আসবো ফিরে আবারো পর্ব ১
সুরভী আক্তার
— ভাইয়া , কি করছেন ? আমি আপনাকে কেনো বিয়ে করবো ? ছেড়ে দিন আমায় ! আমি কবুল বলবো না , বিয়ে করবো না আমি ! আপনার তো ইভা আপুর সাথে বিয়ে হবে ! আপু সেঁজেছিল আপনার জন্য ! আপনি এখানে কি করছেন ? প্লিজ ছেড়ে দিন আমায় , আমি বাড়ি যাবো !
কম্পিত এক ষোড়শী কন্যার গলা । নিজেকে ছাড়াতে ছটফট করছে সেই ষোড়শী কন্যা । তবুও ছাড়াতে পারছে না নিজেকে । মেয়েটার নরম হাত দুটো শক্ত করে চেয়ারের হাতলের সাথে এঁটে বেঁধে রাখা । পা দুটোও একই ভাবে চেয়ারের পায়ার সাথে শক্ত করে বাঁধা ।
ভয়ের তোপে বিন্দু বিন্দু ঘামে চিকচিক করছে মেয়েটার দুধে আলতা মুখশ্রী । নাকের ডগায় মৃদুমন্দ ঘাম জমেছে । লালচে বর্ণ ধারণ করেছে নাকের ডগার সাথে সাথে নেত্র পল্লব । ভয়ে বুক দুরু দুরু মেয়েটার । এতক্ষণ ভয় লাগে নি । এখন সব রাজ্যের ভয় ঘিরে ধরেছে ছোট্ট হৃদয়ে ।
সামনের চেয়ারে সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আছে তেইশ বছর বয়সী #রুডভিক_কাবির_রৌদ্র । ‘কাবির’ পরিবারের ছোট ছেলে । রগচটা স্বভাবের বেপরোয়া , ছন্নছাড়া, বদমেজাজি, রুখো একটা ছেলে । যার কাছে কারোর পরোয়া নেই , সে এই মেয়েটার আর কি পরোয়া করবে ? হাতে উইস্কির বোতল ওর । পরপর অনেক গুলো বোতল খালি করেছে লাস্ট দুই ঘণ্টা ধরে ।
মেয়েটার ভয়ার্ত চিৎকারে বিরক্ত হয়ে নেশালো কন্ঠে বজ্র ধমক দিলো রৌদ্র…
“ চুপ , একদম চুপ ।
আমার উপর উঁচু স্বর পছন্দ নয় আমার । চুপচাপ যা বলছি তাই করবি । তাহলেই ছেড়ে দেবো । এই সাদা ভাল্লুক টা তোকে যা বলতে বলছে , তাই বল । ঝটপট বল …ফাস্ট….
শেষের কথাটা কন্ঠ চিপে দাঁত পিষে বললো ।
ভয়ে শুল্ক ঢোক গিললো সামনের জুব্বা পরিহিত দাঁড়ি ওয়ালা মৌলভি লোকটা । চোখে মুখে তার বিভৎস আতঙ্ক । কপালে তারও ঘাম জমেছে । গলা শুকিয়ে আসছে এই ছেলের ক্ষুব্ধ ভাবমূর্তি দেখে । তিনি ঢোক গিলে কপালের ঘাম মুছলেন । মাথার টুপিটা খুলে পকেটে ঢোকালেন । কম্পিত হাতের কলমটা কাগজে বসিছে থেমে থেমে আবার বললেন গুটিয়ে যাওয়া মেয়েটার উদ্দেশ্যে….
“ ত.. তোমার নামটা আরেকবার বলো মা ।
বানান করে বলবে,কেমন ? বানান ভুল করলে বিয়ে হবে না ।
মেয়েটা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো এবার । হাত পা ছোড়াছুড়ি করার চেষ্টা করে চেঁচিয়ে উঠলো….
“ বলবো না আমি । কিছুতেই বলবো না । বিয়ে করবো না । ছেড়ে দিন আমায় । আমার ব্যাথা লাগছে হাতে । ভাইয়া প্লিজ ছেড়ে দিন । বাড়ি যাবো আমি । আমার দাদু মনি….
হাতের উইস্কির বোতলটা নোংরা ধুলোবালি জমা মেঝেতে ছুড়ে মারলো রৌদ্র । মুহুর্তেই চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো কাঁচের টুকরো । চমকে সিটিয়ে গেলো মেয়েটা । শ্বাস আটকে নিয়ে চুপ হয়ে গেলো ধক্ করে । রৌদ্র হুংকার ছাড়লো..
“ শাট আপ রাবিশ….
যদি আর একবার এসব ফ্যাচ ফ্যাচ করিস না , তাহলে মুখ ভেঙে দেবো তোর । তোকে তুলে এনেছি আমি । এতো সহজে ছাড়ার জন্য নয় । আগে আমার কাজ হবে , তারপর ছাড়বো তোকে । তোকে ছাড়বো , তবে কাবির পরিবারে নিয়ে গিয়ে । বউ হবি তুই কাবির পরিবারের । #রুডভিক_কাবির_রৌদ্রের বউ । বুঝলি , কাবির পরিবারের বেপরোয়া ছেলের বউ হবি তুই ! এই বেপরোয়া ছেলেকে নাকি কেউ বিয়ে করবে না , বলেছে আমার বাপ । তাইতো ঐ রাস্কেল টা ভেগেছে । বাস্টার্ড গার্ল । ওকে তো পরে দেখে নেবো । ছাড়বো না আমি ওকে । আর এখন তোকে ছাড়বো না ।
চুপচাপ বল , বল নাম কি তোর….
মেয়েটা চুপসে গেছে । কান্না চেপে রাখতে না পেরে ফিকড়ে উঠলো ঠোঁট ভেঙে । মৌলভী লোকটা ফের ভয়ে ভয়ে নরম কন্ঠে শুধালেন…
“ বলো মা , নামটা বলো । নয়তো তোমার সাথে সাথে এই ছেলে আমাকেও ছাড়বে না ।
ভয়ার্ত মেয়েটা ঠোঁট উল্টে ছলছল চোখে তাকায় । মৌলভী লোকটার চোখেও অসহায়ত্ব । তাকে তুলে আনা হয়েছে এখানে । ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক এখানে বিয়ের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে । রৌদ্রের দুই বন্ধু রোহান আর সৌভিক রৌদ্রের কথায় এনাকে এখানে তুলে এনেছে । মাগরিবের পর মসজিদ থেকে সবে বেরিয়েছিলেন তিনি । অমনি দুটোয় পাজা কোলা করে এনাকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে এখানে । প্রাণ ভয়ে ভীত তিনি । রৌদ্রের অবস্থা দেখে আরো বেশি কুঁকড়ে গেছেন । এসে থেকেই মেয়েটাকে চেঁচিয়ে গলা ফাটাতে দেখছেন ।
হাত পা বাঁধা ছোট্ট মেয়েটার । মেয়েটাকে দেখেই বয়স আন্দাজ করা যায় । ফুটফুটে সুন্দর চেহারার গড়ন । যে গড়নে আতঙ্ক স্পষ্ট । মায়া লাগে মৌলভী লোকটার । কিন্তু তার হাত বাঁধা উহ্য বাঁধনে । কিচ্ছু করার নেই । রৌদ্রের ক্ষিপ্ত অবস্থা দেখে গলা শুকিয়ে আসছে । নেশার ঘোরে টলছে রৌদ্র । চোখ বিভৎস লাল । ভেজা বোধহয় । চোয়াল শক্ত মাত্রাতিরিক্ত । শ্যামলা চেহারা আরো বেশি তামাটে হয়ে গেছে । ক্ষোভের দরুন ফুলে উঠেছে কপালের শিরা উপশিরা ।
পাশ থেকে আরো একটা উইস্কির বোতল তুলে নিলো রৌদ্র । ছিপি খুলে চুমুক বসালো বোতলের মুখে । তপ্ত চোখ নিভে আসছে । বহুত নেশা করেছে আজ । বেহিসেবি এলকোহল পেটে পড়লে নেশা হওয়ারই কথা । বর বেশ রৌদ্রের শরীরে । আজ তার বিয়ে ছিলো !
পরের চুমুকে ঢকঢকে অর্ধ বোতল খালি করলো সে । এক মুহুর্ত অপেক্ষা হলো না , চেয়ারের হাতলে শক্ত বাড়ি মেরে ভাঙলো কাঁচের বোতলটা । ভয়ে আতঙ্কে চোখ মুখ খিচে চেঁচিয়ে উঠলো ষোড়শী কন্যা । এক টুকরো কাঁচ ছুটে গিয়ে গেড়ে বসলো কপালের পাশে ডান ভ্রুর উপর । নিমিষেই ফিনকি দিয়ে রক্ত গলিয়ে বেরোলো । আহ্ সূচক আর্তনাদে বাঁধা হাত পা খিচে কুকিয়ে উঠলো মেয়েটা । রৌদ্র ভ্রুক্ষেপ দেখালো না । তেড়ে গিয়ে ভাঙ্গা কাঁচের বোতলটা চেপে ধরলো মৌলভী লোকটার গলার নিকট । অন্য হাতে ঘাড় চেপে ধরলো লোকটার । তড়তড় করে কেঁপে উঠলেন লোকটা ।
দাঁত খিচে হুংকার ছাড়লো রৌদ্র..
“ এইই ,,,
নাম বল । কি নাম তোর ? যদি না বলিস , তাহলে এই বুড়ো টাকে মেরে দেবো আমি । আর তার পর তোকে । যদি কাজে না আসিস , তাহলে রেখে কি করবো তোকে ? আর এই উইটনেস , একে রেখেই বা কি করবো ? রোহান , কিল হিম….
লোকটাকে ছুড়ে মারলো রৌদ্র । অতঃপর মাথা চেপে ধরলো নিজের । ভয়ে আতঙ্কে ছোট্ট মেয়েটা ডুকরে উঠলো ব্যাথা নিয়ে….
“ না,, কিচ্ছু করবেন না ওনার ।
আমি নাম বলছি , যা বলবেন তাই করছি ।
তবুও ছেড়ে দিন ..
ফিচেল হাসলো রৌদ্র । মৌলভী লোকটাকে সৌভিক তুলে বসালো । বড় বড় শ্বাস ফেললেন লোকটা । মেয়েটা থামলো । কেঁপে কেঁপে বললো….
“ এরপরে আমাকে ছেড়ে দেবেন তো ? বাড়ি যাবো আমি…
রৌদ্রের শরীর দুলে ওঠে ।
“ দেবো ।
আশ্বাস পেয়ে মেয়েটা মিনমিনে গলায় নাম উচ্চারণ করে….
“ আ..আমার নাম, ম..মেঘা ।
“ পুরো নাম বল ।
“ #ইভারা_তাসনিম_মেঘা !
মৌলভী কম্পিত হাতে কাঁপতে কাঁপতে কাগজে বিবাহ পত্র লিখলেন । রৌদ্র ঘাড় ডলছে বারবার । চোখ নিভে আসছে । সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে নেশার প্রভাব বিস্তার হতেই । রোহান একবার আড়চোখে তাকালো সৌভিকের দিকে । রৌদ্র আজ প্রচুর এলকোহল খেয়েছে । ওরা বারন করতেও সাহস পায় নি । কারন আজ এখানে যা হচ্ছে , সবটার পেছনে ওরাই দায়ি । ওদের দেওয়া তাড়নার জন্য রৌদ্রের বেপরোয়া পনা বেড়েছে আজ ।
এই পুঁচকে মেয়েটাকে তুলে এনে বিয়ের জন্য ফোর্স করছে রুডভিক কাবির রৌদ্র । সবটাই সৌভিক আর রোহানের দেওয়া উটকো ডেয়ারের ফল এসব । পরিস্থিতি বিগড়ে গেছে । আর সামলানো সম্ভব নয় । রৌদ্রকে থামানো সম্ভব নয় এই মুহুর্তে । থামানো গেলে এই অবধি জল গড়াতো না । ভ্রু নাচালো সৌভিক ।
নেশার টাল সামলাতে না পেরে পিছনের দিকে পিছিয়ে ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেলো রৌদ্র । অমনি ধক্ করে উঠে ছুটে গেলো দুই বন্ধু । রোহান বিচলিত হয়ে বললো….
“ রুডি , ব্রো ? আর ইউ ওকে ?
রৌদ্র ঝটকা মেরে দূরে সরালো রোহান কে ।
“ ডোন্ট টাচ মি….
দূরে সর । ঐ সাদা বেয়ার টাকে ফাস্ট হাত চালাতে বল…
সময় নেই আমার হাতে !
মৌলভী কেঁপে কেঁপে দ্রুত হাত চালালেন ।
মেঘা কাঁপছে তিরতির করে । কপালের কাছটায় চিনচিনে ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে । রক্ত গড়িয়ে পড়েছে চোখের কার্নিশ বেয়ে । চোখে ঝাপসা দেখছে মেয়েটা । রৌদ্রকে এই মুহূর্তে ক্ষ্যাপাটে কোনো পাগলের থেকে কম কিছু লাগছে না । মেঘা কোথায় ওকে ভালো ভেবে ভাব জমাতে গেলো , আর এই উগ্র লোকটা এখানে তুলে আনলো ওকে । ঠোঁট কামড়ে ফিকড়ে ফিকড়ে উঠছে মেঘা । বাঁধা হাত কচলাচ্ছে । মৌলভী লোকটা একটু থেমে বললেন….
” কাবিন নামায় দেনমোহর উল্লেখ করতে হয় । কত উল্লেখ করবো বাবা ?
রৌদ্র বুঝলো না নেশার ঘোরে । অস্পষ্টে বললো…
” দেনমোহর কি ?
” এটা স্ত্রীর সম্মান সূচক অধিকার । বিয়েতে দেনমোহর দিতে হয় !
” কত দিতে হয় ?
” সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে হয় ।
” মদ গেলার টাকা পাই না ! আমার আবার সামর্থ্য !
বলেই শেরোয়ানির পকেটে হাত ঢোকালো । পকেট ফাঁকা । কিছুই নেই ওর কাছে । দুলতে দুলতে মাথা ঝাঁকায় রৌদ্র । সামন পকেটের পাশে একটা ফ্লাওয়ার পিন লাগানো । স্বর্নের তা । ছেলেদের স্বর্ণ পড়তে নেই । রৌদ্রের মা এটা শেরোয়ানিতে লাগিয়ে দিয়েছেন তাই । রৌদ্র হেঁচকা টানে সেটা খুললো । বাড়িয়ে দিয়ে বললো….
” এটা দিয়ে দিন ।
শেষমেষ দু’জনের সাক্ষ নিয়ে কাগজে কলমে কাবিন নামায় বিয়ের সাক্ষরিত হলো । দুটো সাইন হওয়ার পর পর
মৌলভী লোকটা প্রাণভয়ে পালালেন সবটা শেষ করে । রৌদ্র ইশারা করতেই মেঘার হাতের বাঁধন খুলে দিলো সৌভিক । অমনি প্রাণ ফিরে পেলো মেঘা । উঠে দাঁড়ালো । রৌদ্র কে নিজের দিকে টলতে টলতে এগোতে দেখে কয়েক কদম পেছালো মেয়েটা । ছাড়া পেয়েছে এবার , কয়েক ধাপ পিছিয়ে পথ ফাঁকা পেয়ে দ্রুত পিছু ফিরে ছুটতে উদ্যত হলো ষোড়শী কন্যা । অমনি হেঁচকা টান পড়লো মাথার লম্বা হাঁটু সমান বিনুনি টায় । থমকে গেলো ছটফটে উদ্যত পা যুগল । ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো মেঘা । রৌদ্র বিনুনি টা হাতে পেঁচিয়ে ঝটকা মেরে মেঘার ছোট্ট দেহটাকে টান মেরে এনে ফেললো নিজের বুকের উপর । ছোট্ট ষোড়শী কন্যার চুলির মুঠি শক্ত করে চেপে ধরলো । চোখ মুখ খিচে হাত ছুঁড়ে কুকিয়ে উঠলো মেঘা । রৌদ্র নিভু চোখে মেয়েটার ব্যাথাতুর মুখপানে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে হিসহিসিয়ে…..
“ কোথায় পালাচ্ছিস স্টুপিড গার্ল ?
“ ভাইয়া ছেড়ে দিন প্লিজ , লাগছে আমার । আপনি বলেছিলেন আপনি আমাকে বাড়িতে যেতে দেবেন ।
“ দেবো তো , তবে সেটা কাবির ম্যানসনে ।
এখন আমার সাথে যাবি তুই । আমার সাথে । চল ….
আমার বাড়িতে আমাকে বাঁধার জন্য বউ প্রয়োজন । হয়েছিস তুই আমার বউ । এইতো তুই আমাকে বিয়ে করলি । এবার চল , আমার বাপকে গিয়ে তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেই । দেখাই , তার রিকলেস ছেলেকে কেউ একজন বিয়ে করেছে । একটা ভেগেছে তো কি হয়েছে , আর একটা তো জুটেছে । তুই জুটেছিস । নিজে এসেছিস আমার কাছে । আর ছাড়ছি না তোকে । লেটস গো ওয়াইফি…
চুলির মুঠি ছেড়ে হাত ধরে টানতে গেলে ঝাড়া মেরে রৌদ্রের হাত ছাড়ালো মেঘা । সর্বশক্তি দিয়ে গলা চিরে চিৎকার করলো এক পর্যায়ে….
“ ইউ বিস্ট , যাবো না আমি আপনার সাথে । আপনি খুব খারাপ । আমি বাড়ি যাবো । আমার দাদু মনি অসুস্থ । চিন্তা করবে আমার জন্য , যেতে দিন আমায়….
রৌদ্র তেঁতে ওঠে । ঘাড় ডলে আবারো । ঘাড় ঝুঁকিয়ে এবার চেপে ধরে মেয়েটার নরম চোয়াল ।
“ রিজেকশন,, ? আমাকে ? আই হেইট ইট । আই হেইট রিজেকশন…
চোয়াল ছাড়তেই মেঘা কিড়মিড়িয়ে ওঠে ক্ষোভের বশে । এতক্ষণের তৈরি করে জমানো ভয় এক ঝটকায় উপড়ে ফেলে । খিচে ফেলে চোখ মুখ । ঝাপসা চোখে জলন্ত আগুনের ঝিলিক বয়ে যায় ।
রৌদ্রের লম্বাটে চেহারার তুলনায় ওর ছোট্ট চেহারা খানা নগন্য । মেঘা শূন্য মস্তিষ্কে দুহাতে শেরোয়ানির কলার টেনে ধরলো রৌদ্রের । বৃদ্ধা আঙ্গুলে ভর করে শরীর উঁচিয়ে আকস্মিক দাঁত চেপে ধরলো রৌদ্রের গলার নিকট । দাঁত বসিয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ দিলো সেখানটায় । নেশায় টাল রৌদ্র চোখ খিচলো , কপালের শিরা উপশিরা ফুলে উঠলো দপ করে । রোহান আর সৌভিক ছুটে আসতে গেলে হাত উঁচিয়ে বাঁধা দিলো রৌদ্র ।
নিজেই কিড়মিড়িয়ে ঝটকা মেরে ছিটকে ফেললো মেয়েটাকে ।
দু কদম পেছাতেই সৌভিক সামলে নিলো মেঘা কে । রৌদ্র গলায় হাত বসায় । চিনচিন করে ওঠে গন্ডদেশ ।
তড়তড় করে ক্ষুব্ধতা বাড়ে রৌদ্রের । তেড়ে গিয়ে কিছু না ভেবেই সজোরে একটা থাপ্পর বসায় মেঘার গালে । মাথা চড়কে ওঠে মেঘার । চক্কর দিয়ে ওঠে আশপাশ । থাপ্পড়ের টাল সামলে ওঠার আগেই ওর গলা চিপে ধরলো রৌদ্র । খড়খড়ে শক্ত হাতের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেপে ধরল চিকন মেয়েলি গ্রীবা । দাঁত খিচুনি দিয়ে উঠলো….
” স্পর্ধা দেখাস আমায় ? এই টুকু একটা মেয়ে , আমাকে আঘাত করিস ?
মুহুর্তেই শ্বাস রোধ হয়ে আসলো মেঘার ।
রৌদ্র কে রোধের চেষ্টা করে বিফল হলো । চোখ উল্টে আসলো মুখশ্রী বিবর্ন হয়ে । ফর্সা ধবধবে চেহারা রক্তিম বর্ন ধারন করলো । এবার বাড়াবাড়ির মাত্রা বেড়েছে । সৌভিক আর রোহান থামালো রৌদ্র কে । টেনে টুনে ওকে দূরে সরালো মেঘার থেকে । সব রাগ, ক্ষুব্ধতা এই মেয়েটার উপর নিংড়ে ঝাড়ছে রৌদ্র । মেঘা কাঁপছে । ছাড়া পেতেই জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো ও ।
হিসহিসিয়ে উঠলো রৌদ্র । আবার তেড়ে আসতে চাইলো । ওকে ধরে বেঁধে আটকালো সৌভিক ।
” আরে ভাই , পাগল হয়ে গেছিস তুই ? অনেক হয়েছে । এই মেয়েটার উপর উঠে পড়ে লেগেছিস কেনো তুই ? অন্যের ঘরের মেয়ে , চিনিস না জানিস না ফোর্স করে যা করেছিস এনাফ হয়েছে । রাগের মাথায় ভুলভাল কিছু করতে যাস না । এক্ষুনি যদি কিছু হয়ে যেতো ওর….
মেঘার শরীর অবস হয়ে আসে । থাপ্পরের পর পাঁচ আঙুলের স্পষ্ট দাগ পড়েছে ফর্সা গালে । উন্মুক্ত গলায় কালচে আঙ্গুলের ছাপ । উল্টানো চোখ জোড়া স্বাভাবিক হওয়ার আগেই ধীরে ধীরে নিভে আসে ওর । রুদ্ধ শ্বাস জোরালো হয়ে আসে ! বুকে আটকায় নিঃশ্বাস । সৌভিক ওকে ধরে রাখার মাঝেই টলে পড়লো মেয়েটা । লুটিয়ে পড়লো সৌভিকের হাত ছাড়িয়ে । লুটিয়ে পড়ে সম্পুর্ন জ্ঞান খোয়ানোর আগে বিড়বিড় করলো….
” ভাইয়া ……
রাত দশটা । বিলাসবহুল কাবির ম্যানসন । পুরো বাড়ি নানান ফেইরি লাইটের আলোয় ঝকঝক করছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত । বউ বরন ছিলো যে আজ ! এখন দপ করে নিভে গেছে সব আলো । অন্ধকার নেমে এসেছে অফ হোয়াইট রঙের দেয়াল গুলোতে । বাড়ির ভেতরটা গুমোট । স্তব্ধতার রেশ পুরো বাড়িতে । ড্রইং রুমে চুপচাপ বসে আছেন বাড়ির সকলে । তোফায়েল কাবির , তৌসিফ কাবির , দুই ভাই পাশাপাশি মুখ ভার করে বসে । মুখ বিভৎস নিরেট উভয়ের । ক্ষুব্ধতা স্পষ্ট তোফায়েল কাবিরের চেহারায় । মাথায় আগুন জ্বলছে এখনো ।
রুবিনা কাবির জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বামীর পেছনে । মুখ খোলার মতো ক্ষিণ সাহস টুকুও কুলাচ্ছে না ভদ্রমহিলার ।
তোফায়েল কাবির বরাবর গম্ভীর, তপ্ত মেজাজি । রাগেন না তেমন , তবে রেগে গেলে সহজে দমেন না । সিঁড়ির নিচে বড় একটা ল্যাগেজ । রুবিনা কাবির সেটার দিকে একপলক তাকালেন , দৃষ্টি ফিরিয়ে সাহস জুগিয়ে নিভু স্বরে মুখ খুললেন ধৈর্য হারিয়ে….
” শুনুন না, দেখুন , একটু মাথা ঠান্ডা করুন ।
এভাবে রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নেবেন না । শান্ত হোন আগে । ছেলেটার খোঁজ নিন একটু । রাগের মাথায় ও নিজেও বেরিয়ে গেছে । যদি ভুলভাল কিছু……
” চুপ করো । কচি খোকা নয় তোমার ছেলে ।
ভুলভাল করার মতো কি করবে পেট পুরে নেশা করা ছাড়া ? আর তুমি শান্ত হতে বলছো আমায় , শান্ত হবো ? আর কতো ? অনেক হয়েছে , অনেক সহ্য করেছি বেপরোয়া ছেলের বেপরোয়া পনা । আমাদের স্ট্যাটাস,মান সন্মান, সব খোয়া গেছে তোমার ঐ ছেলের জন্য । যেটুকু বাকি ছিলো , আজ সেটুকুও জলে ভাসিয়ে দিয়েছে ও ছেলে ।
বাড়িতে তো আরো দুটো ছেলে আছে , তারা তো ওর বড় । তারা তো অমন হয় নি । ও কেনো বেপথে পা বাড়ালো ? আজ সবকিছুর লিমিট ক্রস করে গেছে । আজ আর ছাড় পাবে না ও…
দুই ভাইয়ের মধ্যে তোফায়েল কাবির ছোট । বড় ভাই তৌসিফ কাবির । তিনি ছোট ভাইয়ের তুলনায় যথেষ্ট ঠান্ডা । তোফায়েল কাবির রগচটা একটু । তৌসিফ কাবির ভাইয়ের রাগ বুঝে ঠান্ডা স্বরে বললেন….
” হয়েছে । এবার একটু শান্ত হ । রৌদ্র কেমন সেটা কারোর অজানা নয় । আর আজ যা হয়েছে , তাতে রৌদ্রের এমনটা করা আমাদের কাছে অস্বাভাবিক হলেও ওর কাছে অস্বাভাবিক নয় । বিয়ে বাড়িতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ঘটেছে , এতে ইভার কান্ডও যথেষ্ট দায়ি । ও না পালালে এর কিছুই হতো না । বিয়ের সিদ্ধান্তটা তো আগে থেকেই নেওয়া হয়েছিল , ইভার মতামত ও নেওয়া হয়েছিল । ওকে তো জোর করা হয় নি বিয়েতে । তাহলে এমন উপস্থিত সময়ে বিয়ে ছেড়ে কাউকে না জানিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মানে কি ? শুরুতেই বাঁধ সাধলে এমন কিছুই হতো না এখন ।
” হতো না বলছো ভাইজান ?
তখন শুরুতেই বাঁধ সাধলে আরো বেশি অঘটন ঘটিয়ে বসতো ঐ ছেলে । না জানি তখন কি করতো । বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কার জন্য ? ওর জন্যই তো ! ও নিজেই তো পাগল হয়ে গেছিলো ইভাকে বিয়ে করতে ।
ভাইয়ের ক্ষুব্ধ মুখশ্রী থেকে চোখ সরিয়ে রুবিনা কাবিরের দিকে তাকালেন তৌসিফ কাবির । শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলেন…
” আদ্র কোথায় ?
” ঘরে ।
” ওকে ডাকো ।
রৌদ্রের একটা খোঁজ নিতে বলো এখন ।
তার কথার মাঝেই সদর দরজার দিকে আগমন ঘটলো এ বাড়ির ছোট ছেলে রুডভিক কাবির রৌদ্রের । নেশাগ্রস্ত অবস্থায় এলোমেলো পায়ে টলতে টলতে ভেতরে ঢুকলো সে । সাথে সৌভিক আর রোহান । সৌভিকের কোলে জ্ঞান হীন একখানা রমনী । ড্রইং রুমের সবাই চকিতে তাকালো দরজার দিকে । রৌদ্র ভেতরে পা রেখেই চেঁচিয়ে ডাকলো নেশার টালে…..
” তোফায়েল কাবির , কোথায় আপনি ? দেখে যান । এসেছি আমি , এসেছে আপনার বেপরোয়া ছেলে । দেখে যান , সে একা আসে নি । বউ নিয়ে এসেছে …
রুবিনা কাবির ছেলের টালমাটাল অবস্থা দেখে ছুটে গেলেন ।
” রৌদ্র , বাবা, এসেছিস তুই ? একি অবস্থা করেছিস নিজের ?
” ওও মম , আমার এই অবস্থা আজ প্রথম দেখছো নাকি ?
ডাকো তোমার স্বামী কে , তিনি দেখুক এসে । আমি বিয়ে করেছি , বউ এনেছি , আমাকে নাকি কেউ বিয়ে করবে না । এই দেখো , এই মেয়ে টা বিয়ে করেছে আমায় । কোথায় তোমার স্বামী …
বলতে বলতে তোফায়েল কাবিরের দিকে চোখ ফেললো রৌদ্র । হাসলো , মাকে ছাড়িয়ে দুই কদম এগিয়ে বললো…
” এইতো , এই দেখুন মি. তোফায়েল কাবির । আপনার বউমা এসেছে । এ বাড়ির ছোট বউ এসেছে । ওয়েল কাম করুন ওকে…
এবার সবাই তাকালো সৌভিকের কোলের নেতিয়ে পড়া মেয়েটার দিকে । অমনি বৃহৎ হয়ে আসলো সবার চাহনি । উঠে দাঁড়ালেন দুই ভাই । তড়তড়ে মেজাজ আরো বেশি বিগড়ে গেলো তোফায়েল কাবিরের । উচ্চস্বরে ধমকে উঠলেন তিনি….
” অসভ্য ছেলে , মদ খেয়ে মাতলামো করছো বাপের সামনে ? কে এই মেয়েটা , কাকে তুলে এনেছো তুমি ?
” ও অন্য কোনো মেয়ে নয় । ওওও আমার বউ । তুলে আনিনি , বিয়ে করে এনেছি ওকে ।
বাজ পড়ল কাবির পরিবারের বেপরোয়া ছেলের কথায় । বাড়ির অন্য দুই ছেলে আদ্র আর শুভ্র নিচে নামলো সিঁড়ি বেয়ে । চমকে সৌভিকের কোলের মেয়েটার দিকে তাকালো সকলে । দাঁত খিচুনি দিলেন তোফায়েল কাবির । হাত মুঠো করে রাগ সংবরণ করলেন । তৌসিফ কাবির বললেন খানিক রাগ প্রকাশ করে….
” রৌদ্র , এসব কি বলছো ? মাথা ঠিক আছে তোমার ?
নেশার ঘোরে ভুলভাল বকছো । কে এই মেয়েটা ?
” ভুলভাল বকছি না বাবাই ।
নেশার ঘোরে নেই আমি । নেশা হয় না আমার । আমি বিয়ে করেছি । ও আমার বউ !
মুখ খিচে তেড়ে গেলেন তোফায়েল কাবির । এই ছেলে ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে বারংবার । কোথা থেকে কোন মেয়েকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে কে জানে ? স্বামী কে তেড়ে আসতে দেখে ছেলের সামনে ছেলেকে আড়াল করে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন রুবিনা কাবির ।
” কি করছেন টা কি ?
শান্ত হন , আগে শুনুন ওর কথা ।
” সরে দাঁড়াও মম , কি করবেন উনি আমার ? মারবেন ? মেরেছেন তো , সবার সামনে থাপ্পর মেরেছেন আমায় । রুডভিক কাবির রৌদ্রের গায়ে তুলেছেন ইনি । আর কি বাকি আছে করার ?
” চুপ, বেয়াদব ছেলে ।
রুবিনা , তোমার ছেলেকে আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে বারন করো । ওর নেশা ছোটাবো আমি ! বলতে বলো কে এই মেয়েটা ? কার মেয়েকে এই অবস্থায় তুলে এনেছে ও !
রৌদ্র কেবলই গা দুলিয়ে হাসলো ।
আদ্র ঠোঁট ভিজিয়ে এগিয়ে যায় । ভাইকে টেনে ধরে নিজের দিকে । রৌদ্র আর আদ্র দুই ভাই , জমজ । আদ্র, পুরো নাম #আদ্রিয়ান_কাবির_আদ্র । তেইশ সেকেন্ডের বড় ওরা একজন আরেকজনের থেকে । এক মায়ের গর্ভে একই সাথে জন্মালেও দুই ভাই সম্পুর্ন ভিন্ন । একে অপরের বিপরীত । আদ্র যথেষ্ট শান্ত স্বভাবের । আর রৌদ্র অশান্ত,নির্ভিক । চেহারাতেও বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য ওদের ।
আদ্র রৌদ্র কে টেনে বললো….
” রুডি , সিরিয়াস মোমেন্টে হেয়ালি করবি না একদম !
আজ যা ঘটিয়েছিস তাতে আব্বু এমনিতেই রেগে আছে । আর রাগাস না আব্বু কে । প্লিজ বি সিরিয়াস । কে ও ? ওর এই অবস্থা কেনো ?
” ওকে মেরেছি । স্টুপিড এক থাপ্পড়ে জ্ঞান হারিয়েছে । এই নাকি ও রুডভিক কাবির রৌদ্রের বউ ? হাহহহহ…
” আদ্র , তোমার ভাইকে দূরে সরাও আমার চোখের সামনে থেকে । আমি কিন্তু আবার ওর গায়ে হাত তুলে বসবো , কন্টোললেস হতে বাধ্য করো না আমায় । ওকে এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে বলো আমার চোখের সামনে থেকে । এ বাড়িতে ওর আর কোনো জায়গা নেই । এমন উশৃঙ্খল ছেলের কোনো জায়গা নেই আমার বাড়িতে ।
বাপের কথায় গলা চিপে বললো রৌদ্র….
” উশৃঙ্খল ? আমি উশৃঙ্খল ? এই উশৃঙ্খল ছেলেকেই তো শৃঙ্খলে আনতে চেয়েছিলেন ? বিয়ে , বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ! বউ এনে আমাকে ঘরে বাঁধতে চেয়েছিলেন । এই নিন বউ । আপনার উশৃঙ্খল ছেলের বউ । বিয়ে করেছি আমি ওকে । জোর করে বিয়ে করেছি । শুনে রাখুন , ওকে বিয়ে করেছি আমি ।
তোফায়েল কাবিরের সংযত হওয়ার শক্তি কমে আসে । সৌভিকের দিকে রগরগে দৃষ্টিপাত করেন তিনি । এরাই তো এই রুখো ছেলের সঙ্গের সাথী । তোফায়েল কাবিরের অমন দৃষ্টিতে ঝট করে চোখ নামায় সৌভিক । গলা ভিজিয়ে মিনমিন করে বলে প্রশ্ন করার আগেই…
” রৌদ্র যা বলছে , একদম ঠিক বলছে আঙ্কেল । ও এই মেয়েটাকে বিয়ে করেছে ।
ফোঁস করে উঠলেন তোফায়েল কাবির । মুহুর্ত বিলম্ব করলেন না আর । সিঁড়ির নিচ থেকে ল্যাগেজ টা নিয়ে আসলেন গটগট পায়ে । প্রথমত সেটা ছুড়ে মারলেন সদর দরজার বাইরে । অতঃপর নেশাখোর ছেলের দিকে এগিয়ে আসলেন । রুবিনা কাবির আর আদ্রকে উপেক্ষা করে কলার ধরে হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন রৌদ্র কে । নেশার ভারে রৌদ্রের শক্তি দূর্বল হয়ে এসেছে । শরীরে সার নেই বিন্দুমাত্র মাত্র । কেউ বাঁধা প্রয়োগের আগেই ছেলেকে বাড়ির বাইরে ছুড়ে মারলেন তিনি । গজগজিয়ে উঠলো রৌদ্র । আব্বুর উপর ঔদ্ধত্য হওয়ার ক্ষমতা থাকলেও সেই মানসিকতা নেই ওর । পারলো না উদ্যত হতে । পিছিয়ে গেলো হাত মুঠো করে । হুংকার ছাড়লেন তোফায়েল কাবির…..
” আজ থেকে এ বাড়ির দরজা পুরোপুরি বন্ধ তোমার জন্য ! বেরিয়ে যাও । এমন ছেলের কোনো প্রয়োজন নেই আমার । আজ থেকে আমার একটা ছেলে আর একটা মেয়ে । দুটো সন্তানের বাবা আমি । আমার আর কোনো সন্তান নেই । আর কোনো সন্তান ছিলো , এটা ভুলে যাবো আমি । আমার কাছে আজ থেকে মৃত তুমি….
ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে মুখে যা আসলো তাই বলে ফেললেন তিনি । রৌদ্র নির্বিকার । রুবিনা কাবির মুখে হাত রেখে চেঁচিয়ে উঠলেন….
” কিসব বলছেন আপনি ?
” চুপ করো তুমি ।
আমাকে রুখতে আসবে না আজ কেউ । যদি আসো , তাহলে আরো কঠিন ডিসিশন নিতে বাধ্য হবো আমি । হয় আজ এই বদমাইশ ছেলে এই বাড়ি থেকে বেরোবে , নয়তো আমি ।
বলেই গজগজ করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন তিনি । আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ দিলেন না । উনি রেগে আছেন , রাগ কমলে সবটা ভুলে যাবেন । তৌসিফ কাবির শান্ত মস্তিষ্কে ধীর শ্বাস ফেললেন । বললেন…
” রৌদ্র , ভেতরে এসো ….
রৌদ্র শুনলো না । ঝাড়া কন্ঠে বলল….
” সৌভিক , ঐ ডাস্টবিন টাকে ছুড়ে মার এদের মুখে । ওরা থাকুক ওদের ছেলের বউকে নিয়ে । ছেলে নেই, আর থাকবেও না । চলে আয় । আজ থেকে আমি মৃত সবার কাছে । এই বাড়ির ছোট ছেলে মৃত । এই বাড়িতে আর ফিরবো না আমি ।
সৌভিক মেঘা কে সোফায় শোয়ালো ।
রৌদ্র কে কেউ থামালো না আর ।
শুভ্র থামাতে গেলে বারন করলেন তৌসিফ কাবির । এই মুহূর্তে বাপ ছেলে দুজনেই চটে আছে । রৌদ্র আপাতত বাড়ির বাইরে থাকুক দুদিন । মাথা ঠান্ডা হলে আবার ফিরে আসবে আপনা আপনি ।
এমনিতেও মাঝে মাঝে বেশি বাড়াবাড়ি করলে নিজে থেকেই বাড়িতে ফেরে না রৌদ্র । সৌভিকের এপার্টমেন্টে থাকে দিনের পর দিন ।
ছেলে যাওয়া মাত্রই রুবিনা কাবির মুখ চেপে কেঁদে উঠলেন । এই ছেলেটার কপালে কি আছে ? কেনো বুঝতে চায় না ও ? এখন না জানি নতুন কোন বিপত্তি বাঁধালো ? চেনা নেই জানা নেই এই মেয়েটা কে বিয়ের নামে কোন মোড়ে এনে দাঁড় করালো এই ছেলে ।
সোফার উপর মেঘার নিস্পন্দ দেহ খানা পড়ে আছে । কপালের কাছে রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধেছে ইতোমধ্যে ।
আদ্র আর শুভ্র একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো মলিন মুখে । শাহিনা কাবির চুপ ছিলেন এতোক্ষণ । এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত এ বাড়ির সবাই । তবে আজ ঝামেলা বেড়েছে । তিনি বিচলিত হয়ে ছুটে গেলেন মেঘার দিকে । মেয়েটার উপর কেউই ধ্যান দিচ্ছে না ।
মেয়েটার মুখশ্রী দেখে ভড়কান শাহিনা কাবির । গালে স্পষ্ট পাঁচ আঙুলের দাগ । কপাল কেটে রক্ত ঝমাট বেঁধেছে ।
কে এই মেয়ে ? কি তার পরিচয় ?
