Home এমপি শেহরান মির্জা এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৩০

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৩০

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৩০
সেঁজুতি আক্তার

সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে একদম মাইরার মুখের উপর এসে পড়তেই ঘুমটা ভেঙে গেল। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই চোখ কপালে উঠে গেল। আটটা বাজে। রাতে অনেক দেরি করে ঘুমানোর কারণে আজ এত দেরি হয়ে গেছে। কাল রাতের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। অভ্যাসবশত পাশে হাত বাড়াল। পাশে শেহরান নেই। মাইরা ধড়ফড় করে উঠে বসল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল। রুমের কোথাও নেই। বুকের ভেতর হঠাৎ করেই ভারি হয়ে উঠল। কাল রাতে ওইভাবে ধাক্কা দেওয়াটা মানুষটা কষ্ট পেয়েছে।

— তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এলোমেলো চুলগুলো হাত খোঁপা করে বেঁধে নিল। মুখটা ফ্যাকাসে লাগছে। ওয়াশরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে পানি দিতেই আবার কাল রাতের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠল।
— লজ্জায় মাইরার মুখটা লাল হয়ে গেল। সাথে সাথেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ও তো না বুঝেই একটু বেশি করে ফেলেছে। কিন্তু ও তো শেহরানকে কখনো এইভাবে দেখেনি। তাই একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এতটা ভয় পাওয়ার কি দরকার ছিল? মাইরা ভাবল শেহরানের সাথে কথা বলতে হবে। সরি বলতে হবে। বুঝিয়ে বলতে হবে। তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসলো। হাত-মুখ মুছে ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসলো। লিভিংরুমে কেউ নেই।

— মাইরার এবার একটু একটু টেনশন হচ্ছে। মানুষটা হয়তো ওর ব্যবহারে খুব কষ্ট পেয়েছে। রান্নাঘর থেকে খুন্তি নাড়ার টুংটাং শব্দ আসছে। সাথে মসলা কষানোর ঘ্রাণ।
— মাইরা কৌতূহলী হয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। পা টিপে টিপে। দরজার সামনে দাঁড়াতেই থমকে গেল। রান্নাঘরের ভেতর শেহরান দাঁড়িয়ে রান্না করছে। পরনে সাদা টি-শার্ট আর ট্রাউজার। হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। চুলগুলো এলোমেলো। খোঁড়া পা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
— মাইরা হা হয়ে গেল। একি! আপনি রান্না করছেন কেন?
— শেহরান পেছন ফিরে তাকাল না। খুন্তি নাড়া থামাল না। শুধু একবার ঘাড়টা একটু কাত করল। তারপর আবার আগের মতো তরকারি নাড়তে লাগল।
— মাইরা দরজার ফ্রেমটা খামচে ধরল। গলা শুকিয়ে আসছে। আপনার পা ব্যথা করছে না? আমি… আমি রান্না করে নিতাম।

— শেহরান এবারও চুপ করে রইল। মাইরার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। এই নীরবতাটা কাল রাতের চেয়েও বেশি কষ্ট দিচ্ছে। কাঁপা গলায় বলল, কাল রাতের জন্য. সরি। আমি বুঝতে পারিনি। আপনি আপনি ওই অবস্থায় ছিলেন। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
— শেহরান চুলার আঁচটা কমিয়ে দিল। তারপর প্লেটে তরকারি বাড়তে লাগল। মাইরা আরেক পা ভেতরে ঢুকল। আপনি কথা বলছেন না কেন? রাগ করেছেন? আমার উপর রাগ করে থাকবেন?
— শেহরান তাও কোনো উত্তর দিলো না। শেহরান প্লেটটা হাতে নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিল। মাইরা তাড়াতাড়ি পথ আটকাল।
— শেহরান মাইরার দিকে না তাকিয়ে বলল, সরুন।
— না। মাইরার চোখে পানি চলে আসলো। আগে কথা বলুন। কাল রাতে যা হয়েছে আমি ইচ্ছে করে করিনি। আপনি যখন ওইভাবে ছিলেন, আমার মাথা কাজ করছিল না।
— শেহরান মাইরার দিকে তাকাল। চোয়াল শক্ত করে বলল, সরো।

— আমি সরব না। আপনি আমাকে ইগনোর করছেন। কাল রাতে ওইভাবে কাছে এসেছিলেন, আর আজ একটা কথাও বলছেন না? আমি কি এতটাই খারাপ?
— শেহরান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্লেটটা টেবিলের উপর সাবধানে রাখল। তারপর মাইরার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি খারাপ না মাইরা। সমস্যাটা আমি।
— তাহলে কথা বলছেন না কেন?
— কি বলব? শেহরান হাসল। কাল রাতে নেশার ঘোরে তোমার সাথে যা করেছি, তারপর কোন মুখে কথা বলব? তোমাকে ভয় দেখিয়েছি। কষ্ট দিয়েছি।
— আপনি নেশায় ছিলেন। আপনার দোষ না।
— দোষ আমারই। শেহরান চোখ নামিয়ে নিল। আমি প্রমিজ করেছিলাম আর কষ্ট দেব না। কিন্তু প্রথম সুযোগেই ভেঙে ফেললাম। তুমি ঠিকই করেছ ভয় পেয়ে।
— এভাবে বলবেন না। মাইরা শেহরানের হাতটা ধরতে গেল। শেহরান একটু পিছিয়ে গেল।
— শেহরানের পিছিয়ে যাওয়াটা মাইরার বুকে ছুরির মতো বিঁধল। আপনি দূরে সরে যাচ্ছেন। ফুঁপিয়ে উঠল মাইরা। কাল রাতে অত কাছে ছিলেন। আর আজ একটু ছোঁয়ারও পারমিশন নেই?
— শেহরান চোখ বন্ধ করল। কপালের রগ দপদপ করছে। তোমাকে ছুঁলে আমি কন্ট্রোল হারাই মাইরা। কাল রাতে হারিয়েছি। আর হারাতে চাই না। তোমার চোখের ওই ভয়টা আমি আর দেখতে পারব না।

— মাইরা দুই হাতে মুখ ঢাকল। তাহলে আমি কি করব? আপনি সারাজীবন এইভাবে চুপ করে থাকবেন?
— চুপ করে থাকাই ভালো। শেহরান প্লেটটা আবার হাতে নিল। আমি নাস্তা বানিয়েছি। খেয়ে নাও। ওষুধ আছে টেবিলে।
— বলেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
— মাইরা পেছন থেকে ডাকল, কিন্তু শেহরান থামল। কিন্তু পেছনে ফিরে চাইলো না।
— আমি কি এতটাই খারাপ বউ যে আমার সাথে কথা বলাও পাপ?
— শেহরান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, তুমি সবচেয়ে ভালো বউ। সমস্যা আমাকে নিয়ে। বলেই সিঁড়ির দিকে চলে গেল।
— মাইরা দাঁড়িয়ে রইল। মাইরা প্লেটের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, নিজে খোঁড়া পা নিয়ে রান্না করেছে আর আমাকে বলছে খেয়ে নিতে। মাইরার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।
— মাইরা ধীরে ধীরে চেয়ার টেনে বসল। প্লেটের ভাত নাড়ছে। খেতে পারছে না। উপর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। শেহরান রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
— মাইরা একটা ভাত মুখে দিল। গলা দিয়ে নামছে না। সব তেতো লাগছে। এইভাবে আর কতদিন? নিজেকেই প্রশ্ন করল। কাল রাতের একটা ভুলের জন্য কি সারাজীবন এভাবে থাকবে।

— এভাবেই কেটে গেল সকাল থেকে রাত, রাত থেকে এক মাস। এই এক মাসে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। শেহরানের শরীর আগের থেকে এখন অনেক ভালো। এখন বিজনেসের জন্য বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতে হয়।
— মাইরা বাড়িতে একাই থাকে বেশিরভাগ সময়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই শেহরান চলে যায়। মাইরার সাথে দেখা হয় না। দেখা হয় রাতে, তাও টুকটাক প্রয়োজনীয় কথা হয়, তাছাড়া কথা হয় না।
— সিঙ্গাপুরে আসা মাইরার দেড় মাস কেটে গেছে। এই দেড় মাসে টুকটাক বাসার মানুষের সাথে মাঝে মধ্যে কথা হয়েছে। কিন্তু মামা-মামির সাথে আর কথা হয়নি সেই বাড়ি থেকে আসার পর। মাঝে একদিন হয়েছিল। তারপরে আর হয়নি।
— গতকাল রাতে বাসা থেকে ফোন দিয়েছিল শেহরানের ফোনে। সায়রার নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্রের নাম জিজ্ঞেস করতেই বলে নীলাদ্রির সাথে। এতে মাইরা বেশ খুশি। আর এও বুঝেছে যে ওদের মধ্যে কোনো কানেকশন আছে। এখন এনগেজমেন্ট করিয়ে রাখবে। ওরা যখন দেশে যাবে তখন বিয়ে হবে।
— শেহরানের বাবা বারবার দেশে ফিরে যেতে বলছে। কিন্তু শেহরানের এক কথা, সে দেশে যাবে না। তার নাকি এখন অনেক কাজ এখানে। অফিসের কিছু ঝামেলা চলছে, এগুলা না মিটিয়ে তো দেশে ফিরে যাবে না।
— মাইরার পড়াশোনা লাটে উঠে আছে। বাসায় টুকটাক পড়াশোনা হয়, তাছাড়া তো কলেজ করা হয় না।

— বিকালের শেষ ভাগ। মাইরা ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে বসে আছে। উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এই কয়েকদিনে শেহরানের সাথে বেশ দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আগে যেখানে সারাদিন টুকটাক কথা হতো, এখন সেখানে প্রয়োজন ছাড়া দুজনের মধ্যে তেমন কোনো কথাই হয় না। মাইরা চুপচাপ বসে বসে নানান চিন্তা করছে। এক মাস হয়ে গেল। মানুষটা যেন ইচ্ছে করেই ওর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগেই চলে যায়, রাতে ফিরে এলেও দু-একটা প্রয়োজনীয় কথা বলেই নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমাতে চলে যায়।
— হঠাৎ নিচ থেকে গাড়ির শব্দ ভেসে আসলো। মাইরা চমকে উঠল। ছাদ থেকে নিচের দিকে উঁকি দিয়ে তাকাতেই দেখল শেহরানের গাড়ি এসে বাড়ির সামনে থামছে।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৯ (২)

— মাইরা অবাক হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি? এই এক মাসে তো শেহরান কখনো বিকেলে বাসায় ফেরেনি। প্রায় প্রতিদিন রাত করে বাসায় ফেরে। আজ হঠাৎ বিকেলেই ফিরে আসলো কেন?
মাইরা কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আর কিছু না ভেবে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। নিচে গিয়ে দেখল শেহরান ইতিমধ্যে লিভিংরুমে ঢুকে পড়েছে। মাইরা দরজার আড়াল থেকে একবার তাকিয়ে রইল। শেহরানকে দেখে মাইরার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল। মানুষটার কি শরীর খারাপ? ভাবতেই মাইরার মনটা খারাপ হয়ে গেল। পরক্ষণে ভাবল, এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে যাওয়া যাক। যেই ভাবা সেই কাজ। রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ কফি বানিয়ে রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here