এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৯ (২)
সেঁজুতি আক্তার
মাইরা রেডি হয়ে লিভিংরুমে এসে দেখল শেহরান কোথাও নেই। বিরক্তি নিয়ে নিচে, গার্ডেনে সব জায়গায় খুঁজল। কোথাও নেই। এবার একটু একটু টেনশন হচ্ছে। মানুষটা গেল কোথায়? হঠাৎ ছাদের কথা মনে পড়তেই আর কিছু না ভেবে ছাদের দিকে পা বাড়াল।
–ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁই ছুঁই। ট্যারেসের নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু শেহরানের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কপালের রগ দপদপ করছে। মনে হচ্ছে মাথার ভেতরের শিরাগুলো এখনই ছিঁড়ে যাবে।
–আজ দুপুর থেকে যন্ত্রণাটা শুরু হয়েছে। এক প্যাকেট সিগারেট শেষ। সাথে তিনটা ড্রিংক। তবুও মাথার অসহ্য যন্ত্রণা কমার বদলে আরও বাড়ছে। সবচেয়ে বড় আগুনটা জ্বলছে বুকের ভেতর। বউ আছে তবুও বউকে ছুঁতে পারছে না। বউটা যে তার পিচ্চি। এই যন্ত্রণা কাকে দেখাবে। ইচ্ছে করছে এখনই দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু পারছে না। এতদিন দাঁতে দাঁত চেপে কন্ট্রোল করেছে। আজ আর হচ্ছে না। শরীরের রক্ত গরম হয়ে উঠছে। অস্থিরতা পাগল করে দিচ্ছে।রাগে টি-টেবিলের উপর একটা ঘুষি মারল, সাথে সাথে গ্লাসটা ছিটকে পড়ে ভেঙে গেল। হাত দিয়ে চুল খামচে ধরে চোখ বন্ধ করল। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, এত কাছে থেকেও ছুঁতে পারছি না। আবার গ্লাসে অ্যালকোহল ঢেলে এক নিঃশ্বাসে শেষ করে দিল। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। সবকিছু ঝাপসা দেখা যাচ্ছে।
–মাইরা আস্তে আস্তে ট্যারেসের দিকে উঠছে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। দরজাটা হালকা খোলা। বাইরে থেকে সিগারেটের ধোঁয়া ভেসে আসছে। মাইরা শুকনো ঢোক গিলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই থমকে গেল।
–সামনে শেহরান পাগলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। চুল গুলে এলোমেলো। শার্টের দুইটা বোতাম খোলা। টি-টেবিলে কাঁচের টুকরো পড়ে আছে। চোখ দুটো লাল, যেন রক্ত জমাট বেঁধে আছে।
–মাইরাকে দেখতেই শেহরানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ঘোলা চোখে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখল। মুহূর্তের মধ্যে ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে মাইরার হাত চেপে ধরল। এত জোরে যে মাইরা আহ করে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল, জান তুই? তুই এখানে কেন এসেছিস? মাইরা ভয়ে কেঁপে উঠল।
–শেহরানের আচরণ দেখে মাইরা একটু ভয় পেয়ে গেল। কাঁপা কণ্ঠে বলল, আপনাকে খুঁজছিলাম। শেহরান মাইরাকে কথা শেষ করতে দিল না। একটানে বুকের সাথে চেপে ধরল। এত শক্ত করে যে মাইরার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। শেহরানের গরম নিঃশ্বাস মাইরার ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে। শেহরান উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, জান, তুই আমার কাছে আসলে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। বুঝিস না? পাশে থেকেও ছুঁতে পারছি না।
–মাইরা নিজেকে শেহরানের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। লাগছে, ছাড়ুন। শেহরান আরও শক্ত করে ধরল। অবসেসিভের মতো চুলে, কাঁধে মুখ ঘষছে। ছাড়ব? ছাড়লে তো আমি শেষ। বলেই কপাল ঠেকাল কপালে। কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, তুই আমার কাছে আসিস না প্লিজ। আসলে আমি কন্ট্রোল হারাই। শেহরানের এমন পাগলামি দেখে মাইরার ভীষণ ভয় করছে। থরথর করে শরীর কাঁপছে। কাঁপা হাতে বুক থেকে সরানোর চেষ্টা করতেই চোখ পড়ল পায়ের দিকে। ব্যান্ডেজ খোলা। রক্ত জমাট বাঁধা জায়গাটা আবার ছিঁড়ে গেছে। মাইরা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, আপনি এটা কী করেছেন? আপনার পা!
–শেহরান পাগলের মতো হাসল। ব্যথা? তুই সামনে থাকলে ব্যথা কোথায় থাকে জান? বলেই এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল। মাইরা ছটফট করছে। নামান আমাকে। আপনার পা দিয়ে রক্ত পড়ছে। পাগল হয়ে গেছেন? শেহরান কোনো উত্তর দিল না। টলতে টলতে ছাদের কিনারার দেয়ালটার কাছে নিয়ে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
–মাইরা পায়ের দিকে হাত বাড়াতেই ওর হাত চেপে ধরে মাথার উপর তুলে ধরল। স্লো ভয়েসে ফিসফিস করে বলল, আমার পা নিয়ে ভাবতে হবে না। আমাকে নিয়ে ভাবো।
–মাইরা কেঁদে ফেলল। ছাড়ুন প্লিজ। আপনি নিজেকে শেষ করে ফেলবেন? শেহরানের মধ্যে কোনো রকম ভাবান্তর দেখা গেল না। ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনল ঘাড়ে। আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল দুই-তিনবার। মাইরা শিউরে উঠল। সারা শরীর কাঁপছে। ছাড়ানোর জন্য হাত-পা ছুঁড়ছে, পারছে না। শেহরান মাইরার নাজুক শরীর পুরো নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে। শেহরান উদভ্রান্ত নেশালো কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল, জান, তুই আমার কাছে আসলে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। এই যে বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে, এটা তুই নেভা। মাইরার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। নিজেকে দিশেহারা লাগছে।
–শেহরান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ড্রিংকের নেশা, পায়ের যন্ত্রণা, আর বউকে কাছে পাওয়ার পাগলামি সব একসাথে গ্রাস করেছে। ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, আজ আর কোনো মানা শুনব না বউ। একদম না। আস্তে করে মুখ তুলে নেশাগ্রস্ত চোখে তাকাল মাইরার কাঁপা ঠোঁটের দিকে। তারপরে কাঁপা হাতে থুতনি ছুঁয়ে মুখটা নিজের দিকে ঘোরাল। মাইরা চোখ বন্ধ করে আছে। ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে। শেহরান একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপরে আলতো করে তর্জনী আঙুলটা মাইরার কাঁপা ঠোঁটে ছুঁয়ে দিল।
–মাইরা উত্তর দিল না। শেহরানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। দুই গালে কাঁপা হাত রাখল। তাকাও আমার দিকে। মাইরা চোখ বন্ধ করেই আছে। শেহরান আর কিছু না ভেবে উন্মাদের মতো ঠোঁট চেপে ধরল।
–উম… ছাড়ুন। মাইরা মুখের ভেতর থেকে বলার চেষ্টা করল। শেহরান কিছুই শুনল না। আরও গভীরে গেল। এক হাতে চুল খামচে ধরল, আরেক হাতে কোমর পিষে ধরল নিজের সাথে।
–মাইরার দম বন্ধ হয়ে আসছে। পেটের ভেতর মোচড়। মদের গন্ধ আর সিগারেটের ঝাঁঝে মাথা ঘুরছে। অনেক কষ্টে দুই হাতে বুকে প্রচন্ড ধাক্কা দিল। শেহরান টলতে টলতে একটু পিছাল, কিন্তু আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল। সেই ফাঁকে মাইরা সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে রেলিং এর কাছে গেল। ঝুঁকে কাশতে লাগল। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। গলা জ্বলছে। বমি আসছে কিন্তু হচ্ছে না।
–শেহরানের ঘোর একটু কাটল। বুকটা হাপরের মতো উঠানামা করছে। টলতে টলতে দুই পা এগিয়ে গেল। কপাল চেপে ধরল। মাইরা, আমি… আমি কী করলাম? শেহরানের কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে। বলেই হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। পায়ের ব্যান্ডেজ খোলা জায়গা দিয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ছে।
–হঠাৎ কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই ঝুম বৃষ্টি নেমে পড়ল। শেহরান মেঝেতে বসে আছে। ভিজে একাকার হয়ে গেছে। পায়ের রক্ত পানিতে মিশছে। নেশার ঘোর অর্ধেক কেটেছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। এক পা এগোতেই টলে পড়ে যেতে নিল। দেয়াল ধরে ব্যালেন্স করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাইরার কাছে গেল।
–মাইরা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। শেহরান ধপ করে পায়ের কাছে বসে পড়ল। দুই হাতে শাড়ির আঁচল খামচে ধরল। জান, জান আমার বউ, মাফ করে দে, মাফ করে দে আমাকে।
–মাইরা চুপ করে আছে। ও তো এসেছিল শেহরানকে শায়েস্তা করতে। কিন্তু এখন নিজেই শায়েস্তা হয়ে গেছে। ভেবেই থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। শেহরান আরও জোরে আঁচল চেপে ধরল। মাথাটা হাঁটুতে ঠেকিয়ে দিল। আমি… আমি জানোয়ার, আমি খারাপ। কয়দিন ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় মরছি। তাই একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তারপরে বিড়বিড় করে বলল, তুই ঠিক আছিস? হ্যাঁ? কথা বল, বউ?
—মাইরার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। শেহরানকে এই অবস্থায় দেখে ওর বেশ মায়া হচ্ছে। অনেকক্ষণ পর আস্তে করে হাঁটু গেড়ে বসল। ভেজা হাতে এলোমেলো চুলে হাত রাখল। শেহরান চমকে মুখ তুলে চাইল মাইরার দিকে। মাইরার গলা আটকে আসছে, তবুও কষ্ট করে বলল, চলুন। ঘরে চলুন। শেহরান আস্তে করে বলল, মাইরা?
–বললাম চলুন। অসুস্থ হয়ে যাবেন। বলেই মাইরা উঠে দাঁড়িয়ে নিজেই সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল। আর পেছন ফিরে তাকাল না।
–শেহরান কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। পায়ের ব্যথায় উফ করে উঠল। খোঁড়াতে খোঁড়াতে পিছু পিছু গেল।
–রুমে ঢুকেই মাইরা সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল। শেহরান ভেজা শরীরে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। পাঁচ মিনিট পর মাইরা বের হলো।
–কিন্তু একবারও শেহরানের দিকে তাকাল না। সোজা কিচেনে চলে গেল। শেহরান ধীরে ধীরে রুমে ঢুকে বাথরুমে গিয়ে দরজা লাগাল। শাওয়ারের ঠান্ডা পানিতে মাথা ধরিয়ে দিল। নেশা প্রায় কেটেছে। শুধু ঝিমঝিম করছে।
–দশ মিনিট পর বের হয়ে দেখল খাটের পাশের টেবিলে এক গ্লাস লেবু-আদার শরবত। পাশে প্যারাসিটামল। মাইরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শেহরান আস্তে করে গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নিল। তারপরে মাইরার দিকে তাকিয়ে ধন্যবাদ বলতে গিয়েও বলল না। গলা আটকে আসছে।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৮
–মাইরা কোনো কথা না বলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কাঁথা টেনে গায়ে দিল। শেহরান খাটের এক কোণায় মেঝেতে বসে পড়ল। মাইরার দিকে তাকিয়ে রইল।
–অনেকক্ষণ পর মাইরা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। শেহরান উঠে খোঁড়াতে খোঁড়াতে খাটের পাশে গেল। খুব সাবধানে আলতো করে মাইরার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। সরি বউ, আমি আর কষ্ট দিব না। কথা দিলাম। ফিসফিস করে বলেই পাশে বসে রইল। ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে।
