Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৪০

এই অবেলায় পর্ব ৪০

এই অবেলায় পর্ব ৪০
সুমনা সাথী

নিযানা কেবিনে ঢুকতেই কক্ষের ভেতরের হট্টগোল এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। তিনজনেই যেন হুট করে বোবা হয়ে গেল। নিযানা থমথমে মুখে একবার শান্ত আর অভিকের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল। তারপর বিছানায় শুয়ে থাকা কলরবের দিকে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,
“কাব্য ভাইয়া অলরেডি বাসার উদ্দেশ্যে চলে গেছে। তবে উনি অন-ডিউটি আরেকজন ডাক্তারকে বলে গেছেন। উনি একটু পরেই এসে তোমাকে দেখে যাবেন।”
কলরব নিযানার পানে চেয়ে বলল, “তুই এদিকে আয়। এসে বোস।”
নিযানা ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আগের মতো করেই পাশের চেয়ারটায় বসল। নিযানা বসতেই কলরব শান্ত আর অভিকের দিকে ফিরে ধমক দিয়ে বলল,
“আর তোরা দুটো এখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার চাঁদের মতো মুখটা কী দেখছিস হ্যাঁ? বের হ তোরা এখান থেকে। দূর হ!”

বিনা দোষে ধমক খেয়ে শান্ত আর অভিক কয়েকবার অবাক নয়নে কলরবের দিকে তাকাল। মনে মনে এক গাদা গালি আর বিড়বিড় করতে করতে ওরা দুজনে হন্তদন্ত হয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। ওদের দেখে নিযানার ভেতরে ভেতরে খুব হাসি পেল। এই ছেলেটা মরতে মরতেও নিজের স্বভাব বদলাতে পারল না! তবুও সে জোর করে নিজের ঠোঁটের কোণের হাসিটা চেপে রেখে গম্ভীর হয়ে রইল। কেবিনের ভেতর আবারও এক অদ্ভুত নীরবতা। কলরব বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিযানার মুখের প্রতিটা অভিব্যক্তি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে অত্যন্ত গভীর গলায় সুধাল,
“নিযানা! তুই আমাকে এখনো বিশ্বাস করিসনি। তাই না?”

নিযানা ডাগর চোখ দুটো তুলে তাকাল কলরবের দিকে। কলরবের চোখে আকুলতা। কাতরতা নিয়ে চেয়ে আছে। নিযানা দ্রুত নিজের মাথাটা সামান্য নেড়ে বোঝাল যে। সে বিশ্বাস করেছে। কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমি ইরাকে ঘৃণা করি। এটাই একমাত্র সত্যি। হ্যাঁ, আমি স্বীকার করছি। আমাদের বিয়ের পর আমি একবার ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা কোনো ভালোবাসার টানে ছিল না। সেটা ছিল শুধুমাত্র আমার মনে জমে অজস্র প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম ও কেন অমনটা করেছিল। ব্যাস! আর সেদিন যে আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম? ওটা হাসপাতাল ছিলো। কারণ ও সু ইসাইড করার চেষ্টা করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। বড়জোর পনেরোটা মিনিট সেখানে ছিলাম। বিশ্বাস কর। তোর আর আমার সম্পর্কের মাঝে ওই ইরার কোনো অস্তিত্ব নেই। বরং ওই মেয়েটাকে, ওই অতীতটাকে আমি পেছনে ফেলে এসেছি অনেক অনেক আগে। কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই। তুই কি আমার কথাটা একটুও বুঝতে পারছিস?”

নিযানা কোনো কথা বলতে পারল না। সে কেবল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল কলরবের ব্যান্ডেজ জড়ানো মুখের দিকে। তার মনের এককোণে একটা সংশয় উঁকি দিল। যদি ইরা নাই বা হবে। তবে আসল কারনটা আরকি বা হতে পারে? শুধুমাত্র নিযানা কে অপছন্দ করে বলে তো নয় নিশ্চয়ই। কলরব কি আবারও কোনো নতুন গল্প সাজাচ্ছে? নাটকবাজ বলে কথা। ও তো নিমেষেই রঙ বদলাতে পারে! কিন্তু পরক্ষণেই নিযানার মনে হলো। মিথ্যা হোক বা সত্যি, এই মুমূর্ষু অবস্থায় বিছানায় শুয়েও ছেলেটা তাকে মানানোর জন্য, তার মান ভাঙানোর জন্য কতটা মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে! তার এই ব্যাকুলতা, এই আকুলতার মাঝে এক অদ্ভুত অধিকার লুকিয়ে আছে। আর এই এতটুকু উপলব্ধি করতেই নিযানার বুকের ভেতর এক অসম্ভব, অবর্ণনীয় সুখের অনুভূতি এসে দোলা দিয়ে গেল। সব অভিমান যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে যেতে চাইল। সে নিজের গলার স্বর নরম করে বলল,
“আমি সব শুনে নিয়েছি। এখন আর একদম কথা বোলো না। মাথায় চাপ লাগলে সমস্যা বাড়বে। তোমাকে চুপ থাকতে বলা হয়েছে। এত কথা কেনো বলছো?”
কলরব আশ্বস্ত হয়ে মাথা নাড়ল।সে আরও কিছু একটা বলতে যাবে। ঠিক তখনই কেবিনের দরজায় মৃদু নকের শব্দ হলো। নিযানা নবাগতকে না দেখেই ভাবল হয়তো ডিউটি ডাক্তার বা কোনো নার্স এসেছে। সে সহজ গলায় বলল,
“আসুন।”

দরজা ঠেলে নিজের ছোট বোনকে সাথে নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করল ইরা। নিযানা মুখ ঘুরিয়ে তাকানোমাত্র প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলল মেয়েটাকে। ওদিকে দরজার দিকে চোখ পড়তেই কলরবের কলিজা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে অবশ গলায় একটা শুকনো ঢোক গিলল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। সে অত্যন্ত দ্রুত নিযানার মুখের পানে চেয়ে ওর ভেতরের প্রতিক্রিয়াটা বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা করল। মেয়েটার পুরো মুখটা পাথরের মতো থমথমে আর গম্ভীর হয়ে গেছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে নিজের স্বামীর প্রাক্তনকে হুট করে সামনে আবিষ্কার করলে যেকোনো মেয়ের অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। নিযানার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ইরা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার বেশ কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। নিযানা এই পরিস্থিতি এড়াতে হুট করেই বসা চেয়ারটা থেকে উঠে দাঁড়াতে চাইল। কলরব ঝট করে নিজের একটা হাত বাড়িয়ে খপ করে নিযানার হাতটা চেপে ধরল। নিযানা কিছুটা চমকে গিয়ে ঘুরে তাকাল কলরবের দিকে। কলরবের চোখের দৃষ্টিতে কি ছিলো নিযানা জানেনা। তবে সে আর টানাটানি না করে চুপচাপ চেয়ারটাতেই বসে রইল। ইরা কলরবের ব্যান্ডেজ জড়ানো মাথার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠল,

“কলরব! এখন কেমন আছো তুমি? তোমার এত বড় একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেল অথচ কেউ আমাকে একটা বার জানানোর প্রয়োজনও মনে করল না! আমি অভিকের একটা ফেসবুক পোস্ট দেখে জানতে পারলাম।”
কলরব নিযানার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে রেখে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল,
“আপাতত ঠিক আছি। কিন্তু তুমি হঠাৎ এখানে?”
ইরার চোখ ততক্ষণে কলরবের হাতের ওপর শক্ত করে ধরে রাখা নিযানার হাতটার দিকে পড়েছে। সে বেশ সূক্ষ্ম নজরে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল নিযানাকে। কলরবের এই অধিকারবোধ দেখেই সে মনে মনে কিছু একটা আন্দাজ করে নিলো। সাথে সাথেই তার ফর্সা মুখটা কালো হয়ে এলো। অত্যন্ত সন্ধিহান ও জড়তা মেশানো গলায় নিযানাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল,
“আই অ্যাম স্যরি! তুমি কে?”
“আমার ওয়াইফ, নিযানা।”
কলরবের গম্ভীর কণ্ঠে বলল। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি আর রাগ। কলরবের মুখে ‘ওয়াইফ’ শব্দটা শুনে ইরা নিজের ভেতরের ধাক্কাটা সামলে নিয়ে জোরপূর্বক ঠোঁটের কোণে একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলল। অত্যন্ত কোমল গলায় বলল,

“ওহ। হ্যালো! আমি ইরা। কলরবের খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড।”
“এক্স গার্লফ্রেন্ড!”
কেবিনের শান্ত আবহাওয়ায় যেন একটা আকস্মিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটল। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, ধারালো আর স্পষ্ট গলায় কথাটা ছুড়ে দিল নিযানা। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে ইরার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কলরব আমাকে আপনার সম্পর্কে সবকিছুই বলেছে। আপনাদের অতীতের সব গল্পই আমার জানা। সো এখানে লুকানোর বা অস্বস্তি বোধ করার কিচ্ছু নেই। ইট’স নরমাল! আসলে এই যুগে নিজের এক্স-কে কেউ এভাবে স্রেফ বন্ধুর নজরে দেখে। তার বিয়ের পরেও নিখুঁত ভাবে খোঁজখবর রাখে।এটা দেখে সত্যিই আমার খুব ভালো লাগছে। দাঁড়িয়ে আছেন কেন। বসুন না?”

কলরব হতভম্ব হয়ে তাকাল নিযানার পানে। শান্ত, জেদি নিযানা যে এই মুহূর্তে এমন এক ভয়ংকরী রূপ ধারণ করে শান্ত গলায় এত বড় বড় কথা ছুড়তে পারে এটা সে কল্পনা ও করেনি। সেই বিস্ময়ের পরক্ষণেই তীব্র ব্যথায় কলরবের পুরো চোখ-মুখ কুঁচকে একদম এক হয়ে গেল। নিযানা অবচেতনভাবেই কলরবের সেই হাতটা বড্ড বেশি শক্ত করে চেপে ধরেছে। অ্যাক্সিডেন্টে কলরবের হাতেও বেশ ভালো রকমের চোট লেগেছিল। ব্যান্ডেজ করা থাকলেও সেই ব্যথার তীব্রতা এখনো কমেনি। নিযানার শক্ত নখের চাপে কলরবের কলিজা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলেও সে মুখ ফুটে কোনো শব্দ করল না। কেবল দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে লাগল।
ইরা নিযানার এমন সোজাসাপ্টা আর ধারালো জবাব শুনে একেবারে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল। সে অপমানিত বোধ করে আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে কলরবও তো আমাকে দেখতে হাসপাতালে যেত। তাই ভাবলাম ওর এই খারাপ দিনে একটা বন্ধু হিসেবে আমারও বোধহয় একবার আসা উচিত ছিল। অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কিন্তু আমি আসিনি।”
নিযানা অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, “যেত নাকি গিয়েছিল? আমার জানা মতে ও স্রেফ একবারই গিয়েছিল। নিছক দয়ার খাতিরে।”

ইরা নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকুকে এক চিলতে কৃত্রিম হাসির আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করল। সে কলরবের দিকে এক পলক তাকিয়ে একটু উসকানিমূলক সুরে বলল,
“বাহ কলরব! দেখছি বউকে খুব ভালোবাসো। বউকে না বলে তো তুমি আজকাল কোনো কাজই করো না। কিন্তু আমি তো অন্য কিছু শুনছিলাম? শুনলাম তোমাদের মাঝে নাকি মারাত্মক ঝগড়া চলছে? তুমি নাকি রাগ করে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিলে নিযানা? তা এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসলে যে? আর সবচেয়ে মজার বিষয় কী জানো? এসব নিয়ে একটু আগে অভিক করিডোরে আমাকে রীতিমতো শাসিয়ে গেল। ওর ধারণা। আমি নাকি তোমাদের এই দূরত্বের কারণ! এটা কোনো কথা, বলো?”

নিযানা অত্যন্ত সাবলীল গলায় জবাব দিল, “সংসারে আর ভালোবাসায় একটু-আধটু মান-অভিমান থাকাটাই তো স্বাভাবিক? অভিমান করেই না হয় বাপের বাড়ি গিয়েছি। অন্য কারও হাত ধরে তো আর ভেগে যাইনি! আর আমার সেই অভিমান ভাঙাতে কলরব আমাকে কতবার স্যরি বলেছেএকটু ওকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন না। ওভাবে ভুল স্বীকার করলে তাকে মাফ না করে কীভাবে থাকতাম বলুন? তা আপনার স্বামী আপনার সাথে আসেননি? নাকি জীবনে ‘বেস্ট’ আর ‘বেটার’এই দুইয়ের মাঝে বাছাই করতে গিয়ে শেষমেশ নিজেই লুজার হয়ে বসে আছেন?”
বিছানায় শুয়ে থাকা কলরবের সত্যিই যেন আকাশ থেকে থপ করে মাটিতে পড়লো। সে মনে মনে এক প্রকার নিশ্চিত হয়েই ধরে নিয়েছিল যে ইরার মুখে বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে নিযানা হয়তো আবারও প্রচণ্ড রেগে। অভিমান করে কাঁদতে কাঁদতে ঘর ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু এ যেন এক সম্পূর্ণ অচেনা অন্য এক নিযানা। কথাটা মুখের উপর বলে দেওয়ার জন্য কলরবের মনে চাইলো নিযানার মুখে একশটা চুমু দিতে। কলরবের অবশ্য এই মুহূর্তে অবাক হওয়ার চেয়ে ব্যথায় বেশি প্রাণ যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। কারণ মুখের কথার ধার বাড়ানোর সাথে সাথে নিযানা নিজের অজান্তেই কলরবের ইনজুরড হাতটায় আরও বেশি বল প্রয়োগ করছে। মেয়েটা মুখে যতই শান্ত ভাব দেখাক না কেন। ভেতরে ভেতরে যে সে রাগে আর ঈর্ষায় দাউদাউ করে ফুঁসছে তা এই হাতের ওপর পড়া নির্মম চাপ থেকেই কলরব টের পাচ্ছে। রাগে নিযানার ফর্সা নাকটা হালকা লাল হয়ে উঠেছে। ইরা এই আকস্মিক অপমানে কী বলবে তা ভেবেই পেল না। নিযানার ‘লুজার’ শব্দটা তার অহংকারে বড্ড জোরে গিয়ে লেগেছে। এক নিমেষে তার মুখটা অপমানে আর লজ্জায় ছোট হয়ে গেল। ইরার সাথে আসা তার ছোট বোন লারা এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখছিল। সে ইরার হাত ধরে টান দিয়ে বলল,

“আপু, চলো। অনেক হয়েছে। আমরা এবার যাই।”
ইরা আগুন চোখে নিয়ে একবার নিযানার পানে চাইল। সে মনে মনে মেয়েটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। কী এমন জাদুকরি আছে এই মেয়েটার মধ্যে। যার জন্য কলরবের মতো ছটফটে, অবাধ্য একটা ছেলে এই মাত্র কয়েকটা দিনে এতটা বদলে গেল? শুধু দেখতে সুন্দরী বলে? কিন্তু ইরা নিজে সৌন্দর্যে কোন অংশে কম?হঠাৎ করেই ইরার বুকের ভেতর একটা তীব্র আফসোস আর হাহাকার চাড়া দিয়ে উঠল। নিযানার শেষ কথাটা তিরের মতো সত্য হয়ে তার বুকে বিঁধল। আজ সত্যিই নিজেকে বড্ড বেশি অসহায় আর ‘লুজার’ মনে হলো তার। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলরবের দিকে তাকিয়ে ম্লান গলায় বলল,
“তোমার কিছু বলার নেই কলরব?”
কলরব বলল, “ডাক্তার কথা বলতে নিষেধ করেছে।”
নিযানা চকিত চাইলো ওর দিকে। সিরিয়াসলি? এ কথা কলরব বলছে? তার মনে হলো সে ভুল শুনেছে৷ ইরা মৃদু হেঁসে বলল,

“আচ্ছা, আসি তাহলে কলরব। মন থেকে দোয়া করি। তোমার বিবাহিত জীবন অনেক সুখের হোক। তোমার বউ কিন্তু দেখতে যেমন মিষ্টি। মুখে কথার ধারও বেশ চমৎকার।”
নিযানা একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল ইরার চলে যাওয়ার পথের পানে। এই তো সেই মেয়ে! যার মূল্য কলরবের কাছে একসময় এতটাই বেশি যে তার জন্য সে চোখের সামনে রক্তমাংসের নিযানাকে পেয়েও যেন দেখে না। মেয়েটা নিঃসন্দেহে অসম্ভব সুন্দর তার ওপর এক অদ্ভুত মার্জিত আভিজাত্য লেপ্টে আছে। নিযানার কেন যেন হঠাৎ বুকের ভেতরটা ভীষণভাবে তছনছ হয়ে যেতে লাগল। এক তীব্র, অবাধ্য হিংসা এসে গ্রাস করল তার পুরো মনকে। এর আগে নিজের জীবনে সে কখনো এমন ঈর্ষা অনুভব করেনি। মনে মনে ভাবল। এই মেয়েটার ভাগ্য কতই না ভালো! না চাইতেও সে এমন একজনের নিখাদ ভালোবাসা পেয়েছিল। কেউ একজন পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন সাধনা করে মরে আর কেউ একজন তা না চাইতেই অনায়াসে হাতের মুঠোয় পেয়ে হেলায় হারিয়ে ফেলে! ইরা কেবিনের দরজার কাছাকাছি পৌঁছাতেই নিযানা পেছন থেকে বেশ গম্ভীর গলায় বলল,
“যে মানুষটা যেমন তাকে ঠিক সেইভাবেই ভালোবাসতে শিখুন। জীবনে সবসময় ‘বেটার’ কিছু খুঁজতে গিয়ে কেউ কখনো শেষমেশ জয়ী হতে পারে না। দিনশেষে কেবল আফসোসের পাল্লাই ভারী হয়। আর যাকে অন্য কারও পাশে দেখলে নিজের বুকের ভেতরটা এভাবে হু হু করে কেঁদে ওঠে। তাকে চিরদিনের মতো নিজের করে আগলে রাখতে হয়।”

নিযানার কথাগুলো শুনে ইরা দরজার মুখেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীরপায়ে ঘুরে দাঁড়াল। তার মুখে লেপ্টে অত্যন্ত মৃদু ও ম্লান এক চিলতে হাসি।
“আসলে মানুষের মনের ওপর তো কোনো জোর খাটে না। আজকে অবাধ্য মনের ভুলে যে জিনিসটার জন্য আমি নীরবে কাঁদছি। ভবিষ্যতে হয়তো স্রষ্টা আমাকে তার চেয়ে বহু গুণ ভালো কিছু দেবেন কিন্তু তবুও আজকের এই বিশেষ জিনিসটার শূন্যতা বোধহয় কোনোদিনও পূরণ করা সম্ভব হবে না। তবে হ্যাঁ, আজ আর আমার কোনো আফসোস নেই। কলরব আসলে জীবনে কারও ‘সেকেন্ড চয়েস’ বা সস্তা কোনো ‘অপশন’ হওয়া ডিজার্ভ করে না। ও বড্ড খাঁটি একটা ছেলে। তাই ও অবিকল তোমার মতোই একজন একনিষ্ঠ জীবনসঙ্গী ডিজার্ভ করে। আমি সত্যিই মন থেকে দোয়া করছি তোমাদের জন্য। অনেক সুখী হও তোমারা।”
কথাটা শেষ করেই ইরা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। নিজের চোখের কোণের অশ্রুটুকু আড়াল করে বোনকে নিয়ে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল করিডোরে। ইরা চোখের আড়াল হতেই ওদিকে বিছানায় শুয়ে থাকা কলরব বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আধো-কাঁদো গলায় বলে উঠল,

“এই নিযানা! তুই সত্যি করে বল তো। তুই আসলে চাস না তো আমি এই যাত্রা বেঁচে ফিরি। তাই না? আল্লাহর দোহাই লাগে। এবার অন্তত আমার হাতটা ছাড়! তোর ওই তলোয়ারের মতো নখের চিমটিতে আমার এমনিতে অর্ধেক হয়ে যাওয়া জানটা এবার পুরোপুরি বের হয়ে গেছে!”
নিযানার যেন এতক্ষণে ঘোর কাটল। ফিরল দুনিয়াবি হুঁশ। সে চট করে কলরবের হাতটা নিজের মুঠো থেকে ছেড়ে দিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“ওহ গড! আই অ্যাম সো স্যরি। জোরে লেগেছে? আসলে আমি খেয়ালই করিনি। আই অ্যাম স্যরি। কিন্তু যা হয়েছে ভালো হয়েছে।”

কলরব বিরক্ত চোখে চাইলো। ঠিক তখনই কেবিনের দরজা ঠেলে ডিউটি ডাক্তার ভেতরে এসে প্রবেশ করলেন। তিনি অত্যন্ত যত্নসহকারে কলরবের চোখের মণি, পালস আর মাথার ব্যান্ডেজ নিখুঁতভাবে চেক করলেন। পরীক্ষা শেষে মুচকি হেসে জানালেন। আপাতত বড় কোনো ইন্টারনাল ইনজুরির লক্ষণ নেই। সবকিছুই একদম নরমাল আছে। এরপর দুপুর আর বিকেলের ওষুধের কিছু জরুরি নির্দেশনা নার্স আর নিযানাকে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর থেকেই নিযানা একটা জিনিস বেশ ভালোভাবেই খেয়াল করছিল। এখানে আসার পর থেকে কলরব কেমন যেন এক প্রকার হতভম্ব আর অপলক দৃষ্টিতে তার দিকেই চেয়ে আছে। যেন সে কোনো ভিনগ্রহের অদ্ভুত প্রাণী দেখছে! নিযানা নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকুকে ঢাকতে গলার স্বর কিছুটা তীক্ষ্ম করে বলল,

“কী দেখছ ওভাবে হাঁ করে শুনি? অনেক তো নাটক হলো সকাল থেকে। এখন এক কাজ করো। চুপচাপ চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ো তো। আমি আসছি।”
কলরব বলল, “উহুঁ, এখন আমার একদম ঘুম-টুম আসছে না। তার ওপর ফোনটা ভেঙে এক্কেবারে চুরমার হয়ে গেছে। এই সাদা ঘরে একা একা ওভাবে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকতে বড্ড বোর লাগছে! কী করবো আমি? এক কাজ কর না। তোর ফোনটা একটু দে না আমাকে। তোর ফোনে কোনো ভালো মুভি, ওয়েব সিরিজ কিংবা কার্টুন-টার্টুন কিছু একটা চালিয়ে দে। আমি শুয়ে শুয়ে দেখি।”
নিযানা নিজের ফোনটা কলরবের দিকে এগিয়ে দিতেই সে মুখ কুঁচকে বলল,
“তোর কী সত্যিই মনে হয় এই অবস্থায় আমি হাত দিয়ে ফোনটা ধরে রাখতে পারব? একটা হাতে স্যালাইন চলছে আর আরেকটা হাত তো তুই নিজেই চেপে ধরে ব্যান্ডেজের বারোটা বাজিয়ে দিলি। এখনো তীব্র ব্যথা! এক কাজ কর। তুই নিজে ফোনটা ধরে রাখ। আমি শুয়ে শুয়ে দেখি।”

নিযানা চোখ-মুখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “তার মানে আমি এখন এখানে পুতুলের মতো এভাবে বসে বসে তোমাকে ফোন ধরে ধরে মুভি দেখাবো? সিরিয়াসলি কলরব?”
কলরব এক মুহূর্ত চুপ থাকলো। অতঃপর তার বেডের একপাশের খালি জায়গাটায় ইশারা করে বলল,
“এত ঝামেলার কী আছে! তুই এখানে আমার পাশে শুয়ে পড়লেই তো সব মিটে যায়। তুইও আরাম পাবি। আর আমারও স্ক্রিনটা দেখতে সুবিধা হবে।”
নিযানার মনে হলো আইডিয়াটা কিন্তু মন্দ নয়। হাসপাতালের কেবিনের বেডটা অবশ্য দুজনের তুলনায় বেশ ছোটই। তবে মানিয়ে নেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কলরব কালক্ষেপণ না করে নিজের অবশ শরীরটাকে টেনেটুনে বেডের একপাশে একটু সরে গেল। নিযানা বেডের ওপর বসার পর কেমন যেন এক তীব্র ইতস্তত বোধ করতে লাগল। এত দিন পর হুট করে এভাবে এতটা কাছাকাছি শুয়ে পড়বে সে? কলরব ওর এই দ্বিধাগ্রস্ত চেহারা দেখে চোখ-মুখ কুঁচকে খিটখিটে গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আবার কী সমস্যা তোর?”
নিযানা মৃদু মাথা নেড়ে বোঝাল। না। কোনো সমস্যা নেই।
কলরব এবার চরম বিরক্ত গলায় বলল,
“আরে ধুর। এত ঢং না করে আয় না বালডা!”
নিযানা চোখ-মুখ কুঁচকে কিছু একটা কড়া কথা বলতে গিয়েও নিজের রাগটা সামলে নিল। সে আর কথা না বাড়িয়ে ধীর পায়ে কলরবের পাশে আলতো করে শুয়ে পড়ল। দুজনের শরীর একদম ঘেঁষাঘেঁষি। সে ফোনে কলরবের বলে দেওয়া একটা মুভি চালু করে দুজনের চোখের সামনে আলতো করে ধরে রাখাল। এরপর দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না। কেবিনের ভেতর কেবল মুভির ডায়লগ আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজতে লাগল। কিন্তু একটু পরেই নিযানার হাত থেকে ফোনটা আচমকা ‘ধপ’ করে সোজা কলরবের পেটের ওপর এসে পড়ল। আকস্মিক এই ওজনে কলরব কিছুটা আতঙ্কে ও ব্যথায় কেঁপে উঠে বলতে গেল,
“এই তুই… কী করছিস…!”

বাকি কথাটা আর মুখ দিয়ে বের করতে পারল না কলরব। সে ঘাড়টা সামান্য ঘুরিয়ে নিযানার ঘুমন্ত, নিষ্পাপ মুখটার দিকে চেয়ে নিজের সব কথা যেন এক নিমেষে হারিয়ে বসল। সারারাত এক ফোঁটাও না ঘুমানো নিযানার ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় পিঠ ঠেকতেই কেমন যেন অবশ হয়ে এসেছিল। মুভি চলার মাঝেই কখন যে তার চোখের পাতা দুটো এক হয়ে গেছে। সে নিজেও টের পায়নি। কলরব আর জাগাল না ওকে। সে নিজের স্যালাইন চলা হাতটা সাবধানে, অনেক কষ্টে একটু উঁচিয়ে কোনোমতে ফোনটা অফ করে একপাশে রেখে দিল। নিযানার নিশ্বাসের ওলটপালট হাওয়া তার গলায় এসে লাগছে। সে বেশ কিছুক্ষণ অপলক নজরে ওর মায়াবী ঘুমন্ত মুখটার পানে চেয়ে রইল। দেখতে দেখতে একসময় সে নিজেও ক্লান্তি আর ওষুধের ঘোরে চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলল। অনেকটা সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও নিযানা কেবিন থেকে বাইরে না আসায়। অপেক্ষারত আনতাসা নিজে এলেন মেয়েকে ডেকে নিয়ে যেতে। কিন্তু কেবিনের দরজাটা আলতো করে ঠেলে ভেতরে পা রাখামাত্রই থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি। তার চোখের সামনে তখন একটা চমৎকার সুন্দর দৃশ্য। আনতাসার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো অকৃত্রিম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি দেখলেন। কলরবের চওড়া বুকের ওপর নিশ্চিন্তে মাথা দিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে নিযানা। কলরবও নিজের একখানা হাত দিয়ে বউকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। সে-ও নিবিড় ঘুমে মগ্ন।আনতাসা আর ওদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটালেন না। এক বুক স্বস্তি আর হাসিমুখে পা টিপে টিপে নিঃশব্দে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।

ক্রমশ গোধূলির নরম আভা চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে অস্তগামী সূর্যটা। নীল আকাশটাকে এক মায়াবী রক্তিম বর্ণে ভরিয়ে তুলছে সে। বর্ষাকালের মেঘমুক্ত গোধূলি আকাশ এমনিতেই বড্ড রূপসী। আর আকাশ যদি এমন ধুয়ে-মুছে ঝকঝকে থাকে তবে তো কোনো কথাই নেই। প্রকৃতির এই শান্ত রূপের বিপরীতে তালুকদার বাড়িতে তখনো এক চাপা উত্তেজনার অবসান ঘটেছে মাত্র। নওরোজ নকীবকে পুলিশের স্পেশাল ফোর্সের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যাওয়ার সময় সে আর একটা ‘টু’ শব্দও করেনি। শুধু এক চিলতে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রেখে গেছে। নিজের শোবার ঘরে বিছানায় গভীর ঘুমে মগ্ন ছোট্ট দিয়ার পাশে চুপচাপ বসে আছে দিব্য। তার এক হাত মেয়ের নরম চুলের ওপর আর অন্য হাতে ধরা ফোনটা কানের কাছে গোঁজা। ওপাশে কারও সাথে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় কথা বলছে সে। নবনী ঘরটায় ঢুকতে গিয়ে দরজার মুখে দাঁড়িয়েই দিব্যর শেষ কয়েকটা বাক্য অল্প একটু শুনতে পেল,
“বিয়েটা আজ বিকেলের মধ্যেই দিয়ে দাও। আমাকে আবার হাসপাতালে যেতে হবে। নয়তো আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই শুভ কাজটা সম্পন্ন করতাম।”
দরজায় নবনীর ছায়া দেখামাত্রই দিব্য তড়িঘড়ি করে ফোনটা কেটে একপাশে রেখে দিল। নবনী নিজের চোখ দুটো সরু করে তাকাল বরের দিকে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোজা দিব্যর সামনে এসে দাঁড়াল। অত্যন্ত সন্ধিহান কণ্ঠে বলল,

“কার বিয়ে হচ্ছে শুনি? কার বিয়ে দিচ্ছেন আপনি?”
দিব্য হঠাৎ নবনীর এমন মুখোমুখি প্রশ্নে কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। সে কপালে হাত দিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।এমন নীরবতা দেখে নবনী বেশ কড়া গলায় বলল,
“এবার যদি আমার কাছে আর একটা জিনিসও লুকিয়েছেন। তবে কিন্তু বড্ড খারাপ হবে বলে দিচ্ছি। সত্যিটা কী? জলদি বলুন!”
দিব্য নিজের চোখ দুটো নবনীর দৃষ্টি থেকে সরিয়ে জানালার বাইরের রক্তিম আকাশের দিকে চেয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল,
“অসীমের বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।”
নবনীর গোলগাল চোখ দুটো এবার অবাক হয়ে আরও বড় বড় হয়ে গেল। সে অবিশ্বাস্য গলায় বলল,
“আপনি… আপনি অসীমের বিয়ে দিয়েছেন? মানে কী এসবের?”
“হ্যাঁ, জোর করে। কাজী ডেকে আজকেই ওর বিয়েটা দিয়ে দিয়েছি।”
দিব্যর চোয়ালটা ক্ষোভে শক্ত হয়ে উঠল। নবনী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ধপ করে বিছানার একপাশে দিব্যর ঠিক মুখোমুখি বসল। এই লোকটা ইদানীং কী করছে, কেন করছে, মাথার ওপর দিয়ে কোন খেলা খেলছে। তার কিচ্ছু নবনীর সাধারণ বুদ্ধিতে ইদানীং ঢুকছে না। সে বলল,

“জোর করে বিয়ে দিয়েছেন? কিন্তু কেন?”
“কারণ ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে নবনী। নকীবের ওই পুরো নোংরা প্ল্যানটার সাথে ভেতরে ভেতরে এই অসীমও জড়িয়ে ছিল। নকীবের মূল উদ্দেশ্য ছিল আমাকে চিরতরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া। আর অসীমের কাজ ছিল সেই সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে নকীব আমাকে শেষ মুহূর্তে স্পট ডেড করেনি। আটকে রেখেছিল। কিন্তু অসীম ওদের কেন সাহায্য করেছিল? সেই কারণটা জানো? নকীবের সাথে ওর চুক্তি ছিল। আমার মৃত্যুর পর ও তোমাকে নিজের করে পেতে চেয়েছিল। রাসকেল, ইডিয়ট একটা!”
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে দম নিল দিব্য। অসীমের এই কদর্য কামনার কথা শুনে নবনীর মনে হলো পায়ের নিচের মাটিটা যেন এক নিমেষে সরে গেল। প্রচণ্ড ক্ষোভ, ঘৃণা আর অপমানে নবনীর গায়ের প্রতিটা শিরা-উপশিরা যেন এক লহমায় দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। তার পুরো মুখটা রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল। নবনীর চেহারার এই আকস্মিক পরিবর্তন লক্ষ্য করে দিব্য তার একটা হাত নিজের মুঠোয় নিল। অত্যন্ত নিবিড় নজরে ওর মুখের দিকে চেয়ে খুব ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কী হলো, চুপ করে আছ কেন? তোমার কি আমার এই সিদ্ধান্তের ওপর বড্ড বেশি রাগ হচ্ছে, নবনী?”
নবনী নিজের ভেতরের সবটুকু উত্তেজনা উগরে দিয়ে বলল,
“আপনি এতদিন ওকে কেন সহ্য করেছেন হ্যাঁ? ওর মনের ভেতরে যে এত বড় একটা বিষাক্ত সাপ লালন-পালন করছিল। তাকে পুলিশে না দিয়ে এখন আবার ঘটা করে বিয়ে দিচ্ছেন?”
“ওর কাছে আমার পুরনো একটা ঋণ আছে নবনী। তাই ওকে স্রেফ পুলিশে না দিয়ে এই অদ্ভুত উপায়ে ঋণটা চুকিয়ে দিলাম। আজকের পর থেকে অসীমের সাথে আমাদের যাবতীয় সম্পর্ক শেষ। ওর রাস্তায় ও চলবে। আমার অফিস আজ থেকে ওর জন্য চিরতরে বন্ধ।”
নবনী অত্যন্ত কৌতূহলী ও বিস্মিত গলায় বলল,
“কিসের ঋণ? ও এমন কী করেছিল আপনার জন্য?”
“একবার আমার জীবন বাঁচিয়েছিল। সেই একটা উপকারের খাতিরেই আজ ওকে ওভাবে জেলের ভাত না খাইয়ে ছেড়ে দিলাম। আর এতদিন এতকিছু দিয়েছি।”
নবনী আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু দিব্য তার আগেই নিজের হাত তুলে নবনীকে থামিয়ে দিল। একটু ম্লান হেসে বলল,

“আমাকে কি তোমার খুব অদ্ভুত লাগছে না?”
নবনী ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। তারপর সত্যিটা স্বীকার করে বলল,
“হ্যাঁ… একটু তো লাগছেই।”
“আচ্ছা। যাতে না লাগে সেই ব্যবস্থাটা করি আসি?”
দিব্য বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল।।নবনী কেবল মাথা নাড়ল। দিব্য ধীর পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে নিজের দাড়ি নিখুঁতভাবে শেভ করল। আয়নায় নিজের চেনা চেহারাটা ফিরে পেয়ে সে এক মস্ত বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ওদিকে নবনী ততক্ষণে বিছানায় ঘুমন্ত দিয়ার পাশে গা এলিয়ে শুয়ে পড়েছে। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দিব্য সোফায় গিয়ে বসল। তবে তার আগে সে আলমারির ড্রয়ার থেকে স্কিন কেয়ার মাস্ক বের করে নিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখে এঁটে নিল। নবনী বিছানা থেকে বরের এই মুখোশ পরার চেনা দৃশ্যটা দেখে অলক্ষ্যেই এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এর কিছুক্ষণ পরই তারা সবাই মিলে হাসপাতালে কলরবের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। যদিও কাব্য একদমই চাইছিল না যে ছোট্ট ইহান, ইভান আর দিয়াকে নিয়ে ওরা হাসপাতালের পরিবেশে আসুক। কিন্তু ইহানের সেই অবিরাম কান্নাকাটি আর জেদের চোটে শেষমেশ কাব্যর বারণ খাটল না। ওদের সাথে করে নিয়েই হাসপাতালে আসতে হলো।

হাসপাতাল থেকে যখন ওরা বাড়ি ফিরল। ততক্ষণে রাতের অন্ধকার বেশ ঘন হয়ে এসেছে। পুরোটা রাস্তা জুড়েই কাব্য একটা জিনিস খুব সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করেছে। মৌনিতার মুখটা ভীষণ থমথমে হয়ে আছে। গাড়িতে বসে সে একটাও কথা বলেনি। জানালার বাইরে শূন্য চোখে তাকিয়ে ছিল। আসলে অভিমানের মেঘটা জমেছে বেশ কিছুদিন ধরেই। সেদিন মাঝরাতে কাব্য যেভাবে হুট করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কোথায় গেল। কেন গেল। মৌনিতা জানতে চেয়েছিল। কিন্তু কাব্য বলতে পারেনি। নকীব, দিব্য আর অসীমের এই ভয়ংকর জাল আর রহস্যের কথা কি চাইলেই ঘরের বউকে হুট করে বলা যায়? তার ওপর ইদানীং মৌনিতার শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। অথচ কাব্য নিজের ডিউটি আর ভাইয়ের অ্যাক্সিডেন্ট নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে। ঠিকমতো বাড়িতেই থাকতে পারছে না। সব মিলিয়ে মৌনিতার মনে এখন পাহাড়সম অভিযোগ আর অভিমান জমে পাথর হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকেই মৌনিতা আলমারি খুলে একটা মস্ত বড় ট্রাভেল ব্যাগ বের করল। তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে ধপধপ করে নিজের জামাকাপড়গুলো ব্যাগে গোছাতে লাগল। কাব্য দরজার মুখে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে মৌ? ব্যাগে হুট করে এসব কাপড়চোপড় ভরছ কেন?”
মৌনিতা অত্যন্ত শীতল গলায় জবাব দিল, “আমি আগামীকাল সকালে আম্মুর বাসায় চলে যাব। অনেক দিন হলো যাওয়া হয় না।”

মৌনিতার থমথমে মুখ আর গলার আওয়াজ শুনে কাব্য ভেতরের আসল কারণটা কিছুটা আন্দাজ করতে পারল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে পেছন থেকে মৌনিতার কোমরে হাত রেখে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। নিজের মুখটা ওর ঘাড়ের কাছে ঠেকিয়ে অনুনয়ের সুরে বলল,
“আই অ্যাম সো স্যরি, ডার্লিং। আমার কি কোনো বড় ভুল হয়ে গেছে?”
স্বামীর এই চেনা আদুরে স্পর্শে মৌনিতার বুকের ভেতরটা এক নিমেষে হু হু করে কেঁদে উঠল। চোখে পানি এসে গেল তার। কিন্তু ঠিক তখনই ঘরের দরজা ঠেলে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকল ইহান আর ইভান। ছোট ভাই দুটো কোনো একটা অদ্ভুত বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে তুমুল তর্ক করতে করতে এসেছে। ছেলেদের আচমকা আগমন দেখে কাব্য চট করে মৌনিতাকে ছেড়ে একটু দূরে সরে দাঁড়াল। মৌনিতা নিজের কান্নাটা জোর করে গিলে নিয়ে কাব্যের দিকে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল,
“স্যরি? তোমার ওই সস্তা ‘স্যরি’ দয়া করে তোমার নিজের কাছেই রাখো কাব্য। তুমি তোমার ওই চব্বিশ ঘণ্টার ডাক্তারী আর জরুরি কাজ নিয়েই সুখে থাকো। আমাদের কথা বা আমাদের আবেগের কথা তোমাকে এত বেশি না ভাবলেও চলবে!”

ইভান মায়ের গলার স্বরে কষ্টের আভাস পেয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে মৌনিতার কোমর জড়িয়ে ধরল। তারপর নিজের নিষ্পাপ মুখটা ওপরে তুলে বড্ড কোমল গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে আম্মু? আব্বু কি তোমাকে বকেছে? তুমি কাঁদছ কেন?”
কাব্য এককোণে দাঁড়িয়ে বড্ড অসহায় চোখে চেয়ে রইল নিজের স্ত্রী আর সন্তানদের দিকে। মৌনিতা চট করে নিজের চোখের কোণের জলটুকু হাত দিয়ে মুছে ফেলল। ছেলেদের সামনে নিজের ভাঙা মনটা আড়াল করতে ঠোঁটের কোণে একটু মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তেমন কিছু না সোনা। আব্বু-আম্মু তো এমনিই কথা বলছিলাম। তা তোমরা দুজনে এই মাঝরাতে নিজের ঘর ছেড়ে আমাদের ঘরে এলে যে? তোমাদের কিছু দরকার?”
ইহান নিজের মাথাটা জোরে জোরে নেড়ে বলল,
“দেখো না আম্মু। এই ইভানটা একটা আস্ত গাধা! ও বলছে আকাশের চাঁদ নাকি একটাই। অথচ আমি সেদিন রাতে আকাশজুড়ে একটা আলাদা আকারের বাঁকা চাঁদ দেখেছি। আর আজকে হাসপাতালে যাওয়ার পথে দেখলাম একদম গোল থালার মতো আরেকটা চাঁদ! তাহলে চাঁদ দুটো হলো না?”
ইভান ভাইয়ের এই অদ্ভুত যুক্তি শুনে মুখ বাঁকিয়ে বলল,

“তুই একটা আস্ত বুদ্ধু। কিচ্ছু জানিস না!”
কাব্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেদের থামানোর জন্য বলল,
“আকাশে চাঁদ যে কয়টাই হোক না কেন। তোদের তাতে কী শুনি? অনেক রাত হয়েছে। এবার তোরা নিজেদের ঘরে যা গিয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়।”
“কিন্তু আম্মু কাঁদছিল কেন আব্বু?”
ইহান তার বড় বড় চোখ দুটো তুলে সরাসরি বাবার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল। বাচ্চার মন। মায়ের চোখের জলটুকু ঠিকই ধরে ফেলেছে। কাব্য পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল,
“তোদের যে সামনের সপ্তাহে মুসলমানি দেব। সেই চরম শোকে আম্মু আগে থেকেই কাঁদছে। সাথে তোমার বিয়ে।”
কথাটা শোনামাত্র মৌনিতা নিজের ভেতরের সব কষ্ট ভুলে কটমট চোখে চাইল কাব্যের দিকে। এই লোকটা বাচ্চাদের সামনেও এমন রসিকতা কীভাবে করতে পারে! কাব্য অবশ্য ওদিকে নিজের মুখ টিপে হাসছে। ছেলেদের সামনে বউয়ের এই রাগী চাউনিটা তার বেশ ভালোই লাগছে। ইহান অবশ্য ‘মুসলমানি’ শব্দটা শুনে বেশ কৌতূহলী আর উৎসাহিত হয়ে উঠল। সে অবুঝ গলায় জিজ্ঞেস করল,

“মুসলমানি কীভাবে করে আব্বু?”
কাব্য আর কথা না বাড়িয়ে ছোট করে বলল, “সময় হলেই টের পাবি। তখন নিজেই বুঝবি কেমন লাগে।”
“তার মানে তুমি নিজেই জানো না!”
ইহান বুক ফুলিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “ঠিক আছে। আমি এখন আর জিজ্ঞেস করব না। আমার ছোট চাচ্চু হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরলে আমি সোজা ওকেই জিজ্ঞেস করব।”
কাব্য কেবল মাথা নাড়ল। কলরবের মতো ফাজিল চাচ্চু যার। সে এমন আজব উত্তর খোঁজার জন্য ওর কাছেই যাবে। এটাই স্বাভাবিক। এর মাঝেই ইভান মায়ের শাড়ির আঁচলটা একটু টেনে নরম গলায় বলল,
“আম্মু, আজকে আমি তোমার সাথে এই ঘরে ঘুমাব?”
মৌনিতার মনের ভেতরের সব মেঘ যেন ছেলেদের এই মিষ্টি কথায় এক নিমেষে কেটে গেল। সে ইভানের নরম গালে একটা গভীর চুমু খেয়ে বলল,
“আমি একদম ঠিক আছি সোনা। আমার কিচ্ছু হয়নি। তোমরা লক্ষ্মী ছেলের মতো নিজের ঘরে যাও। গিয়ে শুয়ে পড়ো।”
ইহান বাবার কোলে ওঠার জন্য উসখুস করছিল। সে এবার কাব্যের দিকে চাইল। কাব্য ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“কী? ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?”
“আমাকেও একটা চুমু দাও!”
মৌনিডা খিলখিল করে হেসে ফেলল। কাব্য আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ইহানকে দুই হাতে কোলে তুলে নিল। এক বুক গভীর ভালোবাসায় ছেলের গালে, ললাটে অসংখ্য চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিল। সে এক হাতে ইহানকে ধরে রেখেই অন্য হাত বাড়িয়ে ইভানকেও ছোঁ মেরে কোলে তুলে নিল। তারপর ওকেও একই রকম আদরে আর চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিল। মৌনিতা আলমারির পাল্লায় হেলান দিয়ে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার জীবনের এই সম্পূর্ণ বৃত্তটার দিকে। তার চোখের সামনে তখন এক পরম সুন্দর, নিখুঁত সংসার। কাব্যের ওপর জমে থাকা সব অভিমান আর ক্ষোভ যেন ছেলেদের এই খিলখিল হাসির তোড়ে কোথায় ভেসে গেল। তার ভেতরটা এক অদ্ভুত ভালো লাগায় আর শান্তিতে ভরে উঠল। কাব্য দুই ছেলেকে দুই কাঁধে নিয়ে ধীর পায়ে মৌনিতার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ঝুঁকে এসে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়ালো তার প্রিয় অর্ধাঙ্গীনির ললাটে। এক পরম তৃপ্তি আর ভালোবাসার স্পর্শে মৌনিতা আলতো করে নিজের চোখ জোড়া বুজে নিল।

দিয়াকে নিশ্চিন্তে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে নবনী ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হলো দিব্যর খোঁজে। অবশ্য এই মাঝরাতে সে কোথায় থাকতে পারে তা নবনীর খুব ভালো করেই জানা। সাতপাঁচ না ভেবে রাতের বেলা এভাবে জিমঘরে গিয়ে ঘাম ঝরানোর মানেটা নবনীর সাধারণ মাথায় কোনোদিনই ঢোকে না। তবে একটা জিনিস সে খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করেছে। দিব্য সাধারণত রাতে জিমে যায় না। কেবল তখনই যায় যখন তার মনের ভেতর কোনো ঝড় চলে। মন-মেজাজ তীব্র খারাপ থাকে। এতটুকু তো সে তার এই মিস্টার তালুকদারকে চেনে! নবনী ধীর পায়ে মগ ভর্তি ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম কফি নিয়ে জিমঘরে গিয়ে ঢুকল। দিব্য তখন কোনো ইন্সট্রুমেন্ট না ছুঁয়ে স্রেফ চুপচাপ সোফাটায় মাথা নিচু করে বসে ছিল। নবনী আলতো পায়ে এগিয়ে গিয়ে কফির মগটা ওর সামনে বাড়িয়ে দিল। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আপনাকে বড্ড চিন্তিত লাগছে। বিশেষ কিছু হয়েছে কি?”
দিব্য আলতো করে মাথা নাড়ল। বোঝাতে চাইল তেমন কিছু নয়। নবনী কফিটা রেখে ওখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হতেই দিব্য সোফা ছেড়ে হুট করে উঠে দাঁড়াল। ওর চোখের ভেতরের সেই অস্থিরতা দেখে নবনী এগিয়ে এলো। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের পায়ের পাতা দুটো সামান্য উঁচু করে। নিজের দুই হাতের নরম আজলায় আগলে নিল দিব্যর মুখটা। আদুরে গলায় বলল,
“সত্যি করে বলুন তো। খারাপ কিছু হয়েছে?”
দিব্য নবনীর হাতের ওমে নিজের চোখ দুটো ক্ষণিকের জন্য বুজে নিল। তারপর চোখের পাতা মেলে বলল,
“সব খারাপ কেটে গেছে নবনী। আমাদের চারপাশ থেকে সব অন্ধকার সরে গেছে। এখন থেকে শুধু ভালোটাই হবে।”
“তাহলে ওভাবে মন খারাপ করে বসে আছেন কেন?”
দিব্য প্রচণ্ড দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেল। একটা শুকনো ঢোক গিলে জড়তা মেশানো গলায় বলল,
“আমার… আমার তোমাকে একটা সত্যি কথা বলা উচিত নবনী। কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি। কথাটা শোনার পর তুমি কীভাবে নেবে।”

নবনী ওর ঠোঁটের উপর নিজের হাতটা রেখে আলতো করে থামিয়ে দিল। বলল,
“আমি নতুন করে আর কিচ্ছু জানতে চাই না।”
“কিন্তু আমি বলতে চাইছি…!”
দিব্যর গলায় এক অদ্ভুত আকুলতা। নবনী কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,
“বললাম তো, আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না! আপনার অতীত, আপনার রহস্য কিংবা আপনার সম্পর্কে আমি যতটুকু আজ পর্যন্ত জেনেছি। আমার জন্য ততটুকুই যথেষ্ট। এই এতটুকু চেনা মানুষকে নিয়েই আমি অনায়াসে একটা পুরো জীবন পার করে দিতে পারব। আমি আর অন্য কোনো কিছুর বিনিময়ে। কোনো সত্যের অজুহাতে আমাদের মাঝে দূরত্ব চাই না।”
কথাটা শেষ হতেই দিব্য তার মুখ থেকে নবনীর হাতটা সরিয়ে নিলো। অতঃপর চুমু খেল হাতটায়। নবনীর নাকে নাক ঘষে বলল,

“ওটা এতটাও সিরিয়াস কিছু না। তার চেয়ে বরং কাল তুমি যে কথাটা আমাকে বলেছিল। সেটা আজ আরেকবার বলবে? আমি কেন যেন এখনো নিজের কানকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না!”
দিব্য এক বুক কাতরতা, অনুরাগ নিয়ে চেয়ে রইল নবনীর দিকে। সেই অপলক, তৃষ্ণার্ত চাউনি দেখে লজ্জায় নবনীর চোখের পাতা দুটো নিজে থেকেই বুজে এলো। মুখটা নেমে গিয়ে চিবুক ছুঁয়ে গেল। ফর্সা গাল জোড়ায় পলকে ভর করল এক চিলতে রক্তিম আভা। সে নিজের পায়ের পাতায় ভর দিয়ে আরও সামান্য উঁচু হলো। তারপর দিব্যর কানের খুব কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে নিচু গলায় বলল,
“আমি আপনাকে ভালোবাসি!”
দিব্য নিজের দুই হাতের বাঁধনে জড়িয়ে নিল নবনীর ছিপছিপে, পাতলা কোমর। দূরত্ব ঘুচিয়ে তাকে আরও কিছুটা নিজের বুকের গহীনে টেনে নিয়ে ব্যাকুল গলায় বলল,
“আরেকবার?”

নবনী খিলখিল করে হেসে ফেলল। বাইরের দুনিয়ায় ত্রাস ছড়ানো এই গম্ভীর, রহস্যময় পুরুষটা যে হুট করে এমন অবুঝ বালকের মতো বায়না ধরতে পারে। তা বোধহয় এই চার দেওয়ালের বন্দিদশা ছাড়া আর কোথাও প্রকাশ পাওয়ার নয়। তবে দিব্যর এই অস্থিরতার পেছনের দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা মানসিক ঝড়টা নবনী ঠিকই উপলব্ধি করতে পারলো। তাই আর কোনো লুকোচুরি বা ছলনার আশ্রয় না নিয়ে এক আজ্ঞাবহ অনুগত লতার মতো সে আবারও বরের বুকে মিশে গিয়ে সুর মেলাল,
“আপনাকে ভালোবাসি।”
“আরেকবার?”
দিব্য যেন অলৌকিক চাতক পাখি আজ। নবনী এবার ওর চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে আলতো করে ঠোঁট উল্টে অভিমানের সুরে বলল,
“উহুঁ, আর একটিবারও মুখ ফুটে বলব না। এবার শুধু আপনার বলার পালা। আপনি নিজে কি একটা বারও এই মুখ ফুটে মনের কথাটা বলেছেন শুনি?”
দিব্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী ফুটে উঠল। সে নবনীর কোমরের বাঁধন আরও একপ্রস্থ আষ্টেপৃষ্ঠে শক্ত করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমি সস্তা শব্দের জাল বুনে মুখে বলায় নয় নবনী বরং তার চেয়ে ঢের বেশি গভীর প্রমাণে বিশ্বাসী। দেব সেই অকাট্য প্রমাণ?”

স্বামীর মুখের এমন সোজাসাপ্টা, গভীর ইশারা শুনে নবনী মুহূর্তের মধ্যে আক্ষরিক অর্থেই আড়ষ্ট হয়ে জমে বরফ হয়ে গেল। দিব্য ওর লজ্জাবনত মুখের অবস্থা দেখে চোখের কোণ দিয়ে মিটিমিটি হাসছে। নবনী মুখে আর কোনো উত্তর দিল না। দেওয়ার মতো কোনো ভাষা বা সাহস তার অবাধ্য ঠোঁটেরা খুঁজে পেল না। ওইভাবেই স্তব্ধ হয়ে পার হয়ে গেল প্রকৃতির বুকে কিছুটা হিরণ্ময় থমকে যাওয়া সময়। নবনী নিজের সবটুকু জড়তা আর লজ্জার দেয়াল ঝেড়ে ফেলে আলতো করে নিজের কপালটা ঠেকাল দিব্যর চওড়া বুকে। নিজের অর্ধাঙ্গীনির এই নীরব সমর্পণ আর মিষ্টি ইঙ্গিতটুকু বুঝতে বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হলো না দিব্যর। তার পুরো মুখাবয়বে ফুটে উঠল এক তৃপ্তি আর বিজয়ের হাসি। সে হালকা ঝুঁকে গভীর মায়ায় আর গভীর অনুরাগে একটা উষ্ণ চুমু আঁকল নবনীর ললাটে। সেই আবেশের ওমে নবনী নিজের চোখের পাতা জোড়া আলতো করে বুজে নিল। দিব্য ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ঘরের দেয়ালের মূল সুইচের দিকে। হুট করেই নিশ্ছিদ্র আঁধার নেমে এল পুরো কক্ষ জুড়ে। জানালার ভারী পর্দা গলে ওপাশ থেকে কেবল গলিয়ে পড়া নিঝুম রাতের এক চিলতে আবছা জোছনাটুকুই চোরের মতো এসে ঘরটাকে ছুঁয়ে রইল। পরক্ষণেই নবনী টের পেল তার পুরো দেহটা আচমকা কোনো এক মায়াবী জাদুবলে শূন্যে ভেসে উঠেছে।

আকস্মিক এই ভারসাম্যহীনতায় সে কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে দুহাতে আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল দিব্যর গলা। সেই ঘন অন্ধকারেও দিব্যর পায়ের নিখুঁত ছন্দে কোনো ভুল হলো না। মেঝেতে পাতা পুরু কার্পেটটায় নবনীর পিঠ ঠেকল অচিরেই। আর তার ঠিক পরক্ষণেই সে তীব্রভাবে অনুভব করল দিব্যর ভারী ও উষ্ণ শরীরের একচ্ছত্র সান্নিধ্য। বুকের ভেতরের হৃৎপিণ্ডের গতিমাত্রা যেন সব চেনা হিসাব আর সীমানা ছাড়িয়ে এক প্রলয়নাচন শুরু করল নবনীর।সে নিজেকে কোনোমতে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। দিব্যর প্রথম ও পরম আকাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার স্পর্শটা এসে ঠেকল ওর উন্মুক্ত কণ্ঠনালিতে। এক তীব্র, অবর্ণনীয় শিহরণে কেঁপে উঠল নবনীর পুরো নাজুক কায়া। সেই উষ্ণ, মায়াবী স্পর্শে সারা শরীর যেন এক মিষ্টি দাহে দাউদাউ করে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। নিজের কম্পিত, অবশ হয়ে আসা গলার স্বর কোনোমতে সচল করে আর্দ্র গলায় বলে উঠল,
“একটা বার শুধু মুখ ফুটে বলুন না!”
দিব্য অবশ্য এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। নবনীর কানের নরম লতিতে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় পুরুষালি গলায় ফিসফিসিয়ে উত্তর দিল,

এই অবেলায় পর্ব ৩৯

“ভালোবাসি জিনিসটা স্রেফ মুখে উচ্চারণ করার মতো সস্তা কোনো বিষয় নয়। তুমি এখনো ছোট মানুষ। বড্ড অবুঝ। তাই এই পবিত্র অনুভূতির অতল গভীরতা পরিমাপ করার সাধ্য তোমার নেই। বললে ও বুঝবে না৷ কথা বোলোনা।”
অন্ধকারে নিজের ভিজে আসা চোখের কোণে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল নবনীর। বড্ড চালাক আর জটিল লোক একটা! এমন মুহূর্তেও তার কেমন নিখুঁত ও অকাট্য চালাকি! মনে মনে ভাবল। ঠিক আছে মিস্টার তালুকদার। কতদিন আপনি এভাবে মুখে না বলে এড়িয়ে চলতে পারেন। তা এই নবনীও নিজের ধৈর্য দিয়ে দেখে নেবে। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে অবাধ্য রাতের গভীরতায় বাড়তে থাকল ওদের দুই দেহের নিষিদ্ধ স্পর্শের গভীরতা। বাইরের পৃথিবীর সব কোলাহলকে আড়ালে অনেক দূরে ঠেলে দিয়ে নবনী তার পুরো সত্তা দিয়ে, প্রতিটা তপ্ত নিশ্বাসের ওঠানামায় গভীর থেকে গভীরতম অনুভূতিতে অবগাহন করতে লাগল ‘স্বামী’ নামক তার জীবনের এই শ্রেষ্ঠ, চমৎকার আশ্রয়টাকে।

এই অবেলায় পর্ব ৪১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here