Home এমপির অবাধ্য বউ এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৩৪

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৩৪

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৩৪
সুহাসিনী

প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রাহি আর আয়েশা বাড়িতে চলে আসলেও এখনো প্রেমের কোনো হদিশ নেই। আমজাদ খান খুব বিরক্ত তার ওই এক রোখা ছেলের উপরে। এমন একটা দিনেও সময়ের কাজ সময়ে করবে না।প্রেম অবশ্য জানে না মেহমান কারা,,তাকে শুধু বলা হয়েছে আজ বাড়িতে স্পেশাল গেস্ট আসবে।
আমজাদ খান বিরক্তিতে বারবার প্রেমের ফোনে কল দিচ্ছে। কিন্তু প্রেম ফোন ধরছে না। আমজাদ খানের বিরক্তি বেড়েই চলেছে।এদিকে মেহমান আসার সময় হয়ে গেছে।সব আয়োজন শেষ,কিন্তু তার গুণধর ছেলে এখনো এসে পৌঁছায়নি।এতো বড় মাপের লোক আসবে আজকে, নিশ্চিত এসেই সবার প্রথম প্রেমের কথায় জানতে চাইবে,হাজার হোক সে একজন এমপি।এখন যদি প্রেম তখন উপস্থিত না থাকে বিষয়টা খারাপ দেখায়।
আমজাদ খানের অস্থিরতা দেখে রাহি মিনমিন করে আমজাদ খানকে বললো,

“চিন্তা করবেন না বাবা,উনি ঠিক সময়ে এসে যাবেন। হয়তো কোনো কাজে আটকে গেছে।”
আমজাদ খান কোনো কথা বললো না। আফরোজা খানকে এক কাপ চা দিতে বলে সোফায় গিয়ে আরাম করে বসলেন।এই ছেলের চিন্তায় না সে কবে হার্ট অ্যাটাকে মরে।
আরও দশ মিনিট কেটে গেছে,কিন্তু প্রেমের হদিশ মিলছে না। অপারক হয়ে রাহি এবার নিজেই কল করলো প্রেমকে।রাহিকে পরীক্ষার পরে আমজাদ খান মোবাইল কিনে দিয়েছিলেন। সেটা থেকেই কল দিল।
কয়েকবার রিং হতেই রিসিভ হলো।রাহি হ্যালো বলতেই আমজাদ খান এর ভ্রু কুঁচকে গেলো।সাথে কিছুটা অবাক হলেন।উনি আধা ঘণ্টায় মিনিমাম বিশ টার উপরে কল দিয়েছে।কিন্তু প্রেম ফোন উঠায়নি। আর এদিকে বউ একবার কল করতেই কি সুন্দর রিসিভ করে ফেললো।
“কোথায় আপনি?বাবা আপনাকে কখন থেকে কল করছে, ধরছিলেন না কেনো?”
“আব্বু তো আর আমার বউ না,যে কল দিলেই ধরতে হবে।”

ফোন স্পিকারে না থাকলেও রাহি আমজাদ খানের পাশে বসায় প্রেমের সব কথা স্পষ্ট শুনতে পেলেন তিনি। আমজাদ খান চা দিয়েছিলেন মুখে কিন্তু প্রেমের কথা শুনে চা আর গলা দিয়ে নামলো না।ছিটকে বেরিয়ে এলো। আফরোজা খান স্বামীর এই অবস্থা দেখে কিছুটা বিচলিত হয়ে ধমকের সুরে বললেন,
“কি করছোটা কি তুমি?একটু আস্তে ধীরে খাবে তো নাকি? ঠিক আছো?”
শেষের কথাটা মোলায়েম কন্ঠে বললেন।
আমজাদ খান আফসোসের স্বরে উত্তর করলেন,
“যার এমন একটা ছেলে আছে সে কখনো ঠিক থাকতে পারে না আফরোজা।”
স্বামীর মুখে ছেলের বদনাম শুনে বিরক্ত হলেন আফরোজা খান। তিনি প্রেমকে বড্ড ভালবাসেন প্রেমের নামে কটু কথা তার সহ্য হয় না। তাই আমজাদ খানের কাছে আর না দাঁড়িয়ে তিনি নিজের কাজে চলে গেলেন।
রাহি প্রেমের কথাই বিরক্ত প্রকাশ করে বলল,
“আপনার আজাইরা প্যাঁচাল রেখে তাড়াতাড়ি বাড়িতে আসুন। মেহমান চলে আসবে যখন তখন।”
“সো হোয়াট? মেহমান আসুক চাই মেহমানের বাপ আসুক সেটা আমার দেখার বিষয় না।আমি তো বাড়িতে আসব শুধু তুমি বলেছ দেখে।”

আমজাদ খান কাছে থাকায় প্রেমের কথায় কিছুটা লজ্জা পেলো রাহি।এই লোকটার মুখে কিছুই আটকায় না।মনে মনে কয়েকটা গালি দিয়ে মুখে বললো,
“যেটায় হোক,আপনি আগামী দশ মিনিটের মধ্যে বাড়িতে থাকবেন।”
“জো হুকুম বেগমজান।”
কানের কাছে পুরুষালি কণ্ঠ পেয়ে চমকে উঠল রাহি।প্রেম বাড়িতে চলে এসেছে এর মধ্যেই।রাহি আর প্রেমের কাণ্ডে আমজাদ খান আর আয়েশা না হেসে পারলো না। আমজাদ খান রাহির প্রতি প্রেমের এমন পরিবর্তন দেখে মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন এবং তাদের দুজনের জন্য মন ভরে দোয়া করলেন।
কিন্তু মুখে গম্ভীর ভাব এনে প্রেমের উদ্দেশ্যে বললেন,
“যাও ফ্রেশ হয়ে এসো। রাহি মা তুমিও ওই অপদার্থের সাথে যাও, নয়তো এ এখানে আসার কথা আবার ভুলে যাবে।”
প্রেম কিছু বলতে চেয়েও বললো না। উপরে চলে গেল। রাহিও গেলো পিছু পিছু ।

রাহি আজকে কালো রঙের একটা ফ্লোরটাচ জামা পড়েছে, সাথে ম্যাচিং উড়না। লম্বা সুন্দর চুল গুলো হাত খোপা করে মাথায় ভদ্র ভাবে উড়না পেঁচিয়েছে। কালো ড্রেসে ফর্সা শরীরটা কেমন যেনো জ্বলজ্বল করছে।যে কেউ দেখলে চোখ আটকে যাবে।
প্রেম রাহিকে কড়া ভাবে বলে দিয়েছে,মেহমানদের সামনে যেনো বেশি ঘুরঘুর না করে। কুশল বিনিময় সেরে যেনো রুমে এসে দরজা লক করে ঘাপটি মেরে বসে থাকে।প্রেমের যেনো দ্বিতীয় বার বলতে না হয়।
রাহিও দ্বিমত করেনি ।
মেহমান চলে এসেছে। মেহমান হিসেবে আছেন আজিজ চৌধুরী, উনার সহধর্মিণী এবং এক ছেলে দুই মেয়ে,আবার সাথে উনার ছোটো ভাইয়ের বউও আছে। আমজাদ খান সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাদের।প্রেম আর রাহি এখনও নিচে আসেনি। আজিজ খান প্রেমের কথা তুলতেই সিঁড়ি বিয়ে শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে নিচে নেমে আসে প্রেম।কিন্তু মেহমানদের উপস্থিতিতে তার ভ্রু জোড়া সামান্য কুঁচকে যায়। এরা এখানে এসেছে কেনো? বিসনেসের ব্যাপার তো অফিসেই ঠিক ছিল, ফ্যামিলিতে নিয়ে আসার কি হলো। আমজাদ খানের উপর বেশ বিরক্ত হলেন প্রেম।

তাঁর বিরক্তির সবচেয়ে বড় কারণ হলো সাঈদ চৌধুরী। এর ব্যাপারে প্রেম যতটুকু জানে তার মধ্যে এই লোকের বিজনেসের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই। সিঙ্গাপুরেই বেশি সময় থাকা। আর সেখান থেকে সোজা বিজনেস পারপাসে একজনের বাড়িতে বেড়াতে চলে এলো? বিষয়টা চিন্তার। বিয়ে বাড়ির ঘটনার কথা চিন্তা করে আসল বিষয় ধরতে প্রেমের চতুর মস্তিষ্ক বেশি সময় নিলো না। মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।কিন্তু ভেতরের রাগ ভেতরেই রাখলো।
প্রেমকে দেখে সবাই একে একে কুশল বিনিময় করলো। সাঈদের মেজো বোন আঁখির তাকানো প্রেমের সুবিধে লাগলো না বেশ একটা। বয়স বেশি না, আয়েশার সমবয়সী হবে।প্রেম সে দিকে বেশি একটা পাত্তা দিলো না।
সাঈদ আশে পাশে চোখ ঘুড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে না দেখতে পেয়ে কেমন ছটফট করতে লাগলো।নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে প্রেমের উদ্দেশ্যে বলেই ফেললো,
“আপনার কাজিনকে তো দেখছি না মিস্টার প্রেম,সে কি চলে গেছে?”
ওই সময়ই রাহি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। সাঈদের মুখে আবার প্রেমের কাজিন শুনে রাগ হলো তার। একে তো এই বেটাকে সহ্য হয় না তার।তার উপর আবার তাকে তার আপন জামাই এর কাজিন বানিয়ে দিচ্ছে। রাহি এসে সবাইকে সালাম দিলো।রাহিকে দেখে সাঈদের ঠোঁটে সামান্য মিষ্টি হাসি দেখা দিলো।তার মনে হচ্ছে এবার প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে পারবে। সাঈদের মা রাহিকে ডেকে নিজের পাশে বসালো। রাহিও ভদ্র মেয়ের মতো ভদ্র মহিলার পাশে বসলো। সাঈদের মা রাহিকে দেখে মিষ্টি হেঁসে বলল,

“মাশাআল্লাহ,তুমি তো অনেক সুন্দর।যেনো জীবন্ত পুতুল।”
রাহি লজ্জা পেলো।প্রেমের আর সহ্য হলো না।সে কিছু বলতে নিবে ওমনি সাঈদের মা রাহির পাশে দেখিয়ে সাঈদকে বলল,
“ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো এখানে এসে বসো।”
প্রেম আর সাঈদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। সাইদকে শুধু বসতে বললে খারাপ দেখা যায় তাই তিনি প্রেমকেও বসতে বললেন।প্রেম দেরি না করে সাঈদের আগে দ্রুত গিয়ে রাহির পাশের জায়গা দখল করলো। সাঈদ কিছুটা বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলল না।সে ভাবলো হয়তো বোন হিসেবেই বসেছে।সে পাশের সোফায় গিয়ে বসলো।এরপর যে যার মতো আলাপে মগ্ন হলো।কিছুক্ষণ পরে আজিজ চৌধুরী বলেন,
“আসলে আমাদের এখানে আসার আসল কারণটা মনে হয় এখন বলে দেওয়া উচিত কি বলেন আমজাদ সাহেব।”
“জ্বি অবশ্যই।”
“আমি আমার ছেলের জন্যে বউ চাইতে এসেছি আপনার কাছে।”
মুহূর্তেই সবার মধ্যে কেমন নীরবতা দেখা দিলো।আমজাদ খান অবাক হলেন কার বিয়ের কথা বলতে এসেছেন ভেবে।

“আমি আমার ছেলে সাঈদ এর জন্য আপনার ভাই এর মেয়েকে চাই।যতদূর আমি জেনেছি ওর বাবা মা কেউ নেই,এখানেই থাকে ও।আপনার মেয়ের মতোই।আশা করছি ওর ভালো দিকটা বিবেচনা করে আপনি এই বিয়েতে অমত করবেন না।জানি ওর বয়স কম,তাই আমরা এখনই বিয়ে না দিয়ে এঙ্গেজমেন্ট করিয়ে রাখতে চাইছি।পারলে আকদ সম্পন্ন করে রাখবো।”
আজিজ চৌধুরীর কথায় খান বাড়ির সবার উপর যেনো বজ্র পাতের মতো প্রভাব ফেললো। আমজাদ খান কি উত্তর করবেন বুঝলেন না।একবার প্রেমের সিংহের ন্যায় দৃষ্টির দিকে তাকালেন।প্রেমের তাকানো দেখে মনে হচ্ছে সে এখনই আমজাদ খানকে গিলে খাবে।প্রেমের এরূপ দৃষ্টিতে কিছুটা ভরকে গেলেন তিনি।এরপর তাকালেন রাহির পানে।রাহি করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উনার দিকে।
আমজাদ খান পড়েছেন বিপাকে। তিনি কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না।না পারছে সত্যিটা বলতে না পারছে গিলতে।
শান্তও এসেছিল মেহমানদের আসার একটু পরেই।সে এতক্ষণ চুপচাপ বসে আয়েশাকে জালাচ্ছিল।এবার বোধহয় সে তার চিরশত্রু ওরফে তার সমন্ধীকে জ্বালানোর সুযোগ পেয়ে গেছে। আস্তে করে উঠে প্রেমের পাশে গিয়ে প্রেমের কানের কাছে ফিসফিস করে গাইলো,

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৩৩

“ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়
সাঈদ যখন রাহিরে লয়া
প্রেমের চোখের সামনে দিয়া
রঙ্গ কইরা হাইট্টা যায়
ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়”

এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৩৫