এই অবেলায় পর্ব ৩৪
সুমনা সাথী
ভোরের কাঁচা রোদ ক্লাব ঘরের টিনের চালে ঠিকরে পড়ছে। চারপাশটা নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। শান্ত যখন ক্লাবের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। কপালে ভাঁজ পড়ল ওর। কপাট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। কাল রাতের কনসার্টের ধকল এখনো শরীরে রয়ে গেছে। কলরবের শেষ মুহূর্তের অনুপস্থিতি পুরো দলটাকে যেভাবে নাজেহাল করেছে তাতে ওর ওপর বিরক্তির পারদ আকাশচুম্বী। সেই রাগে শান্ত বিড়বিড় করতে করতে ভেতরে ঢুকেই থমকে গেল। ঘরের মাঝখানে রাখা বড় টেবিলটার ওপর দুই পা তুলে দিয়ে চেয়ারটা পেছনে হেলিয়ে দিয়ে কেউ একজন বেশ আয়েশ করে ঘুমিয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখে শান্তর বিস্ময়ের সীমা রইল না। এইভাবেও কেউ ঘুমাতে পারে? আরও কাছে এগোতেই চেনা অবয়বটা স্পষ্ট হলো। কলরব! শান্ত খানিকটা কর্কশ স্বরেই ডাক দিল,
“কলরব, এই কলরব! তুই এখানে এইভাবে শুয়ে আছিস কেন?”
ডাক শুনে কলরব এক প্রকার লাফিয়েই জেগে উঠল। তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে একবার শান্তকে দেখল তারপর কোনো উচ্চবাচ্য না করে আবার আয়েশ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। শান্তর বিরক্তি এখন তুঙ্গে। ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল অভিক আর অনন্ত। কলরবকে দেখেই দুজনে যেন দ্বিগুণ উৎসাহে তেড়ে এল। অনন্ত অবিশ্বাসের সুরে চিৎকার করে উঠল,
“কী রে, তুই এখানে কী করছিস? তোর না ঘরে বউ আছে? তুই ক্লাবে ঘুমিয়েছিলিস নাকি?”
কলরব ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল। তার দুচোখে ক্লান্তি। উদাসীনতা। নির্বিকার গলায় জবাব দিল,
“আব্বু বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।”
কথাটা শুনে উপস্থিত তিনজনের কারো কপালেই খুব একটা চিন্তার রেখা ফুটে উঠল না। আরশাদ তালুকদার তার এই বেয়াড়া ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি প্রায় দেন। এটা তাদের কাছে নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু হুমকিটা যে শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শান্তর কাছে একটু অবিশ্বাস্য ঠেকল। বিস্ময় কাটিয়ে বলল,
“সেকী! কেন? এবার আবার কী করলি?”
কলরব টেবিল থেকে পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল। “বউ ঝগড়া করে বাপের বাড়ি চলে গেছে। আর আমার দয়ালু বাপ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। যতদিন না বউকে ফিরিয়ে আনছি ততদিন ওই বাড়িতে আমার ঢোকা নিষেধ।”
অনন্ত যেন খুব মজার কিছু শুনলো। হাসতে হাসতে ভ্রু কুঁচকে টিপ্পনী কাটল,
“কেন রে? তোর বউ তো তোকে সারাক্ষণ আদরে-সোহাগে চুম্মার ওপরে রাখত। হঠাৎ এই হাল হলো কেন?”
কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“সাপের কাজই তো চুম্মা দেওয়া। আসল সমস্যা সেটা না। সমস্যা হচ্ছে বউয়ের তাও বাপের বাড়ি আছে। রাগ করে নাহয় বাপের বাড়ি চলেগেছে। আমি শালা তো সেই অপশনটাও পাচ্ছি না। কী এক মুশকিলে পড়লাম বল তো!”
ওর কথা বলার ভঙ্গি দেখে শান্ত, অভিক আর অনন্ত তিনজনেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। কলরব কড়া চোখে তাকালো। চোখ রাঙিয়ে থামানোর চেষ্টাও করল কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। হাসি থামিয়ে অভিক জিজ্ঞেস করল,
“তুই কি রাত থেকেই এখানে পড়ে আছিস?”
কলরব মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। তোকে কয়েকবার কল দিয়েছিলাম। ধরলি না। এরপর ফোনটাও অফ হয়ে গেল। একটা সিগারেট হবে কারো কাছে? খুব খিদে পেয়েছে।”
শান্ত বিরক্তি নিয়ে বলল, “খিদে পেয়েছে তো সিগারেট কেন খাবি? এই অভিক। গিয়ে জলদি কিছু খাবার নিয়ে আয়।”
অভিক বেরিয়ে যেতেই অনন্ত পাশে বসল। “ঝগড়াটা আসলে কী নিয়ে হয়েছে বল তো? মিটিয়ে নিলেই তো পারিস। এইভাবে ক্লাবঘরে কতদিন পড়ে থাকবি? আর বড় কোনো ঝামেলা না হলে আঙ্কেল তোকে বাড়ি থেকে বের করার লোক নন।”
“সব নষ্টের গোড়া ওই ইরা! মেয়েটা কেন যে এখনো আমার পিছু ছাড়ছে না জানি না। অন্তত বারোটা নাম্বার ব্লক লিস্টে ফেলেছি। তাও কাল নতুন নাম্বার দিয়ে ফোন করেছে। আর আমার ফুটা কপাল। ফোনটা ধরেছে নিযানা। ইরা ওকে কী কী বলেছে কে জানে! সম্ভবত বলে দিয়েছে আমি এখনো মাঝরাতে ওর সাথে দেখা করি।”
কলরব কথা শেষ করার পূর্বে শান্ত কুৎসিত একখানা গালি দিলো। তার চোখেমুখে ধিক্কার। ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল,
“শালা, আমরা কত বুঝিয়ে-সুজিয়েও তোকে ওর সাথে দেখা করাতে নিয়ে যেতে পারছিলাম না। আর যেই শুনেছিস মেয়েটা এখনো সিঙ্গেল। অমনি তোর আবার পুরনো ছুকছুকানি শুরু হয়ে গেল? তোর কি নূন্যতম লজ্জা নেই? ঘরে অমন সুন্দরী বউ রেখে এই কাজ করলি! শুরুতে তোর জন্য একটু মায়া হচ্ছিল। এখন আর হচ্ছে না। নিযানা আর তোর বাপ একদম ঠিক কাজ করেছে। তোর সাথে আরও খারাপ হওয়া উচিত।”
শান্তর কথা শেষ হওয়ার আগেই কলরব ওর পায়ে সজোরে একটা লাথি বসিয়ে দিল। রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“শালা, আমি কখন বললাম যে দেখা করেছি? রাত-বিরাতে আমি তোদের সাথেই থাকি। এটা নিযানা না জানুক। তোর তো জানা উচিত। এসেছে আমার সুন্দরী বউয়ের জন্য দরদ দেখাতে! ও সুন্দরী?”
অনন্ত কিছুটা আমতা আমতা করে বলল, “সুন্দরীই তো! তুই কি এতদিনেও নিজের বউকে ঠিক করে দেখিসনি? সিরিয়াসলি বলছিস? মেয়েটা তোর ঘরেই থাকে। নাকি তুই আসলে কানা আমি সেটাই বুঝতে পারছি না।”
কথাটা শুনে কলরব কিছুক্ষণের জন্য একদম চুপ হয়ে গেল। যেন ডুবলো গভীর চিন্তায়। অনন্ত গম্ভীর গলায় বলল,
“একটা কথা সিরিয়াসলি বলব? তুই কি এখনো ইরাকে ভুলতে পারছিস না? দেখ ভাই ওই মেয়েটা তোকে ঠকিয়েছে। এটা সত্য। এখন পথ না পেয়ে আবার ছুকছুক করছে। এখন তোর বিয়ে হয়ে গেছে। ঘরে বউ আছে। জাস্ট মুভ অন কর না! নিজের বউটার দিকে একটু তাকা। ওকে ভালোবাসার চেষ্টা কর। দেখবি সব আপদ মিটে গেছে।”
কলরব বিরক্ত গলায় বলল, “আরে ধুর। ওসব সম্ভব না। তোদের কীভাবে বোঝায়। আরে বাল ও আমার বোনের মতো! মানে আমি বলতে চাচ্ছি ছোটবেলা থেকে ওকে আমি কখনোই ওই নজরে দেখিনি। গত কয়েক বছর ধরে তো আরও না। তবে হ্যাঁ। এটা ঠিক যে ওর মধ্যে কিছু একটা ব্যাপার আছে। মানে! ওর সাথে ঝগড়া করে খুব মজা পাওয়া যায়। ওকে বিরক্ত করতেও বেশ লাগে।”
অনন্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল, “এ নিশ্চিত পাগল হয়ে গেছে। কী সব আবোলতাবোল বকছে উল্টোপাল্টা!”
কলরব বলল, “আরে আমি সত্যি বলছি। নয়তো তোরা ভেবে দেখ। ইরা যাওয়ার পর তো আমার শোকে পাথর হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। দেবদাস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমি তো দিব্যি ভালো আছি। কারণ একটু হলেও মেয়েটা…!”
কলরবের কথাগুলো মাঝপথে থমকে গেল। অভিক আর শান্ত দুজনেই উৎসুক চোখে চেয়ে আছে ওর দিকে। পরবর্তী শব্দর অপেক্ষায়। কিন্তু কলরব আর বলতে পারল না। সব কথা মুখে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সে বলতে পারল না। বা কিভাবে বোঝাবে সেটাও বুঝলো না। তার একাকিত্ব আর কাউকে হারানোর তীব্র বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া রাতগুলোকে রাঙানোর একটা গোপন জাদু ওই মেয়েটার জানা আছে। হুটহাট কথাবার্তায় কলরবকে বিরক্তির সাথে স্বাভাবিক করে। সে বলতে পারল না। কীভাবে নিমিষেই ওই মেয়েটার অস্তিত্বের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে সে ভুলে যেতে পারে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল। তার বুকে মুখ লুকিয়ে যে স্বস্তিটুকু কলরব পায়। তার নাম তার জানা নেই। এটা টনিকের মতো। সেই মুহূর্তগুলোতে জাগতিক কোনো দুশ্চিন্তা তাকে স্পর্শ করার সাহস পায় না। অত্যন্ত অপছন্দের, বিরক্তিকর ওই মেয়েটার মাঝে সত্যিই অদ্ভুত কোনো একটা শক্তি আছে। যা কলরবকে বারবার নিয়ন্ত্রণ করে দেয়।
নিযানার যখন ঘুম ভাঙল। ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটার ঘর ছুঁইছুঁই। মানসিক ধকলে শরীরটা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল সে। বিশাল বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে। আনতাসা কিংবা নওয়াজ চৌধুরী। কারো থাকার কথা নয়। এ সময় তারা সাধারণত অফিসেই থাকেন। বাড়িতে দুজন গৃহকর্মী থাকে। যারা স্থায়ীভাবে এই বাড়িতেই বসবাস করে। তাদেরই একজন মাহমুদা। রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল সে। নিযানাকে সিঁড়িতে দেখেই তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এল। কিছুটা কুুণ্ঠিত স্বরে বলল,
“আপু, উঠে গেছেন? শরীরটা কি ভালো লাগছে এখন? আপনি কী খাবেন বলেন। আমি এখনই গরম গরম রেঁধে দিচ্ছি। আর এমনিতে অনেক কিছুই রান্না করেছি। চাইলে সেখান থেকেও দিতে পারি।”
নিযানা মাহমুদার কথার উত্তর দিল না। তার চোখজোড়া অস্থিরভাবে সদর দরজার দিকে ঘুরছে। মনের কোণে একটা সূক্ষ্ম আশা ছিল। হয়তো ও-বাড়ি থেকে কেউ এসেছে। অন্তত কেউ একজন কি খোঁজ নিতে আসেনি? মাহমুদা লক্ষ করল নিযানার চেহারাটা কেমন জানি বিবর্ণ হয়ে গেছে। গত কদিনেই মেয়েটা যেন অনেকটা শুকিয়ে গেছে। নিযানাকে নিশ্চুপ দেখে সে আবার আমতা আমতা করে বলল,
“আপু, কিছু বলছেন না যে? খুব খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই? চাচিআম্মা বলেছিলেন আপনি একটু অসুস্থ।”
ভাবনা থেকে বাস্তবে ফিরে এল নিযানা। চমকে উঠে বলল,
“হ্যাঁ, যা রান্না করেছ সেটাই দাও।”
মাহমুদা মাথা নেড়ে খাবারের গোছগাছ করতে রান্নাঘরে চলে গেল। নিযানা ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসে পড়ল। হঠাৎ মনে পড়লো। তাড়াহুড়ো করে আসার সময় ও-বাড়ি থেকে ফোনটা পর্যন্ত আনা হয়নি। বাইরের দুনিয়ার সাথে তার এখন কোনো যোগাযোগ নেই। মাহমুদা খাবার নিয়ে এল। নিযানা নিজেকে সামলে নিয়ে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, সকাল থেকে বাড়িতে কি কোনো মেহমান বা কেউ এসেছিল?”
মাহমুদা মাথা নেড়ে নির্লিপ্ত স্বরে জানালো, “না তো আপা। কেউ আসেনি।”
নিযানার বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। অবচেতনে একটা নাম ওর ঠোঁটের আগায় চলে এল। খুব মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল,
“কলরব? ও-ও কি আসেনি?”
মাহমুদা খানিকটা অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“কলরব কে আপা?”
নিযানা আর কোনো উত্তর দিল না। হঠাৎ করে কথা বলার সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে সে। বুকের ভেতরটা এক অজানা হাহাকারে ভরে উঠল। তবে কি কলরব সত্যিই খুশি হয়েছে? নিযানা চলে আসাতে কি ওর উপদ্রব বিদায় হয়েছে বলেই ও আর কোনো খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি? ও তো এটাই চেয়েছিল। কিন্তু এত সহজে সবটা ছেড়ে দেবে। সেটা ভাবেনি নিযানা। মানুষের মন কতটা পাথরের হলে। ওইভাবে বেরিয়ে আসার পরেও একবার খবরটুকুও নেয় না! নিযানার মনে হয়েছিল ছেলেটা হয়তো শুধু একটু ভবঘুরে। কষ্টে আছে৷ আদতে ভেতরে মানুষটা খারাপ নয়। কিন্তু এখন নিজের সেই ভাবনার ওপরই তার প্রচণ্ড রাগ হতে লাগল। চোখের কোণ দুটো নোনা জলে টলমল করে উঠল তার। পাছে মাহমুদা দেখে ফেলে সেই ভয়ে দ্রুত মুখ নিচু করে ভাতের লোকমায় মনোযোগ দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করল সে। নিযানার এমন বিধ্বস্ত দশা দেখে মাহমুদা থতমত খেয়ে গেল। কোমল গলায় বলল,
“আপা, সকাল থেকে আসলেও কেউ আসেনি। চাচিআম্মা অফিসে যাওয়ার সময় শুধু বলে গেছেন যে আপনি রাতে এসেছেন। আমি যেন আপনার খাওয়ার দিকটা খেয়াল রাখি।”
নিযানা যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে সায় দিল। তারপর একটু থেমে কাঁপা গলায় বলল,
“ঠিক আছে। আচ্ছা। তোমার ফোনটা কি একটু আমাকে দেবে? একটা জরুরি কল করতে হবে। আসলে তাড়াহুড়োয় আমার ফোনসহ সবকিছু ওই বাড়িতেই ফেলে এসেছি।”
মাহমুদা সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল, “অবশ্যই আপা। আমি ফোন নিয়ে আসছি।”
“নবনী, আমাদের এবার ফেরা উচিত।”
দিব্যর গম্ভীর স্বরটা কানে আসতেই নবনী চট করে ওর দিকে তাকালো। রোদেলা উঠোনের মাঝখানে দিয়া আর অনিকদের হইহুল্লোড় চলছে। ওরা খেলায় মত্ত। নবনী এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে সেই দৃশ্যটাই দেখছিল। দিব্য ঠিক তার পাশটিতে এসে দাঁড়াতেই মুহূর্তের মধ্যে সেই আনন্দের আবেশটা উবে গেল। নবনী অস্বস্তি লুকানোর চেষ্টা করে প্রসঙ্গ এড়াতে চাইল,
“আপনি কি এক কাপ কফি খাবেন?”
দিব্যর অভিজ্ঞ চোখ নবনীর ভেতরের উদ্বেগটুকু ঠিকই ধরে ফেলল। সে খানিকটা সোজাসুজিভাবেই প্রশ্ন করল,
“তোমার কী মনে হয় নবনী? আমি কি সারা জীবন তোমার বাপের বাড়িতে এভাবেই বসে থাকব?”
নবনী নিচু স্বরে বলল, “আসলে অনেকদিন পর আসা তো। তাই আরকি। দিয়াকেও দেখেছেন নিশ্চয়ই? ও এখানে এসে কতটা খুশি! আমার মনে হয় না ও এখন এখান থেকে যেতে চাইবে।”
“ওকে বুঝিয়ে বললে ও ঠিক বুঝবে। কিন্তু আমার কাজের কথাটাও তো ভাবতে হবে।”
নবনী গম্ভীর গলায় বলল, “তাহলে আপনি একাই চলে যান।”
দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। “নবনী, বোঝার চেষ্টা করো। এভাবে পালিয়ে থাকা কোনো সমাধান নয়। আমাকে দুদিনের জন্য এক জায়গায় যেতে হবে। কাজের জায়গায় কিছু সমস্যা হয়েছে। আমি না গেলে ঝামেলা মিটবে না। তোমার কি সত্যিই মনে হয় আমি এখানে লুকিয়ে থাকলে সব আপদ এমনি এমনি কেটে যাবে?”
নবনীর সমস্ত চপলতা নিমেষেই মিলিয়ে গেল। বুকটা অজানা আশঙ্কায় ধক করে উঠল তার। আবার দিব্য বাইরে যাবে? এর চেয়ে আতঙ্কের খবর আর কী হতে পারে! নবনী আমতা আমতা করে বলল,
“আমরা বাড়ি ফিরে যাব। তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আপনার কি বাইরে না গেলেই নয়? অন্য কাউকে পাঠালে হয় না?”
নবনীর উদ্বিগ্ন মুখটার দিকে চেয়ে দিব্যর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। সেই হাসিতে নবনী আরও খানিকটা মুখ ভার করে ফেলল। দিব্য বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে বলল,
“আমি না গেলে আর কে যাবে বলো? তোমার ছোট দেবরের কি এসবে খুব একটা মন আছে? আর আব্বু তো আমাদের বিয়ের আগে থেকেই অফিসের ঝামেলা থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। ছোট চাচ্চু দেখছেন অন্যদিকটা। তাই এই নির্দিষ্ট কাজটা আমারই। আমি ছাড়া বাকিরা এটা বুঝবে না।”
নবনীর কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। সে বুঝতে পারল। দিব্যকে আটকানোর কোনো পথ আর খোলা নেই। দিব্যর হুট করে কিছু একটা মনে পড়তেই নবনীর চুপসে যাওয়া মুখটার দিকে চেয়ে মনের ভেতর দানা বাঁধা হাসিটা অতি কষ্টে সংবরণ করল সে। গলার স্বর কিছুটা রহস্যময় করে বলল,
“আরেকটা কাণ্ড ঘটেছে। জানো?”
নবনী উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী?”
“নিযানা আর কলরবের মধ্যে বোধহয় বড়সড় কোনো ঝগড়া হয়েছে। নিযানা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। আর সেই রাগে আব্বু ভাইকেও বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। কী একটা অবস্থা বলো তো!”
নবনী বিস্মত চোখে তাকালো। “সত্যিই বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন? ভাইয়া এখন কোথায় আছে। কোনো খবর পেয়েছেন?”
“সেটা কি আর আমি এখান থেকে বলতে পারি? ফোন দিয়েছিলাম। সুইচ অফ৷ ফিরে গিয়েই না হয় খোঁজ নেব।”
নবনী মৃদু মাথা নাড়ল। “এখনই বের হবেন? যেতে যেতে তো প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যাবে।”
“অসুবিধা নেই। তুমি দিয়াকে তৈরি করে নিজেও চটপট রেডি হয়ে নাও। আমাদের একটু দ্রুত ফিরতে হবে। কারণ আমাকে হয়তো কাল সকালেই ঢাকার বাইরে বের হতে হবে।”
নবনী আর দ্বিমত করল না। মনটা খচখচ করলেও দ্রুত হাতে দিয়াকে গুছিয়ে নিল সে। উঠোনে দাঁড়িয়ে দিব্য গাড়ির চাবি হাতে অপেক্ষা করছিল। বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নবনী বের হয়ে এলো দিয়াকে নিয়ে৷ গাড়ির কাছে এসেই সে বায়না ধরল,
“মাম্মা, আমি কিন্তু তোমাদের সাথে সামনে বসবো!”
নবনীর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। আলতো করে দিয়ার গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“ওকে, ডান!”
দিব্য ততক্ষণে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসেছে। নবনী দিয়াকে কোলে নিয়ে ওর পাশের সিটটায় বসল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে কিছুটা পথ যাওয়ার পর দিব্য একবার আড়চোখে নবনীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তোমার কষ্ট হচ্ছে না তো?”
নবনী মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করল যে ও ঠিক আছে। শহরের চেনা রাস্তায় যখন ওরা প্রবেশ করল। ততক্ষণে চারিপাশে অন্ধকার বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। দুপুরের সেই কড়া সূর্য অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। এখন রাস্তার দুধারের ল্যাম্পপোস্ট আর বহুতল ভবনগুলোর কৃত্রিম আলোয় চারপাশটা ঝলমল করছে। দিনের বেলার চেনা শহরটাকে রাতে একদম অন্যরকম। মায়াবী মনে হয়। নবনী একমনে জানলার বাইরে তাকিয়ে সেই আলো-আঁধারির খেলা দেখছিল। মাঝে মাঝে দিয়ার টুকটাক কথার উত্তর দিচ্ছিল। মা-মেয়ের এই খুনসুটি আর অনেক অনেক কথার মাঝে দিব্য এক নীরব শ্রোতা হয়ে রইল। তবে এই ওর মন্দ লাগছিল না।
হুট করেই একটা ফুচকার দোকানের সামনে এসে গাড়িটা থামিয়ে দিল দিব্য। আচমকা গাড়ি থামায় নবনী কিছুটা অবাক হয়ে চারপাশটা দেখে নিল। দিব্য গাড়ি থেকে নামতে উদ্যত হলে নবনী কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?”
দিব্য মৃদু হেসে বলল, “নাহ্, চলো ফুচকা খাবে। দিয়া তুমি কী খাবে মাম্মা?”
দিয়া মুখ তুলে বলল, “আমি কোণ আইসক্রিম খাবো!”
দিব্য মাথা নেড়ে সায় দিল। নবনী যেই গাড়ি থেকে নামতে যাবে। দিব্য হাত বাড়িয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি গাড়িতেই বোসো। আমি নিয়ে আসছি। ওখানে বড্ড ভিড়।”
নবনী আর জোরাজুরি না করে গাড়িতেই রয়ে গেল। দিব্য ভিড়ের দিকে এগিয়ে যেতেই নবনীর ঠোঁটের কোণে একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। মানুষটার খেয়াল রাখার ভঙ্গিটা সত্যি অদ্ভুত। সব দিকে কড়া নজর। এই যে ছোট ছোট বিষয়ে ওর প্রতি দিব্যর যত্ন আর গভীর মনোযোগ। এটাই নবনীকে বারবার ওর প্রতি নতুন করে আকর্ষণ করে।কিছুক্ষণ পর দিব্য একটা ওয়ানটাইম প্লেটে ফুচকা নিয়ে এসে নবনীর সামনে ধরল। তারপর অন্য হাত থেকে একটা আইসক্রিম দিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“এই যে। আমার মায়ের কোণ আইসক্রিম!”
দিয়া আইসক্রিম হাতে পেয়েই একগাল হেসে বলল,
“আই লাভ ইউ পাপ্পা।”
এটা দিয়ার একটা অদ্ভুত অভ্যাস। বাকি সবাইকে সে ধন্যবাদ জানালেও দিব্যর ক্ষেত্রে তার অভিব্যক্তিটা সবসময় এমন। সরাসরি ভালোবাসার কথা। কি জানি তার ছোট মনের কোন কোণে কি গভীর ধারণা সাজিয়ে রেখেছে সে। দিব্যরও দিয়ার এই অভ্যাসটা ভীষণ পছন্দ। মনে হয় ওর সমস্ত ক্লান্তি মুছে যায় এই এক কথায়। সে মৃদু হেসে প্রত্যুত্তরে বলল,
“পাপ্পা লাভ ইউ ইনফিনিটি।”
দিয়াকে দিব্যর খালি ড্রাইভিং সিটটায় বসিয়ে দিয়েছে নবনী। দিব্য গাড়ির পাশেই বাইরে দাঁড়িয়ে একটা কোল্ড ড্রিংসের ক্যান হাতে নিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে চুমুক দিচ্ছে। দিয়া আইসক্রিমটা খানিকটা খেয়ে এবার একমনে নবনীর খাওয়া দেখতে শুরু করল। নবনী যখন ফুচকা মুখে দিয়ে ভেতরের টকের স্বাদে চোখমুখ বুঁজে নিচ্ছিল। দিয়ার ছোট মনটাতে একটা কৌতুহল জাগল। ওর মনে হলো এই খাবারটা নিশ্চয়ই খুব সুস্বাদু। তাই টেস্ট করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগল। নবনী ঠিক তখনই মেয়ের উৎসুক দৃষ্টিটা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল,
“দিয়া ও খাবে?”
দিয়া সাথে সাথে মাথা উপর-নিচ নেড়ে তার সম্মতি জানাল। নবনী এবার গাড়ির কাচ দিয়ে বাইরে দিব্যর দিকে চেয়ে বলল,
“শুনুন, দিয়ার জন্যও একটা প্লেট ফুচকা নিয়ে আসুন না।”
দিব্য কথাটা শুনেই চোখমুখ কুঁচকালো। গলায় স্পষ্ট বিরক্তি। সে বলল,
“না, দিয়া ওসব খায় না। তুমি খাচ্ছ। খাও। আর দ্রুত শেষ করো। ফিরতে হবে তো।”
নবনী বলল, “ও খাবে বলছে। নিয়ে আসুন।”
“ও খাবে না। আমি তো বলছি এসব জিনিস ও কখনও খায় না। অভ্যস্ত না।”
নবনী বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি তো বলছি খাবে।”
দিব্য এবার মেয়ের দিকে ফিরে বলল, “আমি বলছি খাবে না। দিয়া তুমি বলো তো। তুমি খাবে না?”
দিয়া কোনো দ্বিধা না করেই চটপট জবাব দিল, “আমি খাব!”
দিব্য অবিশ্বাসের চোখে চাইলো নিজের আদরের মেয়ের দিকে। কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেল। নবনী ঠোঁট টিপে হাসল। তারপর বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলল,
“নাহ। আর অযথা তর্ক না করে। ঝাল ছাড়া একটা প্লেট নিয়ে আসুন। যান।”
দিব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মুহূর্তে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে কোনো লাভ হবে বলে মনে হলো না। অগত্যা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভিড় ঠেলে গিয়ে আরেক প্লেট ফুচকা নিয়ে এল সে। দিয়াকে নিজের কোলে বসিয়ে নিজ হাতে একটা ফুচকা ওর মুখে পুরে দিল। ফুচকার টক আর মশলার স্বাদ জিভে লাগতেই দিয়া মুহূর্তের মধ্যে চোখমুখ কুঁচকে ফেলল। দিব্য ভাবল দিয়ার হয়তো পছন্দ হয়নি। তাই তড়িঘড়ি করে বলল,
“খুব বিচ্ছিরি লাগছে? জোর করে খাওয়ার একদম দরকার নেই সোনা। বের করে দাও।”
দিয়া মাথা নেড়ে না জানাল। বেশ উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“না পাপ্পা। এটা তো খুব টেস্টি! তুমিও একটা খাও না।”
পাশে বসা নবনী হাসছে। দিব্য আড়চোখে নবনীর দিকে একবার বিরক্তিতে তাকাল; অর্থাৎ নবনীর হাসিটা তার মোটেও পছন্দ হচ্ছে না। নবনী অবশ্য সেসবে পাত্তা দিলো না। দিয়া তার ছোট্ট হাত দিয়ে প্লেট থেকে একটা ফুচকা তুলে দিব্যর মুখের সামনে ধরল। দিব্যর মোটেও ইচ্ছা ছিল না। তবু মেয়ের আবদার ফেরাতে না পেরে মুখ বাড়িয়ে সেটা খেয়ে নিল। নবনী উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল দিব্যর প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়। দিয়া জিজ্ঞেস করল,
“পাপ্পা বলো। খুব টেস্টি তাই না?”
দিব্য মাথা নেড়ে সায় দিল, “হ্যাঁ।”
নবনী কিছুটা অবাক হয়েই প্রশ্ন করল, “সত্যিই আপনার ভালো লাগছে?”
“হ্যাঁ, ঝাল ছাড়া মোটামুটি খাওয়া যায় আরকি।”
নবনী শুধু মাথা নাড়ল। মনে মনে তার হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাওয়ার উপক্রম কিন্তু অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে গাম্ভীর্য ধরে রাখল সে। দিয়া প্লেটের প্রায় অর্ধেক ফুচকাই নিজের হাতে দিব্যকে খাওয়াল। আর দিব্যও বিনাবাক্যে মেয়ের কথা মানলো।
কলরবের চিন্তায় অলেখার অস্থিরতা যেন বাঁধ মানছে না। আরশাদ তালুকদারের সঙ্গে একদফা তুমুল ঝগড়া হয়ে গেছে তাঁর। এখন অভিমানে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে অন্য ঘরে খিল দিয়েছেন তিনি। আরশাদ তালুকদারও নিজের সিদ্ধান্তে অটল। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে যা-ই হোক। নিজে থেকে কলরবের কোনো খোঁজ তিনি করবেন না। তবে মনে মনে তিনিও যে বেশ বিপাকে পড়েছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে। আনতাসার সঙ্গে কথা বলার সাহসটুকুও পাচ্ছেন না তিনি। বাড়ির এই গুমোট আবহের মধ্যে মাজহা নিজেও প্রচণ্ড অস্থির হয়ে আছেন। তবে তাঁর অস্থিরতার কারণ ভিন্ন। তাঁর মাথায় অন্য কোনো এক গভীর পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছে। ধীর পায়ে তিনি কায়েফের ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। মাজহা কয়েকবার ধাক্কা দিয়ে গম্ভীর গলায় ডাকলেন,
“কায়েফ দরজা খোল। তোর সাথে আমার জরুরি কথা আছে।”
কায়েফ তখন মেঝের ওপর এলিয়ে বসে ছিল। মদের আস্ত একটা বোতলের অর্ধেকটা ইতিমধ্যেই তার পেটে চলে গেছে। নেশার ঘোর শরীরটাকে আচ্ছন্ন করতে শুরু করেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মায়ের ডাক শুনে সে চমকে উঠল। ভেতরে ভেতরে কিছুটা ঘাবড়ে গেল। তড়িঘড়ি করে গ্লাস আর বোতলটা ঠেলে দিল খাটের নিচে। মাজহার দরজায় করাঘাতের ধরন দেখে সে বুঝতে পারল। আজ কথা না বলে তিনি যাবেন না। দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ভালো করে কুলি করে নিলো। নেশার ঘোরে গলাটা ধরে আসছে। যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজাটা খুলে দিয়ে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“আম্মু কিছু বলবে?”
মাজহা ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র বিরপ্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ফেললেন। একটা উটকো কটু গন্ধ তাঁর নাকে এসে ধাক্কা দিল। এই গন্ধ তাঁর অপরিচিত নয়। কায়েফ ভীষণ আড়ষ্টবোধ করতে লাগল। শেষ রক্ষা যে হলো না। তা মায়ের চোখের চাউনি দেখেই সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। মাজহা অত্যন্ত রাগী দৃষ্টিতে চেয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
“কায়েফ! তুই এসব করছিস?”
কায়েফ টলমল পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। মায়ের দিকে না তাকিয়েই নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
“আমি বড় হয়েছি আম্মু। সব ভালো-মন্দের হিসাব দেওয়ার বয়স এখন আর নেই।”
মাজহা দ্বিগুণ ক্ষোভে ছেলের দিকে এগিয়ে এলেন। তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন,
“বড় হয়েছিস সে তো তোর নমুনা দেখেই বুঝতে পারছি। কিন্তু বড় ভাইয়ের স্ত্রী কিংবা বড় ভাবির প্রতি যে নূন্যতম সম্মান রাখা উচিত। সেই কাণ্ডজ্ঞানটুকুও কি হারিয়ে ফেলেছিস?”
কায়েফ মায়ের কথাগুলোর আগামাথা কিছুই ধরতে পারল না। সে আকাশ থেকে পড়ার মতো অবাক হয়ে বলল,
“এসব তুমি কী বলছ আম্মু? কিসের সম্মান?”
“একদম নাটক করবি না আমার সামনে! একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ কায়েফ। ওই মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। আর এখন যদি কোনো কারণে ওদের ডিভোর্সও হয়ে যায়। তাও আমি ওই মেয়েটাকে তোর বউ হিসেবে কোনোদিন মেনে নেব না। না মানে না!”
মাজহার কথাগুলো কায়েফের কানে তপ্ত তীরের মতো বিঁধলো। এসব যেন তার বোধগম্যের বাইরে। ডিভোর্স হবে মানে কী? সে স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আম্মু তুমি কী বলছ এসব? আর কেনই বা বলছ?”
মাজহা কড়া গলায় বললেন, “সত্যি করে বল তো। কলরব আর নিযানার এই ঝামেলার পেছনে কি তোর কোনো হাত আছে? দেখ কায়েফ…!”
মাজহাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই কায়েফ অবিশ্বাস্য গলায় চিৎকার করে উঠল,
“এসব কী আজেবাজে কথা বলছ তুমি? এসবের মধ্যে আমি আবার কোথা থেকে এলাম?”
মাজহা খানিকটা শান্ত হয়ে বললেন, “না আসলেই আমাদের জন্য ভালো।”
কায়েফ কিছুক্ষণ পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে রইল। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার। আহত গলায় প্রশ্ন করল,
“তুমি আমাকে এতটা অবিশ্বাস করছ আম্মু? তোমার কি সত্যিই মনে হয় আমি এতটা নিচ হতে পারব?”
“অবিশ্বাস করছি না। তবে তোর বর্তমান নমুনা তো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। তোর কতটা অধঃপতন হয়েছে। সেটা এই ঘরের গন্ধই বলে দিচ্ছে। নিজের পতন যখন নিজেই ডেকে আনছিস। তখন তোকে বিশ্বাস করা কী কঠিন হয়ে যায় না?”
কায়েফ একটু চুপ থেকে বলল, “তাহলে আমাকে চলে যেতে দিচ্ছ না কেন? জোর করে এই নরকের মধ্যে আমাকে আটকে রেখেছ কেন তুমি? আমি চলে যাই এ বাড়ি থেকে। আমার পক্ষে এসব আর সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। সকাল হলে ওকে দেখি, খাওয়ার সময় ওকে দেখি, সন্ধ্যায় দেখি তাও আবার অন্য কারো সঙ্গে! কী করব আমি। বলতে পারো?”
ছেলের কথায় মাজহার বুকটা মুচড়ে উঠল। তিনি যে কায়েফকে আটকে রাখতে চান। তা নয়। কিন্তু তাঁর মনে এক গভীর ভয় বাসা বেঁধে আছে। তাঁর দুশ্চিন্তা হয়। চোখের আড়াল হলে কায়েফ নিশ্চয়ই কোনো একটা অঘটন ঘটিয়ে বসবে। হয়তো নিজেকেই শেষ করে দেবে। সেই শোক সইবার শক্তি তাঁর নেই। আবার ছেলের এই তিল তিল করে জ্বলেপুড়ে খাক হওয়াটাও তিনি সহ্য করতে পারছেন না। কী করবেন তার কোনো কুলকিনারা তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। কায়েফ বিরক্তিতে ক্লান্ত গলায় বলল,
“তোমার জেরা শেষ হলে এবার যেতে পারো আম্মু। আমি যখন কথা দিয়েছি তখন সে কথা রাখব। আমি এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না আর ওদের দুজনের মাঝখানেও কখনো আসব না। তুমি আমার জন্মদাত্রী। তোমার জন্য এতকুটু কবুল। সবকিছু মেনে নিয়েছি। শুধু আমাকে একটু সময় দাও। আমি নিজেকে সামলে নেব।”
ছেলের বিধ্বস্ত দশা দেখে মাজহা আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। তিনি ধীর পায়ে বিছানায় কায়েফের পাশে বসলেন। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই মাজহার চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন,
“তুই বিয়ে কর কায়েফ। আমি ভালো মেয়ে দেখছি তোর জন্য।”
কায়েফ নিরেট গলায় বলল, “আপাতত ওসব সম্ভব না।”
“বিয়ে করলে সব ঠিক হয়ে যাবে। নতুন কেউ জীবনে এলে তুই পুরনো সব ভুলে যাবি। তোর সুন্দর একটা সংসার হবে।”
“একটু দয়া করো আমার ওপর। প্লিজ।”
“ওকে ভুলে যেতে চাস। তাহলে করতে বাধা কোথায়?”
“আম্মু দোহাই তোমার! আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।”
ছেলের কাতর কণ্ঠ উপেক্ষা করতে পারলেন না মাজহা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ঠিক আছে। তুই ঘুমা।”
কায়েফ আর কোনো কথা না বলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। মাজহা আরও কিছুক্ষণ ছেলের কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর ঘরের লাইট নিভিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
দিয়া সবেমাত্র ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে। ওর পাশ থেকে সাবধানে উঠে দাঁড়ালো নবনী। দিব্য বাড়ি ফেরার পর থেকেই ল্যাপটপে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। রাতের খাবারটুকু খাওয়ারও অবসর হয়নি তার। নবনী ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালো।
“আপনাকে কি এক কাপ কফি করে দেব?”
দিব্য ল্যাপটপে থেকে চোখ সরিয়ে নবনীর দিকে তাকালো। মাথা নেড়ে নিঃশব্দে জানিয়ে দিল কফির প্রয়োজন নেই। এরপর হুট করেই ল্যাপটপটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো। নবনী ভেবেছিল ওর কাজ শেষ। সে নিজের শোয়ার জন্য পা বাড়ালো। কিন্তু যাওয়া আর হলো না। দিব্য এক ঝটকায় নবনীর হাত ধরে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করালো। দিব্যর এমন হুটহাট আচরণের সাথে নবনী এখন অনেকটাই অভ্যস্ত। তাই সে খুব একটা ঘাবড়ালো না। বরং শান্ত আর কৌতূহলী চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। দিব্য কিছুক্ষণ নবনীর চোখের গভীরতায় নিবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বলল,
“দিয়া বলছিল ওর নাকি একটা খেলার সাথী লাগবে। আমি ওকে কথা দিয়েছি। দেব।”
নবনী আকাশ থেকে পড়ল। আক্ষরীক অর্থ বুঝলো না। অহেতুকই মনেহলো তার। এটা কি এখন বলার মতো কোনো কথা? সে অবাক হয়ে বলল,
“তো দিয়ে দিন। সমস্যা কী?”
“তুমি সাহায্য না করলে আমি একা দেব কীভাবে?”
নবনী ভুরু কুঁচকে তাকালো, “মানে? কী বলছেন আপনি?”
“নবনী, চলো সংসার করি।”
কথাটা শুনেই নবনীর বিরক্তি চরমে পৌঁছাল। মেজাজ খারাপ করা কথা আর কাকে বলে! এতদিন তবে তারা কী করছে? নবনী রাগে গজগজ করতে করতে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“এতদিন তো স্টার জলসার নাটক করছিলাম!”
দিব্য ঠোঁট টিপে একটু হাসল। “স্টার জলসাতেই তো! নয়তো বাস্তবে কার সাধ্য ছিল তোমাকে এতদিন মা হওয়া থেকে বঞ্চিত রাখার?”
নবনীর মনে হলো সে হয়তো ভুল শুনেছে। দিব্য তালুকদারের মতো মানুষের মুখে এমন মন্তব্য যেন অকল্পনীয়। সে বিস্ময় নিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে বলল,
“কী বললেন আপনি?”
দিব্য এবার আরও কিছুটা ঝুঁকে এল। নবনীর নাকের ডগায় নিজের নাকটা ছুঁইয়ে দিল সে। নবনী যেন আক্ষরিক অর্থেই জমে পাথর হয়ে গেল। ওর বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা অবাধ্য হয়ে ধক করে উঠল। দিব্য একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিচু স্বরে বলল,
“যা শুনলেন। ঠিকই শুনেছেন।”
নবনী একবার ওর চোখের দিকে তাকাল। কিন্তু পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো। দিব্যর চাহনি আজ বড় বেশি প্রখর। বড় বেশি অন্যরকম। এমন দৃষ্টিতে সে আগে কখনো দিব্যকে দেখেনি। নবনীর সারা শরীর কাঁপছে। হাতের আঙুলগুলো যেন ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দিব্য আলতো করে নবনীর রক্তিম আর কোমল গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় এক চুমু খেল। নবনী লজ্জায়, আড়ষ্টতায় খামচে ধরল দিব্যর শার্টের কলার। দিব্য একটু সময় নিলো। নিবিড়ভাবে পরখ করল নবনীকে। নবনী মুখটা নিচু করে আছে। লজ্জায় ওর ফর্সা মুখটায় শরতের বিকেলের মতো এক রক্তিমাভ আভা ফুটে উঠেছে। আচমকাই যেন একটা বিদ্যুত্তরঙ্গ খেলে গেল নবনীর শরীরে। সে উপলব্ধি করল। দিব্য তাকে পাজাকোলা করে তুলে নিয়েছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিছানার কোমল চাদরে ওর পিঠ ঠেকলো। নিজের ওপর দিব্যর পৌরুষদীপ্ত ভারী শরীরটার সান্নিধ্য পেতেই নবনী থমকে গেল। ওর এলোমেলো হয়ে কপালে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো দিব্য খুব যত্ন করে কানের পেছনে গুঁজে দিল। নবনী আচমকা দিব্যর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ওর ঠোঁট দুটো কাঁপছে। খুব ক্ষীণ স্বরে বলল,
“আমার… আমার সময় লাগবে।”
দিব্য কিছুটা চমকাল। কথাটা মজা হিসাবেই নিলো। নবনীর চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেঁসে বলল,
“সিরিয়াসলি? ভেবে বলছেন তো ম্যাডাম?”
নবনী মাথা নেড়ে সায় দিল। “আমি একদম সিরিয়াস।”
দিব্য আর কথা বাড়ালো না। ধীরে ঝুঁকে এসে নবনীর ললাটে উষ্ণ ঠোঁট ছোঁয়ালো। আবেশে নবনী চোখ বুজে নিল। দিব্যর চোখের দিকে সোজাসুজি তাকানোর সাহসটুকু পাচ্ছেনা। দিব্য মৃদু স্বরে বলল,
“ওকে।”
নবনী চট করে চাইলো। কথাটা শেষ করেই দিব্য নবনীকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর গ্রীবার ভাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে চোখ বুজলো। সেই সান্নিধ্যে নবনীর ভেতরটা এক অদ্ভুত মায়ায় আর্দ্র হয়ে উঠল। এক চিলতে অপরাধবোধে নিয়ে নবনী খুব ধীরে দিব্যর মাথায় হাত রাখল। কুণ্ঠিত স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
এই অবেলায় পর্ব ৩৩
“স্যরি।”
দিব্য ওর কথার প্রত্যুত্তরে কোনো অভিযোগ করল না। শান্ত গলায় বলল,
“ইট’স ওকে। এবার ঘুমাও।”
“আপনি কি কাল সকালে চলে যাবেন?”
দিব্য অস্পষ্ট গলায় বলল, “হুমমম।”
বাইরের রাতের নিস্তব্ধতার মতো ঘরের ভেতরটাও মৌনতায় ডুবে গেল। নবনী আর কিছু বলল না৷
