Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ২৮

এই অবেলায় পর্ব ২৮

এই অবেলায় পর্ব ২৮
সুমনা সাথী

রাতটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা। কালবৈশাখীর উন্মত্ততায় আকাশ ভেঙে নামছে মুষলধারে বৃষ্টি; বাতাসের শনশন শব্দে মুখরিত চারিদিক। এমন শীতল রাতে নরম কম্বলের ওমে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে থাকার আনন্দই আলাদা। কিন্তু সেই গভীর প্রশান্তির ঘুমে বাধা পড়ল ছোট্ট দিয়ার।নবনী খুব সন্তর্পণে দিয়াকে জাগিয়ে তুলল। নিবিড় ঘুমের এমন আকস্মিক ব্যাঘাতে ছোট্ট বাচ্চাটার কপালে বিরক্তির রেখা ফুটে উঠল। চোখ দুটো না খুলেই অভিমানে মুখটা একটু কুঁচকে নিল সে। নবনী কোমল স্বরে ডাকল,

​’দিয়া, সোনা মাম্মা! একটু চোখ খোলো তো। তোমার মাম্মা আর পাপ্পা তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই।’
​দিয়া আধোঘুমে কথাগুলো শুনতে পেল। ছোট ছোট দুটি হাতে চোখ কচলে নিয়ে সে পিটপিট করে তাকানোর চেষ্টা করল। মেয়ের এমন কান্ড দেখে দিব্যর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল; নবনীও হেসে ফেলল। ​ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার ওপাশ থেকে একদল মানুষের আনাগোনা উপলব্ধি করা গেল। ইহান, ইভান, কাব্য, মৌনিতা, কুহু, কায়েফ, নিযানা আর কলরব। সবাই ঘরে ঢুকে পড়ল। নবনী কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হকচকিয়ে গেলেও দিব্য কিন্তু মোটেও অবাক হয়নি। সে জানত এরা ঠিক সময়েই হাজির হবে। তাই তো দরজাটা খোলাই রেখেছিল। ​দেয়াল ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটার ঘর স্পর্শ করেছে। সমস্বরে ঘর কাঁপিয়ে উঠল একটা বাক্য৷ শুভ জন্মদিন! হ্যাপি বার্থডে দিয়া সোনা!মুহূর্তেই দিয়ার সব ঘুম উবে গেল। বিছানায় উঠে দাঁড়িয়ে সে বিস্ময়ভরা চোখে সবার দিকে তাকাতে লাগল। কয়েকটা বেলুন ফাটার ‘ঠাস ঠাস’ শব্দে ঘরটা মুখরিত হলো। দিয়ার গায়ে ঝরে পড়ল রঙিন কাগজের বৃষ্টি। কোমরে দুহাত বেঁধে কিছুক্ষণ সবার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকার পর হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে গেল আজকের কথা। খুশিতে ডগমগ হয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল সে। হাততালি দিয়ে বলে উঠল,

​’ইট’স মাই বার্থডে! ওয়াও!’
​মেয়েটার চোখেমুখে আনন্দ উফছে পড়ছে। দিব্য একটি কেক সামনে নিয়ে এসে বসল। চুমু বসালো দিয়ার ললাটে৷ অতঃপর বলল,
​’শুভ জন্মদিন। মাই প্রিন্সেস। এই নাও তোমার পছন্দের কেক। এবার জলদি কেটে ফেলো তো!’
​দিয়া খুশিতে মাথা দুলিয়ে তড়িৎগতিতে কেক কাটল। প্রথম টুকরোটা দিব্য ওকে খাইয়ে দিল। তারপর দিয়াও দিব্য আর নবনী-কে কেক খাইয়ে দিল। হাসি-গল্প আর খুনসুটিতে বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল। সেই আমেজ কিছুটা থিতিয়ে এলে মৌনিতা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
​’ইহান, ইভান অনেক রাত হয়েছে। এবার চলো ঘুমাতে হবে। কাল বাড়িতে বড় অনুষ্ঠান, মনে নেই?’
ইভান মাথা দোলালো। ইহান বলল, ‘গুড নাইট দিয়া। এগেইন হ্যাপি বার্থডে।’
দিয়া মিষ্টি করে হাসল। কায়েফ যাওয়ার আগে ওকে আদর করে গেল। কলরব এগিয়ে এসে দিয়াকে পাজাখোলা করে কোলে তুলে নিল। ওর তুলতুলে গালে একটা শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,
​’বার্বিডল, হ্যাপি বার্থডে! তুমি তো দিনদিন একদম টেডিবিয়ার হয়ে যাচ্ছো। বলো তো কাল তোমার কী উপহার চাই? তোমার এই চাচ্চু সব নিয়ে আসবে।’

​কলরবের আদুরে কথাগুলো শুনে দিয়ার মুখের হাসি হঠাৎ মিলিয়ে গেল। ছোট্ট মুখটা বেশ গম্ভীর করে ফেলল সে। কলরব কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘কী হলো সোনা? মন খারাপ করলে কেন?’
​দিয়া হাত-পা ছুড়ে কোল থেকে নামার চেষ্টা করে বলল,
‘চাচ্চু, আমি তোমার কাছে থাকব না। নামাও আমাকে! তুমি কিচ্ছু জানো না। খালি পঁচা কথা বলো।’
​কলরব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে বুঝতেই পারল না ঠিক কোথায় তার ভুল হয়েছে। নিযানা দিয়াকে নিজের কোলে টেনে নিল। দিয়ার ফোলা ফোলা নরম গাল দুটোয় পরপর কয়েকটা চুমু বসিয়ে হেসে কলরবের দিকে তাকাল। টিপ্পনী কেটে বলল,

​’আসলেই নির্বোধ।’
​কলরব বেশ বিরক্তি নিয়ে কটমট করে নিয়ানার দিকে তাকাল। দিব্য হেসে বলল,
‘নিযানা তো ঠিকই বলেছে। তুই দিয়াকে টেডিবিয়ার বলতে গেলি কেন? টেডিবিয়ার তো গোলগাল আর মোটা হয়। আর আমাদের দিয়া এখন প্রতিদিন নিয়ম করে ব্যায়াম করছে। তোর ওকে কোন দিক দিয়ে ফ্যাট মনে হলো বল তো?’
​দিয়া সম্মতিসূচক মাথা দোলালো। নিজের কপালে হাত দিয়ে আক্ষেপের সুরে বলল,
‘সেটাই তো পাপ্পা! চাচ্চু তুমি খুব বোকা। দিয়া রোজ ব্যাম করছে। তাও তুমি তাকে ফ্যাট বলছো?’
​কলরব আসল রহস্য বুঝতে পেরে জিভ কাটল। মাথা নেড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
‘আচ্ছা, এই ব্যাপার! আরে বাবা, রসগোল্লা আমার। টেডিবিয়ার তো খুব কিউট হয় তাই বলেছি। আর আমি তো তোমাকে বার্বিডল-ও বলি। এইটুকু জন্য চাচ্চুর ওপর রাগ করতে হয়? আর হবে না। স্যরি!’
​দিব্য হেসে কলরবের পিঠে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, অনেক হয়েছে। এবার বের হ তো সবাই। জলদি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।’

হাসপাতালে আসার একদমই ইচ্ছা ছিল না কলরবের। অনেকটা বাধ্য হয়েই আসতে হলো। সেদিন বিয়ের আসর থেকে ইরা যার জন্য পালিয়েছিল। সেই লোকটা শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রহণ করেনি। কলরবের সাথে ইরার একটা সময় প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এই কথাটা লোকটা কোনোভাবে জেনে ফেলেছিল আর এটাই কাল হয়ে দাঁড়াল। আশ্রয়হীন ইরা দিশেহারা হয়ে আ ত্ম হত্যার চেষ্টা করে। প্রথমবার বেঁচে ফিরলেও দ্বিতীয়বার বিষ খেয়ে এখন সে হাসপাতালের বিছানায়। ​ইরা খুব করে চাইছিল একবার কলরবের সাথে কথা বলতে। বন্ধুদের জোরাজুরি আর ইরার বাবার করুণ মুখটা দেখে কলরব শেষমেশ এলো ঠিকই কিন্তু আসার পর থেকে ইরা কেমন জানি পাথর হয়ে আছে। একটা কথাও বলছে না। কলরবের মনে মনে বেশ বিরক্তি লাগছে। বাড়িতে অনুষ্ঠানের কাজ ফেলে এভাবে বসে থাকাটা তার জন্য যন্ত্রণার। শান্ত গলায় বলল,
​’তোমার কিছু বলার থাকলে বলে ফেলো। নয়তো আমি কিন্তু এবার উঠব।’
​ইরা মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো একদম ম রা মানুষের মতো ফ্যাকাশে। কলরবের সাথে আসা শান্ত আর অভিক তখন ওখানেই দাঁড়িয়ে। পাশে ইরার বাবাও বসা। ইরা তাদের দিকে তাকিয়ে খুব কষ্ট করে একটু হাসল। হাসিটা নীর্জিব। এরপর নিচু স্বরে বলল,

​’তোমরা সবাই কি একটু বাইরে যাবে? আমি কলরবের সাথে একা কথা বলতে চাই।’
কলরব স্পষ্ট গলায় আবারও বলল, ‘আমি কোনো কথা বলতে চাই না। বললাম তো আমাকে এখনই যেতে হবে।’
কলরবের এই আপত্তিতে কেউ তেমন কান দিল না। ইরার বাবা কলরবের দিকে এমন এক করুণ দৃষ্টিতে তাকালেন যে কলরব চাইলেও আর কঠোর হতে পারল না। অভিক আর শান্তকে সাথে নিয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কলরব পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইল। এক অজানা অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরছে। হঠাৎ ইরা খুব আলতো করে কলরবের হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল। স্পর্শটা পেয়ে কলরব যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল। চকিতে তাকাতেই দেখল ইরা তাকিয়ে হাসছে। এক বিষণ্ণ হাসি। কলরবের কেন যেন আজ ওই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করল না। সে হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল কিন্তু ইরা এবার শক্ত করে ধরল। ভাঙা গলায় বলল,
‘এতটা রাগ কলরব? তিনটে দিন ধরে বলছি একবার আসার জন্য অথচ তুমি সামান্য দেখা করতেও চাইছিলে না? এতটা অভিমান করে আছো?’

কলরব মুখ তুলে তাকাল। ‘এটা অভিমান নয় ইরা, ঘৃণা।’
কথাটা শুনে ইরার ছলছল চোখ দুটো থমকে গেল। সে মনে মনে জানে এই মানুষটাকে সে কতটা ঠকিয়েছে। কলরব সবসময় তাদের সম্পর্কে সম্মান বজায় রেখেছিল। ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিল। অথচ আজ সেই মানুষটাই তাকে ঘৃণা করে। ভেবেই ইরার গাল গড়িয়ে টপ করে এক ফোঁটা জল পড়ল। সে কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি… তুমি আমাকে ঘৃণা করো?’
‘কেন, তুমি কি আশা করো? আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসব?’
ইরা মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি ভুল করেছি কলরব!’
‘না ইরা, তুমি অন্যায় করেছ! একজনকে মনে রেখে অন্য একজনের মন নিয়ে খেলেছ। এটা ভুল নয়, এটা অপরাধ।’
ইরা ডুকরে কেঁদে উঠল, ‘তুমি আমাকে ক্ষমা না করলে আমি মরেও শান্তি পাব না।’
‘তুমি মরলেও আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারব না।’
কথাটা যেন তীরের মতো ইরার বুকে বিঁধল। সে কলরবের হাতটা টেনে নিয়ে নিজের গালের ওপর রাখল। কলরব হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল না। কেবল এক জীবন্ত মূর্তির মতো বসে রইল। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। নীরবতা ভেঙে ইরা হঠাৎ বলে উঠল,

‘কলরব, আমি জানি তুমি আমাকে এখনো ভালোবাসো। না হলে তুমি এখানে আসতে না। দেখো, যা হয়েছে তার জন্য আমি সত্যিই লজ্জিত। আমরা কি আবারও নতুন করে শুরু করতে পারিনা। চলো আমরা সব নতুন করে শুরু করি। আমাকে বিয়ে করবে? সেদিন তুমি আমায় জিজ্ঞেস করেছিলে। আজ আমি তোমাকে করছি।’
কলরব হতভম্ব হয়ে ইরার দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত পর ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠে বলল,
‘তাহলে আমার বউয়ের কী হবে? সতিন নিয়ে সংসার করতে তোমার খুব একটা অসুবিধা হবে না তো?’
ইরা পাথরের মতো জমে গেল। কেউ তাকে বলেনি যে কলরব বিয়ে করে ফেলেছে। তার চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছায়া। আহত গলায় সে জানতে চাইল,
‘তুমি… তুমি বিয়ে করে নিয়েছ?’
কলরব ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘তুমি কী ভেবেছিলে? আমি সারাজীবন তোমার বিরহে পথ চেয়ে বসে থাকব? আর তুমি অন্য একজনকে নিয়ে সুখে দিন কাটাবে?’
ইরার সব কথা যেন হারিয়ে গেল। চারপাশটা তার কাছে ভীষণ এলোমেলো ঠেকছে। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,

‘কনগ্রাচুলেশন! আমি ভাবিনি তুমি এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে যাবে। মুভ অন করবে। এই জন্যই কি তুমি আসতে চাইছিলে না?’
কলরব কোনো উত্তর দিল না। বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। ইরার মুঠোর ভেতর থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। ইরা বিষণ্ণ গলায় বলল,
‘তোমাকে ঠকানোর শাস্তিই বোধহয় পাচ্ছি, তাই না?’
‘হতে পারে। আসছি।’
কথাটা বলে কলরব আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না।

সময়টা সন্ধ্যা। তালুকদার বাড়ির অন্দরমহল জুড়ে উৎসবের গুঞ্জন। অতিথিরা আসতে শুরু করেছেন। নবনী দিয়াকে একটি কালো বার্বি গাউনে সাজিয়ে দিয়েছে। মাথার দুপাশে দুটো ঝুঁটি করা মেয়েটিকে অপার্থিব মিষ্টি লাগছে। আজকের অনুষ্ঠানের থিম সাদা-কালো। তাই কমবেশি সবাই এই দুই রঙের পোশাকেই সেজেছে। দিয়াকে তৈরি করে দিয়ে নবনী তড়িঘড়ি করে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিল। হাতে সময় খুব কম। তাই চটজলদি পরনের শাড়িটা বদলে আলমারি থেকে একটা কালো রঙা শাড়ি বের করে পরতে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তে হুট করে দরজা খুলে ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল দিব্য। নবনীর হাতের ভাঁজে তখন শাড়ির অবিন্যস্ত কুঁচিগুলো ধরা। গায়ে কোনোমতে জড়ানো শাড়িটা তার ফর্সা পিঠ আর সুগঠিত উদরকে পুরোপুরি ঢাকতে পারেনি। এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় নবনীকে দেখে দিব্য যেন মুহূর্তেই পাথর হয়ে গেল। তার স্থির দৃষ্টি নবনীর ওপর আটকে রইল। চোখ ফেরানো দায়। দিব্যকে এভাবে অসময়ে ঘরে ঢুকতে দেখে নবনী এতটাই ঘাবড়ে গেল যে হাতের মুঠো শিথিল হয়ে শাড়ির কুঁচিগুলো ঝপঝপ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। নবনী একবারও ভাবেনি যে দিব্য এখন ওপরে আসবে। সে ভেবেছিল দিব্য নিচে অতিথিদের নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। আর সেই সুযোগে সে শাড়িটা পরে নেবে। মুহূর্তের স্তব্ধতা কাটিয়ে দিব্য যেন নিজের হুঁশ ফিরে পেল। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল। নবনীর হৃৎপিণ্ডটা ছুটছে তড়িৎ বেগে। কাঁপছে অনবরত। এতটা জোরে যে মনে হচ্ছে সেই শব্দ সে নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে। লজ্জা আর আড়ষ্টতায় তার সারা শরীর যেন জমে গিয়েছে। পরিণত হয়েছে পাথরে। নড়ার শক্তিটুকুও পাচ্ছে না। নবনী ভেবেছিল দিব্য হয়তো এভাবেই ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে দিব্য বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এল। নবনীর মনেহলো এখনি যদি মেঝেটা দুভাগ হয়ে যেত। সে টুপ করে ঢুকে পড়তো। নবনীর ঠিক সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল দিব্য। মেঝে থেকে শাড়ির কুঁচিগুলো তুলে নিয়ে নবনীর দিকে বাড়িয়ে ধরল। নবনী লজ্জায় আর সংকোচে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। নিজেকে সামলে নিয়ে কোনোমতে হাত বাড়িয়ে কাপড়টা ধরতে গেল সে। হাতটা থরথর করে কাঁপছে। দিব্য খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

‘কী হলো, ধরো!’
নবনী যচমকে উঠে কাপড়টা ধরল। লজ্জায় তার শুভ্র মুখটা তখন লাল হয়ে উঠেছে। দিব্য খানিকটা ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে চেয়ে বলল,
‘এত সময় লাগে তোমার? নিচে তোমার বাড়ির লোকজন চলে এসেছে। সবাই তোমার খোঁজ করছে। জলদি করো।’
নবনী দ্রুত মাথা নেড়ে সায় দিল। কোনোমতে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
‘পাঁচ মিনিট সময় দিন। আপনি নিচে যান। আমি আসছি।’
দিব্য সে কথায় কান দিল বলে মনে হলো না। সে নির্বিকার চিত্তে ঘরের সোফাটায় গিয়ে বসল। খুব স্বাভাবিক গলায় জানাল,
‘তুমি তৈরি হও। আমরা একসাথেই নিচে যাব।’
কথাটা বলেই দিব্য অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসল। দীর্ঘ কয়েকটা শ্বাস টানলো। দিব্য সরাসরি নবনীর দিকে তাকিয়ে না থাকলেও নবনী যেন নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তার হাত কাঁপছে অনবরত। দিব্যর ওপর মনে মনে কিছুটা বিরক্তও হলো সে। লোকটা সারাক্ষণ সবাইকে কাণ্ডজ্ঞান শেখায় অথচ এখন নিজে কী করছে! এভাবে ঘরে বসে থাকার কোনো মানে হয়? হঠাৎ দিব্য গম্ভীর গলায় বলল,
‘দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি আমার মুখ দেখছ? পাঁচ মিনিটের মধ্যে দুই মিনিট তো আমাকে দেখেই কাটিয়ে দিলে। আমি কি শাড়ি পরতে সাহায্য করব?’
বিস্ময়ে নবনীর ঠোঁট জোড়া খানিকটা ফাঁক হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে কোনোমতে শাড়িটা সামলে নিয়ে প্রায় দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। বিকট শব্দে দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজে দিব্যর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠল। হাসি পেলেও দিব্যর মনে মনে বেশ রাগ হচ্ছিল। এভাবে দরজা আধখোলা রেখে তৈরি হওয়ার মানে কী? বাড়িতে আজ এত মানুষ। সে না এসে যদি অন্য কেউ ঘরে ঢুকে পড়ত! খানিকক্ষণ পর নবনী বেরিয়ে দেখল দিব্য আগের জায়গাতেই বসে আছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুত চুলগুলো আঁচড়ে নিয়ে একটা খোঁপা করল। দিব্য উঠে এসে নবনীর একদম পেছনে দাঁড়াল। আয়নায় ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির প্রতিফলন দেখে নবনী যেন আরও কুঁকড়ে গেল। এই চাহনির অর্থ সে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ দিব্য হাত বাড়িয়ে নবনীর বৃহত গলার ব্লাউজের ফিতা দুটো বেঁধে দিল। নবনী শক্ত করে চোখ জোড়া বুজে ফেলল। তার দম আটকে আসছে। দিব্য মুগ্ধ হয়ে আয়নায় ওকে পরখ করছিল। কালো রঙের শাড়িটা ওর দুগ্ধশুভ্র শরীরে এক মায়াবী রূপ দিয়েছে। অপূর্ব লাবণ্যময়ী লাগছে। নবনীর কানের নিকট মুখ রেখে বলল,
‘তোমার কমনসেন্স কোথায় নবনী? এভাবে দরজা খুলে রাখতে বারণ করিনি? আজ আমি না এসে যদি অন্য কেউ আসত। তবে কী হতো জানো?’
নবনী চোখ মেলল। আয়নার স্বচ্ছ কাঁচে তাদের চার চোখ এক হলো। দিব্যর তীক্ষ্ণ আর নেশাতুর দৃষ্টিতে নবনী আড়ষ্ট বোধ করলো। লজ্জায় সে তাকাতে পারছে না। দিব্য নিজের বিশেষ ভঙ্গিতে ভ্রু নাচিয়ে উত্তর চাইল। নবনী দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মুখ ঘুরিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় আলতো করে বলল,
‘কী হতো?’
‘তাহলে আজ আমার হাতে একজন খু ন হতো!’
নিচু স্বরে বলা কথাগুলো নবনীর কানে উত্তাপ ছড়িয়ে দিল। ঝাঁঝাঁ করে উঠলো কর্ণজোড়া। বুকটা ধক করে উঠলো। উত্তরের সুযোগ পেল না। তার পূর্বে অসম্ভব একটা কাজ করলো দিব্য। নবনীর উন্মুক্ত কাঁধে নিজের উষ্ণ ঠোঁট জোড়া ছুঁইয়ে দিলো। আচমকা এরূপ স্পর্শে নবনী থরথর করে কেঁপে উঠল। দিব্যর ওষ্ঠের ছোঁয়া গাঢ় হলো। নবনী সহ্য করতে পারলো না৷ সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই একটা শক্তপোক্ত হাত লতার মতো পেঁচিয়ে ধরলো ওর সুগঠিত কোমর। নিজের আরও কাছে টেনে নিলো। দিব্যর হাতের স্পর্শ কোমল উদরে বিচরণ করতেই নবনী পাথরের মতো জমে গেল। চোখ দুটো খিঁচে বুজে নিলো। স্বামীর এই নিবিড় সান্নিধ্য অনুভব করতে লাগল। পরক্ষণেই দিব্য ওকে ছেড়ে দিল। বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে নিয়ে হাতের আঙুলে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে বলল,
‘তাড়াতাড়ি নিচে এসো।’
মুহুর্তে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নবনীর শরীরটা তখনো কাঁপছে। মাথাটা ভনভন করছে যেন। ভারসাম্য রাখতে একহাতে ড্রেসিং টেবিলটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। হৃৎপিন্ডের ধুকপুকানিটা থামবার নাম নেই। জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো।

আয়োজনের কোনো কমতি রাখা হয়নি।আলোকসজ্জা পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে। কালো, সোনালি বেলুন আর রঙিন বাতির আলোয় চারপাশটা ঝলমল করছে। আমন্ত্রিত অতিথিদের আগমনে বাড়িটা এখন উৎসবমুখর। ঠিক মাঝখানে রাখা হয়েছে বিশাল এক কেক। পাঁচ তলার সেই কেকের চূড়ায় জ্বলজ্বল করছে সংখ্যা ‘৫’। দিব্য আর নবনী দাঁড়িয়েছে দিয়ার দুপাশে। বাকিরা ও আছে৷ তিনজনে মিলে একসাথে কেক কাটল। দিয়া নিজের ছোট্ট হাতে একে একে সবাইকে কেক খাইয়ে দিল। এরপর চঞ্চল পায়ে কলরবের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আবদার করে বলল,
‘চাচ্চু, তোমার গিটারটা নিয়ে এসো না! তুমি আমাদের গান শোনাবে।’
কথাটা শুনেই কলরব কিছুটা ভড়কে গেল। গিটারের কথা যে এভাবে ফাঁস হয়ে যাবে সে ভাবেনি। তার চোখেমুখে এক মুহূর্তের জন্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। দিব্য ব্যাপারটা খেয়াল করে মৃদু হেসে তাকে আশ্বস্ত করে বলল,
‘আরে নিয়ে আয়। কোনো সমস্যা নেই।’
দিব্যর অনুমতি পেয়ে কলরবের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটল। ঠিক সেই মুহূর্তেই কুহু কলরবের গিটারটা হাতে নিয়ে সেখানে হাজির হলো। বিজয়ীর হাসি দিয়ে বলল,
‘এই তো, আমি আগেই নিয়ে এসেছি!’
কলরব চট করে ওর হাত থেকে গিটারটা ছিনিয়ে নিল। প্রিয় যন্ত্রটার গায়ে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে তীরিক্ষী গলায় বলল,

‘তোর সাহস তো কম নয়! আমার ঘরে ঢোকার আর এটা স্পর্শ করার স্পর্ধা পেলি কোথায়? খবরদার কুহু নেক্সট টাইম যেন এমন দুঃসাহস আর না দেখি!’
কুহু পাত্তা না দিয়ে মুখ ভেঙালো। কলরব গিটারটা গলায় ঝুলিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসল। টুংটাং শব্দে গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়াতেই চারদিকে একটা সুর ছড়িয়ে পড়ল। নিযানা আর উপস্থিত বাকি সবাই অবাক হয়ে সেদিকে দৃষ্টিপাত করলো। ঘরের সব কোলাহল ছাপিয়ে গিটারের সুরের সাথে মিশ্রিত হলো কলরবের কণ্ঠঃ-
Saal bhar mein sabse pyara
Hota hai ek din
Sau duaein de raha dil
Tumko aaj ke din…
I wish you happy happy birthday
Happy birthday
Happy happy birthday to you…

অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত গড়ালো অনেকটা। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই বিদায় নিয়েছে৷ বাড়ির চারপাশের কোলাহল স্তিমিত। নিঝুম চারদিক। কিন্তু নিযানার চোখে ঘুম নেই; সে আপনমনে বই খুলে বসেছে। কলরবের মেজাজটা এবার সপ্তমে চড়ল। একটা মানুষ কতটা অদ্ভুত হলে এই অসময়েও পড়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে পারে! নিযানাকে তার বরাবরই রক্ত-মাংসের মানুষ নয়; ভিনগ্রহের কোনো এক প্রাণী মনেহয়। সবার সাথে আজকে শাড়ি পড়েছিলো। পরনের জমকালো শাড়িটা বদলানোর প্রয়োজনটুকুও বোধ করেনি। বিরক্ত কণ্ঠে কলরব বলল,
‘এখন না পড়লে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? মেজাজ খারাপ না করে লাইটটা অফ কর তো।’
নিযানা মুহূর্তকাল ভাবল। কথা মিথ্যে নয়। রাত হয়েছে ঢের। কিন্তু উপায় কী? আগামীকালের কলেজের অ্যাসাইনমেন্টটা জরুরি। ভোরে উঠে আবার রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে৷ বই ছোঁয়ার ফুরসত মিলবে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বইটা বন্ধ করল। মেইন সুইচ অফ করে নীল রঙের ড্রিম লাইটটা জ্বালিয়ে শুয়ে পড়লো। যেই না ক্লান্ত চোখে ঘুমের আবেশটুকু জড়ো করতে চাইল। অমনি এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত তার বাহু আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। মুহূর্তের ব্যবধানে নিযানা নিজেকে আবিষ্কার করল কলরবের বক্ষ তলে। তার ওপর ঝুঁকে থাকা কলরবের তপ্ত নিঃশ্বাস ললাটে আছড়ে পড়ছে। আড়ষ্টতায় নিযানার সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে এল। হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি মাত্রা ছাড়ালো। বিস্ময় আর কৌতূহলের বিমূঢ় নিযানা। কলরব বিনাবাক্যে মুখ ডুবিয়ে দিল নিযানার গ্রীবার খাঁজে। ওষ্ঠের এলোপাতাড়ি উষ্ণ ছোঁয়া আর দন্তের মৃদু দংশন নিযানাকে এক অজানা অস্থিরতায় আচ্ছন্ন করে তুলল। লজ্জায় আর আবেশে অবচেতনেই খামচে ধরল কলরবের মাথার চুল। অস্পষ্ট স্বরে কোনোমতে উচ্চারণ করল,

‘কী করছো?’
কলরব থামল। মুখটা নিযানার কানের একদম কাছে নিয়ে ফিসফিসিয়ে কিছু একটা বলল। সেই কথা কানে যেতেই নিযানা বজ্রাহত হলো। লজ্জার গাঢ় আস্তরণ তার গালদুটোকে রাঙিয়ে দিল মুহূর্তেই। নিজেকে সামলাতে না পেরে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
‘ছিঃ! অসভ্য কোথাকার!’
‘তোর বাপও অসভ্য।’
খুব স্বাভাবিকভাবে বলল কলরব। নিযানা অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাল। ড্রিম লাইটের নীল আলোয় দুজনের চোখাচোখি হলো। কলরবের দৃষ্টি স্থির। নিযানাকেই দেখছে। রমণীর কম্পিত ওষ্ঠাধরে ক্ষণিক চেয়ে ওষ্ঠ মিলাতেই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিযানা বলল,
‘তোমার কি একটুও লজ্জা করছে না?’
কলরব অবলীলায় বলল, ‘এটা তো প্রথমবার না। তাছাড়া তোর বাপের……’
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই নিযানা তার হাত দিয়ে কলরবের ঠোঁট চেপে ধরল। বিরক্ত গলায় বলল,
‘আব্বুকে কেন টানছো বারবার? আমি ভেবেছিলাম ওটা শেষবার।’
কলরব নিযানার কোমল হাতদুটো বন্দি করলো নিজের একহাতের মুঠোয়। মাথার ওপরটায় শক্ত করে চেপে ধরল। আরেকটু ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,

‘এটাই শেষবার।’
বলার সাথে সাথেই নিযানার কাঁধ থেকে সযত্নে সরিয়ে দিল শাড়ির আঁচলখানা। মুহূর্তের জন্য নিযানা জমে পাথর হয়ে গেল; হূদস্পন্দন থমকে দাঁড়াল তার। কিন্তু মনের মধ্যে জমে থাকা জেদটা দমল না। ধরা গলায় প্রশ্ন করল,
‘তবে ডিভোর্স দিচ্ছ কবে?’
‘পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই।’
নিযানার আখিঁজোড়া টলমল করে উঠলো। কলরব তার শার্টটা খুলে পাশে রেখে পুনরায় নিযানার কন্ঠলগ্নে ঠোঁট ছোঁয়াতেই নিযানা বলল,
‘তুমি আমায় একটুও মেনে নিতে পারছ না, তাই না?’
‘নাহ। কোনোদিন পারবও না।’
কলরবের এমন নির্লিপ্ত ব্যবহার। নিযানার অভিমান টগবগিয়ে রাগে পরিণত হলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘তাও আমার কাছে আসতে বিন্দুমাত্র লজ্জা হয় না তোমার?’
কলরব মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। কর্কশ গলায় বলল,
‘আমি কি তোকে জোর করেছি?’
‘তা তো করতেই পারো।’
‘উহু, জোর তোর ওপর খাটাতে পারি না।’

নিযানা কম্পিত গলায় বলল, ‘কতটা মনুষ্যত্বহীন তুমি কলরব! শুধু নিজের প্রয়োজনটাই বোঝো। আমার প্রতি কি তোমার বিন্দুমাত্র মায়া হয় না? তুমি আদতে মানুষের মধ্যে পড়ো?’
‘এমন কথা বলিস না, সরাসরি বুকে গিয়ে লাগে। জানিস তো, কথার আঘাত খুব গভীর হয়।’
নিযানা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ‘এ কথা অন্তত তোমার মুখে মানায় না। তুমি কি কিছু ভেবে বলো আমাকে?’
‘আমি ভেবেই বলি নিযানা। বিশেষ করে তোকে বলার আগে একশ বার ভাবি।’
‘তাও বলো?’
কলরব কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কি আমায় ভালোবাসিস?’
প্রশ্নটা নিযানার হৃদপিণ্ডে গিয়ে সজোরে আঘাত করল। সে থমকে গেল। ওর কাছে এই প্রশ্নের কোনো তৈরি উত্তর নেই। এখানে সে বড় অসহায়। নিজের মনের কাছেই যেখানে সে স্বচ্ছ নয়। সেখানে অন্যকে কী জবাব দেবে? চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রুটুকু আড়াল করে নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিরেট রেখে বলল,
‘নাহ।’

‘তাহলে ছাড়ছিস না কেনো আমাকে?”
নিযানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুট স্বরে বলল, ‘আমি নিজের ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছি।’
‘তাহলে আজ আর আটকাস না। প্লিজ…!’
নিযানা আর পারল না। এই ছেলেটার কাছে অবচেতনেই সে কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়ে। নিজের অজান্তেই নিজেকে সঁপে দেয় ওর কাছে। কলরবের ছোঁয়ায় সে বশীভূত হয়ে যায়; তখন মনে হয় পৃথিবীর সব চিন্তা সব তিক্ততা বড্ড তুচ্ছ। কলরব যখন আবারও নিবিড়ভাবে কাছে এলো নিযানা তাকে আগলে নিল। বাঁধা দিতে পারলো না। শুধু ধরা গলায় বলল,
‘আমায় ডিভোর্স দিয়ে দিও।’
কলরব শুধু সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, ‘আচ্ছা।’

কিন্তু নিযানার কেন যেন কথাটা বিশ্বাস হলো না। ওর মনে হলো এই ছেলেটা মুখে যা-ই বলুক না কেন তাকে কখনো ছাড়বে না। অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই অসম্পূর্ণ আর অগোছালো সম্পর্কটা এখন আর তার অতটা খারাপ লাগছে না। এত এত তিক্ততা আর অপমানের মাঝেও কোথায় যেন একটা ভালোলাগা কাজ করে। এটাও কি সম্ভব? সে ভেবে পাইনা। কলরবও জানে না তার আসলে কী হয়। এই মেয়েটার কাছাকাছি এলেই সে জীবনের সমস্ত জটিলতা আর হিসাব-নিকাশ ভুলে যায়। এক অদ্ভুত ভালোলাগা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে।

এই অবেলায় পর্ব ২৭

তখন না আসে অদূর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা। না মনে পড়ে অন্য কারো কাছে দায়বদ্ধতার কথা। এর কারণ কী তা কলরবের অজানা। আর সে জানতেও চায় না। কখনো না। এসব সাত-পাঁচ ভাবনার আবর্তে হাবুডুবু খাওয়া নিযানা আচমকায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো কলরবের ক্রমবর্দ্ধমান অস্থিরতাকে সামলাতে। ক্রমশ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে সে। নিযানা স্তব্ধ হয়ে অনুভব করছিল সেই দহন। কলরবের তপ্ত হাত শাড়ির কুঁচিতে পড়তেই নিযানা শিউরে উঠল। এক অজানা শিহরণ তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। কোনো কথা দ্বিধা ছাড়ায় অত্যন্ত নিপুণ দক্ষতায় নিযানার তনু থেকে শাড়িটা বিচ্যুত করে দিল কলরব। মখমল কালো কাপড়টা অবহেলায় গিয়ে পড়ল ঘরের এক কোণে। নিস্তব্ধ ঘরে শুধু দুজনের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠলো৷

এই অবেলায় পর্ব ২৯