Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১১

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১১

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১১
সেঁজুতি আক্তার

শেহরানের গাড়িটা এসে থামল কলেজের গেটে।
মাইরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। গাড়ি থামতেই সোজা হয়ে বসল। শেহরানের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, আমরা কি চলে এসেছি?
-শেহরান গভীর কণ্ঠে বলল, হুম নামো।
-মাইরা দরজা খুলে নেমে পড়ল। চারপাশে তাকাল। কলেজটা সুন্দর। বড় বড় গাছ, সাদা বিল্ডিং। কিন্তু মাইরার ভালো লাগল না। ওর মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে “আবার ক্লাস, আবার পড়া। ধুর।
-শেহরান গাড়িতে বসেই কালো মাস্কটা পরে নিল। ভিউ মিররে একবার নিজেকে দেখে ক্যাপটা মাথায় দিল। তারপর নেমে এল।
-মাইরা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আপনি এইসব পরেছেন কেন?
-শেহরান উত্তর দিল না। শুধু বলল, মুখ বন্ধ রাখো। চলো।
বলেই সামনে হাঁটা শুরু করল।
-মাইরা দাঁড়িয়ে রইল দুই সেকেন্ড। তারপর বিড়বিড় করল, “অসভ্য একটা। প্রশ্ন করলাম, উত্তর নাই। তারপর দৌড়ে শেহরানের পিছে গেল। শেহরান অনেক লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটে। মাইরা ওর সাথে তাল মেলাতে পারছিল না।

-সায়রা ভার্সিটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। ওর এক ফ্রেন্ডের আসার কথা কিন্তু এখনো আসছে না। বিরক্তি নিয়ে ফোন বের করে কল দিতে গেল। তখনই দেখতে পেল, দূর থেকে একটি ছেলে বাইক নিয়ে এসে সায়রার সামনেই দাঁড়াল।
–সায়রা বিরক্তি নিয়ে বলল, তুমি আবার কেন এসেছ? আমি তোমাকে আগেও বলেছি। তুমি আমাকে ডিস্টার্ব করবে না? তুমি আর এক সেকেন্ড যদি এখানে থাকো আমি কিন্তু মানুষ জড়ো করব।
তুষার বাইক থেকে নেমে সায়রার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, সায়রা প্লিজ, তুমি এমন বলো না।
সায়রা দুই কদম পিছিয়ে গেল। তুষারের দিকে আঙুল তাক করে বলল, তোমার মতো অসভ্য আমি দুইটা দেখিনি। আমি তো তোমাকে বলেছি। আমি তোমাকে পছন্দ করি না। তারপরেও কেন আমাকে বিরক্ত করো তুমি। আমি অন্য একজনকে পছন্দ করি। তুমি প্লিজ আমাকে আর বিরক্ত করবে না।”

তুষার আশাহত হল। বিষণ্ণ মুখে সায়রার দিকে চেয়ে রইল। ছেলেটা বিগত দুই বছর ধরে সায়রার পিছনে ঘুরছে। কিন্তু সায়রা তো তুষারকে পছন্দ করে না। এটা সায়রা বহুবার বলেছে। কিন্তু তুষার যেন বিশ্বাসই করতে চায় না। বারবার ছুটে আসে সায়রার কাছে।
“দেখো তুষার, আমি এতদিন কিছু বলিনি তোমাকে। কিন্তু আমি তোমাকে এবার লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি। তুমি যদি আমাকে আর একবারও বিরক্ত করতে আসো, আমি কিন্তু আমার ভাইকে বলতে বাধ্য হব। আর আমার ভাইকে নিশ্চয়ই তুমি চেনো।”
তুষার একটু পিছিয়ে গেল। তুষার হলো মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। বাবা অনেক কষ্ট করে পরিশ্রম করে ওকে পড়াশোনা করাচ্ছে। কিন্তু মন তো আর মানে না। যখন এই ভার্সিটিতে নতুন আসে, তখন থেকে সায়রাকে পছন্দ করে। কবে যে পছন্দ থেকেই ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেছে, ও নিজেও বুঝতে পারেনি।

তুষার আর একটা কথাও বলল না। মাথা নিচু করে বাইকে উঠে পড়ল। মাথার হেলমেটটা লাগিয়ে ভার্সিটির ভেতরে চলে গেল।
সায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তখনই দেখল নবনীতা রিকশা থেকে নেমে রিকশার ভাড়া মিটিয়ে সায়রার দিকেই এগিয়ে আসল।
“কোথায় ছিলি, কখন থেকে অপেক্ষা করছি জানিস?”
নবনীতা মুচকি হেসে বলল, “আসলে ট্রাফিক জ্যামে পড়েছিলাম। জানিসই তো আমার বাসা থেকে বেরোলেই ট্রাফিক। চল ভেতরে চল।”
“হুম চল।” বলেই দুজন ভার্সিটির ভেতরে চলে গেল।

ভর্তির সমস্ত ফর্মালিটি শেষ করে মাইরা আর শেহরান বাইরে বেরিয়ে আসল। শেহরান ফোন স্ক্রল করতে করতে হাঁটছে। মাইরা শেহরানের পাশে এক প্রকার দৌড়াচ্ছে।
-মাইরা বিরক্তি নিয়ে বলল, “আচ্ছা আপনি এমন হাতির মতো করে হাঁটছেন কেন?
-শেহরান পথের মধ্যেই থেমে গেল।
–মাইরা অন্যদিকে তাকাতে তাকাতে হাঁটছিল বিধায় শেহরানের দাঁড়ানোতে ওর পিঠের সাথে ধাক্কা খেল। ও মা গো বলে কপালে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে শেহরানের দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা আপনি কি লোহা। আপনি শুধু আমাকে ব্যথা দেন।”
-শেহরান মাইরার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা তোমার সমস্যা কি বলবে? তুমি সবসময় এত কথা বলো কিসের জন্য? ওকে ফাইন, এবার তুমি আগে হাঁটো। আমি তোমার পিছে আসছি?

-মাইরা মুখ ভেংচিয়ে আগে আগে হাঁটতে লাগল। বিড়বিড় করে বলল, “সাধে তো বলি না খাটাশ। ব্যবহার দেখো কেমন। আমি হলাম ছোট মানুষ। তুই কোথায় আমার সাথে ভালো ব্যবহার করবি। আমি তোর বউ। তা নয় আমার সাথে সবসময় খাটাশদের মতো আচরণ করবে। অসভ্য, ম্যানার্সলেস লোক একটা।”
-মাইরা গাড়িতে উঠে পড়ল।
-গাড়ির ভিতরটা একদম চুপ। শুধু এসির মৃদু শব্দ আর বাইরে গাড়ির হর্ন।
-মাইরা জানালার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে আড়চোখে শেহরানকে দেখছে। লোকটা ড্রাইভ করছে, চোখ সামনে, মুখে কোনো কথা নেই। কালো মাস্ক আর ক্যাপের জন্য মুখটাও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না।

-মাইরা চুপ করে আর থাকতে পারল না। বিড়বিড় করে বলল, রোবট একটা।
-শেহরান ভ্রু একটু কুঁচকাল কিন্তু কিছু বলল না।
-মাইরা এবার একটু জোরে বলল, “কি হলো? কথা বলতে মানা করেছে কেউ?
-শেহরান স্টিয়ারিং ধরে রেখেই বলল, “ডিস্টার্ব করো না।”
মাইরা মুখ ফুলিয়ে বলল, “আমি ডিস্টার্ব করছি? আপনি তো সারাদিন ডিস্টার্ব করেন আমাকে। আচ্ছা আমরা কি এখনই বাসায় যাব? একটু আইসক্রিম খেতে যাই?”
-শেহরান একবার ওর দিকে শান্ত চোখে তাকাল, না।
-মাইরা বলল, একটা শব্দেই না? মানুষ এত কিপটা হয় কিভাবে?”
-গাড়ি সিগন্যালে থামল। শেহরান পকেট থেকে পানির বোতল বের করে ঢাকনা খুলে মাইরার দিকে বাড়িয়ে দিল। একটা কথাও বলল না।
-মাইরা অবাক হয়ে বোতলটা নিয়ে বলল, “আমার জন্য?”
-শেহরান সামনে তাকিয়ে বলল, “পানি খাও। গলা শুকিয়ে গেছে তোমার। বকবক করতে করতে।
মাইরা বোতলে চুমুক দিয়ে মনে মনে দুষ্টু হাসল। লোকটা যতটা দেখায় আসলে ততটা খারাপ না।

শাহানা বেগম সোফায় বসে চা খাচ্ছিলেন। পাশে লাবনী বেগম আর লীনা বসা।
লাবনী বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আপা, শেহরানের বিয়ে হয়ে গেল। অথচ আমরা কেউ জানতেই পারলাম না। আমার কত ইচ্ছা ছিল শেহরানের বিয়ে নিয়ে। হলুদ, মেহেদি, গায়ে হলুদের গান।
-শাহানা বেগম মুচকি হেসে বললেন, “মন খারাপ করো না লাবনী। বিয়ের কথা এখনো কাউকেই বলা হয়নি। মেয়ের বয়স কম। আরেকটু বড় হোক, তারপর ধুমধাম করে অনুষ্ঠান করব। তখন তোমার সব ইচ্ছা পূরণ হবে। কেমন?
লাবনী বেগম আর কথা বাড়ালেন না। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা লীনা, তোর ভার্সিটি কেমন চলছে?”
লীনা মাথা নেড়ে বলল, “ভালো আম্মু।” তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, “সায়রা কোথায় আপা?”

-“সায়রা ওর রুমে আছে।”
-“ওহ।” লীনা ফোন ঘাটতে লাগল।
লাবনী বেগম তখন আসল কথায় আসলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “তা তোমার বৌমা কোথায়? বৌমাকে ডাকো। আমিও একটু দেখি। কেমন মেয়ে আমাদের শেহরানের বউ।”
শাহানা বেগম সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “মাইরা রুমে আছে। সকালের দিকে কলেজে গিয়েছিল ভর্তির জন্য। আসার পর একটু ঘুমিয়েছে। এখনো ওঠেনি। উঠলেই তোমার সাথে দেখা করিয়ে দেব।”

লাবনী বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন, “বাবা, এখনো ঘুমাচ্ছে? এখন তো বিকাল হয়ে গেছে। বাড়ির বউ এত বেলা পর্যন্ত ঘুমায়?”
শাহানা বেগম শান্ত গলায় বললেন, “বাচ্চা মানুষ তো। কলেজ থেকে এসে টায়ার্ড।”
মাইরা বিছানায় কাত হয়ে ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতেই ঘড়ির দিকে তাকাল। চোখ দুটো ছানাবড়া। ঘড়িতে পাঁচটা বাজে।
ধড়ফড় করে উঠে বসল। শেহরান ওকে নামিয়ে দিয়েই আবার পার্টি অফিস চলে গেছে।
তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে চুল আঁচড়াল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা স্কার্ট আর টপস পরে নিল। তারপর গলায় একটি ওড়না ঝুলিয়ে নিচে নেমে আসলো। চুল ছাড়া।

-ডাইনিং রুমে ঢুকতেই দেখে সবাই বসে আছে।
-শাহানা বেগম মাইরাকে দেখে হাসলেন, “মাইরা এদিকে আসো।”
-মাইরা শাশুড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
-শাহানা বেগম মাইরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “উনি তোমার মামী শাশুড়ি।”
-শাশুড়ির কথা শুনে মাইরা মুচকি হেসে লাবনী বেগমের দিকে তাকিয়ে সালাম দিল, “আসালামু আলাইকুম।”
-লাবনী বেগম উপর থেকে নিচ পর্যন্ত মাইরাকে দেখলেন। তারপর বললেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম। তুমিই শেহরানের বউ?
-“জি।” মাইরা মাথা নিচু করল।
লাবনী বেগমের চোখ আটকাল মাইরার খোলা চুলে। মুখটা কেমন বাঁকা হয়ে গেল। “তা মা, বাড়ির বউ হয়েছ। মাথায় একটা ওড়না দিবা না? বড়রা বসে আছে। এভাবে চুল ছেড়ে ঘোরে?
মাইরা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। কি বলবে বুঝতে পারল না।
শাহানা বেগম সাথে সাথে বললেন, “লাবনী, ও আমার বাড়ির মেয়ে। আর মেয়েরা নিজের বাড়িতে একটু ফ্রি হয়েই থাকে।”

“তা ঠিক আপা। লাবনী বেগম হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে ধার ছিল। “কিন্তু শ্বশুর বাড়ি বলে কথা। নিয়ম কানুন তো মানতে হবে। আমার সময়ে তো শাশুড়ি দেখলে মাথা থেকে ওড়না নামতই না।
লীনা মাইরার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল।
মাইরা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জা লাগছে।
শাহানা বেগম মাইরার হাত ধরে পাশে বসালেন। তারপর লাবনীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “লাবনী, আমার ছেলের বউ। আমি যেমন রাখব তেমনই থাকবে।
একটু থেমে আবার বললেন, “আর শোনো, নিয়ম কানুন ভালোবাসা দিয়ে শেখাতে হয়। ধমক দিয়ে না। মাইরা খুব লক্ষ্মী মেয়ে। আস্তে আস্তে সব শিখে যাবে। তুমি বড় মানুষ, তুমিই ওকে শিখিয়ে দিও। কেমন?”

লাবনী বেগম আর কিছু বলতে পারলেন না। শুধু বললেন, “হুম।”
শাহানা বেগম মাইরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। “যাও মা, ফ্রিজ থেকে শরবত বের করে সবাইকে দাও তো।”
-মাইরা -আচ্ছা আম্মু” বলে রান্নাঘরে চলে গেল। যাওয়ার সময় একবার শাশুড়ির দিকে কৃতজ্ঞ চোখে তাকাল।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১০

-লাবনী বেগম বিড়বিড় করলেন, “ছেলেকে একদম মাথায় তুলেছ আপা।”
-শাহানা বেগম শুধু হাসলেন। “ছেলের বউকেও মাথায় তুলব। সমস্যা?”
-লীনা মাইরার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুখ ঘোরাল।
-শাশুড়ির কথা শুনে মাইর আর ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেল।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ১২