিছুটা ঘাবড়ে গেল। সে আড়চোখে একবার পেছনটা দেখে নিল। কায়েফ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে ওদের পর্যবেক্ষণ করছিল। সে ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই ইহান হুট করে লোকটার হাত আঁকড়ে ধরল। উৎসুক গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘কোথায় যাচ্ছেন আঙ্কেল?’
লোকটা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ইহানকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। অপ্রস্তুত শিশুটা ছিটকে পড়ল দূরে। কায়েফ ততক্ষণে বিপদের আঁচ পেয়েছে। সে কালক্ষেপণ না করে ঝড়ের বেগে ছুটে এল। এদিকে ইহান মাটি থেকে উঠে এসে আবারও লোকটাকে জাপটে ধরল। কে জানে খুদে এই হৃদয়ে তখন কী সাহসের সঞ্চার হয়েছিল! সে কিছুতেই লোকটাকে পালাবার পথ দেবে না। সে ছোট ছোট হাত দিয়ে লোকটার পা জড়িয়ে ধরে পড়ে রইল। ইভান ততক্ষণে দিয়াকে আগলে নিয়ে নিজের পেছনে আড়াল করে দাঁড়িয়েছে। কায়েফ এসে চোখের পলকে লোকটাকে ধরে ফেলল। পরে কেবল সন্দেহের বশে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হলে উন্মোচিত হলো এক ভয়াবহ সত্য। ভদ্রবেশধারী এই লোকটা আসলেই একজন কিডন্যাপার।
বিকেলের শেষ আলোটুকু যখন ফিকে হয়ে এল; উত্তরের আকাশে তখন জমেছে স্লেট রঙের নিবিড় মেঘের ঘটা। প্রকৃতি যেন এক গভীর মৌনতায় স্থির হয়ে আছে। তার বুক চিরে বইছে এলোমেলো শীতল হাওয়া। ঝড়ের পূর্বাভাস নিয়ে আসা সেই বাতাসের ঝাপটায় চারদিকের গাছপালাগুলো মাথা নোয়াচ্ছে। বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা সেই গুমোট আবহাওয়ায় চারপাশটা এক রহস্যময় স্নিগ্ধতায় ছেয়ে গেল। কায়েফ বিশেষ এক প্রয়োজনে ছাদে এসেছিল কিন্তু সীমানাপ্রাচীরের কাছে যেতেই তার পা জোড়া যেন মাটির সাথে গেঁথে গেল। ছাদের একদম শেষ প্রান্তে, কার্নিশ ঘেঁষে কেউ একজন পা ঝুলিয়ে বসে আছে। ঝাপসা আলোয় কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল চিনতে। ওটা নিযানা। কায়েফ অবাক হলো; এমন বৈরী আবহাওয়ার মাঝে মেয়েটা ওভাবে একা বসে আছে কেন? চারদিকের এই উত্তাল পরিবর্তনের কি বিন্দুমাত্র আভাস তার কাছে নেই? ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কায়েফ ফিরে যেতে পারল না। এক অদৃশ্য মায়ার টানে সে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে নিযানার ঠিক পেছনে দাঁড়াল। ডাকতে গিয়েও একরাশ সংকোচ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরল। কেন জানি নিযানার সান্নিধ্যে এলেই তার হৃতস্পন্দন অবাধ্য হয়ে ওঠে। নিজেকে কোনোমতে সংযত করে সে খুব মোলায়েম স্বরে ডাকল,
‘নিযানা, এখানে এভাবে বসে আছিস কেন?’
ডাকটা শোনামাত্রই নিযানা হুট করে ডুকরে কেঁদে উঠল। কায়েফ থমকে গেল; মেয়েটা কাঁদছে! কিন্তু কেন? সকালেও তো স্বাভাবিক ছিলো। নিযানা মুখ তুলে তাকানোর সাহস পেল না বরং নতমুখে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল। কায়েফ কিছুটা দ্বিধা নিয়ে ওর পাশে বসল। নিযানার মতোই শূন্যে পা ঝুলিয়ে। নিযানা তার মাথাটা আরও নুইয়ে ফেলল। অকালবৃষ্টির মতো ঝরতে থাকা চোখের পানিটুকু সে আড়াল করতে চাইছে। প্রচণ্ড বাতাসের দোলায় নিযানার অবিন্যস্ত কেশরাশি মুক্ত হয়ে উড়ছে; রেশমি চুলের সেই অবাধ্য গুচ্ছ বারবার এসে কায়েফের মুখে আঘাত করছে। কায়েফ চুলগুলো সরাল না বরং সেই চঞ্চল স্পর্শটুকু অনুভব করে খুব শান্ত গলায় শুধাল,
‘কী হয়েছে বলবি তো? আমাকে বলতে এত দ্বিধা কিসের? এভাবে এখানে বসে কাঁদছিস কেন?’
নিযানা ধরা গলায় অস্ফুটে উত্তর দিল, ‘সেদিন কলেজে একটা পরীক্ষা হয়েছিল। আমি… আমি একশতে মাত্র বায়ান্ন পেয়েছি।’
কায়েফ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে৷ কিন্তু নিযানার বিষণ্ণ মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে সে হাসি চেপে নিল পরম যত্নে। শান্ত গলায় সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
‘আচ্ছা, না হয় এবার নম্বর একটু কম এসেছে। পরের বার ঠিকঠাক পরীক্ষা দিস। তাছাড়া এটা তো কেবল সামান্য একটা ক্লাস টেস্ট।’
নিযানা যেন কথাটার মাঝে কোনো সান্ত্বনা খুঁজে পেল না। কম্পিত গলায় বলল,
‘আমি কোনোদিন পরীক্ষায় আশির নিচে পাইনি কায়েফ। এমনকি ছোটখাটো ক্লাস টেস্টেও না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি পড়াশোনা থেকে অনেক দূরে ছিটকে যাচ্ছি। আমার কোচিং বন্ধ হয়ে গেছে। পড়াশোনাও প্রায় লাটে উঠতে বসেছে। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না। মাম্মি কেন আমার সাথে এমনটা করল? কেন আমায় একটু সময় দিল না? আমি…!’
বাক্যটা আর শেষ হলো না। কান্নার তীব্র বেগ আবারও তার ঠোঁট কাঁপিয়ে ডুকরে উঠল। কায়েফ অপলক নজরে নিযানার আরক্ত মুখের দিকে চেয়ে রইল। বাতাসের ঝাপটায় চোখ মেলা দায়। তবু তার দৃষ্টি নিযানার বিষণ্ণতায় নিবদ্ধ। কী বলা উচিত বা কীভাবে এই ব্যাকুলতা থামানো যায় তা তার জানা নেই। সে শুধু জানে, এই কান্নার শব্দ তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অবচেতন মনেই সে নিযানার মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঝুমঝুম শব্দে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। নিযানা তখনো কাঁদছে; সেই নোনা জল বৃষ্টির ধারার সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কায়েফ নিযানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
‘চুপ করে যা না। আচ্ছা, এরপর থেকে মন দিয়ে পড়িস। পড়া নিয়ে যখনই কোনো সমস্যায় পড়বি, আমায় বলিস; আমি তোকে সব বুঝিয়ে দেব। আমি তো এখন বাড়িতেই আছি।’
কলরব ছাদে এসেছিল নিযানাকেই খুঁজতে। আনতাসা বারবার কল করছে। পুরো বাড়িতে কোথাও তাকে না পেয়ে কলরব ভেবেছিল নিযানা বোধহয় এখানেই থাকবে। কিন্তু তার পা আর সামনে এগোল না। বৃষ্টির ঝাপটায় ঝাপসা সেই দৃশ্যপটে নিযানা আর কায়েফকে ওভাবে পাশাপাশি দেখে সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর কোনো বাক্যব্যয় না করেই সে নিঃশব্দে ফিরে গেল।
তখনকার সেই মুহূর্তের পর পুরোটা দিন নবনী আর দিব্যর সামনে আসেনি। সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলো। দিব্য তা স্বচ্ছ করার ফুরসত পাইনি। অফিস থেকে ফিরে দিব্য সারা বাড়ি খুঁজে বেড়াল। রান্নাঘর থেকে শুরু করে বসার ঘর, কোথাও নবনী নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলোদিয়াও নিরুদ্দেশ।কায়েফের কাছ থেকে অপহরণকারীর ঘটনা শোনার পর থেকেই দিব্যর বুকের ভেতরে তোলপাড় চলছিলো। সে তড়িঘড়ি করে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছে।এমনকি ফেরার পথে থানায় গিয়েও খোঁজখবর নিয়েও এসেছে। অস্থিরতা বাড়তে থাকায় উপায় না পেয়ে সে অলেখাকে খুঁজতে শুরু করল। বসার ঘরেই তাঁকে পাওয়া গেল। দিব্য দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘আম্মু, দিয়া আর নবনী কোথায়? আমি সারা বাড়ি খুঁজেও তো ওদের কোথাও দেখছি না।’
ছেলের অস্থিরতা দেখে অলেখাও বেশ অবাক হলেন। তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন,
এই অবেলায় পর্ব ২৮
‘কোথাও দেখছিস না মানে কী? ওরা আর যাবেই বা কোথায়?’
মিলু আপন মনে টিভি দেখছিল। সন্ধ্যা হলেই সে স্টার জলসার মোহময় জগতে ডুব দেয়; সিরিয়াল দেখা তার প্রাত্যহিক নেশার মতো। সে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
‘বড় ভাবিকে তো কিছুক্ষণ আগেই দেখলাম দিয়া মামণিকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে। গাড়িতে করে কোথাও একটা গেল।’
অলেখা চমকে উঠে বললেন, ‘গাড়িতে করে! কিন্তু কোথায় গেল?’
মিলু পুনরায় টিভির পর্দায় মন দিয়ে বলল, ‘তা তো আমি জানি না। ওভাবে হুট করে বেরিয়ে গেল যে জিজ্ঞেস করার সুযোগটাই পেলাম না।’
