Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ২৭

এই অবেলায় পর্ব ২৭

এই অবেলায় পর্ব ২৭
সুমনা সাথী

গোধূলির সেই মায়াবী রক্তিম আভা অলসভাবে মিলিয়ে গিয়ে প্রকৃতির বুকে নামছে নিবিড় আঁধার। দিনশেষে পরিশ্রান্ত পাখিরা ডানা ঝাপটে ফিরছে আপন কুলায়ে। নিযানা কেবল পড়ার টেবিলে বইটা মেলে ধরেছে। এমন সময় হাতে একটি খাতা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল কুহু। এবার একাদশ শ্রেণিতে সে। সামনে পরীক্ষা কিন্তু একটি অঙ্ক কিছুতেই তার আয়ত্তে আসছে না। দরজায় মৃদু করাঘাত করে সে শুধাল,
“আসতে পারি?”
নিযানা চশমার ওপর দিয়ে দৃষ্টি তুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আসবি কি না সেটা আবার জিজ্ঞেস করার কী আছে? আয়। তোকে তো আজকাল পাওয়াই দুষ্কর হয়ে পড়েছে।”
কুহু ঘরে ঢুকেই আড়চোখে একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে কলরবকে খুঁজল। তাকে কোথাও না দেখে আশ্বস্ত হয়ে দ্রুত কদমে এগিয়ে এল। বলল,

“আর বলিস না ভাই, পড়তে পড়তে জীবনটা একেবারে কয়লা হয়ে গেল! ভোরে কোচিং, সেখান থেকে সোজা কলেজ। ফিরে এসে একটু জিরোতে না জিরোতেই তিনটের সময় আবার দৌড়াতে হয় কোচিংয়ে। তারপর রাতে এই পাহাড় সমান পড়া নিয়ে বসা। আমায় খুঁজে পাবি কীভাবে বল?”
নিযানা সহমর্মিতার সাথে মাথা নাড়ল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
“বিশেষ কোনো প্রয়োজনে এসেছিস?”
কুহু খাতাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ রে, এই অঙ্কটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না।”
নিযানা অঙ্কটার দিকে নজর দেওয়ার আগেই সেখানে উদয় হলো ইভান। বয়সটা অল্প হলেও ছেলেটার চলন-বলন আর চোখের চাউনিতে সবসময় এক গম্ভীরতা লেপ্টে থাকে। নিজের স্বভাবজাত গাম্ভীর্য বজায় রেখে সে এসে ওদের সামনে দাঁড়াল। তাকে দেখে কুহু জিজ্ঞেস করল,
“কী ব্যাপার ইভান বেবি? এখানে কী মনে করে? কিছু চাই?”
ইভান ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করল। গম্ভীর গলায় সংশোধন করে দিয়ে বলল,
“আমি মোটেও বেবি নই ফুপি। নিযানা আন্টি, আপনাকে দাদি ডাকছেন। বললেন যেন এখনই একবার নিচে যান।”
ইভানের এমন উত্তরে কুহু বড় বড় চোখে চেয়ে রইল। নিযানা মৃদু হেসে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আসছি।”
ইভান ঠিক যেভাবে এসেছিল সেভাবেই নিজের প্রস্থান করল। নিযানা বসা থেকে উঠে পড়লো। টেবিলের ওপর বইটা রেখে দিলো। কুহু বিরক্তিতে মুখটা একটু কুঁচকে বলল,
“আমার অঙ্কটার কী হবে তাহলে? আর একটু পরে গেলে হয় না?”
নিযানা একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। নিজের ভেতরের দোলাচল আর এই বাড়ির অলিখিত নিয়মকানুন সে কুহুকে কীভাবে বোঝাবে? কেবল মৃদু হেসে শান্ত গলায় বলল,
“এখন না গেলে মামি যদি রাগ করেন? আমি ফিরে এসে তোকে অঙ্কটা বুঝিয়ে দেব, কথা দিচ্ছি।”
কুহু বলল, “চল, আমিও তোর সাথে নিচে যাই।”
নিযানা নিষেধ করতে গিয়েও পারল না। দুইজনে মিলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। বাড়ির পরিবেশ এখন বেশ স্বচ্ছল। রান্নাঘরে সন্ধ্যার নাস্তা তৈরি হচ্ছে। বসার ঘরে চলছে আগামীকালের অনুষ্ঠানের আলাপ-আলোচনা। সেখানে দিব্য, কাব্যসহ বাড়ির বড়রা সবাই উপস্থিত। অলেখা ডাইনিং টেবিলের এক কোণে গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন। নিযানা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“মামি, আমাকে ডেকেছো?”
অলেখা তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিযানার ওপর স্থির করলেন। সেই চাহনিতে কী ছিল জানা নেই তবে নিযানা অদ্ভুত এক সংকোচে গুটিয়ে গেল। এক অজানা অস্বস্তি তার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা বজায় রেখে অলেখা প্রশ্ন করলেন,
“সন্ধ্যাবেলা ঘরের দরজা আটকে ভেতরে বসে ছিলে কেন?”
নিযানা নিচু স্বরে উত্তর দিল, “আমি পড়ছিলাম মামি।”
“হ্যাঁ, সে তো বুঝতেই পারছি। তবে এটা মনে রাখা ভালো যে এটা যৌথ পরিবার আর তোমার শ্বশুরবাড়ি। এখানে সবার সাথে মিলেমিশে চলাটাই নিয়ম। যখন-তখন নিজের ইচ্ছামতো ঘরের দরজা আটকে পড়ে থাকলে চলে না।”
নিযানা কোনো পাল্টা যুক্তি দিল না। কেবল নিঃশব্দে মাথা নুইয়ে শাসনটুকু মেনে নিল। অতি সংক্ষেপে শুধাল,
“আমাকে এখন কিছু করতে হবে?”
অলেখা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“এমনভাবে কথা বলছো কেনো? যেন সব কাজ আমি একা তোমাকে দিয়ে করাই! আর এই তোমার পোশাকের ছিরি? বাড়িতে শ্বশুর, ভাসুর, দেবর সবাই বড়রা আছেন। ওড়না ছাড়া এভাবে ঘুরে বেড়ানো কোন ধরনের ভদ্রতা, শুনি?”

নিযানা ভীষণভাবে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ছোটবেলা থেকেই সে এভাবে থেকে অভ্যস্ত। পোশাকের খুঁটিনাটি নিয়ে এমনভাবে কেউ কখনো আঙুল তুলবে সেটা তার ভাবনার অতীত ছিল। তাকে পাথরের মূর্তির মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অলেখা পুনরায় তপ্ত কণ্ঠে যোগ করলেন,
“থ্রিপিস পরো আর শাড়ি। নয়তো কুহু যেমন পোশাক পরে তেমন পরো। ওড়না ছাড়া এমন অবস্থায় যেন তোমাকে আর কখনও এ বাড়িতে না দেখি। কথাগুলো কানে গেছে? যাও এখন। রান্নাঘরে গিয়ে দেখো ভাবিদের কোনো সাহায্য লাগবে কি না।”
নিযানা মাথা নুইয়ে নির্দেশটুকু মেনে নিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কুহুর প্রচন্ড মেজাজ খারাপ হলো। চট করে বলে উঠল,
“কিন্তু আম্মু, আমি নিযানাকে বলেছিলাম আমার একটা অঙ্ক বুঝিয়ে দিতে। ওটা আমার খুব দরকারি ছিল।”
অলেখা কুহুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “অঙ্ক বুঝতে হলে কায়েফ ভাইয়ের থেকে দেখিয়ে নে। আর ‘নিযানা’ কী? সম্পর্কে ও তোর বড় ভাইয়ের বউ হয়। ‘ভাবি’ ডাকতে শেখ।”
মায়ের এমন কঠোর আর অযৌক্তিক আচরণে কুহুর মেজাজটা তিতকুটে হয়ে গেছে। আজকাল বাড়ির পরিবেশটা যেন বড্ড বেশি দমবন্ধ করা হয়ে উঠছে।

রাতের খাওয়ারপর্ব চুকিয়ে দিব্য বেশ আগেই নিজের ঘরে ফিরেছে। নবনী ফিরল কিছুটা পরে। তার মনটা আজ এক অজানা বিষণ্ণতায় ভারাক্রান্ত। কিছুক্ষণ আগে ওই বাড়ি থেকে অনিক ফোন করেছিল; বাবার শরীরটা নাকি বিশেষ ভালো যাচ্ছে না। সেই দুশ্চিন্তার সাথে যুক্ত হয়েছে তার নিজের অপূর্ণ উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। মা হওয়ার পর কি মেয়েদের স্বপ্নগুলো ফুরিয়ে যায়? অলেখা যদি নিযানার পড়াশোনা নিয়ে আপত্তি না করেন তবে নবনীর বেলায় কেন বাধা আসবে? দিব্যর কাছে নিজের ইচ্ছের কথাটুকু বলতে চেয়েও নবনী সাহসে কুলাতে পারছে না। ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে নবনী দেখলো, দিয়া এর মধ্যেই ঘুমের অতলে তলিয়ে গেছে। দিব্য সোফায় বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। নবনী মৃদুস্বরে প্রশ্ন করল,
“শুনছেন? এক কাপ কফি দেব আপনাকে?”
দিব্য মুখ তুলে তাকাল। কাজের চাপে হয়তো একটু ক্লান্তি ছিল। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,
“হলে তো বেশ ভালো হয়।”

নবনী আবারও ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দিব্যর মনে এক চিলতে দ্বিধা জেগে উঠল; নবনীর থমথমে মুখটা তার নজর এড়ায়নি। মেয়েটা সবে ঘরে এল, এসেই আবার রান্নাঘরের দিকে ছুটল। কফির কথাটুকু না বললেই বোধহয় ভালো হতো। সে কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত?অল্পক্ষণের মধ্যেই নবনী ধোঁয়া ওঠা কফির মগ হাতে ফিরে এল। দিব্যর সামনে মগটা নামিয়ে দিয়ে সে সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। মনের অস্থিরতা কিছুতেই গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারছে না সে। দিব্য কফিতে চুমুক দিয়ে নবনীর দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। তাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিচু স্বরে শুধাল,

“নবনী? কিছু কি বলবে?”
নবনী একটু চমকে উঠল। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“নাহ, তেমন কিছু না। আপনি ঘুমাবেন না? রাত তো অনেক হলো।”
দিব্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “দিয়াকে বারোটায় উইশ করব ভাবছি। হাতে আর সামান্য সময় আছে তাই ভাবলাম এইটুকু সময় আর না-ই বা ঘুমালাম। তোমার আসলে তুমি শুয়ে পড়ো।”
দিব্যর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ শক্তি নবনীর নীরবতা থেকে কিছু একটা আঁচ করার চেষ্টা করল। সে কফির কাপটা পাশে সরিয়ে রেখে শান্ত গলায় ডাকল,
“নবনী, একটু এদিকে এসো তো।”
নবনী ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কাছে দাঁড়াতেই দিব্য অতর্কিতে তার একটি হাত ধরে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। আকস্মিক এই ঘটনায় নবনী ভীষণভাবে ভড়কে গেল; টাল সামলাতে না পেরে সে দুচোখ বুঁজে দিব্যর শার্টের কলারটা খামচে ধরল। লজ্জার গাঢ় লালিমা তার গাল দুটোকে মুহূর্তেই রাঙিয়ে দিল। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি তীব্র হলো। দিব্য এক হাত দিয়ে তার পাতলা কোমর জড়িয়ে ধরে কোমল স্বরে শুধাল,
“তুমি কি কোনো বিষয় নিয়ে মন খারাপ করে আছো? কেউ কি কিছু বলেছে তোমাকে?”
নবনী পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। সে বিস্ময়ে হতবাক! মুখে একটি শব্দও উচ্চারণ না করে কেবল মনের ভেতরে চেপে রাখা অব্যক্ত ব্যথাটা এই মানুষটা কীভাবে এক পলকেই পড়ে ফেলল? অথচ এর আগে সে কতজনকে কত কিছু বলেও তো বোঝাতে পারেনি। এক অজানা আবেগে নবনীর কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠল; সে কুণ্ঠিত স্বরে বলল,

“আমি আপনাকে একটা কথা বললে আপনি কি রাগ করবেন?”
দিব্যর চোখে কৌতূহলের ছায়া নামল। মেয়েটা রীতিমতো কুঁকড়ে আছে। তার মনে এমন কী তোলপাড় চলছে? সে মৃদু মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
“আগে শুনিই না কী বলবে। রাগ করব কি না সেটা না হয় পরে ভেবে দেখা যাবে।”
নবনীর আড়ষ্টতা যেন কাটছেই না। এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থানে বসে আলোচনা করা কি সম্ভব? আমতা আমতা করে বলল,
“আমরা কি একটু স্বাভাবিকভাবে বসে কথা বলতে পারি না?”
“কেন, এভাবে বসে কথা বলতে কী সমস্যা? বরং কোলে বসিয়েছি বলে তো তোমার খুশি হওয়ার কথা।”
“আমি কি বাচ্চা ?”
“বাচ্চা নও বুঝি?”
“আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন?”
“কেন? তোমার কী মনে হচ্ছে? আমি কি তোমাকে ধমকাচ্ছি?”
“না তো। কিন্তু মজা করলে তো অন্তত হাসতে হয়!”
“আমার হাসি সুন্দর নয়।”
“কে বলেছে এই বাজে কথা আপনাকে?”
“তার মানে কি আমার হাসি সুন্দর লাগে?”
“ভীষণ সুন্দর লাগে!”

নবনী কোনো দ্বিধা না রেখে কথাটি বলে ফেলল। দিব্যর ঠোঁটের কোণে এবার সত্যিই একটা স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। সে চেয়েছিল নবনীকে সহজ করতে আর সেই কাজে সে সফলও হয়েছে। নবনী এবার সব ভয় আর জড়তা ঝেড়ে ফেলে সরাসরি দিব্যর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আসলে… আমি পড়তে চাই।”
কথাটা বলে নবনী শ্বাস আটকে দিব্যর চোখের দিকে চেয়ে রইল। মুহূর্তের মধ্যে দিব্যর মুখাবয়বে গাম্ভীর্যের ছায়া নামল; হাসিখুশি ভাবটা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ঠাঁই নিল এক কঠিন নিস্তব্ধতা। নবনীর বুকের ভেতরটা দুরুদুরু কাঁপছে। প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটি যুগের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে দিব্য থমথমে গলায় বলল,

“কাল আম্মুর সাথে এ বিষয়ে কথা বলব। ঠিক আছে? এখন যাও, শুয়ে পড়ো।”
নবনীর মনে হলো কেউ যেন এক বালতি শীতল জল তার ওপর ঢেলে দিল। দিব্য তার কোমরে রাখা হাতের বাঁধন আলগা করে দিয়েছে। দৃষ্টিও সরিয়ে নিয়েছে অন্যদিকে। একরাশ হতাশা আর ভারী মন নিয়ে নবনী ওভাবেই বসে রইল। কাঁপা গলায় অস্ফুট গলায় শুধাল,
“আপনি কি আমার ওপর রাগ করলেন?”
দিব্য সরাসরি তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “উঁহু, রাগ করিনি। আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি। তোমার পড়াশোনা নিয়ে আমার কোনো ব্যক্তিগত আপত্তি নেই। তবে আমি যতটুকু জানতাম, বিয়েতে বসার আগে তুমি সবকিছু জেনেশুনেই রাজি হয়েছিলে। তবে আজ হঠাৎ এই পরিবর্তনের কারণ কী নবনী? নিযানার জন্য? ব্যাস, সেটুকুই ভাবছি।”
নবনীর মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বেরোল না। দিব্য তো মিথ্যে বলেনি; বিয়ের শর্তগুলো তখন সে মেনেই নিয়েছিল। তবে কি নিযানাকে দেখে তার মনে কোনো সূক্ষ্ম ঈর্ষা জেগেছে? মনের গহীনে সে নিজের স্বপক্ষে হাজারো যুক্তি সাজাতে লাগল। সে তো কোনো অন্যায় আবদার করছে না। নবনীর থমথমে মুখটা দেখে দিব্য মৃদু স্বরে বলল,
“কী ভাবতে বসলেন ম্যাডাম? তুমি তো ভুল কিছু করছ না তাই এত ভাবারও প্রয়োজন নেই। আমি বলেছি তো, আম্মুর সাথে কথা বলে নেব।”

নবনী অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে বলল, “প্লিজ আমায় ভুল বুঝবেন না।”
দিব্য হাসল। নবনীর চোখের দিকে চেয়ে ধীরস্থিরভাবে বলল,
“ভুল বোঝার কিছু নেই। তবে শুরুতে তুমি আমায় একটা মিথ্যে বলেছিলে, তাই না? অসীম তোমার কলেজের পরিচিত কেউ নয় বরং তোমাদের ভার্সিটিও এক। আর অসীম কিন্তু পড়াশোনা ছাড়েনি।”
নবনী যেন পাথরের মতো জমে গেল। অসহায় চোখে চাইলো। তার গোপন রাখা অতীতটা দিব্যর নখদর্পণে। নবনীর নির্বাক হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় রইল না। একটা সুক্ষ্ম অপরাধবোধ তার মনের কার্নিশে জেঁকে বসল। দিব্যর মুখটা এখন গম্ভীর; সে কি এসবে কষ্ট পেয়েছিলো? এই সত্যটা কি তবে লোকটা এতদিন অবলীলায় মনের কোণে পুষে রেখেছিল? মুখ ফুটে কখনো কিছু বলেনি অথচ সবটাই তার নখদর্পণে। নবনী ভেবেছিল দিব্য বোধহয় গুরুত্ব দেয়নি কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আঘাতটা বেশ গভীর ছিল। দিব্য তো সবসময়ই বলে এসেছে। সে আর যাই হোক, অন্তত মিথ্যাচার পছন্দ করে না। দিব্যর শীতল কণ্ঠস্বর নীরবতা ভাঙল,
“কী হলো? এইভাবেই কি সারারাত বসে থাকতে চাও?”
নবনী কোনো উত্তর দিল না বরং আকস্মিকভাবে দুই হাত বাড়িয়ে দিব্যকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। আকস্মিক এই আলিঙ্গনে দিব্য ক্ষণিকের জন্য চমকে উঠল। তার শরীরটা আড়ষ্ট হয়ে গেল। দিব্যর বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল নবনী,

“আই অ্যাম স্যরি। প্লিজ, আমার ওপর রাগ করে থাকবেন না।”
দিব্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল, “আমি রাগ করেছি এমন কথা কি একবারও বলেছি? রাত অনেক হয়েছে। এখন গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”
“তবে আমায় সরিয়ে দিতে চাইছেন কেন?”
দিব্য কিছুটা অবাক হয়ে শুধাল, “তুমি কি সত্যিই এভাবে থাকতে চাও?”
নবনী কোনো কথা না বলে মৃদু মাথা নাড়লো। দিব্য কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে রইল; নবনী তার সান্নিধ্য চাইছে যা তার কাছে বিস্ময়। দিব্য বলল,
“আমি না খুব চেষ্টা করি তোমাকে বোঝার, নবনী। আসলে আমি সবার মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করি কিন্তু বারবার ব্যর্থ হই। ভালোবাসা না পেতে পেতে আমি বোধহয় কাউকে ভালোবাসতে ভুলে গেছি। খুব ভয় হয়, জানো? কাউকে চট করে ভরসা করতে পারি না একদম। আমি জানি এটা আমার একটা চারিত্রিক ত্রুটি কিন্তু চাইলেও এই স্বভাবটা ছাড়তে পারি না। আমার চিন্তাভাবনাগুলো হয়তো একটু বাজে অদ্ভুত, কিন্তু…”
নবনী চট করে একটি হাত দিব্যর গালে রাখল। বাকি কথাগুলো আর পূর্ণ করতে দিল না। শান্ত গলায়বলল,
“আপনার চিন্তাভাবনা একদমই বাজে নয় বরং খুব সুন্দর। আপনি চেষ্টা তো করছেন। ঠিক পারবেন৷ আমি আপনাকে সাহায্য করব।”
নবনী পুনরায় দিব্যর প্রশস্ত বুকে নিজের মাথা ঠেকিয়ে আবেশে চোখ দুটো বুজে ফেলল। দিব্য নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারল না; এক হাতে পুনরায় নবনীকে নিজের সাথে লেপ্টে ধরল। অন্য হাতে তার চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল।

রাতের প্রহর তখন বারোটার কাঁটা ছুঁইছুঁই। কলরব অনবরত দরজায় করাঘাত করে চলেছে। সন্ধ্যার দিকে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। ফিরল মাঝরাতে। ঘরের ভেতর নিযানা তখনো বইয়ের পাতায় মগ্ন; বইটা হাতে ধরা থাকলেও তার কান পড়ে আছে দরজার শব্দে। সে জেগে আছে ঠিকই কিন্তু একরাশ অভিমান আর জেদ নিয়ে ইচ্ছা করেই দরজা খুলছে না। কলরব দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চাপল। অগত্যা বিকল্প পথ খুঁজতে তাকে আবার আঙিনায় নেমে আসতে হলো। ব্যালকনি টপকে যখন সে নিজের ঘরে পা রাখল, ঠিক তখনই বুকটা ধক করে উঠল তার। মুখোমুখি নিযানা! কলরব ভেবেছিল নিযানা হয়তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন কিন্তু এই মেয়ে তো দিব্যি জেগে। তার মানে সজ্ঞানেই সে এতক্ষণ দরজার ওপাশে কলরবকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। নিযানা অবাক চোখে তাকিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। বিস্ময় মেশানো গলায় বলল,
“তুমি? তুমি তারমানে এভাবে চোরের মতো ব্যালকনি দিয়ে?”
কলরব তর্জনী উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এই যে খবরদার! একদম চোর বলবি না। এটা আমার নিজের ঘর। আমি যেদিক দিয়ে খুশি আসব। তুই যে এই ভূতের মতো জেগে ছিলিস, তাহলে এতক্ষণ দরজা খুললি না কেন?”

“আমি তোমাকে স্পষ্ট বলেছিলাম, রাত দশটার পর ঘরের দরজা বন্ধ থাকবে। কোন রাজকার্য শেষ করে ফিরছ তুমি এত রাতে?”
“সেই কৈফিয়ত কি এখন তোকেও দিতে হবে?”
নিযানা এক পা এগিয়ে এসে ধীরস্থিরভাবে বলল, “আমি কি তবে মামুকে ডাকব?”
কলরব তপ্ত চোখে নিযানার দিকে তাকাল। পরক্ষণেই মুখ ভেঙিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল,
“বলব মামুকে! কিছু হলেই নালিশ আর নালিশ। ল্যাদা বাচ্চা কোথাকার! নিজে কিছু করতে পারিস না? গিরগিটি একটা!”
“তার মানে তুমি বলবে না যে এই এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে? আমি করবো। কালকের পর ব্যালকনি ও বন্ধ করে রাখবো।”
কলরব কোনো উত্তর না দিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। টেবিলের ওপর থেকে নিযানার বইটা হাতে তুলে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“নাহ, বলব না। কী করবি শুনি? সাহস থাকলে করিয়। খুব তো পড়ছিলে দেখছি! এত পড়ে কী হবে? চশমা পরতে পরতে তো চোখের বারোটা বাজিয়েছিস। আস্ত একটা বইয়ের কীট হয়ে গেছিস তুই। কোন বাল হবে না এতে।”
নিযানা চট করে এগিয়ে গিয়ে ওর হাত থেকে বইটা কেড়ে নিল।
“তোমার মতো ‘আদু ভাই’ তো আর আমি নই যে বছরের পর বছর এক ক্লাসেই পড়ে থাকব!”
কলরব দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কী বললি তুই?”

“যা শুনেছ, ঠিকই শুনেছ। আদু ভাই! তাকে চেনো তো নিশ্চয়ই? তোমার সাথে বেশ মিল আছে ওনার।”
কলরব রাগে ফুঁসছিল কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সংবরণ করল। শরীরের প্রতিটি কোষে একরাশ ক্লান্তি জেঁকে বসেছে। ঝগড়া করার মতো শক্তিটুকুও যেন অবশিষ্ট নেই। যখন বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার উপক্রম করল, অমনি নিযানা বাধা হয়ে দাঁড়াল। নাসিকা কুঞ্চিত করে বলল,
“বাহির থেকে এসেছ। অমনি বিছানায় উঠে পড়ছো? যাও, হাত-মুখ-পা ভালো করে ধুয়ে এসো। সারা গা দিয়ে ঘামের উৎকট দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। পারলে গোসল করে এসো। তার আগে ভুলেও এই খাটে উঠবে না। নোংরা কোথাকার!”

এই অবেলায় পর্ব ২৬

কলরবের বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছাল। সে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ এক হ্যাঁচকা টানে নিযানাকে নিজের বুকের মাঝে ঝাপটে ধরল। নিযানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কলরব নিজের বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে থাকা গাল দুটো নিযানার ফর্সা গালে সজোরে ঘষে দিল। নিযানা সর্বশক্তি দিয়ে ছটফট করতে লাগল কিন্তু কলরবের হাতের বাঁধন আলগা করতে পারলো না। একরাশ ঘেন্না আর অভিমানে তার কান্না পেয়ে গেল। একটা মানুষ কতটা অসভ্য হলে এমন আচরণ করতে পারে! কাজ হাসিল করে কলরব ওকে ছেড়ে দিল। নিযানা চোখমুখ শক্ত করে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কলরব সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। দরজার কাছে পৌঁছে ঘাড় ঘুরিয়ে বিজয়ের হাসি হেসে বলল,
“আমি নোংরা, তাই তো? তোর সারা গায়ে নোংরা লেপ্টে দিয়েছি। এবার তুইও গোসল কর!”

এই অবেলায় পর্ব ২৮